📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ২য় স্পর্ধা : পুঁজিবাদ

📄 ২য় স্পর্ধা : পুঁজিবাদ


আমাদের স্পর্ধা উদাসীনতার স্পর্ধা। আমি উদাসীন, আই ডোন্ট কেয়ার। এটাই প্রবল পরাক্রমশালী অধিকর্তা আল্লাহর তেজ, প্রাবল্য, বিক্রমের সাথে স্পর্ধা। তিনি বলছেন একটা কথা আমাকে আর আমি উদাসীন। ‘আল্লাহকে বের করে দেওয়া’ কথাটা খুব খারাপ শোনাচ্ছে, না? জি, এতটা দম্ভ আর অহংকারই আমরা দেখিয়েছি আমাদের রবের সাথে, আমাদের পালনকর্তা দয়াময় আল্লাহর সাথে। এবার চলে যাচ্ছি আমাদের দ্বিতীয় সামষ্টিক স্পর্ধায়।

পুঁজিবাদ একটা জীবনব্যবস্থা (দ্বীন)। ইসলাম যেমন জীবনের প্রতিক্ষেত্রে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ইসলাম ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-বাজার-আদালত-রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, সুস্পষ্ট নীতিমালা দেয়। তেমনি পুঁজিবাদকে যদিও আমরা ‘অর্থব্যবস্থা’ হিসেবে পড়ি, কিন্তু ফাংশনালি এটা একটা দ্বীন। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সবকিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করে, নীতিমালা গড়ে দেয়। আজ আমরা নীতিমালা হিসেবে সর্বক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছি, মানে আমাদের দ্বীন পুঁজিবাদ। اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللّٰهِ الْاِسْلَامُ - ইন্নাদ্দীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম। [১] আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীনকে (ইসলাম) ছেড়ে দিয়েছি আমরা। এটা আমাদের দ্বিতীয় স্পর্ধা।

* হবস, স্পিনোজা, কান্টসহ অধিকাংশ এনলাইটেনমেন্ট দার্শনিকদের মতে।

২.১ একটি ইতিহাস দেখে নিই। শিল্পবিপ্লবের আগে সারা দুনিয়া চলত কুটিরশিল্পে বা ক্ষুদ্রশিল্পে। যখন ইঞ্জিন আবিষ্কার হলো, তৈরি হলো বৃহৎ শিল্প। একব্যক্তির পক্ষে বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা কঠিন হতো, কারণ একজনের হাতে এত পুঁজি বা মূলধন থাকে না। ডেভলপ হলো ব্যাংক-ব্যবস্থা, যেখানে সমাজের সবাই টাকা রাখত। সমাজের সকলের পুঁজি একত্রিত হয়ে চলে যেত ওই পুঁজিপতির হাতে ঋণ হিসেবে, যাতে সে বড় কারখানা বানাতে পারে। কারখানা থেকে এদের প্রচুর লাভ করতে হবে। ব্যাংকের সুদ, শ্রমিকের মজুরি দিয়েথয়ে তাকে আরো লাভ করতে হবে যাতে সে আরো মেশিন কিনতে পারে, ব্যবসা আরো বড় করতে পারে। এই ক্রমাগত পুঁজি বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে পুঁজিবাদ (Capital-ism) শব্দের উদ্ভব। কিন্তু বর্তমানে পুজিবাদ কেবল ব্যাবসায়িক প্রবণতায় সীমাবদ্ধ নয়। পুজি বৃদ্ধির প্রবণতা আজ প্রতিটি মানুষের শিরায় শিরায় প্রবহমান। যেকোনো মূল্যে 'পুজির আমদানি' আজ আমাদের আরাধ্য দেবতা। Money is the second God.

ইসলাম ও পুঁজিবাদের পার্থক্যটা বুঝতে হবে আমাদের। বিশ্বের একক হচ্ছে মানুষ। মানুষের সংজ্ঞা কেমন, তার ওপর নির্ভর করবে পুরো সিস্টেমটা কেমন। ইসলামের মতে মানুষ একটি আধ্যাত্মিক (spiritual) জীব। মানুষের উন্নতি মানে তার আধ্যাত্মিক উন্নতি। একজন মানুষ যত আধ্যাত্মিক ভাবে উন্নত হতে থাকবে তত সে তার অস্তিত্বের পূর্ণতায় পৌঁছাবে। তার অস্তিত্বই 'আবদ' হিসেবে (দাস বান্দা)। আমি জীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্য। [১] অর্থাৎ একজন 'আবদ' বা দাস হিসেবে আপনি যত পারফেকশনের দিকে যাবেন, তত আপনি আপনার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেন, মানবজনম তত সার্থক হতে থাকবে। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু 'ইবাদতের জন্য' অংশটুকুর অর্থ করেছেন 'লিয়া'রিফুন' (চেনার জন্য)। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁকে চেনার জন্য। যত চেনা হবে, তত আমার আবদিয়্যাত (দাসত্ব) পরিপূর্ণ হবে, আধ্যাত্মিকভাবে আমার উন্নতি হবে। মানুষের এই সংজ্ঞাটুকুর ওপর ইসলামের পুরো সিস্টেমটা দাঁড়ানো।

মানুষের সাথে আল্লাহর এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক 'ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র'-র ইসলামি সংজ্ঞা দেয়। আমার প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে আল্লাহ আছেন। রাষ্ট্র-প্রজা, বিচারক-বাদী, ক্রেতা-বিক্রেতা, সেবাদাতা-গ্রহীতা, উৎপাদক-ভোক্তা, চুক্তির দুইপক্ষ, পাড়াপড়শি, কাফির-মুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, ভাই-বোন, এমনকি বাথরুমে একেলা বাসায় একাকী আমি। প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে আল্লাহ রয়েছেন, এই বোধের জন্ম দেয় আবদিয়ত দাসত্বানুভূতি। ফলে প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে এক আশ্চর্য জবাবদিহিতা-সংযম-পরোপকার এবং ওহিভিত্তিক নীতিমালা মেনে চলার প্রবণতা ব্যক্তিকে জীবনের প্রতি কদমে 'ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাড়না' যোগায়। কারণ তাকে তো আবদিয়্যাতের পূর্ণতা দ্বারা আধ্যাত্মিক উন্নতি করে রবকে খুশি করতে হবে। এটা একটা সফটওয়্যার যা 'বাথরুম থেকে রাষ্ট্র' সবখানে তাকে জুলুম করতে বাধা দেবে, ইনসাফ ও কল্যাণ সাধনে তাড়িয়ে বেড়াবে।

২.২

পুঁজিবাদের চোখে মানুষ কেবল একজন ‘ভোক্তা’। তার ভোগের চাহিদা সীমাহীন। অর্থনীতির সংজ্ঞা কী পড়েছিলাম, মনে আছে? অসীম চাহিদা ও সীমিত সম্পদের মাঝে ব্যালেন্স। পুঁজিবাদ প্রোডাক্ট বানাবে আর বিক্রি করে মুনাফা কামাবে, তার পুঁজি বাড়বে। তার চোখে মানুষ একজন ভোক্তা (consumer/customer), আপনি যত ভোগ করতে আগ্রহী হবেন, তার প্রোডাক্ট তত বিক্রি হবে। অতএব সে বলবে : মানবজনমের সার্থকতা হলো ভোগে। কয়দিনই বাঁচবা, ভোগ করে নাও, 'YOLO= you only live once', 'জী ভারকে জীও, কাল হো না হো'-মিডিয়া, বিনোদনের নামে এগুলো শেখানো পুঁজিবাদের কাজ। এটা করতে গিয়ে তো ধর্ম আধ্যাত্মিকতাকে বাতিল করতে হবে। সেজন্য লাগবে নাস্তিকতা-বিবর্তন-নারীবাদ-মানবতাবাদ। তাকে টিকে থাকতে হলে মানুষকে পরিপূর্ণ ভোক্তা বানাতে হবে, সংযমের সব বেড়া উঠিয়ে দিতে হবে।

