📄 ১.২ ক্যারিয়ারে সেক্যুলার
এতটুকু পড়ে হয়তো নিজেকে দায়িত্বমুক্ত মনে হচ্ছে। স্পর্ধা যা দেখানোর তা তো ক্ষমতাবানরা দেখিয়েছে, আমরা তো দেখাইনি। আমরা তো আম-মুসলিম। রাষ্ট্র-বিচার-আইন-শাসন ওসব তো আর আমার হাতে ছিল না। না, বন্ধু। আমি আপনি এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছি গত ১০০ বছর। নিজের মতামত, ভোট, মেধা, অস্ত্র, শ্রম দিয়ে আল্লাহর সাথে স্পর্ধাকারী সিস্টেমকে সমর্থন দিয়েছি। আমরা মনে করেছি, বিশ্বাস করেছি 'রাজনীতিতে আল্লাহর কোনো জায়গা নেই'। এই আপ্তবাক্যকে আউড়িয়েছি, শিখিয়েছি, দম্ভভরে ঘোষণা করেছি। কত বড় সাহস আমার, আমি আল্লাহকে বের করে দেবার কথা বলেছি, আল্লাহর দেওয়া মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, আল্লাহর খেয়ে আল্লাহর পরে। আপনারা কী ভাবতে পারছেন আমরা কী করেছি? What we have done? 'আল্লাহ' মুক্ত রাজনীতি করেছি গত ১০০ বছর। কী জানি কাকে দেখানোর জন্য, কাদের সাপোর্ট পেতে পেছনে ফেলে রেখেছি কুরআনের অকাট্য সব বিধান। যেন এসব কুরআনে নেই।
চাকরিজীবনে আল্লাহকে বের করে দিয়ে চাকরি খুঁজেছি। চাকরিতে আবার আল্লাহ কেন আসবে? জীবিকা নিয়ে আল্লাহ কী বলল, তাঁর নবি কী বলল, কোনো তোয়াক্কা করিনি। কেউ বলে দিলেও পাত্তা নেই আমার কাছে। ওসব কি এ যুগে চলে? যেন বললাম, 'মধ্যযুগীয় আল্লাহ' আর তাঁর 'মধ্যযুগীয় রাসুল'-এর কথায় এই আধুনিক যুগ চলবে? (নাউযুবিল্লাহ) এটাই তো বলতে চাই, না কি? কথা ও চিন্তার 'গতিপথ' কোনদিকে দেখেন? আমাদের কথা আর আমাদের কাজে কী পরিমাণ স্পর্ধা প্রকাশ পায়, দেখেছেন? এগুলোর মানে কী দাঁড়ায়? সহিহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চুক্তিলেখক ও চুক্তির সাক্ষীদের ওপর লানত করেছেন। [১] নবিজির অভিশাপের কী মূল্য? ফুঃ ওসব শুনলে জীবন চলে? আলহামদুলিল্লাহ, আজ সুদের চুক্তিলেখকের চাকরি পেয়েছি। মেয়ের জামাই কী করে? জামাই সুদের চুক্তিলেখক। মেয়ে মাইক্রোসুদ এনজিওতে চাকরি করে। একবারও তোয়াক্কা করিনি আল্লাহ কী বলেছেন এই চাকরির ব্যাপারে। এই লেখাটি পড়তে পড়তে নিজের অন্তরের দিকে তাকান। আল্লাহর যুদ্ধ ঘোষণার কোনো পাত্তা আমার কাছে আছে কি না।
দারিদ্র্যের ভয়ে সুদে ঋণ নিয়েছি, ব্যবসা করব। কে ঘুচাবে আমার দারিদ্র্য? কে বণ্টন করে রিজিক? আমি কি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে রিজিক ছিনিয়ে আনতে চাচ্ছি? আল্লাহ বলছেন কুরআনে: 'আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন... এরপর যদি তোমরা সুদ ত্যাগ না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে 'যুদ্ধের' ঘোষণা শুনে নাও।' [২] হোয়াট? আমরা চাকরি-ব্যবসা করছি, নাকি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করছি? আমরা করতে চাচ্ছিটা কী আসলে? একটু ভাবেন ভাই, আমার পরিচয়টা কী আসলে? মুসলিম? মুসলিম মানে তো আত্মসমর্পিত, এর অর্থ তো 'প্রতিপক্ষ' নয়। আমার ক্যারিয়ার থেকে (৮ ঘণ্টা দিনে) মহাশক্তিধর আমার Owner-কে আমি বের করে দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছি। হোম লোন, কার লোন, বিয়ে লোন, শিক্ষা লোন। হে মহাশক্তিধর পরাক্রান্ত আল্লাহর 'প্রতিপক্ষ', ক্ষান্ত দেন, ক্ষান্ত দেন। নিজের ওপর রহম করেন। আল্লাহর ক্রোধকে চিনে নেন।
সুরা মায়িদায় পর পর তিনটি আয়াতে আমাদের Owner, আমাদের যিনি বানিয়েছেন, সেই আল্লাহ বলছেন : وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ 'আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা অনুসারে যে যারা বিচারকার্য করে না...' প্রথমে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (তারাই কাফির, অবিশ্বাসী), পরের আয়াতে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (তারাই জালিম, অত্যাচারী)। পরের আয়াতে বলছেন : فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (তারাই ফাসিক, গর্হিত পাপাচারী)। [১] আল্লাহর এই কথাগুলোর আর কোনো ব্যাখ্যা দরকার আছে? [২] ভার্সিটিতে সাবজেক্ট চয়েসের সময়, সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দেবার সময়, একবারের জন্যও মন বলেনি আমার Owner কী বলেছেন দেখি। এই সাবজেক্টটা নেব, না নেব না? এই চাকরিটা করব, না করব না? আমার জীবনে আমার আল্লাহর মতামতের কী মূল্য আমি দিয়েছি? বলেন, কী মূল্য আমার কাছে সর্বশক্তিমান শাস্তিদাতা এবং একইসাথে স্নেহশীল অভিভাবক Owner আল্লাহর। আমার চাকরিই আজ আল্লাহ-বিরোধী আইন প্রয়োগের চাকরি। আমার শক্তি-মেধা-শ্রম-অস্ত্র দিয়ে আমি আল্লাহ-বিরোধী আইনকে টিকিয়ে রেখেছি। উঁচু থেকে উঁচু পদে উন্নীত হয়েছি। হে মুসলিম ভাই, আমরা কি মুসলিম আছি? নাকি আল্লাহর প্রতিপক্ষ হয়ে গেছি? এর পরের প্রোমোশন তো 'কাফিরুন-জলিমন-ফাসিকুন' (কাফির-জালিম-ফাসিক)। আল্লাহ বলছেন—এখনো কি ঈমানদারের সময় আসেনি অন্তর বিগলিত হবার? নিজেই বিচার করেন, এই লেখা পড়ার পর আপনার অন্তর বিগলিত, নাকি উদ্ধত? কোনো ব্যাখ্যা দিলাম না, বলবেন অপব্যাখ্যা করছি। জাস্ট কুরআন কোট করলাম।
ফেসবুকে ডাক্তারদের বেশকিছু গ্রুপ আছে। ডাক্তাররা জানেন ঔষধের সাথে পথ্য (সহযোগী খাবার) দেওয়া হয়। এরপরও আমি নিশ্চিত জানি, পথ্য হিসেবে মধু ও কালোজিরার আয়াত ও হাদিসগুলো সেখানে দিলে হিন্দু ও মুরতাদরা 'হা হা' রিয়্যাক্টে ভরিয়ে দেবে। অথচ হলুদ-আদা-রসুন-ছাগলের দুধের কথা বললে দিতো না। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, বহু মুসলিম দাবিদার, এমনকি নামাযি-হিজাবিরাও হাহা দেবে। অনেকে বলবে, কোনো 'মোল্লাদের গ্রুপে' দিতে, এখানে ধর্মীয় আলাপ না করতে। এই বিভাজনটা কীভাবে এলো? কে আমাদেরকে বলে দিলো : সব আলাদা করে ফেলো, এগুলো থেকে আল্লাহকে আউট করে দাও। আল্লাহর নাম নিবা শুধু মসজিদে-মাদরাসায়। মসজিদ থেকে বেরিয়ে প্যান্টের ভাঁজ খুলে ফেলবা, ভুলে যাবা আল্লাহ নামে কেউ আছেন। মসজিদের ভেতরে করো ঠিক আছে, বাইরে আল্লাহর আর এখতিয়ার নেই। জীবনের ক্ষেত্রগুলো আলাদা করে দেওয়া, সবখানে ধর্ম টেনে আনবেন না—এসব শ্লোগান তো মুসলিমের মতো শোনায় না। তাহলে আল্লাহ যে দণ্ডবিধি দিলেন, তার ওপর আমাদের ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে অর্থব্যবস্থা দিলেন তার ওপর ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে পরিবার-ব্যবস্থা দিলেন, তার ওপর ঈমান কোথায় আমার? তাহলে কি আমরা কুরআনের কিছু অংশ মানি, কিছু মানি না?
