📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা

📄 ১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা


তখন শীতের শেষ। ফজরের জামাআত একটা সময় ৫:৫০ বা ৬:০০ টার দিকে থাকে না? ওই সময়টায়। আহলে হাদিস মসজিদে প্রায় মিনিট তিরিশেক আগে জামাআত হতো। আমার বাসা থেকে হানাফি আর আহলে হাদিস মসজিদের দূরত্ব সমানই। খুব সম্ভব লেখালেখির জন্যই হবে, আমি আহলে হাদিস মসজিদে যেতাম আগে আগে সালাত পড়ে এসে কাজ শুরু করার জন্য। আমার বাসার সামনেই একটা দোকানঘর ভাড়া করে একজন স্যার বেশ কটা ছেলেমেয়ে পড়াতেন ঠিক ওই টাইমটায়, বাচ্চাগুলো সেভেন-এইটের হবে। আমি যেতাম আর দেখতাম, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাবা-মায়েরা বাচ্চাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটা ফজরের প্রারম্ভিক সময় এবং খুব বেশি সম্ভাবনা যে, এই বাচ্চারা কেউই ফজর পড়েনি। বাবা-মায়েরা ফিরে গিয়ে পড়বেন, কিন্তু এই ১৩-১৫ বছরের বাচ্চারা আর পড়বে না। অনেকগুলো ভালো ধারণা করা যায়, কিন্তু বর্তমান সেক্যুলার ক্যারিয়ারিস্ট ফ্যামিলি কালচারের কারণে সে সুধারণা আমি করতে পারলাম না। স্যরি।

কাকডাকা ভোরে আমরা আমাদের সন্তানদের কোচিং ব্যাচের জন্য ঘুম থেকে তুলে দিই, কিন্তু আল্লাহর ফরজ হুকুম সালাত তার জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা কোচিং। সালাতে উঠলে বাচ্চার শরীর খারাপ করবে, কোচিংয়ে উঠলে কিন্তু করবে না। রামাদান মাসে পড়াশোনার অজুহাতে পরীক্ষার অজুহাতে... সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা 'আল্লাহর ফরজ বিধান' সিয়ামকে ‘আমি’... কত বড় কলিজা আমার? ‘আমি’ ফরজ সিয়ামকে আমার সন্তানের জন্য নিষ্প্রয়োজন ঘোষণা করেছি। সন্তানকে নাচ শেখাচ্ছি, গান শেখাচ্ছি। আমি কালচারাল মাইন্ডেড। কুরআন শেখানো? ওসব বড় হলে ‘যদি প্রয়োজন মনে করে’ শিখে নেবেনে, মানে ‘আমি প্রয়োজন মনে করি না’। সিয়াম রাখলে শরীর খারাপ করবে, ফজরে উঠলে শরীর খারাপ করবে। পড়ালেখা করে, এ-প্লাস পেতে হবে। সিয়াম-সালাত করলে পিছিয়ে পড়বে। আমার আর আমার সন্তানের মাঝে আল্লাহ কোথায়? এই আল্লাহ চাইলে আমার এই সন্তান দ্বারাই আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিতে পারেন, এই আহ্লাদের সন্তানের কারণে আমাকে সমাজে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারেন। সেই মহাশক্তিশালী আল্লাহর হুকুম ‘আমি’ স্থগিত করে দিচ্ছি। কে আমি? আমার কি একটুও ভয় লাগছে না, পরিবার থেকে আল্লাহকে বের করে দিতে? যিনি আমাকে পরিবার দিলেন তাঁকেই বের করে দিলাম। আমি এগুলো লেখার সময় কিছুটা কাঁপছি।

একবারও ভাবি না, যিনি দিলেন, তিনি কেড়ে নিতে কতক্ষণ; যিনি চোখের মণি করেছেন, তিনি তো চোখের বালিও বানিয়ে দিতে পারেন। পরিবারেও আমরা সেক্যুলারিতা প্রতিষ্ঠা করেছি। সন্তানকে ভোগবাদ শেখাই (লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে), ক্যারিয়ারিজম শেখাই (‘এইম ইন লাইফ’ রচনায়), শুধু দ্বীন শেখাতে লজ্জা পাই। দ্বীন শেখানোকে অপচয় মনে করি। এক বাবাকে বললাম:

ছেলের তো এসএসসি শেষ, তাবলীগ জামাতে ৩ দিনের জন্য দ্যান; কিছু শিখুক। কমপক্ষে এটুকু শিখুক যে—আল্লাহ কে, রাসুল কে, বাপ-মা কী? শুনলাম: এই ছুটির সময়টা খুব দামি, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেয়া চাই। ইংলিশ স্পিকিং কোর্সে ভর্তি করিয়ে রেখেছি, এখন সময় নষ্ট করা যাবে না। সময় নষ্ট? সময় কার দেওয়া? আমার বাবার? ছেলে আইলেটস-এ ৮+ স্কোর করবে, বিদেশি ভার্সিটিতে পড়বে। বিদেশে সেটেল হবে। আর বাপকে বৃদ্ধাশ্রমের খরচ পাঠাবে, কিংবা একেলা ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে থাকবে ৬ মাস। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মাকে ফেলে আসবে স্টেশনে। কিংবা ছুরি গলায় ধরে বাপকে বলবে : 'কোনো মসজিদে-টসজিদে জমি দেওয়া চলবে না, চুপচাপ কবরে যাবেন।' এগুলো সবই হয়েছে, হচ্ছে। সব হবে, বাপ-মায়ের দাম চেনা হবে না। যে ছেলে নিজের স্রষ্টাকে চেনে না, তার কাছে আপনার কী মূল্য? তার কাছে মূল্য শুধু টাকা আর পণ্যের, যার সাথে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ছোটবেলায়।

ভালো স্কুলের নামে কাফিরদের ব্রেইন-ওয়াশিং (পড়ুন মিশনারি) স্কুলে কাফিরের হাতে তুলে দিচ্ছি সন্তানের আনকোরা মগজ। স্রেফ দুনিয়ার জন্য। আক্কেল-দানাই ব্যাংকের ভল্টে নাকি? লাজ-শরম-আকল কিছুই আর নিজের কাছে নেই জনাব? আধুনিক হবার জন্য বাপ হয়ে সোমত্ত মেয়েকে এমন পোশাক কিনে দিই, যেটা পরে আরেক মেয়ে হেঁটে গেলে নিজেই জুলজুল করে চেয়ে থাকি। নিজে মা হয়ে, যুবতী মেয়েকে তাই পরাই, যা নিজে পরার কথা চিন্তাও করতাম না। আমরা তো এমন ছিলাম না ভাই? আজ কীসে আমাদের এমন করল? কে আমাদের এমন প্রতিবন্ধী, চিন্তাশক্তিহীন, 'ভেড়ার তোড়ে ভাসমান' করে দিলো?

আপনার আর আপনার সন্তানের মাঝে 'আল্লাহ' নামের একজন ছিলেন। তাঁকে চেনানো আপনার দায়িত্ব ছিল। তাঁর দিকে আমার সন্তানকে আকর্ষিত করার দায়িত্ব আমারই ছিল। আমার সন্তান আজ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শুনলে বলে, এটা তো ফকিরদের গান। 'ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ' পারে, পুরো 'অপরাধী' গানটা পারে; নাজাতের কালিমাটা পারে না। বলিউড হিরোদের চেনে, ৪ খলিফাকে চেনে না, নবিকে চেনে না। শাইখ উমায়ের কোব্বাদি বলেছিলেন, আমরা ভাবি, আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে। কেউ ভাবি না, আমার সন্তানের মৃত্যুর পর তার কী হবে? ১০ বছর বয়সে সালাত না পড়লে সন্তানকে প্রহারের হাদিস [১] শুনলে আমার নাক সিটকে আসে? আহ মুসলিম, আপনার এই সন্তান যখন জাহান্নামি হবে, আল্লাহকে ফরিয়াদ করবে : মালিক, আমার বাপ-মা আমাকে ফার্স্ট হতে পারিনি বলে মেরেছে, স্কুল পালিয়েছি বলে মেরেছে, এ-প্লাস পাইনি বলে বকেছে। তোমার হুকুম সালাতের জন্য আমাকে বকেনি, তোমার হুকুম ভেঙেছি বলে কখনো মারেনি। আজ এই বাপ-মাকে দোযখে দ্বিগুণ শাস্তি দাও। [১]