পুঁজিবাদ আপনার মধ্যে ভোক্তা হবার অনুপ্রেরণা দেয়, আপনার ভোক্তা হওয়াকে যারা বাধা দেয় (ধর্ম), তাদেরকে ভিলেন বানিয়ে ছাড়ে। তার চোখে আপনি যত বড় ভোক্তা, আপনার তত উন্নতি হয়েছে। গাড়ি-বাড়ি-ফোন-পোশাক-গগলস-খাবার। যত দামি যত ফ্যাশনেবল, যত বেশি, জীবনে আপনি তত সার্থক। সমস্ত হাতিয়ার (মিডিয়া, অ্যাডুকেশন) ইউজ করে এমনভাবে আপনার মাথায় পুঁজিবাদ ঢুকিয়েছে যে, আপনিও একজন উন্নত ভোক্তা হবার চেষ্টায় দৌড়াচ্ছেন। যেকোনো মূল্যে আপনাকে একজন পাক্কা ভোক্তা হতে হবে, এজন্য চাই প্রচুর টাকা। আপনার বাবা যে লেভেলের ভোক্তা ছিলেন, তার চেয়ে আপনাকে ওপরের লেভেলের ভোক্তা হতে হবে। সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি-ভূমিদস্যুতা-খুন-প্রতিজ্ঞাভঙ্গ-অর্থনৈতিক সব অপরাধ করে হলেও ভোগের তাড়না মেটানো চাই।

» এখানে ব্যক্তি পুঁজিবাদী (ভোগের তাড়না, ক্যারিয়ারিস্টিক, অপরাধপ্রবণ)
» পরিবার পুঁজিবাদী (চাকরিজীবী মা; সন্তানের চোখে ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’)
» সমাজ পুঁজিবাদী (অপরাধ ও কলহপ্রবণ, আত্মকেন্দ্রিক)
» বাজার পুঁজিবাদী (মাপে কম, মজুতদারি, সিন্ডিকেট, প্রতারণা)
» অর্থনীতি পুঁজিবাদী (সুদি, খেলাপি, একমুখী প্রবাহ, পাচার)
রাষ্ট্র পুঁজিবাদী (পুঁজিপতি নিয়ন্ত্রিত সরকার, পুঁজিপতিরাই মন্ত্রী, পুঁজিপতি-বান্ধব পলিসি)

প্রতিটি মানুষ পুঁজিবাদী। যেকোনো মূল্যে পুঁজি বাড়ানো চাই। দুটো সিস্টেমের কনট্রাস্ট দেখেন। একটা জুলুম করতে বাধা দিচ্ছিল। আরেকটা জুলুম করতে উৎসাহিত করছে। ফলে আবশ্যিকভাবে প্রতিটি মানুষ কিছু না কিছু জুলুম করছে। এই পুজিবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে আমরা দ্বীন হিসেবে নিয়েছি। 'টাকা' আমাদের আরাধ্য দেবতা, যার বেদীতে আর সব কিছুকে এমনকি আল্লাহ-রাসুলের আদেশ-নিষেধকেও বলি দিয়ে চলেছি। এ দীনের কালিমা হচ্ছে-লা ইলাহা ইল্লাল মাল (অর্থসম্পদ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই)। এ এক আজব দ্বীন, যেখানে মাজলুম নিজেও জালিম। আবার জালিম নিজেও মাজলুম।

২.৩ বর্তমান পৃথিবী যে সিস্টেম বা অর্ডার অনুযায়ী চলছে তা হলো 'পুঁজিবাদ-ভোগবাদ' সিস্টেম। এটা এমন দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা যা গ্রহণ করে নিয়েছে কাফির-মুমিন সবাই। খুব ভেবে দেখুন, পুরো সিস্টেমটায় ওপরের স্তরগুলো লাভবান হচ্ছে। এখানে-

■ অর্থব্যবস্থা: পুঁজিবাদ (ওয়ান-ওয়ে)। অর্থনৈতিক কাঠামোয় যে যত ওপরে তার দিকে লাভের স্রোত, পুঁজির স্রোত। উৎপাদক/মজুর/শ্রমিক নিম্নতম মজুরি পায়। ভোক্তা থেকে অর্জিত লাভের বলতে গেলে কিছুই পৌঁছে না উৎপাদকের হাতে। ধনী হয় আরো ধনী, গরিব থেকে হয় আরো গরিব।

■ ব্যক্তিব্যবস্থা ও পরিবার-ব্যবস্থা: জানি না শব্দটা বানালাম কি না। সেলফ-মোটিভেশন বা সেলফ-অপারেটিং-সিস্টেম। এটা আজ 'ক্যারিয়ারিজম'। ধর্ম শব্দের অর্থ যদি (√ধৃ+অনট) হয় ধারণ করা, তবে মুমিন-কাফির নির্বিশেষে প্রত্যেকের অসাম্প্রদায়িক ধর্ম হলো ক্যারিয়ারিজম। আরো ওপরের স্তরের ভোক্তা হবার প্রতিযোগিতা। সবাই এই ক্যারিয়ারিজম টার্গেট রেখে ভাবে। সন্তানকে ক্যারিয়ারের জন্য বড় করে। অধিক হারে ভোক্তা তৈরি, বেশি ভোক্তা তৈরি। দুনিয়া উপভোগই লক্ষ্য।

■ সমাজ-ব্যবস্থা : ইনডিভিজুয়ালিস্টিক। সেলফ-সেন্টার্ড। অনেক প্রয়োজন সমাজ মেটাত। সমাজের সেই ফাংশনগুলো শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আর পজিবাদ সেগুলোর ভার নিয়েছে। ভোক্তা বাড়িয়ে নিয়েছে। যাকাতের জায়গা নিয়েছে মাইক্রোসুদ। মেহমানদারি ও পান্থশালার জায়গা নিয়েছে হোটেলব্যবসা। আত্মীয়-সংযোগের স্থান নিয়েছে ক্যাবল-টিভি। একাকী জীবন, একক পরিবার।

বিচার-ব্যবস্থা: ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা। কোর্ট-উকিল নিয়োগ-জেল। ডেটের পর ডেট, আরো ডেট। আইনের প্যাঁচ, প্রচুর ফাঁক। পুঁজিপতিদের জন্য কোনো আইন নেই। ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে। ফাঁসির আসামির রাষ্ট্রীয় ক্ষমার ব্যবস্থা। বাদীর কোনো say নেই। বিস্তারিত এবং বিকল্প পরে কোনোদিন আলোচনায় আসবে হয়তো।

রাষ্ট্রব্যবস্থা: সেক্যুলার সোকল্ড 'গণ'তন্ত্র। যেখানে সরকার বসাবে পুঁজিপতিরা (গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকরা)। Government by the পুঁজিপতি, of the পুঁজিপতি, for the পুঁজিপতি। নির্বাচনের ডোনার পুঁজিপতিরা, মন্ত্রিপরিষদে পুঁজিপতিরা, পলিসি হবে তাদের পক্ষে। অর্থপাচার, ঋণখেলাপি, কালোটাকা, শেয়ার বাজারে পুঁজিলোপাট সব তারা করবে। কিন্তু তাদের পুতুল তাদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করবে না। ৩য় বিশ্বের পুঁজিপতিদের ওপরে আছে ১ম বিশ্বের পুঁজিপতিরা (Buyer-রা, সাপ্লায়াররা)। তারা বসায় তাদের সরকার।

২.৪

এবার তাকান। পুরো সিস্টেমটার পুঁজির স্রোত ওপরে। শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি দেওয়া, ভোক্তাদের ঠকানো, পণ্যে ভেজাল, বেশিদিন টেকানোর জন্য বিষ দেওয়া, জমিতে যথেচ্ছা সার কীটনাশক থেকে নিয়ে ঘুষ-দুর্নীতি সবকিছুর মূলে এই সিস্টেমটা। প্রতি স্তরে যে বসে আছে, সে চাচ্ছে আরো লাভ করতে, আরো পুঁজি বাড়াতে। যে করেই হোক। ব্যবসায়ী হিসেবে সে চাচ্ছে আরো পুঁজি বাড়াতে আর একই লোক ভোক্তা হিসেবে চাচ্ছে আরো বেশি ভোগ করতে, আরো ওপরের স্তরের ভোক্তা হতে।

