📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ > 📄 বইকে সঙ্গী করি - অদৃশ্য বিভাজনকারী কিছু জীবনীপাঠ

📄 বইকে সঙ্গী করি - অদৃশ্য বিভাজনকারী কিছু জীবনীপাঠ


এসবই আপনাকে মানুষ নির্বাচন এবং বাছাইয়ে নির্দেশনা দিচ্ছে। মুহাদ্দিসগণ যেমন বলেন—অধিক মাধ্যমের ব্যবহার বর্ণনাকে দুর্বল করে দেয়। কেননা, রাবি (বর্ণনাকারী) এবং মারওয়ি আনহু (মূল প্রবক্তা) এর মধ্যে মাধ্যম যত কম হবে, বর্ণনায় ভুল ও মিথ্যার অবকাশ তত কম হবে এবং তা শুদ্ধতার তত কাছাকাছি হবে। আমাদের আমল যত বেশি রাসূলের সাথে মিলবে, আমরা শুদ্ধতা ও হিদায়াতের তত বেশি কাছে চলে যাব। তাই আপনি যদি অনুসরণ করতে চান, তাহলে মূলেরই অনুসরণ করেন। কেননা, মূলের অনুসরণে লিখিত কপিগুলোতে মাঝে মাঝে বিকৃতি ও পরিবর্তন ঘটে।
বইকে সঙ্গী করি
যে ব্যক্তি সৎ সঙ্গ হতে বঞ্চিত হয় কিংবা উচ্চ মনোবলসম্পন্ন কারও সাহচর্য লাভ করতে পারে না, অথবা নিজেকে ব্যর্থদের মাঝে আবিষ্কার করে; তবে নিঃসন্দেহে সে এমন এক মহাবিপদের সম্মুখীন, যা অলসতাকে তার অন্তরে টেনে এনে বসিয়ে দেবে। এই আপদ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই তাকে পরিশ্রমীদের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে গবেষণা করতে হবে। যেমনটি করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ্। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—আপনি খোরাসানে কাদের সাথে উঠা-বসা করেছেন?
তিনি বললেন—শুবা এবং সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহর সাথে।
ইমাম আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন—
এই কথার দ্বারা (তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে) আমি তাদের গ্রন্থাবলিতে নজর বুলিয়েছি।৯১
তাকে একদিন জিজ্ঞাসা করা হলো—
আপনি তো আমাদের সাথে সালাত আদায় করেন। তাহলে আমাদের সঙ্গে বসেন না কেন?
তিনি বললেন—
আমি সাহাবা ও তাবেয়িগণের সাথে চলে যাই।
প্রশ্ন করা হলো—
সাহাবা এবং তাবেয়িগণ এলেন কোত্থেকে?
তিনি বললেন—
আমি নিজের জ্ঞানের জগতে মনোনিবেশ করি। সেখানে দেখতে পাই তাদের চিহ্ন এবং আমলের অস্তিত্ব।
আব্দুল্লাহ ইবনু হাসান আল-উলওয়ি বই পড়ার নাম দিয়েছেন ‘মৃতের সাথে কথোপকথন।’ যখন খলিফা মামুন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—আবু আলি, জীবনে তোমার কী শখ বাকি থেকে গেছে? তিনি বললেন—
আমার ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে খেলা এবং মৃতদের সাথে কথোপকথন করা। ৯২
আলস্য বিতাড়নকারী কিছু জীবনীপাঠ
* ইমাম জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহর জীবনীপাঠে আপনি জানতে পারবেন, ইমাম জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন—
আপন অভ্যাসের দাস হয়ে আমি ঘুমাই না, পানাহারও করি না। রাত অথবা দিনে, ঘুম যখন আমায় কাবু করে ফেলে তখনই আমি ঘুমাতে যাই।৯৩
তবুও কি আপনার সিংহভাগ সময় ঘুমেই কাটিয়ে দেবেন?
কথাটি পুনরায় লক্ষ্য করেন, তিনি বলেন—
আপন অভ্যাসের দাস হয়ে আমি ঘুমাই না, পানাহারও করি না। রাতে অথবা দিনে, ঘুম যখন আমায় কাবু করে ফেলে, তখনই আমি ঘুমুতে যাই। যখন আহারের প্রয়োজন হয়, তখনই আহার সেরে নিই।
তার শখ, মনোকামনা ও আনন্দ ছিল শুধু বই পাঠে এবং যে-কোনো ধরনের উপকার সন্ধানে।
* আপনি উবাইদ ইবনু ইয়ায়িশ রাহিমাহুল্লাহর জীবনীতে জানতে পারবেন, তিনি বলেছেন—
আমি লাগাতার ত্রিশ বছর নিজ হাতে রাতের খাবার খাই নি। আমার বোন আমাকে খাইয়ে দিত আর আমি শুধু লিখতাম।৯৪
তবুও কি আপনি অনর্থক সময় অপচয় করে যাবেন? বৃথা কাজে সময় নষ্ট করবেন?
* সালাফদের জীবনীপাঠে আপনি জানতে পারবেন, মুহাম্মাদ ইবনু আলি আস-সুলামি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—
আমি ইবনুল আখরাম রাহিমাহুল্লাহর কাছে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনানোর জন্য সুবহে সাদিকের সময় উঠে চলে যাই। গিয়ে দেখি, আমার আগেই আরও ত্রিশজন কারী চলে এসেছেন। আসর পর্যন্ত আমার পড়ে শোনানোর সুযোগ হয় নি। ৯৫
এরপরও কি আপনার অন্তরে অলসতা বা বিরক্তির অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে? বিস্ময় জাগানিয়া এই তিনটি ঘটনা পড়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার পর এবং ইলম অন্বেষী এ সকল মনীষীদের উচ্চ মনোবলের ব্যাপারে জানার পরও কি আপনি অলসতায় মত্ত হয়ে থাকবেন?
* পূর্ববর্তী সাধকদের জীবনীপাঠে আপনি জানতে পারবেন, নাহু (আরবি ব্যাকরণ)-শাস্ত্রের অমর নক্ষত্র আহমদ ইবনু ইয়াহইয়া আল-বাগদাদি রাহিমাহুল্লাহর ইন্তেকালের কারণ কী ছিল? ঘটনাটি এমন—
জুমআর দিন আসরের সালাতের পর তিনি মসজিদ থেকে বের হন। তার কানে কিছুটা সমস্যা ছিল। অনেক ডাকাডাকির পর শুনতে পারতেন। তার হাতে ছিল একটি বই। রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন আর বইটি পড়ছিলেন। হঠাৎ এক ঘোড়া এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে বাড়িতে আনা হয়। মাথার যন্ত্রণায় তিনি বারবার আর্তনাদ করছিলেন।
এ আঘাতের ফলেই রবিবার দিন তার ইন্তেকাল হয়। আল্লাহ তার প্রতি রহম করেন!
তবুও কীভাবে আপনার লক্ষ্যগুলোর সম্মিলন হয় না? তবুও কেন আপনি এক কাজের সাথে আরেকটি সমর্থক কাজের সমন্বয় ঘটাতে পারেন না?
* তাদের জীবনীপাঠে আপনি জানতে পারবেন শায়খ কিনানির সেই অমূল্য নসিহত। যে নসিহত তিনি শুনেছিলেন তার পিতার কাছ থেকে। আমাদের কাছে সেই নসিহত বর্ণনা করেছেন ইমাম সুয়ুতি রাহিমাহুল্লাহ্। তিনি বলেন, আমাদের শায়খ কিনানি তার বক্তা পিতা থেকে বর্ণনা করেন—
ইলমের দুই বন্ধু দ্রুত তিনে পরিণত হয়—খাওয়া, হাঁটা এবং লেখা।
তবুও পানাহার কীভাবে আপনাকে মত্ত করে রাখে? কীভাবে পারেন আপনার সময় অনর্থক কাজে নষ্ট করে দিতে?
* তাদের জীবনীপাঠে আপনি জানতে পারবেন, আবুল কাসিম আত-তবারানি রাহিমাহুল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও অধিক হাদিস বর্ণনার রহস্য। তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—
আমি লাগাতার ত্রিশ বছর শক্ত চাটাইয়ের ওপর ঘুমিয়েছি।
তবে কি কষ্ট আপনাকে দমিয়ে দিতে পারে? কাঠিন্য কি পারে আপনার মনোবলে ফাটল ধরিয়ে দিতে? আপনি কি হতে পারেন অলসতার কাছে আত্মসমর্পণ এবং বিশ্রাম ও নিদ্রাযাপনে আগ্রহী।

