📄 ক্ষতির শঙ্কা - এ-যুগের হুজাইফা
২য় প্রকার : অন্তরের অলসতা। যা খরচ করায় গড়িমশি করা, কল্যাণের কাজে অগ্রসর না হওয়া ও দ্বিধায় ভূগা এবং প্রতিরক্ষীদের তালিকায় সর্বশেষ সারিতে আসন গ্রহণে উৎসাহ যোগায়। তাদের গলার ফাঁস সংকীর্ণ হয়ে এলে তারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আনুগত্য করে। এতেও তারা কোনো মতলব নিহিত রাখে। এজন্যই মুনাফিকরা লৌকিকতাকারী।
ক্ষতির শঙ্কা
শয়তানের সাথে আমাদের সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের এই বার্তা দেয় যে, (দোষ ত্রুটি জন্মদানকারী) শয়তানের বিভ্রান্তিকর ধোঁকায় পড়ে আমাদের প্রবৃত্তি এক বা দুটি অপরাধেই ক্ষান্ত হয় না। যদি না আপনি আপনার সমস্যার সমাধা করেন এবং অবাধ্যতার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ক্ষতে পট্টির ব্যবস্থা করেন। কেননা, ক্ষত দিন দিন বাড়তেই থাকবে। এই ক্ষত বড় হয়ে গেলে আশংকা করি, আপনি আপনার ঈমানকে উদাসীনতার অতল গহীনে আবিস্কার করবেন। পাপের আঘাতে জর্জরিত হতে হতে আপনার অন্তর হয়ে যাবে মৃত। যদি না আপনি শীঘ্রই জেগে ওঠে শত্রুর নিরবচ্ছিন্ন ভ্রান্তি প্রচার ও ধারাবাহিক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
এ-যুগের হুজাইফা
হায়, এখনো যদি সবার জন্য জিহাদের দরজা খোলা থাকত, তবে জিহাদে যাওয়া-না-যাওয়ার বিবেচনায় আমরা আমাদের অন্তরে নিফাকির গোপন অনুপ্রবেশ পরখ করে দেখতে পারতাম!
হায়, যদি আকাশ থেকে ওহি আসার ধারা বন্ধ না হতো! তবে ওহি এসে মুনাফিকদের নামগুলো বলে তাদের লাঞ্চনায় ফেলত! ওলট-পালট করে দিত মিথ্যা দাবিদারদের কাতার!
হায়, প্রিয় নবীজির গোপন বার্তার রক্ষক হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান যদি আমাদের মাঝে থাকতেন! তাহলে তিনি মুমিন ও মুনাফিকদের নামগুলো আমাদের সামনে উন্মোচন করে দিতেন!৩৪ তাদের ওপর বদদুআ করে হোক কিংবা না করে।
কিন্তু আজ আমাদের ঈমান ও নিফাকি, সততা ও দোষ-ত্রুটি নির্দেশক প্রমাণ হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত আমল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। হয়তো এব্যাপারে সবচে গুরুত্বপূর্ণ আমল সেটাই, যে ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশনা দিয়েছেন-
আমরা কাউকে এশা ও ফজরের সালাতে না পেলে তার (ঈমানের) ব্যাপারে মন্দ ধারণা করতাম। ৩৫
মন্দ ধারণার অর্থ হলো, তারা মনে করতেন যে, সে মুনাফিকদের সাদৃশ্য অবলম্বন করছে, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সুতরাং আজ এ বিষয়ের বাস্তবতা খুঁজতে আমাদের করণীয় হবে (এই যুগের হুজাইফা) তথা এমন কিছু আমল-যা গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করতে পারে। কেননা, মুনাফিকদের তালিকা জানা একমাত্র মানুষটিকে মৃত্যু অদৃশ্য করে দিয়ে এই রহস্য চিরতরে গোপন করে রেখেছে।
টিকাঃ
