📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 আল্লাহর আযাবে মুসলিম কেন মরে?

📄 আল্লাহর আযাবে মুসলিম কেন মরে?


তিনটা পয়েন্টে আলোচনাটা শেষ করব, ইনশাআল্লাহ।

প্রথমত, আমরা দেখলাম আল্লাহর আযাব-গযবের এপিসেন্টার হলো স্পর্ধা। কাফির চিরকালই স্পর্ধা দেখিয়েছে, দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সে আল্লাহকে চেনে না। কিন্তু কাফিরদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা মুসলিমরা সমষ্টিগতভাবে গত এক শতকে যে স্পর্ধা দেখিয়েছি, আগের ১৩০০ বছরে এতখানি ঔদ্ধত্য মুসলিমরা দেখায়নি। আমি তো মনে করি, এ দিক বিবেচনায় কাফিরদের তুলনায় আমরাই আল্লাহর গযবের বেশি উপযুক্ত। কী সে স্পর্ধা, সেটা একটু পরে একসাথে আলোচনা করছি।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর আযাবের কিছু নিয়ম আছে। যখন দুনিয়ায় আযাব আসে, সেটা সবার জন্যই আসে। ইমাম মাহদির বিরুদ্ধে প্রেরিত বাহিনীকে বাইদা নামক জায়গায় ধসিয়ে দেওয়া হবে, শুনে আম্মাজান আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেন, বাইদা এলাকায় এমন অনেক লোকও তো থাকতে পারে, যারা ওই বাহিনীর লোক নয়। বাজার এলাকার আম পাবলিক। তারাও এই আযাব ভোগ করবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

হ্যাঁ, যখন কোনো এলাকায় আল্লাহর আযাব আসে, তখন সবার ওপরই আসে। পরে হাশরের মাঠে যার যার নিয়ত অনুসারে আলাদা হয়ে যাবে।

বিশেষ করে মহামারি সম্পর্কে নবিজি স্পষ্ট করেই বলেছেন—

মহামারি হলো রিযয় (গযব বা শাস্তি) বা আযাব, যা আল্লাহ বনি ইসরাইল বা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেদের ওপর দিয়েছিলেন। কতক জাতিকে এর দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাকি রয়ে গেছে, তাই কখনো তা আসে, কখনো চলে যায়। তবে মুমিনদের জন্য আল্লাহ একে রহমত বানিয়েছেন। যদি মুমিন ধৈর্য সহকারে নিজ শহরে অবস্থান করে, মৃত্যু হলে সে শহিদের সমান সাওয়াব পাবে।

তৃতীয়ত, মুসলিমদের ওপর একটা বিশেষ দায়িত্ব ছিল। মানুষকে আল্লাহ জমিনে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের কাছে এভাবেই তিনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন, 'আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করব।' মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব আল্লাহর ক্যানভাস করা (যেভাবে রাষ্ট্রদূত তার দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন) এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর বিধানমাফিক দুনিয়া শাসন করা। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর পরিচয় ভুলে 'ভুল উপাস্য' বেছে নিয়েছে তারা তাদের দায়িত্ব জানে না, সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানে না। আর যারা আল্লাহকে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ে চিনেছে তারা হলাম আমরা-মুসলিম। সুতরাং, প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এককভাবে আমাদের। দায়িত্ব কী ছিল? আল্লাহর পথে দাওয়াহ এবং আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ। আল্লাহর বিধানের দিকে আহ্বান এবং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনকারীদের রোধ। যার স্তর তিনটি—

■ হাত দ্বারা। এটা না পারলে...

জবান দ্বারা (দাওয়াহ/সৎকাজে আদেশ অসৎকাজে নিষেধ)। তাও না পারলে...

অন্তর দ্বারা (বুগদ ফিল্লাহ বা আল্লাহর জন্য ঘৃণা রাখা)। নবিজি বলেছেন, এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। জোর করে বা মৌখিক বাধা দিচ্ছেন না, ওকে ফাইন। আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন যদি কমপক্ষে ঘৃণাও করতে না পারেন, তাহলে খুব সম্ভবত আল্লাহর খাতায় মুসলিম তালিকায় আপনার নাম নাও থাকতে পারে। এই 'আদি দায়িত্ব'-এ অবহেলার কারণে মুমিনদের প্রতিও আল্লাহর আযাব আসে।

আল্লাহ এক ফেরেশতাকে আদেশ করলেন, অমুক অমুক শহরকে তার অধিবাসীদের ওপর উল্টে দাও। ফেরেশতা সবিনয়ে আরজ করলেন, 'হে আল্লাহ, সেখানে তো আপনার অমুক বান্দা আছে, যে এক পলকের জন্যও আপনার অবাধ্য হয়নি।' আল্লাহ বললেন, 'তাকে-সহই পুরো জনপদ উল্টে দাও। কেননা তার চেহারা আমার তরে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন হয়নি। অর্থাৎ তার চারপাশে পাপ-জুলুমে সয়লাব, সমাজ অন্যায়-পাপাচারে পরিপূর্ণ, তবু সে আপন অবস্থায় ইবাদতে মগ্ন থেকেছে। সমাজে চলমান এতসব পাপ-অন্যায়-জুলুম দেখে তার মুখ মলিন হয়নি। তার ভ্রুও কুঞ্চিত হয়নি। তার অন্তরে খারাপও লাগেনি। ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের দায়িত্বও সে পালন করেনি।

আমাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের এই বার্তা, ইসলামের এই সুশাসনের আওতায় সকল মাজলুমকে নিয়ে আসা। যাতে মানবতার মুক্তি ঘটে। সব সামাজিক (দলিত, নিগ্রো, হিজড়া, হিন্দু, বিধবা, প্রথা, পেশাগত হীনম্মন্যতা) মাজলুম, সব অর্থনৈতিক মাজলুম, রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের মাজলুম, পুঁজিবাদের মাজলুম, ক্যারিয়ারিজমের মাজলুম সবার কাছে ইসলামের সমাধান পৌঁছে দেওয়া এবং ইসলামের সিস্টেমের ভেতর এনে এই নিগৃহীত মানবতাকে স্বস্তি দেওয়া ছিল আমাদের কাজ। বস্তুত জালিম জুলুমের মধ্য দিয়ে নিজের ওপরও জুলুম করে, যা থেকে তাকে বিরত রাখা আমাদের দায়িত্ব। জালিমকে জুলুম থেকে ফেরানো মানে খোদ তার ওপরও ইহসান বা দয়া করা। আমরা পুরো উম্মাহ একসাথে সেই 'আদি দায়িত্ব' ছেড়ে দিয়েছি।

গুনাহকে ঘৃণা করা তো দূর কি বাত। ঘৃণা করবার আগে সেটাকে গুনাহ তো মনে করতে হবে। গুনাহকে গুনাহ মনে করাই ছেড়ে দিয়েছি আমরা মুসলিমরা। আমরা অনেকেই মিউজিককে গুনাহ মনে করি না, অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিউজিক শুনলে কানে আঙুল দিয়ে সে জায়গা পার হতেন। বলেও গেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন দল বের হবে যারা ব্যভিচার-রেশম-মদ-বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। বলেছেন, আল্লাহ আমার উম্মতের ওপর মদ-জুয়া-বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন। অথচ বহু মুসলিমকে আপনি বোঝাতে পারবেন না। তারা একে ঘৃণা তো দূরের কথা, হারামই মনে করবে না। নিষেধ করাকে উগ্রতা মনে করবে। তার মানে নবিজি 'উগ্র' ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ। বহু মুসলিম ঘুষ-সুদকে 'ও-কিছু-না' মনে করে। বহু মুসলিমা পর্দা করাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে, মাহরাম ও নন-মাহরাম মেনে চলাকে বাড়াবাড়ি মনে করে। ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকানোকে গুনাহ মনে করে না, অথচ সুরা নুরে আল্লাহ নিজে এ থেকে বিরত থাকতে আদেশ করেছেন। বহু দ্বীনদার পর্দানশিন মুসলিমা গুনাহে লিপ্ত হবার প্রবল আশঙ্কা থাকাবস্থায় পুরুষের দিকে তাকানোকে তেমন কিছু গণ্য করে না, অথচ এ থেকে বিরত থাকা আল্লাহর আদেশ ছিল।

আল্লাহর শপথ, ইসলামের ইতিহাসে এমন সময় কোনোদিন আসেনি যে, এত বেশিসংখ্যক মুসলিম কুরআন-হাদিসে বর্ণিত স্পষ্ট অকাট্য সব হুকুমকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহর আদেশকে অদরকারি মনে করেছে। আল্লাহর আদেশকে ইনিয়ে-বিনিয়ে অজুহাত-সহ বা স্পষ্টভাবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমন ঔদ্ধত্য সামষ্টিকভাবে মুসলিমরা আগে কোনোদিন দেখায়নি। ক্যারিয়ার, আধুনিকতা, সামাজিকতা, মধ্যপন্থা ইত্যাদির অজুহাতে মহান আর-রাজ্জাক আল-মালিকের আদেশের প্রতি এতটা তাচ্ছিল্য আমরা আগে কখনো দেখাইনি। এমনকি এই লেখা পড়তে পড়তেও অনেক মুসলিম ভাইয়ের মনে নেগেটিভ অনুভূতি হচ্ছে। কী ভয়ংকর স্পর্ধা আমরা দেখাচ্ছি মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সাথে। সামনে আরো বিস্তারিত আসবে বিষয়গুলো। মোদ্দা কথা, সৎকাজের আদেশ আর অসৎকাজে নিষেধ করার 'আদি-কর্তব্য'তে অবহেলা আল্লাহর গযবের আরেকটি কারণ।

বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান-যা তোমরা পছন্দ করো, যদি (এসব কিছু) তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।

যদি ৮টা জিনিস বেশি প্রিয় হয় ৩টা জিনিসের চেয়ে, তাহলে অপেক্ষা করো আযাবের। আয়াতটি আমাদের মুসলিমদেরই উদ্দেশে। সমঝদারোঁ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়।

আযাব আসার যে কারণগুলো-ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের আদি দায়িত্বে অবহেলা সবই আমরা মুসলিমরা পূর্ণ করেছি। আর কাফিরদের জন্য হোক বা মুসলিমদের জন্য, আযাব যখন কোনো জনপদে আসে, সেটা ব্যাপকভাবে আসে। সবার জন্য আসে। কারো (কাফির) জন্য পাকড়াও, আর কারো (মুমিন) জন্য সতর্কবাণী। আশ্চর্য, আমরা আযাবকে আযাব বলতেই লজ্জা পাই, তাহলে সতর্ক হব কীভাবে? আর ছোট আযাবে যদি সতর্ক না হতে পারি তাহলে? 'বড় আযাবের আগে আমি তাদের ছোট আযাব আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ছোট আযাব টের পেতে ব্যর্থ হলে, আমার জন্য এর পরের আপ্যায়ন কেমন হবে? বড় আযাব। জাহান্নাম।

আফসোস, মুসলিম সন্তানের কাছে আজ জাহান্নামও মামুলি ব্যাপার। মুসলিম হয়ে যেহেতু জন্মেছি, সাজা খেটে একদিন তো জান্নাতে যাবই। আল্লাহর খাতায় আমি এখনো মুসলিম আছি, শিওর? শরিয়তের অকাট্য বিধান অস্বীকার করলে ঈমান থাকে না। আমল করতে পারছি না, সেটা ভিন্ন বিষয়। সেটা আমার ঈমানের দুর্বলতা। কিন্তু অস্বীকার করলে তো ঈমানটাই থাকবে না। দেখেন তো ভেবে, আল্লাহর কী কী হুকুম আমার পছন্দ হয় না। মনে হয়, কী দরকার ছিল এই বিধানের। কোনো কোনো বিধান শুনে মনে হয়- 'এ যুগে কী আর ওসব চলে' কিংবা 'এমন না হয়ে ওমন হলে ভালো হতো।' ওযুভঙ্গের কারণ যেমন আছে, ঈমানভঙ্গেরও কারণ আছে (শেষের দিকে আলোচনা আছে)। ক'জন জানি? আমার অজান্তেই ঈমান হারিয়ে বসে নেই তো আমি? ইয়া আল্লাহ, আমি জানতাম না, তাই অমন বলে ফেলেছি। 'না জানা'-কে আল্লাহ কাল-হাশরে কোনো ওজর হিসেবে গ্রহণ করবেন না। আমার কাছে আলিম ছিল, মসজিদে ইমাম ছিল, নেট ছিল, অসংখ্য ইসলামি বই ছিল, হাজারো পিডিএফ ছিল, দ্বীনি বন্ধু ছিল। আমার জানতে ইচ্ছে হয়নি, তাই জানিনি। জানার প্রয়োজন মনে করিনি, তাই জানিনি। জানাও ফরজ ছিল আমার ওপর। না জানাটা মানে আরেকটা ফরজ হুকুমের তোয়াক্কা না করা। সেদিন আর কাকে দোষ দেবো, যেদিন খোদ শয়তানও বলবে: 'খবরদার আমাকে দুষবে না, কেননা তোমাদের ওপর আমার কোনো আধিপত্য নেই। আমি কেবল রাস্তা দেখিয়েছি। গুনাহের রাস্তায় তুমি নিজেই হেঁটেছ।'

