📄 তাওয়াতুর বা ধারাবাহিকতা
যারা হাদিস নিয়ে ঘাঁটেন বা দ্বীনি বইপত্রের সাথে সম্পর্ক রাখেন, তারা 'মুতাওয়াতির' শব্দটা চেনেন। হাদিসের একটা ক্যাটাগরি হিসেবে চিনি আমরা। যে হাদিস প্রতি জেনারেশনে এত বেশিসংখ্যক রাবি (বর্ণনাকারী) পৃথক পৃথক সূত্রে উল্লেখ করেছেন, যাদের পক্ষে একত্রিত হয়ে বানোয়াট কিছুকে সত্য বলে চালানো অসম্ভব। প্রতি জেনারেশনেই বহুসংখ্যক মানুষ আলাদা আলাদা করে একই হাদিস Pass করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের বহুসংখ্যক মানুষের কাছে। এই হাদিসগুলো শক্তিশালী অকাট্য হাদিস। কারণ—ধরুন, মক্কায় ১০ জন, বাগদাদে ১০ জন, আন্দালুসে ১০ জন, বুখারায় ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন চেইনে একটাই কথা শুনেছেন এবং বলেছেন। সে কথা মিথ্যা হবার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। প্রতিযুগে নির্ভরযোগ্য শ্রোতা ও বর্ণনাকারীদের এই সংখ্যাধিক্যমূলক Continuity-কে বলা হয় 'তাওয়াতুর', আর হাদিসটিকে বলা হয় 'মুতাওয়াতির'। সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহ তার ইকফারুল মুলহিদিন (বঙ্গানুবাদ: ওরা কাফির কেন?) কিতাবে তিন প্রকার তাওয়াতুর উল্লেখ করেছেন।
১. তাওয়াতুরে সনদ :
হাদিসের ক্ষেত্রে কেবল যেটা আলোচনা করলাম। সনদ মানে 'বর্ণনা চেইন'। যেমন ধরুন : নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস, যে আমার ব্যাপারে নিজ থেকে মিথ্যা বলবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম। ৩০ জন সাহাবি এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। মানে পয়লা যুগেই ৩০ জনা। এই তথ্যও এসেছে, ১০০ বা ২০০ জন সাহাবি প্রথম যুগে এই হাদিস বলেছেন। তাদের মুখ থেকে পরের যুগে অসংখ্য ব্যক্তি, এরপর তাদের থেকে আবার অসংখ্য এভাবে প্রতিযুগে কত মানুষ এই একটা কথা শুনেছেন ও বলেছেন? তার মানে এটা যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখেরই কথা এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকে আর? এই হাদিসটি মুতাওয়াতিরের একটা উদাহরণ।
২. তাওয়াতুরে তবকা :
কোনো যুগের লোকজন আগের যুগের লোকজন থেকে কোনো রিওয়ায়াত, আকিদা বা আমল অব্যাহতভাবে শুনতে থাকলে এবং শোনাতে থাকলে তাকে ‘তাওয়াতুরে তবকা’ বলে। এর উদাহরণ হলো—কুরআনে কারিম। মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া, তানজানিয়া থেকে তাতারিস্তান প্রতিযুগে লক্ষ মানুষ তার আগের জেনারেশনের লক্ষ লোক থেকে কুরআন শিখেছে, পড়েছে, পড়িয়েছে, হিফয করেছে করিয়েছে, বর্ণনা করেছে। প্রতিযুগে লক্ষ-হাজার-শত মানুষ। এভাবে যুগ ধরে চলে যান, শেষ অব্দি সাহাবি হয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামে গিয়ে ঠেকবে। সাব্যস্ত করতে হাদিসের মতো স্বতন্ত্র কোনো সনদের প্রয়োজন পড়বে না, সূত্রপরম্পরায় নির্দিষ্ট কোনো রাবিদের নাম নেওয়া লাগে না।
