📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ 📄 লক্ষ্যে ছেড়ে দিয়ে মনোযোগ হওয়া - নিয়ত নবায়নের অনুশীলন

📄 লক্ষ্যে ছেড়ে দিয়ে মনোযোগ হওয়া - নিয়ত নবায়নের অনুশীলন


◆ লক্ষ্যে ছেড়ে মাধ্যম নিয়ে মনোযোগী হওয়া
উদাহরণস্বরূপ, এই বইটি পাঠের পেছনে আপনার কী লক্ষ্য? শুধু কি পড়তে হবে বলেই পড়া?
কোনো কোনো পাঠক বলবেন—আমার লক্ষ্য অজানাকে জানা এবং জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটানো।
দ্বিতীয়জন বলবেন—আমার লক্ষ্য ঈমান বৃদ্ধি করা এবং আত্মিক শক্তি ও উপলব্ধিকে আরও শক্তিশালি করা。
তৃতীয়জন বলবেন—এতে যা আছে সে অনুযায়ী আমল করার জন্য।
চতুর্থজন বলবেন—অন্যকে শেখানোর জন্য। ৬১
অধিকাংশ সময় মানুষ মাধ্যম নিয়েই ডুবে থাকে। লক্ষ্য ও গন্তব্য থাকে অজানা। ফলে তারা যা ইচ্ছা করে তা বুঝতে পারে না। যা বহন করে তা নিয়ে গন্তব্য পর্যন্ত যেতে পারে না। পরিশেষে ফলাফলের ঝুলিতে আসে দুর্বলতা ও অলসতা।

নিয়ত নবায়নের অনুশীলন
প্রতিটি কাজে দৈনন্দিন নিয়ত ঠিক করে নেওয়া এক কার্যকরী অনুশীলন। এতে লক্ষ্য সামনে থাকে এবং সকল কাজের ভিড়েও গন্তব্যের কথা মাথায় থাকে। শুধু লক্ষ্য সামনে রাখা এবং মনে মনে অনুভব করা কাজের প্রতিদান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মর্যাদা ও প্রতিদানলাভে পরিশ্রমী ও অকর্মণ্যের মাঝে বিশাল ব্যবধান গড়ে দেয়। তাই নিয়তের তারতম্যে বান্দার প্রতিদানের সংখ্যা বেড়ে যায়।
• সালাতের লক্ষ্য হলো: অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা।
• সাদকার লক্ষ্য হলো : অন্তরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করা।
• রোজার লক্ষ্য হলো: তাকওয়া অর্জন করা।
এই ইবাদতগুলো যদি তার লক্ষ্য পর্যন্তই না পৌঁছে, তবে এর মূল অর্থই হারিয়ে যাবে। সওয়াব শূন্যে উড়ে যাবে। আর সেই আমলকারী হবে এমন দুষ্ট ব্যক্তির ন্যায়, যে দিনের শুরুভাগে মুত্তাকি বন্ধুদের সাথে থেকে তাদের মতো করেই কাজ চালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দৃষ্টিকে ধোঁকায় ফেলে এবং তাদের অন্তর জয় করে নেয়। এরপর দিনের শেষভাগে গিয়ে সেই মুখোশ খুলে ফেলে। মত্ত হয় কুপ্রবৃত্তির দাসত্বে। সুতরাং, লক্ষ্যহীন ইবাদত হচ্ছে সেই ব্যক্তির মতো, যে জামা গায়ে দিয়ে আবার খুলে ফেলে। সেতু পার হয়ে আবার চলে আসে। প্রকৃত মুমিন কখনো এমন শূন্য মজলিসে বসতে পছন্দ করতে পারে না, যার কোনো লক্ষ্য নেই কিংবা কোনো উপকার নেই।

