📄 স্বপ্নযোগে ইবনে উমর (রা.) জাহান্নাম দেখলেন
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বেশ কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে স্বপ্ন দেখতেন। অতঃপর তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) এগুলোর ব্যাখ্যা দিতেন যা আল্লাহ ইচ্ছা করতেন。
আমি তখন অল্প বয়সের যুবক। বিয়ের পূর্বে মসজিদই ছিল আমার ঘর। আমি মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, আমার মধ্যে কোন কল্যাণ আছে তাহলে আমাকে কোন একটি স্বপ্ন দেখান। আমি ঐ অবস্থায়ই (ঘুমিয়ে) থাকলাম।
দেখলাম আমার কাছে দু'জন ভয়ঙ্কর ফেরেশতা এসেছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতেই লোহার একটি করে হাতুড়ি। তারা আমাকে নিয়ে (জাহান্নামের দিকে) এগোচ্ছে। আমি তাঁদের দু'জনের মাঝে থেকে আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, হে আল্লাহ। আমি জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর আমাকে দেখানো হল যে, একজন ফেরেশতা আমার কাছে এসেছেন। তাঁর হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। সে আমাকে বলল, তোমার অবশ্যই কোন ভয় নেই। তুমি খুবই ভাল লোক। যদি অধিক করে নামায আদায় করতে! তাঁরা আমাকে নিয়ে চলল, অবশেষে তাঁরা আমাকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করালেন, (যা দেখতে) কূপের মত গোল আকৃতির। আর কূপের মত এরও রয়েছে অনেক শিং। আর দুইটি শিং-এর মাঝখানে একজন ফেরেশতা, যার হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। আর আমি এতে (জাহান্নামে) কিছু লোককে শিকল পরিহিত দেখলাম। তাদের মাথা ছিল নিচের দিকে। কুরাইশের এক ব্যক্তিকে সেখানে আমি চিনে ফেললাম। অতঃপর তারা আমাকে ডান দিকে নিয়ে ফিরল।
এ ঘটনা (স্বপ্ন) আমি হাফছা (রা.) এর নিকট বর্ণনা করলাম। আর হাফছা (রা.) তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বর্ণনা করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আব্দুল্লাহ তো নেককার লোক।
নাফে' (র.) বলেন, এরপর থেকে তিনি সর্বদা অধিক করে (নফল) নামায আদায় করতেন। (বুখারী, 'স্বপ্নে নিরাপদ মনে করা ও ভীতি দূর হতে দেখা' অধ্যায়, হা/৭০২৮, ৭০২৯)।
📄 জাহান্নামীদের সুরত ও আকৃতি
অধিক শাস্তি ভোগ করার জন্য বিরাট আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া যুক্তিসংগত। কারণ আযাব হাড়ে হাড়ে পৌঁছানোর জন্য বিশাল দেহ হওয়া প্রয়োজন। জাহান্নামীদের তাই দেহাকৃতি হবে যেমনি বিশাল সূরতও হবে তেমনি কুৎসিত। দেখলে যে কেহর অভক্তি হবে, ভীত হবে দেখলে তাদের বিরাট আকৃতি।
আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যে তাদেরকে বিশালাকৃতির দেহ দান করবেন। যেমন- তাদের এক কাঁধ থেকে অপর কাঁধের দূরত্ব হবে দ্রুতগামী ঘোড়ার তিন দিনের পথ, একটি দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের সমান, চামড়া হবে তিন দিনের পথ সমতুল্য পুরু বা মোটা।
এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে নবী করিম (সা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- কাফিরের দু'কাধের মাঝের দূরত্ব একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিনের ভ্রমণ পথের সমান হবে। (বুখারী, অধ্যায়, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ, হা:/৬৫৫১)
অন্য এক বর্ণনায় জাহান্নামীদের শরীরের চামড়া ৪২ গজ পুরু হবে উল্লেখ আছে। (আত-তারগীব-৪/৮৬৫)
জাহান্নামীদের সূরত কেমন কুৎসতি ও কদাকার হবে, এ সম্পর্কে কোরআনে স্পষ্ট বর্ণনা আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
“আর যারা পাপকার্য সমূহে লিপ্ত হয়েছে, তাদের অপরাধের শাস্তি অপরাধ পরিমাণ হতে থাকবে এবং তাহাদিগকে এভাবে বেইজ্জত ও অপদস্ত করা হবে যে, আল্লাহর আযাব হতে তাদেরকে রক্ষাকারী কেহ থাকবে না। তারা এত বদ আকৃতির হবে যেন অন্ধকার রাত্রির তীব্র অন্ধকার তাদের চেহারা মুখমন্ডলকে ছেয়ে ফেলেছে'।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেছেন, যদি জাহান্নামীদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তিকে দুনিয়াতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়, তাহলে তার ভয়ঙ্কর সূরত ও দুর্গন্ধ দুনিয়ার সকল জীব জন্তু মরে যাবে। অতঃপর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর অনেকক্ষণ কাঁদলেন। (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ৪/৮৬৪)
এ সম্পর্কে কোরআন মাজিদেও ব্যাখ্যা আছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
تَلْفَحُ وُجُوهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيهَا كَلِحُونَ .
