📄 মৃত্যুর ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা - ঘুম
পৃথিবীর যত সম্পর্ক আছে সব ক্ষণস্থায়ী। যতবার অন্তরে মৃত্যুর স্মরণ জাগ্রত হবে, তখনই চেষ্টা ও পরিশ্রম বেড়ে যাবে। আর যখন মৃত্যুর স্মরণ আড়াল হয়ে যাবে, তখনই মানুষ অলস হয়ে যাবে এবং ঝিমিয়ে পড়বে। আপনি যখন ইবাদতে অলসতার প্রভাব প্রবল মনে করবেন এবং ফরজ-ওয়াজিবে অবহেলা বিরাজমান দেখতে পাবেন, তখন বুঝে নেবেন যে, দীর্ঘ আশা আপনার অন্তরে বাসা বেঁধেছে এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। এজন্যই হাসান আল-বাসরি রাহিমাহুল্লাহ একটি মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন, যার ব্যতিক্রম ঘটে না। তিনি এমন একটি কথা বলেছেন, যা শ্রবণেন্দ্রিয়ের দরজায় কড়া নেড়ে তালা ভেঙে সরাসরি অন্তরে প্রবেশ করে। তিনি বলেন—
বান্দা যখন মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তখন এর প্রতিক্রিয়া তার আমলে দেখা যায়। আরবান্দার আশা দীর্ঘায়িত হলে তার আমলকে নষ্ট না করে ছাড়ে না। ১০৪
প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার আলোকে শাইখ সাদুদ্দিন মালাবারি রাহিমাহুল্লাহর কাছে এই কথা স্পষ্ট হয়েছিল। হাজারো অবস্থা পাঠের ফলাফল প্রত্যক্ষ করে তিনি বলেন—
আমার কাছে পরিপূর্ণভাবে স্পষ্ট হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সকালেই সন্ধ্যা দেখার আশা করে বসে অথবা সন্ধ্যায় পরের দিনের সূর্য দেখার আশায় বুক বাঁধে, সে কখনো দুর্বলতা ও কালক্ষেপণের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। তাকে আজীবন মন্থরগতিতেই হেঁটে যেতে হবে। ১০৫
তবে যারা পরিশ্রমীদের অবস্থা থেকে না হোক, কিন্তু অলসদের মৃত্যুকালীন অনুতাপ থেকে হলেও শিক্ষা নেয়; তাহলে এই শিক্ষাই তাকে বিশ্রামের বিছানা থেকে টেনে তুলে দেবে এবং ঘুম থেকে জেগে উঠতে পীড়া দেবে।
ইবনুল জাওজি রাহিমাহুল্লাহ্ বলেন—
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে মানুষের চেতনা ফিরে পাওয়া বড়ই চমৎকার! কিন্তু তার তখনকার চেতনা প্রশংসাযোগ্য নয়। সে তখন সীমাহীন অস্থির হয়ে ওঠে। অতীতের জীবন নিয়ে হা-হুতাশ করতে থাকে। কামনা করে, এবারের মতো যদি তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো তবে ছুটে যাওয়া সবকিছু পূরণ করে নিত! তাওবায় ততটাই বিশ্বাসী হয়ে উঠত যতটা সে এখন মৃত্যুর কথা বিশ্বাস করছে। যেন সে মৃত্যুর আগেই পরিতাপের অনলে পুড়িয়ে নিজেকে মেরে ফেলবে। সেই অবস্থার অণু পরিমাণও যদি সুস্থতার সময় আপনার অনুভূত হয়, তাহলে তাকওয়ার সকল উদ্দেশ্যই অর্জিত হবে। সুতরাং, সেই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান, যে এই অবস্থা থেকে শিক্ষা নেয় এবং তদানুযায়ী আমল করে। যদি কেউ এমনটি কল্পনা করে নিজের বাস্তব জীবনকে সজ্জিত না করে, তবে সে স্বাভাবিক অবস্থার মতোই দম্ভ করে যাবে। নিশ্চয়ই এমনটি কল্পনা করার মাধ্যমে প্রবৃত্তি দমন হয় এবং চেষ্টা ও পরিশ্রমে উৎসাহ সৃষ্টি হয়।
