📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.১ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা

📄 ১.১ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা


খুব খারাপ শোনাবে কথাগুলো। দাঁত চেপে শুনবেন আর নিজের জীবনের সাথে মেলাবেন। কসম আল্লাহর, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে আমাদের জীবন থেকে বের করে দিয়েছি। আল্লাহ বলছেন-লিল্লাহি মুলকুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর। [২] মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) করে ছেড়েছি। আমি সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তাদেরকে দাওয়াহর নিয়তে নসিহত করছি। আপনারা তাওবা করুন, আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করুন। কার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন? কাকে বাদ দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন? কাকে বাদ দিয়ে সংবিধান করছেন? ইউরোপীয়দের পাল্লায় পড়ে আল্লাহর সাথে অনেক লড়েছেন, আর নয়। এবার ক্ষান্ত দিন।

>> 'আল্লাহর ওপর বিশ্বাস'-এর কোনো জায়গা আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে নেই। কোনো পলিসিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রাখা হয় না। আল্লাহ এই পলিসিতে কী করতে বলেছেন, তা বলার মতো লোক আপনাদের পলিসি লেভেলে থাকে না। একজন নামেমাত্র সংবিধানে ঢুকিয়েছিল, সেই নামেমাত্র 'আল্লাহর নামটুকু সংবিধানে থাকবে', তাও আমাদের সহ্য হয়নি। দলাদলি আর দলীয় অন্ধত্ব এই পর্যায়ে গেছে, আল্লাহর নাম... কার নাম? 'আল্লাহর নাম' আমরা বের করে দিয়েছি।

কাফিরদের সন্তুষ্টি পেতে, কাফিরদের দেওয়া উন্নয়নসূচকে স্থান পেতে আমরা নারীনীতি করি কাফিরদের মতো করে। আল্লাহ ও রাসুল কী বললেন, তার সেখানে জায়গা নেই।

অসাম্প্রদায়িকতার নামে শিক্ষানীতি করি বিধর্মী-স্তুতি দিয়ে, যা আল্লাহ ও রাসুল থেকে নিয়ে যায় দূরে বহু দূরে। খোদ পশ্চিমা একাডেমিয়ায় যেগুলো এখনো বিতর্কিত, সেগুলোকে (নারীবাদ, মানবতাবাদ, বিবর্তনবাদ প্রভৃতি কুফরকে) ধ্রুবসত্য ও আধুনিকতার স্কেল হিসেবে শেখাই আমাদের সন্তানদের।

এমনি করে আইনসভায় আইন করার সময় আল্লাহ ও রাসুলের কথার কোনো স্থান নেই। মদ ও পতিতার লাইসেন্স দেবার সময় আল্লাহর সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা নেই।

অর্থব্যবস্থায় 'আল্লাহ যে সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন' তার কোনো পরোয়া নেই। [১] আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে আমাদের কোনো ভয় নেই।

পরিবার পরিকল্পনা নামে আমরা একটা মন্ত্রণালয়ই বানিয়ে নিয়েছি যাদের কাজ 'আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করা' (টিউবেকটোমি ও ভ্যাসেকটোমি)।

দণ্ডবিধিতে আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাখিনি। আল্লাহ আর তাঁর রাসূল এ যুগে 'অচল'? কুরআনে নানা জায়গায় বিধান-আইন বলে দিয়ে আল্লাহ বলছেন: 'এগুলো হলো আল্লাহর নির্ধারণ। আর (যারা এটা অস্বীকার করবে, সেই) কাফিরদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' [২] মহারাজাধিরাজ আল্লাহর বেঁধে দেওয়া দণ্ডকে 'অমানবিক' বলেছি, 'এ যুগে অচল' বলেছি। কত বড় সাহস আমাদের! এত বড় সাহস গত ১৪০০ বছর মুসলিমরা কখনো দেখায়নি।
নামেমাত্র যেটুকু 'আল্লাহর ওপর বিশ্বাস' রাষ্ট্রনীতিতে কথার কথা হিসেবে ছিল, নাস্তিক-বাম মুরতাদ বুদ্ধিজীবী আর কাফির প্রতিবেশীকে পাশে পেতে সেটুকুও আমরা খেদিয়েছি। মুখে মুসলিম দাবি করে এত বড় স্পর্ধা আমাদের। আল্লাহকে বের করে দেওয়ার স্পর্ধা। আল্লাহর সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা না করার দম্ভ আর ঔদ্ধত্য আমাদের। সীমা বেঁধে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন 'খবরদার, এটুকু আমার সীমা, এই সীমা লঙ্ঘন করবে না।' আর আমরা দম্ভের সাথে ঘোষণা করছি 'আল্লাহর সীমা মানি না', 'আমরা ধর্মনিরপেক্ষ', মানে রাষ্ট্র চলবে ইউরোপীয় কায়দায়, এখানে আল্লাহর মতামতের মূল্য নেই। এগুলো কাফিরদের মুখে মানায়, একেকজন মুসলিম আমরা এই ঘোষণা দিচ্ছি আজ।

১.১.১ খুলে ফেললাম ফুলের মালা

মধ্যযুগে মুসলিম সাম্রাজ্য যখন জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতি, আইনের শাসন, নিত্যনতুন ভূখণ্ডে মাজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান ইত্যাদির অনন্য নজির তৈরি করছিল। ঠিক তখন মধ্যযুগে পোপ-যাজকদের সমর্থিত জমিদার ও রাজতন্ত্র ইউরোপের জনজীবন দুঃসহ করে তুলেছিল। অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ধর্মীয় দলাদলি, যুদ্ধ, মানব-রচিত বিকৃত খ্রিষ্টধর্মের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথায় অতিষ্ঠ ইউরোপ মুক্তি চাইল। ইউরোপের দার্শনিকরা জমিদারতন্ত্রকে উৎখাত করে গণতন্ত্র আর খ্রিষ্টীয় যাজকতন্ত্রকে উৎখাত করে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার কথা বলল। নতুন এই রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্ম বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো স্থান নেই। দুই অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই প্রেক্ষাপট। একদিকে ওহিভিত্তিক শাসনের ফলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত। আরেকদিকে মানব-রচিত ধর্মের কারণে স্বার্থান্বেষী যাজকশ্রেণি সমর্থিত শাসনের ফলে অন্যায়ের সয়লাব। দুটো দুই জিনিস। আজ ওরা গলা থেকে শেকল খুলে ফেলেছে বলে দেখাদেখি আমাকেও গলা থেকে ফুলের মালা খুলে ফেলতে হলো? একটু ভাবার ফুরসত হলো না কী করছি? কাকে দেখাতে গিয়ে কাকে রাগাচ্ছি? কাকে সাথে নিয়ে কার সাথে লাগতে আসছি?

ইউরোপ তাদের 'এনলাইটেনমেন্ট'-এ এসে সোকল্ড আলোকিত হয়েছে। আর আমরা তো আলোকিতই ছিলাম। আমাদের হিদায়াতের নুর তো সেই ৭ম শতকেই এসে গেছে।
» ১৭০০ সালে ব্রিটিশ আসার আগে আমরা তো বিশ্বে ১ নম্বর অর্থনীতির দেশই ছিলাম, চীনকে টপকে। [১] আজ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর কেন আমরা বনেবাদাড়ে মলত্যাগ করি, [২] বুঝতে এত কষ্ট কেন?