অর্থাৎ : অগ্নি তাদের মুখমন্ডলকে ঝলসিয়ে দিবে, আর তারা থাকবে • সেখানে বীভৎস চেহারায়। (সূরা মু'মিনূন-১০৪)
হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবী (সা.) কে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি এরশাদ করেন, দোযখের অগ্নি তাদেরকে পুড়িয়ে এমন অবস্থা করবে যে, তাদের দেহের গোশ্ত তাদের পায়ে লুটে পড়বে। আর কোন কোন ব্যাখ্যাকার বলেছেন, তাদের জিহ্বা বের হয়ে মাটিতে লুটে পড়বে এবং অন্য দোজখীরা তা পায়ে মাড়াবে।
তিরমিযী শরীফে সংকলিত হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, প্রিয়নবী (সা.) এ বাক্যটির ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, জাহান্নামের অগ্নি কাফেরদের ভুনে ফেলবে, তার ওপরের ঠোঁট এত উপরে উঠবে যে মাথার অর্ধেক পর্যন্ত পৌঁছে যাবে আর নীচের ঠোঁট নিচের দিকে নেমে যাবে এবং নাভি পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর (উর্দু), পারা-১৮/২৭)
📄 জাহান্নামীদের খাদ্য-পানীয়
জাহান্নাম যাতনা ও পাপীদের আযাবের ঘৃণিত স্থান। এখানে যা কিছু করা হবে সবই যাতনা, দুঃখ আযাবের। তাদের পানাহারের বস্তু হবে সেখানে আযাব। মর্মান্তিক যাতনা হবে খাদ্য-পানীয়।
জাহান্নামীদের খাদ্য হবে যাক্কুম এবং কাঁটাযুক্ত এক প্রকার গাছ। আর পানীয় হবে রক্ত-পুঁজ মিশ্রিত গরম দুর্গন্ধময় পানি। জাহান্নামীদের খাদ্য “যাক্কুম” সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُوْمِ طَعَامُ الْأَثِيمِ كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ كَغَلْي الْحَمِيمِ .
