📄 জাহান্নামের আগুনের প্রখরতা এবং ধোঁয়ার আধিক্য
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'আর বাম দিকের দল, কত হতভাগ্য বাম দিকের দল! তারা থাকবে তীব্র গরম হাওয়া এবং প্রচন্ড উত্তপ্ত পানিতে, আর প্রচন্ড কালো ধোঁয়ার ছাঁয়ায়, যা শীতলও নয়, সুখকরও নয়'। (সূরা ওয়াকি'আহ: ৪১-৪৪) এ আয়াতসমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিনের প্রচন্ড তাপ থেকে মানুষকে ঠান্ডা করবেন তিনটি বস্তু দ্বারা, তা হল ঃ ১। পানি। ২। বাতাস এবং ৩। ছায়া।
যার সামান্যটুকুও জাহান্নামীদেরকে দেয়া হবে না। অতএব, জাহান্নামের বাতাস যা তার অধিবাসীদেরকে দেয়া হবে, তা প্রচণ্ড গরম বাতাস। আর পানি যা পান করতে দেয়া হবে, তা প্রচন্ড গরম পানি। আর ছায়া যা তাদেরকে আচ্ছাদন করে রাখবে, তা জাহান্নামের আগুন নিঃসৃত ধোঁয়ার ছায়া। এগুলো জাহান্নামীদের কোন উপকারে আসবে না, বরং এগুলো তাদের অধিক শাস্তির কারণ হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
"চলো তিন শাখা বিশিষ্ট ছায়ার দিকে, যে ছায়া শীতল নহে এবং যা রক্ষা করে না অগ্নিশিখা হতে, উহা উৎক্ষেপ করবে বৃহৎ স্ফুলিঙ্গ অট্টালিকাতুল্য উহা পীতবর্ণ উষ্ট্রশ্রেণী সদৃশ।” (সূরা মুরসালাত: ৩০-৩৩) অত্র আয়াতে আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের আগুন নিসৃত ধোঁয়ার তিনটি প্রকার উল্লেখ করেছেন-
১। ছায়া সদৃশ ধোঁয়া যা শীতল করে না। ২। এই ধোঁয়া জ্বলন্ত অগ্নি শিখা থেকে রক্ষা করতে পারে না। ৩। এই ধোঁয়া মোটা কালো উটের মত।
📄 জাহান্নামের জ্বালানী
মহান আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের জ্বালানী হিসেবে পাথর এবং পাপিষ্ট কাফিরদেরকে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফিরিশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই করে। (সূরা আত-তাহরীম : ৬)
অত্র আয়াতে মানুষ বলতে কাফির-মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। আর পাথর বলতে কোন প্রকারের পাথর যা আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করবেন তা আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। তবে বলা হয়ে থাকে, ইহা ঐ সমস্ত মূর্তি, কাফির-মুশরিকরা যাদের ইবাদত করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, 'তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলি তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সকলে তার মধ্যে প্রবেশ করবে। (সূরা আম্বিয়া : ৯৮)
আল্লামা আলুসী (র.) তাঁর তাফসীরে রুহুল মা'আনীতে এবং আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপত্তি (র.) তাঁর তাফসীরে আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় একথাও লিখেছেন যে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের প্রিয় নবী (সা.)-এর নিকট এ প্রশ্ন করেছিল যে, আলোচ্য আয়াতের সতর্কবাণী শুধু কি আমাদের উপাস্যদের উদ্দেশ্যই উচ্চারিত হয়েছে? তখন প্রিয়নবী (সা.) জবাব দিয়েছিলেন:
لِكُلِّ مَنْ عُبِدَ مِنْ دُونِ اللَّهِ .