আমার ঘর সয়লাব মূর্তি আর প্রাণীর ছবিতে। প্রগতির নামে, সংস্কৃতির নামে, সজ্জার নামে মুসলিমের ড্রয়িং-রুম জন্তু-জানোয়ার, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল, মৃত বাপ-মায়ের শোপিসে ছবিতে ভর্তি। ছবি-মূর্তিতে রহমতের ফেরেশতা ঢোকে না। [২] আযাবের ফেরেশতাদের কিন্তু এসবের তোয়াক্কা নেই। আরো আছে। সেকেন্ডে ৩৬টা স্টিল পিকচার বা ৩৬ ফ্রেম গেলে নাকি তাকে বলে মুভি বা ভিডিও। ঘরে সে জিনিসও আছে। থাক, বললে দ্বীনদাররাও তেড়ে আসবেন। চেপে গেলাম। নিজেকে উদারমনা, প্রগতিমনা, ধর্মের খুটোছেঁড়া প্রমাণের কত চেষ্টা আমাদের। ভেবেছেন একবার, আধুনিক হবার নামে 'পশ্চিমা' হবার, সংস্কৃতিমনা হবার নামে 'হিন্দু' হবার এই হিড়িক আমাদের দুনিয়াতেই কোথায় নিয়ে ফেলবে? সেক্যুলার-মনা হবার নামে আল্লাহকে ত্যাগ করার এই স্পর্ধা আখিরাতে আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে? আফটার-অল যদি আখিরাতে বিশ্বাস করেই থাকি।

টিকাঃ
১. ৭ বছর বয়সে তোমাদের সন্তানকে সালাত আদায়ের জন্য আদেশ করো আর ১০ বছর বয়সে সালাত আদায় না করার জন্য প্রহার করো।-সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৫, মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৮৯, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭০৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৩২৩৩, ৩২৩৪, ৩২৩৫, ৫০৯২; সুনানু দারাকুতনি: ৮৮৭, ৮৮৮। হাদিসটি সহিহ
১. তারা (জাহান্নামিরা) আরো বলবে, 'হে আমাদের রব, আমরা আমাদের "নেতা ও বড়দের (সিনিয়রদের)" আনুগত্য করেছিলাম, আর ওরাই আমাদেরকে ভুলপথে নিয়েছে। হে আমাদের রব, ওদের “দ্বিগুণ শাস্তি” দিন আর তাদেরকে দিন মহা-অভিসম্পাত।' [সুরা আহযাব, আয়াত : ৬৭-৬৮]
২. সহিহ বুখারি: ৩২২৫, ৩২২৬, ৩৩২২, ৪০০২, ৫৯৪৯, ৫৯৫৮; সহিহ মুসলিম: ২১০৬; সুনানু আবি দাউদ: ৪১৫৩, ৪১৫৫; জামি তিরমিযি: ২৮০৪; সুনানু নাসায়ি: ৪২৮২, ৫৩৪৭, ৫৩৪৮, ৫৩৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৪৯

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.৫ বোনদের সেক্যুলারিতা

📄 ১.৫ বোনদের সেক্যুলারিতা


এটা আসলে ভিন্ন কোনো স্পর্ধা নয়, এতক্ষণ যেগুলো আলোচনা করলাম, তারই অনিবার্য প্রতিফলন। হওয়ারই ছিল। টেস্টোস্টেরোন হরমোন-জাত বৈশিষ্ট্য হলো 'প্রভাব-প্রতিপত্তি' বা ডমিনেন্স। পুরুষ সৃষ্টিগতভাবে 'আমির ম্যাটেরিয়াল'। আর নারী 'মামুর' ম্যাটেরিয়াল, আনুগত্য ও সহজে প্রভাবিত হবার বৈশিষ্ট্য নারীর মাঝে প্রবল। আমরা পুরুষেরা নষ্ট হয়েছি, স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে আমাদের নারীরা নষ্ট হয়েছে। একে আমি আলাদাভাবে 'নারীদের স্পর্ধা' হিসেবে দেখতে রাজি নই।

