📄 স্পর্ধা ৪ : অশ্লীলতা
৪.১ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর প্রতি আল্লাহর আযাবের প্যাটার্নটা যদি লক্ষ্য করি। সব জাতিকেই আল্লাহ একটা আযাবে ধ্বংস করেছেন, সিঙ্গেল আযাব।
» কওমে নুহকে মহাপ্লাবন
» আদ জাতিকে প্রবল ঝড়
» সামুদ জাতিকে ফেরেশতার প্রচণ্ড আওয়াজ
» আসহাবুল আইকা-কে মন্দা-খরা
» কওমে সাবাকে বাঁধ ধ্বসে প্লাবন
শুধু একটা জাতিকে ধ্বংস করেছেন ৪টা আযাব একসাথে দিয়ে, করুণভাবে। কওমে লুত।
» দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া [১]
» প্রচণ্ড নিনাদ [২]
» নগরকে উলটে দেওয়া [১]
» পাথর-বর্ষণ [২]
স্পর্ধা তো সবার কমন কারণ। তাহলে কওমে লুত কেন ভাগে এতগুলো পেল। কারণ আমরা সবাই জানি। বিরল প্রজাতির অশ্লীলতার প্রসার। মূলত সমকামিতা ছিল তাদের অশ্লীলতার চরমতম পর্যায়। এর আগের পর্যায়গুলো ছিল তাদের কাছে পানিভাত। স্বাভাবিক যৌনতা যখন সয়লাব, তখন মানুষ আরো বৈচিত্র্য খোঁজে। মানসাঙ্ক বইয়ে বহু আলোচনা করেছি যৌন-মনোবিজ্ঞান নিয়ে। সুতরাং,, অশ্লীলতার সয়লাব আল্লাহর ক্রোধকে বাড়িয়ে তোলে। অশ্লীলতা বিষয়টি চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে, মানুষ চিত্ত-বিনোদনের জন্য নতুন নতুন অশ্লীলতা খুঁজে নেয়। অলরেডি পশ্চিমে সমকামিতা গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে, ফলে আওয়াজ উঠেছে ড্র্যাগকুইনের নামে বালক-কামের। নেদারল্যান্ডে শিশুকামীদের ম্যাগাজিন আছে PAIDIKA নামে। ডার্ক-ওয়েবে টেরাবাইট টেরাবাইট শিশুপর্ন, মৃতদেহের সাথে পর্ন। জার্মানিতে পশুকামীদের সংগঠন নিজেদের অধিকারের জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছে।
৪.২
লিবারেলদের কথাবার্তার মূল ভিত্তি হলো 'সম্মতি'। সম্মতি থাকলে সব বৈধ, ধর্মটর্ম গোনার টাইম নাই। এখন কানাডার আদালত বলছে, 'সম্মতির ব্যাপারটা যেহেতু নেই, অতএব যৌনাঙ্গে প্রবেশ ছাড়া পশুর সাথে সবকিছু করা বৈধ।' পশুকামীরা বলছে, পশুরাও এক বিশেষ ধরনের সম্মতি দেয়, অতএব পশুকাম বৈধ। 'জেন্ডার আইডেন্টিটি'র পুরোধা মনোবিদ জন মানি এক সাক্ষাৎকারে শিশুকামী ম্যাগাজিনকে বলেন : 'বালক যদি সম্মতি দেয়, তবে বালক-কাম হতে পারে দুই প্রজন্মের এক অপূর্ব সম্মিলন।' অথচ, সম্মতি ছাড়া স্বামী কিচ্ছু করতে পারবে না-'বৈবাহিক ধর্ষণ' হবে সেটা। এই হলো সোকল্ড 'সম্মতি'র বাস্তব চেহারা। অন্য কোনোদিনের জন্য সে আলাপ তোলা থাক।
৪.৩ ইসলামি মুআশারাত (ধরে নেন কালচার) এর একদম বেসিক এসেন্স হলো 'হায়া' বা লজ্জাশীলতা। ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক হিন্দু সমাজের অংশ হওয়ায় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের প্রেতাত্মা সওয়ার রয়ে গেছে। শূদ্র-বৌদ্ধ-বৈশ্য-নারী কেউই বাদ যায়নি ব্রাহ্মণ্যবাদের জুলুম থেকে, কেবল অস্ত্রধারী রাষ্ট্রকর্তা ক্ষত্রিয়রা ছাড়া। নারীর প্রতি হিন্দু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আজও ছাড়েনি। সেজন্য ইসলাম যখন 'হায়া'র কথা বলে তখন আমাদের চোখেও লজ্জাশীলা নারীর ব্রীডানত লাজনম্র দৃষ্টিটাই চোখে ভাসে। আমাদের বুলিই হয়ে গেছে, 'লজ্জা নারীর ভূষণ, পুরুষের দূষণ।' যেন পুরুষের লজ্জা থাকতে নেই, পুরুষ হবে বেহায়া-নির্লজ্জ।