আল্লাহর এই গযব আমি তো মনে করি আমাদেরই উদ্দেশে। আমাদেরকে সতর্ক করতে। আমাদের পাপের ভারা পূর্ণ। আমাদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, স্পর্ধা আর কাফিরপ্রেম চূড়ায় পৌঁছে গেছে। ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছি আমরা।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ২১১৬; সহিহ মুসলিম: ২৮৮২, ২৮৮৩; সুনানু নাসায়ি: ২৮৭৯; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০৬৪, ৪০৬৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৬৭৫৫, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৩২১; মুসনাদু আহমাদ: ২৬৪৮৭, ২৬৭০২, ২৬৮৬০
২. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৩, ৬৯৭৪; সহিহ মুসলিম: ২২১৮; জামি তিরমিযি : ১০৬৫; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৭৪৮১; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ২৯৫২, ২৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৫১, ২১৭৬৩, ২১৮০৬, ২১৮১৮; মুসনাদুল হুমাইদি: ৫৫৪
৩. সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০
৪. যদি কোথাও গান-বাজনা-বাদ্য বাজতে থাকে তাহলে সামর্থ্য থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়া: এমনকি বাদ্যযন্ত্র ও ঢোল-তবলা ভেঙে ফেলাও 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা'-এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ কোথাও মদ্যপানের আসর বসলে সেখানে গিয়ে মদের পানপাত্র ভেঙে ফেলা কিংবা কোথাও কারো ধনসম্পদ জবরদখল হতে দেখলে তা উদ্ধার করে মূল মালিককে পৌঁছে দেওয়া এসবই 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা' এর অন্তর্ভুক্ত। চাই এসব প্রতিরোধ সে সরাসরি নিজেই করুক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে করাক, উভয় ক্ষেত্রেই সে হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এটা তখনই করা যাবে, যখন তা করার পরিপূর্ণ সামর্থ্য থাকবে এবং এতে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা এমন ফিতনা সৃষ্টি হবে না, যার কারণে সমাজে আরো অধিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে কিংবা মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন হয়। এমন আশঙ্কা থাকলে সেক্ষেত্রে শুধু মৌখিকভাবে বাধাদান করবে এবং ওয়াজ-নসিহত করবে। আর এটার সামর্থ্যও না থাকলে সেক্ষেত্রে অন্তরে অন্যায় কাজের প্রতি ঘৃণা রাখবে, যেটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। ইমাম নাওয়াওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-সহ আরো অনেক হাদিসবিশারদ এমনটাই বলেছেন। দেখুন-শারহু মুসলিম, নাওয়াওয়ি, খণ্ড : ২; পৃষ্ঠা : ২৫
সরাসরি হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করার বিষয়টি মুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, আবার কাফিরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন তারা মুসলিম সমাজে অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে। এক্ষেত্রে জিম্মি অমুসলিমরাও অন্তর্ভুক্ত। আর কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন পৃথিবী থেকে কুফর-শিরক মূলোৎপাটন করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালিমা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ময়দানে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হবে। বোঝা গেল, 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ' কেবল কাফিরদের ক্ষেত্রেই নয়; বরং কাফির-মুসলিম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শারয়ি সম্পাদক
১. সহিহ মুসলিম: ৪৯
২. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৭৬৬১; শুআবুল ঈমান : ৭৪৯৮৯; মুজামু ইবনিল আরাবি: ২০১৬-হাদিসটির সনদ যইফ
১. সহিহ বুখারি : ২৪৪৪, ৬৯৫২; জামি তিরমিযি: ২২৫৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৫১৬৭, ৫১৬৮; মুসনাদু আহমাদ: ১৩০৭৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ১১৫০৯, ১১৫১০, ২০১৭৭
২. মুসনাদু আহমাদ: ৪৫৩৫, ৪৯৬৫; সুনানু আবি দাউদ: ৪৯২৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯০১; শুআবুল ঈমান: ৪৭৬০; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ২০৯৯৭; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ১১৭৩, ৬৭৬৭-হাদিসটির সনদ সহিহ
৩. সহিহ বুখারি ৫৫৯০; সহিহু ইবনি হিব্বาน ৬৭৫৪; আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৩৪১৭; শুআবুল ঈমান: খন্ড ৭; পৃষ্ঠা :১১৮; মুসনাদুশ শামিয়িান: ৫৮৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ২০৯৮৮; আস-সুনানুস সগির, বাইহাকি ৩৩৫৩
৪. মুসনাদু আহমাদ ২৪৭৬, ৬৫৯১, ৬৫৯৯; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৯৬; সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৩৬৫; আল-আহাদিসুল মুখতারা ৫৭, ৬০; মুসনাদু আবি ইয়ালা ২৭২৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২০৯৯১-হাদিসটির সনদ সহিহ
১. (হে নবি) আপনি মুমিন পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩০]
২. আর (হে নবি,) আপনি মুমিন নারীদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩১]
৩. সুরা তাওবা, আয়াত : ২৪
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. যখন সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, 'আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের ওপর কোনো আধিপত্য ছিল না। আমি শুধু তোমাদের আহ্বান করেছিলাম আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমায় দোষারোপ কোরো না, তোমরা বরং তোমাদের নিজেদেরই দোষারোপ করো। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা যে আমাকে (আল্লাহর সাথে) শরিক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করছি। আর জালিমদের জন্য তো আছে ভয়াবহ শাস্তি। সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২২]

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 আযাব, না ভাইরাস?

📄 আযাব, না ভাইরাস?


আল্লাহর গযব বা আযাব প্রাথমিকভাবে সতর্ক করার জন্য আসে। কী কী দিয়ে দুনিয়াতে আযাব দেওয়া হয়। আযাবের জন্য আল্লাহ কী কী ব্যবহার করেন?

■ আদ জাতিকে প্রবল ঝড় দিয়ে। আজকের যুগে একে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে উচ্চচাপের এলাকা থেকে নিম্নচাপের এলাকায় বায়ু প্রবাহিত হয়ে ঝড় হয়। এটুকু বিজ্ঞান আপনাকে বলবে। বস্তুজগতের বাইরে কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না। কোনো পিয়ার রিভিউ জার্নাল কখনোই বলবে না, 'আমরা এর কারণ খুঁজে পেতে ব্যর্থ, অতএব এটা একটা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা।' বরং প্রতিটি ঘটনার কোনো না কোনো বস্তুগত ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে চেষ্টা করে। কারণ এটাই তার কাজ। 'প্রকৃতিবাদ'কে নিজের চালকের আসনে বসিয়ে বিজ্ঞান অতিপ্রাকৃত কিছুকে কীভাবে মেনে নিতে পারে? বিজ্ঞান নামক tool-টার সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। প্রকৃতিবাদের নামে বিজ্ঞানবাদ স্রষ্টাকেই 'অপ্রয়োজনীয়' বলে বাতিল করে, তখন ইসলামের সাথে ১৮০ ডিগ্রি বিরোধ।

ইসলামের দর্শন হলো, আল্লাহ সৃষ্টিজগতে কারণ (cause) ও ঘটনা (effect)-কে ওতপ্রোতভাবে রেখেছেন। 'কারণ'-এর পর্দা না থাকলে সবাই আল্লাহর কুদরত (শক্তি-রহস্য) জেনে ঈমান এনে ফেলত। তখন দুনিয়া যে 'পরীক্ষাগার', সেই বিষয়টা আর থাকত না। সবাই অটোপাশ হয়ে যেত। বাহ্যদর্শী মানুষ (সেক্যুলার-বিজ্ঞানাখ) আটকে যায় শুধু 'কারণ'-এর বেড়াজালে। 'ঘটনা'র পেছনে 'কারণ' কেই দায়ী মনে করতে থাকে। ফলে 'কারণ'-এর আড়ালে যে আসল শক্তি (আল্লাহ) কারণ ও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তার দিকে তার দৃষ্টি যায় না। 'পশ্চিমা বিজ্ঞান' এই কারণ পর্যন্ত যায় এবং কারণের পরে আর যাবে না, সেই সংকল্প করেই সে রাস্তায় নামে। 'পশ্চিমা বিজ্ঞান' কেন বললাম, কারণ বিজ্ঞান একসময় মুসলিমদের tool ছিল। কুরআন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঈমানের ইন্দ্রিয় সাথে নিয়ে তারা বিজ্ঞানচর্চা করত। 'কারণ' তো বের করতেনই, কারণের পেছনে 'আল্লাহর শক্তি' কেও তারা বুঝতে পারতেন। আমার কাঠগড়া বইটাতে বিস্তারিত পাবেন। ফলে বিজ্ঞানকে কে চালাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে 'ফল কী পাচ্ছেন' -আল্লাহর পরিচয়? নাকি আল্লাহকে অস্বীকার?

■ সামুদ জাতিকে ফেরেশতার প্রচণ্ড আওয়াজের দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে। এখানেও কোনো বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কোনো ম্যাগনেটিক ইভেন্ট বা কসমিক ইভেন্ট বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

■ ফিরআউনের কিবতি সম্প্রদায়কে কয়েকটা আযাব দেওয়া হয়েছিল পরপর, যাতে তারা ফিরে আসে। প্রথমে দেওয়া হলো অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ।

তারপর আমি পাকড়াও করেছি-ফিরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। অতঃপর যখন কল্যাণ হতো, তখন তারা বলতে আরম্ভ করত যে, এটাই আমাদের প্রাপ্য

অর্থাৎ ছোট যে সতর্কীকরণ আযাব আসে তা এজন্য আসে না যে, সবাইকে শেষ করে না দেওয়া অব্দি চলবে; বরং সেটা এসে আবার চলে যায়। শুভদিন ফিরে আসে। এই করোনাও একদিন চলে যাবে ইনশাআল্লাহ। শুধু পার্থক্য হবে: কেউ একে আল্লাহর আযাব জেনে জীবনযাপনে সংযত হবে। ফিরে আসবে আল্লাহর দিকে। আর কেউ বলবে : 'করোনা চলে গেছে, এটাই তো আমাদের প্রাপ্য ছিল। কারণ আমাদের জ্ঞানবিজ্ঞান যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে করোনাকে আমরা পরাজিত করব, এটাই স্বাভাবিক।' দেখবেন, আজকেও অনেক মুসলিম এটাই বলবে যা ফিরআউনের সম্প্রদায় বলেছিল। তাদের আদর্শিক অনুসারীরা বলবে, 'এটাই তো হবার কথা যে আমরা নিজেরা এর মোকাবেলা করলাম, আর এমনটাই হওয়ার ছিল, 'মনে রেখো বিজ্ঞান লড়েছিল একা' - এই স্পর্ধার কারণে আযাবকে চিনতে ব্যর্থ হলো তারা। এরপর...

সুতরাং, আমি তাদের ওপর পাঠিয়ে দিলাম প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্তের আযাব, বিস্তারিত নিদর্শন হিসেবে। কিন্তু তারা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল। বস্তুত তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।

আপনি চাইলে এই সবগুলোরই জাগতিক ব্যাখ্যা দিয়ে আল্লাহ, তাঁর সতর্কীকরণ সবকিছুকে বাইপাস করতে পারবেন। ফিরআউনের জাতি এগুলোকে মুসা আলাইহিস সালামের জাদু-ভেলকিবাজি বলে বাইপাস করেছিল। আপনি বিজ্ঞানের যুগে প্রাকৃতিক ঘটনা, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টেকটোনিক প্লেট নড়ে গেছে বলে সুনামি হয়ে গিয়েছিল, মাটিতে আয়রন বেশি হয়েছিল বলে পানি রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছিল-ইত্যাদি বলে অস্বীকার করবেন। এই যা। পরপর সতর্কবার্তা বুঝতে ব্যর্থ হওয়া, বারবার আল্লাহকে অস্বীকার করা, মুসলিমদের ওপর অত্যাচার অব্যাহত রাখা, ফিরআউনের নিজেকে 'আল্লাহ' বলে দাবি করা এবং তার সম্প্রদায়ের মেনে নেওয়া। এরপর ফাইনাল পাকড়াও এলো। তাহলে যেহেতু পিয়ার রিভিউড রিসার্চ জার্নাল করোনাকে অতিপ্রাকৃত কিছু বলছে না, তাহলে আমরাও অপেক্ষা করি ফাইনাল খেলার জন্য। নাকি?

হয়তো এটুকু বুঝতে পারলাম, সকল আসমানি বা জমিনি আযাব কিংবা আল্লাহর ক্রোধ 'বস্তু' দিয়েই দেওয়া হয়। ফলে চাইলেই এর বস্তুগত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, 'কারণ' অব্দি গিয়ে আটকে থাকা যায়। যা বিজ্ঞান করে থাকে। কিন্তু বস্তুগত পর্দার আড়ালে বা বস্তুগত কারণের আড়ালে এর মূল উৎস যে আল্লাহর শক্তি এবং মূল কারণ যে আমাদের আমল, সেটা কেবল গায়েবে বিশ্বাসীর ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ার কথা, যদি সেটা থাকে আর কি।

জলে-স্থলে যে বিপর্যয়, তা মানুষের দুহাতের কামাই...

