📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 সেদিনের কথোপকথন

📄 সেদিনের কথোপকথন


নিশ্চয়ই আল্লাহ অভিশপ্ত করেছেন কাফিরদের এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন প্রজ্জ্বলিত অগ্নি। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং পাবে না কোনো অভিভাবক বা সাহায্যকারী। যেদিন আগুনে উলটেপালটে দেওয়া হবে তাদের চেহারাগুলো, সেদিন তারা বলবে: হায়! যদি আল্লাহকে মানতাম, যদি রাসুলকে মানতাম।

তারা আরো বলবে : হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের (সিনিয়রদের) আনুগত্য করেছিলাম আর ওরাই আমাদেরকে ভুলপথে নিয়েছে। হে আমাদের রব, ওদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন। আর দিন মহা-অভিসম্পাত। [২]

জালিম (সীমালঙ্ঘনকারী) সেদিন নিজের দুহাত কামড়াতে কামড়াতে বলতে থাকবে : ইশ, আমি যদি রাসুলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম। হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম! সে তো আমাকে ভুলপথে নিয়েছিল, আমার কাছে উপদেশ আসার পরও। আর শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক। [১]

আল্লাহ উত্তর দেবেন: দ্বিগুণ শাস্তি তো প্রত্যেকের জন্য আছে, কিন্তু তোমরাই তো জানো না। [২]

আর তাদের পূর্ববর্তী দল (আগের জেনারেশন) পরবর্তী দলকে (পরের জেনারেশনকে) বলবে (মানে নেতারা অনুসারীদেরকে) : আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই (তোমরাও এমন কোনো সাধু নও)। কাজেই এখন তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করো। [৩]

টিকাঃ
১. এখানে আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষায় ভাবানুবাদ করা হয়েছে, যাতে আমরা আমাদের জীবনের সাথে মিলিয়ে বুঝতে পারি। মূল অনুবাদ দেখতে সংশ্লিষ্ট আয়াত দেখুন।
২. সুরা আহযাব, আয়াত: ৬৪-৬৮
১. সুরা ফুরকান, আয়াত: ২৭-২৯
২. সূরা আরাফ, আয়াত: ৩৮
৩. সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৯

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 তিন প্রকার মানুষ

📄 তিন প্রকার মানুষ


সুরা বাকারা ১-১৫ আয়াতগুলো পড়তে পড়তে মনে হলো, সুবহানাল্লাহ, এখানে তো পুরো মানবজাতিকে ৩ ভাগে ভাগ করেছেন আল্লাহ। আজকের সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কুরআনের একদম প্রথম দিকের এই কটা আয়াত।

সুরা ফাতিহা পুরো সুরাটাই একটা দুআ। আল্লাহর কাছে আমরা প্রতি রাকআতে এই দুআটা করি। এ দুআতে গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস চাই। কিছু চাইবার আগে প্রথমে দেনেওয়ালার প্রশংসা করি। দুনিয়াতেও করি কিন্তু আমরা। মহান রব এটা পছন্দ করেন, তাই কিছু চাইবার আগে আমরা তাঁর প্রশংসা করি। এভাবে বলি-

১. প্রশংসার (যত ধরন হতে পারে) সবটুকু আল্লাহর জন্য, যিনি জগৎসমূহের 'পালনকারী অধিকর্তা'।

২. অসীম দয়ালু (রহমান), পরম করুণাময় (রহিম)।

৩. বিচার দিবসের একচ্ছত্র কর্তৃত্বধারী

মহান রবের প্রশংসার পর তাঁর কাছে আমাদের দুটি কাজের বিবরণ দিচ্ছি। নিজেদের দাসত্ব ও মুখাপেক্ষিতার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিচ্ছি; যেন তিনি খুশি হন, আমাদের দুআ কবুল করেন, আমাদের চাওয়া পূরণ করেন-