'শুধু তোমাদের দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে এই সতর্কবাণী নয়, বরং আল্লাহ পাক ব্যতীত যা কিছুর বন্দেগী করা হয় তার সম্পর্কেই এই সতর্ক বাণী”। (তাফসীরে নূরুল কোরআন ১৭/১৫১)।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন-
এটা গন্ধক পাথর যা আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করে, যা আল্লাহ তা'আলা আসমান-যমীন সৃষ্টির সময় সৃষ্টি করে কাফিরদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।
ইবনে রজব রহ. বলেন- অধিকাংশ মুফাসসিরগণ পাথর বলতে গন্ধক পাথরকে বুঝিয়েছেন যা আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করে এবং বলা হয়ে থাকে এই আগুনে পাঁচ প্রকার শাস্তি বিদ্যমান।
১. দ্রুত আগুন প্রজ্জ্বলিতকরণ।
২. অতি দুর্গন্ধময়।
৩. অতিরিক্ত ধোঁয়া নিসৃতকরণ
৪. কঠিনভাবে শরীরের সাথে আগুনের সংযুক্তকরণ।
৫. তাপের প্রখরতা। (জাহান্নামের আগুন-০৯ মুফতী সালাহুদ্দীন মাসউদ) মানুষ আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে যে সকল ব্যক্তি বা বস্তুকে মা'বুদ হিসেবে গ্রহণ করেছে, জাহান্নামের জ্বালানী হিসাবে মানুষ ও পাথরকে ঐ সকল মা'বুদদের সাথে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন- 'তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলিতো জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে। যদি তারা ইলাহ হতো তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না, তাদের সকলেই তাতে (জাহান্নামে) স্থায়ী হবে'। (সূরা আম্বিয়া-৯৮-৯৯)
আল্লাহ তা'আলা আমাদের জাহান্নামের ইন্ধন হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
📄 স্বচক্ষে জাহান্নাম দর্শন
আসমা বিনতে আবু বকর রা. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. একবার সূর্যগ্রহণের নামায আদায় করলেন। নামায শেষ করে ফিরে বললেন, জান্নাত আমার খুবই নিকটে এসে গিয়েছিল। এমনকি আমি যদি চেষ্টা করতাম তাহলে জান্নাতের একগুচ্ছ আঙ্গুর তোমাদের এনে দিতে পারতাম। আর জাহান্নামও আমার একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। এমনকি আমি বলে উঠলাম, হে আল্লাহ আমিও কি তাদের সাথে? আমি একজন স্ত্রীলোককে দেখতে পেলাম।
আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছিলেন, একটি বিড়াল তাকে (মহিলাটিকে) খামচাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ স্ত্রীলোকটির এমন অবস্থা কেন? ফেরেশতাগণ জবাব দিলেন, সে একটি বিড়ালকে আটকিয়ে রেখেছিল, ফলে বিড়ালটি অনাহারে মারা যায়। উক্ত স্ত্রীলোকটি তাকে খেতেও দেয়নি এবং তাকে ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে আহার করতে পারে। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৭৪৫, ২৩৬৪)
📄 স্বপ্নযোগে ইবনে উমর (রা.) জাহান্নাম দেখলেন
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বেশ কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর যুগে স্বপ্ন দেখতেন। অতঃপর তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) এগুলোর ব্যাখ্যা দিতেন যা আল্লাহ ইচ্ছা করতেন。
আমি তখন অল্প বয়সের যুবক। বিয়ের পূর্বে মসজিদই ছিল আমার ঘর। আমি মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, আমার মধ্যে কোন কল্যাণ আছে তাহলে আমাকে কোন একটি স্বপ্ন দেখান। আমি ঐ অবস্থায়ই (ঘুমিয়ে) থাকলাম।
দেখলাম আমার কাছে দু'জন ভয়ঙ্কর ফেরেশতা এসেছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতেই লোহার একটি করে হাতুড়ি। তারা আমাকে নিয়ে (জাহান্নামের দিকে) এগোচ্ছে। আমি তাঁদের দু'জনের মাঝে থেকে আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, হে আল্লাহ। আমি জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর আমাকে দেখানো হল যে, একজন ফেরেশতা আমার কাছে এসেছেন। তাঁর হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। সে আমাকে বলল, তোমার অবশ্যই কোন ভয় নেই। তুমি খুবই ভাল লোক। যদি অধিক করে নামায আদায় করতে! তাঁরা আমাকে নিয়ে চলল, অবশেষে তাঁরা আমাকে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড় করালেন, (যা দেখতে) কূপের মত গোল আকৃতির। আর কূপের মত এরও রয়েছে অনেক শিং। আর দুইটি শিং-এর মাঝখানে একজন ফেরেশতা, যার হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। আর আমি এতে (জাহান্নামে) কিছু লোককে শিকল পরিহিত দেখলাম। তাদের মাথা ছিল নিচের দিকে। কুরাইশের এক ব্যক্তিকে সেখানে আমি চিনে ফেললাম। অতঃপর তারা আমাকে ডান দিকে নিয়ে ফিরল।
এ ঘটনা (স্বপ্ন) আমি হাফছা (রা.) এর নিকট বর্ণনা করলাম। আর হাফছা (রা.) তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বর্ণনা করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আব্দুল্লাহ তো নেককার লোক।
নাফে' (র.) বলেন, এরপর থেকে তিনি সর্বদা অধিক করে (নফল) নামায আদায় করতেন। (বুখারী, 'স্বপ্নে নিরাপদ মনে করা ও ভীতি দূর হতে দেখা' অধ্যায়, হা/৭০২৮, ৭০২৯)।