📄 জাহান্নামের শিকল
দুনিয়ার কয়েদীদের যে প্রকার শিকল বা জিঞ্জির দ্বারা জেলখানায় আটক করা হয়, তেমনি জাহান্নামীদের আগুনের শিকল-কড়া দিয়ে বেঁধে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। উক্ত শিকল বহু শত গজ লম্বা। কোরআনের ভাষায় উহাকে সত্তর গজ লম্বা বলা হয়েছে-
: ফেরেশতাদের প্রতি আদেশ হবে, তাকে গ্রেফতার কর এবং পরাইয়া দাও তাকে কয়েদীর শৃঙ্খল। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। আর উহাকে এইরূপ এক জিঞ্জিরে আবদ্ধ কর যা ৭০ গজ লম্বা হবে। (সূরা আল হাক্কা-৩০, ৩১, ৩২)
তিরমিযি শরীফের একটি হাদীসে আছে, হযরত রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেন:
'যদি রাং-এর একটি টুকরা প্রথম আসমান থেকে দুনিয়ার প্রতি ফেলে দেয়া হয়, তাহলে উক্ত টুকরা সন্ধ্যা হবার পূর্বেই যমীনের বুকে পতিত হবে। অথচ ইহা পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। আর সেই রাং-এর টুকরা যদি জাহান্নামের জিঞ্জিরের একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্তের দিকে ছাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে পূর্ণে জিঞ্জিরের দূরত্ব অতিক্রম করতে উহার দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর অতিবাহিত হবে।
পঙ্গপাল উত্তপ্ত অগ্নিতে কাবাব করার উদ্দেশ্যে লোহার দন্ডে ভরে যেভাবে কাবাব করা হয়, অনুরূপভাবে জাহান্নামীদের গুহ্যদ্বার দিয়ে জিঞ্জির ভরে দিয়ে আযাব দেয়া হবে।
এ কথার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আল্লাহ পাকের পবিত্র কোরআন মাজিদের আয়াতে।
আল্লাহ পাক বলেন- : নিশ্চয় আমি কাফেরদের জন্য শৃঙ্খলসমূহ ও জ্বলন্ত অগ্নি তৈয়ার করে রেখেছি।
জাহান্নামীদের গুহ্যদ্বারে এ প্রকার জ্বলন্ত শিকল যে বিদ্ধ করা হবে, তাও কোরআন মাজিদে বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- : ক্ষণকাল পরেই তারা জানতে পারবে, যখন তাদের ঘাড়ে বেড়ী লাগিয়ে শৃঙ্খল দ্বারা ফেরেস্তাগণ সজোরে টানতে টানতে অগ্নি সমতুল্য তিক্ত পানির মধ্যে নিয়ে যাবে এবং পুনরায় সেই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করবে। (সূরা মু'মিনূন)
বিভিন্ন হাদীসের তথ্য জানা যায়- জাহান্নামীগণ কোন একদিকে ঘোর কালো বর্ণ মেঘের আনা-গোনা দেখতে পাবে, ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করবে, তোমাদের কি অভিপ্রায় আছে তা প্রকাশ কর। তখন তারা দুনিয়ার উপর কেয়াস করে বলতে থাকবে, আমাদের ইচ্ছা হল এই মেঘমালা আমাদের উপর বর্ষিত হক। সঙ্গে সঙ্গে সেই মেঘ-রাশি গর্জন সহকারে তাদের উপর বর্ষণ আরম্ভ করবে। আর তথা হতে বেড়ি, শৃঙ্খল এবং অগ্নি স্ফুলিঙ্গসমূহ নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে, যদ্বারা তারা জ্বলিয়া ছারখার হয়ে যাবে এবং তাদের দুঃখ মুসীবত আরও অধিক পরিমাণে বেড়ে যাবে।
এ বিষয়ে আরো জানা যায়, ভীষণ গরম পানিতে যখন জাহান্নামীদের গর্দান ধরে ডুবিয়ে উঠানো হবে, তখন তাদের শরীরের সমস্ত মাংস খসে পড়বে এবং সারা অঙ্গ কঙ্কাল ও দুটো চক্ষু ব্যতীত আর কিছুই থাকবে না। অবশ্য পরে আবার মাংস ফিরে পাবে।
যেমন কোরআন মাজিদে আছে, আল্লাহ বলেন- : জাহান্নামীদের চামড়া জ্বলে খসে পড়া মাত্র নতুন চামড়ার আবর্তন হবে। কারণ এতে নতুন নতুন আযাবের স্বাদ অনুভব হবে। (সূরা নিসা: ৫৬)
📄 জাহান্নামের উপত্যকা
مُوْبِقًا মূবিষ্ণু সম্পর্কে ইমাম মুজাহিদ (রহ.) বলেন, এটা জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।
ইকরামা (রহ.) موبق মূবিষ্ণু জাহান্নামের আগুনের একটি নদীর নাম। যার কিনারায় খচ্চরের মত কালো কালো সাপ রয়েছে, যখন এই সাপগুলো জাহান্নামীদের উপর হামলা করবে, তখন জাহান্নামীরা নিজেদেরকে আত্মরক্ষার জন্য জাহান্নামের আগুনের মধ্যে ঢুকে পড়ে বাঁচানোর চেষ্টা করবে।
