📄 জাহান্নামের দরজা সাতটি
পবিত্র কুরআন মাজীদে পাপীদের জন্য ইরশাদ হচ্ছে- وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمَوْعِدُهُمْ أَجْمَعِينَ - لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِكُلِّ بَابٍ مِّنْهُمْ جُزْءٌ مَقْسُومٌ .
'অবশ্যই তাদের সবার নির্ধারিত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম। এর সাতটি দরজা আছে। প্রত্যেক দরজার জন্য এক একটি পৃথক দল আছে'। (সূরা হিজর-৪৩-৪৪) প্রথম দরজার নাম جهنم জাহান্নাম। দ্বিতীয় দরজার নাম لظى লাজা। তৃতীয় দরজার নাম سقر ছাক্বার। চতুর্থ দরজার নাম الحطمه হোতামা। পঞ্চম দরজার নাম الجحيم জাহীম। ষষ্ঠ দরজার নাম السعير ছায়ীর। সপ্তম দরজার নাম الهاوية হাবিয়া।
প্রথম জাহান্নাম : যারা ইচ্ছাকৃত ভাবে আল্লাহর কোন বান্দাকে হত্যা করেছে, তারা তথায় শাস্তি পাবে। দ্বিতীয় লাজা: যারা যাকাত আদায় করে নাই, তারা উক্ত দোযখে শাস্তি পাবে।
তৃতীয় ছাক্বার : যারা নামাজ আদায় করে নাই ও গরীব দুঃখীদিগকে অন্নদান করে নাই, তারা তথায় শাস্তি ভোগ করবে।
চতুর্থ হোতামা: যারা চোগলখুরী করেছে, তারা উক্ত দোযখে শাস্তি ভোগ করবে।
পঞ্চম জাহীম : যারা আল্লাহর রাস্তা হতে ঘাড় ফিরিয়েছে ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার যিন্দেগীর লোভে জীবন উৎসর্গ করেছে, তারা উক্ত দোযখে প্রবেশ করবে।
ষষ্ঠ ছায়ীর : এই দোযখে যারা আল্লাহ তা'আলার বাণীসমূহ ও নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছে, তাদের শাস্তির জন্য ইহা নির্ধারিত।
সপ্তম হাবিয়া: বিভিন্ন প্রকার পাপে লিপ্ত হয়ে যারা বদ আমলের পাল্লাকে ভারী করেছে, তাদের তথায় হবে বাসস্থান।
আল্লামা বগভী লিখেছেন: জাহ্যাক (র.) বলেছেন, দোযখের প্রথম স্তরে সেই তৌহিদপন্থীরা থাকবে, যাদেরকে তাদের পাপাচারের কারণে দোযখে প্রবেশ করানো হবে। তাদের গুনাহ বা পাপকার্য হিসেবেই তাদেরকে দোযখে রাখা হবে। এরপর ঈমানের কারণেই তাদেরকে দোযখ থেকে নাজাত দেয়া হবে। দোযখের দ্বিতীয় স্তরে থাকবে নাসারারা। তৃতীয় স্তরে মজুমী (অগ্নিপূজক) চতুর্থ স্তরে ইহুদীরা পঞ্চম স্তরে মুশরিক বা পৌত্তলিক ষষ্ঠ স্তরে সাবী এবং সপ্তম স্তরে থাকবে মোনাফিকরা। (তাফসীরে নূরুল কোরআন ১৪/৪৯)
উপরি উক্ত সাতটি জাহান্নামেই দোযখীদের আযাব ও নির্যাতন হতে থাকবে। এছাড়া অন্যান্য প্রকার জাহান্নামও আছে। কোরআন পাকের ভাষায় এই গুলিকে দোযখের দরজা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কোন স্থানে। এগুলিকে স্তবক বা তবকও বলা হয়েছে।
আল্লামা বগভী (র.) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। হুজুর (সা.) ইরশাদ করেছেন, জাহান্নামের সাতটি দরজা তথা স্তর রয়েছে। তন্মধ্যে একটি স্তর তাদের জন্য রয়েছে যারা আমার উম্মতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। অথবা তিনি বলেছেন, যারা মোহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে। (তাফসীরে নূরুল কোরআন-১৪/৫০)
তাফসীরকারগণ বলেছেন: গুনাহ এবং নাফরমানীর বিচারে যে দোযখী যেমন শাস্তির উপযুক্ত বিবেচিত হবে, তাকে দোযখের সেই দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে হবে। অথবা দোযখীদের সংখ্যা যেহেতু অনেক হবে, তাই তাদের জন্যে সাতটি দরজা রাখা হয়েছে। (তাফসীরে মাজেদী ১/৫৪২)