ফলে প্রতিটি ব্যক্তি নিজে নিচের স্তরে জুলুম করছে পুঁজি বাড়ানোর জন্য। আর ওপরের স্তরের কাছে সেই ব্যক্তিটিই মাজলুম হচ্ছে ভোক্তা হিসেবে। পুরো সিস্টেমটাই নষ্ট। যে মাছওয়ালা আমাকে ১০০ গ্রাম কম দিলো কেজিতে, সেও পাইকারের কাছে মণে ৩ কেজি কম পেয়েছে। বেশি লাভ সবাই করতে চাচ্ছে। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে। যে অফিসার আজ আমার থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিল, ওই চেয়ারে থাকতে তাঁকেও কোথাও ঢেলে আসতে হচ্ছে মাসে কিছু। একটা সিস্টেম। উন্নত বিশ্ব হয়তো এভাবে নিচ্ছে না, কিন্তু ভিন্ন কোনোভাবে এই পুঁজির একমুখী স্রোত চালু রেখেছে।

দুটো উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। আমি সবার সাথে খুব গল্প করি। ইমার্জেন্সিতে রোগী না থাকলে ওয়ার্ডবয় থেকে নিয়ে স্থানীয় পরিচিতমুখ সবার সাথে। তো রাতে অন-ডিউটি পুলিশ কনস্টেবল এস-আই, উনাদের সাথেও খুব খাতির গপসপ করতাম। একদিন একজন কনস্টেবল এসে দুঃখের কথা শোনালেন: স্যার, আসামি ধরতে অনেকগুলো সোর্স পালি। তাদের টাকা না দিলে ইনফো দেবে না। আবার এদের পালার জন্য বরাদ্দ পাই না। কিংবা বরাদ্দ থাকে, সিনিয়ররা নিয়ে নেয়। ওদিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আসামি ধরতে না পারলে প্রোমোশনের স্কোর তুলতে পারব না। বেতনও বাড়বে না, জিনিসপত্রের যা দাম। তো কী আর করব, নিরপরাধ লোক ধরে থানায় দিতে হয়, যাতে আমার কোটা পূরণ হয়। প্রোমোশন যেন পাই। দেখেন সিস্টেমে পড়ে বেচারা জুলুম করতে বাধ্য হচ্ছে নিরপরাধের ওপর, সে নিজেও মাজলুম।

শেষ উদাহরণ। আমার চেম্বার। রোগী এসেছে। লাইপোমা জাতীয় টিউমার। অনেকগুলো, একটা আবার ব্যথা, দ্রুত বড় হচ্ছে। আমি দেখেটেখে বললাম: ব্যথা না হলে সমস্যা ছিল না। যেহেতু ব্যথা, আর বড় হচ্ছে, অপারেশন করাতে হবে বড় ডাক্তার দিয়ে। অপারেশনের পর আবার বায়োপসি করতে হবে খারাপ কিছু কি না বুঝতে। আপনি কুষ্টিয়া মেডিকেলে যাবেন, যত দ্রুত সম্ভব। আর কিছু ব্যথার ওষুধ লিখে দিলাম। ৩০০ টাকা ভিজিট দিলো, বের হয়ে বাইরে গিয়ে বসল। যে ডায়াগনস্টিকে বসি, তার মালিক এসে বলল: স্যার, রোগীটাকে পাঠিয়েছে পল্লীচিকিৎসক, তাকেও একটা পার্সেন্টিজ দেওয়া লাগে। আপনি যদি টেস্ট না দেন, তাহলে ওকে ওর পার্সেন্টিজ দেবো কোত্থেকে? পকেট থেকে? সে রোগীটাকে আবার পাঠাল ভেতরে, অশিক্ষিত গ্রাম্য কৃষক। খচখচ করে লিখলাম রক্ত পরীক্ষা আর প্রস্রাব পরীক্ষা। আর ভিজিটে পাওয়া আমার ৩০০ টাকা দিলাম ফিরিয়ে। সিস্টেম।

পুলিশ-ডাক্তারদের সবাই গালি দেয়। দোষ করলে তো দেবেই। কিন্তু সিস্টেমটাকে কেউ গালি দেয় না। সিস্টেমটাকে কেউ বদলাতে চায় না। সিস্টেমের কর্তারা এসে ঠ্যাঙাবে বলে? প্রতিটা পুলিশ-ডাক্তার-শিক্ষক সেবার ব্রত পোষণ করে। মনের গভীরে। কিন্তু এই লোভী সিস্টেম তাকে করে তোলে লোভী-কঠোর। যে সিস্টেম ঘুষখোর তৈরি করে, কসাই তৈরি করে, ফাঁকিবাজ তৈরি করে, সে সিস্টেমের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। সমাধান ইসলাম নিয়ে এসেছিল, হুজুরদের কথাটা একবার বসে শুনুন। একবার বসেন। কী অর্থনীতি, বিচার-ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপদ্ধতির কথা তারা বলে, একটাবার শোনেন। নাকি জানেন? জানেন বলেই শোনেন না? কার স্বার্থে? জুলুম করা যাবে না আর, তাই?

কত মাজলুমের চোখের পানি আজ করোনা ডেকে এনেছে, আমফান (ঘূর্ণিঝড়ের নাম) ডেকে এনেছে, সেটা কেউ বলবে না। সবাই বলবে নিম্নচাপ হয়ে আমফান এসেছে। মুমিন এটা বলবে না। মুমিন বলবে, 'মাজলুমের দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল, এমনকি মাজলুম কাফির হলেও।' [১] কত মজুরের বেদামি ঘাম, কত কয়েদির উতলা মন, কত সর্বসান্ত বাদীর দীর্ঘশ্বাস, কত সেবাগ্রহীতার তিতে মন, কত চোখের পানি এই সিস্টেমের কারণে আল্লাহর দরবারে নালিশ করেছে বছরের পর বছর। পুরো দুনিয়ায়। আল্লাহর ক্রোধ না আসার কোনো কারণই তো আমি খুঁজে পাই না। আপনারা কীভাবে এত নিশ্চিন্ত, এত প্রশান্ত?

টিকাঃ
১. সুরা আলি ইমরান, আয়াত: ১৯
১. সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
১. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৪৯; সহিহ ইবন হিব্বান: ৮৭৫; মাকারিমুল আখলাক, তাবারানি: ১২৭; জামিউল মাসানিদ, ইবনুল জাওযি, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৫৬

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 স্পর্ধা ৩ : বক্রতা, ইলহাদ

📄 স্পর্ধা ৩ : বক্রতা, ইলহাদ


৩.১ শরিয়তে মুহাম্মাদিকে আল্লাহ তাআলা সুরক্ষিত রেখেছেন। কীভাবে সংরক্ষিত রেখেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে আরেক মুজিযা। কী এক আশ্চর্য উপায়ে আল্লাহ—

» তাঁর কালামকে সংরক্ষিত রেখেছেন (একেবারে নবিজির জীবদ্দশা থেকে আজ অব্দি একটানা, লিখিত-মুখস্থ দুভাবেই, প্রতি প্রজন্মেই বহুসংখ্যক লোকের দ্বারা)

» কালামের ভাষাকে সংরক্ষণ করেছেন (আরবি ভাষা দুনিয়ার সবচেয়ে 'অ-তরল' মানে কম পরিবর্তিত ভাষা, বিস্তারিত সামনে ইনশা আল্লাহ)

» কালামের ব্যাখ্যাকে সংরক্ষণ করেছেন (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস। এটাও তাঁর জীবদ্দশা থেকে একটানা লিখিত প্লাস মুখস্থ, দুটোই। উদাহরণটা একটু কেমন হয়, তারপরও বলি। গার্মেন্টস থেকে প্রোডাক্ট ডেলিভারির সময় একটাতে খুঁত পেলে যেমন পুরো লট বাতিল, একেবারে তেমন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে আল্লাহর রাসুলের মুখের কথা)

» কালাম যার ওপর নাযিল হয়েছে, তার জীবন-চরিতকে সংরক্ষণ করেছেন। (হাদিসের মতো করেই)