টিকাঃ
৯১ হিলইয়াতুল আউলিয়া, খণ্ড: ৮, আয়াত: ১৬৪
৯২ তাকয়িদুল ইলম, খতিব বাগদাদি, দারু ইহইয়ায়ি সুন্নাতিন নববিয়্যাহ, বৈরুত
৯৩ কিমাতুজ জামানি ইনদাল উলামা : ৫২, আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, মাকতাবাতুল মাতবুয়াতিল ইসলামিয়া, আলেপ্পো।
৯৪ আল-জামে লি আখলাকির রাওয়ী: ২/১৭৮, খতীব বাগদাদী, দারুল মাআরিফ।
৯৫ সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৫/৫৬৫, শামসুদ্দীন আজ-জাহাবি, মুওয়াসসাসাতুর রিসালা
** আল-মুশাওয়িক ইলাল কিরাআতি ওয়া তলাবিল ইলম : ৬১, আলি ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হুসাইন আল-ইমরান, দারু আলামিল ফাওয়াইদ লিননাশরি ওয়াত তাওজি
** কিমাতুজ জামানি ইনদাল উলামা :১১০।
** সিয়ারু আলামিন নুবালা :১৬/১২২, তাজকিরাতুল হুফফাজ: ৩/৯১৫।

📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ > 📄 শেষ কথা

📄 শেষ কথা


শেষ কথা
ঠিকভাবে অনুসরণ করে অন্ধ অনুসরণের গোঁড়ামিপনা থেকে সচেতন হন। সতর্ক হন সেই আত্মতৃপ্তি থেকে, যার পর কোনো পরিকল্পনা অথবা অন্য কোনো প্রতিযোগিতার সংকল্প থাকে না।
আব্দুল কাদের জিলানি রাহিমাহুল্লাহু বলেন—
হে বৎস, তুমি সৎলোকদের জীবনচরিত আলোচনা করে এবং তাদের মতো হওয়ার আশা করেই আত্মতৃপ্তিতে ভুগছ? তুমি তবে এমন ব্যক্তি, যে তার দুই হাত খোলা রেখে পানি তুলে আনে। ফলে সে কোনো পানিই খুঁজে পায় না। শ্রমবহীন আকাঙ্খা নির্বুদ্ধিতার ঘাঁটি।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00