টিকাঃ
৬১. তৃতীয় ও চতুর্থ লক্ষ্য অর্থাৎ আমল করা ও শিক্ষা দেওয়া আপনার ইলমের যাকাতসদৃশ নফল নয়, বরং ফরজ যাকাত যেমন: মুহাম্মদ ইবনু সালিম আস-সাফারিনী আল-হাম্বলী বলেন, 'জেনে রাখুন, ইলমের জাকাত প্রদানের পদ্ধতি দুটি ১-আলেম অন্যকে শিখানো এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার ইলম বাড়িয়ে দেন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করেন ২-ইলম অনুযায়ী আমল করা কেননা ইলম অনুযায়ী আমল করলে ইলম বাড়ে আমল তার জন্য ইলম তথা জ্ঞানের দরজাগুলো উন্মোচন করে দেয় এবং ধোঁয়াশা দূর করে দেয়

📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ 📄 লক্ষ্যপানে ছুটে চলার দুর্বলতা - অনুকারী লক্ষ্য

📄 লক্ষ্যপানে ছুটে চলার দুর্বলতা - অনুকারী লক্ষ্য


• লক্ষ্যপানে ছুটে চলার দুর্বলতা
জাহাজ চালানোর সময় একজন নাবিক ভালোভাবেই বুঝতে পারে, শুধু লক্ষ্য স্থির করাই তার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তার জন্য আবশ্যক হচ্ছে-জাহাজকে লক্ষ্যের পথে চালিত করা। লক্ষ্যপানে ছুটে চলা ব্যক্তিও এমনই। গন্তব্যপানে মন্থর পথচলা সময়ের পরিক্রমায় গন্তব্যই ভুলিয়ে দেয়। পরে যখন সে কথা মনে পড়ে তখন হাতছাড়া হওয়াতে খানিকটা আক্ষেপ করে। এরপর ঘুমিয়ে পড়ে। আর এই ঘুমেই কেটে যায় সারাটা জীবন।

অনুপকারী লক্ষ্য
> এক. এমন কিছু মানুষ দেখবে—কাজে ও পেশায় খুব কর্মঠ। মনিব যা যা বলে, সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে একের পর এক পালন করে যাচ্ছে; কিন্তু এই উদ্যমতা সত্ত্বেও ব্যস্ততার চাপে তার কয়েক মিনিট সময় হয় না ফরজ সালাতটা আদায় করার!!
> দুই. অন্যজন ইবাদতে খুব শ্রম ব্যয় করেন। দ্বীনি বিধানাবলী পালন করেন। নফল সালাতেও বেশ গুরুত্বারোপ করেন। তবে তিনি কাজের বেলায় ঢিলেমি করেন। পেশার ক্ষেত্রে করেন টালবাহানা। সবসময় এই অবহেলার কারণে তাকে হতে হয় তিরস্কারের শিকার।
> তিন. তৃতীয়জন লোকদের উৎসাহ প্রদান, দাওয়াত দেওয়া এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশ পরিচালনায় ব্যস্ত। অথচ তিনি নিজের সন্তানদের শিষ্টাচার ও লালনপালনে উদাসীন!
> চার. চতুর্থ ব্যক্তি জ্ঞানের জগতে অনেক এগিয়ে, জ্ঞানার্জন উপকার লাভে খুব আগ্রহী; কিন্তু তার সামাজিক সম্পর্কগুলো এসে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতিবেশীকে দেখতে যাওয়া এবং আত্মীয়তা রক্ষার গুরুত্ব ক্রমেই তার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
লক্ষ্য অর্জনে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। আপনার ওপর আরোপিত কর্তব্যের বিবেচনায়ই আপনার উদ্যমতা ও সাহসিকতা যাচাই হবে। অন্যথায় এক ময়দানে আপনার সাফল্য অন্যান্য ময়দানে হোঁচট খাওয়ার ভূমিকা হয়ে যাবে। কখনো কখনো ময়দান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে থাকে।

📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ 📄 লক্ষ্য পরিষ্কার না থাকা - লক্ষ্যের স্থবিরতা