৪. আমরা দাসত্ব করি একমাত্র আপনারই এবং একমাত্র আপনার কাছেই সাহায্য চাই।

প্রশংসা হলো, নিজের দুর্বলতা ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যও প্রকাশ করা হলো। এবার তাঁর কাছে চাওয়া হচ্ছে-

৫. আমাদেরকে হিদায়াত দিন সরল পথের

৬. ওই পথের, যে পথে চলেছেন আপনার নিয়ামত-প্রাপ্তগণ

৭. সেই পথ নয়, যে পথ আপনার ক্রোধে পতিতদের, আর ওই পথও নয় যা পথভ্রষ্টদের। (আমিন)

দুআ শেষ। এবার জবাবের পালা। এই দুআর জবাবটাই বাকি কুরআন। আমরা সরল-সোজা পথের হিদায়াত (খোঁজ, দিশা) চেয়েছিলাম। আল্লাহ বলছেন-

সুরা বাকারা

১. আলিফ-লাম-মীম

২. এটিই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটিই হিদায়াত (পথের দিশা) মুত্তাকিদের জন্য।

আল্লাহ আমাদের প্রার্থনা কবুল করেছেন। হিদায়াত চেয়েছিলাম, সিরাতুল মুস্তাকিম চেয়েছিলাম, সরল পথের খোঁজ চেয়েছিলাম। আল্লাহ দিশা দিচ্ছেন। এই কিতাবটিই সেই অবিচল সরল পথের ম্যাপ। কাঙ্ক্ষিত পথনির্দেশ, কিন্তু সবার জন্য নয়। কাদের জন্য? মুত্তাকিদের জন্য। আল্লাহ-সচেতনদের জন্য। যাদের স্রষ্টানুভূতি আছে, তারা বুঝতে পারবে এই ম্যাপ। সবাই নয়। তারা কারা? তারা ১ম গ্রুপ-

৩. যারা অদৃশ্য বিষয়াবলিতে বিশ্বাস করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যে রিজিক-রসদ তাদের দিয়েছি তা থেকে খরচ (দান) করে।
৪. যারা আপনার ওপর এবং আপনার পূর্ববর্তীদের ওপর যা নাযিল করা হয়েছে তা বিশ্বাস করে। আর আখিরাতের প্রতি যারা দৃঢ়বিশ্বাসী!

৫. তারাই রবের নির্দেশিত হিদায়াতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফল।

এরা হচ্ছে প্রথম প্রকার মানুষ। যারা নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনীত সকল অদৃশ্যের খবর বিশ্বাস করে। আগেও আল্লাহ বিধান পাঠিয়েছেন-এটা বিশ্বাস করে। পরকালে বিশ্বাস করে। নিজের জীবনে, পরিবারে, সমাজে ও দেশে সালাত বাস্তবায়নের চেষ্টা-মেহনত করে। যাকাত দেয় এবং সাধ্যমতো দান-খয়রাত করে। এরা প্রথম গ্রুপ, যারা সঠিক দিশাপ্রাপ্ত। এই মহাসত্য কিতাব এদেরই জন্য। সফলতা এদেরই প্রাপ্য।

এবার ২য় গ্রুপ...

৬. যারা (ওপরের বিষয়গুলো) অস্বীকার করেছে, আপনি তাদের সতর্ক করেন আর না করেন; তাদের জন্য সবই সমান (তাদের কিচ্ছু যায়-আসে না)। তারা বিশ্বাস করবেই না।

৭. (যেহেতু তাদের কোনো গা নেই পরকাল, আল্লাহ ইত্যাদির ব্যাপারে) আল্লাহ তাদের অন্তরগুলোয় সিলগালা করে দিয়েছেন, কানগুলোতেও। চোখগুলোর ওপর ফেলে দিয়েছেন পর্দা, আর তাদের জন্য আছে কঠোর আযাব।