» কালামের বুঝ সংরক্ষণ করেছেন। এই কালামের প্রথম ছাত্ররা (সাহাবিরা) যা বুঝেছেন, যেভাবে প্রয়োগ শিখেছেন শিক্ষক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে, সেটাকেও একইভাবে সংরক্ষণ করেছেন। (সাহাবিদের কথাও হাদিসের মতো করেই সংরক্ষণ করা হয়েছে)

প্রথম ছাত্রদের, তাদের ছাত্র, তাদের ছাত্র, তাদের ছাত্র এভাবে যারা যারা প্রতি জেনারেশনে তার কালাম-ব্যাখ্যা-বুঝ-ইতিহাস বহন করে পরের জেনারেশনে পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের সবার জীবন-চরিত, চরিত্র বিশ্লেষণ সংরক্ষণ করেছেন। এই শাস্ত্রের নাম 'আসমাউর রিজাল'।

ধরুন, নবিজির একটা হাদিস হঠাৎ করে উদয় হলো, যেটা কেউ শোনেনি। তখনই সেটার উৎস খোঁজা হবে, কোন চেইনে (সনদ) কথাটা এলো। এই বর্ণনা চেইন ছাড়া একটা লাইনও পাত্তা পাবে না। নতুন করে কিছু ঢুকবার সুযোগই নেই। না আয়াত, না হাদিস, না নতুন কোনো ব্যাখ্যা, না নতুন কোনো বুঝ। এরপর দেখা হবে, সেই চেইনে কারা কারা আছে, এই হাদিসের বাহক কারা প্রজন্মান্তরে। তাদের জীবনী সংরক্ষিত। বের করা হবে ৮০ ভল্যুম, ৬০ ভল্যুমের সেসব বই। এমন কেউ যদি চেইনে থাকে যার নাম এসব বইয়ে নেই (মাজহুল বা অজ্ঞাত), নগদে সে হাদিস বাদ। এমন কেউ যদি থাকে যার নামে অবজেকশন আছে, হয় সে মিথ্যুক, নয় হাদিস জালের হিস্ট্রি আছে, সাথে সাথে বাদ। কী কী খুঁত থাকলে হাদিস বাদ হবে, কী খুঁত থাকলে বাদ হবে না তবে ওজন কমে যাবে, দালিলিক গুরুত্ব কমে যাবে। সবখানে সে হাদিস ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। আকিদা প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের হাদিস, বিধান প্রমাণের জন্য কোন লেভেল, উৎসাহ-সতর্কবাণী প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের, ইতিহাস প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের বর্ণনা নেয়া যাবে, এগুলো সব নীতিমালা করা রয়েছে।

সুতরাং, মনে চাইল একটা হাদিস বানিয়ে ঢুকোলাম, একটা হাদিস মনমতো ব্যাখ্যা মেরে দিলাম, কুরআনের আয়াতের একটা ব্যাখ্যা দিয়ে দিলাম, সে সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলাম হলো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (কুরআন), নবিজি যা বুঝেছেন, যা বুঝিয়েছেন (হাদিস)। সাহাবিরা যা বুঝেছেন-বুঝিয়েছেন (আছার)। এটুকু যুগের সাথে সম্পর্কিত নয়। কুরআনকে সেই যুগে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে বুঝেছেন, সাহাবিদের যেমনিভাবে বুঝিয়েছেন। আজকের যুগে সেই কুরআনকে আমরা অন্যভাবে বুঝব, সে সুযোগ নেই। কাণ্ডজ্ঞান (আকল) খাটিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হাদিস, সুপ্রতিষ্ঠিত বুঝ বাইপাস করার সুযোগ নেই।
৩.২ ইসলাম এসে যুগকে বদলায়, দেশকে বদলায়, মানুষকে বদলায়। যুগভেদে, দেশভেদে, জাতিভেদে ইসলাম বদলায় না। বর্তমান যুগের খাপে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসকে জোর করে সেট করতে চায় অনেকে, কুরআনের আয়াত সেট করতে চায়। এটা ভুল। বর্তমান যুগের খাপে কুরআন-হাদিস বসবে না, বরং কুরআন-হাদিসের উপযোগী খাপে যুগকে বসতে হবে। এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। সাইয়িদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন: 'ইসলাম ছাড়া বাকি সব জাহিলিয়্যাত। শুধু ইসলামই সভ্যতা।' আসলেই তাই। আজ আমরা জাহিলিয়াত পরম ধরে ইসলামকে ভ্যারিয়েবল নিচ্ছি।

» অবিবাহিত নারী-পুরুষ সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তার থেকে সাহাবিদের 'কোর্টশিপ' টেনে বের করছি।

» ব্যভিচারকে, সমকামকে, শিরককে একটা 'অধিকার' ধরে নিয়ে বলছি 'ইসলাম মানবাধিকারের কথা বলে'।

» জন্ম-নিয়ন্ত্রণকে আগে অপরিহার্য ধরে নিয়ে এরপর সাহাবিদের আযল (withdrawl method)-এর দলিল খুঁজে বের করছি। তাই বলে জায়িয হয়ে গেল জন্মনিয়ন্ত্রণের অবৈধ উদ্দেশ্যে পিল খাওয়া, যার রয়েছে ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতি? জায়িয হয়ে গেল চামড়ার ইমপ্ল্যান্ট, ভ্যাসেকটমির মতো সৃষ্টি-বিকৃতি?

» জাতিরাষ্ট্র সীমাকে সর্বৈব পরম ধরে নিয়ে লজিক দিচ্ছি, জন্মনিয়ন্ত্রণ না করলে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাবে যে!

গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-মানববাদ-ব্যক্তিস্বাধীনতার খাপ অপরিবর্তনীয়। খালি আল্লাহর কালাম-রাসুলের হাদিস-সাহাবিদের বুঝই মোয়া? আল্লাহকেই আমার চিন্তার মাঝে পশ্চিমা জীবনধারার মাঝে ফিট হতে হবে? নইলে আল্লাহ বাদ, কিংবা ব্যাখা করতে হবে ঘুরিয়ে যাতে কোনোমতে আল্লাহকে রাখা যায়, কিন্তু কাফিরদের সামনে ছোট হতে না হয়। আল্লাহর রাসুলকেই আমার মানসিকতায় সেট হতে হবে? নইলে হাদিস বাদ। আমি আত্মসমর্পণ করছি, নাকি আল্লাহ-রাসুলকে বলছি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে? (নাউযুবিল্লাহ)

কুরআনের আয়াত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের বক্র অর্থ করা এক বিশেষ প্রকারের কুফর। এমন অর্থ করা যা গত ১৪০০ বছরে আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত ওই বিধানের চেহারা-অর্থ-বুঝ-সুরূপ থেকে ভিন্ন। একে বলে 'ইলহাদ', যে করবে তাকে বলা হবে মুলহিদ। আমার আপনার মনের কাছে ইসলাম আত্মসমর্পণ করে না। হয় আমি এগুলোর কাছে নিজেকে মিটিয়ে দেবো, নচেৎ ইসলাম আমাকে সশব্দে ডিজ-ঔন করবে। এবং আমার বাকি সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে। হাশর হবে কাফিরদের সাথে। [১]

আল্লাহ বলেন- إِنَّ الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي آيَاتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَا أَفَمَن يُلْقَىٰ فِي النَّارِ خَيْرٌ أَم مَّن يَأْتِي آمِنًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করে তারা আমার অগোচর নয়। যে ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে সে শ্রেষ্ঠ; নাকি যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে (ও প্রশান্ত চিত্তে) উপস্থিত হবে সে (শ্রেষ্ঠ)? তোমাদের যা ইচ্ছা কর; তোমরা যা করো, তিনি তার প্রত্যক্ষদর্শী। [২]