৩৪ হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গোপন বিষয়ের সংরক্ষক ছিলেন তিনি তাকে মুনাফিকদের নামগুলো বলেছিলেন উমর রা. প্রত্যেক জানাজায় তার অপেক্ষায় থাকতেন তিনি নামাজে আসলে উমর রা. সেই ব্যাক্তির নামাজ পড়তেন; এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে যে, সে মুসলমান হুজাইফা রা. কোনো জানাজায় না আসলে উমর রা. সেই জানাজা পড়তেন না; কেননা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন উমর রা. হুজাইফা রা. কে জিজ্ঞেস করেছেন, হে হুজাইফা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আমার নামও বলেছেন? তিনি বললেন, না তবে আপনার পর অন্য কাউকে (এভাবে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়ে) আমি পরিশুদ্ধ করে দিব না
৩৫ সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব: ৪১৭
📄 উদার প্রস্তাবনা - দুটি পথ, যা ভিন্ন তৃতীয় কোনো পথ নেই
উদার প্রস্তাবনা
দুটি পথ, যা ভিন্ন তৃতীয় কোনো পথ নেই
একটি পথ মুনাফিকদের, যা তাদেরকে জাহান্নামের অতল গহীনে নিয়ে ফেলবে। আরেকটি মুমিনদের পথ, যা তাদের নিয়ে যাবে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে এবং সৎকর্মশীলদের কাতারে। সুতরাং যে পথ বেছে নিতে চান বেছে নেন। এই প্রস্তাবের উপস্থাপনা আমি করছি না; বরং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-
কাঁটাগাছ থেকে যেমন আঙুর আহরণ করা যায় না, ঠিক তেমনি সৎকর্মশীলদেরকে পাপাচারীর কাতারে নামিয়ে আনা হবে না। সুতরাং তোমরা যে পথ ইচ্ছা বেছে নাও! তোমরা যে পথে চলবে, সে পথের লোকদের সাথেই অবতরণ করবে। ৩৬
একটি স্পষ্ট কথা, যা পৃথককরণ অসম্মানজনক
যে মুমিনদের পথে চলবে সে মুমিনদের মতোই প্রতিদান লাভ করবে; জান্নাতের আবাসগৃহে মিলিত হবে তাদের সাথে। আর যে অলসতা ও পিছলে পড়ার মাধ্যমে নিফাকির পথ বেছে নেবে, তার ভেতরে নিফাকির ব্যাধি সংক্রমিত হবে। যার ফলশ্রুতিতে সেও জাহান্নামের অতল গহীনে পিছলে পড়বে। আর যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে-ও তাদের একজন হয়ে যায়।
টিকাঃ
৩৬ হাদিসের মান: হাসান, আবু নু'আইম, হিলয়াহ, আস-সিলসিলাতুস সহিহাহ: ২০৪৬
📄 একটি স্পষ্ট কথা - ঘাতক ভীতি
একটি স্পষ্ট কথা, যা পৃথককরণ অসম্মানজনক
যে মুমিনদের পথে চলবে সে মুমিনদের মতোই প্রতিদান লাভ করবে; জান্নাতের আবাসগৃহে মিলিত হবে তাদের সাথে। আর যে অলসতা ও পিছলে পড়ার মাধ্যমে নিফাকির পথ বেছে নেবে, তার ভেতরে নিফাকির ব্যাধি সংক্রমিত হবে। যার ফলশ্রুতিতে সেও জাহান্নামের অতল গহীনে পিছলে পড়বে। আর যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে-ও তাদের একজন হয়ে যায়।
ঘাতক ভীতি
সালাফের নিফাকভীতি
উমর ইবনু আবদুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহুর একজন ভাই ছিলেন। যিনি খুব নেককার ছিলেন। তিনি খিলাফতের আসনে বসে ভাইকে ডেকে বললেন—
> সালেম, আমি আশংকা করছি যে, আমি রক্ষা পাব না।
তাঁর ভাই বললেন—
> আপনি আশংকা করে থাকলে তো ভালো কথা। তবে আপনার ব্যাপারে আমার ভয় ছিল—আপনি এই আশংকাটিই করবেন না। ৩৭
📄 সালাফের নিফাকভীতি - ঈমান ও নিফাকের পার্থক্য
উমর ইবনু আবদুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহুর একজন ভাই ছিলেন। যিনি খুব নেককার ছিলেন। তিনি খিলাফতের আসনে বসে ভাইকে ডেকে বললেন—
> সালেম, আমি আশংকা করছি যে, আমি রক্ষা পাব না।
তাঁর ভাই বললেন—
> আপনি আশংকা করে থাকলে তো ভালো কথা। তবে আপনার ব্যাপারে আমার ভয় ছিল—আপনি এই আশংকাটিই করবেন না। ৩৭