আমরা তো মুসলিম ছিলাম। আমরা তো আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলাম। আমাদের তো সবখানেই আল্লাহ ছিলেন। অফিসে, আদালতে, ব্যবসায়, অর্থব্যবস্থায়, বিচার, শিক্ষায়। তখন জবাবদিহিতা ছিল, দুর্নীতি-ঘুষ-আত্মসাৎ আল্লাহর উপস্থিতির স্মরণে ভয়ে কল্পনাতেও আসতে পারত না। সে অবস্থায়ই তো আমরা সব সভ্যতার শীর্ষে ছিলাম। হিরা শহর থেকে মদিনা ১২০০ মাইল একজন নারী একেলা উটে চড়ে এসেছে ((অবশ্য এভাবে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া নারীদের একাকী ভ্রমণ শরিয়াহসম্মত নয়), কেউ তার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি সেসময়। [১] সুয়ং খলিফার বিরুদ্ধে বিচার হয়েছে, রায় গেছে সংখ্যালঘু ইহুদির পক্ষে। [২] এ কেমন আইন, এ কেমন সিস্টেম, এ কেমন অফিস, এ কেমন বাজার? ইহুদি আসামি মুসলিম হয়ে গেছে। কাফির ইসলাম গ্রহণ করেছে সিস্টেম 'দেখে'। যাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে বোঝাতে পারতেন না, সে নিজচোখে দেখে বুঝে গেছে। আজ আমরা দেখাতে পারছি না। শারিয়া সবচেয়ে বড় দাওয়াত। সুখ-সমৃদ্ধি-নিরাপত্তা-ইনসাফ-আইনের শাসন-অধিকার-জ্ঞানবিজ্ঞানের চূড়ান্ত রূপ তো আমরা দেখেছিলাম আল্লাহর আইনের অধীনেই। তাহলে কীসে আমাকে বাধ্য করল আল্লাহকে পরিত্যাগ করতে?
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ
হে মানব সম্প্রদায়! কীসে তোমাকে বিভ্রান্ত করল তোমার মহান রব সম্পর্কে?" (কী তোমাকে ধোঁকা দিলো, যে তুমি তোমার বদান্য রবকে পরিত্যাগ করলে?) [৩]
আমার আজ প্রচুর টাকা দরকার, সমাজে সম্মান দরকার, উঁচু পদ দরকার। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে। প্রয়োজনে আল্লাহর বিরুদ্ধে গিয়ে, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে, আল্লাহ-বিরোধী এই সিস্টেমটার প্রহরী হয়ে। অথচ আমি দুনিয়াতে আসার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আল্লাহকে খুশি করা, যেকোনো কিছুর বিপরীতে আল্লাহর দাসত্ব করা।
আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্য। [১]
এই উপর্যুপরি অবাধ্যতা, বিদ্রোহ আর গুনাহের ওপর অটলতা আমাকে 'দাস' (বান্দা) হয়ে কবরে যেতে দেবে তো? নাকি তাঁর 'প্রতিপক্ষ' হয়ে যাব কবরে? বিশ্বাস করুন, আমার লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রিজিকের জন্য আজ মহান আর-রাজ্জাকের বিরুদ্ধে আমি? ইজ্জতের জন্য আজ মহাশক্তিধর আল-মুইজ্জের বিরুদ্ধে আমি? কে আমি? আজ আমার এত শক্তি, এত সাহস? আল্লাহর ক্রোধের উপযুক্ত আমি ছাড়া আর কে?