হযরত আনাস (রা.) বলেন, موبق মূবিষ্ণু রক্ত-পূঁজে বড়া একটি উপত্যকার নাম।
হুযুর (সা.) ইরশাদ করেন জাহান্নামের মধ্যে একটি উপত্যকা রয়েছে, যাকে ليلم "লামলাম” বলা হয়। জাহান্নামের অন্যান্য উপত্যকা পর্যন্ত তার উত্তপ্ততা থেকে আশ্রয় চায়। উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রহ.) লিখেন, ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন, আল্লাহ তা'আলা এই উপত্যকায় প্রত্যেক স্বৈরাচার, জেদীকে স্থান দিবেন। (কুরতুবী)
📄 পাপীরা জাহান্নামে গাধার ন্যায় চীৎকার করতে থাকবে
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা জাহান্নামীদের কত ধরনের শাস্তি দেয়া হবে তার কোন সীমা নাই। সে সকল শাস্তির কথা মনে হলে দুনিয়ার যাবতীয় সুখ-শান্তির কথা ভুলে যেতে হয়। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, কয়জন সেদিকে খিয়াল করে। মানুষ যদি এদিকে সামান্য খিয়াল করত, তবে এত পাপ পঙ্কিল রাস্তায় গমন করতে সাহস পেত না। এজন্য সর্বদা আল্লাহর দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য তাওবা করা উচিত।
আযাব এতই করুণ হবে যে, আযাবের জ্বালায় অস্থির হয়ে তারা গাধার মত আর্তচীৎকার করতে থাকবে। কোরআন মজিদে আছে আল্লাহ বলেন- পাপীরা জাহান্নামে গাধার ন্যায় চিৎকার করতে থাকবে। (মরনের আগে ও পরে, ইমাম গাযযালী)
📄 বিভিন্ন পাপে ভিন্ন ভিন্ন আযাব
রিয়াকারদের আযাবঃ ইবাদত পুণ্যের যদিও, তবুও যদি ইহার উদ্দেশ্য লোক দেখানো হয়, তবে উহাকেই বলে রিয়া বা লৌকিকতা।
হুযুর (সা.) বলেছেন, 'জুরুল হুজন' অর্থাৎ চিন্তার কুপ হতে তোমরা আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ চাও।'
সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, হুযুর! 'জুব্বুল হুজন' কি জিনিস? হুযুর (সা.) উত্তর করলেন, উহা জাহান্নামের একটি গর্ত, যাহা হতে স্বয়ং জাহান্নামই দৈনিক চারশতবার আল্লার দরবারে পানাহ চায়।'
সাহাবারা (রা.) বললেন, তথায় কারা শাস্তি পাবে? হুযুর (সা.) উত্তর করলেন, সেইসব ইবাদতকারী তথায় গমন করবে, যারা লোককে দেখানোর নিমিত্তে ইবাদত করেছে।
মদখোরের আযাব : বুদ্ধিশূন্যতা মানবতা বিরোধী। মানবতা ও বিবেকশূন্য মানুষ সমাজে ঘৃণিত এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে তার খেয়াল থাকে না আদৌ। মদের নেশায় মানুষ নির্লজ্জ ভাবে সব কিছুই করতে পারে। এজন্যই ইহা পান করা মহা পাপ। এ প্রকার পাপের শাস্তি সম্পর্কে হুজুর আকরাম (সা.) বলেছেনঃ
'আল্লাহ তা'আলা আপন ইজ্জতের কসম খেয়ে ওয়াদা করেছেন, আমার বান্দাগণের মধ্যে যে ব্যক্তি একগ্লাস মদও পান করবে আমি তাকে সেই পরিমাণ পুঁজ পান করাব এবং যে ব্যক্তি আমার ভয়ে শরাব পান ত্যাগ করবে, আমি তাকে পবিত্র হাউযে কাউসার হতে পান করাব।'
হযরত নবীয়ে কারীম (সা.) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি নেশার দ্রব্য পান করবে, আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন যে, তাকে রোজ কিয়ামতে 'তীনাতুল খেয়াল' পান করানো হবে।
সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, হুযুর! 'তীনাতুল খেয়াল' আবার কি জিনিস? হুযুর পাক উত্তর করলেন- উহা জাহান্নামীদের ঘাম ও নিংড়ানো পুঁজ-রক্ত।
হযরত আবূ মূসা আশ'আরী হতে বর্ণিত আছে, হুযুর (সা.) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি শরাব বা মদ পান করে ও সে অবস্থাই মৃত্যু মুখে পতিত হয়, আল্লাহ তা'আলা তাকে 'নহরুল গোতা' হতে পান করাবেন। সাহাবারা উহার তথ্য জানতে চাইলে হুযুর (সা.) উত্তর দিলেন: উহা এমন একটি নহর যা ব্যভিচারী নারীদের লজ্জাস্থান হতে প্রবাহিত কুৎসিত পদার্থ।