আমরা মুসলিম পুরুষেরা একেকজন পাক্কা দাইয়ুস হয়েছি, আত্মমর্যাদা ইউরোপের হাটে তুলে গায়রতহীন লো-টেস্টোস্টেরোন কাপুরুষ হয়েছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: দাইয়ুস কোনোদিনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [১] যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায় সর্বনিম্ন ৪০ বছর সর্বোচ্চ ৫০০ বছরের দূরত্ব থেকে। [২] কে দাইয়ুস? দাইয়ুস হলো ওই পুরুষ, যার ঘরের নারীরা খুল্লামখোলা বেপর্দা ঘোরে, আর সে তা স্বাভাবিকভাবে নেয়। মেয়েকে হাত ধরে নাচের ক্লাসে নেয়। হাজারো মানুষের চোখের সামনে সোমত্ত মেয়েটা বাঁকা দেহে নাচে, আর গর্বে বাবার বুক ভরে ওঠে। মেয়েকে এমন পোশাক বাবা কিনে দেয়, সেই একই পোশাক পরে অন্য মেয়ে হেঁটে গেলে সেই বাবাই চোখ দিয়ে লালা ঝরায়। স্ত্রী পরপুরুষের সাথে খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে, স্বামীও সেটা উপভোগ করে। বন্ধুরা বৌয়ের পাশ ঘেঁষে ছবি তোলে, স্বামীই তুলে দেয়। বন্ধুরা বলে, 'ভাবী যা সুন্দরী, দোস্ত তুই তো জিতছিস', শুনে স্বামী ভাবে সে কতই না ভাগ্যবান! রাস্তার লোকে আমার বৌকে দেখে হাঁ করে চেয়ে থাকে, স্ক্যান করে আপাদমস্তক, মনে মনে মনকলা খায়; আমি দেখি, দেখে আমার খুব সুখ হয়। আমি পেয়েছি, তোমরা পাওনি, পাবে না। উঁহু... হবে না ভাই, ৫০০ বছর দূর থেকেই বিদায়, টা টা। লক্ষ লক্ষ দাইয়ুসের ঘরের লক্ষ লক্ষ নারী ব্যতিক্রম হবে কীভাবে? আমাদের আইকন যেমন আত্মপরিচয়হীন কামাল পাশা। আমাদের মেয়েদের আইকন তেমনি বেগম রোকেয়া-রা।

ইউরোপ যেমন ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখে, আমাদের মেয়েরাও ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখতে শিখেছে। ইসলাম সম্পর্কে, ইসলাম যে জীবন তাদের দিয়েছে তা সম্পর্কে আমাদের মেয়েদের জানাশোনা ভয়ংকর রকম কম। ভার্সিটিতে যান, সেখানে ১০০ জন মেয়ের সাথে যদি আপনি ১০ মিনিট করে কথা বলেন ইসলামে নারীর অবস্থানের ব্যাপারে, ৯৫ জনের মাঝে কোনো-না-কোনো পয়েন্টে বিভিন্ন মাত্রার ইরতিদাদ (ইসলাম ত্যাগ) দেখতে পাবেন। দেখবেন কোনো একটা টপিকে হয় কুরআনের কোনো আয়াতকে, না হয় স্পষ্ট কোনো হাদিসকে সে হয় অস্বীকার করছে, না হয় এ যুগে অচল বলে মন্তব্য করছে। ইসলামকে পুরুষতান্ত্রিক ও সেকেলে, আর পশ্চিমা সভ্যতাকে আধুনিক ও নারীবান্ধব বলে মনে করছে। খুব স্বাভাবিক। সে ঘরে তার মায়ের নিগৃহীত জীবন আর টিভিতে পশ্চিমের বাঁধনহারা জীবন দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছে। তুলনা করেছে। দুটোর জন্য দায়ী তো আমরা পুরুষরাই। মোদ্দা কথা হলো আমরা পারিনি এবং করিনি। ইসলাম যে মর্যাদার, প্রশান্তির, আরামের আর সার্থকতার জীবন নারীকে দিয়েছিল, আমাদের 'হিন্দুয়ানি মুসলিম' সমাজ তা আমাদের নারীদের দিতে পারেনি, মানে দেয়নি আর কি। পশ্চিমা সমাজ কিন্তু নারীবাদের ঝলমলে সোনালি খাঁচা ঠিকই তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। আমরা আমাদের নিজ ঘরের মেয়েদের কাছে ইসলামের মুক্তির ডাক পৌঁছাতে পারিনি।
হে মুসলিম নারী,

» কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা মুসলিম পুরুষেরা বছরের পর বছর আপনাদের ওপর জুলুম করেছি।

» কৃষিপ্রধান বাঙালি মুসলিম কন্যাসন্তানকে খাটো নজরে দেখেছে।

» হিন্দুদের দেখাদেখি আমাদের বিধবাদের শাদা শাড়ি পরিয়ে রেখে দিয়েছি।

» হিন্দুদের পণপ্রথাকে যৌতুক হিসেবে আত্মীকরণ করে ঘরের বউয়ের ওপর নির্যাতন করেছি, মোহরানা তো দূর কি বাত।

» আমরা মসজিদ বানানোর সময় আমাদের নারীদের কথা ভুলেই গেছি যে, সফরে তাদের ওপরও সালাত ফরজই থাকে।

» একাধিক বিয়ে করার পর আগের স্ত্রীর সাথে ইনসাফ করিনি।

» স্ত্রীর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম-এটিকেটের বালাই রাখিনি।

» কখনো কখনো তো শারীরিক অত্যাচারকেও ছাপিয়ে গেছে মানসিক অত্যাচার।

কিন্তু তার মানে কি এই যে, আল্লাহর দেয়া সমাধান আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়? তার মানে কি এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও আপনাদের বঞ্চিত করেছেন? তার মানে কি এই যে, কাফির নারীদের মতো স্বাধীনতাই আপনাদের চাই?

হে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া মেয়ে, 'নিশির ডাক' চেনেন? মাঝরাতে ৩ বার নাকি আপনার নাম ধরে কেউ ডাকবে। সেই ডাক শুনে যে ঘর থেকে বের হবে, সে মারা পড়বে। (কাল্পনিক গল্প) ঠিক এই 'সমতার নিশির ডাকে' দলে দলে আমাদের মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে। আমাদের মেয়েরা ইউরোপের সমতার সুরে মাতাল হয়ে ইঁদুরদৌড়ে মেতেছে বাঁশিওয়ালাদের পিছু পিছু। অস্বীকার করেছে বায়োলজির স্রষ্টা, সাইকোলজির স্রষ্টার বেঁটে দেওয়া ওয়াজিব কর্মবণ্টন। যা তাদের নাজুক শারীরতত্ত্বের সাথে যায় না, যা তাদের মাতৃত্ব-আবেগতাড়িত মানসিক প্রোসেসিংয়ের সাথে যায় না, সেই সব পুরুষালি বোঝা তারা তুলে নিয়েছে কাঁধে। [১] ফলে বিদ্রোহ করেছে শরীর, বিদ্রোহ করেছে মন। ইউরোপের ব্যাবসায়িক স্বার্থে নারীরা তিলে তিলে ক্ষয় করে দিয়েছে নিজের দেহ-মন-সন্তান-পরিবার। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যে ঘরোয়া দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছিল, তাকে তারা নিকৃষ্ট-অপমানজনক-ছোটকাজ মনে করেছে। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যেসব দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেই তারা 'আসল কাজ', 'পুরুষের মতো হয়ে নিজেকে প্রমাণ করা', 'পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা', 'পুরুষের মতো করে মর্যাদা' - সেগুলোর পেছনেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। এর পেছনে কি পুরুষের দায় নেই? আমরাই কি বছরের পর বছর ঘরের কাজে দিনরাত খাটতে থাকা নারীদের তাচ্ছিল্য করিনি? 'ঘরেই তো থাকো সারাদিন', 'কিছুই তো করো না', 'আমার স্ত্রী কিছু করে না, হাউজওয়াইফ।' ঘরের কাজ কোনো কাজই না, এই মাইন্ডসেটের জন্য দায়ী তো আমরাই, নাকি? ইউরোপের খ্রিষ্টান পুরুষ যা করেছে, আমরা আমাদের মেয়েদের সাথে ঠিক তাই করেছি। তাদের নারীরাও ধর্মকে ঝেড়ে ফেলেছে, আমাদের নারীরাও একই রাস্তায় বাঁচার উপায় খুঁজছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো এমন দিন আসেনি, আমাদের মেয়েরা আমাদেরকেই শত্রু ভেবেছে। পরিবারকে, পরিবার গঠনকে নিজের পিছুটান মনে করছে। নিজের সম্মানিত পিতা, খেলার সাথি বড়ভাই, প্রাণের স্বামী, কলিজার ছেলেকে মেয়েরা শত্রু ভাবছে : এরা তাকে আটকে রেখেছে, তাকে মুক্ত-স্বাধীন হতে দিচ্ছে না, তার 'নারী হয়ে ওঠা'র পেছনে জীবনকে নিজের মতো উপভোগ করার পেছনে এরাই বাধা। বাঁধ ভেঙে দাও... ন ডরাই...। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দিন কখনো আসেনি যে মেয়েরা গর্ভধারণকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। আহা, যে গর্ভধারণকে নারী নিজ নারীজন্মের পূর্ণতা ভাবত, তাকে ফেলে দেবার অধিকার চাইছে। পশ্চিমে গবেষণা হচ্ছে Risk of Pregnancy নিয়ে, যেন এটা একটা রোগ। সারা দুনিয়ার জনসংখ্যার হার কমে যাচ্ছে নারীবাদের কারণে, ইউরোপ-আমেরিকায় আরো বেশি কমে যাচ্ছে। পুরস্কার ঘোষণা করেও বিয়ে করানো যাচ্ছে না। কে টানে ওসব ঝক্কি। এর চেয়ে একা আছি, বেশ আছি। দরকার হলে হুক-আপ করি, প্রোটেকশান নিই, গর্ভপাত করি, সেক্সটয় আছে, ভালো চাকরি করি। কী দরকার বিয়েশাদি, বাচ্চাকাচ্চার।