» ১৭৫৭ সালে পলাশী জয় আর ১৭৬০-এ শিল্পবিপ্লব। এত এত কারখানার পুঁজি কোথা থেকে কোথায় গেল, বুঝতে এত কষ্ট? [৩]

» ব্রিটিশের দুনিয়াজোড়া সাম্রাজ্য কারা গড়ে দিলো, কারা তাদের সব যুদ্ধের ব্যয় মেটাল, তাদের যুদ্ধব্যয় মেটাতে গিয়ে ১ম অর্থনীতির দেশটায় ১০০ বছরে ৫২ বার দুর্ভিক্ষে ৫ কোটি লোক কীভাবে মরে গেল, বুঝতে এত কষ্ট? [৪]

» ইউরোপের তকতকে পাথরের পথঘাট, ঝলমলে শহর-বন্দর, এত এত গবেষণার ফান্ডিং কোথা থেকে গেল?

বোকা আমি এখানে বসে ভাবছি: আরে ওরা বিজ্ঞান করে কত উন্নত হয়েছে, কত নারীবাদ করে কত উন্নত হয়েছে, হিউম্যানিজম করে কত উন্নত হয়েছে। আমরাও এগুলো করে মধ্যম আয়ের দেশ হব। মুক্তবাজার অর্থনীতি করে উন্নত বিশ্ব একদিন হবই হব। অথচ তারা উন্নত হয়েছে নিজেদের বাজার বদ্ধ করে, আমাদের শিল্প শেষ করে, শিল্পোন্নত ভারতবর্ষকে কৃষির দেশ বানিয়ে, নারী শ্রমিকদের অর্ধেক বেতন দিয়ে। নীলকুঠির সাহেব দাদনের অত্যাচার করে, মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে ৫ কোটি লোক না খাইয়ে মেরে এখন এসেছে হিউম্যানিজমের কটকটি নিয়ে। আর তাই কিনতে 'আবাল' বৃদ্ধবণিতা মুসলিম ছুটছি তো ছুটছিই। জাতিসংঘ নামের একটা কাকতাড়ুয়া বানিয়ে পেছন থেকে বাধ্য করছে ওদের এসব আইডিয়া দিয়ে পলিসি বানাতে, যাতে সম্পদের সাপ্লাইটা চিরকাল ইউরোপমুখীই থাকে। উপনিবেশ ছাড়লেও আয়টা যেন না ছোটে। গণতন্ত্র নামক লুডুখেলা জিনিস শিখিয়ে দিয়ে গেছে, যে তাদের মনমতো পলিসি করবে না, তাকে যেন বদলে দেওয়া যায় পরের দানে।

১.১.২ যুদ্ধটা কার সাথে

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন ১৪ শ' বছর আগে-

আমার উম্মত আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) কদমে কদমে অনুসরণ করবে। তারা গোসাপের গর্তে ঢুকলে এরাও সেধোঁবে [১]

আজ ব্রিটিশ আইন আমাদের আইন, ব্রিটিশ বিচারব্যবব্যবস্থা আমাদের বিচারব্যবস্থা, ব্রিটিশ এন্ট্রান্স-এফএ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, ব্রিটিশ অর্গানোগ্রাম আমাদের শাসনব্যবস্থা। ওদের গণতন্ত্র আমাদের কেন নিতে হলো? আমরা তো আওরঙ্গজেবের শাসনেই ১ম অর্থনীতির দেশ ছিলাম, শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আমাদের। [২] ওদের ব্রিটিশ কমন 'ল' কেন নিতে হলো? আমাদের শারিয়া আইনেই অপরাধের হার ছিল সর্বনিম্ন। [১] ওদের ধর্মনিরপেক্ষতা আমরা কেন নিলাম? এমনিতেই হিন্দুরা উচ্চ পদে দেদারসে নিয়োগ পেত, [২] যদিও তার ফল মুসলিমদের জন্য ক্ষতিই বয়ে এনেছে বারবার।

ওদের মিথ্যা উপাস্য মনুষ্যপুত্র যীশুকে ওরা বের করেছে। আমার প্রবল পরাক্রমশালী একক সৃষ্টিকর্তা, স্বত্বাধিকারী, আল-কাহহার, প্রতিশোধ গ্রহণকারী (যুনতিকাম) সর্বশক্তিমান আল্লাহকে আমি কেন বের করে দিলাম আমার সংবিধান থেকে, আমার কোর্ট থেকে, আমার টেক্সটবুক থেকে, আমার অর্থনীতি থেকে, আমার পলিসি থেকে। কোন আক্কেলে, কোন কলিজায়? কে দিলো আমাকে এত বড় সাহস? প্রশ্ন করেন নিজেকে। বুক একটুও কাঁপল না মদের লাইসেন্স দেবার সময়। কলিজা একটুও কাঁপল না পতিতালয়ের লাইসেন্স, সুদকে বৈধতা দেবার সময়। কার সাথে লাগতে যাচ্ছি? কে তিনি?

'আর যার ওপর আমার ক্রোধ আপতিত হয়, সে তো নিশ্চিতই ধ্বংস হয়ে যায়। [১]'

দেশ পরিচালনায় যারা রয়েছেন, সকলের প্রতি অধমের দিল-চেরা আহ্বান। দুহাত জোড় করছি, আপনারা তাওবা করেন। সংসদে তাওবা করে দুআ হয়েছে। কিন্তু আসল ভুলটা কোথায়, স্পর্ধাটা কোথায়, সীমা ছাড়িয়েছি কোথায়, তা দেখানোই আমার বই লেখার উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাওবা করুন। সকল পলিসি রিচেক করুন। আল্লাহ-দ্রোহী আইন, পলিসি সব বাদ দিন। ভয় করুন। করোনা হয়তো চলে যাবে, কিন্তু ওই আল্লাহকে ভয় করুন যার কাছে অসহায় অবস্থায় খালি হাতে আপনাকে যেতে হবে। তিনি লক্ষবার আপনার জ্যান্ত চামড়া তুলে লক্ষবার নতুন চামড়া দিতে পারেন, প্রতিবার আপনি ছাল-ছিলার অসহনীয় যন্ত্রণাময় স্বাদ আস্বাদন করবেন। তাঁর ক্রোধকে ভয় করুন। আপনার অফিস, আপনার সংসদ, আপনার গোপন শলাপরামর্শ কিছুই তাঁর আওতা, তাঁর কাউন্টের বাইরে নয়।

লিখতে লিখতে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কেন তাঁর ক্রোধ আমাদের ওপর আসবে না, আমাকে বলেন। স্পর্ধার কী বাকি রেখেছি আমরা গত ১০০ বছর?