কোনো পিয়ার রিভিউয়ে ঈমানদার এটা বুঝবে না। এখন আমি কোন ঈমানদার এটা আমাকে স্পষ্ট অবস্থানে যেতে হবে। ঈমান আর কুফরের মাঝে আর কোনো অবস্থান নেই। হয় আপনাকে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর সত্যবাদিতার ওপর ঈমান আনতে হবে-পূর্ণ আত্মসমর্পণ। নয়তো পিয়ার রিভিউয়ের কাছে কুরআন-হাদিস-ঈমানকে সেকেন্ডারি রাখতে হবে।

১৪০০ বছর আগের শ্রেষ্ঠ বংশে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ, যে তার নবুওয়াতপূর্ব ৪০ বছরের কখনো মিথ্যা বলেছেন এমন রেকর্ড নেই, রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াসের সামনে তৎকালীন শত্রু আবু সুফইয়ান তার নামে মিথ্যাবাদিতার অভিযোগ করতে পারেনি বাকিদের সামনে নিজে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবার ভয়ে। মিথ্যা যে যে কারণে আমরা বলে থাকি, তার সবগুলো তাকে অফার করা হয়েছিল শুরুতেই। কুরাইশরা উতবা ইবনু রবিআকে পাঠাল নবিজির দাওয়াতি কার্যক্রম বন্ধ করার একটা চেষ্টা করতে। উতবার প্রস্তাব ছিল-

হে পুরুষ! তোমার যদি আর্থিক চাহিদা থাকে তাহলে বলো। আমাদের সকলের সম্পদ থেকে অংশবিশেষ জমা করে তোমাকে দেবো। তাতে তুমি বনে যাবে কুরাইশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। (সম্পদ)

যদি বিয়ের প্রয়োজন বোধ করেন, বলেন। কুরাইশ নারীদের মাঝে যাকে ইচ্ছা বেছে নেন। আমরা আপনার কাছে ১০ জনাকে বিয়ে দেবো। (নারী)

যদি রাজত্ব চান বলুন, আপনাকে বাদশাহ বানিয়ে দেবো। (ক্ষমতা)

আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় সম্মান-গৌরব হাসিল করা, তবে আমরা আপনাকে সসম্মানে আমাদের সরদার বানিয়ে দেবো, আপনার কথার বাইরে আমরা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব না। (সম্মান)

আর আপনার মনে যদি নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে আমরা আমাদের সকল গোত্রের ঝান্ডা আপনার সামনে গেড়ে দেব। এরপর আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আপনিই হবেন আমাদের নেতা। (নিরঙ্কুশ আমৃত্যু নেতৃত্ব)

আমরা তো সাধারণত অর্থ-সম্মান-নারী-ক্ষমতার জন্যই মিথ্যা বলি। কিন্তু দেখুন, সকল প্রলোভন আর হুমকির মুখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব ছিল একটাই-

তোমরা কী বলছ তা আমি জানি না। আমি তোমাদের কাছে যে ঐশী বার্তা নিয়ে এসেছি তা তোমাদের সম্পদের লোভে নয়, তোমাদের নেতৃত্ব সম্মানলাভের উদ্দেশে নয় এবং তোমাদের ওপর রাজত্ব করার খায়েশেও নয়। বস্তুত আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, আমার ওপর তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ করেছেন, যেন আমি তোমাদের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হই। সুতরাং, আমি আমার রবের বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছি। অতএব যদি তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দাও তাহলে সেটা তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য। আর যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করো তাহলে আমি আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করব; যতক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।

আপনারা যদি সূর্যের আগুন দিয়ে একটা মশাল জ্বালিয়ে এনে দেন, তাতেও আমি আমার কার্যক্রম ছাড়তে পারব না। আমাকে যে কাজ দিয়ে পাঠানো হয়েছে, তা ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব

কুরাইশদের অব্যাহত হুমকির মুখে চাচা আবু তালিব যখন বাধ্য হয়ে ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার দাওয়াতি কাজ বন্ধ করার কথা বললেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তার চাচাকে জবাব দিয়েছিলেন :

'চাচাজান, আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তবু আমি এ কাজ (তাওহিদের দাওয়াহ) ছেড়ে দিতে পারব না; যতক্ষণ না আল্লাহ এ দ্বীনকে বিজয়ী করেন কিংবা এতে আমার মৃত্যু হয়ে যায়।'

অথচ তিনি তখন অভাবী, সংসার করছেন ৫৫ বছর বয়েসী এক নারীর সাথে। যদি মিথ্যাবাদীই হন, কুরাইশদের দেওয়া সেসব লোভনীয় অফার কেন ছাড়লেন? কী তার সেই বাধ্যবাধকতা?

যাদের চোখের সামনে তিনি চন্দ্রকলার মতো বড় হয়েছেন ৪০টা বছর যারা তার কাছে সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে, আল-আমিন (বিশ্বস্ত) নামে ডেকেছে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আস্থা রেখেছে। সেই লোকগুলোকেই যখন আহ্বান করলেন : তোমাদের 'মনচাহি' জীবন থেকে ফিরে এসো দ্বীন ইসলামের দিকে। মিথ্যা উপাস্য থেকে ফিরে এসো সত্য মাবুদ আল্লাহর দিকে। তখন এতকালের সত্যবাদিতার সাক্ষী সেই লোকগুলোই তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে দিলো, যদিও তারা জানত তাদের সাথে কাটানো ৪০টা বছর আল-আমিন কখনো মিথ্যা বলেননি। তারা জানত তাঁর কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যও নেই। তারপরও তারা তাঁকে অস্বীকার করল কী কারণে?

মিলিয়ে দেখি তো। আমরাও কি সেই একই কারণে তাঁর আনীত দ্বীনকে নিজের জীবনে আনতে চাচ্ছি না? তাঁর আনীত শরিয়তের কাছে নিজের খেয়ালখুশিকে সমর্পণ করতে অনিচ্ছুক কি আমরাও সেই একই কারণে? ১৪০০ বছর পরেও কারণগুলো সেই একই। বংশগৌরব, লাইফস্টাইল, নেতৃত্ব, জীবিকা, খাহেশাত...

টিকাঃ
১. 'তারপর আমি পাকড়াও করেছি-ফিরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। যখন তাদের কোনো কল্যাণ হতো, তারা বলত, 'এটাই তো আমাদের প্রাপ্য।' আর যখন তাদের কোনো অকল্যাণ হতো, তখন তারা মুসা ও তার সঙ্গীদেরকে অলক্ষুণে মনে করত। সাবধান! তাদের অকল্যাণ তো কেবল আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণাধীন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। সুরা আরাফ, আয়াত: ১৩০-১৩১
১. সুরা আরাফ, আয়াত : ১৩৩
২. সুরা রুম, আয়াত : ৪১
১. মুসনাদু আবি ইয়ালা: ১৮১৮; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ৩৬৫৬০; দালায়িলুন নবুওয়াহ, বাইহাকি : খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ২০২; দালায়িলুন নবুওয়াহ, আবু নুআইম: ১৮২। -হাদিসটির সনদ হাসান
২. প্রাগুক্ত
৩. সিরাত ইবনি হিশাম খন্ড ১, পৃষ্ঠা: ২৯৩; সিরাত ইবনি ইসহাক: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯৭; আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ইবন কাসির খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭৯; আর-রাহিকুল মাখতুম খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৯৪
৪. প্রাগুক্ত
১. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বাইহাকি : খণ্ড: ২পৃষ্ঠা: ২০২। -হাদিসটির সনদ হাসান
২. সিরাতু ইবনি ইসহাক: খণ্ড: ১পৃষ্ঠা: ১৯৮
৩. মুসনাদু আবি ইয়ালা, তাবারানি আওসাত ও তাবারানি কাবিরে বিশুদ্ধ সনদে। সিরাতন নবি সা., শাইখ ইবরাহিম আলি, মাকতাবাতুল বায়ান
১. তাফসির ইবনি কাসির, খন্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৪৮, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বর্ণনা। সিরাত ইবনি হিশাম : খন্ড, ১; পৃষ্ঠা, ২৬৬

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 গযবের সাথে যুদ্ধ

📄 গযবের সাথে যুদ্ধ


এই করোনা আল্লাহর গযব এবং 'আল-আযাবুল আদনা' (ছোট আযাব)। আল্লাহর সমস্ত গযবই বস্তু দিয়ে হয়, যার ফলে সবকিছুরই বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হয়। কোনো কিছুর বস্তুবাদী ব্যাখ্যা জানি বলে তা আল্লাহর আযাব নয়, এই ধারণা ঠিক নয়। করোনা তো একটা জীবাণু, একটা ভাইরাস। এটা আল্লাহর আযাব হবে কেন? এটা অজ্ঞতাপ্রসূত প্রশ্ন। আল্লাহ তাঁর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যেকোনো কিছুকেই ব্যবহার করতে পারেন। মশা, পঙ্গপাল, উকুন, দাবানল, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প যেকোনো কিছু। যেমন এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

যে জাতির মাঝে (ব্যাপকভাবে) অশ্লীলতা-কুকর্ম দেখা যাবে এবং তা প্রকাশ্যেই করা হবে, সে জাতির মাঝে মহামারি ও এমন সব রোগ-ব্যাধির আবির্ভাব ঘটবে, যা পূর্বের জাতিসমূহের মাঝে কখনো দেখা যায়নি। রোগ আপতিত করবেন, যা তোমাদের পূর্বে হতো না

অর্থাৎ এই যে নতুন নতুন রোগ, এগুলো আমাদের কৃতকর্মের দরুন আল্লাহর ক্রোধের প্রকাশ। আমরা আরো দেখলাম, আল্লাহর গযব একটা ব্যাপক বিষয়। তাঁর রহমত যেমন একটা ব্যাপক বিষয়। আল্লাহকে যে গালি দেয়, তাকেও আল্লাহ একটা নির্দিষ্ট সময় অব্দি অবকাশ দেন। তাকেও রিজিক দেন, প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা আটকে দেন না, সন্তান দেন। তেমনি তাঁর গযবও ব্যাপক। যে এলাকায় আসে সে এলাকায় কাফির-মুমিন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আযাবে গ্রেপ্তার হয়। এই কমন আযাবটাই কাফিরের জন্য 'ফাইনাল ধরা' হয়, মুমিনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে যায়। মহামারিতে দুজন মরল, কাফিরের জাহান্নামের জীবন শুরু হলো। ধৈর্যধারণকারী ও সাওয়াবপ্রত্যাশী মুমিনের শহিদের মর্যাদা শুরু হলো। দুনিয়ার আযাবটা মুমিনের জন্য আখিরাতের পুরস্কার হয়ে ধরা দিলো।

» আর জীবিত উদাসীন মুমিনদের জন্য ওয়ার্নিং। এ ওয়ার্নিংয়ের পর কেউ কেউ শুদ্ধ হয়ে গেল।

» আর কেউ কেউ গুনাহে হঠকারিতা করতেই থাকল। ক্রমাগত গুনাহ করতে থাকা বা গুনাহের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যাওয়া এই মুমিনটির ঈমান চলে যাওয়ার কারণ হবে। যেমন: 'সালাত হলো ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্যসৃষ্টিকারী' - এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ইচ্ছাকৃত সালত ছেড়ে দেয় সে কাফির। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ ও ইসহাক ইবনু রাহওয়াই রাহিমাহুমাল্লাহও একই মত পোষণ করেছেন। আর অধিকাংশ আলিম বলেন, বেনামাযি নগদে কাফির হবে না, তবে তার ক্রমাগত সালাত ত্যাগ তাকে কুফুরির দিকে ধাবিত করবে।

ভ্যাকসিন বা ওষুধ তৈরি হলো, করোনা চলে গেল; তবু এটা প্রমাণ হয় না যে, এটা আযাব নয়। কারণ-

“ ...কতক জাতিকে এর দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাকি রয়ে গেছে, তাই কখনো তা আসে, কখনো চলে যায়। তবে মুমিনদের জন্য আল্লাহ একে রহমত বানিয়েছেন...

হাদিস বলছে: মহামারি আসবে এবং চলেও যাবে। গযব যেমন আসে বস্তুগত মাধ্যম দিয়ে। গযব চলেও যেতে পারে বস্তুগত মাধ্যম দিয়ে (ভ্যাকসিন/ওষুধ)। মাধ্যমের পর্দার আড়ালে আল্লাহর একচ্ছত্র রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রকাশ বিশ্বাসীর বিশ্বাসের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে। গাছপালা, আকাশ, ফুল, বৃষ্টি সবকিছুর অন্তরালে সে মহাশিল্পীর নিপুণ কারিগরি দেখে, ফিজিক্সের সূত্রের খটমটে ধ্রুবকগুলোর মাঝে মহাপরিকল্পনা-প্রসূত হিসেবি টিউনিং অনুভব করে। জীবকোষের ভেতর এই মুহূর্তে হাজারো বিক্রিয়া একই সাথে আনইন্টেরাপ্টেড চলতে দেখে সে এক মহানিয়ন্ত্রকের অমোঘ নিয়মকে উপলব্ধি করে। করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পেছনে বিশ্বাসী দেখে করুণাময়ের করুণা, নগণ্য মানুষকে দেওয়া যোগ্যতার জন্য সে মহান দাতার বদান্যতার শোকর করে। আর বস্তুবাদী কেবল বস্তুর উপাসনা করে। বস্তুর সাফল্যে অহংকারী হয়ে ওঠে। বস্তুর ব্যর্থতায় আশাহত হয়। অন্ধ সূর্য দেখে না, তাই বলে কি সূর্য নেই?

