📄 পাপীদের জাহান্নামের আহ্বান
জাহান্নামীদের তথায় নিক্ষিপ্ত হবার পূর্বেই জাহান্নামের বিকট হুঙ্কার শুনতে পাবে। মনে হবে, জাহান্নাম তাদের উপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। আল্লাহ পাক এ সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে বলেন- 'যারা আপন প্রভুকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য জাহান্নামের কঠিন শাস্তি রয়েছে এবং উহা খুবই নিকৃষ্ট হবে।'
যখন তারা উক্ত জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তারা উহার ভীষণ হুঙ্কার শুনতে পাবে এবং উহা এরকম টগবগ করতে থাকবে যেন শীঘ্রই ভীষণ রাগে ফেটে পড়বে।
তাফসীরে বয়ানুল কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হয়ত আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের ভিতর রাগান্বিত হওয়ার এক অনুভূতি পয়দা করে দিবেন, অথবা দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা হয়েছে যে, জাহান্নামের অবস্থা দৃষ্টে মনে হবে যেন উহা ভীষণ রাগান্বিত হয়েছে।
জাহান্নামের হুঙ্কার জাহান্নামীরা শুনতে পাবে দূর হতে। যেমন বাজারের নিকটে পৌঁছলে বাজারের শোরগোল শোনা যায়। কিন্তু জাহান্নামীরা বন্ধন অবস্থায় অদূরে থাকতেই জাহান্নামের আহ্বান শ্রুত হবে এবং তখন তারা মৃত্যুকে স্মরণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় খুঁজে পাবে না।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- “যখন উক্ত দোযখ দূর হতে জাহান্নামীদিগকে দেখতে পাবে, তখন তারা উহার বিকট শব্দ ও হুঙ্কার শুনতে পাবে। অতঃপর যখন তাহাদিগকে বন্ধনাবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা শুধু মৃত্যুকে আহ্বান করতে থাকবে।” (সূরা ফোরকান-১২-১৩)
দুনিয়ার বুকে মানুষ কোন বিপদগ্রস্ত হলে যেমন শুধু বলতে থাকে, হায় মরিয়া গেলাম! হায় মরিয়া গেলাম! তদ্রুপ জাহান্নামবাসীগণও বলতে থাকবে। কিন্তু তাদের চিৎকার ও আর্তনাদ কোন কাজেই আসবে না। কেহই তাতে সাড়া দিবে না বা কর্ণপাত করবে না। যদিও জাহান্নাম প্রশস্ত স্থান, তবুও শাস্তির জন্য পাপীদিগকে মাঝে মাঝে সংকীর্ণ স্থানেই রাখা হবে।
সূরায়ে মা'আরিজে আছে, আল্লাহ বলেন- “জাহান্নাম ঐ সমস্ত লোকদিগকে নিজের দিকে আহ্বান করবে যারা হক রাস্তা হতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে এবং আল্লাহ তা'আলার গোলামী হতে মুখ ফিরিয়েছে এবং অবৈধভাবে ধন-সম্পদকে জমা করে সংরক্ষিত করেছে।' (১৭-১৮)
📄 আযাবের বিভিন্ন দিক
জাহান্নাম কাফেরদের জন্য দুঃখ ও আযাবের স্থান, এ আযাব তাদের চলবে অনন্তকাল এতটুকু বিরাম হবে না এ হতে কোন জাহান্নামীর।
খাদ্য-খাদকের বেলায় যেমনি আযাব হবে, তেমনি আযাব হতে থাকবে বিভিন্ন আযাবের বস্তু দ্বারা।
যখন তারা তৃষ্ণায় অস্থির হয়ে ছটফট করতে ও পানির জন্য আর্তনাদ করতে থাকবে তখন তাদেরকে এরকম পানি দেওয়া হবে যা তৈলের গাদের মত বিশ্রী হবে ও মুখমন্ডলকে জ্বালাইয়া ভষ্ম করে দিবে। উহ! উহা কত নিকৃষ্ট পানীয়।
এখানে কি কি রূপে এবং কিসের দ্বারা কিভাবে আযাব দিবে তার মোটামুটি বর্ণনা দেওয়া হল।
📄 আগুনের পাহাড়
জাহান্নামীদের আযাবের উপকরণের মধ্যে আগুনের পাহাড় একটি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন- 'অতি সত্বর আমি তাকে "সাউদ الصعود নামক পাহাড়ে উঠাব।'
এই আয়াতের “সাউদের" ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নবী কারীম (সা.) বলেন- অগ্নির একটি পাহাড়ের নাম 'সাউদ'। জাহান্নামীদের উহার উপর অনবরত ৭০ বৎসর যাবত উঠানো হবে। অতঃপর সেখান হতে তাকে ফেলে দেয়া হবে এবং পুনরায় ৭০ বৎসর যাবত নীচের দিকে পড়তেই থাকবে। এভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত শাস্তি পাবে। (মরণের আগেও পরে, ইমাম গাজ্জালী)