টিকাঃ
২. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এদুয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর সার্বভৌমত্ব-রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২০)
১. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৯
২. সুরা মুজাদালাহ, আয়াত :৪
১. সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহিমাহুল্লাহর সময়ে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনকে পেছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে (World's Largest Economy) পরিণত হয়, যার মূল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর জিডিপি ছিল সে সময়ের সমগ্র বিশ্বের ৪ ভাগের ১ ভাগ।
Angus Maddison, The World Economy,, OECD Publishing (2003), page: 261
২. Dean Nelson (25 June 2012), India 'the world's largest open air toilet', The Telegragh
৩. Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
'পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ স্রোতের মতো এসে জমা হতে থাকে লন্ডনে। ১৭৬০ সালের আগে যেখানে শিল্পকারখানার নাম-গন্ধও ছিল না, সেখানে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে' লর্ড মেকলে লিখেছেন (Lajpat Rai, Unhappy India, 1928):
'ইংল্যান্ডে সম্পদ আসত সমুদ্রপথে। ওয়াট ও অন্যদের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইংল্যান্ডের যেটুকু কমতি ছিল, ইন্ডিয়া সেটুকু সরবরাহ করেছে। ইংল্যান্ডের পুঁজি বহুগুণে বাড়িয়েছে ভারতীয় সম্পদের প্রবেশ।... শিল্পবিপ্লব, যার ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সম্ভব হয়েছিল কেবল ইন্ডিয়ার সম্পদের কারণে। যা লোন ছিল না, এমনিতেই নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তা নাহলে স্টিম ইঞ্জিন ও যন্ত্রশিল্প পড়েই থাকত ইংল্যান্ডের। ইংল্যান্ডের উন্নতি মানে ভারতের লোকসান-এমনই লোকসান, যা ভারতে শিল্পকে ফাঁকা করে দিয়েছিল, কৃষিকে স্থবির করে দিয়েছিল। যেকোনো দেশ যদি এইভাবে পাচার করা হয়, সে ধনী-সম্পদশালী হলেও নিঃস্ব হয়ে যাবে।'
৪. ১৮০১ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত ১০০ বছরে ৩১টা মন্বন্তরে ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ মরেছে- 'না খেয়ে'। 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
১. আবু সাইদ খুদরি রাযিয়াল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, 'অবশ্য অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দবের (গুইসাপ-গিরগিটির) গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, (পূর্ববর্তী জাতি বলতে) এরা কি ইহুদি-নাসারা? তিনি বললেন, তাহলে আর কারা?' (সহিহ বুখারি: ৭৩২০; সুনান ইবনি মাজাহ: ৩৯৯৪; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৬৭০৩; মুসনাদু আহমাদ: ৯৮১৯, ১০৬৪১)
২. উইলিয়াম হান্টার তার ইন্ডিয়ান মুসলিমস গ্রন্থে লেখেন-
'এ দেশটা আমাদের শাসনে আসার আগে মুসলিমরা শুধু শাসন ব্যাপারেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতি ছিল। ভারতের যে প্রসিদ্ধ (ইংরেজ) রাষ্ট্রনেতা তাদের ভালোভাবে জানেন, তার কথায়: ভারতীয় মুসলিমদের এমন একটা শিক্ষাপ্রণালি ছিল, যেটা আমাদের আমদানি করা (ব্রিটিশ) প্রণালির চেয়ে নিম্ন হলেও (!) কোনো ক্রমেই ঘৃণার যোগ্য ছিল না। তার দ্বারা উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন হতো। সেটা পুরোনো ছাঁচের হলেও তার ভিত্তিমূল সুদৃঢ় ছিল এবং সেকালের অন্য সব প্রণালির চেয়ে নিঃসন্দেহে উত্কৃষ্ট ছিল। এই শিক্ষাব্যবস্থায়ই তারা মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য সহজেই অধিকার করেছিল।' [ইন্ডিয়ান মুসলিমস, উইলিয়াম হান্টার, পৃষ্ঠা: ১১৬]
১. বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সময় ভারতে এসেছিলেন স্যার থমাস রো (১৫৮১ - ১৬৪৪)। তিনি তাঁর ভ্রমণগাঁথায় উল্লেখ করেন: সকলের ভিতর আতিথেয়তা ও দানের ঝোঁক, তার চেয়েও বড় কথা দুর্বলকে রক্ষা করা ও তাদের জানমালের নিরাপত্তার প্রতি খেয়াল রাখা— এসব এমন বৈশিষ্ট্য যা দেখে এ জাতিকে অশিক্ষিত বর্বর বলা যায় না। তাদের যেসকল গুণের কথা বললাম, তাতে ভারতীয়দেরকে ইউরোপীয় জাতিসমূহের তুলনায় কোনোভাবেই নীচ বলা যায় না। [The Embassy of Sir Thomas Roe to India 1615-1619]
২. আকবরের আমলে ১৪ জন হিন্দুকে 'মনসবদার' উচ্চপদে নিয়োগ দেন। আর আওরঙ্গজেব ওই পদে ১৪৮ জন হিন্দুকে নিয়োগ দিয়েও দিলেন। [মোগল গবর্নমেন্ট, শ্রীশর্মা, পৃষ্ঠা: ১১১] গভর্নর পদেও হিন্দুদের নিয়োগ দেওয়া হতো। যশোবন্ত সিংকে মুসলিম এলাকা কাবুলের গভর্নর বানিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। এমনকি শত্রু শিবাজির আপন জামাই অচলাজি ৫ হাজারি মনসবের সেনাপতি ছিল, আরেক আত্মীয় আজুজি ছিল ২ হাজারি। এছাড়া তার সেনাপতিদের মাঝে ছিল রাজা রাজরূপ, অর্ঘ্যনাথ সিং, দিলীপ রায়, কবির সিং, প্রেমদেব সিং। রাজস্ব বিভাগের প্রধান ছিলেন রসিকলাল ক্রোরী। [চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম মোর্তজা] ভূমি ব্যবস্থাপনা (কানুনগো বিভাগ) ছিল একচেটিয়া হিন্দুদের হাতে। সামগ্রিকভাবে হিন্দু-মুসলিমে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য ছিল। [বাংলার আর্থিক ইতিহাস, সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৫]
হিন্দুদের ব্যাপারে মোগল সম্রাটগণ, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ প্রমুখের এই উদারনীতি মুসলিমদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি। অমুসলিমদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ আলিমদের নিষেধাজ্ঞা আছে। যার বাস্তবতা হলো, মুসলিম ভূমি বারবার হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
১. সুরা ত-হা, আয়াত: ৮১

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.২ ক্যারিয়ারে সেক্যুলার

📄 ১.২ ক্যারিয়ারে সেক্যুলার


এতটুকু পড়ে হয়তো নিজেকে দায়িত্বমুক্ত মনে হচ্ছে। স্পর্ধা যা দেখানোর তা তো ক্ষমতাবানরা দেখিয়েছে, আমরা তো দেখাইনি। আমরা তো আম-মুসলিম। রাষ্ট্র-বিচার-আইন-শাসন ওসব তো আর আমার হাতে ছিল না। না, বন্ধু। আমি আপনি এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছি গত ১০০ বছর। নিজের মতামত, ভোট, মেধা, অস্ত্র, শ্রম দিয়ে আল্লাহর সাথে স্পর্ধাকারী সিস্টেমকে সমর্থন দিয়েছি। আমরা মনে করেছি, বিশ্বাস করেছি 'রাজনীতিতে আল্লাহর কোনো জায়গা নেই'। এই আপ্তবাক্যকে আউড়িয়েছি, শিখিয়েছি, দম্ভভরে ঘোষণা করেছি। কত বড় সাহস আমার, আমি আল্লাহকে বের করে দেবার কথা বলেছি, আল্লাহর দেওয়া মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, আল্লাহর খেয়ে আল্লাহর পরে। আপনারা কী ভাবতে পারছেন আমরা কী করেছি? What we have done? 'আল্লাহ' মুক্ত রাজনীতি করেছি গত ১০০ বছর। কী জানি কাকে দেখানোর জন্য, কাদের সাপোর্ট পেতে পেছনে ফেলে রেখেছি কুরআনের অকাট্য সব বিধান। যেন এসব কুরআনে নেই।