ইসলাম 'আধুনিক' 'সর্বাধুনিক' ধর্ম। এর মানে এটা নয় যে, বর্তমান আধুনিকতার সংজ্ঞায় ইসলামকে আসতে হবে। আপনার আমার আধুনিকতার খাপে ইসলামকে ঢুকতে হবে। বরং 'ইসলাম আধুনিক' মানে হলো ইসলামটাই আধুনিক, বাকি সব অ-আধুনিক। আমাকে আপনাকেই আমাদের অজ্ঞতা থেকে ইসলামের আধুনিকতায় এসে ঢুকতে হবে। ইসলাম কোনো সমঝোতায় আসে না। আর যদি আমি আমার কুফরি চিন্তা-চেতনা, জাহিলি জীবন-বোধ, জুলুমি-সিস্টেমের সাথে ইসলামের সমঝোতা চাই, তবে যেন আমি জেনে নিই, 'লাকুম দ্বীনুকুম ওয়া লিয়া দ্বীন।' আমার জাহিলি দ্বীন, আমার সোকল্ড আধুনিক চিন্তাচেতনার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম ইসলামের মতো, আমি আমার মতো।

ইসলাম নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

ইসলাম ছাড়া বাকি সকল ধর্মই ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা। কেবল কিছু আকিদা-বিশ্বাস আর সচ্চরিত্র গঠনমূলক নীতিকথা। আর কিছু সামাজিক প্রথা-পার্বণ। নওমুসলিম প্রফেসর জেফ্রি লাং তার ‘আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্ব’ বইয়ে খুব চমৎকার তুলে ধরেছেন, যদিও আমি বইটা গণহারে পড়তে নিষেধ করি, ‘আমেরিকান ইসলাম’ সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা পড়তে পারেন। তিনি বলেন, অমুসলিমদের দাওয়াহর ক্ষেত্রে আমরা যে স্ট্র্যাটেজি নিই (তাদের ধর্মগ্রন্থ ভুল প্রমাণ, ইসলামকে সঠিক প্রমাণ, বিতর্ক) এসব সংশয়ীদের ক্ষেত্রে কাজ করে (সংশয়ী খ্রিষ্টান বা সংশয়ী হিন্দু)। কিন্তু প্র্যাকটিসিং হিন্দু বা প্র্যাকটিসিং খ্রিষ্টান এগুলোতে প্রভাবিত হয় না। কারণ তাদের কাছে তাদের ধর্মগ্রন্থের ভুলগুলোর (যেগুলো আমরা খণ্ডন করি) একটা ব্যাখ্যা আছে। যেমন আছে আমাদের কাছে, যখন ওরা কুরআনের কোনো ভুল ধরে। বরং প্র্যাকটিসিং অমুসলিম খোঁজে ‘আধ্যাত্মিকতা’। বর্তমান ধর্মে আমি ‘এক ধরনের’ আধ্যাত্মিক খোরাক পাচ্ছি, ইসলাম আমাকে কী এমন বেশি দেবে? সুতরাং, ইসলামের আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরতে হবে আমাদের। এটুকু ওনার বক্তব্য। দেখুন, তারা ধর্ম বলতে যেমন ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা (personal spirituality) বোঝে, ইসলামকেও সেটাই বোঝে। তখনই প্রশ্ন ওঠে ইসলামের আইন নিয়ে, জিহাদ নিয়ে, অনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা নিয়ে। একটা ব্যক্তিক অধ্যাত্মবাদের (ধর্মের) ভেতর এত কিছু থাকবে কেন?

ইসলাম নিয়ে খুব কমন একটা আপত্তি আসে পশ্চিমা-মনস্কদের তরফ থেকে। ইসলাম তো তরবারির জোরে ছড়িয়েছে। এই আপত্তির বিপরীতে হীনম্মন্য মুসলিমরা চিঁটি করে জবাব দেবার চেষ্টা করে : আরে না না, ইসলাম মানেই তো শান্তি। ইসলামে তো যুদ্ধই নেই, যা হয়েছে সব ডিফেন্সিভ। অফেন্সিভ যুদ্ধ ইসলামে নেই। ব্লা ব্লা... প্রশ্নটা ওঠে ঠিক এই কারণে কেবলই যেটা বললাম। ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের মতো কেবল ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা আর নৈতিকতার সমষ্টি ভাবার কারণে। কেমন ধর্ম (পড়ুন ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা), যে যুদ্ধ করে দেশ জয় করে? কেমন ধর্ম (নৈতিকতা) যে, তরবারি ধরে চাপিয়ে দেয়? ইসলাম সম্পর্কে নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের অধিকাংশ প্রশ্ন এই ‘আলাদা করতে না পারা’ থেকে উৎসারিত। আর আমাদের ভুল হলো আমরাও তাদের কোণা থেকেই জবাব দেবার চেষ্টা করি। ফলে হয় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’।
খেয়াল করলে দেখবেন, উপমহাদেশে হিন্দুরা বিদেশিদের করা সকল ব্যবস্থা দ্রুততার সাথে আত্মীকরণ করে ফেলেছে। মুসলিমদের আনুগত্য মেনেছে, ব্রিটিশদের আনুগত্য মেনেছে। দ্রুততম সময়ে। তেমন কোনো বৃহৎ প্রতিবন্ধক ছাড়াই। এসব ধর্ম ব্যক্তিক নীতিমালা দেয়, বেশির চেয়ে বেশি সমাজনীতি দেয়। ফলে অর্থনীতি, বিচারনীতি, রাষ্ট্রনীতিতে একটা শূন্যতা রয়ে যায়। সেটা যখন যে পাত্রে তখন সে পাত্রের আকার ধারণ করে। এই শূন্যতাটাই ইউরোপে জমিদার-রাজাদের যথেচ্ছাচারিতার কারণ, খ্রিষ্টবাদের ব্যর্থতার কারণ। যে শূন্যতাটা পূরণ করতে জন্ম হয়েছে সেক্যুলার লিবারেল হিউম্যানিজমের ভিত্তিতে নয়া রাষ্ট্রচিন্তার। ইসলামের বিষয়টা ভিন্ন, ভিন্নরকম ভিন্ন। ইসলামের এই শূন্যস্থানটা নেই। তাই ব্রিটিশ আইন, বিচার, অর্থ, রাষ্ট্রকাঠামো হিন্দুরা যত সহজে মেনেছে, মুসলিমরা তত সহজে পারেনি। প্রায় ১০০ বছর লেগেছে সাধারণ মুসলিমদের পোষ মানাতে। ইসলামের স্বতন্ত্র পরিপূর্ণ বিচার-বাজার-রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে নতুন আনা কোনো ব্যবস্থা টক্কর লাগবেই।

টিকাঃ
১. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪০ এর তাফসির, তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন দ্রষ্টব্য
২. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪০

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 স্পর্ধা ৪ : অশ্লীলতা

📄 স্পর্ধা ৪ : অশ্লীলতা


৪.১ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর প্রতি আল্লাহর আযাবের প্যাটার্নটা যদি লক্ষ্য করি। সব জাতিকেই আল্লাহ একটা আযাবে ধ্বংস করেছেন, সিঙ্গেল আযাব।

» কওমে নুহকে মহাপ্লাবন

» আদ জাতিকে প্রবল ঝড়

» সামুদ জাতিকে ফেরেশতার প্রচণ্ড আওয়াজ

» আসহাবুল আইকা-কে মন্দা-খরা

» কওমে সাবাকে বাঁধ ধ্বসে প্লাবন

শুধু একটা জাতিকে ধ্বংস করেছেন ৪টা আযাব একসাথে দিয়ে, করুণভাবে। কওমে লুত।

» দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া [১]

» প্রচণ্ড নিনাদ [২]

» নগরকে উলটে দেওয়া [১]

» পাথর-বর্ষণ [২]