মুক্ত হতে গিয়ে, স্বাধীন হতে গিয়ে, সাবলম্বী হতে গিয়ে সে প্রধান শত্রু হিসেবে চিনে নিয়েছে নিজের পরিবারকে ও ধর্মকে। পর্দার ফরজ বিধানকে ছুড়ে ফেলেছে। গরম লাগে, দমবন্ধ লাগে, বুড়ি-বুড়ি লাগে। এই মেয়ে, তুমি জানো তুমি কী বলছ? ধর্মকে সেকেলে, নারীবিদ্বেষী, পুরুষের জুলুমের হাতিয়ার মনে করছে। গত ১৪০০ বছরের আলিমসমাজকে, সাহাবিদেরকে, এমনকি খোদ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পুরুষতান্ত্রিক sexist বলতে ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই নারীবাদের প্যারাডাইমে ইসলামকে কুলিয়ে উঠতে পারেনি, ছেড়ে দিয়েছে ঈমানকেই। নারীবাদের শেষ গিয়ে ঠেকে কুফরে (কুরআনের একটা আয়াত বা একটা মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকার কুফর)। পশ্চিমের সুরে সুর মিলিয়ে আমাদের মেয়েরা নিজ পরিবার ও ধর্মকে কথায় কথায় sexist, পুরুষতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী, কুসংস্কার বলে গালি দিচ্ছে।

হাজারো মানুষের হাজারো মনমানস থেকে সুরক্ষার সকল স্তর নারী ত্যাগ করেছে। ইসলাম যে কয়েক স্তর বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নারীর জন্য দিয়েছিল, সেগুলোকে উঠিয়ে দিয়ে নারীকে ভিকটিম হিসেবে শিকারযোগ্য করে তুলেছে নারী নিজেই। পশ্চিমা সভ্যতার বড়ি গিলে তুলে নিয়েছে সব বাঁধ। সহশিক্ষা, সহকর্ম, বিয়েপূর্ব প্রেম, পরকীয়া। যে নারীকে পাওয়া ছিল কঠিন, নারীকে পেতে হলে পুরো সমাজকে সাক্ষী রেখে, উপযুক্ত সম্মানী পরিশোধ করে, স্বামী হিসেবে তার আজীবন সকল প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব নিয়ে এরপর তাকে একান্তে পেতে হতো। এখন সে নারীকে সহজেই পাওয়া যায় চোখের আড়ালে, কোনো প্রমাণ থাকে না, নিয়ে যাওয়া যায় পার্কের চিপায়, লাইব্রেরিতে স্টাডির অসিলায়, খালি ফ্ল্যাটে, হোটেলে, অফিসে কিংবা মিডিয়ায় সুযোগ দেবার লোভ দেখিয়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভোগ, গর্ভপাত, ড্রেনে পড়ে থাকা নবজাতক, ভিডিও তুলে ছেড়ে দেওয়া।