ইসলামি এই 'হায়া' সর্বজনীন, নারী-পুরুষ সবারই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ নিজে লজ্জাশীল, তিনি লজ্জাশীলতা পছন্দ করেন।' [১] ইসলাম তার বিভিন্ন বিধানের দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এই 'হায়া'-কে প্রোমোট করে এবং বে'হায়া'পনা-কে দমন করে। যে সমাজ 'হায়া' বা modesty'র ভিত্তিতে নির্মিত সে সমাজ হয় পবিত্র, সুসংহত। আজ আমাদের সমাজে অমুকের মেয়ে তমুকের সাথে ভেগে যাচ্ছে, অমুক প্রবাসীর বউয়ের ঘরে লোকের আনাগোনা, রাস্তাঘাটে ভ্রূণ-নবজাতকের লাশ পড়ে থাকা, পরকীয়ার বলি, প্রেমের বলি, ধর্ষণ, ভিড়ে-বাসে হাতাহাতি, পার্কে-রিকশায় উন্মত্ত নারী-পুরুষ, এগুলো একটা সমাজে 'হায়া' না থাকার প্রমাণ। আর 'হায়া' না থাকা সমাজ যেকোনো সভ্যতার আসন্ন ধ্বংসের আলামত।
৪.৪ সোশ্যাল নৃতাত্ত্বিক Joseph Daniel Unwin MC [২] প্রায় ৫ হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র ও ৫টি বৃহৎ সভ্যতার ওপর একটি পর্যালোচনা করেন। Sex and Culture (1934) বইয়ে তিনি ফলাফল তুলে ধরেন বিস্তারিত আকারে। যেকোনো সমাজ বা সভ্যতার বিকাশ তাদের যৌনসংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। প্রতিটি সমাজ শুরুতে যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে কঠোর থাকে, যতদিন তারা এর ব্যাপারে সংযমী থাকে ততদিন তাদের বিকাশ ও উন্নতি হতে থাকে। সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছে তাদের ভেতরে শুরু হয় অবক্ষয়। যৌনতার ব্যাপারে উদার হতে থাকে। ব্যভিচার-সমকাম-প্রকাশ্য অশ্লীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এগুলো স্বাভাবিক প্র্যাকটিসে পরিণত হয়। ফলে কমে যেতে থাকে সামাজিক শক্তি। অশ্লীলতার প্রসার মানে পতনের বিউগল।
ইসলামি সমাজ-ব্যবস্থার বুনিয়াদ এই 'হায়া' বা লজ্জা। দেখুন কীভাবে ইসলাম 'হায়া'কে বিভিন্ন বিধানাবলির দ্বারা প্রতিষ্ঠা করে-
» বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৃষ্টি অবনত রাখা।
» নারীর খিমার-জিলবাব-নিকাব। পুরুষের ঢিলেঢালা পোশাক। মোদ্দা কথা ইসলামি ড্রেসকোড।
» মাহরাম ও গাইরে মাহরাম মেনে চলা। এই ফরজ বিধান তো আমরা মুসলিমরা অস্বীকারই করে বসি।
» বাবার সামনে মেয়ে, ছেলের সামনে মা, ছেলেরা ছেলেরা, মেয়েরা মেয়েরা কতটুকু খোলা রাখবে কতটুকু ঢেকে রাখবে তার বিধান।
» সতর-আওরাতের বিধান।
» একজন আরেকজনের ঘরে, আরেকজনের বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি গ্রহণের বিধান। উঁকিঝুঁকি নিষিদ্ধ।
» একটা বয়সের পর সন্তানকে পৃথক বিছানায় প্রেরণ।