টিকাঃ
১. জামি তিরমিযি: ১২০৬; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫-২৭৯
১. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪৪, ৪৫, ৪৭
২. কুরআনের স্পষ্ট আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর দেওয়া আইন অনুসারে বিচার না করলে সে কাফির, ফাসিক ও জালিম। আমাদের জানার বিষয় হলো, মানব-রচিত আইনে বিচার করা সুস্পষ্ট বড় কুফর নাকি কুফর দুনা কুফর (ছোট কুফর) তথা ফিসক? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া মুশকিল। মৌলিকভাবে বলা যায়-
■ কেউ আল্লাহর আইনের বিপরীতে কোনো আইন প্রণয়ন করলে সে সুনিশ্চিতই কাফির।
■ অনুরূপ যে এ ধরনের কাজ সাপোর্ট করে মানব-রচিত আইনকে সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে তারও একই বিধান।
■ আর আইন নিজে না বানিয়ে কেবল আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনে বিচার করলে সেক্ষেত্রে এর উত্তর হবে, যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সে আল্লাহর আইনকে সঠিক এবং সে অনুসারে বিচার করাকে আবশ্যক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পার্থিব স্বার্থে কখনো ভিন্ন আইনে বিচার করে অথবা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তাহলে সে কাফির নয়; বরং জালিম বা ফাসিক। এ ধরনের কুফরকে বলা হবে 'কুফর দুনা কুফর।' অর্থাৎ এর কারণে সে মারাত্মক গুনাহগার হলেও দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে না।
■ আর যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানব-রচিত আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং এটার প্রতি কোনো ঘৃণা ও বিদ্বেষ না রেখে সেই আইন অনুসারেই সে নিয়মিত বিচার-আচার করে থাকে কিংবা সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনকেই সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে অথবা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকল্পে এ আইন অনুসারে ফয়সালা করাকে বাধ্যতামূলক বিশ্বাস করে তাহলে তার কুফর ও ইরতিদাদের বিষয়টি সুস্পষ্ট। এখানে তার কুফরির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এটাকে 'কুফর দুনা কুফর' (ছোট কুফর বা ফিসক, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না) বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করে, তারা নিশ্চিত দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে আল্লাহদ্রোহীদের খুশি করতে চায়। আমরা এদের থেকে মুক্ত এবং তারাও আমাদের থেকে মুক্ত। শারয়ি সম্পাদক
১. আদি ইবনু হাতিম থেকে তিরমিযির বর্ণনা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, আল্লাহ অবশ্যই এ দ্বীনকে এমন পূর্ণতা দেবেন, একাকিনী নারী হাওদার ওপর চড়ে সুদূর হিরা শহর থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তাতে কোনো লোকের আশ্রয় দানের প্রয়োজন তার হবে না।... আদি ইবনু হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এই তো আমি দেখছি হাওদানশিনা নারী কারো নিরাপত্তা সঙ্গী ছাড়াই হিরা থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে যাচ্ছে। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৯-১৩০)
২. ঘটনা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময়কার। খলিফা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেন এক ইহুদির দায়ের করা মামলায়। বর্মের মালিকানা নিয়ে খলিফা আর ইহুদির মাঝে বিরোধের ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। (তাবিয়িদের ঈমানদীপ্ত জীবন, ড. আব্দুর রহমান রাফাত পাশা, রাহনুমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১০৮) এবং (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৫)
৩. সুরা ইনফিতার, আয়াত : ৬
১. সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
📄 ১.৩ আমার আমি
একটু চোখ বুজি চলেন। আমার সাথে আমার Owner-এর সম্পর্ক কেমন? সম্পর্ক মানে ভাব-বিনিময়, টু-ওয়ে। তিনি আমাকে যা যা বলেছেন, তার প্রতি আমার রেসপন্স কেমন? নাকি তাঁকে আমার দরকার নেই? সম্পর্ক পাতানো নিষ্প্রয়োজন আমার কাছে। যেখানে তিনি চাচ্ছেন আমার সাথে সম্পর্ক করতে—
> আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাকে স্মরণ করব। [২]
> আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। [৩]
> তুমি একহাত এসো, আমি ২ হাত আসছি। হেঁটে আসো, আমি দৌড়ে আসব। [৪]
১.৩.১ আমি আল্লাহকে পাত্তা দিচ্ছি না? আমি কার ডাক অগ্রাহ্য করছি? কে তিনি? অফিসের বস, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট? সে (পড়ুন তিনি) আল্লাহ। আসমান জমিনের একচ্ছত্র Owner. বছরের পর বছর আমি সালাত পড়ছি না, কাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছি? পড়লেও জুমআয় দুটো ঠোকর দিয়েই দৌড়। বছরের পর বছর কুরআন খোলার সময় আমার হচ্ছে না, মানে পাত্তা পাচ্ছে না। জিকির কাকে বলে তা জানিও না, জানার প্রয়োজনও মনে করছি না। Who cares? আল্লাহর কসম, এই করোনা, এই ভীতি এগুলো কিচ্ছু না। সামনে আমার সাথে যা যা হতে যাচ্ছে তার তুলনায় এসব কিচ্ছু না। 'একবার দহনের পর তাকে আমি দেবো নতুন ত্বক, যাতে সে যন্ত্রণার স্বাদ ভোগ করতে পারে।' [১] এভাবে অসীম দিন কেটে যাবে, আবার সেখানকার একদিন আমাদের পার্থিব হিসেব অনুযায়ী হাজার দিনের সমান। রেডি? কী করছি আমরা? বা কী করছি না আমরা? আমার জীবন থেকেই তো আমি আল্লাহকে বের করে দিয়েছি।
১.৩.২ ফেসবুকই ধরুন। দ্বীনী কনটেন্ট আমি অপ্রয়োজনীয় মনে করি। স্কিপ করি। 'নট মাই টাইপ' মনে করি। দ্বীন-আখিরাত-'আল্লাহ' আমার প্রায়োরিটি লিস্টে সবার শেষে থাকে। আমার ২৪টা ঘণ্টা ক্যারিয়ার-ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডস-টিভি-গেমস সবকিছুর মাঝে ডিস্ট্রিবিউটেড। দিনরাতের স্রষ্টা আমার জীবন-মৃত্যুর হুকুমদাতা আমার Owner আল্লাহর জন্য আমার এক মিনিটও সময় নেই। বন্ধু একটা ইসলামি পোস্টে আমাকে ট্যাগ করেছে, সেটা পড়ার জন্য ১ মিনিটও নেই। 'তাদের অন্তর আছে, তারা ভাবে না; চোখ আছে, তবু দেখে না; কান আছে, তাও শোনে না।' [২] দুনিয়ার বাকি সবকিছু আমার কাছে আল্লাহর চেয়ে ইম্পর্টেন্ট। আল্লাহ আমার জীবনে সবচেয়ে আন-ইম্পর্টেন্ট। I am not interested in ALLAH. ওফ!! আমাদের কথা-কাজ-চিন্তাকে ভেক্টর রাশি ধরেন, দেখেন এদের গতিপথ। শয়তান এত এত বছর ইবাদতের পর একটা বার মাত্র স্পর্ধা দেখিয়েছিল। আর আমি দিনে কতবার স্পর্ধা দেখাই? কতবার? আমার তো একটা শেষ আছে, একদিন তো সব ঔদ্ধত্য থামবে। তারপর?
১.৩.৩ সবার সামনে আল্লাহর নাম নিতে লজ্জা পাচ্ছেন। কোনো বক্তব্য, কোনো একাডেমিক সেশন বা লেকচার, কোনো জ্বালাময়ী ভাষণে, কোনো সাক্ষাৎকারে। ভয় পাচ্ছেন, সামনে বসা বিধর্মীরা কী ভাববে। সাপোর্ট কমে যায় কি না, লাইক কমে যায় কি না। তালি কমে যায় কি না। কাফির বস, বড়ভাই, বড় নেতার সুনজর থেকে বাদ পড়ে যাই কি না আল্লাহর নামটা নিলে। এক তো আল্লাহর প্রসঙ্গ আনারই দরকার নেই। ধর্ম টেনে আনার কী দরকার। আর একান্তই আল্লাহর নাম নিতে হলে অফিস-আদালত-বিশ্ববিদ্যালয়ে-জনসভায়-মিডিয়ায় 'আল্লাহ' বলবা না। সৃষ্টিকর্তা, পরম করুণাময়, গড-এগুলা বলবা। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ। বলবা শুভসকাল বা 'সবাইকে শুভেচ্ছা'। সালাম-টালাম দেওয়ার কী দরকার। বেশি দরকার হলে বলবা 'স্লামালিকুম'। অন্তত ইসলামিক তো হলো না!... আজ আমি এত স্মার্ট হয়েছি যে, আমার Owner, আমার Sustainer (টিকিয়ে রেখেছেন যিনি) 'আমার আল্লাহ'র নাম উচ্চারণ করতে আমার লজ্জা হয়। আমার সেক্যুলার পবিত্রতা (!) নাপাক হয়। 'জাহান্নামের স্বাদ নাও, তুমি তো দুনিয়ায় সম্মানিত ছিলে।' [১] এত সম্মানিত ছিলে, এত জনপ্রিয় ছিলে, আমার নাম নিতেও তোমার মান যেত।
১.৩.৪ কেউ যখন আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে 'ভাই, কুরআনে নিষেধ আছে', 'ভাই, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো নিষেধ করেছেন।' আমরা কী বলেছি? আমরা বলেছি- 'সবকিছুতে ধর্ম টেনে আনবেন না।' মানে কী? মানে সবখানে আল্লাহ-নবির কথা শোনাবেন না। সবখানে আল্লাহ-নবির জায়গা নেই। সবখানে জায়গা নেই, নাকি আমার কাছে জায়গা নেই? আমি শুনতে চাই না, এ ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন। কী প্রমাণ করতে চাই আমি এ কথা বলে? জিজ্ঞেস করি আজ নিজেকে, আমার জীবনের কোন জায়গায় আমি আল্লাহকে তাঁর স্থানটা দিয়েছি। মুখে আল্লাহকে মানার দাবি সবাই করে, প্রতিটি আস্তিক আল্লাহকে মানার দাবি করে। একজন মুসলিম (আত্মসমর্পিত) আর একজন আস্তিকের মধ্যে পার্থক্য কী? কী কী কাজ করলে, কোন কোন কথা বললে, অন্তরের রোখ কোনদিকে হলে আমার নাম আরবি থাকে, সরকারের আদমশুমারিতে আমি মুসলিম থাকি। কিন্তু আল্লাহর খাতায় আমি আর মুসলিম থাকি না। কীসে আমাকে নিশ্চিন্ত করল? কোন সে জ্ঞান যা আমাকে জান্নাতের ব্যাপারে এতটা টেনশন-ফ্রি করে রেখেছে। আল্লাহর কথা শুনতে চাই না, আল্লাহর নাম নিতে চাই না, পাত্তা দিতে চাই না। মুসলিম পরিবারে জন্ম দিয়ে আল্লাহ ঠেকায় পড়ে গেছেন আমাকে জান্নাত দেবার। নাকি?