এটি এমন এক আশংকা—যা সকল অলসতার লক্ষণ ও উদাসীনতার প্রস্তুতিকে নস্যাৎ করে দেয়। তৈরি করে দেয় একজন মানুষের মধ্যে সৎকর্ম করার এবং যে-কোনো পদস্খলনের ব্যাপারে দ্রুত উপলব্ধি সৃষ্টি হওয়ার যোগ্যতা।
উমর ইবনুল খাত্তাব রাজিয়াল্লাহু আনহু নিজের ওপর নিফাকির আশংকা করতেন। অথচ তিনি নিজ কানেই নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখ থেকে সুসংবাদ শুনেছেন— উমর জান্নাতি।৩৮
কেননা, এটিই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তার ভেতর থাকবে এমন ভয়-যা তাকে আমলে উৎসাহ জোগায়। ভেতরে শঙ্কা জাগায়; এমন শঙ্কা-যা অলসতা দূর করে তাকে চাঙ্গা থাকতে সহযোগিতা করে।
ঈমান ও নিফাকের পার্থক্য
সুতরাং যে ব্যক্তি নিফাকের শঙ্কায় থাকে সে নিফাক লালনকারীদের থেকে পালিয়ে বেড়ায় এবং কথার আগেই কাজের মাধ্যমে তাদের থেকে মুক্ত হয়ে যায়। শাকিক আল-বালখি ঈমান ও নিফাকির মাঝে এভাবে পার্থক্যরেখা স্পষ্ট করেছেন-
মুমিনের উপমা হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে একটি খেজুর গাছ রোপন করে কাঁটা গাছ বহন করার শংকায় থাকে। আর মুনাফিকের উপমা হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে কাঁটা গাছ রোপন করে খেজুর কেটে আনার আশায় থাকে। ৩৯
আপনার জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, যারা সালাতের ব্যাপারে শিথিলতা করে এবং সালাতে মনোযোগী হয় না তাদের ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে আমাদের নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারা কিয়ামতের দিন কারুন, ফিরাউন, হামান ও উবাই ইবনু খালফের সাথে একত্র হবে। সুতরাং, ফরজ আদায়ে বিলম্ব করা এবং মনোযোগী না হওয়া বান্দাকে কাফেরদের শীর্ষ নেতাদের দলে ভিড়িয়ে দেবে। তাদের সাথে তাকেও একই শিকলে বেঁধে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে বুদ্ধিমানদের জন্য স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, 'যে ব্যক্তি কাজে কর্মে কোনো দলসদৃশ হয়, সে তো তাদের মতোই প্রতিদান পাবে।' তাহলে আমাদের অন্তরগুলো দীর্ঘ অবসাদ ও উদাসীনতার তিক্ত পরিণতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের শঙ্কা কীভাবে দূর হয়ে যেতে পারে? একেই কিছু বুজুর্গ বলেছেন সাদৃশ্যনীতি। যার মূল কথা হলো-
(প্রত্যেকে তার অনুরূপ ব্যক্তির নিয়মই গ্রহণ করে থাকে। অনুরূপ দুজনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রয়োগে তারতম্য করা অসম্ভব। যেভাবে পরস্পরবিরোধী দুজনের ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগে অনুরূপ করা অসম্ভব।) ৪০
টিকাঃ
৩৭ হিলয়াতুল আউলিয়া: ৫/৩২৯, আবু নুআয়িম আল-ইস্পাহানি, দারুল কুতুবিল আরবি; নসিহতের বাকি অংশ— আল্লাহ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে একটি বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন; সে মাত্র একটি ভুল করায় সেই বাড়ি থেকে তাকে বেরও করে দিয়েছেন। অথচ আমরা, অগণিত গুনাহ করেও সেই বাড়িতে জায়গা পাওয়ার আশা করি!
৩৮ হাদিসের মান: সহিহ, সায়িদ ইবনু জায়িদ রা.-এর সূত্রে মুসনাদে আহমাদ-এ বর্ণিত হয়েছে; সহিহুল জামি: ৫০
৩৯ সিফাতুস সফওয়া: ২/৩৩৯, ইবনুল জাওজি, দারুল হাদিস, কায়রো