মৃত্যুর ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা
সাথী-সঙ্গীদের মৃত্যুর একটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, শায়খ ইমাম মুহাম্মদ আবদুহ যখন মারা যান তখন নিম্নোক্ত ছয়জন কবি ধারাবাহিকভাবে তাঁর কবরে এসে শোকগাঁথা আবৃত্তি করেন—
১। শায়খ হাসান আবু খাতওয়াহ
২। হাসান পাশা আসেম
৩। হাসান পাশা আব্দুর রাজ্জাক
৪। কাসিম বেক আমীন
৫। হাফানি বেক নাসিফ
৬। হাফিজ বেক ইবরাহিম
ঘটনাক্রমে এই ধারাবাহিকতা অনুসারেই এই ছয়জন কবির মৃত্যু হয়।
সর্বশেষে থাকা হাফিজ ইবরাহিম অসুস্থ হন এবং মৃত্যুর আশংকা করেন, তখন শুধু হাফিজ হাফানিই জীবিত ছিলেন। হাফানি তখন ইবরাহিমের কাছে বার্তা পাঠান যে, পরবর্তী পালা হাফানির নিজের। হাফিজ ইবরাহিমের নয়। তিনি নিজের ভাষায় বলেন—
আমরা যে কবরের পাশে ছয়জন ছিলাম, সেই কথা কি তোমার মনে পড়ে? আমরা ইমামের স্মৃতিচারণ করছিলাম এবং শোকগাঁথা বর্ণনা করছিলাম আমরা একজন একজন করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম আর মৃত্যুও আমাদের কাছে এসেছে শোকগাঁথা বর্ণনার সেই ধারাবাহিকতায় আবু খাতওয়া গত হয়েছেন, তাঁর অনুগামী হয়েছেন আসেম আব্দুর রাজ্জাকের খোঁজেও এসেছে মৃত্যু সে হয়েছে তার সঙ্গী, এরপর কাসিমের সূর্যও হয়েছে অস্তমিত আর খুব শীঘ্রই আমার জীবনতারাও ডুবে যাবে তুমি ট্রেনের নীচে গিয়ে নির্ভয়ে শুয়ে পড়ো বিরান ঘরে গিয়ে নিশ্চিন্তে নিদ্রায় দাও ডুব তীব্র যুদ্ধে জড়িয়েও নিরাপদে দিন কাটাতে পারবে তুমি কারণ, মৃত্যু আপাতত তোমার কাছ থেকে পালিয়েই বেড়াচ্ছে।
হাফিজ ইবরাহিম জবাবে বলেন:
আমি তোমার ব্যাপারে মৃত্যুর আশংকা করি যেন তুমি আমার মতোই থেকে যাও যখন আমি মাথাব্যথায় আক্রান্ত হই তখনই হাফানির বিনিদ্রা নিকটবর্তী হতে থাকে তোমাকে যখন দুর্বলতা চেপে ধরে তখন আমি আমার শয়নকক্ষ প্রস্তুত করি, আমার প্রাণ তোমার প্রাণের সাথে জড়ানো তুমি বেঁচে থাকো তবে আমিও বেঁচে থাকব হাজার বছর।
হাফানির এই কথাই সত্যি হয়েছিল। ১৯১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তখন হাফিজ ইবরাহিম এই কবিতা আবৃত্তি করেন—
আমার জীবনের সূর্য অস্তাচলের কাছাকাছি উপনীত হয়ে গেছে প্রিয় আত্মা! তোমার যাত্রা শুভ হোক!