📄 লক্ষ্য পরিষ্কার না থাকা - লক্ষ্যের স্থবিরতা


◆ লক্ষ্য পরিষ্কার না থাকা
প্রতিটি লক্ষ্যে সময় নির্ধারণ কঠিন ব্যাপার এবং এক্ষেত্রে অগ্রগতির অনুমান করা লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছাকে অসম্ভব করে তোলে। লক্ষ্যের ছক আঁকা এবং তা সুনির্দিষ্টকরণে আমরা লক্ষ্য অর্জনের পথে বিরাট একটি সময় নষ্ট করে ফেলি।
এন্থনি রবিন্স লক্ষ্য স্থিরকারী এবং লক্ষ্যহীন ব্যক্তির উপমা দিয়েছেন এমন শিশুর সাথে, যে পাজল মেলানোর খেলা খেলে। প্রথমে বড়ো ছবিটি দেখে, এরপর এক এক করে পাজল মেলাতে থাকে। সুতরাং, যার জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই, সে হলো সেই শিশুর মতো, যে মূল ছবিটি না দেখেই পাজল মেলানো শুরু করে। তখন তার কাছে কাজটি কঠিন মনে হয়। যদিও তা অসাধ্য কিছু নয়।

◆ লক্ষ্যের স্থবিরতা
লক্ষ্য যদি চলমান না হয়ে মন্থর হয়ে যায় তবে তা খুব জটিল হয়ে দাঁড়াবে এবং ভারী বোঝায় পরিণত হবে। প্রেরণা জোগানোর বদলে তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। ফলে উপহার দেয় ব্যর্থতা। তুমি লক্ষ্যপানে চলার পথে যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয়তো পুরোপুরি ধরে রাখবে, নয়তো একেবারে ছেড়ে দেবে। যদি লক্ষ্য চলমান থাকে; তাহলে এর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দিক—দুটোই আছে। যেন তা আমাদের এভাবে নির্দেশনা দিয়ে দেয়—
তুমি প্রতিদিন একপারা বা আধপারা কুরআন পড়বে। সপ্তাহে এক বা দু রাত কিয়ামুল লাইল করবে। প্রতি এক বা দু মাসে একটি করে বই পড়বে। এই পদ্ধতি তোমার লক্ষ্যের সকল জটিলতা ভারসাম্যপূর্ণভাবে সহজ করে তুলবে; যা হীনম্মন্যতার পরিবর্তে দৃঢ়মনোবলের অধিকারী করে তুলবে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদিসের আড়ালে কী আছে খেয়াল করেন—
যে সালাতে দাঁড়িয়ে দশ আয়াত তিলাওয়াত, তার নাম উদাসীনদের তালিকা থেকে মুছে যায়। যে একশ আয়াত তিলাওয়াত তার নাম অনুগতদের তালিকায় লেখা হয়। যে হাজার আয়াত পড়ে তাকে ভান্ডারের অধিপতিদের মাঝে গণ্য করা হয়। ৬২
নববী তরবিয়তের চমৎকারিত্বের প্রতি লক্ষ্য করেন। নফল বিধানে সমন্বয়সাধনের ধারাবাহিকতায় মনোযোগী হন। সর্বশ্রেষ্ঠ অভিভাবকের কাছ থেকে নেন চমৎকার প্রেরণা ও আকর্ষক দাওয়াতের শিক্ষা। সবাই তো আর সর্বোচ্চ লক্ষ্য তথা রাতের বেলা হাজার আয়াত পড়তে পারবে না। তবে এরচেয়ে ছোট লক্ষ্য তথা একশ আয়াত তো পড়া যেতেই পারে। আর এর নীচের দশ আয়াত পাঠে লক্ষ্য তো আরও সহজ। সবার সক্ষমতার বিচারে এই পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে; বরং মানুষের হিম্মতের তারতম্য এর মাঝে পার্থক্যরেখা গড়ে দেবে।
হাদিসে সর্বনিম্ন লক্ষ্যের ব্যাপারেও উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এব্যাপারে কিছুটা জোর দেওয়া হয়েছে। যেন কেউ অলসতায় অভ্যস্ত হয়ে না পড়ে। 'কিয়ামুল লাইল' (তাহাজ্জুদ বা) রাতের (অন্যান্য) ইবাদাতে যদি কারও অবহেলা পেয়ে বসে, তবে আমরা তাকে বলব, সর্বনিম্ন যতটুকু সম্ভব হয় পাঠ করেন। খামখেয়ালি করে দূরে সরে থাকবেন না। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন。