'নিশ্চয়ই যাক্কুম বৃক্ষ হবে পাপীদের খাদ্য, গলিত তামার মত, তাদের উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মত'। (সূরা দুখান: ৪৩-৪৬)
আর যাক্কুম-এর আকৃতি উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা বলেন- 'আপ্যায়নের জন্য কি ইহাই শ্রেয় না যাক্কুম বৃক্ষ? যালিমদের জন্য আমি ইহা সৃষ্টি করেছি পরীক্ষাস্বরূপ, এই বৃক্ষ উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে, ইহার মোচা যেন শয়তানের মাথা, তারা ইহা হতে ভক্ষণ করবে এবং উদরপূর্ণ করবে ইহা দ্বারা। তদুপরি তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। আর তাদের গন্তব্য হবে অবশ্যই প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দিকে'। (সূরা ছাফফাত-৬২-৬৮)
উল্লেখিত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, যাক্কুম বৃক্ষ যা আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদের খাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন তা অতীব নিকৃষ্ট, যা উদগত হয় জাহান্নামের তলদেশ হতে। আর উহার ফল দেখতে কুৎসিত যা আল্লাহ তা'আলা শয়তানের মাথা সাদৃশ বলে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামীদেরকে প্রচন্ড ক্ষুধা প্রদান করবেন, আর এই ক্ষুধার্ত জাহান্নামীদের খাদ্য হিসেবে কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ যাক্কুম প্রদান করবেন। প্রচন্ড ক্ষুধার যন্ত্রণায় যখন তারা এই যাক্কুম বৃক্ষ খাওয়ার চেষ্টা করবে তখন তাদের গলায় এমনভাবে আটকিয়ে যাবে যা নিচেও নামবে না বের হয়েও আসবে না।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন- لَيْسَ لَهُمْ طَعَامُ إِلَّا مِنْ ضَرِيحٍ لَّا يُسْمِنُ وَلَا يُغْنِي مِنْ جُمْعٍ.
'তাদের জন্য খাদ্য থাকবে না কাঁটাযুক্ত ফল ব্যতীত, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করবে না। (সূরা গাশিয়া-৬-৭)
আয়াতে বর্ণিত (যরি') হচ্ছে এক প্রকার কাঁটাযুক্ত গাছ, যার নমুনা আরব উপদ্বীপগুলোতে কোথাও কোথাও দেখা যায়।
উল্লেখিত খাদ্য যা জাহান্নামীগণ ভক্ষণ করবে। কিন্তু এতে তারা কোন স্বাদ অনুভব করবে না এবং শারীরিক কোন উপকারে আসবে না। অতএব, এই খাদ্য তাদেরকে শাস্তি স্বরূপ প্রদান করা হবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন- إِنَّ لَدَيْنَا أَنْكَالًا وَجَحِيمًا-وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا.
"আমার নিকট আছে শৃংখল ও প্রজ্জ্বলিত অগ্নি, আর আছে এমন খাদ্য, যা গলায় আটকিয়ে যায় এবং মর্মান্তিক শাস্তি।” (সূরা মুযযাম্মিল: ১২-১৩)
এমতাবস্থায় জাহান্নামীরা আল্লাহর নিকটে পানি পানের আবেদন করবে। পান করার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমন গরম পানি দান করবেন, যা জাহান্নামীরা পিপাসিত উটের ন্যায় পান করবে। অতঃপর তাদের নাড়িভুঁড়ি এমনভাবে ফুটতে থাকবে যেমনভাবে গরম তেল ফুটতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ .
“এবং তাদের (জাহান্নামী) পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিবে।” (সূরা মুহাম্মাদ-১৫)
📄 জাহান্নামীদের পানীয়
জাহান্নামীদের শরীর হতে গড়িয়ে পড়া রক্ত পুঁজ মিশ্রিত গরম ও তরল পদার্থ জাহান্নামীদেরকে পানীয় হিসেবে দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন-
فَلَيْسَ لَهُ الْيَوْمَ هَهُنَا حَمِيمٌ . وَلَا طَعَامُ إِلَّا مِنْ غِسْلِيْنٍ لَّا يَأْكُلُهُ إِلَّا الْخَاطِئُونَ.
"অতএব এই দিন সেথায় তার কোন সুহৃদ থাকবে না এবং কোন খাদ্য থাকবে না ক্ষত নিঃসৃত স্রাব ব্যতীত, যা অপরাধী ব্যতীত কেউ খাবে না।” (সূরা হাক্কু-ক্বাহ : ৩৫-৩৭) তিনি আরো বলেন-
هُذَا فَلْيَذُوقُوهُ حَمِيمٌ وَ غَسَّاقٌ وَاخَرُ مِنْ شَكْلِه أَزْوَاجٌ .
“ইহা সীমালংঘনকারীদের জন্য সুতরাং তারা আস্বাদন করুক ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। আরও আছে এইরূপ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি।” (সূরা ছাদ: ৫৭-৫৮)