অতঃপর ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে হাফিজ ইবরাহিমের মৃত্যু হয়। ১০৬
* ঘুম
দৈনন্দিন স্মৃতিচারণ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا
মানুষের মৃত্যুর সময় আল্লাহ তার প্রাণ নিয়ে যান। ১০৭
এই আয়াতে মৃত্যু মানে ঘুম। তবে আল্লাহ তাআলা ঘুম বুঝাতে মৃত্যু শব্দ এনেছেন যেন আমরা প্রতিবার ঘুমানোর সময়ে মৃত্যুকে মনে করি। প্রতি রাতেই যেন এমন ঘুমের প্রস্তুতি নিই, যা থেকে জেগে ওঠা হবে কেবল হাশরের মাঠে। দৈনিক মৃত্যুকে স্মরণ করার আবশ্যকীয় সর্বনিম্ন সীমা একবার। অন্যথায় হৃদয় নষ্ট হয়ে যাবে এবং তাতে বাসা বাঁধবে ক্ষতির ঘুণেপোকা।
সৎকর্মশীলগণ আল্লাহ তাআলার প্রেরিত আহ্বান মেনে নিয়ে, তার চাহিদা অনুযায়ী আমল করেছেন। চেষ্টা এবং পরিশ্রম করেছেন। দামেস্ক অধিবাসীদের নেতা ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া ইবনু কাইস গাসসানিকেই দেখেন। তিনি বলেন-
আমি এমন ঘুম কোনোদিন ঘুমোইনি, যে ঘুমের সময় আমার মন বলেছে যে, আমি জেগে উঠব।১০৮
এমনিভাবে মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি ঘুমানোর সময় বিছানায় যাওয়ার আগে পরিবারের লোকদের বলতেন-
আল্লাহ তোমাদের হিফাজত করেন, হতে পারে এটিই আমার সেই ঘুম, যা থেকে আমি আর জেগে উঠব না। ১০৯
প্রতি রাতেই ঘুমানোর সময় তিনি এই কাজ করতেন।
হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে এমন প্রেরণাদায়ক সচেতনতা এবং এমন চমৎকার চেতনা দান করেন!
টিকাঃ
১০৪ আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ: ২১৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
১০৫ আল ইস্তিদাদ লিল মাওতি ওয়া সুওয়ালিল কবর: ১৩, জাইনুদ্দীন আল-মিলিবারি আল-হিন্দী, দারু ইবনি খালদুন, আলেকজান্দ্রিয়া
১০৬ আল-আহরাম পত্রিকা ৪০৬৩৬তম সংখ্যা জিলকদ, ১৪১৮ হিজরি মোতাবেক মার্চ, ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত
১০৭ সূরা যুমার: ৪২
১০৮. কসরুল আমাল :৪৫, আবু বকর ইবনু আবিদ-দুনিয়া, দারু ইবনিল জাওজি
১০৯ যাম্মুত তাসওয়ীফ : ১৪৭, আবু বকর ইবনু আবিদ দুনিয়া, দারু ইবনু হাযম
📄 প্রস্তুত হন - আমরা কেন মৃত্যুকে অপছন্দ করি
এই পদ্ধতিতে পথ চলতে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে আমাদেরকে সাহায্য করবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথার বাস্তবায়ন, তিনি বলেন-
কোনো মুসলিম যখন কোনো বিষয়ে অসিয়ত করতে চায়, তবে সেই অসিয়ত তার কাছে লিখে রাখা ব্যতীত দুই রাত অতিবাহিত করার অধিকারও তার নেই।১১০
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের প্রত্যেককে অসিয়ত লিখে রাখার আদেশ দিয়েছেন। কেননা, মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে। তাই অসিয়ত লিখে রাখার কাজটা কেবল অসুস্থ এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তিদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। হাদিসে দুই রাতের কথা বলা হয়েছে, যাতে করে অতি ব্যস্ততার দরুন না লিখে রাখার বাহানা দেওয়া না যায়। দুই রাত পর্যন্ত সুযোগ রাখা হয়েছে। এজন্য লিখিত অসিয়ত সঙ্গে থাকা ছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাজিয়াল্লাহু আনহুএর একটি রাতও কাটত না। সার্বক্ষণিক মৃত্যুর প্রস্তুতি এবং সবার হক আদায়ের জন্যই তিনি এমনটি করতেন।
প্রস্তুত হন
একদিন আমার বাবা তার এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু সদকার টাকা পেলেন। তখন তিনি একটি সাদা পৃষ্ঠায় 'সদকা' শব্দটি লিখলেন। সংরক্ষিত স্থানে টাকাগুলো রাখার আগে সেই কাগজটি দিয়ে মুড়িয়ে নিলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, তোমার নিজস্ব সম্পদ ছাড়া বাকী সব ক্ষেত্রেই এমন করবে। কেননা, তুমি হঠাৎ করেই মারা যেতে পারো। তুমি যদি এই সম্পদগুলোর ব্যাপারে জানিয়ে না যাও, তাহলে তোমার ওয়ারিশরা এগুলোকে তোমার সম্পদ ভেবে নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেবে। এদিকে অন্যের সম্পদ খাওয়ার কারণে কবরে বসে তোমার কাছে হিসাব চাওয়া হবে।
এই হলো মৃত্যুর অতর্কিত আক্রমণ এবং কবরের সাক্ষাতের জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুতি এবং সচেতন অপেক্ষা। এজন্যই আমার বাবা সর্বদা এই সাক্ষাত, হিসাব প্রদান এবং চিরস্থায়ী নিবাসের পথে নিশ্চিত যাত্রায় মৃত্যুদূত ফেরেশতার সঙ্গী হওয়ার সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিয়েই থাকতেন।
আমরা কেন মৃত্যুকে অপছন্দ করি
• অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَمَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ لِلْأَبْرَارِ.