আমরা প্রত্যেকে মৃত্যুকালে শয়তানের চূড়ান্ত প্রচেষ্টার সম্মুখীন হব, ফিতনাতুল মামাত (মৃত্যুকালীন পরীক্ষা)। শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে শেষ চেষ্টা করবে ঈমানহরণের। যে জীবিতকালে শয়তানের সামান্য ইন্ধনেই কাত হতো, সে শয়তানের সর্বশক্তি নিয়োগে ঈমান ছেড়ে দেবে। হয়তো সে মারা গেল, দাফন হলো, জানাযা হলো, কুরআন খতম হলো। কিন্তু সে কাফির হয়ে মরেছে। মৃত্যুর মুহূর্তে সে ঈমান ত্যাগ করে মরেছে। সুতরাং, 'মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া'টা আপনাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দেয় না। বরং 'ঈমান নিয়ে মৃত্যু' আপনাকে জান্নাতে পৌঁছাবে। আর ঈমান নিয়ে মৃত্যু তখনই গ্যারান্টেড যখন আপনি পুরোটা জীবন ঈমানের ওপর চলে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করবেন, তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসবেন আল্লাহর দিকে। আল্লাহ বলছেন—

নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের রব (প্রতিপালক+অধিকারী Master) আল্লাহ। অতঃপর (এই কথার ওপরেই) অবিচল থাকে। তাদের কাছে (মৃত্যুকালে) নাযিল হয় ফেরেশতা। (এবং বলে) ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না। সেই জান্নাতের সুসংবাদ নাও, যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল

মৃত্যুকালে আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে আপনার ঈমান নিশ্চিত করে, আপনাকে কমফোর্ট করে জান্নাত নিশ্চিত করবেন। শর্ত হলো আল্লাহকে তাঁর অধিকার দিতে হবে, রব হিসেবে, আপনার মালিক হিসেবে, আপনার পালনকর্তা হিসেবে তাঁর যে স্থান আপনার জীবনযাত্রায় তাঁর প্রাপ্য, সেটা তাঁকে দিতে হবে এবং মৃত্যু তক সেই জীবনের ওপর আপনাকে অটল থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এটা আপনারই কাজ। নয়তো আল্লাহর নিজস্ব কোনো ঠেকা নেই, মুসলিম পরিবারে জন্ম বলে আমাকে জান্নাত দিতেই হবে।

তো, করোনা আল্লাহর ক্রোধের প্রকাশ। আপনার ঈমানের এন্টেনায় এটুকু ধরা পড়তে হবে। না হলে প্রবলেম। প্রশ্ন আসতে পারে : তাহলে আল্লাহর গযব ঠেকানোর জন্য এই যে মাস্ক-পিপিই-ভ্যাকসিন এগুলো তো বেয়াদবি হচ্ছে, আল্লাহর রাগকে কাউন্টার দেওয়া কি ঠিক? দেখুন—

» গযব এসেছে রোগের সুরতে

» নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা-আরোগ্য সৃষ্টি করেননি। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান সাধন করেছিল অভূতপূর্ব উন্নতি। বিভিন্ন সভ্যতার গ্রন্থানুবাদ—বিশ্লেষণ, নতুন ওষুধ সন্ধান, ডোজিং, ফার্মাকোলজি ডেভলপ করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ইউরোপীয় মেডিসিন গড়ে উঠেছে। সার্জারি যন্ত্রপাতি ডেভলপ, সার্জারি প্রক্রিয়া গঠন হয়েছিল যার অনেক কিছু আজও আমরা ব্যবহার করি। সুতরাং, রোগ নিয়ে গবেষণা, এটাও ইসলামের বিধান থেকে উৎসারিত ও উৎসাহিত।

» হাদিসের হুকুম হলো—মহামারি গযব। মহামারির সময় যথোচিত বস্তুগত ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নিজেকে দূরে রাখো, ওই স্থানে যেয়ো না, সেখান থেকে বের হয়ো না। সুস্থ উটের সাথে অসুস্থ উট মিশিয়ো না। পবিত্রতা মেইনটেইন করো (তাহারাত)। ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা করো।

সুতরাং, বস্তুবাদ বলছে, মহামারি বস্তুগত কারণে হলো (ভাইরাস ইত্যাদি), বস্তু দিয়ে সমাধান করো (ভ্যাকসিন ইত্যাদি)। আর ইসলাম বলছে, বস্তুগত মাধ্যমের (ভাইরাস) আড়ালে আসল উৎস আল্লাহর ক্রোধ (তোমাদের গুনাহের কারণে), ফলে আসল উৎস সামলাও (তাওবা-আমল দ্বারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো) এবং মাধ্যম সামলাও (ওষুধ, হাইজিন ইত্যাদি)। ইসলাম হলিস্টিক সিস্টেম—টোটাল (ইহজগত+পরজগত), উট বেঁধে তাওয়াক্কুল। শুধু বিশ্বাসে ভর করে হাত গুটিয়ে থাকা নয়, আবার বিশ্বাসহীন বস্তুগত গোঁড়ামিও নয়। এটাই ইসলাম আর অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য।

টিকাঃ
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০১৯; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৬২৩; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৪৬৭১; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৩০৪২, ৩০৪৩; ১০০৬৬; মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৫৫৮; আশা-উকুবাত, ইবনু আবিদ দুনইয়া: : ১১; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৩৩- হাদিসটি হাসান
১. শারহু মুসলিম, নাওয়াওয়ি খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৯৪
২. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৩, ৬৯৭৪; সহিহ মুসলিম: ২২১৮; জামি তিরমিযি: ১০৬৫; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৭৪৮১; সহিহ ইবনি হিব্বาน: ২৯৫২, ২৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৫১, ২১৭৬৩, ২১৮০৬, ২১৮১৮; মুসনাদুল হুমাইদি: ৫৫৪
৩. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৪, ৫৭৩৪, ৬৬১৯; মুসনাদু আহমাদ: ২৪৩৫৮, ২৫২১২, ২৬১৩৯; মুসনাদু ইসহাক ইবনি রাহওয়াই: ১৩৫৩, ১৭৬১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৬৫৬০; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৭৪৮৫
১. সুরা ফুসসিলাত (হা-মীম-সাজদাহ), আয়াত: ৩০
১. সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৪৩৯; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৭৫১৩; মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২৩৪১৬; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ১৯৫৫৭

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 স্পর্ধানামা

📄 স্পর্ধানামা


সুতরাং, স্প্যানিশ ফ্লু, প্লেগ, ডেঙ্গু, করোনা, পঙ্গপাল, ইসরাইলের দাবানল, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল, সুনামি, নান্দনিক নামের সব সাইক্লোন, ভূমিকম্প এমনকি মুসলিমদের অন্তর্কোন্দল, নেতৃত্বহীনতা, কাফির কর্তৃক নির্যাতন এ সবই আল্লাহর গযবের প্রকাশ ও সতর্কবার্তা।

প্রথমদিকে আলোচনায় আমরা দেখেছি আযাব আসার এপিসেন্টার হলো স্পর্ধা। কাফির স্পর্ধা দেখাবে, স্বাভাবিক। আর আমরা মুসলিমরা আল্লাহকে চিনি, এরপরও স্পর্ধার সীমা অতিক্রম করেছি। কাফিরদের প্রতিটি ভঙ্গি অনুকরণ করেছি। যেমনটা বনি ইসরাইল করত। তারা ছিল আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতপ্রাপ্ত জাতি, আল্লাহর অলৌকিক কুদরত তারা স্বচক্ষে দেখত। আল্লাহ বলছেন-

يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَنِّي فَضَّلْتُكُمْ عَلَى الْعَالَمِينَ

হে ইসরাইলের বংশধরগণ! আমার সে নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা দ্বারা আমি তোমাদের অনুগ্রহ করেছিলাম। আর নিশ্চয় আমি সমগ্র সৃষ্টিকুলের ওপর তোমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।

আল্লাহ বারবার তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, অলৌকিকভাবে সাহায্য করেছেন।
আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত

ফিরআউনের নৃশংস জুলুম থেকে উদ্ধার করেছেন।

চোখের সামনে সাগর ভাগ হয়ে গেল। তার ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হলো।

ফিরআউনকে দলবল-সহ ডুবিয়ে মেরেছেন। তারা স্বচক্ষে দেখেছে।

পাথর ফেটে ১২টা ঝরনা বের করেছেন, তা থেকে তারা পানি পান করেছে [সুরা বাকারা, আয়াত: ৬০]

মুসা আলাইহিস সালামকে চল্লিশ দিনের জন্য তুর পাহাড়ে রেখেছেন তাদের জন্য ইহকাল-পরকালে সুখের একটা গাইডলাইন পাঠাবেন বলে।

আল্লাহ তাদেরকে সুশৃঙ্খল জীবন পরিচালনার জন্য দিয়েছেন তাওরাতের শরিয়ত।

তারা ৭০ জন প্রতিনিধি পাঠাল আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখার জন্য। তুর পাহাড়ে গিয়ে তারা নিজ কানে আল্লাহর বাণী শুনল।

তাদের অকৃতজ্ঞতা

এত কিছু দেখার পরও, আল্লাহর এত পরিচয় দেখার পরও তারা গোবৎসের পূজা করল।

তারা বলেছে, ‘হে মুসা! আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনো বিশ্বাস করব না।’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ৫৫] অথচ মুসা আলাইহিস সালাম যে আল্লাহর নবি, তারা তা স্বচক্ষে দেখেছে।

এরপরও তারা বলল, নিজ চোখে দেখতে চাই।

এরপরও তারা পরিষ্কারভাবে বলে দিলো, আমাদের দ্বারা এ গ্রন্থের ওপর আমল করা সম্ভব হবে না। ফলে তুর পাহাড় মাথার ওপর ঝুলিয়ে রেখে আনুগত্যের অঙ্গীকার করানো হলো। [সুরা বাকারা, আয়াত : ৬৩, ৯৩]

বজ্র তাদের গ্রাস করল। মুসা আলাইহিস সালামের অনুরোধে আল্লাহ আবার তাদেরকে পুনর্জীবিত করলেন। তারা ফিরে এসে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিলো।

খাওয়ার জন্য জান্নাত থেকে মান্না-সালওয়া দেওয়া হয়েছে।

তারা বলেছে, 'হে মুসা! আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করব না। সুতরাং, তুমি তোমার রবের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করো-তিনি যেন আমাদের জন্য ভূমিজাতদ্রব্য শাক-সবজি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ উৎপাদন করেন'। [সুরা বাকারা, আয়াত : ৬১]

আল্লাহ বললেন, ঠিক আছে, তাহলে এই জনপদ দখল করো, সেখানে চাষাবাদ করো।

তারা বলল, মুসা, তুমি আর তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করোগে। অথচ তারা প্রথম থেকেই দেখে আসছে যে আল্লাহ তাদের সাহায্য করছেন।

শহর দখলে আসার পর আল্লাহ বললেন, ঢোকো। দরজা দিয়ে নতশিরে প্রবেশ করো। আর বলো, 'ক্ষমা চাই।' [সুরা বাকারা, আয়াত: ৫৮]

তারা তা না করে শব্দ বিকৃত করে 'গম চাই' বলতে বলতে ঢুকল।

বারবার তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন।

তারা নবিদেরকে হত্যা করেছে।

পরিশেষে আল্লাহ তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত অভিশপ্ত করলেন। আল্লাহ দুইবার কাফিরদের (পারসিক ও রোমান) ব্যবহার করে তাদেরকে আযাব দিয়েছেন। রাজ্য দুভাগ হয়ে গেছে। ৭২ দলে দলাদলি করেছে।

আর সে সময়টির কথা স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ঘোষণা করলেন যে, নিশ্চয় তিনি তাদের (ইহুদিদের) ওপর কিয়ামত পর্যন্ত এমন লোক (শাসক) প্রেরণ করতে থাকবেন, যারা তাদেরকে কঠোর শাস্তি দিতে থাকবে। নিশ্চয় আপনার রব শাস্তিদানে খুবই ক্ষিপ্র এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।

মিলিয়ে নিন আজ আমাদের সাথে। কাফিরদেরকে আল্লাহ তাআলা আজ আমাদের ওপর প্রবল করে দিয়েছেন। কতগুলো রাষ্ট্রে কতগুলো দলে উম্মাহ বিভক্ত! কী করেছি আমরা? কী স্পর্ধা দেখালাম যে, বনি ইসরাইলের মতো হুবহু একই পরিণতি হচ্ছে আমাদের? চলুন খুলে দেখি হিসেবের খতিয়ান।

১ম স্পর্ধা : ধর্মনিরপেক্ষতা/সেক্যুলারিজম

১.১ রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা

খুব খারাপ শোনাবে কথাগুলো। দাঁত চেপে শুনবেন আর নিজের জীবনের সাথে মেলাবেন। কসম আল্লাহর, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে আমাদের জীবন থেকে বের করে দিয়েছি। আল্লাহ বলছেন-লিল্লাহি মুলকুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সকল রাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) করে ছেড়েছি। আমি সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তাদেরকে দাওয়াহর নিয়তে নসিহত করছি। আপনারা তাওবা করুন, আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করুন। কার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন? কাকে বাদ দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন? কাকে বাদ দিয়ে সংবিধান করছেন? ইউরোপীয়দের পাল্লায় পড়ে আল্লাহর সাথে অনেক লড়েছেন, আর নয়। এবার ক্ষান্ত দিন।

>> 'আল্লাহর ওপর বিশ্বাস'-এর কোনো জায়গা আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে নেই। কোনো পলিসিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রাখা হয় না। আল্লাহ এই পলিসিতে কী করতে বলেছেন, তা বলার মতো লোক আপনাদের পলিসি লেভেলে থাকে না। একজন নামেমাত্র সংবিধানে ঢুকিয়েছিল, সেই নামেমাত্র 'আল্লাহর নামটুকু সংবিধানে থাকবে', তাও আমাদের সহ্য হয়নি। দলাদলি আর দলীয় অন্ধত্ব এই পর্যায়ে গেছে, আল্লাহর নাম... কার নাম? 'আল্লাহর নাম' আমরা বের করে দিয়েছি।

কাফিরদের সন্তুষ্টি পেতে, কাফিরদের দেওয়া উন্নয়নসূচকে স্থান পেতে আমরা নারীনীতি করি কাফিরদের মতো করে। আল্লাহ ও রাসুল কী বললেন, তার সেখানে জায়গা নেই।