'হায়া' প্রোমোটিং কিছু বিধান ফরজ, কিছু মুস্তাহাব। আবার কিছু আছে ব্যক্তিগত তাকওয়া ও গাইরাত (আত্মমর্যাদাবোধ)। আবার এমনও কিছু আছে যা শুনতে অ্যাবসার্ডও মনে হতে পারে। এগুলো একটু বলি, তাহলে 'হায়া'র কনসেপ্টটা ক্লিয়ার হবে। 'হায়া'র বাংলাটা ঠিক লজ্জাশীলতায় পরিপূর্ণতা পায় না। অপরে দেখবে বলে সংকোচটাকে আমরা লজ্জা বলি। কিন্তু 'হায়া' অর্থ এটাও, প্লাস আত্মলজ্জা। অনেকটা 'আমি এমন কাজ কীভাবে করি!' স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো পর্দা নেই, তারপরও স্ত্রীর শরমগাহে না তাকানো। গুনাহ হবে, তা কিন্তু না। জাস্ট আত্মলজ্জা। আত্মলজ্জার কয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে-
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হতো সবচেয়ে লজ্জাশীল, অত্যন্ত দুর্বল একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো নিজের ডান হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করেননি। [১]
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে যাই তখন আল্লাহকে লজ্জা করে আমার মাথার কাপড় দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে নিই। [২]
আবু মুসা আশআরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি অন্ধকার কামরায় গোসল করি, এরপরও আল্লাহর লজ্জায় কাপড় পরার আগ পর্যন্ত আমার পিঠ সোজা করি না, ঝুঁকিয়ে কুঁজো করে রাখি। [৩]
৪.৫ মেয়েদের 'হায়া' বললে তো চট করে বুঝে ফেলি আমরা। লজ্জা নারীর ভূষণই নয় কেবল, ইসলামি কালচারে পুরুষেরও অলংকার এই লজ্জা। পুরুষের জন্যও ইসলাম 'হায়া'র কিছু বিধানকে ফরজ করেছে, কিছু মুস্তাহাব, কিছু আদব, আবার কিছু আছে কিছুই না, স্রেফ আত্মলজ্জা। ওপরের হাদিসটা মনে করুন, 'আল্লাহ লজ্জাশীল, ভালোও বাসেন লজ্জাশীলদের।' [৪]
» পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু সর্বাবস্থায় ঢেকে রাখা
» চোখ নামিয়ে চলা
» গাইরে মাহরাম নারীদের এড়িয়ে চলা (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ)
» বেশভূষায়, চুলের কাটে ইসলামি কোড মেনে চলা।
» পুরুষ হয়ে নারীর পোশাক না পরা
» স্বচ্ছ পোশাক না পরা
৪.৬ পারিবারিক কিছু 'হায়া' (আত্মলজ্জা) আছে। এখন মুসলিম পরিবার থেকে 'হায়া' বিদায় নিয়েছে। পুরো পরিবার একসাথে বসে ফরাসি-চুম্বনদৃশ্য উপভোগ করছে। 'লিটনের ফ্ল্যাট'-টাইপ নোংরা ডায়লগ বাপের সাথে মেয়ে বসে দেখে। অভিনেতাদের পোশাকে 'আই অ্যাম পর্নস্টার', 'ব্লো-জব', 'ডগিস্টাইল' লেখা- সবাই মিলে দেখছে। ছেলের সাথে মা বসে দেখে, ভাইবোন একসাথে দেখে। নায়ক নায়িকাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে, থুতনি ওপরে তুলে ধরে এরপর দুটো ফুল একটা আরেকটাকে ঠোকরাচ্ছে-এ ধরনের সিম্বোলিক দৃশ্য তো একদমই স্বাভাবিক হয়ে গেছে আরো আগে। গুনাহের প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া ঈমানহীনতার আলামত। হাদিস আমাদেরকে জানিয়েছে: অন্তরে ঘৃণা করার নিচে ঈমানের আর স্তর নেই। তাহলে এইসব জঘন্য অশ্লীলতার প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া, এগুলোকে নর্মাল মনে হওয়া কীসের আলামত?