আল্লাহর কাছে যা আছে তা সৎকর্মশীলদের জন্য কল্যাণকর।১১১
আর আল্লাহর তাআলার কাছে যা আছে তা মৃত্যু ছাড়া অর্জন করা যাবে না।
• অন্যথায় আমরা যদি দুনিয়া আবাদ করে আখিরাতকেই ধ্বংস করে ফেলি, তাহলে আমাদের অট্টালিকা থেকে ধ্বংসস্তূপে পতিত হওয়ার ভয় করতেই হবে। নেককার সালামা ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহু খলিফা সুলাইমান ইবনু আব্দুল মালিককে যেমনটি বলেছিলেন।
• অথবা আমাদের মধ্য হতে কেউ যদি ইনসাফের গন্ডি থেকে অপরাধীর মতো পালিয়ে বেড়ায়, তবে তাকে প্রতিমুহূর্তে প্রাণনাশের ভয় পেতে হবেই। এভাবেই বিচারক তাকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে তার অপরাধগুলোতে নজর বুলাবেন।
• অথচ মৃত্যুতে আছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ, তাদের সাথে একই বাড়িতে থাকার সৌভাগ্য, সকাল-সন্ধ্যা তাদের সাথে উঠাবসার সু-ব্যবস্থা।
• তাছাড়া মৃত্যু হলো হুরদের সাথে মিলিত হওয়া এবং সুখ-শান্তিতে পূর্ণ চিরস্থায়ী অট্টালিকায় বসবাসের একমাত্র সেতু। এছাড়াও তা হলো দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সমাপ্ত হওয়া ক্ষমাশীল স্নেহপরায়ণ প্রভুর পক্ষ থেকে সৎকর্মশীলগণের প্রতিদান দেওয়ার প্রতিশ্রুত সময়।
টিকাঃ
১১০ হাদিসের মান : সহিহ, ইমাম বুখারি, ইমাম মালিক এবং আহমাদ আবদুল্লাহ ইবনু উমর রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন সহিহুল জামে : ৫৬১৪ নং হাদিস
১১১ সূরা আল-ইমরান: ১৯৮
📄 কবর - দৃষ্টি বাড়ি-ওপরে ও নীচে
কবর
কবর জিয়ারতের মতো উদ্যমতা সৃষ্টিকারী এবং অলসতাকে পরাভূতকারী অন্য কোনো কাজ নেই। এজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও ছিলেন এর প্রতি আগ্রহী এবং তাঁর উম্মতকেও জানিয়েছেন আহ্বান।
বারা ইবনু আযিব রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আমরা রাসূলের সাথে ছিলাম। তিনি একটি দলকে দেখতে পেয়ে বললেন—
তারা কেন একত্র হয়েছে? বলা হলো, তারা একটি কবর খুঁড়ছে। বারা রাজিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং সাহাবায়ে কেরামের মাঝ দিয়ে দ্রুত হেঁটে কবরের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তিনি কী করেন তা দেখার জন্য আমি সামনে গেলাম। দেখলাম, তিনি কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন। এমনকি তাঁর চোখের পানিতে মাটি ভিজে যায়। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘প্রিয় ভাইয়েরা আমার, এই দিনের মতো করে প্রস্তুতি নাও। ১১২
এই প্রস্তুতিই মূলত প্রকৃত উদ্যমতা এবং সাহসিকতা। আবু নাসর বিশর ইবনু হারেস এই প্রস্তুতির যথার্থতা বুঝেছেন। তাঁর কাছে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বলতেন—
যে জানে যে, সে অবশ্যই মারা যাবে তাকে সেই ব্যক্তির মতো হওয়া উচিত, যে তার সফরের পাথেয় জমা করে বাহনে। রেখেছে। সফরে যা কিছুর প্রয়োজন হতে পারে কিছুই নিতে বাদ রাখে।১১৩