এক আহলে কুরআন-কে ইনবক্সে প্রশ্ন করেছিলাম, হাসিদ মানবেন না, ঠিক আছে। যে কুরআন মানবেন, সেই কুরআন যে প্রামাণ্য এবং আল্লাহর বাণী এ কথা কে বলে দিলো আপনাকে? হ্যাঁ, তার প্রমাণ এই তাওয়াতুর। অনেক ভাই বলে, কুরআন মানব, হাদিস মানব না। কেন? যেই সূত্রে আপনি কুরআন পেয়েছেন, সেই সূত্রে তো হাদিসও পেয়েছেন। বলে কিনা, হাদিস নবিজির জন্মের २०० বছর পর নাকি সংকলিত। মূর্খতার সীমা নেই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবদ্দশাতেই শেষ দিকে হাদিস লেখার অনুমতি দিয়েছেন। যখন কুরআনের বর্ণনাশৈলী ও হাদিসের ভাষা সুস্পষ্টভাবে সাহাবিরা বুঝে গেছেন, আর মিশে যাবার কোনো চান্স নেই, তখন। বহু সাহাবির নিজস্ব হাদিসের ডায়েরি ছিল, যারা লেখাপড়া জানতেন। সেই হাদিসগুলোই তাওয়াতুরের মাধ্যমে পরের জেনারেশনে pass হয়েছে। সহিহ বুখারিকেই বেচারারা প্রথম হাদিসের কিতাব ভেবে রেখেছে।
৩. তাওয়াতুরে আমল বা তাওয়াররুস :
প্রত্যেক যুগে বহুসংখ্যক মানুষ দ্বীনের যেসব বিষয় আমল করেছে নবি-সাহাবিযুগ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে, মাঝে কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায়নি কিংবা নবিযুগ থেকে খবর নেই, হঠাৎ ৫০০ বছর পর এসে কোনো আমল চালু হয়েছে, এমন নয়। মানে নবিযুগ থেকে প্রতিযুগে বহু মানুষ আমলটি করে এসেছে। এইসব বিষয় ও তার হুকুম আহকামও মুতাওয়াতির। যেমন ধরুন : ওযু, মিসওয়াক, কুলি, নাকে পানি, জামাআতে সালাত। নবিজির জীবদ্দশায় সোয়া লক্ষ সাহাবি। লক্ষ সাহাবি তাদের সন্তানকে ওযু শিখিয়েছেন, প্রতিযুগে লক্ষ-কোটি বাবা তাদের সন্তানকে ওযু শিখিয়েছেন। এখন কেউ যদি এসে বলে, ওযু দরকার নেই, সাহাবিরা খেতখামারে কাজ করতেন তাই ওযু করতেন, এসিরুমে যারা থাকে তাদের ওযু লাগে না। নগদে এই লোক কাফির হয়ে যাবে, চাই হাজি-গাজি যা-ই হোক।
মূল আলোচনা শেষ। এখন তিনটে পয়েন্ট আলোচনা থেকে-
∎ দ্বীনের কিছু বিধানের মধ্যে ৩ প্রকারের তাওয়াতুরই আছে। যেমন : ওযুতে মিসওয়াক করা, কুলি করা, নাকে পানি। এর হাদিসও মুতাওয়াতির, বিষয়টাও মুতাওয়াতির, প্র্যাকটিক্যালি কাজটাও মুতাওয়াতির।
■ অনেক ভাই তাওয়াতুরের সংজ্ঞা না জানায় মনে করেন, মুতাওয়াতির হাদিস ও বিষয়ের সংখ্যা বোধ হয় খুব কম। না ভাই, বরং আমাদের শরিয়তে মুতাওয়াতির বিধানের সংখ্যা এত বেশি যার তালিকা করতে মানুষ ব্যর্থ। অধিকাংশ বিধানই তিন প্রকার তাওয়াতুরের কোনো এক প্রকারে অবশ্যই পড়বে। সুবহানাল্লাহ।
■ বহু হাদিস ও হুকুম এমন আছে, আমরা সেটা মুতাওয়াতির হবার খবরই জানি না (যেকোনো এক প্রকার)। পরে দেখা যায় সেটা কোনো না কোনো প্রকার মুতাওয়াতির।