চাকরিজীবনে আল্লাহকে বের করে দিয়ে চাকরি খুঁজেছি। চাকরিতে আবার আল্লাহ কেন আসবে? জীবিকা নিয়ে আল্লাহ কী বলল, তাঁর নবি কী বলল, কোনো তোয়াক্কা করিনি। কেউ বলে দিলেও পাত্তা নেই আমার কাছে। ওসব কি এ যুগে চলে? যেন বললাম, 'মধ্যযুগীয় আল্লাহ' আর তাঁর 'মধ্যযুগীয় রাসুল'-এর কথায় এই আধুনিক যুগ চলবে? (নাউযুবিল্লাহ) এটাই তো বলতে চাই, না কি? কথা ও চিন্তার 'গতিপথ' কোনদিকে দেখেন? আমাদের কথা আর আমাদের কাজে কী পরিমাণ স্পর্ধা প্রকাশ পায়, দেখেছেন? এগুলোর মানে কী দাঁড়ায়? সহিহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চুক্তিলেখক ও চুক্তির সাক্ষীদের ওপর লানত করেছেন। [১] নবিজির অভিশাপের কী মূল্য? ফুঃ ওসব শুনলে জীবন চলে? আলহামদুলিল্লাহ, আজ সুদের চুক্তিলেখকের চাকরি পেয়েছি। মেয়ের জামাই কী করে? জামাই সুদের চুক্তিলেখক। মেয়ে মাইক্রোসুদ এনজিওতে চাকরি করে। একবারও তোয়াক্কা করিনি আল্লাহ কী বলেছেন এই চাকরির ব্যাপারে। এই লেখাটি পড়তে পড়তে নিজের অন্তরের দিকে তাকান। আল্লাহর যুদ্ধ ঘোষণার কোনো পাত্তা আমার কাছে আছে কি না।

দারিদ্র্যের ভয়ে সুদে ঋণ নিয়েছি, ব্যবসা করব। কে ঘুচাবে আমার দারিদ্র্য? কে বণ্টন করে রিজিক? আমি কি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে রিজিক ছিনিয়ে আনতে চাচ্ছি? আল্লাহ বলছেন কুরআনে: 'আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন... এরপর যদি তোমরা সুদ ত্যাগ না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে 'যুদ্ধের' ঘোষণা শুনে নাও।' [২] হোয়াট? আমরা চাকরি-ব্যবসা করছি, নাকি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করছি? আমরা করতে চাচ্ছিটা কী আসলে? একটু ভাবেন ভাই, আমার পরিচয়টা কী আসলে? মুসলিম? মুসলিম মানে তো আত্মসমর্পিত, এর অর্থ তো 'প্রতিপক্ষ' নয়। আমার ক্যারিয়ার থেকে (৮ ঘণ্টা দিনে) মহাশক্তিধর আমার Owner-কে আমি বের করে দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছি। হোম লোন, কার লোন, বিয়ে লোন, শিক্ষা লোন। হে মহাশক্তিধর পরাক্রান্ত আল্লাহর 'প্রতিপক্ষ', ক্ষান্ত দেন, ক্ষান্ত দেন। নিজের ওপর রহম করেন। আল্লাহর ক্রোধকে চিনে নেন।

সুরা মায়িদায় পর পর তিনটি আয়াতে আমাদের Owner, আমাদের যিনি বানিয়েছেন, সেই আল্লাহ বলছেন : وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ 'আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা অনুসারে যে যারা বিচারকার্য করে না...' প্রথমে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (তারাই কাফির, অবিশ্বাসী), পরের আয়াতে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (তারাই জালিম, অত্যাচারী)। পরের আয়াতে বলছেন : فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (তারাই ফাসিক, গর্হিত পাপাচারী)। [১] আল্লাহর এই কথাগুলোর আর কোনো ব্যাখ্যা দরকার আছে? [২] ভার্সিটিতে সাবজেক্ট চয়েসের সময়, সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দেবার সময়, একবারের জন্যও মন বলেনি আমার Owner কী বলেছেন দেখি। এই সাবজেক্টটা নেব, না নেব না? এই চাকরিটা করব, না করব না? আমার জীবনে আমার আল্লাহর মতামতের কী মূল্য আমি দিয়েছি? বলেন, কী মূল্য আমার কাছে সর্বশক্তিমান শাস্তিদাতা এবং একইসাথে স্নেহশীল অভিভাবক Owner আল্লাহর। আমার চাকরিই আজ আল্লাহ-বিরোধী আইন প্রয়োগের চাকরি। আমার শক্তি-মেধা-শ্রম-অস্ত্র দিয়ে আমি আল্লাহ-বিরোধী আইনকে টিকিয়ে রেখেছি। উঁচু থেকে উঁচু পদে উন্নীত হয়েছি। হে মুসলিম ভাই, আমরা কি মুসলিম আছি? নাকি আল্লাহর প্রতিপক্ষ হয়ে গেছি? এর পরের প্রোমোশন তো 'কাফিরুন-জলিমন-ফাসিকুন' (কাফির-জালিম-ফাসিক)। আল্লাহ বলছেন—এখনো কি ঈমানদারের সময় আসেনি অন্তর বিগলিত হবার? নিজেই বিচার করেন, এই লেখা পড়ার পর আপনার অন্তর বিগলিত, নাকি উদ্ধত? কোনো ব্যাখ্যা দিলাম না, বলবেন অপব্যাখ্যা করছি। জাস্ট কুরআন কোট করলাম।

ফেসবুকে ডাক্তারদের বেশকিছু গ্রুপ আছে। ডাক্তাররা জানেন ঔষধের সাথে পথ্য (সহযোগী খাবার) দেওয়া হয়। এরপরও আমি নিশ্চিত জানি, পথ্য হিসেবে মধু ও কালোজিরার আয়াত ও হাদিসগুলো সেখানে দিলে হিন্দু ও মুরতাদরা 'হা হা' রিয়‍্যাক্টে ভরিয়ে দেবে। অথচ হলুদ-আদা-রসুন-ছাগলের দুধের কথা বললে দিতো না। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, বহু মুসলিম দাবিদার, এমনকি নামাযি-হিজাবিরাও হাহা দেবে। অনেকে বলবে, কোনো 'মোল্লাদের গ্রুপে' দিতে, এখানে ধর্মীয় আলাপ না করতে। এই বিভাজনটা কীভাবে এলো? কে আমাদেরকে বলে দিলো : সব আলাদা করে ফেলো, এগুলো থেকে আল্লাহকে আউট করে দাও। আল্লাহর নাম নিবা শুধু মসজিদে-মাদরাসায়। মসজিদ থেকে বেরিয়ে প্যান্টের ভাঁজ খুলে ফেলবা, ভুলে যাবা আল্লাহ নামে কেউ আছেন। মসজিদের ভেতরে করো ঠিক আছে, বাইরে আল্লাহর আর এখতিয়ার নেই। জীবনের ক্ষেত্রগুলো আলাদা করে দেওয়া, সবখানে ধর্ম টেনে আনবেন না—এসব শ্লোগান তো মুসলিমের মতো শোনায় না। তাহলে আল্লাহ যে দণ্ডবিধি দিলেন, তার ওপর আমাদের ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে অর্থব্যবস্থা দিলেন তার ওপর ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে পরিবার-ব্যবস্থা দিলেন, তার ওপর ঈমান কোথায় আমার? তাহলে কি আমরা কুরআনের কিছু অংশ মানি, কিছু মানি না?