অসাম্প্রদায়িকতার নামে শিক্ষানীতি করি বিধর্মী-স্তুতি দিয়ে, যা আল্লাহ ও রাসুল থেকে নিয়ে যায় দূরে বহু দূরে। খোদ পশ্চিমা একাডেমিয়ায় যেগুলো এখনো বিতর্কিত, সেগুলোকে (নারীবাদ, মানবতাবাদ, বিবর্তনবাদ প্রভৃতি কুফরকে) ধ্রুবসত্য ও আধুনিকতার স্কেল হিসেবে শেখাই আমাদের সন্তানদের।

এমনি করে আইনসভায় আইন করার সময় আল্লাহ ও রাসুলের কথার কোনো স্থান নেই। মদ ও পতিতার লাইসেন্স দেবার সময় আল্লাহর সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা নেই।

অর্থব্যবস্থায় 'আল্লাহ যে সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন' তার কোনো পরোয়া নেই। আল্লাহর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে আমাদের কোনো ভয় নেই।

পরিবার পরিকল্পনা নামে আমরা একটা মন্ত্রণালয়ই বানিয়ে নিয়েছি যাদের কাজ 'আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করা' (টিউবেকটোমি ও ভ্যাসেকটোমি)।

দণ্ডবিধিতে আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাখিনি। আল্লাহ আর তাঁর রাসূল এ যুগে 'অচল'? কুরআনে নানা জায়গায় বিধান-আইন বলে দিয়ে আল্লাহ বলছেন: 'এগুলো হলো আল্লাহর নির্ধারণ। আর (যারা এটা অস্বীকার করবে, সেই) কাফিরদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' মহারাজাধিরাজ আল্লাহর বেঁধে দেওয়া দণ্ডকে 'অমানবিক' বলেছি, 'এ যুগে অচল' বলেছি। কত বড় সাহস আমাদের! এত বড় সাহস গত ১৪০০ বছর মুসলিমরা কখনো দেখায়নি।

নামেমাত্র যেটুকু 'আল্লাহর ওপর বিশ্বাস' রাষ্ট্রনীতিতে কথার কথা হিসেবে ছিল, নাস্তিক-বাম মুরতাদ বুদ্ধিজীবী আর কাফির প্রতিবেশীকে পাশে পেতে সেটুকুও আমরা খেদিয়েছি। মুখে মুসলিম দাবি করে এত বড় স্পর্ধা আমাদের। আল্লাহকে বের করে দেওয়ার স্পর্ধা। আল্লাহর সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা না করার দম্ভ আর ঔদ্ধত্য আমাদের। সীমা বেঁধে দিয়ে আল্লাহ বলেছেন 'খবরদার, এটুকু আমার সীমা, এই সীমা লঙ্ঘন করবে না।' আর আমরা দম্ভের সাথে ঘোষণা করছি 'আল্লাহর সীমা মানি না', 'আমরা ধর্মনিরপেক্ষ', মানে রাষ্ট্র চলবে ইউরোপীয় কায়দায়, এখানে আল্লাহর মতামতের মূল্য নেই। এগুলো কাফিরদের মুখে মানায়, একেকজন মুসলিম আমরা এই ঘোষণা দিচ্ছি আজ।

১.১.১ খুলে ফেললাম ফুলের মালা

মধ্যযুগে মুসলিম সাম্রাজ্য যখন জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প সংস্কৃতি, আইনের শাসন, নিত্যনতুন ভূখণ্ডে মাজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান ইত্যাদির অনন্য নজির তৈরি করছিল। ঠিক তখন মধ্যযুগে পোপ-যাজকদের সমর্থিত জমিদার ও রাজতন্ত্র ইউরোপের জনজীবন দুঃসহ করে তুলেছিল। অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ধর্মীয় দলাদলি, যুদ্ধ, মানব-রচিত বিকৃত খ্রিষ্টধর্মের কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথায় অতিষ্ঠ ইউরোপ মুক্তি চাইল। ইউরোপের দার্শনিকরা জমিদারতন্ত্রকে উৎখাত করে গণতন্ত্র আর খ্রিষ্টীয় যাজকতন্ত্রকে উৎখাত করে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার কথা বলল। নতুন এই রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্ম বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো স্থান নেই। দুই অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই প্রেক্ষাপট। একদিকে ওহিভিত্তিক শাসনের ফলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত। আরেকদিকে মানব-রচিত ধর্মের কারণে স্বার্থান্বেষী যাজকশ্রেণি সমর্থিত শাসনের ফলে অন্যায়ের সয়লাব। দুটো দুই জিনিস। আজ ওরা গলা থেকে শেকল খুলে ফেলেছে বলে দেখাদেখি আমাকেও গলা থেকে ফুলের মালা খুলে ফেলতে হলো? একটু ভাবার ফুরসত হলো না কী করছি? কাকে দেখাতে গিয়ে কাকে রাগাচ্ছি? কাকে সাথে নিয়ে কার সাথে লাগতে আসছি?

ইউরোপ তাদের 'এনলাইটেনমেন্ট'-এ এসে সোকল্ড আলোকিত হয়েছে। আর আমরা তো আলোকিতই ছিলাম। আমাদের হিদায়াতের নুর তো সেই ৭ম শতকেই এসে গেছে।

» ১৭০০ সালে ব্রিটিশ আসার আগে আমরা তো বিশ্বে ১ নম্বর অর্থনীতির দেশই ছিলাম, চীনকে টপকে। আজ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর কেন আমরা বনেবাদাড়ে মলত্যাগ করি, বুঝতে এত কষ্ট কেন?

» ১৭৫৭ সালে পলাশী জয় আর ১৭৬০-এ শিল্পবিপ্লব। এত এত কারখানার পুঁজি কোথা থেকে কোথায় গেল, বুঝতে এত কষ্ট?

» ব্রিটিশের দুনিয়াজোড়া সাম্রাজ্য কারা গড়ে দিলো, কারা তাদের সব যুদ্ধের ব্যয় মেটাল, তাদের যুদ্ধব্যয় মেটাতে গিয়ে ১ম অর্থনীতির দেশটায় ১০০ বছরে ৫২ বার দুর্ভিক্ষে ৫ কোটি লোক কীভাবে মরে গেল, বুঝতে এত কষ্ট?

» ইউরোপের তকতকে পাথরের পথঘাট, ঝলমলে শহর-বন্দর, এত এত গবেষণার ফান্ডিং কোথা থেকে গেল?

বোকা আমি এখানে বসে ভাবছি: আরে ওরা বিজ্ঞান করে কত উন্নত হয়েছে, কত নারীবাদ করে কত উন্নত হয়েছে, হিউম্যানিজম করে কত উন্নত হয়েছে। আমরাও এগুলো করে মধ্যম আয়ের দেশ হব। মুক্তবাজার অর্থনীতি করে উন্নত বিশ্ব একদিন হবই হব। অথচ তারা উন্নত হয়েছে নিজেদের বাজার বদ্ধ করে, আমাদের শিল্প শেষ করে, শিল্পোন্নত ভারতবর্ষকে কৃষির দেশ বানিয়ে, নারী শ্রমিকদের অর্ধেক বেতন দিয়ে। নীলকুঠির সাহেব দাদনের অত্যাচার করে, মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে ৫ কোটি লোক না খাইয়ে মেরে এখন এসেছে হিউম্যানিজমের কটকটি নিয়ে। আর তাই কিনতে 'আবাল' বৃদ্ধবণিতা মুসলিম ছুটছি তো ছুটছিই। জাতিসংঘ নামের একটা কাকতাড়ুয়া বানিয়ে পেছন থেকে বাধ্য করছে ওদের এসব আইডিয়া দিয়ে পলিসি বানাতে, যাতে সম্পদের সাপ্লাইটা চিরকাল ইউরোপমুখীই থাকে। উপনিবেশ ছাড়লেও আয়টা যেন না ছোটে। গণতন্ত্র নামক লুডুখেলা জিনিস শিখিয়ে দিয়ে গেছে, যে তাদের মনমতো পলিসি করবে না, তাকে যেন বদলে দেওয়া যায় পরের দানে।

১.১.২ যুদ্ধটা কার সাথে

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন ১৪ শ' বছর আগে-

আমার উম্মত আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) কদমে কদমে অনুসরণ করবে। তারা গোসাপের গর্তে ঢুকলে এরাও সেধোঁবে

আজ ব্রিটিশ আইন আমাদের আইন, ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা আমাদের বিচারব্যবস্থা, ব্রিটিশ এন্ট্রান্স-এফএ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, ব্রিটিশ অর্গানোগ্রাম আমাদের শাসনব্যবস্থা। ওদের গণতন্ত্র আমাদের কেন নিতে হলো? আমরা তো আওরঙ্গজেবের শাসনেই ১ম অর্থনীতির দেশ ছিলাম, শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আমাদের। ওদের ব্রিটিশ কমন 'ল' কেন নিতে হলো? আমাদের শারিয়া আইনেই অপরাধের হার ছিল সর্বনিম্ন। ওদের ধর্মনিরপেক্ষতা আমরা কেন নিলাম? এমনিতেই হিন্দুরা উচ্চ পদে দেদারসে নিয়োগ পেত, যদিও তার ফল মুসলিমদের জন্য ক্ষতিই বয়ে এনেছে বারবার।

ওদের মিথ্যা উপাস্য মনুষ্যপুত্র যীশুকে ওরা বের করেছে। আমার প্রবল পরাক্রমশালী একক সৃষ্টিকর্তা, স্বত্বাধিকারী, আল-কাহহার, প্রতিশোধ গ্রহণকারী (যুনতিকাম) সর্বশক্তিমান আল্লাহকে আমি কেন বের করে দিলাম আমার সংবিধান থেকে, আমার কোর্ট থেকে, আমার টেক্সটবুক থেকে, আমার অর্থনীতি থেকে, আমার পলিসি থেকে। কোন আক্কেলে, কোন কলিজায়? কে দিলো আমাকে এত বড় সাহস? প্রশ্ন করেন নিজেকে। বুক একটুও কাঁপল না মদের লাইসেন্স দেবার সময়। কলিজা একটুও কাঁপল না পতিতালয়ের লাইসেন্স, সুদকে বৈধতা দেবার সময়। কার সাথে লাগতে যাচ্ছি? কে তিনি?

'আর যার ওপর আমার ক্রোধ আপতিত হয়, সে তো নিশ্চিতই ধ্বংস হয়ে যায়।'

দেশ পরিচালনায় যারা রয়েছেন, সকলের প্রতি অধমের দিল-চেরা আহ্বান। দুহাত জোড় করছি, আপনারা তাওবা করেন। সংসদে তাওবা করে দুআ হয়েছে। কিন্তু আসল ভুলটা কোথায়, স্পর্ধাটা কোথায়, সীমা ছাড়িয়েছি কোথায়, তা দেখানোই আমার বই লেখার উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাওবা করুন। সকল পলিসি রিচেক করুন। আল্লাহ-দ্রোহী আইন, পলিসি সব বাদ দিন। ভয় করুন। করোনা হয়তো চলে যাবে, কিন্তু ওই আল্লাহকে ভয় করুন যার কাছে অসহায় অবস্থায় খালি হাতে আপনাকে যেতে হবে। তিনি লক্ষবার আপনার জ্যান্ত চামড়া তুলে লক্ষবার নতুন চামড়া দিতে পারেন, প্রতিবার আপনি ছাল-ছিলার অসহনীয় যন্ত্রণাময় স্বাদ আস্বাদন করবেন। তাঁর ক্রোধকে ভয় করুন। আপনার অফিস, আপনার সংসদ, আপনার গোপন শলাপরামর্শ কিছুই তাঁর আওতা, তাঁর কাউন্টের বাইরে নয়।

লিখতে লিখতে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কেন তাঁর ক্রোধ আমাদের ওপর আসবে না, আমাকে বলেন। স্পর্ধার কী বাকি রেখেছি আমরা গত ১০০ বছর?