স্পর্ধা তো সবার কমন কারণ। তাহলে কওমে লুত কেন ভাগে এতগুলো পেল। কারণ আমরা সবাই জানি। বিরল প্রজাতির অশ্লীলতার প্রসার। মূলত সমকামিতা ছিল তাদের অশ্লীলতার চরমতম পর্যায়। এর আগের পর্যায়গুলো ছিল তাদের কাছে পানিভাত। স্বাভাবিক যৌনতা যখন সয়লাব, তখন মানুষ আরো বৈচিত্র্য খোঁজে। মানসাঙ্ক বইয়ে বহু আলোচনা করেছি যৌন-মনোবিজ্ঞান নিয়ে। সুতরাং,, অশ্লীলতার সয়লাব আল্লাহর ক্রোধকে বাড়িয়ে তোলে। অশ্লীলতা বিষয়টি চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে, মানুষ চিত্ত-বিনোদনের জন্য নতুন নতুন অশ্লীলতা খুঁজে নেয়। অলরেডি পশ্চিমে সমকামিতা গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে, ফলে আওয়াজ উঠেছে ড্র্যাগকুইনের নামে বালক-কামের। নেদারল্যান্ডে শিশুকামীদের ম্যাগাজিন আছে PAIDIKA নামে। ডার্ক-ওয়েবে টেরাবাইট টেরাবাইট শিশুপর্ন, মৃতদেহের সাথে পর্ন। জার্মানিতে পশুকামীদের সংগঠন নিজেদের অধিকারের জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছে।

৪.২

লিবারেলদের কথাবার্তার মূল ভিত্তি হলো 'সম্মতি'। সম্মতি থাকলে সব বৈধ, ধর্মটর্ম গোনার টাইম নাই। এখন কানাডার আদালত বলছে, 'সম্মতির ব্যাপারটা যেহেতু নেই, অতএব যৌনাঙ্গে প্রবেশ ছাড়া পশুর সাথে সবকিছু করা বৈধ।' পশুকামীরা বলছে, পশুরাও এক বিশেষ ধরনের সম্মতি দেয়, অতএব পশুকাম বৈধ। 'জেন্ডার আইডেন্টিটি'র পুরোধা মনোবিদ জন মানি এক সাক্ষাৎকারে শিশুকামী ম্যাগাজিনকে বলেন : 'বালক যদি সম্মতি দেয়, তবে বালক-কাম হতে পারে দুই প্রজন্মের এক অপূর্ব সম্মিলন।' অথচ, সম্মতি ছাড়া স্বামী কিচ্ছু করতে পারবে না-'বৈবাহিক ধর্ষণ' হবে সেটা। এই হলো সোকল্ড 'সম্মতি'র বাস্তব চেহারা। অন্য কোনোদিনের জন্য সে আলাপ তোলা থাক।
৪.৩ ইসলামি মুআশারাত (ধরে নেন কালচার) এর একদম বেসিক এসেন্স হলো 'হায়া' বা লজ্জাশীলতা। ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক হিন্দু সমাজের অংশ হওয়ায় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের প্রেতাত্মা সওয়ার রয়ে গেছে। শূদ্র-বৌদ্ধ-বৈশ্য-নারী কেউই বাদ যায়নি ব্রাহ্মণ্যবাদের জুলুম থেকে, কেবল অস্ত্রধারী রাষ্ট্রকর্তা ক্ষত্রিয়রা ছাড়া। নারীর প্রতি হিন্দু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আজও ছাড়েনি। সেজন্য ইসলাম যখন 'হায়া'র কথা বলে তখন আমাদের চোখেও লজ্জাশীলা নারীর ব্রীডানত লাজনম্র দৃষ্টিটাই চোখে ভাসে। আমাদের বুলিই হয়ে গেছে, 'লজ্জা নারীর ভূষণ, পুরুষের দূষণ।' যেন পুরুষের লজ্জা থাকতে নেই, পুরুষ হবে বেহায়া-নির্লজ্জ।

ইসলামি এই 'হায়া' সর্বজনীন, নারী-পুরুষ সবারই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ নিজে লজ্জাশীল, তিনি লজ্জাশীলতা পছন্দ করেন।' [১] ইসলাম তার বিভিন্ন বিধানের দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এই 'হায়া'-কে প্রোমোট করে এবং বে'হায়া'পনা-কে দমন করে। যে সমাজ 'হায়া' বা modesty'র ভিত্তিতে নির্মিত সে সমাজ হয় পবিত্র, সুসংহত। আজ আমাদের সমাজে অমুকের মেয়ে তমুকের সাথে ভেগে যাচ্ছে, অমুক প্রবাসীর বউয়ের ঘরে লোকের আনাগোনা, রাস্তাঘাটে ভ্রূণ-নবজাতকের লাশ পড়ে থাকা, পরকীয়ার বলি, প্রেমের বলি, ধর্ষণ, ভিড়ে-বাসে হাতাহাতি, পার্কে-রিকশায় উন্মত্ত নারী-পুরুষ, এগুলো একটা সমাজে 'হায়া' না থাকার প্রমাণ। আর 'হায়া' না থাকা সমাজ যেকোনো সভ্যতার আসন্ন ধ্বংসের আলামত।

৪.৪ সোশ্যাল নৃতাত্ত্বিক Joseph Daniel Unwin MC [২] প্রায় ৫ হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র ও ৫টি বৃহৎ সভ্যতার ওপর একটি পর্যালোচনা করেন। Sex and Culture (1934) বইয়ে তিনি ফলাফল তুলে ধরেন বিস্তারিত আকারে। যেকোনো সমাজ বা সভ্যতার বিকাশ তাদের যৌনসংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। প্রতিটি সমাজ শুরুতে যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে কঠোর থাকে, যতদিন তারা এর ব্যাপারে সংযমী থাকে ততদিন তাদের বিকাশ ও উন্নতি হতে থাকে। সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছে তাদের ভেতরে শুরু হয় অবক্ষয়। যৌনতার ব্যাপারে উদার হতে থাকে। ব্যভিচার-সমকাম-প্রকাশ্য অশ্লীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এগুলো স্বাভাবিক প্র্যাকটিসে পরিণত হয়। ফলে কমে যেতে থাকে সামাজিক শক্তি। অশ্লীলতার প্রসার মানে পতনের বিউগল।

ইসলামি সমাজ-ব্যবস্থার বুনিয়াদ এই 'হায়া' বা লজ্জা। দেখুন কীভাবে ইসলাম 'হায়া'কে বিভিন্ন বিধানাবলির দ্বারা প্রতিষ্ঠা করে-

» বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৃষ্টি অবনত রাখা।

» নারীর খিমার-জিলবাব-নিকাব। পুরুষের ঢিলেঢালা পোশাক। মোদ্দা কথা ইসলামি ড্রেসকোড।

» মাহরাম ও গাইরে মাহরাম মেনে চলা। এই ফরজ বিধান তো আমরা মুসলিমরা অস্বীকারই করে বসি।

» বাবার সামনে মেয়ে, ছেলের সামনে মা, ছেলেরা ছেলেরা, মেয়েরা মেয়েরা কতটুকু খোলা রাখবে কতটুকু ঢেকে রাখবে তার বিধান।

» সতর-আওরাতের বিধান।

» একজন আরেকজনের ঘরে, আরেকজনের বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি গ্রহণের বিধান। উঁকিঝুঁকি নিষিদ্ধ।

» একটা বয়সের পর সন্তানকে পৃথক বিছানায় প্রেরণ।

'হায়া' প্রোমোটিং কিছু বিধান ফরজ, কিছু মুস্তাহাব। আবার কিছু আছে ব্যক্তিগত তাকওয়া ও গাইরাত (আত্মমর্যাদাবোধ)। আবার এমনও কিছু আছে যা শুনতে অ্যাবসার্ডও মনে হতে পারে। এগুলো একটু বলি, তাহলে 'হায়া'র কনসেপ্টটা ক্লিয়ার হবে। 'হায়া'র বাংলাটা ঠিক লজ্জাশীলতায় পরিপূর্ণতা পায় না। অপরে দেখবে বলে সংকোচটাকে আমরা লজ্জা বলি। কিন্তু 'হায়া' অর্থ এটাও, প্লাস আত্মলজ্জা। অনেকটা 'আমি এমন কাজ কীভাবে করি!' স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো পর্দা নেই, তারপরও স্ত্রীর শরমগাহে না তাকানো। গুনাহ হবে, তা কিন্তু না। জাস্ট আত্মলজ্জা। আত্মলজ্জার কয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে-

উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হতো সবচেয়ে লজ্জাশীল, অত্যন্ত দুর্বল একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো নিজের ডান হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করেননি। [১]

আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে যাই তখন আল্লাহকে লজ্জা করে আমার মাথার কাপড় দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে নিই। [২]