৪.৭ যেকোনো খারাপ বিষয় নর্মালাইজ করার কয়েকটা ধাপ আছে। প্রথমে সেটাকে সবাই ঘৃণা করত। এরপর সেটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। এরপর সেটা সিম্প্যাথাইজ করে, ওর কী দোষ। এরপর সেটা নর্মাল হয়ে যায় সমাজে। পর্নো, সমকামিতা এখন আমাদের সমাজে ঠাট্টার স্তরে আছে, একটা সময় ঘৃণার বিষয় ছিল। বিনোদনের নামে (নাটক-সিনেমা) মিডিয়া এই কাজগুলো করে। ছেলে-মেয়ে লিভ-টুগেদার আমাদের সমাজে একটা ঘৃণার জিনিস ছিল। 'লিটনের ফ্ল্যাট' জাতীয় ডায়লগ ও নাটকের দ্বারা এগুলোকে প্রচলিত করে দেওয়া হয়েছে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে। পরের ধাপে সেটা নর্মাল একটা ব্যাপার হয়ে যাবে, বা অলরেডি হওয়ার পথে। সমাজে গ্রহণযোগ্য একটা সম্পর্কে পরিণত অলরেডি হচ্ছে। যেমন ধরুন, প্রেমটা। একসময় আমাদের বাবাদের যুগেও সামাজিকভাবে ঘৃণ্য একটা ব্যাপার ছিল, এখন নাটক-সিনেমার সুবাদে 'কিছুই না' বা 'ছেলের নিজের পছন্দ আছে' হয়ে গেছে। টিভি প্রোগ্রামগুলো আমাদের মনস্তত্ত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একই ধরনের মেসেজ বারবার পেতে পেতে, একই ধরনের সিনারিও বারবার দেখতে দেখতে সেটাকে বাস্তবজীবনেও স্বাভাবিক মনে হয়। 'ও তো জাস্ট অভিনয়'-এভাবে ফু মেরে উড়িয়ে দিলেও ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ঘটনাপ্রবাহ, পটভূমি, সিনারিও, চরিত্রায়ণ, ডায়লগ, পোশাক, ভাষা, ভঙ্গিমা সকল কিছু দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় 'হায়া' বিরুদ্ধ, ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সব জীবনাচরণ-বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, ফাহশা। যেমন করছে ক্লোজ-আপ: কাছে আসার গল্প। একটু একটু করে আমাদের মানসিক প্রতিরোধকে ভেঙে দিয়েছে।
৪.৮ মিডিয়াকর্মীদের মাঝে যারা এখনো নিজেদের মুসলিম ভাবেন, আখিরাতের ওপর, বিচার দিবসে জবাবদিহিতার ওপর এখনো বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য জাস্ট একটা আয়াত কুরআনের। কোনো তাফসির দরকার নেই, এমন দিবালোকের মতো স্পষ্ট আয়াত।
যারা চায় ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাক, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ভোগ করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [১]
যন্ত্রণাদায়ক আযাব দুনিয়াতেও, আখিরাতেও। খেয়াল করলে দেখবেন অধিকাংশ মিডিয়াকর্মী, নাট্যাভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবন সুখের হয় না। ড্রাগ-ডিভোর্স-পরকীয়া-ড্রিংক্স-আত্মহত্যা প্রভৃতির ঘূর্ণাবর্তে এক অস্থির জীবন কাটায় তারা। পত্রপত্রিকাতেই অহরহ আমরা পেয়ে থাকি। এটা তাদের জন্য দুনিয়ার আযাব। এটা এজন্য, তারা মুসলিম সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাত, পশ্চিমের অশ্লীল জীবনাচারকে নর্মালাইজ করত। আর এর চেয়ে শত-সহস্রগুণ শাস্তি তারা ভোগ করবে আখিরাতে।
বহু মুসলিম ভাই, যারা আখিরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, তারাও নিজেদের অজান্তেই এই গর্হিত গুনাহ করে যাচ্ছেন। অনেকের জীবিকা উপার্জনের উপায়ই (ক্যারিয়ার) এটি, অশ্লীলতার প্রসার। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থও হারাম হয়ে যাচ্ছে তাদের অজান্তে। বিনোদনের নামে জনপ্রিয়তা অর্জনের দিকে তাদের ঝোঁক। জনপ্রিয়তা, নিশ্চিন্ত জীবিকা—এগুলো ভেদ করে আল্লাহর আহ্বান কানে আসাই কঠিন হয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের এসব ধোঁকা থেকে আল্লাহ কুরআনে বারবার সতর্ক করেছেন। অনেকে আল্লাহর দয়ায় উঠে আসতে পারেন এই পঙ্কিল জীবন থেকে। আল্লাহর জন্য বিসর্জন দেওয়া জনপ্রিয়তা ও জীবিকা আল্লাহ দুনিয়াতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন শতগুণে, হালালের মাঝে। জুনাইদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহর উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে।