আমরা তো মুসলিম ছিলাম। আমরা তো আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলাম। আমাদের তো সবখানেই আল্লাহ ছিলেন। অফিসে, আদালতে, ব্যবসায়, অর্থব্যবস্থায়, বিচার, শিক্ষায়। তখন জবাবদিহিতা ছিল, দুর্নীতি-ঘুষ-আত্মসাৎ আল্লাহর উপস্থিতির স্মরণে ভয়ে কল্পনাতেও আসতে পারত না। সে অবস্থায়ই তো আমরা সব সভ্যতার শীর্ষে ছিলাম। হিরা শহর থেকে মদিনা ১২০০ মাইল একজন নারী একেলা উটে চড়ে এসেছে ((অবশ্য এভাবে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া নারীদের একাকী ভ্রমণ শরিয়াহসম্মত নয়), কেউ তার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি সেসময়। [১] সুয়ং খলিফার বিরুদ্ধে বিচার হয়েছে, রায় গেছে সংখ্যালঘু ইহুদির পক্ষে। [২] এ কেমন আইন, এ কেমন সিস্টেম, এ কেমন অফিস, এ কেমন বাজার? ইহুদি আসামি মুসলিম হয়ে গেছে। কাফির ইসলাম গ্রহণ করেছে সিস্টেম 'দেখে'। যাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে বোঝাতে পারতেন না, সে নিজচোখে দেখে বুঝে গেছে। আজ আমরা দেখাতে পারছি না। শারিয়া সবচেয়ে বড় দাওয়াত। সুখ-সমৃদ্ধি-নিরাপত্তা-ইনসাফ-আইনের শাসন-অধিকার-জ্ঞানবিজ্ঞানের চূড়ান্ত রূপ তো আমরা দেখেছিলাম আল্লাহর আইনের অধীনেই। তাহলে কীসে আমাকে বাধ্য করল আল্লাহকে পরিত্যাগ করতে?

يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ

হে মানব সম্প্রদায়! কীসে তোমাকে বিভ্রান্ত করল তোমার মহান রব সম্পর্কে?" (কী তোমাকে ধোঁকা দিলো, যে তুমি তোমার বদান্য রবকে পরিত্যাগ করলে?) [৩]

আমার আজ প্রচুর টাকা দরকার, সমাজে সম্মান দরকার, উঁচু পদ দরকার। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে। প্রয়োজনে আল্লাহর বিরুদ্ধে গিয়ে, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে, আল্লাহ-বিরোধী এই সিস্টেমটার প্রহরী হয়ে। অথচ আমি দুনিয়াতে আসার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আল্লাহকে খুশি করা, যেকোনো কিছুর বিপরীতে আল্লাহর দাসত্ব করা।

আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্য। [১]

এই উপর্যুপরি অবাধ্যতা, বিদ্রোহ আর গুনাহের ওপর অটলতা আমাকে 'দাস' (বান্দা) হয়ে কবরে যেতে দেবে তো? নাকি তাঁর 'প্রতিপক্ষ' হয়ে যাব কবরে? বিশ্বাস করুন, আমার লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রিজিকের জন্য আজ মহান আর-রাজ্জাকের বিরুদ্ধে আমি? ইজ্জতের জন্য আজ মহাশক্তিধর আল-মুইজ্জের বিরুদ্ধে আমি? কে আমি? আজ আমার এত শক্তি, এত সাহস? আল্লাহর ক্রোধের উপযুক্ত আমি ছাড়া আর কে?

টিকাঃ
১. জামি তিরমিযি: ১২০৬; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫-২৭৯
১. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪৪, ৪৫, ৪৭
২. কুরআনের স্পষ্ট আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর দেওয়া আইন অনুসারে বিচার না করলে সে কাফির, ফাসিক ও জালিম। আমাদের জানার বিষয় হলো, মানব-রচিত আইনে বিচার করা সুস্পষ্ট বড় কুফর নাকি কুফর দুনা কুফর (ছোট কুফর) তথা ফিসক? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া মুশকিল। মৌলিকভাবে বলা যায়-
■ কেউ আল্লাহর আইনের বিপরীতে কোনো আইন প্রণয়ন করলে সে সুনিশ্চিতই কাফির।
■ অনুরূপ যে এ ধরনের কাজ সাপোর্ট করে মানব-রচিত আইনকে সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে তারও একই বিধান।
■ আর আইন নিজে না বানিয়ে কেবল আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনে বিচার করলে সেক্ষেত্রে এর উত্তর হবে, যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সে আল্লাহর আইনকে সঠিক এবং সে অনুসারে বিচার করাকে আবশ্যক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পার্থিব স্বার্থে কখনো ভিন্ন আইনে বিচার করে অথবা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তাহলে সে কাফির নয়; বরং জালিম বা ফাসিক। এ ধরনের কুফরকে বলা হবে 'কুফর দুনা কুফর।' অর্থাৎ এর কারণে সে মারাত্মক গুনাহগার হলেও দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে না।
■ আর যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানব-রচিত আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং এটার প্রতি কোনো ঘৃণা ও বিদ্বেষ না রেখে সেই আইন অনুসারেই সে নিয়মিত বিচার-আচার করে থাকে কিংবা সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনকেই সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে অথবা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকল্পে এ আইন অনুসারে ফয়সালা করাকে বাধ্যতামূলক বিশ্বাস করে তাহলে তার কুফর ও ইরতিদাদের বিষয়টি সুস্পষ্ট। এখানে তার কুফরির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এটাকে 'কুফর দুনা কুফর' (ছোট কুফর বা ফিসক, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না) বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করে, তারা নিশ্চিত দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে আল্লাহদ্রোহীদের খুশি করতে চায়। আমরা এদের থেকে মুক্ত এবং তারাও আমাদের থেকে মুক্ত। শারয়ি সম্পাদক
১. আদি ইবনু হাতিম থেকে তিরমিযির বর্ণনা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, আল্লাহ অবশ্যই এ দ্বীনকে এমন পূর্ণতা দেবেন, একাকিনী নারী হাওদার ওপর চড়ে সুদূর হিরা শহর থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তাতে কোনো লোকের আশ্রয় দানের প্রয়োজন তার হবে না।... আদি ইবনু হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এই তো আমি দেখছি হাওদানশিনা নারী কারো নিরাপত্তা সঙ্গী ছাড়াই হিরা থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে যাচ্ছে। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৯-১৩০)
২. ঘটনা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময়কার। খলিফা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেন এক ইহুদির দায়ের করা মামলায়। বর্মের মালিকানা নিয়ে খলিফা আর ইহুদির মাঝে বিরোধের ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। (তাবিয়িদের ঈমানদীপ্ত জীবন, ড. আব্দুর রহমান রাফাত পাশা, রাহনুমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১০৮) এবং (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৫)
৩. সুরা ইনফিতার, আয়াত : ৬
১. সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.৩ আমার আমি

📄 ১.৩ আমার আমি


একটু চোখ বুজি চলেন। আমার সাথে আমার Owner-এর সম্পর্ক কেমন? সম্পর্ক মানে ভাব-বিনিময়, টু-ওয়ে। তিনি আমাকে যা যা বলেছেন, তার প্রতি আমার রেসপন্স কেমন? নাকি তাঁকে আমার দরকার নেই? সম্পর্ক পাতানো নিষ্প্রয়োজন আমার কাছে। যেখানে তিনি চাচ্ছেন আমার সাথে সম্পর্ক করতে—
> আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাকে স্মরণ করব। [২]
> আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো। [৩]
> তুমি একহাত এসো, আমি ২ হাত আসছি। হেঁটে আসো, আমি দৌড়ে আসব। [৪]

১.৩.১ আমি আল্লাহকে পাত্তা দিচ্ছি না? আমি কার ডাক অগ্রাহ্য করছি? কে তিনি? অফিসের বস, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট? সে (পড়ুন তিনি) আল্লাহ। আসমান জমিনের একচ্ছত্র Owner. বছরের পর বছর আমি সালাত পড়ছি না, কাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছি? পড়লেও জুমআয় দুটো ঠোকর দিয়েই দৌড়। বছরের পর বছর কুরআন খোলার সময় আমার হচ্ছে না, মানে পাত্তা পাচ্ছে না। জিকির কাকে বলে তা জানিও না, জানার প্রয়োজনও মনে করছি না। Who cares? আল্লাহর কসম, এই করোনা, এই ভীতি এগুলো কিচ্ছু না। সামনে আমার সাথে যা যা হতে যাচ্ছে তার তুলনায় এসব কিচ্ছু না। 'একবার দহনের পর তাকে আমি দেবো নতুন ত্বক, যাতে সে যন্ত্রণার স্বাদ ভোগ করতে পারে।' [১] এভাবে অসীম দিন কেটে যাবে, আবার সেখানকার একদিন আমাদের পার্থিব হিসেব অনুযায়ী হাজার দিনের সমান। রেডি? কী করছি আমরা? বা কী করছি না আমরা? আমার জীবন থেকেই তো আমি আল্লাহকে বের করে দিয়েছি।