বেশ ইন্টেলেকচুয়াল এক এক্স-মুসলিম নাস্তিক নারীবাদী তার ফেসবুক প্রোফাইলে নিয়মিত তার গ্রুপসেক্স ও সেক্সটয়ের ছবি আপলোড করে। আরেক এক্স-মুসলিম নারীবাদীকে জিগ্যেস করা হয়ে ছিল: নাস্তিক ফেমিনিস্ট হয়ে আপনার অর্জন কী? তার উত্তর: আমি এখন নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারি। দেশী নারীবাদীদের প্রায়ই দেখা যায় পিরিয়ডের রক্তমাখা প্যাডের ছবি বা অন্তর্বাসের ছবি আপলোড দিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে। আহ কী অর্জন! আল্লাহ-রাসূল-সালাফদের অস্বীকার করে কতটুকু স্বাধীন হইবা বোন? এতটুকু হলে চলবে?

টিকাঃ
১. আম্মার ইবনু ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন প্রকারের লোক কোনোদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যথা: দাইয়ুস, পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি।' [শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ১০৩১০; মারিফাতুস সাহাবা, আবু নুআইম : ৫২০৮, ৫২০৯; মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি ৬৭৭; আত-তাওহিদ, ইবনু খুযাইমা: খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা : ৮৬৫; সহিহুল জামি: ৩০৬২। হাদিসটি সহিহ।]
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে হারাম (নিষিদ্ধ) করেছেন—মদে আসক্ত ব্যক্তি, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ুস, যে তার পরিবারে নোংরামি সমর্থন করে।' [মুসনাদু আহমাদ: ৫৩৭২, ৬১১৩, ৬১৮০; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৪৪; মুসনাদুল বাযযার : ৬০৫০, ৬০৫১; শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৭৪১৬; সহিহুল জামি: ৩০৫২, ৩০৬৩। হাদিসটি সহিহ।]
এখানে একটি মূলনীতি স্মরণ রাখা দরকার, কুফর-শিরকে লিপ্ত না হয়ে থাকলে ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করা প্রত্যেক মুমিনই একদিন না একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। গুনাহের কারণে যতদিনই সে জাহান্নামে থাকুক না কেন, আল্লাহ একদিন না একদিন তার ঈমানের বদৌলতে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করবেন। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহর স্বীকৃত মূলনীতি ও আকিদা। সুতরাং, যেসব আয়াত-হাদিসে কোনো গুনাহের কারণে স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকা কিংবা জান্নাতে কোনোদিনও প্রবেশ না করার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ধমকের অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ সেসব আয়াত-হাদিসে প্রকৃত অর্থেই চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকা বা কোনোদিনও জান্নাতে না যাওয়ার কথা বোঝানো হয়নি; বরং গুনাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের কথা সাধারণত কঠিন ধমক ও দীর্ঘ শাস্তি বোঝানোর উদ্দেশেই বলা হয়ে থাকে। গুনাহের জঘন্যতা ও ভয়াবহতা বোঝানোর জন্যই অনেক সময় এমন কঠিন ধমকি দেওয়া হয়ে থাকে। আরবি ভাষায় শব্দের এমন রূপক ব্যবহারের অনেক প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত আছে। তাই এ ব্যাপারটিতে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, যেন কোনোরূপ বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়।—শারয়ি সম্পাদক
২. সহিহ বুখারি : ৬৯১৪; সহিহ মুসলিম: ২১২৮; জামি তিরমিযি: ১৪০৩; সুনানু নাসায়ি: ৪৭৪৯, ৪৭৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২০৫৪, ২৬১১, ২৬৮৬, ২৬৮৭; মুসনাদ আহমাদ ৬৭৪৫, ১৬৫৯০, ১৮০৭২, ২০৫০৬, ২০৫১৫।
১. এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত জানতে লেখকের রচিত 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০' বইটি দেখা যেতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00