আমলহীন বক্তার আযাবঃ 'যে ব্যাপারে তোমার আমল নাই, তার নসীহত অন্যদের করো না'- আল্লাহর এ বাণীর বিরুদ্ধে গিয়ে যারা মানুষকে উপদেশ করে, তাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
যে রাত্রে আমি মেরাজে গমন করি, সেই রাত্রে আমি কতগুলি লোককে দেখেছি যে, তাদের ঠোঁট আগুনের কেঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা
করলাম, ভাই জিব্রাঈল, ওরা কারা? তিনি উত্তর করলেন, ওরা আপনার ঐ সমস্ত উম্মত, যারা লোকদিগকে সৎকাজের আদেশ করত অথচ নিজেরা তার প্রতি আমল বা নিজ কর্মে পরিণত করত না এবং আল্লাহর কিতাব পড়ত অথচ তদানুযায়ী আমল ও কর্ম-সম্পাদন করত না।
এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সা.)-এর অন্য একটি হাদীসে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেখা যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন-
কিয়ামতের দিবসে এক ব্যক্তিকে হাযির করার পর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার পেটের ভিতরের নাড়ী ভুঁড়ি সব বের হয়ে যাবে। আর তারা নাড়িভুঁড়ির চারপাশে গাধার ন্যায় ঘুরতে থাকবে, যেমন- গাধা চাকা ঘুরিয়ে গম পিষে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে বলবে- 'হে অমুক ব্যক্তি! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতে আর অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতে?'
সে বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতাম বটে, কিন্তু আমি তা করতাম না আর আমি তোমাদেরকে অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতাম, অথচ আমিই তা করতাম। (বুখারী, হাদীস নং ৩২৬৭)
অনুরূপ, ইলম গোপনকারী আলেমের জিহ্বা ও মুখে আগুনের লাগাম লাগানো হবে। এ সম্পর্কে হযরত নবীয়ে কারীম (সা.) বলেছেন:
'যার নিকট কোন মাসায়েল জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, অথচ সেই ব্যক্তি জানা সত্ত্বেও নিজের ইলমকে গোপন রাখে। কিয়ামতের দিনে এ প্রকার আলেমের মুখে আগুনের লাগাম পড়ানো হবে।
আত্মহত্যার আযাব : আত্মহত্যা মহাপাপ। কারণ এতে আল্লাহর কাজে নাখোশ থাকার শামিল।
এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেন-
যে ব্যক্তি পর্বত হতে পড়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের অগ্নির পর্বত হতেও পড়তে থাকবে। ইহাতে তার কোন বিরাম হবে না। আর যে ব্যক্তি বিষ পানে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের অগ্নিতে উক্ত বিষ সর্বদা পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি লৌহির কোন অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করে, সে উক্ত লৌহ অস্ত্র জাহান্নামের অগ্নিতে নিজের পেটে বিদ্ধ করতে থাকবে।
অহংকারীর সাজা : অহংকার শয়তানের স্বভাব। এই শয়তানী স্বভাব মানুষের দ্বীন দুনিয়ার সুখ নষ্ট করে। দুনিয়ার কোন ব্যাপারে তার শান্তি থাকবে না। পরকালের আযাব সম্পর্কে হুযূর আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন :
যারা অহঙ্কার ও গর্ব করে বেড়ায়, তারা পিপীলিকার মত ক্ষুদ্র শরীর নিয়ে কিয়ামতের মাঠে উঠবে। অবশ্য আকৃতি তাদের মানুষের আকৃতিই হবে। অতঃপর হুযূর (সা.) বলেন, চতুর্দিক হতে তারা বেইজ্জত হতে থাকবে। অবশেষে জাহান্নামের জেলখানার দিকে চালিত হতে থাকবে, যার নাম বুলেছ। উক্ত বুলেছ নামীয় জেলখানায় এত কঠিন আগুনের ব্যবস্থা রয়েছে যে, যা অন্যান্য আগুনকে খেয়ে ফেলতে পারে এবং তাদেরকে তীনাতুল খেয়াল-অর্থাৎ জাহান্নামীদের নিংড়ানো রক্ত-পুঁজ ও চর্বি ইত্যাদি খাওয়ানো হবে।' (মরণের আগে ও পরে, ইমাম গাজ্জালী)