চিল্লা থেকে এসে আমি সামনাসামনি আমার এক হিন্দু রুমমেটকে দাওয়াত দিয়েছি। খুব জিগরি সম্পর্ক ছিল। সে কান খাড়া করে আমার প্রতিটি কথা শুনল। আমার দাওয়াহর শেষটা ছিল: দোস্ত, তুই মেধাবী ছেলে। সত্য চিনতে তোর সময় লাগবে না। তুই শুধু নিজের ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা কর। আর ইসলাম নিয়ে পড়। আমি তোকে সব ম্যাটেরিয়াল প্রোভাইড করছি। সে আমাকে উত্তর দিয়েছিল কী জানেন? উত্তর দিয়েছিল: দোস্ত, আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না। এখন আমার প্রচুর টাকা চাই। প্রচুর টাকা। এটা ছাড়া আমি আর কিছু ভাবছি না।

আমার ছোটভাইয়ের এক হিন্দু ফ্রেন্ড একবার আমার বাসায় এসেছিল। ভাই থেকে শুনলাম, সে নিজ ধর্মে অনাগ্রহী, মুসলিমদের প্রতি ঝোঁক আছে। দাওয়াহ করলাম। একটা বই দিলাম। সে নিলো না। বলল ভাই, আমি পাঠ্যবই-ই পড়ি অতিকষ্টে। বই পড়তে আমার ভয়ানক আলসেমি লাগে। আমাকে দিয়েন না। এছাড়া কোনটা সত্য-মিথ্যা, এসব নিয়ে ভাবার সময়ও এই মুহূর্তে আমার নেই।

এবার ওপরের দুটো আয়াত নিয়ে ভাবুন। তারা চাচ্ছেই না এখন মৃত্যু নিয়ে ভাবতে, মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে ভাবতে। এই জীবন যে 'এক খেলায় এক দান', তারা এটাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। মৃত্যুর পরে কিছু আছে কি না, এগুলো নিয়ে ভাবার সময়ই নেই তাদের। কিচ্ছু আসে-যায় না। যাচাই করার ইচ্ছেটুকুও নেই। কেন?

পার্থিব জীবন তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে। [১]

দুনিয়ার চাকচিক্য ভোগ তাদের চোখের সামনে পর্দা হয়ে আছে। আসল বাস্তবতা কী, আদি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ইচ্ছেটুকুও নেই। বহু মুসলিমও আছে এমন। যুবক, বয়স কম। যেন কোনোদিন মরতে হবে না। ধর্ম, মৃত্যু, জীবনের উদ্দেশ্য, কে আমি, কেন এলাম, কোথায় যাব। এগুলো তাদের লিস্টেই নেই। বন্ধু-আড্ডা-গান-রেস্টুরেন্ট-প্রেম-ক্যারিয়ার ছাড়া জীবনে কিছুই ভাবার সময় নেই। যদিও এরা এই গ্রুপে নয়, তবে খাসলত-বৈশিষ্ট্য এদের মতোই।

এজন্য আল্লাহ বলছেন: তাদের অন্তরে-কানে মোহর আঁটা। [২] অন্যত্র আল্লাহ বলছেন: অন্তর থাকলেও তারা ভাবে না, ভাবার সময় নেই। কান আছে শোনে না, চোখ আছে কিন্তু মেলে দেখতে রাজি নয়। [৩] দুনিয়ার মিথ্যা স্বপ্নে বিভোর থাকতে চায়। জোর করে চোখ এঁটে রাখে যেন এই মিথ্যা স্বপ্ন না ভাঙে। তাদের এই অনিচ্ছা, অনীহা, পাত্তা না দেওয়ার দরুন আল্লাহ সিল করে দিয়েছেন।

এবার ৩য় গ্রুপ।

বর্তমান অস্থির সময়ে, এই প্রেক্ষাপটে এই গ্রুপটা আমাদের বুঝতে হবে, চিনতে হবে।

৮. মানুষজনের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা বলে আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, আখিরাতে বিশ্বাস করি, কিন্তু তারা মোটেই 'মুমিন' নয়।

অর্থাৎ আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও অনেকে কিংবা বিশ্বাসের দাবিকারী অনেকে 'বিশ্বাসী' নয়। তারা কী করে?