সুতরাং, হুট করে কোনো সুন্নাহ বা হাদিস অস্বীকার করা যাবে না। কারণ ওই জিনিস যদি আসলেই মুতাওয়াতির হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখুন: মুতাওয়াতির সুন্নাহ অস্বীকার করা কুফর। নাসিহা নিই, সতর্ক হই। এখানে সুর ফাতওয়ার না, নসিহার।
» সালাত পড়া ফরজ, একে ফরজ জানাও ফরজ, শেখাও ফরজ। ফরজ বলে বিশ্বাস না করা কুফর। সালাত সম্পর্কে মূর্খ থাকাও কুফর।
» মিসওয়াক করা নবির সুন্নাত, এর ওপর আমল করাও সুন্নত, কিন্তু মিসওয়াককে সুন্নত বলে বিশ্বাস করাটা আবার ফরজ। সুন্নত বলে অস্বীকার করাটা কুফর। অর্থাৎ, মুতাওয়াতির সুন্নাতকে সুন্নাত মনে না করা কুফর। [১]
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১০৬, ১০৭, ১১০, ১২৯১, ৩৪৬১, ৬১৯৭; সহিহ মুসলিম: ৩, ৪, ৩০০৪; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৫১; জামি তিরমিযি: ২২৫৭, ২৬৫৯, ২৬৬০, ২৬৬১, ২৬৬৯, ২৯৫১, ৩৭১৫; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৬, ৩৭; মুসনাদু আহমাদ: ৩২৬, ৫৮৪, ১০৭৫, ১৪১৩, ১৪২৮, ২৬৭৫, ২৯৭৪, ৩০২৪, ৩৬৯৪, ৩৮০১, ৩৮১৪, ৩৮৪৭, ৪১৫৬, ৪৩৩৮, ৬৪৮৬, ৬৫৯২, ৬৮৮৮, ৭০০৬, ৯৩১৬, ৯৩৫০, ১০০৫৫, ১০৭২৮, ১১০৯২, ১১৩৪৪, ১১৩৫০, ১১৪০৪, ১১৪২৪, ১১৫৩৬, ১১৯৪৪, ১২১১০, ১২১৫৪, ১২৭০২, ১২৭৬৪, ১২৮০০, ১৩১০০, ১৩১৮৯, ১৩৩৩২, ১৩৯৬১, ১৩৯৭০, ১৩৯৮০, ১৪২৫৫, ১৫৪৮২, ১৬৫০৬, ১৬৯১৬, ১৭৪৩১, ১৭৭৯০, ১৮১৪০, ১৮২০২, ১৯২৬৬, ২২৫০১, ২৩৪৯৭; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৫৮, ৩৮০, ৫১৪১, ৫২২২, ৭৮১৯, : আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৫৬১৯, ৬১১৩, ৭১৬৯, ৭১৭০, ২০৯৯৩; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৪০৮৪, ৫৮৮০, ৫৮৮১, ৫৮৮৩, ৫৮৮৪; মুসতাখরাজু আবি আওয়ানা: ২২, ৩৩, ৩৫, ৩৮,৫৮, ৬১, ৬৫, ৬৬, ৬৯; সুনানুদ দারিমি: ২৩৭, ২৩৮, ২৪০, ২৪১, ২৪২, ২৪৪, ৫৫৯, ৬১৩; সহিহ ইবনি হিব্বาน: ৩১,, ১০৫২, ২৫৫৫, ৪৮০৪, ৫৪৩৬, ৬২৫৬; মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি: ৩৪০, ৩৬০, ২১৯৭, ২৫৪৩; মুসনাদু আবি ইয়ালা: ৭৩, ২৫৯, ২৬০, ৪৯৬, ৫৮৮, ৬৩১, ৬৬৭, ৬৭৪, ৯৬৬, ১২০৯, ১২২৯, ১৪৩৬, ১৬৩৬, ১৭৫১, ১৮৪৭, ১৯৫২, ২৩৩৮, ২৭২১, ২৯০৯, ৩১৪৭, ৩৭১৬, ৩৯০৪, ৪০০১, ৪০২৫, ৪০৬১, ৪০৭০, ৪০৭৬, ৪০৭৭, ৫২৫১, ৫৩০৭, ৬৮৬৮; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ২৬২৩৮, ২৬২৩৯, ২৬২৪১, ২৬২৪২, ২৬২৪৩, ২৬২৪৭, ২৬২৪৮, ২৬২৫০, ২৬২৫১, ২৬২৫২, ২৬২৫৩, ২৬২৫৪, ২৬২৫৫; মুসান্নাফ আব্দির রাযযাক ১০১৫৭, ১৯২১০; জামিউ মামার ইবনু রাশিদ: ২০৪৯৩, ২০৪৯৪, ২০৪৯৫; মুসনাদু ইসহাক ইবনি রাহওয়াই ২৬৪; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার: ১৪২, ১৪৩। -হাদিসটি মতাওয়াতির
১. ওরা কাফির কেন? আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি রাহিমাহুল্লাহ, পৃষ্ঠা : ৪৫-৪৭ অবলম্বনে।