১.৩.৫ যারা কুরআনের কথা, আল্লাহর কথা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে পৌঁছানোর কাজটা করত, আমাদের মাঝে নবির দায়িত্ব পালন করত, তাদেরকে 'মোল্লা, মৌলভি, হুজুর' লকব দিয়ে তাচ্ছিল্য করেছি, অচ্ছুৎ অবমানব হিসেবে মার্জিনালাইজ করেছি। যেন তাদের কথাকে পাত্তা দিতে না হয়। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়। বলেন, আমার জীবনে এমন কে আছে যে আমাকে আল্লাহর কথা পৌঁছাবে? জরুরি মনে করিনি, তোয়াক্কা করিনি। এমন কার সাথে আমি সম্পর্ক রেখেছি যে আমাকে আল্লাহর কথা শোনাবে? 'সেই উত্তম সঙ্গী যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে।' [১] আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান হাসিলকে আপনার ওপর ফরজ করেছেন। আলিমদের জন্য আপনার কাছে গিয়ে আপনাকে শেখানো ফরজ নয়। ফিকহে আছে, শরিয়তের যেসব বিধান সচেতন মুসলিম সমাজের কাছে প্রসিদ্ধ কিংবা যেখানে সহনীয় দূরত্বের মধ্যে মাসআলা জিজ্ঞেস করার মতো একজন আলিম আছেন, সেখানে 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। ওই বাসিন্দাদের 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। [২] আমার বাসার পাশে মসজিদ আছে, পাশের মহল্লার মাদরাসা আছে, আলিমদের সাথে উঠবসকারী বন্ধু আছে, আমার হাতে ফেসবুক-ইউটিউব-পিডিএফ (অনিরাপদ উৎস, তারপরও উৎস তো)। এরপরও আমার 'না জানার অজুহাত' আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়া আল্লাহ, আমি তো জানতাম না। এরপরও দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অর্থ—আমার ইচ্ছা হয়নি। স্বেচ্ছায় আমি আল্লাহর করা ফরজকে অবজ্ঞা করেছি। এত ব্যস্ত আমি, এত আমার ডিমান্ড, দুনিয়াতে এত জরুরি আমি? আমার নিজের পিঠ বাঁচানোরই সময় আমার নেই।
যে পরিমাণ স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য আর দর্প আমি আমার রব (Owner + Sustainer + Guardian + Master)-এর সাথে এই একজীবনে দেখালাম, তাতে কাফির কেন, আমিই তো তাঁর গযব বা ক্রোধের বেশি উপযুক্ত। কাফির তো চিনে নাই; আমি তাঁকে চিনে তাঁকে জেনেই যা দেখাইলাম। দোষ আল্লাহকে দিতে পারবেন, বলেন? আসেন তওবা করি। জবান না, অন্তর ব্যবহার করে বলি :
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায য-লিমীন)
আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ (দাসত্ব বা উপাসনা পাবার উপযুক্ত) আর কেউ নেই। আপনিই পবিত্র, আমিই জালিম। আমার ওপর যে সমস্যা এসেছে, আপনার কোনো দোষ নেই, আপনি পবিত্র। আমিই দোষী। আমিই আপনার ক্রোধকে সেধে পড়ে ডেকে এনেছি। নিজের কর্মদোষে অটোমেটিক আপনার ক্রোধে পড়ে গেছি। আমাদেরকে মাফ করুন। আপনি ছাড়া আমরা আর কাউকে চিনি না যে মাফ করার এখতিয়ার রাখে। হেঁচকি তুলে সিজদায় কাঁদুন: আল্লাহ, আবার নতুন করে ঈমান আনলাম আপনার ওপর, যেমন করে ঈমান আনার কথা ছিল। অতএব আপনি আমাদের মাফ করেন। কারণ, 'আপনি তো আল্লাহ।' লিআন্নাকাল্লাহ (لِأَنَّكَ الله)।
টিকাঃ
২. অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। [সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫২]
৩. আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। [সুরা গাফির, আয়াত : ৬০]
৪. বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে এক বাঁও (প্রসারিত দুই বাহু পরিমাণ) এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (হাদিসে কুদসি) সহিহ বুখারি: ৭৪০৫; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫]
১. 'নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমি আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া দেবো, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা নিসা, আয়াত: ৫৬]
২. 'তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে, তা দ্বারা তারা দেখে না; তাদের কান আছে, তা দ্বারা তারা শোনে না।' [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯]
১. (ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ )বলা হবে, আজ জাহান্নামের) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমি তো (দুনিয়ায়( ছিলে সম্মানিত, অভিজাত!' [সুরা দুখান, আয়াত: ৪৯]
১. সেই তো উত্তম সঙ্গী, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কথা শুনলে আমলের উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে। মুসনাদ আবি ইয়ালা: ২৪৩৭; শুআবুল ঈমান: ৯০০০; আল-আওলিয়া, ইবনু আবিদ দুনইয়া: ২৫; আত-তারগিব ফি ফাজাইলিল আমাল: ৪৮২; আল-মুনতাখাব মিন আবদ বিন হুমাইদ: ৬৩১; আল-মাতালিবুল আলিয়া: ২৮১৭, ৩২৪৬/ হাদিসটির সনদ সামান্য দুর্বল।]
২. শারহুল হামওয়ি আলাল আশবাহি ওয়ান নাযায়ির খন্ড ২, পৃষ্ঠা৩৮; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা : খন্ড :১৬, পৃষ্ঠা :১৯৯