৯. তারা ধোঁকা দিতে চায় আল্লাহকে ও ঈমানদারদেরকে। কিন্তু মূলত ধোঁকা তারা নিজেকেই দেয়, অথচ তারা টের পায় না।

১০. তাদের অন্তর/বুঝশক্তি হলো অসুস্থ, আল্লাহ আরো বাড়িয়ে দেন সে রোগ। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি, এই মিথ্যাচারের (এই ধোঁকাবাজির) দরুন।

১১. যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা দুনিয়াটাকে নষ্ট কোরো না (বিশৃঙ্খলা কোরো না)। তারা বলে, (আরে বলো কি!) আমরাই তো 'সংস্কারক'।

১২. কক্ষনো নয়, ওরাই সেই বিশৃঙ্খলাকারী, কিন্তু ওরা টের পায় না।

১৩. যখন ওদের বলা হয়, লোকেরা (১ম গ্রুপ) যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে ঈমান আনো। তারা বলে, আমরা কী বোকাদের মতো (মূর্খ পশ্চাৎপদ মোল্লাদের মতো) ঈমান আনব? সাবধান, বরং ওরাই বোকা, কিন্তু ওরা সেটা জানেই না।

১৪. যখন ওরা ঈমানওয়ালাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে: আমরা (তোমাদের মতোই) বিশ্বাস করি। আবার তাদের শয়তানগুলোর (২য় গ্রুপ, কাফির) সাথে গোপন সাক্ষাতে বলে: আমরা তো তোমাদের সাথেই, ওদের (মুমিনদের) সাথে তো কেবল মশকরা করি।

১৫. বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন, তাদের উদ্ভ্রান্ত সীমালঙ্ঘনে ছাড় দিয়ে রেখে।

১৬. এরাই তারা, যারা (হিদায়াত পেয়েও) হিদায়াতের বদলে ভ্রষ্টতা কিনেছে। না তারা তাদের এই ব্যবসায় জিতল, আর না পেল হিদায়াত।

এবার প্রতিটি আয়াতকে আজকের যুগে সেট করুন। আল্লাহ জানাচ্ছেন মুসলিমদের মধ্যেই একদল মুসলিম আসলে মুসলিম নয়। তারা মুসলিমদের কাছে এলে বলে, আমরা মুসলিম, কুরআন পড়ি, তাহাজ্জুদও পড়ি, আরো কত কিছু পড়ি। কুরআন-বিরোধী কিচ্ছু করব না; কিন্তু যখন কাফির-মুশরিকদের সাথে মিটিং করে, তখন বলে: আরে, অমন একটু বলতে হয়। কথার কথা জনগণকে বলে বুঝ দিতে হয়। ওদের সাথে একট তামাশা করলাম। আসলে তো আমরা তোমাদের সাথেই, তোমরা যা বলবে তাই করব। তোমাদের সব সার্থ রক্ষা করব। আল্লাহ এদেরকে সহসাই ধরেন না, ছাড় দেন। প্রচুর ছাড় দেন। এদের শান-শওকত, ক্ষমতা, জুলুমের মেয়াদ, হায়াত আরো বাড়িয়ে দেন। যাতে তারা সীমালঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায়। এরপর ফিরআউনের মতো হঠাৎ করে ধরেন, যখন তাওবার সুযোগটাও থাকে না।

তাদেরকে যদি বলা হয় : তোমরা ১ম গ্রুপের মতো করে ঈমান আনো। পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে ফেলো। কুরআন বাস্তবায়ন করো। তখন তারা বলে: বোকা মূর্খ পশ্চাৎপদ মোল্লাদের মতো ঈমান আনব? মধ্যযুগীয় আইন-কানুন এখন চলে নাকি? যত্তসব মান্ধাতার আমলের চিন্তাভাবনা! আধুনিক হোন, বুঝলেন? অসাম্প্রদায়িক হোন।