১.২ ক্যারিয়ারে সেক্যুলার

এতটুকু পড়ে হয়তো নিজেকে দায়িত্বমুক্ত মনে হচ্ছে। স্পর্ধা যা দেখানোর তা তো ক্ষমতাবানরা দেখিয়েছে, আমরা তো দেখাইনি। আমরা তো আম-মুসলিম। রাষ্ট্র-বিচার-আইন-শাসন ওসব তো আর আমার হাতে ছিল না। না, বন্ধু। আমি আপনি এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছি গত ১০০ বছর। নিজের মতামত, ভোট, মেধা, অস্ত্র, শ্রম দিয়ে আল্লাহর সাথে স্পর্ধাকারী সিস্টেমকে সমর্থন দিয়েছি। আমরা মনে করেছি, বিশ্বাস করেছি 'রাজনীতিতে আল্লাহর কোনো জায়গা নেই'। এই আপ্তবাক্যকে আউড়িয়েছি, শিখিয়েছি, দম্ভভরে ঘোষণা করেছি। কত বড় সাহস আমার, আমি আল্লাহকে বের করে দেবার কথা বলেছি, আল্লাহর দেওয়া মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, আল্লাহর খেয়ে আল্লাহর পরে। আপনারা কী ভাবতে পারছেন আমরা কী করেছি? What we have done? 'আল্লাহ' মুক্ত রাজনীতি করেছি গত ১০০ বছর। কী জানি কাকে দেখানোর জন্য, কাদের সাপোর্ট পেতে পেছনে ফেলে রেখেছি কুরআনের অকাট্য সব বিধান। যেন এসব কুরআনে নেই।

চাকরিজীবনে আল্লাহকে বের করে দিয়ে চাকরি খুঁজেছি। চাকরিতে আবার আল্লাহ কেন আসবে? জীবিকা নিয়ে আল্লাহ কী বলল, তাঁর নবি কী বলল, কোনো তোয়াক্কা করিনি। কেউ বলে দিলেও পাত্তা নেই আমার কাছে। ওসব কি এ যুগে চলে? যেন বললাম, 'মধ্যযুগীয় আল্লাহ' আর তাঁর 'মধ্যযুগীয় রাসুল'-এর কথায় এই আধুনিক যুগ চলবে? (নাউযুবিল্লাহ) এটাই তো বলতে চাই, না কি? কথা ও চিন্তার 'গতিপথ' কোনদিকে দেখেন? আমাদের কথা আর আমাদের কাজে কী পরিমাণ স্পর্ধা প্রকাশ পায়, দেখেছেন? এগুলোর মানে কী দাঁড়ায়? সহিহ মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের চুক্তিলেখক ও চুক্তির সাক্ষীদের ওপর লানত করেছেন। নবিজির অভিশাপের কী মূল্য? ফুঃ ওসব শুনলে জীবন চলে? আলহামদুলিল্লাহ, আজ সুদের চুক্তিলেখকের চাকরি পেয়েছি। মেয়ের জামাই কী করে? জামাই সুদের চুক্তিলেখক। মেয়ে মাইক্রোসুদ এনজিওতে চাকরি করে। একবারও তোয়াক্কা করিনি আল্লাহ কী বলেছেন এই চাকরির ব্যাপারে। এই লেখাটি পড়তে পড়তে নিজের অন্তরের দিকে তাকান। আল্লাহর যুদ্ধ ঘোষণার কোনো পাত্তা আমার কাছে আছে কি না।

দারিদ্র্যের ভয়ে সুদে ঋণ নিয়েছি, ব্যবসা করব। কে ঘুচাবে আমার দারিদ্র্য? কে বণ্টন করে রিজিক? আমি কি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে রিজিক ছিনিয়ে আনতে চাচ্ছি? আল্লাহ বলছেন কুরআনে: 'আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন... এরপর যদি তোমরা সুদ ত্যাগ না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে 'যুদ্ধের' ঘোষণা শুনে নাও।' হোয়াট? আমরা চাকরি-ব্যবসা করছি, নাকি আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করছি? আমরা করতে চাচ্ছিটা কী আসলে? একটু ভাবেন ভাই, আমার পরিচয়টা কী আসলে? মুসলিম? মুসলিম মানে তো আত্মসমর্পিত, এর অর্থ তো 'প্রতিপক্ষ' নয়। আমার ক্যারিয়ার থেকে (৮ ঘণ্টা দিনে) মহাশক্তিধর আমার Owner-কে আমি বের করে দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছি। হোম লোন, কার লোন, বিয়ে লোন, শিক্ষা লোন। হে মহাশক্তিধর পরাক্রান্ত আল্লাহর 'প্রতিপক্ষ', ক্ষান্ত দেন, ক্ষান্ত দেন। নিজের ওপর রহম করেন। আল্লাহর ক্রোধকে চিনে নেন।

সুরা মায়িদায় পর পর তিনটি আয়াতে আমাদের Owner, আমাদের যিনি বানিয়েছেন, সেই আল্লাহ বলছেন : وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ 'আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তা অনুসারে যে যারা বিচারকার্য করে না...' প্রথমে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (তারাই কাফির, অবিশ্বাসী), পরের আয়াতে বলছেন, فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (তারাই জালিম, অত্যাচারী)। পরের আয়াতে বলছেন : فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (তারাই ফাসিক, গর্হিত পাপাচারী)। আল্লাহর এই কথাগুলোর আর কোনো ব্যাখ্যা দরকার আছে? ভার্সিটিতে সাবজেক্ট চয়েসের সময়, সার্ভিস কমিশনে পরীক্ষা দেবার সময়, একবারের জন্যও মন বলেনি আমার Owner কী বলেছেন দেখি। এই সাবজেক্টটা নেব, না নেব না? এই চাকরিটা করব, না করব না? আমার জীবনে আমার আল্লাহর মতামতের কী মূল্য আমি দিয়েছি? বলেন, কী মূল্য আমার কাছে সর্বশক্তিমান শাস্তিদাতা এবং একইসাথে স্নেহশীল অভিভাবক Owner আল্লাহর। আমার চাকরিই আজ আল্লাহ-বিরোধী আইন প্রয়োগের চাকরি। আমার শক্তি-মেধা-শ্রম-অস্ত্র দিয়ে আমি আল্লাহ-বিরোধী আইনকে টিকিয়ে রেখেছি। উঁচু থেকে উঁচু পদে উন্নীত হয়েছি। হে মুসলিম ভাই, আমরা কি মুসলিম আছি? নাকি আল্লাহর প্রতিপক্ষ হয়ে গেছি? এর পরের প্রোমোশন তো 'কাফিরুন-জলিমন-ফাসিকুন' (কাফির-জালিম-ফাসিক)। আল্লাহ বলছেন—এখনো কি ঈমানদারের সময় আসেনি অন্তর বিগলিত হবার? নিজেই বিচার করেন, এই লেখা পড়ার পর আপনার অন্তর বিগলিত, নাকি উদ্ধত? কোনো ব্যাখ্যা দিলাম না, বলবেন অপব্যাখ্যা করছি। জাস্ট কুরআন কোট করলাম।

ফেসবুকে ডাক্তারদের বেশকিছু গ্রুপ আছে। ডাক্তাররা জানেন ঔষধের সাথে পথ্য (সহযোগী খাবার) দেওয়া হয়। এরপরও আমি নিশ্চিত জানি, পথ্য হিসেবে মধু ও কালোজিরার আয়াত ও হাদিসগুলো সেখানে দিলে হিন্দু ও মুরতাদরা 'হা হা' রিয়‍্যাক্টে ভরিয়ে দেবে। অথচ হলুদ-আদা-রসুন-ছাগলের দুধের কথা বললে দিতো না। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, বহু মুসলিম দাবিদার, এমনকি নামাযি-হিজাবিরাও হাহা দেবে। অনেকে বলবে, কোনো 'মোল্লাদের গ্রুপে' দিতে, এখানে ধর্মীয় আলাপ না করতে। এই বিভাজনটা কীভাবে এলো? কে আমাদেরকে বলে দিলো : সব আলাদা করে ফেলো, এগুলো থেকে আল্লাহকে আউট করে দাও। আল্লাহর নাম নিবা শুধু মসজিদে-মাদরাসায়। মসজিদ থেকে বেরিয়ে প্যান্টের ভাঁজ খুলে ফেলবা, ভুলে যাবা আল্লাহ নামে কেউ আছেন। মসজিদের ভেতরে করো ঠিক আছে, বাইরে আল্লাহর আর এখতিয়ার নেই। জীবনের ক্ষেত্রগুলো আলাদা করে দেওয়া, সবখানে ধর্ম টেনে আনবেন না—এসব শ্লোগান তো মুসলিমের মতো শোনায় না। তাহলে আল্লাহ যে দণ্ডবিধি দিলেন, তার ওপর আমাদের ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে অর্থব্যবস্থা দিলেন তার ওপর ঈমান কোথায়? আল্লাহ যে পরিবার-ব্যবস্থা দিলেন, তার ওপর ঈমান কোথায় আমার? তাহলে কি আমরা কুরআনের কিছু অংশ মানি, কিছু মানি না?

আমরা তো মুসলিম ছিলাম। আমরা তো আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলাম। আমাদের তো সবখানেই আল্লাহ ছিলেন। অফিসে, আদালতে, ব্যবসায়, অর্থব্যবস্থায়, বিচার, শিক্ষায়। তখন জবাবদিহিতা ছিল, দুর্নীতি-ঘুষ-আত্মসাৎ আল্লাহর উপস্থিতির স্মরণে ভয়ে কল্পনাতেও আসতে পারত না। সে অবস্থায়ই তো আমরা সব সভ্যতার শীর্ষে ছিলাম। হিরা শহর থেকে মদিনা ১২০০ মাইল একজন নারী একেলা উটে চড়ে এসেছে ((অবশ্য এভাবে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া নারীদের একাকী ভ্রমণ শরিয়াহসম্মত নয়), কেউ তার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি সেসময়। স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে বিচার হয়েছে, রায় গেছে সংখ্যালঘু ইহুদির পক্ষে। এ কেমন আইন, এ কেমন সিস্টেম, এ কেমন অফিস, এ কেমন বাজার? ইহুদি আসামি মুসলিম হয়ে গেছে। কাফির ইসলাম গ্রহণ করেছে সিস্টেম 'দেখে'। যাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে বোঝাতে পারতেন না, সে নিজচোখে দেখে বুঝে গেছে। আজ আমরা দেখাতে পারছি না। শারিয়া সবচেয়ে বড় দাওয়াত। সুখ-সমৃদ্ধি-নিরাপত্তা-ইনসাফ-আইনের শাসন-অধিকার-জ্ঞানবিজ্ঞানের চূড়ান্ত রূপ তো আমরা দেখেছিলাম আল্লাহর আইনের অধীনেই। তাহলে কীসে আমাকে বাধ্য করল আল্লাহকে পরিত্যাগ করতে?

يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ

হে মানব সম্প্রদায়! কীসে তোমাকে বিভ্রান্ত করল তোমার মহান রব সম্পর্কে? (কী তোমাকে ধোঁকা দিলো, যে তুমি তোমার বদান্য রবকে পরিত্যাগ করলে?)

আমার আজ প্রচুর টাকা দরকার, সমাজে সম্মান দরকার, উঁচু পদ দরকার। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে। প্রয়োজনে আল্লাহর বিরুদ্ধে গিয়ে, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে, আল্লাহ-বিরোধী এই সিস্টেমটার প্রহরী হয়ে। অথচ আমি দুনিয়াতে আসার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে আল্লাহকে খুশি করা, যেকোনো কিছুর বিপরীতে আল্লাহর দাসত্ব করা।

আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্য।

এই উপর্যুপরি অবাধ্যতা, বিদ্রোহ আর গুনাহের ওপর অটলতা আমাকে 'দাস' (বান্দা) হয়ে কবরে যেতে দেবে তো? নাকি তাঁর 'প্রতিপক্ষ' হয়ে যাব কবরে? বিশ্বাস করুন, আমার লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রিজিকের জন্য আজ মহান আর-রাজ্জাকের বিরুদ্ধে আমি? ইজ্জতের জন্য আজ মহাশক্তিধর আল-মুইজ্জের বিরুদ্ধে আমি? কে আমি? আজ আমার এত শক্তি, এত সাহস? আল্লাহর ক্রোধের উপযুক্ত আমি ছাড়া আর কে?

১.৩ আমার আমি

একটু চোখ বুজি চলেন। আমার সাথে আমার Owner-এর সম্পর্ক কেমন? সম্পর্ক মানে ভাব-বিনিময়, টু-ওয়ে। তিনি আমাকে যা যা বলেছেন, তার প্রতি আমার রেসপন্স কেমন? নাকি তাঁকে আমার দরকার নেই? সম্পর্ক পাতানো নিষ্প্রয়োজন আমার কাছে। যেখানে তিনি চাচ্ছেন আমার সাথে সম্পর্ক করতে—

> আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাকে স্মরণ করব।

> আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো।

> তুমি একহাত এসো, আমি ২ হাত আসছি। হেঁটে আসো, আমি দৌড়ে আসব।

১.৩.১ আমি আল্লাহকে পাত্তা দিচ্ছি না? আমি কার ডাক অগ্রাহ্য করছি? কে তিনি? অফিসের বস, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট? সে (পড়ুন তিনি) আল্লাহ। আসমান জমিনের একচ্ছত্র Owner. বছরের পর বছর আমি সালাত পড়ছি না, কাকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছি? পড়লেও জুমআয় দুটো ঠোকর দিয়েই দৌড়। বছরের পর বছর কুরআন খোলার সময় আমার হচ্ছে না, মানে পাত্তা পাচ্ছে না। জিকির কাকে বলে তা জানিও না, জানার প্রয়োজনও মনে করছি না। Who cares? আল্লাহর কসম, এই করোনা, এই ভীতি এগুলো কিচ্ছু না। সামনে আমার সাথে যা যা হতে যাচ্ছে তার তুলনায় এসব কিচ্ছু না। 'একবার দহনের পর তাকে আমি দেবো নতুন ত্বক, যাতে সে যন্ত্রণার স্বাদ ভোগ করতে পারে।' এভাবে অসীম দিন কেটে যাবে, আবার সেখানকার একদিন আমাদের পার্থিব হিসেব অনুযায়ী হাজার দিনের সমান। রেডি? কী করছি আমরা? বা কী করছি না আমরা? আমার জীবন থেকেই তো আমি আল্লাহকে বের করে দিয়েছি।

১.৩.২ ফেসবুকই ধরুন। দ্বীনী কনটেন্ট আমি অপ্রয়োজনীয় মনে করি। স্কিপ করি। 'নট মাই টাইপ' মনে করি। দ্বীন-আখিরাত-'আল্লাহ' আমার প্রায়োরিটি লিস্টে সবার শেষে থাকে। আমার ২৪টা ঘণ্টা ক্যারিয়ার-ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডস-টিভি-গেমস সবকিছুর মাঝে ডিস্ট্রিবিউটেড। দিনরাতের স্রষ্টা আমার জীবন-মৃত্যুর হুকুমদাতা আমার Owner আল্লাহর জন্য আমার এক মিনিটও সময় নেই। বন্ধু একটা ইসলামি পোস্টে আমাকে ট্যাগ করেছে, সেটা পড়ার জন্য ১ মিনিটও নেই। 'তাদের অন্তর আছে, তারা ভাবে না; চোখ আছে, তবু দেখে না; কান আছে, তাও শোনে না।' দুনিয়ার বাকি সবকিছু আমার কাছে আল্লাহর চেয়ে ইম্পর্টেন্ট। আল্লাহ আমার জীবনে সবচেয়ে আন-ইম্পর্টেন্ট। I am not interested in ALLAH. ওফ!! আমাদের কথা-কাজ- চিন্তাকে ভেক্টর রাশি ধরেন, দেখেন এদের গতিপথ। শয়তান এত এত বছর ইবাদতের পর একটা বার মাত্র স্পর্ধা দেখিয়েছিল। আর আমি দিনে কতবার স্পর্ধা দেখাই? কতবার? আমার তো একটা শেষ আছে, একদিন তো সব ঔদ্ধত্য থামবে। তারপর?