📄 ১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা
তখন শীতের শেষ। ফজরের জামাআত একটা সময় ৫:৫০ বা ৬:০০ টার দিকে থাকে না? ওই সময়টায়। আহলে হাদিস মসজিদে প্রায় মিনিট তিরিশেক আগে জামাআত হতো। আমার বাসা থেকে হানাফি আর আহলে হাদিস মসজিদের দূরত্ব সমানই। খুব সম্ভব লেখালেখির জন্যই হবে, আমি আহলে হাদিস মসজিদে যেতাম আগে আগে সালাত পড়ে এসে কাজ শুরু করার জন্য। আমার বাসার সামনেই একটা দোকানঘর ভাড়া করে একজন স্যার বেশ কটা ছেলেমেয়ে পড়াতেন ঠিক ওই টাইমটায়, বাচ্চাগুলো সেভেন-এইটের হবে। আমি যেতাম আর দেখতাম, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাবা-মায়েরা বাচ্চাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটা ফজরের প্রারম্ভিক সময় এবং খুব বেশি সম্ভাবনা যে, এই বাচ্চারা কেউই ফজর পড়েনি। বাবা-মায়েরা ফিরে গিয়ে পড়বেন, কিন্তু এই ১৩-১৫ বছরের বাচ্চারা আর পড়বে না। অনেকগুলো ভালো ধারণা করা যায়, কিন্তু বর্তমান সেক্যুলার ক্যারিয়ারিস্ট ফ্যামিলি কালচারের কারণে সে সুধারণা আমি করতে পারলাম না। স্যরি।
কাকডাকা ভোরে আমরা আমাদের সন্তানদের কোচিং ব্যাচের জন্য ঘুম থেকে তুলে দিই, কিন্তু আল্লাহর ফরজ হুকুম সালাত তার জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা কোচিং। সালাতে উঠলে বাচ্চার শরীর খারাপ করবে, কোচিংয়ে উঠলে কিন্তু করবে না। রামাদান মাসে পড়াশোনার অজুহাতে পরীক্ষার অজুহাতে... সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা 'আল্লাহর ফরজ বিধান' সিয়ামকে ‘আমি’... কত বড় কলিজা আমার? ‘আমি’ ফরজ সিয়ামকে আমার সন্তানের জন্য নিষ্প্রয়োজন ঘোষণা করেছি। সন্তানকে নাচ শেখাচ্ছি, গান শেখাচ্ছি। আমি কালচারাল মাইন্ডেড। কুরআন শেখানো? ওসব বড় হলে ‘যদি প্রয়োজন মনে করে’ শিখে নেবেনে, মানে ‘আমি প্রয়োজন মনে করি না’। সিয়াম রাখলে শরীর খারাপ করবে, ফজরে উঠলে শরীর খারাপ করবে। পড়ালেখা করে, এ-প্লাস পেতে হবে। সিয়াম-সালাত করলে পিছিয়ে পড়বে। আমার আর আমার সন্তানের মাঝে আল্লাহ কোথায়? এই আল্লাহ চাইলে আমার এই সন্তান দ্বারাই আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিতে পারেন, এই আহ্লাদের সন্তানের কারণে আমাকে সমাজে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারেন। সেই মহাশক্তিশালী আল্লাহর হুকুম ‘আমি’ স্থগিত করে দিচ্ছি। কে আমি? আমার কি একটুও ভয় লাগছে না, পরিবার থেকে আল্লাহকে বের করে দিতে? যিনি আমাকে পরিবার দিলেন তাঁকেই বের করে দিলাম। আমি এগুলো লেখার সময় কিছুটা কাঁপছি।
একবারও ভাবি না, যিনি দিলেন, তিনি কেড়ে নিতে কতক্ষণ; যিনি চোখের মণি করেছেন, তিনি তো চোখের বালিও বানিয়ে দিতে পারেন। পরিবারেও আমরা সেক্যুলারিতা প্রতিষ্ঠা করেছি। সন্তানকে ভোগবাদ শেখাই (লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে), ক্যারিয়ারিজম শেখাই (‘এইম ইন লাইফ’ রচনায়), শুধু দ্বীন শেখাতে লজ্জা পাই। দ্বীন শেখানোকে অপচয় মনে করি। এক বাবাকে বললাম:
ছেলের তো এসএসসি শেষ, তাবলীগ জামাতে ৩ দিনের জন্য দ্যান; কিছু শিখুক। কমপক্ষে এটুকু শিখুক যে—আল্লাহ কে, রাসুল কে, বাপ-মা কী? শুনলাম: এই ছুটির সময়টা খুব দামি, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেয়া চাই। ইংলিশ স্পিকিং কোর্সে ভর্তি করিয়ে রেখেছি, এখন সময় নষ্ট করা যাবে না। সময় নষ্ট? সময় কার দেওয়া? আমার বাবার? ছেলে আইলেটস-এ ৮+ স্কোর করবে, বিদেশি ভার্সিটিতে পড়বে। বিদেশে সেটেল হবে। আর বাপকে বৃদ্ধাশ্রমের খরচ পাঠাবে, কিংবা একেলা ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে থাকবে ৬ মাস। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মাকে ফেলে আসবে স্টেশনে। কিংবা ছুরি গলায় ধরে বাপকে বলবে : 'কোনো মসজিদে-টসজিদে জমি দেওয়া চলবে না, চুপচাপ কবরে যাবেন।' এগুলো সবই হয়েছে, হচ্ছে। সব হবে, বাপ-মায়ের দাম চেনা হবে না। যে ছেলে নিজের স্রষ্টাকে চেনে না, তার কাছে আপনার কী মূল্য? তার কাছে মূল্য শুধু টাকা আর পণ্যের, যার সাথে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ছোটবেলায়।
ভালো স্কুলের নামে কাফিরদের ব্রেইন-ওয়াশিং (পড়ুন মিশনারি) স্কুলে কাফিরের হাতে তুলে দিচ্ছি সন্তানের আনকোরা মগজ। স্রেফ দুনিয়ার জন্য। আক্কেল-দানাই ব্যাংকের ভল্টে নাকি? লাজ-শরম-আকল কিছুই আর নিজের কাছে নেই জনাব? আধুনিক হবার জন্য বাপ হয়ে সোমত্ত মেয়েকে এমন পোশাক কিনে দিই, যেটা পরে আরেক মেয়ে হেঁটে গেলে নিজেই জুলজুল করে চেয়ে থাকি। নিজে মা হয়ে, যুবতী মেয়েকে তাই পরাই, যা নিজে পরার কথা চিন্তাও করতাম না। আমরা তো এমন ছিলাম না ভাই? আজ কীসে আমাদের এমন করল? কে আমাদের এমন প্রতিবন্ধী, চিন্তাশক্তিহীন, 'ভেড়ার তোড়ে ভাসমান' করে দিলো?