যখন বলা হয়, তোমরা আল্লাহর দুনিয়ার শৃঙ্খলা নষ্ট কোরো না। এমন কাজ কোরো না, যাতে তাঁর ব্যবস্থাপনার ভেতর ভারসাম্য নষ্ট হয়। সৃষ্টজগতের শান্তি নষ্ট কোরো না। তারা বলে, আরে আমরাই তো শান্তি বজায় রাখি। সংস্কার করি। নারীমুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন করি। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন করি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করি। টীকা দিই। স্কুলে যৌনশিক্ষা দিই। সন্ত্রাস দমন করি। ভালো সব কাজ তো আমরাই করি। আমেরিকার জেনারেল বলেছিল: উই আর দ্য মুজাডিন (সন্ত্রাসী তালেবানদের আমরা দমন করছি, আমরাই মুজাহিদ)। আল্লাহ বলছেন, কক্ষনো নয়, তারাই আমার সৃষ্টিজগতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র সব শেষ করে দিচ্ছে। আল্লাহ যেখানে যে বিধান রেখে সিস্টেমটা ব্যালেন্স করেছিলেন, সেটাকে তারা নষ্ট করে দিচ্ছে। পুরুষকে বাইরে, নারীকে ঘরে দিয়ে পরিবার- প্রজন্ম ব্যালেন্স করেছিলেন। শেষ। যাকাত, গনিমতকে গরিবের হাতে ব্যাক করে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেছিলেন, সব শেষ। ধনী হচ্ছে আরো ধনী, গরিব হচ্ছে আরো গরিব। হুদুদ আইন (শারিয়া নির্ধারিত শাস্তি) দিয়ে সমাজের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তাও শেষ। অপরাধী জেলে বসে খায়, বের হয়ে আবার অপরাধ করে। এভাবে সবখানে আল্লাহ ব্যালেন্স করে বানিয়ে, সেটা ঠিক রাখার বিধান দিয়ে দিয়েছিলেন। সব তছনছ করে তারা বলছে, আমরাই তো সব ঠিকঠাক করছি, আধুনিক করছি। ধোঁকা কাকে দিচ্ছ? আল্লাহকে? কঠোর আযাবের অপেক্ষায় থাকো।
সমস্যা হলো, এভাবে লিখে ভেঙে ভেঙে একদিন কেউ বলবে না। সবগুলো কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া হবে। আপসকামী, 'আল্লাহর আয়াতকে বিসর্জন দিয়ে দুনিয়া ক্রয়কারী', 'আল্লাহর আয়াত গোপনকারী', 'কিছু মানি কিছু মানি না', 'আয়াত বিকৃতকারী', 'আল্লাহর বিধানের বেলায় কুরআন পশ্চাতে নিক্ষেপকারী'-দের একদিন আমরা আলিম হিসেবে জানব। তাদের সেইসব তাফসির ছাড়া আর কিছু থাকবে না। তাদের ছাড়া অন্যদের ওয়াজ করতে দেওয়া হবে না।

সেদিন আপনাকে একা ডুব দিতে হবে কুরআনে। আজকের মতো অনিশ্চিত এক সময়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইয়াতিম উম্মাতকে কুরআন কী করতে বলেছে, সেটা একমাত্র কুরআনই তখন আপনাকে বলবে। মেহেরবানি করে আরবি শেখাকে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাববেন না। হক আলিমগণের লেখাজোখা এখনো পাওয়া যাচ্ছে। তারা এখনো রয়েছেন। দ্বীন শেখার এটাই শেষ সুযোগ, কুরআন শেখার। যতটুকু পারেন শিখে নেন আর ডুব দেন কুরআনে। আমরা যেন হককে হক হিসেবে, বাতিলকে বাতিল হিসেবে চিনতে পারি এবং বেশি বেশি আমল করতে পারি, আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন।