আবু মুসা আশআরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি অন্ধকার কামরায় গোসল করি, এরপরও আল্লাহর লজ্জায় কাপড় পরার আগ পর্যন্ত আমার পিঠ সোজা করি না, ঝুঁকিয়ে কুঁজো করে রাখি। [৩]

৪.৫ মেয়েদের 'হায়া' বললে তো চট করে বুঝে ফেলি আমরা। লজ্জা নারীর ভূষণই নয় কেবল, ইসলামি কালচারে পুরুষেরও অলংকার এই লজ্জা। পুরুষের জন্যও ইসলাম 'হায়া'র কিছু বিধানকে ফরজ করেছে, কিছু মুস্তাহাব, কিছু আদব, আবার কিছু আছে কিছুই না, স্রেফ আত্মলজ্জা। ওপরের হাদিসটা মনে করুন, 'আল্লাহ লজ্জাশীল, ভালোও বাসেন লজ্জাশীলদের।' [৪]

» পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু সর্বাবস্থায় ঢেকে রাখা
» চোখ নামিয়ে চলা
» গাইরে মাহরাম নারীদের এড়িয়ে চলা (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ)
» বেশভূষায়, চুলের কাটে ইসলামি কোড মেনে চলা।
» পুরুষ হয়ে নারীর পোশাক না পরা
» স্বচ্ছ পোশাক না পরা
৪.৬ পারিবারিক কিছু 'হায়া' (আত্মলজ্জা) আছে। এখন মুসলিম পরিবার থেকে 'হায়া' বিদায় নিয়েছে। পুরো পরিবার একসাথে বসে ফরাসি-চুম্বনদৃশ্য উপভোগ করছে। 'লিটনের ফ্ল্যাট'-টাইপ নোংরা ডায়লগ বাপের সাথে মেয়ে বসে দেখে। অভিনেতাদের পোশাকে 'আই অ্যাম পর্নস্টার', 'ব্লো-জব', 'ডগিস্টাইল' লেখা- সবাই মিলে দেখছে। ছেলের সাথে মা বসে দেখে, ভাইবোন একসাথে দেখে। নায়ক নায়িকাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে, থুতনি ওপরে তুলে ধরে এরপর দুটো ফুল একটা আরেকটাকে ঠোকরাচ্ছে-এ ধরনের সিম্বোলিক দৃশ্য তো একদমই স্বাভাবিক হয়ে গেছে আরো আগে। গুনাহের প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া ঈমানহীনতার আলামত। হাদিস আমাদেরকে জানিয়েছে: অন্তরে ঘৃণা করার নিচে ঈমানের আর স্তর নেই। তাহলে এইসব জঘন্য অশ্লীলতার প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া, এগুলোকে নর্মাল মনে হওয়া কীসের আলামত?

৪.৭ যেকোনো খারাপ বিষয় নর্মালাইজ করার কয়েকটা ধাপ আছে। প্রথমে সেটাকে সবাই ঘৃণা করত। এরপর সেটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। এরপর সেটা সিম্প্যাথাইজ করে, ওর কী দোষ। এরপর সেটা নর্মাল হয়ে যায় সমাজে। পর্নো, সমকামিতা এখন আমাদের সমাজে ঠাট্টার স্তরে আছে, একটা সময় ঘৃণার বিষয় ছিল। বিনোদনের নামে (নাটক-সিনেমা) মিডিয়া এই কাজগুলো করে। ছেলে-মেয়ে লিভ-টুগেদার আমাদের সমাজে একটা ঘৃণার জিনিস ছিল। 'লিটনের ফ্ল্যাট' জাতীয় ডায়লগ ও নাটকের দ্বারা এগুলোকে প্রচলিত করে দেওয়া হয়েছে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে। পরের ধাপে সেটা নর্মাল একটা ব্যাপার হয়ে যাবে, বা অলরেডি হওয়ার পথে। সমাজে গ্রহণযোগ্য একটা সম্পর্কে পরিণত অলরেডি হচ্ছে। যেমন ধরুন, প্রেমটা। একসময় আমাদের বাবাদের যুগেও সামাজিকভাবে ঘৃণ্য একটা ব্যাপার ছিল, এখন নাটক-সিনেমার সুবাদে 'কিছুই না' বা 'ছেলের নিজের পছন্দ আছে' হয়ে গেছে। টিভি প্রোগ্রামগুলো আমাদের মনস্তত্ত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একই ধরনের মেসেজ বারবার পেতে পেতে, একই ধরনের সিনারিও বারবার দেখতে দেখতে সেটাকে বাস্তবজীবনেও স্বাভাবিক মনে হয়। 'ও তো জাস্ট অভিনয়'-এভাবে ফু মেরে উড়িয়ে দিলেও ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ঘটনাপ্রবাহ, পটভূমি, সিনারিও, চরিত্রায়ণ, ডায়লগ, পোশাক, ভাষা, ভঙ্গিমা সকল কিছু দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় 'হায়া' বিরুদ্ধ, ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সব জীবনাচরণ-বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, ফাহশা। যেমন করছে ক্লোজ-আপ: কাছে আসার গল্প। একটু একটু করে আমাদের মানসিক প্রতিরোধকে ভেঙে দিয়েছে।

৪.৮ মিডিয়াকর্মীদের মাঝে যারা এখনো নিজেদের মুসলিম ভাবেন, আখিরাতের ওপর, বিচার দিবসে জবাবদিহিতার ওপর এখনো বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য জাস্ট একটা আয়াত কুরআনের। কোনো তাফসির দরকার নেই, এমন দিবালোকের মতো স্পষ্ট আয়াত।

যারা চায় ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাক, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ভোগ করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [১]

যন্ত্রণাদায়ক আযাব দুনিয়াতেও, আখিরাতেও। খেয়াল করলে দেখবেন অধিকাংশ মিডিয়াকর্মী, নাট্যাভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবন সুখের হয় না। ড্রাগ-ডিভোর্স-পরকীয়া-ড্রিংক্স-আত্মহত্যা প্রভৃতির ঘূর্ণাবর্তে এক অস্থির জীবন কাটায় তারা। পত্রপত্রিকাতেই অহরহ আমরা পেয়ে থাকি। এটা তাদের জন্য দুনিয়ার আযাব। এটা এজন্য, তারা মুসলিম সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাত, পশ্চিমের অশ্লীল জীবনাচারকে নর্মালাইজ করত। আর এর চেয়ে শত-সহস্রগুণ শাস্তি তারা ভোগ করবে আখিরাতে।

বহু মুসলিম ভাই, যারা আখিরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, তারাও নিজেদের অজান্তেই এই গর্হিত গুনাহ করে যাচ্ছেন। অনেকের জীবিকা উপার্জনের উপায়ই (ক্যারিয়ার) এটি, অশ্লীলতার প্রসার। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থও হারাম হয়ে যাচ্ছে তাদের অজান্তে। বিনোদনের নামে জনপ্রিয়তা অর্জনের দিকে তাদের ঝোঁক। জনপ্রিয়তা, নিশ্চিন্ত জীবিকা—এগুলো ভেদ করে আল্লাহর আহ্বান কানে আসাই কঠিন হয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের এসব ধোঁকা থেকে আল্লাহ কুরআনে বারবার সতর্ক করেছেন। অনেকে আল্লাহর দয়ায় উঠে আসতে পারেন এই পঙ্কিল জীবন থেকে। আল্লাহর জন্য বিসর্জন দেওয়া জনপ্রিয়তা ও জীবিকা আল্লাহ দুনিয়াতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন শতগুণে, হালালের মাঝে। জুনাইদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহর উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে।

মিডিয়া দ্বারা প্রচারিত বা ইন্সটিলড এই সিনারিওগুলোর প্রয়োগ দর্শকের কাছে বাস্তবজীবনে এভেইলেবল করে দেয় সহশিক্ষা ও সহকর্ম। নাটক-সিনেমার শোনা-দেখা (প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর) ডায়লগ, ভঙ্গিমা, ভাষা, চরিত্রায়ণগুলো ফ্যানরা এখানে প্র্যাকটিস করে। এটাই প্রমাণ করে এগুলো কেবলই নির্দোষ 'অভিনয়' নয়, এগুলোর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। আপনারা বহু ঘটনা পাবেন যেখানে 'ক্রাইম পেট্রোল' জাতীয় প্রোগ্রাম থেকে অপরাধের আইডিয়া নেওয়া হয়েছে। আমি বলতে চাইছি—এগুলো থেকে ‘নেওয়া’ হয় অনেক কিছুই। ‘জাস্ট বিনোদন’ বলার সুযোগ নেই।