১.৩.২ ফেসবুকই ধরুন। দ্বীনী কনটেন্ট আমি অপ্রয়োজনীয় মনে করি। স্কিপ করি। 'নট মাই টাইপ' মনে করি। দ্বীন-আখিরাত-'আল্লাহ' আমার প্রায়োরিটি লিস্টে সবার শেষে থাকে। আমার ২৪টা ঘণ্টা ক্যারিয়ার-ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডস-টিভি-গেমস সবকিছুর মাঝে ডিস্ট্রিবিউটেড। দিনরাতের স্রষ্টা আমার জীবন-মৃত্যুর হুকুমদাতা আমার Owner আল্লাহর জন্য আমার এক মিনিটও সময় নেই। বন্ধু একটা ইসলামি পোস্টে আমাকে ট্যাগ করেছে, সেটা পড়ার জন্য ১ মিনিটও নেই। 'তাদের অন্তর আছে, তারা ভাবে না; চোখ আছে, তবু দেখে না; কান আছে, তাও শোনে না।' [২] দুনিয়ার বাকি সবকিছু আমার কাছে আল্লাহর চেয়ে ইম্পর্টেন্ট। আল্লাহ আমার জীবনে সবচেয়ে আন-ইম্পর্টেন্ট। I am not interested in ALLAH. ওফ!! আমাদের কথা-কাজ-চিন্তাকে ভেক্টর রাশি ধরেন, দেখেন এদের গতিপথ। শয়তান এত এত বছর ইবাদতের পর একটা বার মাত্র স্পর্ধা দেখিয়েছিল। আর আমি দিনে কতবার স্পর্ধা দেখাই? কতবার? আমার তো একটা শেষ আছে, একদিন তো সব ঔদ্ধত্য থামবে। তারপর?

১.৩.৩ সবার সামনে আল্লাহর নাম নিতে লজ্জা পাচ্ছেন। কোনো বক্তব্য, কোনো একাডেমিক সেশন বা লেকচার, কোনো জ্বালাময়ী ভাষণে, কোনো সাক্ষাৎকারে। ভয় পাচ্ছেন, সামনে বসা বিধর্মীরা কী ভাববে। সাপোর্ট কমে যায় কি না, লাইক কমে যায় কি না। তালি কমে যায় কি না। কাফির বস, বড়ভাই, বড় নেতার সুনজর থেকে বাদ পড়ে যাই কি না আল্লাহর নামটা নিলে। এক তো আল্লাহর প্রসঙ্গ আনারই দরকার নেই। ধর্ম টেনে আনার কী দরকার। আর একান্তই আল্লাহর নাম নিতে হলে অফিস-আদালত-বিশ্ববিদ্যালয়ে-জনসভায়-মিডিয়ায় 'আল্লাহ' বলবা না। সৃষ্টিকর্তা, পরম করুণাময়, গড-এগুলা বলবা। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ। বলবা শুভসকাল বা 'সবাইকে শুভেচ্ছা'। সালাম-টালাম দেওয়ার কী দরকার। বেশি দরকার হলে বলবা 'স্লামালিকুম'। অন্তত ইসলামিক তো হলো না!... আজ আমি এত স্মার্ট হয়েছি যে, আমার Owner, আমার Sustainer (টিকিয়ে রেখেছেন যিনি) 'আমার আল্লাহ'র নাম উচ্চারণ করতে আমার লজ্জা হয়। আমার সেক্যুলার পবিত্রতা (!) নাপাক হয়। 'জাহান্নামের স্বাদ নাও, তুমি তো দুনিয়ায় সম্মানিত ছিলে।' [১] এত সম্মানিত ছিলে, এত জনপ্রিয় ছিলে, আমার নাম নিতেও তোমার মান যেত।

১.৩.৪ কেউ যখন আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে 'ভাই, কুরআনে নিষেধ আছে', 'ভাই, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো নিষেধ করেছেন।' আমরা কী বলেছি? আমরা বলেছি- 'সবকিছুতে ধর্ম টেনে আনবেন না।' মানে কী? মানে সবখানে আল্লাহ-নবির কথা শোনাবেন না। সবখানে আল্লাহ-নবির জায়গা নেই। সবখানে জায়গা নেই, নাকি আমার কাছে জায়গা নেই? আমি শুনতে চাই না, এ ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন। কী প্রমাণ করতে চাই আমি এ কথা বলে? জিজ্ঞেস করি আজ নিজেকে, আমার জীবনের কোন জায়গায় আমি আল্লাহকে তাঁর স্থানটা দিয়েছি। মুখে আল্লাহকে মানার দাবি সবাই করে, প্রতিটি আস্তিক আল্লাহকে মানার দাবি করে। একজন মুসলিম (আত্মসমর্পিত) আর একজন আস্তিকের মধ্যে পার্থক্য কী? কী কী কাজ করলে, কোন কোন কথা বললে, অন্তরের রোখ কোনদিকে হলে আমার নাম আরবি থাকে, সরকারের আদমশুমারিতে আমি মুসলিম থাকি। কিন্তু আল্লাহর খাতায় আমি আর মুসলিম থাকি না। কীসে আমাকে নিশ্চিন্ত করল? কোন সে জ্ঞান যা আমাকে জান্নাতের ব্যাপারে এতটা টেনশন-ফ্রি করে রেখেছে। আল্লাহর কথা শুনতে চাই না, আল্লাহর নাম নিতে চাই না, পাত্তা দিতে চাই না। মুসলিম পরিবারে জন্ম দিয়ে আল্লাহ ঠেকায় পড়ে গেছেন আমাকে জান্নাত দেবার। নাকি?

১.৩.৫ যারা কুরআনের কথা, আল্লাহর কথা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে পৌঁছানোর কাজটা করত, আমাদের মাঝে নবির দায়িত্ব পালন করত, তাদেরকে 'মোল্লা, মৌলভি, হুজুর' লকব দিয়ে তাচ্ছিল্য করেছি, অচ্ছুৎ অবমানব হিসেবে মার্জিনালাইজ করেছি। যেন তাদের কথাকে পাত্তা দিতে না হয়। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়। বলেন, আমার জীবনে এমন কে আছে যে আমাকে আল্লাহর কথা পৌঁছাবে? জরুরি মনে করিনি, তোয়াক্কা করিনি। এমন কার সাথে আমি সম্পর্ক রেখেছি যে আমাকে আল্লাহর কথা শোনাবে? 'সেই উত্তম সঙ্গী যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে।' [১] আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান হাসিলকে আপনার ওপর ফরজ করেছেন। আলিমদের জন্য আপনার কাছে গিয়ে আপনাকে শেখানো ফরজ নয়। ফিকহে আছে, শরিয়তের যেসব বিধান সচেতন মুসলিম সমাজের কাছে প্রসিদ্ধ কিংবা যেখানে সহনীয় দূরত্বের মধ্যে মাসআলা জিজ্ঞেস করার মতো একজন আলিম আছেন, সেখানে 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। ওই বাসিন্দাদের 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। [২] আমার বাসার পাশে মসজিদ আছে, পাশের মহল্লার মাদরাসা আছে, আলিমদের সাথে উঠবসকারী বন্ধু আছে, আমার হাতে ফেসবুক-ইউটিউব-পিডিএফ (অনিরাপদ উৎস, তারপরও উৎস তো)। এরপরও আমার 'না জানার অজুহাত' আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়া আল্লাহ, আমি তো জানতাম না। এরপরও দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অর্থ—আমার ইচ্ছা হয়নি। স্বেচ্ছায় আমি আল্লাহর করা ফরজকে অবজ্ঞা করেছি। এত ব্যস্ত আমি, এত আমার ডিমান্ড, দুনিয়াতে এত জরুরি আমি? আমার নিজের পিঠ বাঁচানোরই সময় আমার নেই।