আপনার আর আপনার সন্তানের মাঝে 'আল্লাহ' নামের একজন ছিলেন। তাঁকে চেনানো আপনার দায়িত্ব ছিল। তাঁর দিকে আমার সন্তানকে আকর্ষিত করার দায়িত্ব আমারই ছিল। আমার সন্তান আজ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শুনলে বলে, এটা তো ফকিরদের গান। 'ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ' পারে, পুরো 'অপরাধী' গানটা পারে; নাজাতের কালিমাটা পারে না। বলিউড হিরোদের চেনে, ৪ খলিফাকে চেনে না, নবিকে চেনে না। শাইখ উমায়ের কোব্বাদি বলেছিলেন, আমরা ভাবি, আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে। কেউ ভাবি না, আমার সন্তানের মৃত্যুর পর তার কী হবে? ১০ বছর বয়সে সালাত না পড়লে সন্তানকে প্রহারের হাদিস [১] শুনলে আমার নাক সিটকে আসে? আহ মুসলিম, আপনার এই সন্তান যখন জাহান্নামি হবে, আল্লাহকে ফরিয়াদ করবে : মালিক, আমার বাপ-মা আমাকে ফার্স্ট হতে পারিনি বলে মেরেছে, স্কুল পালিয়েছি বলে মেরেছে, এ-প্লাস পাইনি বলে বকেছে। তোমার হুকুম সালাতের জন্য আমাকে বকেনি, তোমার হুকুম ভেঙেছি বলে কখনো মারেনি। আজ এই বাপ-মাকে দোযখে দ্বিগুণ শাস্তি দাও। [১]
আমার ঘর সয়লাব মূর্তি আর প্রাণীর ছবিতে। প্রগতির নামে, সংস্কৃতির নামে, সজ্জার নামে মুসলিমের ড্রয়িং-রুম জন্তু-জানোয়ার, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল, মৃত বাপ-মায়ের শোপিসে ছবিতে ভর্তি। ছবি-মূর্তিতে রহমতের ফেরেশতা ঢোকে না। [২] আযাবের ফেরেশতাদের কিন্তু এসবের তোয়াক্কা নেই। আরো আছে। সেকেন্ডে ৩৬টা স্টিল পিকচার বা ৩৬ ফ্রেম গেলে নাকি তাকে বলে মুভি বা ভিডিও। ঘরে সে জিনিসও আছে। থাক, বললে দ্বীনদাররাও তেড়ে আসবেন। চেপে গেলাম। নিজেকে উদারমনা, প্রগতিমনা, ধর্মের খুটোছেঁড়া প্রমাণের কত চেষ্টা আমাদের। ভেবেছেন একবার, আধুনিক হবার নামে 'পশ্চিমা' হবার, সংস্কৃতিমনা হবার নামে 'হিন্দু' হবার এই হিড়িক আমাদের দুনিয়াতেই কোথায় নিয়ে ফেলবে? সেক্যুলার-মনা হবার নামে আল্লাহকে ত্যাগ করার এই স্পর্ধা আখিরাতে আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে? আফটার-অল যদি আখিরাতে বিশ্বাস করেই থাকি।
টিকাঃ
১. ৭ বছর বয়সে তোমাদের সন্তানকে সালাত আদায়ের জন্য আদেশ করো আর ১০ বছর বয়সে সালাত আদায় না করার জন্য প্রহার করো।-সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৫, মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৮৯, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭০৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৩২৩৩, ৩২৩৪, ৩২৩৫, ৫০৯২; সুনানু দারাকুতনি: ৮৮৭, ৮৮৮। হাদিসটি সহিহ
১. তারা (জাহান্নামিরা) আরো বলবে, 'হে আমাদের রব, আমরা আমাদের "নেতা ও বড়দের (সিনিয়রদের)" আনুগত্য করেছিলাম, আর ওরাই আমাদেরকে ভুলপথে নিয়েছে। হে আমাদের রব, ওদের “দ্বিগুণ শাস্তি” দিন আর তাদেরকে দিন মহা-অভিসম্পাত।' [সুরা আহযাব, আয়াত : ৬৭-৬৮]
২. সহিহ বুখারি: ৩২২৫, ৩২২৬, ৩৩২২, ৪০০২, ৫৯৪৯, ৫৯৫৮; সহিহ মুসলিম: ২১০৬; সুনানু আবি দাউদ: ৪১৫৩, ৪১৫৫; জামি তিরমিযি: ২৮০৪; সুনানু নাসায়ি: ৪২৮২, ৫৩৪৭, ৫৩৪৮, ৫৩৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৪৯
📄 ১.৫ বোনদের সেক্যুলারিতা
এটা আসলে ভিন্ন কোনো স্পর্ধা নয়, এতক্ষণ যেগুলো আলোচনা করলাম, তারই অনিবার্য প্রতিফলন। হওয়ারই ছিল। টেস্টোস্টেরোন হরমোন-জাত বৈশিষ্ট্য হলো 'প্রভাব-প্রতিপত্তি' বা ডমিনেন্স। পুরুষ সৃষ্টিগতভাবে 'আমির ম্যাটেরিয়াল'। আর নারী 'মামুর' ম্যাটেরিয়াল, আনুগত্য ও সহজে প্রভাবিত হবার বৈশিষ্ট্য নারীর মাঝে প্রবল। আমরা পুরুষেরা নষ্ট হয়েছি, স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে আমাদের নারীরা নষ্ট হয়েছে। একে আমি আলাদাভাবে 'নারীদের স্পর্ধা' হিসেবে দেখতে রাজি নই।
আমরা মুসলিম পুরুষেরা একেকজন পাক্কা দাইয়ুস হয়েছি, আত্মমর্যাদা ইউরোপের হাটে তুলে গায়রতহীন লো-টেস্টোস্টেরোন কাপুরুষ হয়েছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: দাইয়ুস কোনোদিনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [১] যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায় সর্বনিম্ন ৪০ বছর সর্বোচ্চ ৫০০ বছরের দূরত্ব থেকে। [২] কে দাইয়ুস? দাইয়ুস হলো ওই পুরুষ, যার ঘরের নারীরা খুল্লামখোলা বেপর্দা ঘোরে, আর সে তা স্বাভাবিকভাবে নেয়। মেয়েকে হাত ধরে নাচের ক্লাসে নেয়। হাজারো মানুষের চোখের সামনে সোমত্ত মেয়েটা বাঁকা দেহে নাচে, আর গর্বে বাবার বুক ভরে ওঠে। মেয়েকে এমন পোশাক বাবা কিনে দেয়, সেই একই পোশাক পরে অন্য মেয়ে হেঁটে গেলে সেই বাবাই চোখ দিয়ে লালা ঝরায়। স্ত্রী পরপুরুষের সাথে খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে, স্বামীও সেটা উপভোগ করে। বন্ধুরা বৌয়ের পাশ ঘেঁষে ছবি তোলে, স্বামীই তুলে দেয়। বন্ধুরা বলে, 'ভাবী যা সুন্দরী, দোস্ত তুই তো জিতছিস', শুনে স্বামী ভাবে সে কতই না ভাগ্যবান! রাস্তার লোকে আমার বৌকে দেখে হাঁ করে চেয়ে থাকে, স্ক্যান করে আপাদমস্তক, মনে মনে মনকলা খায়; আমি দেখি, দেখে আমার খুব সুখ হয়। আমি পেয়েছি, তোমরা পাওনি, পাবে না। উঁহু... হবে না ভাই, ৫০০ বছর দূর থেকেই বিদায়, টা টা। লক্ষ লক্ষ দাইয়ুসের ঘরের লক্ষ লক্ষ নারী ব্যতিক্রম হবে কীভাবে? আমাদের আইকন যেমন আত্মপরিচয়হীন কামাল পাশা। আমাদের মেয়েদের আইকন তেমনি বেগম রোকেয়া-রা।