কতক উলামাগণ বলেন, 'ইয়াহমূম' يحموم জাহান্নামের একটি পাহাড়, যার ছায়াতে জাহান্নামীরা বিশ্রামের চেষ্টা করবে। জাহান্নামের আগুনের ধোঁয়া কঠিন গরম। তার গুণ হলো لَا بَارِ دو لَا كَرِيمٍ না তা ঠাণ্ডা হবে এবং না তা দেখতে ভালো লাগবে।”
📄 জাহান্নামের শিকল
দুনিয়ার কয়েদীদের যে প্রকার শিকল বা জিঞ্জির দ্বারা জেলখানায় আটক করা হয়, তেমনি জাহান্নামীদের আগুনের শিকল-কড়া দিয়ে বেঁধে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। উক্ত শিকল বহু শত গজ লম্বা। কোরআনের ভাষায় উহাকে সত্তর গজ লম্বা বলা হয়েছে-
: ফেরেশতাদের প্রতি আদেশ হবে, তাকে গ্রেফতার কর এবং পরাইয়া দাও তাকে কয়েদীর শৃঙ্খল। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। আর উহাকে এইরূপ এক জিঞ্জিরে আবদ্ধ কর যা ৭০ গজ লম্বা হবে। (সূরা আল হাক্কা-৩০, ৩১, ৩২)
তিরমিযি শরীফের একটি হাদীসে আছে, হযরত রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেন:
'যদি রাং-এর একটি টুকরা প্রথম আসমান থেকে দুনিয়ার প্রতি ফেলে দেয়া হয়, তাহলে উক্ত টুকরা সন্ধ্যা হবার পূর্বেই যমীনের বুকে পতিত হবে। অথচ ইহা পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। আর সেই রাং-এর টুকরা যদি জাহান্নামের জিঞ্জিরের একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্তের দিকে ছাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে পূর্ণে জিঞ্জিরের দূরত্ব অতিক্রম করতে উহার দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর অতিবাহিত হবে।
পঙ্গপাল উত্তপ্ত অগ্নিতে কাবাব করার উদ্দেশ্যে লোহার দন্ডে ভরে যেভাবে কাবাব করা হয়, অনুরূপভাবে জাহান্নামীদের গুহ্যদ্বার দিয়ে জিঞ্জির ভরে দিয়ে আযাব দেয়া হবে।
এ কথার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আল্লাহ পাকের পবিত্র কোরআন মাজিদের আয়াতে।
আল্লাহ পাক বলেন- : নিশ্চয় আমি কাফেরদের জন্য শৃঙ্খলসমূহ ও জ্বলন্ত অগ্নি তৈয়ার করে রেখেছি।
জাহান্নামীদের গুহ্যদ্বারে এ প্রকার জ্বলন্ত শিকল যে বিদ্ধ করা হবে, তাও কোরআন মাজিদে বিশদ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- : ক্ষণকাল পরেই তারা জানতে পারবে, যখন তাদের ঘাড়ে বেড়ী লাগিয়ে শৃঙ্খল দ্বারা ফেরেস্তাগণ সজোরে টানতে টানতে অগ্নি সমতুল্য তিক্ত পানির মধ্যে নিয়ে যাবে এবং পুনরায় সেই প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করবে। (সূরা মু'মিনূন)
বিভিন্ন হাদীসের তথ্য জানা যায়- জাহান্নামীগণ কোন একদিকে ঘোর কালো বর্ণ মেঘের আনা-গোনা দেখতে পাবে, ফেরেশতাগণ জিজ্ঞাসা করবে, তোমাদের কি অভিপ্রায় আছে তা প্রকাশ কর। তখন তারা দুনিয়ার উপর কেয়াস করে বলতে থাকবে, আমাদের ইচ্ছা হল এই মেঘমালা আমাদের উপর বর্ষিত হক। সঙ্গে সঙ্গে সেই মেঘ-রাশি গর্জন সহকারে তাদের উপর বর্ষণ আরম্ভ করবে। আর তথা হতে বেড়ি, শৃঙ্খল এবং অগ্নি স্ফুলিঙ্গসমূহ নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে, যদ্বারা তারা জ্বলিয়া ছারখার হয়ে যাবে এবং তাদের দুঃখ মুসীবত আরও অধিক পরিমাণে বেড়ে যাবে।
এ বিষয়ে আরো জানা যায়, ভীষণ গরম পানিতে যখন জাহান্নামীদের গর্দান ধরে ডুবিয়ে উঠানো হবে, তখন তাদের শরীরের সমস্ত মাংস খসে পড়বে এবং সারা অঙ্গ কঙ্কাল ও দুটো চক্ষু ব্যতীত আর কিছুই থাকবে না। অবশ্য পরে আবার মাংস ফিরে পাবে।
যেমন কোরআন মাজিদে আছে, আল্লাহ বলেন- : জাহান্নামীদের চামড়া জ্বলে খসে পড়া মাত্র নতুন চামড়ার আবর্তন হবে। কারণ এতে নতুন নতুন আযাবের স্বাদ অনুভব হবে। (সূরা নিসা: ৫৬)