মিডিয়া দ্বারা প্রচারিত বা ইন্সটিলড এই সিনারিওগুলোর প্রয়োগ দর্শকের কাছে বাস্তবজীবনে এভেইলেবল করে দেয় সহশিক্ষা ও সহকর্ম। নাটক-সিনেমার শোনা-দেখা (প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর) ডায়লগ, ভঙ্গিমা, ভাষা, চরিত্রায়ণগুলো ফ্যানরা এখানে প্র্যাকটিস করে। এটাই প্রমাণ করে এগুলো কেবলই নির্দোষ 'অভিনয়' নয়, এগুলোর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। আপনারা বহু ঘটনা পাবেন যেখানে 'ক্রাইম পেট্রোল' জাতীয় প্রোগ্রাম থেকে অপরাধের আইডিয়া নেওয়া হয়েছে। আমি বলতে চাইছি—এগুলো থেকে ‘নেওয়া’ হয় অনেক কিছুই। ‘জাস্ট বিনোদন’ বলার সুযোগ নেই।
৪.৯
‘হায়া’ মানুষের এক্সক্লুসিভ বৈশিষ্ট্য। পশুর কাছে নিজের চোখ আর লজ্জাস্থান সমান। কুকুর তার জিভও বের করে রাখে, তার পায়খানার রাস্তাও বের করে রাখে। সবই তো অঙ্গ, লজ্জার কিছু নেই। ‘লজ্জার কী আছে?’ এটা পশুর মুখে মানায়। বস্তুবাদ বা মানব-ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন (ডারউইনিজম) মানুষকে একটা উন্নত পশু ছাড়া আর কিছু হিসেবে দেখে না। তাই বস্তুবাদীদের কাছে ‘লজ্জা’ অনর্থক একটা শব্দ, কারণ বস্তুবাদ দিয়ে ‘লজ্জা’কে ব্যাখ্যা করা যায় না। অথচ মানবেতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ লজ্জা পেয়েছে, পোশাক পরেছে। লিঙ্গ আর হাতের পার্থক্য করেছে, যদিও দুটোই শরীরের প্রত্যঙ্গ। এটা মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। যে কারণে আমরা মানুষ, যে কারণে আমরা জন্তু নই, এগুলো সেই বৈশিষ্ট্য যা আমাদের মানুষ করেছে। কোনো পশু লজ্জা পায়নি, কোনো পশু ধর্ম পালন করেনি, কবিতা লেখেনি। এজন্য শুধু বস্তুবাদ দিয়ে মানুষকে ও মানুষের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু ভাববাদ দিয়েও যায় না। ড. আলিজা আলি ইজাতবেগোভিচ তার Islam between East and West বইতে চমৎকারভাবে এটা আলোচনা করেছেন। ইসলামই মানুষের সত্তা ও জিজ্ঞাসাগুলোর পরিপূর্ণ উত্তর দেয়। বস্তুবাদ ও ভাববাদের সমন্বয় করেছে ইসলাম, মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে শেষ নির্দেশনা। মানুষ বলেই আমাদের কাছে আমার শার্ট আর জাঙ্গিয়া এক জিনিস নয়, যদিও দুটোই পোশাক। মানুষ বলেই আমরা পিরিয়ডের রক্ত দেখিয়ে রাস্তায় ঘুরতে পারি না। মানুষ বলেই আমরা লিপস্টিক নিজে কিনে, প্যাড বাপকে দিয়ে কেনাতে পারি না। মানুষ বলেই নিজেদের অন্তর্বাস ছাদে মেলে তার ফটো ফেসবুকে আমরা দিতে পারি না। এগুলো যতখানি ‘লোকলজ্জা’র বিষয়, এর চেয়ে বেশি ‘আত্মলজ্জা’র বিষয়। মনুষ্যত্ব মানে ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ‘হিউম্যান’ হওয়া নয়। যদি বিবর্তন সঠিক ধরেও নিই, বস্তুবাদের অবোধ্য এই বিষয়গুলোকেই মনুষ্যত্ব বলে। এগুলোই অন্যান্য জন্তু থেকে আমাদের আলাদা করেছিল, আমাদেরকে 'এইপ' (Ape) থেকে 'ম্যান' করেছিল।
৪.১০
তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, সমাজে বে'হায়া'পনা ছড়ানোর শাস্তি হিসেবে আল্লাহ আযাব পাঠান। সমাজে অশ্লীলতার প্রসারে কিছুই করতে আমরা বাকি রাখিনি। পোশাকের ডিজাইন থেকে নিয়ে নাটক, পত্রিকার বিনোদনপাতা থেকে নিয়ে গানের লিরিক্স-প্রতিটি রাস্তাকে ব্যবহার করে আমাদের সমাজে 'হায়া'কে নষ্ট করা হয়েছে। আজ দেখেন চারিদিকে। মুসলিম-সন্তানদের আমরা 'হায়া' শেখাতে পারিনি। পাশ্চাত্য সভ্যতার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ওদের মতো আমাদের সমাজ থেকেও 'হায়া', শ্লীলতা, মডেস্টি, ডিসেন্সি শব্দগুলো উঠে গেছে। যা গোপনে করা হতো, তা প্রকাশ্যে করা হয়। সমকামিতার মতো ঘৃণার্হ কাজকে 'অধিকার' হিসেবে দাবি করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার পশ্চিমা সংজ্ঞা গ্রহণ, নারীবাদ ও এলজিবিটি আন্দোলনের নামে নির্লজ্জতাকে মূলধারায় আনা, স্কুলে যৌনশিক্ষার নামে 'হায়া' ভাঙানো, নাটক-সিনেমা-বিনোদনের নামে পারিবারিক 'হায়া' ধ্বংস করা—ধ্বংসের কিছুই কি বাকি রেখেছি আমরা?
ফিরে যাই শুরুতে। লুত আলাইহিস সালামের কওমে তিনিই ছিলেন সংখ্যালঘু, এমনকি তার স্ত্রীও ছিল অশ্লীল-মতাদর্শী। আজ আপনি সমাজে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কিছু বলে দেখেন, আজ এই লেখায় যা বললাম এগুলো বলে দেখেন। আপনিও টের পাবেন আপনি সংখ্যালঘু। আপনার স্ত্রী-বোন-বেস্টফ্রেন্ডও আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। লুত আলাইহিস সালামের জাতি তাকে শাসিয়েছিল : 'বেশি পবিত্র সেজেছ, বেশি পবিত্র হতে চাও?' আপনার জাতিও আজ আপনাকে শাসাবে : 'বেশি হুজুর হয়েছো, উগ্রবাদ ভালো না, টিভি-সিনেমা দেখে না তো জঙ্গিরা।' তাই যদি হয়, প্রবল পরাক্রমশালী সর্বশক্তিমান আল্লাহর রোষ কেন আসবে না, সেইটে আমাকে বুঝায়ে বলেন।
'করোনা' কেন শুধু, খেল তো সবে শুরু। এ তো একটা, পিকচার আভি বাকি হ্যায়। তবু যদি আমরা কেউ কেউ ফিরে আসি। তবু যদি আমাদের কারো হুঁশ হয়। আসেন আমরা আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাওবা করি, আত্মীয়-বন্ধুদের পক্ষ থেকে করি, পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে তাওবা করি। ফিরে আসি। إن عذابك بالكفار মুলহিক্ক’। আয় মালিক, আপনার আযাব কাফিরদের জন্য। আল্লাহ, আমরা আপনাকে চিনি, আপনার আযাবকে ভয় করি। আল্লাহ, আমরা ঈমান এনেছি, আমাদের মাফ করে দেন। আমরা আর ফিরে যাব না আগের অন্ধকার জীবনে। এবারের মতো আমাদের মাফ করে দেন।
টিকাঃ
১. সুরা কমার, আয়াত: ৩৭
২. সুরা হিজর, আয়াত: ৭৩
১. সুরা হুদ, আয়াত : ৮২
২. সুরা হিজর, আয়াত : ৭৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪-হাদিসটি সহিহ
২. মৃত্যু: ১৮৯৫-১৯৩৬
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৫০৬১
২. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ১১২৭; আয-যুহদ, আহমাদ বিন হাম্বল : ১১৬৮; শুআবুল ঈমান : ৭৩৩৭; তাযিমু কাদরিস সালাহ: ৮২৮; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪
৩. আয-যুহদ, আহমাদ ইবনু হাম্বল : ১১০০; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা : ১১২৮; তাযিম কাদরিস সালাহ : ৮৩৯; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬০-শারয়ি সম্পাদক
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪। -হাদিসটি সহিহ
১. নিশ্চয় যারা ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। [সুরা নূর, আয়াত : ১৯]