ইউরোপ যেমন ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখে, আমাদের মেয়েরাও ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখতে শিখেছে। ইসলাম সম্পর্কে, ইসলাম যে জীবন তাদের দিয়েছে তা সম্পর্কে আমাদের মেয়েদের জানাশোনা ভয়ংকর রকম কম। ভার্সিটিতে যান, সেখানে ১০০ জন মেয়ের সাথে যদি আপনি ১০ মিনিট করে কথা বলেন ইসলামে নারীর অবস্থানের ব্যাপারে, ৯৫ জনের মাঝে কোনো-না-কোনো পয়েন্টে বিভিন্ন মাত্রার ইরতিদাদ (ইসলাম ত্যাগ) দেখতে পাবেন। দেখবেন কোনো একটা টপিকে হয় কুরআনের কোনো আয়াতকে, না হয় স্পষ্ট কোনো হাদিসকে সে হয় অস্বীকার করছে, না হয় এ যুগে অচল বলে মন্তব্য করছে। ইসলামকে পুরুষতান্ত্রিক ও সেকেলে, আর পশ্চিমা সভ্যতাকে আধুনিক ও নারীবান্ধব বলে মনে করছে। খুব স্বাভাবিক। সে ঘরে তার মায়ের নিগৃহীত জীবন আর টিভিতে পশ্চিমের বাঁধনহারা জীবন দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছে। তুলনা করেছে। দুটোর জন্য দায়ী তো আমরা পুরুষরাই। মোদ্দা কথা হলো আমরা পারিনি এবং করিনি। ইসলাম যে মর্যাদার, প্রশান্তির, আরামের আর সার্থকতার জীবন নারীকে দিয়েছিল, আমাদের 'হিন্দুয়ানি মুসলিম' সমাজ তা আমাদের নারীদের দিতে পারেনি, মানে দেয়নি আর কি। পশ্চিমা সমাজ কিন্তু নারীবাদের ঝলমলে সোনালি খাঁচা ঠিকই তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। আমরা আমাদের নিজ ঘরের মেয়েদের কাছে ইসলামের মুক্তির ডাক পৌঁছাতে পারিনি।
হে মুসলিম নারী,
» কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা মুসলিম পুরুষেরা বছরের পর বছর আপনাদের ওপর জুলুম করেছি।
» কৃষিপ্রধান বাঙালি মুসলিম কন্যাসন্তানকে খাটো নজরে দেখেছে।
» হিন্দুদের দেখাদেখি আমাদের বিধবাদের শাদা শাড়ি পরিয়ে রেখে দিয়েছি।
» হিন্দুদের পণপ্রথাকে যৌতুক হিসেবে আত্মীকরণ করে ঘরের বউয়ের ওপর নির্যাতন করেছি, মোহরানা তো দূর কি বাত।
» আমরা মসজিদ বানানোর সময় আমাদের নারীদের কথা ভুলেই গেছি যে, সফরে তাদের ওপরও সালাত ফরজই থাকে।
» একাধিক বিয়ে করার পর আগের স্ত্রীর সাথে ইনসাফ করিনি।
» স্ত্রীর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম-এটিকেটের বালাই রাখিনি।
» কখনো কখনো তো শারীরিক অত্যাচারকেও ছাপিয়ে গেছে মানসিক অত্যাচার।
কিন্তু তার মানে কি এই যে, আল্লাহর দেয়া সমাধান আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়? তার মানে কি এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও আপনাদের বঞ্চিত করেছেন? তার মানে কি এই যে, কাফির নারীদের মতো স্বাধীনতাই আপনাদের চাই?
হে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া মেয়ে, 'নিশির ডাক' চেনেন? মাঝরাতে ৩ বার নাকি আপনার নাম ধরে কেউ ডাকবে। সেই ডাক শুনে যে ঘর থেকে বের হবে, সে মারা পড়বে। (কাল্পনিক গল্প) ঠিক এই 'সমতার নিশির ডাকে' দলে দলে আমাদের মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে। আমাদের মেয়েরা ইউরোপের সমতার সুরে মাতাল হয়ে ইঁদুরদৌড়ে মেতেছে বাঁশিওয়ালাদের পিছু পিছু। অস্বীকার করেছে বায়োলজির স্রষ্টা, সাইকোলজির স্রষ্টার বেঁটে দেওয়া ওয়াজিব কর্মবণ্টন। যা তাদের নাজুক শারীরতত্ত্বের সাথে যায় না, যা তাদের মাতৃত্ব-আবেগতাড়িত মানসিক প্রোসেসিংয়ের সাথে যায় না, সেই সব পুরুষালি বোঝা তারা তুলে নিয়েছে কাঁধে। [১] ফলে বিদ্রোহ করেছে শরীর, বিদ্রোহ করেছে মন। ইউরোপের ব্যাবসায়িক স্বার্থে নারীরা তিলে তিলে ক্ষয় করে দিয়েছে নিজের দেহ-মন-সন্তান-পরিবার। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যে ঘরোয়া দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছিল, তাকে তারা নিকৃষ্ট-অপমানজনক-ছোটকাজ মনে করেছে। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যেসব দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেই তারা 'আসল কাজ', 'পুরুষের মতো হয়ে নিজেকে প্রমাণ করা', 'পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা', 'পুরুষের মতো করে মর্যাদা' - সেগুলোর পেছনেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। এর পেছনে কি পুরুষের দায় নেই? আমরাই কি বছরের পর বছর ঘরের কাজে দিনরাত খাটতে থাকা নারীদের তাচ্ছিল্য করিনি? 'ঘরেই তো থাকো সারাদিন', 'কিছুই তো করো না', 'আমার স্ত্রী কিছু করে না, হাউজওয়াইফ।' ঘরের কাজ কোনো কাজই না, এই মাইন্ডসেটের জন্য দায়ী তো আমরাই, নাকি? ইউরোপের খ্রিষ্টান পুরুষ যা করেছে, আমরা আমাদের মেয়েদের সাথে ঠিক তাই করেছি। তাদের নারীরাও ধর্মকে ঝেড়ে ফেলেছে, আমাদের নারীরাও একই রাস্তায় বাঁচার উপায় খুঁজছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো এমন দিন আসেনি, আমাদের মেয়েরা আমাদেরকেই শত্রু ভেবেছে। পরিবারকে, পরিবার গঠনকে নিজের পিছুটান মনে করছে। নিজের সম্মানিত পিতা, খেলার সাথি বড়ভাই, প্রাণের স্বামী, কলিজার ছেলেকে মেয়েরা শত্রু ভাবছে : এরা তাকে আটকে রেখেছে, তাকে মুক্ত-স্বাধীন হতে দিচ্ছে না, তার 'নারী হয়ে ওঠা'র পেছনে জীবনকে নিজের মতো উপভোগ করার পেছনে এরাই বাধা। বাঁধ ভেঙে দাও... ন ডরাই...। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দিন কখনো আসেনি যে মেয়েরা গর্ভধারণকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। আহা, যে গর্ভধারণকে নারী নিজ নারীজন্মের পূর্ণতা ভাবত, তাকে ফেলে দেবার অধিকার চাইছে। পশ্চিমে গবেষণা হচ্ছে Risk of Pregnancy নিয়ে, যেন এটা একটা রোগ। সারা দুনিয়ার জনসংখ্যার হার কমে যাচ্ছে নারীবাদের কারণে, ইউরোপ-আমেরিকায় আরো বেশি কমে যাচ্ছে। পুরস্কার ঘোষণা করেও বিয়ে করানো যাচ্ছে না। কে টানে ওসব ঝক্কি। এর চেয়ে একা আছি, বেশ আছি। দরকার হলে হুক-আপ করি, প্রোটেকশান নিই, গর্ভপাত করি, সেক্সটয় আছে, ভালো চাকরি করি। কী দরকার বিয়েশাদি, বাচ্চাকাচ্চার।