১.৩.৩ সবার সামনে আল্লাহর নাম নিতে লজ্জা পাচ্ছেন। কোনো বক্তব্য, কোনো একাডেমিক সেশন বা লেকচার, কোনো জ্বালাময়ী ভাষণে, কোনো সাক্ষাৎকারে। ভয় পাচ্ছেন, সামনে বসা বিধর্মীরা কী ভাববে। সাপোর্ট কমে যায় কি না, লাইক কমে যায় কি না। তালি কমে যায় কি না। কাফির বস, বড়ভাই, বড় নেতার সুনজর থেকে বাদ পড়ে যাই কি না আল্লাহর নামটা নিলে। এক তো আল্লাহর প্রসঙ্গ আনারই দরকার নেই। ধর্ম টেনে আনার কী দরকার। আর একান্তই আল্লাহর নাম নিতে হলে অফিস-আদালত-বিশ্ববিদ্যালয়ে-জনসভায়-মিডিয়ায় 'আল্লাহ' বলবা না। সৃষ্টিকর্তা, পরম করুণাময়, গড-এগুলা বলবা। ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ। বলবা শুভসকাল বা 'সবাইকে শুভেচ্ছা'। সালাম-টালাম দেওয়ার কী দরকার। বেশি দরকার হলে বলবা 'স্লামালিকুম'। অন্তত ইসলামিক তো হলো না!... আজ আমি এত স্মার্ট হয়েছি যে, আমার Owner, আমার Sustainer (টিকিয়ে রেখেছেন যিনি) 'আমার আল্লাহ'র নাম উচ্চারণ করতে আমার লজ্জা হয়। আমার সেক্যুলার পবিত্রতা (!) নাপাক হয়। 'জাহান্নামের স্বাদ নাও, তুমি তো দুনিয়ায় সম্মানিত ছিলে।' এত সম্মানিত ছিলে, এত জনপ্রিয় ছিলে, আমার নাম নিতেও তোমার মান যেত।

১.৩.৪ কেউ যখন আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে 'ভাই, কুরআনে নিষেধ আছে', 'ভাই, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো নিষেধ করেছেন।' আমরা কী বলেছি? আমরা বলেছি- 'সবকিছুতে ধর্ম টেনে আনবেন না।' মানে কী? মানে সবখানে আল্লাহ-নবির কথা শোনাবেন না। সবখানে আল্লাহ-নবির জায়গা নেই। সবখানে জায়গা নেই, নাকি আমার কাছে জায়গা নেই? আমি শুনতে চাই না, এ ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন। কী প্রমাণ করতে চাই আমি এ কথা বলে? জিজ্ঞেস করি আজ নিজেকে, আমার জীবনের কোন জায়গায় আমি আল্লাহকে তাঁর স্থানটা দিয়েছি। মুখে আল্লাহকে মানার দাবি সবাই করে, প্রতিটি আস্তিক আল্লাহকে মানার দাবি করে। একজন মুসলিম (আত্মসমর্পিত) আর একজন আস্তিকের মধ্যে পার্থক্য কী? কী কী কাজ করলে, কোন কোন কথা বললে, অন্তরের রোখ কোনদিকে হলে আমার নাম আরবি থাকে, সরকারের আদমশুমারিতে আমি মুসলিম থাকি। কিন্তু আল্লাহর খাতায় আমি আর মুসলিম থাকি না। কীসে আমাকে নিশ্চিন্ত করল? কোন সে জ্ঞান যা আমাকে জান্নাতের ব্যাপারে এতটা টেনশন-ফ্রি করে রেখেছে। আল্লাহর কথা শুনতে চাই না, আল্লাহর নাম নিতে চাই না, পাত্তা দিতে চাই না। মুসলিম পরিবারে জন্ম দিয়ে আল্লাহ ঠেকায় পড়ে গেছেন আমাকে জান্নাত দেবার। নাকি?

১.৩.৫ যারা কুরআনের কথা, আল্লাহর কথা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে পৌঁছানোর কাজটা করত, আমাদের মাঝে নবির দায়িত্ব পালন করত, তাদেরকে 'মোল্লা, মৌলভি, হুজুর' লকব দিয়ে তাচ্ছিল্য করেছি, অচ্ছুৎ অবমানব হিসেবে মার্জিনালাইজ করেছি। যেন তাদের কথাকে পাত্তা দিতে না হয়। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায়। বলেন, আমার জীবনে এমন কে আছে যে আমাকে আল্লাহর কথা পৌঁছাবে? জরুরি মনে করিনি, তোয়াক্কা করিনি। এমন কার সাথে আমি সম্পর্ক রেখেছি যে আমাকে আল্লাহর কথা শোনাবে? 'সেই উত্তম সঙ্গী যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে।' আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান হাসিলকে আপনার ওপর ফরজ করেছেন। আলিমদের জন্য আপনার কাছে গিয়ে আপনাকে শেখানো ফরজ নয়। ফিকহে আছে, শরিয়তের যেসব বিধান সচেতন মুসলিম সমাজের কাছে প্রসিদ্ধ কিংবা যেখানে সহনীয় দূরত্বের মধ্যে মাসআলা জিজ্ঞেস করার মতো একজন আলিম আছেন, সেখানে 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। ওই বাসিন্দাদের 'না জানার অজুহাত' বাতিল হয়ে যায়। আমার বাসার পাশে মসজিদ আছে, পাশের মহল্লার মাদরাসা আছে, আলিমদের সাথে উঠবসকারী বন্ধু আছে, আমার হাতে ফেসবুক-ইউটিউব-পিডিএফ (অনিরাপদ উৎস, তারপরও উৎস তো)। এরপরও আমার 'না জানার অজুহাত' আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়া আল্লাহ, আমি তো জানতাম না। এরপরও দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার অর্থ—আমার ইচ্ছা হয়নি। স্বেচ্ছায় আমি আল্লাহর করা ফরজকে অবজ্ঞা করেছি। এত ব্যস্ত আমি, এত আমার ডিমান্ড, দুনিয়াতে এত জরুরি আমি? আমার নিজের পিঠ বাঁচানোরই সময় আমার নেই।

যে পরিমাণ স্পর্ধা, ঔদ্ধত্য আর দর্প আমি আমার রব (Owner + Sustainer + Guardian + Master)-এর সাথে এই একজীবনে দেখালাম, তাতে কাফির কেন, আমিই তো তাঁর গযব বা ক্রোধের বেশি উপযুক্ত। কাফির তো চিনে নাই; আমি তাঁকে চিনে তাঁকে জেনেই যা দেখাইলাম। দোষ আল্লাহকে দিতে পারবেন, বলেন? আসেন তওবা করি। জবান না, অন্তর ব্যবহার করে বলি :

لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায য-লিমীন)

আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ (দাসত্ব বা উপাসনা পাবার উপযুক্ত) আর কেউ নেই। আপনিই পবিত্র, আমিই জালিম। আমার ওপর যে সমস্যা এসেছে, আপনার কোনো দোষ নেই, আপনি পবিত্র। আমিই দোষী। আমিই আপনার ক্রোধকে সেধে পড়ে ডেকে এনেছি। নিজের কর্মদোষে অটোমেটিক আপনার ক্রোধে পড়ে গেছি। আমাদেরকে মাফ করুন। আপনি ছাড়া আমরা আর কাউকে চিনি না যে মাফ করার এখতিয়ার রাখে। হেঁচকি তুলে সিজদায় কাঁদুন: আল্লাহ, আবার নতুন করে ঈমান আনলাম আপনার ওপর, যেমন করে ঈমান আনার কথা ছিল। অতএব আপনি আমাদের মাফ করেন। কারণ, 'আপনি তো আল্লাহ।' লিআন্নাকাল্লাহ (لِأَنَّكَ الله)।

১.৪ পারিবারিক সেক্যুলারিতা

তখন শীতের শেষ। ফজরের জামাআত একটা সময় ৫:৫০ বা ৬:০০ টার দিকে থাকে না? ওই সময়টায়। আহলে হাদিস মসজিদে প্রায় মিনিট তিরিশেক আগে জামাআত হতো। আমার বাসা থেকে হানাফি আর আহলে হাদিস মসজিদের দূরত্ব সমানই। খুব সম্ভব লেখালেখির জন্যই হবে, আমি আহলে হাদিস মসজিদে যেতাম আগে আগে সালাত পড়ে এসে কাজ শুরু করার জন্য। আমার বাসার সামনেই একটা দোকানঘর ভাড়া করে একজন স্যার বেশ কটা ছেলেমেয়ে পড়াতেন ঠিক ওই টাইমটায়, বাচ্চাগুলো সেভেন-এইটের হবে। আমি যেতাম আর দেখতাম, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাবা-মায়েরা বাচ্চাদেরকে দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটা ফজরের প্রারম্ভিক সময় এবং খুব বেশি সম্ভাবনা যে, এই বাচ্চারা কেউই ফজর পড়েনি। বাবা-মায়েরা ফিরে গিয়ে পড়বেন, কিন্তু এই ১৩-১৫ বছরের বাচ্চারা আর পড়বে না। অনেকগুলো ভালো ধারণা করা যায়, কিন্তু বর্তমান সেক্যুলার ক্যারিয়ারিস্ট ফ্যামিলি কালচারের কারণে সে সুধারণা আমি করতে পারলাম না। স্যরি।

কাকডাকা ভোরে আমরা আমাদের সন্তানদের কোচিং ব্যাচের জন্য ঘুম থেকে তুলে দিই, কিন্তু আল্লাহর ফরজ হুকুম সালাত তার জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা কোচিং। সালাতে উঠলে বাচ্চার শরীর খারাপ করবে, কোচিংয়ে উঠলে কিন্তু করবে না। রামাদান মাসে পড়াশোনার অজুহাতে পরীক্ষার অজুহাতে... সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা 'আল্লাহর ফরজ বিধান' সিয়ামকে ‘আমি’... কত বড় কলিজা আমার? ‘আমি’ ফরজ সিয়ামকে আমার সন্তানের জন্য নিষ্প্রয়োজন ঘোষণা করেছি। সন্তানকে নাচ শেখাচ্ছি, গান শেখাচ্ছি। আমি কালচারাল মাইন্ডেড। কুরআন শেখানো? ওসব বড় হলে ‘যদি প্রয়োজন মনে করে’ শিখে নেবেনে, মানে ‘আমি প্রয়োজন মনে করি না’। সিয়াম রাখলে শরীর খারাপ করবে, ফজরে উঠলে শরীর খারাপ করবে। পড়ালেখা করে, এ-প্লাস পেতে হবে। সিয়াম-সালাত করলে পিছিয়ে পড়বে। আমার আর আমার সন্তানের মাঝে আল্লাহ কোথায়? এই আল্লাহ চাইলে আমার এই সন্তান দ্বারাই আমার চোখের ঘুম কেড়ে নিতে পারেন, এই আহ্লাদের সন্তানের কারণে আমাকে সমাজে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারেন। সেই মহাশক্তিশালী আল্লাহর হুকুম ‘আমি’ স্থগিত করে দিচ্ছি। কে আমি? আমার কি একটুও ভয় লাগছে না, পরিবার থেকে আল্লাহকে বের করে দিতে? যিনি আমাকে পরিবার দিলেন তাঁকেই বের করে দিলাম। আমি এগুলো লেখার সময় কিছুটা কাঁপছি।

একবারও ভাবি না, যিনি দিলেন, তিনি কেড়ে নিতে কতক্ষণ; যিনি চোখের মণি করেছেন, তিনি তো চোখের বালিও বানিয়ে দিতে পারেন। পরিবারেও আমরা সেক্যুলারিতা প্রতিষ্ঠা করেছি। সন্তানকে ভোগবাদ শেখাই (লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে), ক্যারিয়ারিজম শেখাই (‘এইম ইন লাইফ’ রচনায়), শুধু দ্বীন শেখাতে লজ্জা পাই। দ্বীন শেখানোকে অপচয় মনে করি। এক বাবাকে বললাম:

ছেলের তো এসএসসি শেষ, তাবলীগ জামাতে ৩ দিনের জন্য দ্যান; কিছু শিখুক। কমপক্ষে এটুকু শিখুক যে—আল্লাহ কে, রাসুল কে, বাপ-মা কী? শুনলাম: এই ছুটির সময়টা খুব দামি, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেয়া চাই। ইংলিশ স্পিকিং কোর্সে ভর্তি করিয়ে রেখেছি, এখন সময় নষ্ট করা যাবে না। সময় নষ্ট? সময় কার দেওয়া? আমার বাবার? ছেলে আইলেটস-এ ৮+ স্কোর করবে, বিদেশি ভার্সিটিতে পড়বে। বিদেশে সেটেল হবে। আর বাপকে বৃদ্ধাশ্রমের খরচ পাঠাবে, কিংবা একেলা ফ্ল্যাটে লাশ পড়ে থাকবে ৬ মাস। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মাকে ফেলে আসবে স্টেশনে। কিংবা ছুরি গলায় ধরে বাপকে বলবে : 'কোনো মসজিদে-টসজিদে জমি দেওয়া চলবে না, চুপচাপ কবরে যাবেন।' এগুলো সবই হয়েছে, হচ্ছে। সব হবে, বাপ-মায়ের দাম চেনা হবে না। যে ছেলে নিজের স্রষ্টাকে চেনে না, তার কাছে আপনার কী মূল্য? তার কাছে মূল্য শুধু টাকা আর পণ্যের, যার সাথে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ছোটবেলায়।

ভালো স্কুলের নামে কাফিরদের ব্রেইন-ওয়াশিং (পড়ুন মিশনারি) স্কুলে কাফিরের হাতে তুলে দিচ্ছি সন্তানের আনকোরা মগজ। স্রেফ দুনিয়ার জন্য। আক্কেল-দানাই ব্যাংকের ভল্টে নাকি? লাজ-শরম-আকল কিছুই আর নিজের কাছে নেই জনাব? আধুনিক হবার জন্য বাপ হয়ে সোমত্ত মেয়েকে এমন পোশাক কিনে দিই, যেটা পরে আরেক মেয়ে হেঁটে গেলে নিজেই জুলজুল করে চেয়ে থাকি। নিজে মা হয়ে, যুবতী মেয়েকে তাই পরাই, যা নিজে পরার কথা চিন্তাও করতাম না। আমরা তো এমন ছিলাম না ভাই? আজ কীসে আমাদের এমন করল? কে আমাদের এমন প্রতিবন্ধী, চিন্তাশক্তিহীন, 'ভেড়ার তোড়ে ভাসমান' করে দিলো?