তারা মৃত্যুর জন্য পাথেয় প্রস্তুত করেছে এবং নিজেরাও প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই তারা মৃত্যুকে করেননি ভয় এবং মৃত্যু পরবর্তী হিসাবের জটিলতায় হন নি শংকিত। কাকা ইবনু হাকিতার পাথেয় সংগ্রহ এবং এই সফরের প্রস্তুতির কথা এভাবে ব্যক্ত করেন-
আমি ত্রিশ বছর ধরে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে আছি। যদি তা আমার কাছে চলে আসে, তাহলে আমি এক মুহূর্তের বিলম্বও পছন্দ করব না।১১৪
হ্যাঁ। তারা কবরস্থানের দিকে এমনভাবে তাকাতেন, যেন এর মাধ্যমে সাহসিকতার প্রেরণা এবং সংকল্পের প্রখরতা লাভ হতো। কবরের গর্ভে কতই না বেদনা! কত কবরে জিয়ারত করা হয়, অথচ তার বাসিন্দা জাহান্নামি। ভালো করেই জানে যে, তাদের পরীক্ষাকেন্দ্র এখন চলমান। অল্প কিছুদিনের কষ্ট যদি শত বছরের শান্তি বয়ে আনতে পারে, তবে প্রত্যেক বুদ্ধিমানেরই উচিত সেদিকে দৌড়ে যাওয়া এবং অলসতাকে তিন তালাক দিয়ে হাজার মাইল দূরে সরিয়ে রাখা, যেন তা আর কখনো ফিরে আসতে না পারে। তাই চিন্তা করে দেখেন, চিরস্থায়ী নেয়ামত লাভ করতে হলে কতটা কষ্ট সাধনার প্রয়োজন?
প্রিয় ভাই, শিঙ্গায় ফুৎকারের সময় আসা পর্যন্ত আপনি কবরেই আটকে থাকবেন। এরপর আপনি হয়তো হবেন বাহনের আরোহী কিংবা শিকলবন্দী চালিত, ভারাক্রান্ত কিংবা আনন্দিত। এসবই হবে আপনার উদ্যমতা এবং অলসতা অনুপাতে। সুতরাং, আপনি কী চান, তা নিজেই বেছে নেন, স্থায়ী শান্তি বয়ে আনা কষ্ট নাকি স্থায়ী কষ্ট বয়ে আনা শান্তি?
আপনার চোখে কি আবরণ পড়ে আছে? মোহগ্রস্তরা কি এই বাড়ির শেষপ্রান্ত দেখছে না? তাহলে ভালোদের সাথে যুক্ত হওয়ার সেই চেষ্টা সাধনা কোথায়? নাকি তাদের অবস্থা কবির এই কবিতার মতোই—
মানুষ উদাসীন অথচ মৃত্যু তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তারা মৃত্যুকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না, একসময় জীবন ফুরিয়ে আসবে তারা নিজেদের সাথীদের জড়ো করার পিছনে ছুটছে তাদের রেখে আসা কবরের দিকেও তাকাচ্ছে তবুও তারা উদাসীনতার স্বপ্নেই ফিরে আসে যেন তারা কিছুই দেখে নি, কিছুই চোখে পড়ে নি।
দুটি বাড়ি-ওপরে ও নীচে
কীভাবে আপনি দুনিয়ার জন্য এতটা আগ্রহী হয়ে আছেন, যে দুনিয়া পরিশেষে একদিন আপনার প্রতি অনাগ্রহ দেখাবে? অথচ আপনার পরকাল হবে চিরস্থায়ী এবং চিরউন্নত।
কীভাবে আপনি উদাসীনতা করছেন এমন এক ব্যাপারে, যাতে চিরস্থায়ী মুক্তি কিংবা ধ্বংস উভয় পথই আছে? অথচ অস্থায়ী বাড়ীর কারুকার্যে আপনাকে অলস হতে দেখা যায় না।
শোনেন তাহলে, আব্দুল্লাহ ইবনু আইজার আপনাকে সতর্ক করে ডাকছেন। তিনি আপনার বর্তমান ও অত্যাসন্ন বাড়ীর মাঝে চমৎকার তুলনা করে বলেন—
আদম-সন্তানের দুটি বাড়ি। একটি বাড়ি জমিনের উপরে, আরেকটি জমিনের নীচে। সে জমিনের উপরের বাড়ির জন্য কাজ করে যায়। একে কারুকার্যমণ্ডিত করে। সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। এর উত্তর-দক্ষিণে নানা রঙের দরজা বানায়। গ্রীষ্ম ও শীতে যা যা উপকারী সবই করে। এরপর চলে যায় জমিনের নীচে থাকা বাড়িতে; কিন্তু সে তা বরবাদ করে রেখেছে। তখন একজন আগন্তুক এসে তাকে বলে, যে বাড়ি তুমি এতভাবে সাজালে এতে তুমি কতদিন থাকবে?