মুক্ত হতে গিয়ে, স্বাধীন হতে গিয়ে, সাবলম্বী হতে গিয়ে সে প্রধান শত্রু হিসেবে চিনে নিয়েছে নিজের পরিবারকে ও ধর্মকে। পর্দার ফরজ বিধানকে ছুড়ে ফেলেছে। গরম লাগে, দমবন্ধ লাগে, বুড়ি-বুড়ি লাগে। এই মেয়ে, তুমি জানো তুমি কী বলছ? ধর্মকে সেকেলে, নারীবিদ্বেষী, পুরুষের জুলুমের হাতিয়ার মনে করছে। গত ১৪০০ বছরের আলিমসমাজকে, সাহাবিদেরকে, এমনকি খোদ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পুরুষতান্ত্রিক sexist বলতে ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই নারীবাদের প্যারাডাইমে ইসলামকে কুলিয়ে উঠতে পারেনি, ছেড়ে দিয়েছে ঈমানকেই। নারীবাদের শেষ গিয়ে ঠেকে কুফরে (কুরআনের একটা আয়াত বা একটা মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকার কুফর)। পশ্চিমের সুরে সুর মিলিয়ে আমাদের মেয়েরা নিজ পরিবার ও ধর্মকে কথায় কথায় sexist, পুরুষতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী, কুসংস্কার বলে গালি দিচ্ছে।
হাজারো মানুষের হাজারো মনমানস থেকে সুরক্ষার সকল স্তর নারী ত্যাগ করেছে। ইসলাম যে কয়েক স্তর বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নারীর জন্য দিয়েছিল, সেগুলোকে উঠিয়ে দিয়ে নারীকে ভিকটিম হিসেবে শিকারযোগ্য করে তুলেছে নারী নিজেই। পশ্চিমা সভ্যতার বড়ি গিলে তুলে নিয়েছে সব বাঁধ। সহশিক্ষা, সহকর্ম, বিয়েপূর্ব প্রেম, পরকীয়া। যে নারীকে পাওয়া ছিল কঠিন, নারীকে পেতে হলে পুরো সমাজকে সাক্ষী রেখে, উপযুক্ত সম্মানী পরিশোধ করে, স্বামী হিসেবে তার আজীবন সকল প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব নিয়ে এরপর তাকে একান্তে পেতে হতো। এখন সে নারীকে সহজেই পাওয়া যায় চোখের আড়ালে, কোনো প্রমাণ থাকে না, নিয়ে যাওয়া যায় পার্কের চিপায়, লাইব্রেরিতে স্টাডির অসিলায়, খালি ফ্ল্যাটে, হোটেলে, অফিসে কিংবা মিডিয়ায় সুযোগ দেবার লোভ দেখিয়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভোগ, গর্ভপাত, ড্রেনে পড়ে থাকা নবজাতক, ভিডিও তুলে ছেড়ে দেওয়া।
বেশ ইন্টেলেকচুয়াল এক এক্স-মুসলিম নাস্তিক নারীবাদী তার ফেসবুক প্রোফাইলে নিয়মিত তার গ্রুপসেক্স ও সেক্সটয়ের ছবি আপলোড করে। আরেক এক্স-মুসলিম নারীবাদীকে জিগ্যেস করা হয়ে ছিল: নাস্তিক ফেমিনিস্ট হয়ে আপনার অর্জন কী? তার উত্তর: আমি এখন নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারি। দেশী নারীবাদীদের প্রায়ই দেখা যায় পিরিয়ডের রক্তমাখা প্যাডের ছবি বা অন্তর্বাসের ছবি আপলোড দিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে। আহ কী অর্জন! আল্লাহ-রাসূল-সালাফদের অস্বীকার করে কতটুকু স্বাধীন হইবা বোন? এতটুকু হলে চলবে?
টিকাঃ
১. আম্মার ইবনু ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন প্রকারের লোক কোনোদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যথা: দাইয়ুস, পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি।' [শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ১০৩১০; মারিফাতুস সাহাবা, আবু নুআইম : ৫২০৮, ৫২০৯; মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি ৬৭৭; আত-তাওহিদ, ইবনু খুযাইমা: খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা : ৮৬৫; সহিহুল জামি: ৩০৬২। হাদিসটি সহিহ।]
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে হারাম (নিষিদ্ধ) করেছেন—মদে আসক্ত ব্যক্তি, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ুস, যে তার পরিবারে নোংরামি সমর্থন করে।' [মুসনাদু আহমাদ: ৫৩৭২, ৬১১৩, ৬১৮০; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৪৪; মুসনাদুল বাযযার : ৬০৫০, ৬০৫১; শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৭৪১৬; সহিহুল জামি: ৩০৫২, ৩০৬৩। হাদিসটি সহিহ।]
এখানে একটি মূলনীতি স্মরণ রাখা দরকার, কুফর-শিরকে লিপ্ত না হয়ে থাকলে ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করা প্রত্যেক মুমিনই একদিন না একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। গুনাহের কারণে যতদিনই সে জাহান্নামে থাকুক না কেন, আল্লাহ একদিন না একদিন তার ঈমানের বদৌলতে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করবেন। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহর স্বীকৃত মূলনীতি ও আকিদা। সুতরাং, যেসব আয়াত-হাদিসে কোনো গুনাহের কারণে স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকা কিংবা জান্নাতে কোনোদিনও প্রবেশ না করার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ধমকের অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ সেসব আয়াত-হাদিসে প্রকৃত অর্থেই চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকা বা কোনোদিনও জান্নাতে না যাওয়ার কথা বোঝানো হয়নি; বরং গুনাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের কথা সাধারণত কঠিন ধমক ও দীর্ঘ শাস্তি বোঝানোর উদ্দেশেই বলা হয়ে থাকে। গুনাহের জঘন্যতা ও ভয়াবহতা বোঝানোর জন্যই অনেক সময় এমন কঠিন ধমকি দেওয়া হয়ে থাকে। আরবি ভাষায় শব্দের এমন রূপক ব্যবহারের অনেক প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত আছে। তাই এ ব্যাপারটিতে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, যেন কোনোরূপ বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়।—শারয়ি সম্পাদক
২. সহিহ বুখারি : ৬৯১৪; সহিহ মুসলিম: ২১২৮; জামি তিরমিযি: ১৪০৩; সুনানু নাসায়ি: ৪৭৪৯, ৪৭৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২০৫৪, ২৬১১, ২৬৮৬, ২৬৮৭; মুসনাদ আহমাদ ৬৭৪৫, ১৬৫৯০, ১৮০৭২, ২০৫০৬, ২০৫১৫।
১. এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত জানতে লেখকের রচিত 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০' বইটি দেখা যেতে পারে।