আর কোনো কথা নেই। ধীরে ধীরে সব আওয়াজ থেমে যাবে। আর কোনো শব্দ, কোনো নাসিহা, কোনো লেখা থাকবে না। ভেঙে খুলে বুঝিয়ে দেওয়ার কেউ থাকবে না। তখন কুরআন আপনার সাথে কথা বলবে। সব মুখ বন্ধ করে দিলেও কুরআনের মুখ আটকে রাখার সাধ্য কারো নেই। কুরআন খুলুন। তরজমা নিন, শর্ট তাফসির নিন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিটি আয়াতকে মেলান। এখন এই ১৪০০ বছর পর এক অস্থির সময়ে কুরআন আপনাকে কী বলতে চায় দেখেন।

টিকাঃ
১. সুরা আরাফ, আয়াত: ৫১
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ৭
৩. সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 সুরা ফীল অবলম্বনে

📄 সুরা ফীল অবলম্বনে


১. আপনি দেখেননি? আপনার রব কী অবস্থা করেছেন হাতিওয়ালা (বাহিনী)-দের?

২. তিনি কি নস্যাৎ করে ছাড়েননি তাদের পরিকল্পনা?

৩. আর তিনি তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠিয়ে দিলেন।

৪. যারা তাদের ওপর পোড়ামাটির প্রস্তর বর্ষণ করল।
৫. ফলে তিনি তাদেরকে (গবাদিপশুর) চিবানো খড়ের মতো (ধ্বংস) করে দিলেন।

আবরাহা চেয়েছিল, সবাই বাইতুল্লাহ রেখে বাইতুল আবরাহায় (আল-কালিস গির্জা) আসুক তাওয়াফ করতে, ভক্তি করতে। আজও যদি কেউ চায় কিতাবুল্লাহ রেখে সবাই আমাদের রচিত পবিত্র কিতাবের (!) আনুগত্য করুক। যদি কেউ আল্লাহর দ্বীন, আল্লাহ-ওয়ালা, আল্লাহর কিতাব, আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত কিছুর বিরুদ্ধে লাগে। হোক সে আধুনিকতম ভয়ালদর্শন সব অস্ত্রধারী (সে যুগে হাতি)। হোক সে সুনিপুণ পরিকল্পনাকারী, তার গোয়েন্দা, তার টেকনোলজি যত উন্নত হোক, আল্লাহ তা ভন্ডুল করে দেবেন। কী দিয়ে? সামান্য জিনিস দিয়ে। যাকে তারা চিন্তায়ও আনেনি। তখনকার পাখি, এখনকার অন্যকিছু। হয়তো আরো ছোট, হয়তো এত ছোট, যে দেখাই যায় না। আল্লাহ অবশ্যই তাদের ধ্বংস করবেন। এমনভাবে করবেন, নিজের অবস্থা দেখে তাদের নিজেরই করুণা হবে, এত অপমানের সাথে, যেভাবে চারাগাছকে গরু এসে চিবিয়ে মুড়িয়ে রেখে যায়।

এভাবে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে পড়ুন। আরবি শিখুন। এত কিছু শিখেছেন এক জীবনে, আরবিটা শিখে ফেলুন। মূর্খ লোকও আরবদেশে ২ মাস থাকলে শিখে ফেলে, আপনি শিক্ষিত হয়ে কেন পারবেন না? কুরআনে না ফিরলে আর কেউ একদিন থাকবে না, যে আপনাকে আল্লাহর ফরজ হুকুমের কথা শোনাবে।

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 সুরা কুরাইশ অবলম্বনে

📄 সুরা কুরাইশ অবলম্বনে


১. যেহেতু কুরাইশদের একটা টান রয়েছে

২. শীত-গ্রীষ্মে (নির্বিশেষে সারাবছরই) ভ্রমণের প্রতি একটা আসক্তি আছে (যেগুলোতে আবার রয়েছে বিপদের ভয়)

৩. সুতরাং,, তারা দাসত্ব করুক এই গৃহের (কাবা) পালনকারী অধিকর্তার

৪. যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং বিপদের ভয়ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ রেখেছেন।

আজকের দিনে এই সুরার অর্থ কী? ১৪০০ বছর আগে কার কী অভ্যেস, এসব গল্প আল্লাহ আমাদের কেন শোনাচ্ছেন? তাতে আমার কী? আজ এখন বসে এই আয়াতগুলো দিয়ে কুরআন আমাকে কী বলতে চায়?