যে পরিমাণ স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য আর দর্প আমি আমার রব (Owner + Sustainer + Guardian + Master)-এর সাথে এই একজীবনে দেখালাম, তাতে কাফির কেন, আমিই তো তাঁর গযব বা ক্রোধের বেশি উপযুক্ত। কাফির তো চিনে নাই; আমি তাঁকে চিনে তাঁকে জেনেই যা দেখাইলাম। দোষ আল্লাহকে দিতে পারবেন, বলেন? আসেন তওবা করি। জবান না, অন্তর ব্যবহার করে বলি :

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায য-লিমীন)

আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ (দাসত্ব বা উপাসনা পাবার উপযুক্ত) আর কেউ নেই। আপনিই পবিত্র, আমিই জালিম। আমার ওপর যে সমস্যা এসেছে, আপনার কোনো দোষ নেই, আপনি পবিত্র। আমিই দোষী। আমিই আপনার ক্রোধকে সেধে পড়ে ডেকে এনেছি। নিজের কর্মদোষে অটোমেটিক আপনার ক্রোধে পড়ে গেছি। আমাদেরকে মাফ করুন। আপনি ছাড়া আমরা আর কাউকে চিনি না যে মাফ করার এখতিয়ার রাখে। হেঁচকি তুলে সিজদায় কাঁদুন: আল্লাহ, আবার নতুন করে ঈমান আনলাম আপনার ওপর, যেমন করে ঈমান আনার কথা ছিল। অতএব আপনি আমাদের মাফ করেন। কারণ, 'আপনি তো আল্লাহ।' লিআন্নাকাল্লাহ (لِأَنَّكَ الله)।

টিকাঃ
২. অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। [সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫২]
৩. আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। [সুরা গাফির, আয়াত : ৬০]
৪. বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে এক বাঁও (প্রসারিত দুই বাহু পরিমাণ) এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (হাদিসে কুদসি) সহিহ বুখারি: ৭৪০৫; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫]
১. 'নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমি আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া দেবো, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা নিসা, আয়াত: ৫৬]
২. 'তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে, তা দ্বারা তারা দেখে না; তাদের কান আছে, তা দ্বারা তারা শোনে না।' [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯]
১. (ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ )বলা হবে, আজ জাহান্নামের) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমি তো (দুনিয়ায়( ছিলে সম্মানিত, অভিজাত!' [সুরা দুখান, আয়াত: ৪৯]
১. সেই তো উত্তম সঙ্গী, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কথা শুনলে আমলের উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে। মুসনাদ আবি ইয়ালা: ২৪৩৭; শুআবুল ঈমান: ৯০০০; আল-আওলিয়া, ইবনু আবিদ দুনইয়া: ২৫; আত-তারগিব ফি ফাজাইলিল আমাল: ৪৮২; আল-মুনতাখাব মিন আবদ বিন হুমাইদ: ৬৩১; আল-মাতালিবুল আলিয়া: ২৮১৭, ৩২৪৬/ হাদিসটির সনদ সামান্য দুর্বল।]
২. শারহুল হামওয়ি আলাল আশবাহি ওয়ান নাযায়ির খন্ড ২, পৃষ্ঠা৩৮; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়‍্যা : খন্ড :১৬, পৃষ্ঠা :১৯৯

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা

📄 ১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা


তখন শীতের শেষ। ফজরের জামাআত একটা সময় ৫:৫০ বা ৬:০০ টার দিকে থাকে না? ওই সময়টায়। আহলে হাদিস মসজিদে প্রায় মিনিট তিরিশেক আগে জামাআত হতো। আমার বাসা থেকে হানাফি আর আহলে হাদিস মসজিদের দূরত্ব সমানই। খুব সম্ভব লেখালেখির জন্যই হবে, আমি আহলে হাদিস মসজিদে যেতাম আগে আগে সালাত পড়ে এসে কাজ শুরু করার জন্য। আমার বাসার সামনেই একটা দোকানঘর ভাড়া করে একজন স্যার বেশ কটা ছেলেমেয়ে পড়াতেন ঠিক ওই টাইমটায়, বাচ্চাগুলো সেভেন-এইটের হবে। আমি যেতাম আর দেখতাম, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাবা-মায়েরা বাচ্চাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটা ফজরের প্রারম্ভিক সময় এবং খুব বেশি সম্ভাবনা যে, এই বাচ্চারা কেউই ফজর পড়েনি। বাবা-মায়েরা ফিরে গিয়ে পড়বেন, কিন্তু এই ১৩-১৫ বছরের বাচ্চারা আর পড়বে না। অনেকগুলো ভালো ধারণা করা যায়, কিন্তু বর্তমান সেক্যুলার ক্যারিয়ারিস্ট ফ্যামিলি কালচারের কারণে সে সুধারণা আমি করতে পারলাম না। স্যরি।

কাকডাকা ভোরে আমরা আমাদের সন্তানদের কোচিং ব্যাচের জন্য ঘুম থেকে তুলে দিই, কিন্তু আল্লাহর ফরজ হুকুম সালাত তার জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা কোচিং। সালাতে উঠলে বাচ্চার শরীর খারাপ করবে, কোচিংয়ে উঠলে কিন্তু করবে না। রামাদান মাসে পড়াশোনার অজুহাতে পরীক্ষার অজুহাতে... সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা 'আল্লাহর ফরজ বিধান' সিয়ামকে ‘আমি’... কত বড় কলিজা আমার? ‘আমি’ ফরজ সিয়ামকে আমার সন্তানের জন্য নিষ্প্রয়োজন ঘোষণা করেছি। সন্তানকে নাচ শেখাচ্ছি, গান শেখাচ্ছি। আমি কালচারাল মাইন্ডেড। কুরআন শেখানো? ওসব বড় হলে ‘যদি প্রয়োজন মনে করে’ শিখে নেবেনে, মানে ‘আমি প্রয়োজন মনে করি না’। সিয়াম রাখলে শরীর খারাপ করবে, ফজরে উঠলে শরীর খারাপ করবে। পড়ালেখা করে, এ-প্লাস পেতে হবে। সিয়াম-সালাত করলে পিছিয়ে পড়বে। আমার আর আমার সন্তানের মাঝে আল্লাহ কোথায়? এই আল্লাহ চাইলে আমার এই সন্তান দ্বারাই আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিতে পারেন, এই আহ্লাদের সন্তানের কারণে আমাকে সমাজে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারেন। সেই মহাশক্তিশালী আল্লাহর হুকুম ‘আমি’ স্থগিত করে দিচ্ছি। কে আমি? আমার কি একটুও ভয় লাগছে না, পরিবার থেকে আল্লাহকে বের করে দিতে? যিনি আমাকে পরিবার দিলেন তাঁকেই বের করে দিলাম। আমি এগুলো লেখার সময় কিছুটা কাঁপছি।