৪.৯

‘হায়া’ মানুষের এক্সক্লুসিভ বৈশিষ্ট্য। পশুর কাছে নিজের চোখ আর লজ্জাস্থান সমান। কুকুর তার জিভও বের করে রাখে, তার পায়খানার রাস্তাও বের করে রাখে। সবই তো অঙ্গ, লজ্জার কিছু নেই। ‘লজ্জার কী আছে?’ এটা পশুর মুখে মানায়। বস্তুবাদ বা মানব-ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন (ডারউইনিজম) মানুষকে একটা উন্নত পশু ছাড়া আর কিছু হিসেবে দেখে না। তাই বস্তুবাদীদের কাছে ‘লজ্জা’ অনর্থক একটা শব্দ, কারণ বস্তুবাদ দিয়ে ‘লজ্জা’কে ব্যাখ্যা করা যায় না। অথচ মানবেতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ লজ্জা পেয়েছে, পোশাক পরেছে। লিঙ্গ আর হাতের পার্থক্য করেছে, যদিও দুটোই শরীরের প্রত্যঙ্গ। এটা মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। যে কারণে আমরা মানুষ, যে কারণে আমরা জন্তু নই, এগুলো সেই বৈশিষ্ট্য যা আমাদের মানুষ করেছে। কোনো পশু লজ্জা পায়নি, কোনো পশু ধর্ম পালন করেনি, কবিতা লেখেনি। এজন্য শুধু বস্তুবাদ দিয়ে মানুষকে ও মানুষের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু ভাববাদ দিয়েও যায় না। ড. আলিজা আলি ইজাতবেগোভিচ তার Islam between East and West বইতে চমৎকারভাবে এটা আলোচনা করেছেন। ইসলামই মানুষের সত্তা ও জিজ্ঞাসাগুলোর পরিপূর্ণ উত্তর দেয়। বস্তুবাদ ও ভাববাদের সমন্বয় করেছে ইসলাম, মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে শেষ নির্দেশনা। মানুষ বলেই আমাদের কাছে আমার শার্ট আর জাঙ্গিয়া এক জিনিস নয়, যদিও দুটোই পোশাক। মানুষ বলেই আমরা পিরিয়ডের রক্ত দেখিয়ে রাস্তায় ঘুরতে পারি না। মানুষ বলেই আমরা লিপস্টিক নিজে কিনে, প্যাড বাপকে দিয়ে কেনাতে পারি না। মানুষ বলেই নিজেদের অন্তর্বাস ছাদে মেলে তার ফটো ফেসবুকে আমরা দিতে পারি না। এগুলো যতখানি ‘লোকলজ্জা’র বিষয়, এর চেয়ে বেশি ‘আত্মলজ্জা’র বিষয়। মনুষ্যত্ব মানে ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ‘হিউম্যান’ হওয়া নয়। যদি বিবর্তন সঠিক ধরেও নিই, বস্তুবাদের অবোধ্য এই বিষয়গুলোকেই মনুষ্যত্ব বলে। এগুলোই অন্যান্য জন্তু থেকে আমাদের আলাদা করেছিল, আমাদেরকে 'এইপ' (Ape) থেকে 'ম্যান' করেছিল।

৪.১০

তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, সমাজে বে'হায়া'পনা ছড়ানোর শাস্তি হিসেবে আল্লাহ আযাব পাঠান। সমাজে অশ্লীলতার প্রসারে কিছুই করতে আমরা বাকি রাখিনি। পোশাকের ডিজাইন থেকে নিয়ে নাটক, পত্রিকার বিনোদনপাতা থেকে নিয়ে গানের লিরিক্স-প্রতিটি রাস্তাকে ব্যবহার করে আমাদের সমাজে 'হায়া'কে নষ্ট করা হয়েছে। আজ দেখেন চারিদিকে। মুসলিম-সন্তানদের আমরা 'হায়া' শেখাতে পারিনি। পাশ্চাত্য সভ্যতার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ওদের মতো আমাদের সমাজ থেকেও 'হায়া', শ্লীলতা, মডেস্টি, ডিসেন্সি শব্দগুলো উঠে গেছে। যা গোপনে করা হতো, তা প্রকাশ্যে করা হয়। সমকামিতার মতো ঘৃণার্হ কাজকে 'অধিকার' হিসেবে দাবি করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার পশ্চিমা সংজ্ঞা গ্রহণ, নারীবাদ ও এলজিবিটি আন্দোলনের নামে নির্লজ্জতাকে মূলধারায় আনা, স্কুলে যৌনশিক্ষার নামে 'হায়া' ভাঙানো, নাটক-সিনেমা-বিনোদনের নামে পারিবারিক 'হায়া' ধ্বংস করা—ধ্বংসের কিছুই কি বাকি রেখেছি আমরা?

ফিরে যাই শুরুতে। লুত আলাইহিস সালামের কওমে তিনিই ছিলেন সংখ্যালঘু, এমনকি তার স্ত্রীও ছিল অশ্লীল-মতাদর্শী। আজ আপনি সমাজে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কিছু বলে দেখেন, আজ এই লেখায় যা বললাম এগুলো বলে দেখেন। আপনিও টের পাবেন আপনি সংখ্যালঘু। আপনার স্ত্রী-বোন-বেস্টফ্রেন্ডও আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। লুত আলাইহিস সালামের জাতি তাকে শাসিয়েছিল : 'বেশি পবিত্র সেজেছ, বেশি পবিত্র হতে চাও?' আপনার জাতিও আজ আপনাকে শাসাবে : 'বেশি হুজুর হয়েছো, উগ্রবাদ ভালো না, টিভি-সিনেমা দেখে না তো জঙ্গিরা।' তাই যদি হয়, প্রবল পরাক্রমশালী সর্বশক্তিমান আল্লাহর রোষ কেন আসবে না, সেইটে আমাকে বুঝায়ে বলেন।

'করোনা' কেন শুধু, খেল তো সবে শুরু। এ তো একটা, পিকচার আভি বাকি হ্যায়। তবু যদি আমরা কেউ কেউ ফিরে আসি। তবু যদি আমাদের কারো হুঁশ হয়। আসেন আমরা আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাওবা করি, আত্মীয়-বন্ধুদের পক্ষ থেকে করি, পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে তাওবা করি। ফিরে আসি। إن عذابك بالكفار মুলহিক্ক’। আয় মালিক, আপনার আযাব কাফিরদের জন্য। আল্লাহ, আমরা আপনাকে চিনি, আপনার আযাবকে ভয় করি। আল্লাহ, আমরা ঈমান এনেছি, আমাদের মাফ করে দেন। আমরা আর ফিরে যাব না আগের অন্ধকার জীবনে। এবারের মতো আমাদের মাফ করে দেন।

টিকাঃ
১. সুরা কমার, আয়াত: ৩৭
২. সুরা হিজর, আয়াত: ৭৩
১. সুরা হুদ, আয়াত : ৮২
২. সুরা হিজর, আয়াত : ৭৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪-হাদিসটি সহিহ
২. মৃত্যু: ১৮৯৫-১৯৩৬
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৫০৬১
২. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ১১২৭; আয-যুহদ, আহমাদ বিন হাম্বল : ১১৬৮; শুআবুল ঈমান : ৭৩৩৭; তাযিমু কাদরিস সালাহ: ৮২৮; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪
৩. আয-যুহদ, আহমাদ ইবনু হাম্বল : ১১০০; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা : ১১২৮; তাযিম কাদরিস সালাহ : ৮৩৯; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬০-শারয়ি সম্পাদক
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪। -হাদিসটি সহিহ
১. নিশ্চয় যারা ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। [সুরা নূর, আয়াত : ১৯]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00