দাওয়াতের কাজে বের হলে, মানুষকে যখন বলা হয়, ভাই আসেন মসজিদে। দুটো দ্বীনের কথা হচ্ছে, সবার শোনা দরকার। কে জানে, একটা কথায় আমাদের হিদায়াত হতে পারে। কাস্টমারবিহীন দোকানে গ্যাঁট মেরে বসে থাকা অনেকের কাছেই শুনতে হয় : ভাই, খালি সালাত পড়লে কি আল্লাহ ঘরে এসে খাবার দিয়ে যাবেন?-এ জাতীয় কথা। আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দ্বীন মানার মধ্যে। হয়তো চোখে দেখছি না, কিন্তু আমার রিজিক বণ্টন করেন আল্লাহ।

রিজিক মানে জীবনোপকরণ, জীবনে যা কিছু লাগে সবই রিজিক। এই সুরায় যেহেতু ক্ষুধায় খাওয়ানোর কথা এসেছে। তাই আজ রিজিকের এক ছোট্ট অংশ 'খাদ্য' নিয়ে কথা বলি। আমরা কামাই করি, টাকা হাতে করে বাজার পর্যন্ত যাই, বেছে তাজা-ভালো-টাটকা জিনিসটা কিনি, পুরোটা নিয়ে বাসা অব্দি আসি, বউ-ঝিরা সেটা রান্না করে লবণ-তৈল-জিরা, গুঁড়ামরিচ সহযোগে, ধোঁয়া-ওঠা খাদ্য সামনে আসে, চপচপ করে রুচি সহকারে সাঁটানো হয়, ভাতঘুম পায়, হজম চলে, পাচকরস তরল সরল করে। প্রয়োজনীয়টুকু গায়গতরে লাগে, অপাচ্য অংশটা মলদ্বার দিয়ে বহিষ্কৃত হয়, যাতে আপনি আরো খেতে পারেন। এই পুরো বিষয়টা 'খাদ্য'- সম্পর্কিত। পুরো বিষয়টা ফাইন টিউনিং না হলে আপনার রিজিক থেকে খাদ্য স্থগিত হয়ে যায়। প্রতিটি স্টেজে যদি সঠিক ক্লিক না হয়, ব্যাটে-বলে না হয়, আপনার কাঙ্ক্ষিত রিজিক আপনার কপালে নেই।

ভেঙে বলি। ধরেন সারাদিন সালাত বাদ দিয়ে দোকানে বসে খুব কামালেন। যদিও আমার পকেট থেকে আপনার পকেটে এক টাকা যাবে কি না, এটা আল্লাহ ঠিক করবেন। একই টাইম দোকান খোলা, প্রতিদিন সমান কাস্টমার আসে না।

» কতজন আমার দোকানে আসবে, আর কতজন পাশের দোকান থেকে সদাই নেবে, এটা কে ঠিক করেন? আল্লাহ।

» দিনের কামাই পকেটে পুরে বাসা পর্যন্ত আসতে পারা বা মানিব্যাগ সহিসালামতে থাকা, এটা কে ঠিক করেন?

» বেগুনের ভেতরে পোকা না থাকা, সতেজ-ভালো পণ্যটা ব্যাগে পুরতে পারা এটা কে নিশ্চিত করবেন?

» ভুলে কোনোটা দোকানেই রেখে এলেন না, এটা কে ঠিক করবেন?