টিকাঃ
৬২. হাদিসের মান : সহিহ, ইবনু আমরের সূত্রে আবু দাউদ ও ইবনু হিব্বানে বর্ণিত; সহিহুল জামে : ৬৪৩৯

📘 অলসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ 📄 ছোট্ট লক্ষ্য - লক্ষ্যহীনতা

📄 ছোট্ট লক্ষ্য - লক্ষ্যহীনতা


♦️ ছোট লক্ষ্য
সবসময় বড়ো লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আপনি আপনার নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন না। তাছাড়া, আমাদের জীবনে সর্বোচ্চ ছাদ অনুসন্ধানে সাফল্য বলতে কেবল আমাদের মস্তিস্কে আমাদের নির্মিত এই নকল ছাদই পাওয়া যায়! আমরা যার নির্দেশনা পেয়েছি আমাদের নবীজির নসিহত থেকে—
আল্লাহর কাছে চাইলে ফিরদাউস-ই চেয়ো। ৬৩
কাফুর আল-ইখশিদি এবং তার বন্ধু দুজনই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। তাদের দুজনকে তৎকালীন মিশরের রাজা আহমদ বিন তুলুনের বিক্রয় দলে নেওয়া হয় বাজারে বিক্রি করার জন্য। কাফুরের বন্ধুর আকাঙ্খা ছিল, তাকে একজন বাবুর্চি ক্রয় করুক। যেন সারা দিন মনের মতো করে খেয়ে দেয়ে পেট ভরা রাখতে পারে। তবে কাফুরের মনের আশা এই শহরের মালিক হবে। অতঃপর দুজনই যার যার পরিকল্পনা ও আশানুরূপ অবস্থানে পৌঁছে যায়। কাফুরের বন্ধু বিক্রীত হয় বাবুর্চির কাছে আর কাফুরকে কিনে নেয় মিশরের এক নেতা। অতঃপর সে নিজের সক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রদর্শন করে যায় অবিরাম। পরিশ্রম ও সাধনা করতে করতে সে একসময় মিশর ও শামের রাজা বনে যায়।
কাফুর একবার তার সেই বন্ধুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাকে সেই বাবুর্চির কাছে খুব করুণ অবস্থায় দেখতে পায়। এই অবস্থা দেখে সে তার সফরসঙ্গীকে বলে, ভীরুতার কারণেই আজ তার এই শোচনীয় পরিণতি। আর আমার মনোবল আমাকে নিয়ে উড়েছে। তাই আজ আমি এ অবস্থায় উন্নীত হতে পেরেছি। আমার আর তার ভেতরে যদি একই হিম্মত থাকত তবে দুজনের অবস্থা একই থাকত।

• লক্ষ্যহীনতা
এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত দশ বছরে স্নাতক সম্পন্ন করা ছাত্রদের মধ্যে গবেষণা চালনো হয়। গবেষণার ফলাফল ছিল এমন—
> ৮৩% ছাত্রের কোনো লক্ষ্য নেই। তারা বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করে। ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
> ১৪% ছাত্রের লক্ষ্য তো আছে, তবে তা তারা লিখে রাখে না। তারা লক্ষ্যহীনদের চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্জন করতে পারে।
> ৩% ছাত্রের কাছে লিখিত লক্ষ্য ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার ছক আঁকা আছে। তারা লক্ষ্যহীনদের চেয়ে দশ গুণ বেশি অর্জন করতে পারে।

টিকাঃ
৬৩. হাদিসের মান: সহিহ, ইরবাজ রা. এর সূত্রে তবরানীতে বর্ণিত; সহিহুল জামে: ৫৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px