সে বলে, আমি জানি না।
আগন্তুক বলে, আর যে বাড়ি তুমি বরবাদ করে ফেলেছ সেখানে কতদিন থাকবে?
সে বলে, সেটাই আমার আসল বাড়ি।
আগন্তুক বলে—এ কথা তুমি নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছ! তুমি কী বুদ্ধিমান মানুষ! ১১৫
যদি আপনার জ্ঞানে পূর্ণতা আসে এবং পেয়ে থাকেন সু-পথের দিশা, তবে আপনার সকল দৌড়ঝাপ এবং মূল পরিশ্রম হবে আপনার দ্বিতীয় বাড়ি এবং সর্বশেষ নিবাসের নির্মাণকাজে। ফলে তা হয়ে উঠবে আপনার দুনিয়ায় বানানো সকল প্রাসাদের চেয়ে উঁচু এক মনোরম প্রাসাদ। কেনইবা হবে না? আপনার পরিশ্রমের কল্যাণে জান্নাতের একটি এলাকা এবং এক টুকরো শান্তির নিবাস গড়ে উঠেছে!
টিকাঃ
১১২ হাদিসের মান : হাসান ইমাম আহমাদ এবং ইবনু মাজাহ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আলবানি রহ. হাদিসটিকে হাসান আখ্যা দিয়েছেন আস-সিলসিলাতুলস সহিহাহ, ১৭৫১ নং হাদিস
১১৩ আত-তাবসিরা, ইবনুল জাওজি: ২২৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ
১১৪ কসরুল আমাল: ৭০
১১৫ আহওয়ালুল কুবুর: ১৫৬, ইবনু রজব হাম্বলি দারুল গদীল-জাদীদ, আল-মানসুরাহ, মিসর
📄 মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কথা - দরজায় দাঁড়ানো অতিথি
পরিশ্রমীদের মতো চেষ্টা করেন। ছুঁড়ে ফেলে দিন ঘৃণ্য অলসতার পোশাক। আসল বাড়িতে যাওয়ার আগেই যথাসম্ভব তা প্রস্তুত করে নেন। যেন সেখানে যাওয়ার পর তা মনোরম অবস্থাতেই দেখতে পান। এমনটি করতে পারলে সুসংবাদ গ্রহণ করেন সেই কল্যাণের, যা আপনার চক্ষু কখনো দেখেনি। যেমন বিশর ইবনু হারেস বলেছেন—
আল্লাহর অনুগত ব্যক্তির জন্য কবরের বাড়ী কতই না উত্তম! ১১৬
প্রিয় ভাই, আপনি যদি কোনোদিন মন দিয়ে কোনো বাণী পাঠ করেন, তবে তা যেন হয় এই বাণীটি—
কবরে বসবাসের আগেই তা আবাদ করেন। কারণ, সেই বাড়িতে আপনার বসবাস কল্পনাতীত দীর্ঘ।
আর যারা অবাধ্য হয়েছে (অবাধ্যের জন্য ধ্বংস অনিবার্য) এবং প্রত্যাবর্তনস্থলের কথা ভুলে গিয়ে পরিশেষে নিজেদের উপহার দিয়েছে লাঞ্ছনা। অলসতাই ছিল যাদের জীবনের শুরু এবং শেষ। তাদের মৃত্যু হলে তারা প্রত্যেক মুমিনের সহানুভূতি এবং প্রত্যেক বুদ্ধিমানের অশ্রু প্রাপ্য হবে।
এমন বুদ্ধিমান মুমিনদের একজন ফজল আর-রুকাশি, তিনি একদিন কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন—
হায়! আফসোস তাদের জন্য, যাদের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে নানা বাহানা ছিল। তারা যদি উত্তম প্রতিদান সম্পর্কে জানার পর আমলের পথ খুঁজে পেত; তবে তারা এই কবরে খুব তাড়াতাড়ি আসতে চাইত!
অতঃপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন—
প্রিয় ভাইয়েরা, আজ তোমাদের কামনা আর তোমাদের মাঝে কেবলই শূন্যতা ছেয়ে আছে। তাই শূন্যতাই তোমাদের সঙ্গী হয়ে আছে। (জীবিতরা) শোনো, মৃত্যু ও তোমাদের আমলের . . .
বিচ্ছিন্নতার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নাও। কেননা, তোমরা কেউই জানো না, রাতে বা দিনে কখন তার সাথে দেখা হয়ে যাবে। ১১৭
প্রিয় ভাই, জানাজার দৃশ্যের মাধ্যমে আপনার চক্ষুকে তৃপ্তি দেন। মৃতের সাথে হেঁটে যান তাঁর কবর পর্যন্ত। এতে করে আপনার অন্তরে উচ্চ মনোবলের বীজ রোপণ করতে পারবেন; যা প্রতি মুহূর্তে আপনার তুচ্ছতার কথা মনে করিয়ে দেবে এবং সময়কে মূল্যায়ন করতে শেখাবে। সুতরাং নেক আমল অগ্রবর্তী করতে থাকেন। এতে আপনার দাড়িপাল্লা ভারী হবে এবং শয়তান অপমাণিত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে শিক্ষা নেন। তিনি এক জানাজায় গিয়ে জনৈক গাফেলকে অবিস্মরণীয় এক শিক্ষা দিয়েছিলেন।
সেই ব্যক্তি জানাজায় তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। মৃত্যুর শোকে যখন চারপাশ ছেয়ে আছে, এমতাবস্থায় লোকটি সে তাঁকে এক গুরুত্বহীন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে বসল। তখন তিনি তাকে বললেন—
ওহে নির্বোধ, তাসবীহ পড়ো! কেননা, খাটিয়ায় থাকা লোকটি চাইলেও আর তাসবীহ পড়তে পারবে না। ১১৮
আজকের পর থেকে একটি মুহূর্তকেও ছোট করে দেখবেন না। হতে পারে এই মুহূর্তটিই আপনার নাজাতের উসিলা হয়ে যাবে। তাই সেই মুহূর্তটি কাজে লাগিয়ে স্থায়ী সফলতা লাভ করেন। ইবনুল জাওজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
আপনার প্রতিটি মুহূর্তই হীরকখণ্ড। এর মাধ্যমে আপনি একক সত্তার পাশে স্থায়ী বাড়ি কিনতে পারবেন।
মৃত্যু-পরবর্তী দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কথা
কোনো এক সালাফ কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন—
আমরা যেসবে আগ্রহী, তারা সেসব থেকে উদাসীন হয়ে গেছে। ১১৯
নশ্বর দুনিয়ার তুচ্ছ খড়কুটো থেকে বিমুখতা প্রদর্শন করে মৃতরা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যায়; কিন্তু সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পর তাদের এই বিলম্বিত দুনিয়াবিমুখতা কি কোনো কাজে আসবে? হায়! আল্লাহর কসম, আপনি যদি নিজ চোখে আপনার মৃত প্রতিবেশীদের পরিণতি দেখতে পেতেন, তাহলে আপনার উদাসীনতার কথা চিন্তা করে নিশ্চিত জ্ঞান হারাতেন।
দরজায় দাঁড়ানো অতিথি
তাছাড়া মৃত্যু আমাদের জুতার ফিতার চেয়েও বেশি কাছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে আমাদের হিসাবকে কাছে এনে দিয়েছেন এবং আমল ও তাঁর মাঝে সংযোগ স্থাপন করে বলেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ.
ঈমানদারগণ, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে আগামীকালের জন্য কী পাঠাচ্ছে। ১২০
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতকে সবসময় কাছেই রাখছেন। এমনকি তা আগামীকালের মতো করে রেখেছেন। ১২১
টিকাঃ
১১৬ আল-কুবুর : ১৩০, ইবনু আবিদ দুনিয়া, দারু মাকতাবাতিল গুরাবায়িল আসারিয়্যাহ।
১১৭ আহওয়ালুল কুবুর : ৩৮
১১৮ আহওয়ালুল কুবুর: ৩৮
১১৯ আল-কুবুর : ১৪৫
১২০ হাশর : ১৮
১২১ জামিউল বায়ান ফী তাওয়ীলিল কুরআন : ২২/১৯৯, আবু জা'ফর আত-তবারী