» বউয়ের হাতে নুন-মরিচ-জিরা একটু বেশি-কম পড়বে না, এটা কে ঠিক করেন?

» আমার জ্বরে মুখ তেতো নেই, টনসিলে গলা ব্যথা নেই, গ্যাসে পেট ফেঁপে নেই, রুচি ঠিক যে আছে, এটা কে নিশ্চিত করেন?

» ডাক্তার সাহেব যে আমার খাদ্যের স্বাধীনতা হরণ করেননি এখনো, এই সুস্থতা কে দেবেন?

» আজ সকালে যে বাথরুম হয়ে পেটে জায়গা ফ্রি হলো, এটা কে নিশ্চিত করবেন? যদি কয়েকদিন হাগু না হতো, রুচতো মুখে পোলাও-গোশ?

আল্লাহর হুকুম নষ্ট করে কেবল কামাই করার নামই রিজিক নয়। সব রিজিক আল্লাহ থেকেই আসে। আর-রাজ্জাক ছাড়া আর কে আছেন যিনি এই 'ফাইন টিউনিং' করে বান্দাকে তৃপ্ত করবেন? আলহামদুলিল্লাহ।

কুরাইশদের আল্লাহ সম্বোধন করেছেন। হে কুরাইশ! বিরান মরুর বুকে থাকো তোমরা। মদিনার মতো ফল হয় না, সবজি হয় না। উট-ছাগলে শুকনো পাথর চাটে। কে খাওয়ায় তোমাদের? শীত নেই গরম নেই, সারাটা বছর টইটই করে মরুর বুকে ঘোরো, এ-দেশ ও-দেশ সফর করো। পানি নেই, বিপদাপদ, কত কিছু। কে নিরাপত্তা দেয় তোমাদের? আমি এই কাবা গৃহের রব। অতএব, ইট-পাথর-খেয়ালখুশি সব বাদ দিয়ে আমার ইবাদত করো।

এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরে গেলে আল্লাহ আমাদের জীবনকেও টেনশন-ফ্রি করে দেবেন।

» ক্যারিয়ার-ট্রেন্ড-ফ্যাশন-'লোকে কী বলবে'-খেয়ালখুশি-মানবরচিত বিধিব্যবস্থা সবকিছুর বিপরীতে এক আল্লাহর গোলামিতে ফিরে গেলে মানবতা মুক্তি পাবে।

» পুঁজিবাদের লালসা মেটাতে ইয়েমেন-আফ্রিকায় লাখ লাখ আদমসন্তানের 'না-খেয়ে-মরা' ঠেকাবে অর্থনীতিতে এক আল্লাহর দাসত্ব।

» হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে লক্ষ লক্ষ ফাইলবন্দি মামলা, ঘুরে বেড়ায় দাগি আসামি, ফাঁসির আসামি ক্ষমা পেয়ে আবার করে খুন, ধর্ষণ-ছিনতাই-চুরি। বিচারব্যবস্থায় এক আল্লাহর দাসত্বে ফিরে গেলে প্রতিষ্ঠা পাবে নিরাপত্তা।

অফিসে অফিসে দুর্নীতি, বাজারে ধোঁকাবাজি সব শেষ হবে যদি বিচার ও শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে আসে এক আল্লাহর দাসত্ব।

পরিবার ও সমাজের সব অস্থিরতা দূর হয়ে যাবে যদি পরিবার ও সমাজের কেন্দ্র হয় আল্লাহর আদেশকে কেন্দ্রে রেখে, এক আল্লাহর দাসত্বকে মূলে রেখে।

ব্যক্তি-ব্যবস্থায় (self-management) আল্লাহর দাসত্বে ফিরে গেলে মিলবে 'চ্যান-সুকুন-রাহাত', প্রশান্তি-সুস্বাস্থ্য-সম্মান।

আবার পড়ুন সুরা কুরাইশ। দেখুন তো, কী বলছেন আল্লাহ আপনাকে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00