একবারও ভাবি না, যিনি দিলেন, তিনি কেড়ে নিতে কতক্ষণ; যিনি চোখের মণি করেছেন, তিনি তো চোখের বালিও বানিয়ে দিতে পারেন। পরিবারেও আমরা সেক্যুলারিতা প্রতিষ্ঠা করেছি। সন্তানকে ভোগবাদ শেখাই (লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে), ক্যারিয়ারিজম শেখাই (‘এইম ইন লাইফ’ রচনায়), শুধু দ্বীন শেখাতে লজ্জা পাই। দ্বীন শেখানোকে অপচয় মনে করি। এক বাবাকে বললাম:

ছেলের তো এসএসসি শেষ, তাবলীগ জামাতে ৩ দিনের জন্য দ্যান; কিছু শিখুক। কমপক্ষে এটুকু শিখুক যে—আল্লাহ কে, রাসুল কে, বাপ-মা কী? শুনলাম: এই ছুটির সময়টা খুব দামি, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেয়া চাই। ইংলিশ স্পিকিং কোর্সে ভর্তি করিয়ে রেখেছি, এখন সময় নষ্ট করা যাবে না। সময় নষ্ট? সময় কার দেওয়া? আমার বাবার? ছেলে আইলেটস-এ ৮+ স্কোর করবে, বিদেশি ভার্সিটিতে পড়বে। বিদেশে সেটেল হবে। আর বাপকে বৃদ্ধাশ্রমের খরচ পাঠাবে, কিংবা একেলা ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে থাকবে ৬ মাস। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মাকে ফেলে আসবে স্টেশনে। কিংবা ছুরি গলায় ধরে বাপকে বলবে : 'কোনো মসজিদে-টসজিদে জমি দেওয়া চলবে না, চুপচাপ কবরে যাবেন।' এগুলো সবই হয়েছে, হচ্ছে। সব হবে, বাপ-মায়ের দাম চেনা হবে না। যে ছেলে নিজের স্রষ্টাকে চেনে না, তার কাছে আপনার কী মূল্য? তার কাছে মূল্য শুধু টাকা আর পণ্যের, যার সাথে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ছোটবেলায়।

ভালো স্কুলের নামে কাফিরদের ব্রেইন-ওয়াশিং (পড়ুন মিশনারি) স্কুলে কাফিরের হাতে তুলে দিচ্ছি সন্তানের আনকোরা মগজ। স্রেফ দুনিয়ার জন্য। আক্কেল-দানাই ব্যাংকের ভল্টে নাকি? লাজ-শরম-আকল কিছুই আর নিজের কাছে নেই জনাব? আধুনিক হবার জন্য বাপ হয়ে সোমত্ত মেয়েকে এমন পোশাক কিনে দিই, যেটা পরে আরেক মেয়ে হেঁটে গেলে নিজেই জুলজুল করে চেয়ে থাকি। নিজে মা হয়ে, যুবতী মেয়েকে তাই পরাই, যা নিজে পরার কথা চিন্তাও করতাম না। আমরা তো এমন ছিলাম না ভাই? আজ কীসে আমাদের এমন করল? কে আমাদের এমন প্রতিবন্ধী, চিন্তাশক্তিহীন, 'ভেড়ার তোড়ে ভাসমান' করে দিলো?

আপনার আর আপনার সন্তানের মাঝে 'আল্লাহ' নামের একজন ছিলেন। তাঁকে চেনানো আপনার দায়িত্ব ছিল। তাঁর দিকে আমার সন্তানকে আকর্ষিত করার দায়িত্ব আমারই ছিল। আমার সন্তান আজ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শুনলে বলে, এটা তো ফকিরদের গান। 'ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ' পারে, পুরো 'অপরাধী' গানটা পারে; নাজাতের কালিমাটা পারে না। বলিউড হিরোদের চেনে, ৪ খলিফাকে চেনে না, নবিকে চেনে না। শাইখ উমায়ের কোব্বাদি বলেছিলেন, আমরা ভাবি, আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে। কেউ ভাবি না, আমার সন্তানের মৃত্যুর পর তার কী হবে? ১০ বছর বয়সে সালাত না পড়লে সন্তানকে প্রহারের হাদিস [১] শুনলে আমার নাক সিটকে আসে? আহ মুসলিম, আপনার এই সন্তান যখন জাহান্নামি হবে, আল্লাহকে ফরিয়াদ করবে : মালিক, আমার বাপ-মা আমাকে ফার্স্ট হতে পারিনি বলে মেরেছে, স্কুল পালিয়েছি বলে মেরেছে, এ-প্লাস পাইনি বলে বকেছে। তোমার হুকুম সালাতের জন্য আমাকে বকেনি, তোমার হুকুম ভেঙেছি বলে কখনো মারেনি। আজ এই বাপ-মাকে দোযখে দ্বিগুণ শাস্তি দাও। [১]

আমার ঘর সয়লাব মূর্তি আর প্রাণীর ছবিতে। প্রগতির নামে, সংস্কৃতির নামে, সজ্জার নামে মুসলিমের ড্রয়িং-রুম জন্তু-জানোয়ার, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল, মৃত বাপ-মায়ের শোপিসে ছবিতে ভর্তি। ছবি-মূর্তিতে রহমতের ফেরেশতা ঢোকে না। [২] আযাবের ফেরেশতাদের কিন্তু এসবের তোয়াক্কা নেই। আরো আছে। সেকেন্ডে ৩৬টা স্টিল পিকচার বা ৩৬ ফ্রেম গেলে নাকি তাকে বলে মুভি বা ভিডিও। ঘরে সে জিনিসও আছে। থাক, বললে দ্বীনদাররাও তেড়ে আসবেন। চেপে গেলাম। নিজেকে উদারমনা, প্রগতিমনা, ধর্মের খুটোছেঁড়া প্রমাণের কত চেষ্টা আমাদের। ভেবেছেন একবার, আধুনিক হবার নামে 'পশ্চিমা' হবার, সংস্কৃতিমনা হবার নামে 'হিন্দু' হবার এই হিড়িক আমাদের দুনিয়াতেই কোথায় নিয়ে ফেলবে? সেক্যুলার-মনা হবার নামে আল্লাহকে ত্যাগ করার এই স্পর্ধা আখিরাতে আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে? আফটার-অল যদি আখিরাতে বিশ্বাস করেই থাকি।

টিকাঃ
১. ৭ বছর বয়সে তোমাদের সন্তানকে সালাত আদায়ের জন্য আদেশ করো আর ১০ বছর বয়সে সালাত আদায় না করার জন্য প্রহার করো।-সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৫, মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৮৯, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭০৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৩২৩৩, ৩২৩৪, ৩২৩৫, ৫০৯২; সুনানু দারাকুতনি: ৮৮৭, ৮৮৮। হাদিসটি সহিহ
১. তারা (জাহান্নামিরা) আরো বলবে, 'হে আমাদের রব, আমরা আমাদের "নেতা ও বড়দের (সিনিয়রদের)" আনুগত্য করেছিলাম, আর ওরাই আমাদেরকে ভুলপথে নিয়েছে। হে আমাদের রব, ওদের “দ্বিগুণ শাস্তি” দিন আর তাদেরকে দিন মহা-অভিসম্পাত।' [সুরা আহযাব, আয়াত : ৬৭-৬৮]
২. সহিহ বুখারি: ৩২২৫, ৩২২৬, ৩৩২২, ৪০০২, ৫৯৪৯, ৫৯৫৮; সহিহ মুসলিম: ২১০৬; সুনানু আবি দাউদ: ৪১৫৩, ৪১৫৫; জামি তিরমিযি: ২৮০৪; সুনানু নাসায়ি: ৪২৮২, ৫৩৪৭, ৫৩৪৮, ৫৩৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00