📄 জাহান্নামের প্রহরী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণকে জাহান্নামের প্রহরী নিযুক্ত করেছেন যারা আল্লাহর আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত থাকে, কখনোই তারা তা অমান্য করে না।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা- 'হে মু'মিনগণ তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনে ত্রুটি করে না। আর তাঁরা যা করতে আদিষ্ট হয় তাই পালন করে থাকে। (সূরা আত-তাহরীম ৬)
📄 জাহান্নামের আযাবের প্রহরীর সংখ্যা
দোযখীদের আযাবের জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে ঊনিশজন ফেরেশতা। তারা ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর পাপীদের বিভিন্ন প্রকার আযাবের দায়িত্বে নিয়োজিত। অন্যথায়, দোযখীদের আযাবের জন্য একজন মাত্র ফেরেশতাই যথেষ্ট। কারণ তারা প্রত্যেকেই এতবড় মজবুত ও শক্তিশালী যে, মানব-দানবের শক্তি তাদের কাছে কিছুই নয়।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেনঃ 'আমি তাদেরকে নিক্ষেপ করব সাকার-এ। তুমি কি জান সাকার কী? উহা তাদেরকে জীবিত অবস্থায় রাখবে না এবং মৃত অবস্থায়ও ছেড়ে দিবে না। ইহা শরীরের চামড়া পুড়ে ফেলবে। সাকার-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশজন প্রহরী'। (সূরা মুদ্দাছছির: ২৬-৩০)
আয়াতে উল্লেখিত সংখ্যা দ্বারা আল্লাহ তা'আলা কাফিরদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। কারণ, তারা ধারণা করে যে, এই অল্প সংখ্যক ফেরেশতার শক্তির সাথে বিপুল পরিমাণ জাহান্নামীদের বিজয় লাভ সম্ভব। কিন্তু তারা জানেনা যে, একজন ফেরেশতার শক্তি দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়েও বেশি।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন- 'আমি ফেরেশতাগণকে জাহান্নামের প্রহরী নিযুক্ত করেছি, কাফিরদের পরীক্ষা স্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা-উল্লেখ করেছি যাতে কিতাবীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে আর বিশ্বাসীদের বিশ্বাস বৃদ্ধি হয় এবং বিশ্বাসীরা ও কিতাবীগণ সন্দেহ পোষণ না করে। (সূরা মুদ্দাছছির-৩১)
📄 জাহান্নামের প্রশস্ততা ও গভীরতা
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অবাধ্য বান্দাদের শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। যার প্রশস্ততা বিশাল এবং গভীরতা অনেক, এর প্রমাণ নিম্নরূপঃ
রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনি জাহান্নামের গভীরতা সম্বন্ধে বলেছেন, যদি একটি পাথর পুলসিরাত হতে জাহান্নামের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে উক্ত পাথর জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছতে ৭০ বৎসর সময় লাগবে。
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, আমরা একদিন হুযুর (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। এমতাবস্থায় আমরা কোন একটি জিনিস পতিত হবার বিকট শব্দ শুনতে পাইলাম। তখন হুযুর (সা.) আমাদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা জান কি? ইহা কিসের শব্দ? আমরা উত্তর করলাম, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। তখন হুযুর (সা.) উত্তর করলেন, আল্লাহ তা'আলা একটি পাথর জাহান্নামের মুখ হতে নিচের দিকে ছুঁড়ে দিলেন, অতঃপর উহা ক্রমাগত ৭০ বৎসর যাবৎ নীচের দিকে ধাবিত হওয়ার পর জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছে। ইহা জাহান্নামের তলদেশে ধাক্কা খাওয়া সেই পাথরের শব্দ। (আততারগীব-৪/৮৬০)