আপনার আর আপনার সন্তানের মাঝে 'আল্লাহ' নামের একজন ছিলেন। তাঁকে চেনানো আপনার দায়িত্ব ছিল। তাঁর দিকে আমার সন্তানকে আকর্ষিত করার দায়িত্ব আমারই ছিল। আমার সন্তান আজ 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শুনলে বলে, এটা তো ফকিরদের গান। 'ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ' পারে, পুরো 'অপরাধী' গানটা পারে; নাজাতের কালিমাটা পারে না। বলিউড হিরোদের চেনে, ৪ খলিফাকে চেনে না, নবিকে চেনে না। শাইখ উমায়ের কোব্বাদি বলেছিলেন, আমরা ভাবি, আমার মৃত্যুর পর আমার সন্তানের কী হবে। কেউ ভাবি না, আমার সন্তানের মৃত্যুর পর তার কী হবে? ১০ বছর বয়সে সালাত না পড়লে সন্তানকে প্রহারের হাদিস শুনলে আমার নাক সিটকে আসে? আহ মুসলিম, আপনার এই সন্তান যখন জাহান্নামি হবে, আল্লাহকে ফরিয়াদ করবে : মালিক, আমার বাপ-মা আমাকে ফার্স্ট হতে পারিনি বলে মেরেছে, স্কুল পালিয়েছি বলে মেরেছে, এ-প্লাস পাইনি বলে বকেছে। তোমার হুকুম সালাতের জন্য আমাকে বকেনি, তোমার হুকুম ভেঙেছি বলে কখনো মারেনি। আজ এই বাপ-মাকে দোযখে দ্বিগুণ শাস্তি দাও।

আমার ঘর সয়লাব মূর্তি আর প্রাণীর ছবিতে। প্রগতির নামে, সংস্কৃতির নামে, সজ্জার নামে মুসলিমের ড্রয়িং-রুম জন্তু-জানোয়ার, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল, মৃত বাপ-মায়ের শোপিসে ছবিতে ভর্তি। ছবি-মূর্তিতে রহমতের ফেরেশতা ঢোকে না। আযাবের ফেরেশতাদের কিন্তু এসবের তোয়াক্কা নেই। আরো আছে। সেকেন্ডে ৩৬টা স্টিল পিকচার বা ৩৬ ফ্রেম গেলে নাকি তাকে বলে মুভি বা ভিডিও। ঘরে সে জিনিসও আছে। থাক, বললে দ্বীনদাররাও তেড়ে আসবেন। চেপে গেলাম। নিজেকে উদারমনা, প্রগতিমনা, ধর্মের খুটোছেঁড়া প্রমাণের কত চেষ্টা আমাদের। ভেবেছেন একবার, আধুনিক হবার নামে 'পশ্চিমা' হবার, সংস্কৃতিমনা হবার নামে 'হিন্দু' হবার এই হিড়িক আমাদের দুনিয়াতেই কোথায় নিয়ে ফেলবে? সেক্যুলার-মনা হবার নামে আল্লাহকে ত্যাগ করার এই স্পর্ধা আখিরাতে আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে? আফটার-অল যদি আখিরাতে বিশ্বাস করেই থাকি।

১.৫ বোনদের সেক্যুলারিতা

এটা আসলে ভিন্ন কোনো স্পর্ধা নয়, এতক্ষণ যেগুলো আলোচনা করলাম, তারই অনিবার্য প্রতিফলন। হওয়ারই ছিল। টেস্টোস্টেরোন হরমোন-জাত বৈশিষ্ট্য হলো 'প্রভাব-প্রতিপত্তি' বা ডমিনেন্স। পুরুষ সৃষ্টিগতভাবে 'আমির ম্যাটেরিয়াল'। আর নারী 'মামুর' ম্যাটেরিয়াল, আনুগত্য ও সহজে প্রভাবিত হবার বৈশিষ্ট্য নারীর মাঝে প্রবল। আমরা পুরুষেরা নষ্ট হয়েছি, স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে আমাদের নারীরা নষ্ট হয়েছে। একে আমি আলাদাভাবে 'নারীদের স্পর্ধা' হিসেবে দেখতে রাজি নই।

আমরা মুসলিম পুরুষেরা একেকজন পাক্কা দাইয়ুস হয়েছি, আত্মমর্যাদা ইউরোপের হাটে তুলে গায়রতহীন লো-টেস্টোস্টেরোন কাপুরুষ হয়েছি। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: দাইয়ুস কোনোদিনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যায় সর্বনিম্ন ৪০ বছর সর্বোচ্চ ৫০০ বছরের দূরত্ব থেকে। কে দাইয়ুস? দাইয়ুস হলো ওই পুরুষ, যার ঘরের নারীরা খুল্লামখোলা বেপর্দা ঘোরে, আর সে তা স্বাভাবিকভাবে নেয়। মেয়েকে হাত ধরে নাচের ক্লাসে নেয়। হাজারো মানুষের চোখের সামনে সোমত্ত মেয়েটা বাঁকা দেহে নাচে, আর গর্বে বাবার বুক ভরে ওঠে। মেয়েকে এমন পোশাক বাবা কিনে দেয়, সেই একই পোশাক পরে অন্য মেয়ে হেঁটে গেলে সেই বাবাই চোখ দিয়ে লালা ঝরায়। স্ত্রী পরপুরুষের সাথে খিলখিলিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে, স্বামীও সেটা উপভোগ করে। বন্ধুরা বৌয়ের পাশ ঘেঁষে ছবি তোলে, স্বামীই তুলে দেয়। বন্ধুরা বলে, 'ভাবী যা সুন্দরী, দোস্ত তুই তো জিতছিস', শুনে স্বামী ভাবে সে কতই না ভাগ্যবান! রাস্তার লোকে আমার বৌকে দেখে হাঁ করে চেয়ে থাকে, স্ক্যান করে আপাদমস্তক, মনে মনে মনকলা খায়; আমি দেখি, দেখে আমার খুব সুখ হয়। আমি পেয়েছি, তোমরা পাওনি, পাবে না। উঁহু... হবে না ভাই, ৫০০ বছর দূর থেকেই বিদায়, টা টা। লক্ষ লক্ষ দাইয়ুসের ঘরের লক্ষ লক্ষ নারী ব্যতিক্রম হবে কীভাবে? আমাদের আইকন যেমন আত্মপরিচয়হীন কামাল পাশা। আমাদের মেয়েদের আইকন তেমনি বেগম রোকেয়া-রা।

ইউরোপ যেমন ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখে, আমাদের মেয়েরাও ধর্মকে শত্রু হিসেবে দেখতে শিখেছে। ইসলাম সম্পর্কে, ইসলাম যে জীবন তাদের দিয়েছে তা সম্পর্কে আমাদের মেয়েদের জানাশোনা ভয়ংকর রকম কম। ভার্সিটিতে যান, সেখানে ১০০ জন মেয়ের সাথে যদি আপনি ১০ মিনিট করে কথা বলেন ইসলামে নারীর অবস্থানের ব্যাপারে, ৯৫ জনের মাঝে কোনো-না-কোনো পয়েন্টে বিভিন্ন মাত্রার ইরতিদাদ (ইসলাম ত্যাগ) দেখতে পাবেন। দেখবেন কোনো একটা টপিকে হয় কুরআনের কোনো আয়াতকে, না হয় স্পষ্ট কোনো হাদিসকে সে হয় অস্বীকার করছে, না হয় এ যুগে অচল বলে মন্তব্য করছে। ইসলামকে পুরুষতান্ত্রিক ও সেকেলে, আর পশ্চিমা সভ্যতাকে আধুনিক ও নারীবান্ধব বলে মনে করছে। খুব স্বাভাবিক। সে ঘরে তার মায়ের নিগৃহীত জীবন আর টিভিতে পশ্চিমের বাঁধনহারা জীবন দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছে। তুলনা করেছে। দুটোর জন্য দায়ী তো আমরা পুরুষরাই। মোদ্দা কথা হলো আমরা পারিনি এবং করিনি। ইসলাম যে মর্যাদার, প্রশান্তির, আরামের আর সার্থকতার জীবন নারীকে দিয়েছিল, আমাদের 'হিন্দুয়ানি মুসলিম' সমাজ তা আমাদের নারীদের দিতে পারেনি, মানে দেয়নি আর কি। পশ্চিমা সমাজ কিন্তু নারীবাদের ঝলমলে সোনালি খাঁচা ঠিকই তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। আমরা আমাদের নিজ ঘরের মেয়েদের কাছে ইসলামের মুক্তির ডাক পৌঁছাতে পারিনি।

হে মুসলিম নারী,

» কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা মুসলিম পুরুষেরা বছরের পর বছর আপনাদের ওপর জুলুম করেছি।

» কৃষিপ্রধান বাঙালি মুসলিম কন্যাসন্তানকে খাটো নজরে দেখেছে।

» হিন্দুদের দেখাদেখি আমাদের বিধবাদের শাদা শাড়ি পরিয়ে রেখে দিয়েছি।

» হিন্দুদের পণপ্রথাকে যৌতুক হিসেবে আত্মীকরণ করে ঘরের বউয়ের ওপর নির্যাতন করেছি, মোহরানা তো দূর কি বাত।

» আমরা মসজিদ বানানোর সময় আমাদের নারীদের কথা ভুলেই গেছি যে, সফরে তাদের ওপরও সালাত ফরজই থাকে।

» একাধিক বিয়ে করার পর আগের স্ত্রীর সাথে ইনসাফ করিনি।

» স্ত্রীর সাথে আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম-এটিকেটের বালাই রাখিনি।

» কখনো কখনো তো শারীরিক অত্যাচারকেও ছাপিয়ে গেছে মানসিক অত্যাচার।

কিন্তু তার মানে কি এই যে, আল্লাহর দেয়া সমাধান আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়? তার মানে কি এই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও আপনাদের বঞ্চিত করেছেন? তার মানে কি এই যে, কাফির নারীদের মতো স্বাধীনতাই আপনাদের চাই?

হে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া মেয়ে, 'নিশির ডাক' চেনেন? মাঝরাতে ৩ বার নাকি আপনার নাম ধরে কেউ ডাকবে। সেই ডাক শুনে যে ঘর থেকে বের হবে, সে মারা পড়বে। (কাল্পনিক গল্প) ঠিক এই 'সমতার নিশির ডাকে' দলে দলে আমাদের মেয়েরা বেরিয়ে পড়েছে। আমাদের মেয়েরা ইউরোপের সমতার সুরে মাতাল হয়ে ইঁদুরদৌড়ে মেতেছে বাঁশিওয়ালাদের পিছু পিছু। অস্বীকার করেছে বায়োলজির স্রষ্টা, সাইকোলজির স্রষ্টার বেঁটে দেওয়া ওয়াজিব কর্মবণ্টন। যা তাদের নাজুক শারীরতত্ত্বের সাথে যায় না, যা তাদের মাতৃত্ব-আবেগতাড়িত মানসিক প্রোসেসিংয়ের সাথে যায় না, সেই সব পুরুষালি বোঝা তারা তুলে নিয়েছে কাঁধে। ফলে বিদ্রোহ করেছে শরীর, বিদ্রোহ করেছে মন। ইউরোপের ব্যাবসায়িক স্বার্থে নারীরা তিলে তিলে ক্ষয় করে দিয়েছে নিজের দেহ-মন-সন্তান-পরিবার। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যে ঘরোয়া দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়েছিল, তাকে তারা নিকৃষ্ট-অপমানজনক-ছোটকাজ মনে করেছে। নারীর দেহ-মনের সাথে মিলিয়ে যেসব দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেই তারা 'আসল কাজ', 'পুরুষের মতো হয়ে নিজেকে প্রমাণ করা', 'পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা', 'পুরুষের মতো করে মর্যাদা' - সেগুলোর পেছনেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। এর পেছনে কি পুরুষের দায় নেই? আমরাই কি বছরের পর বছর ঘরের কাজে দিনরাত খাটতে থাকা নারীদের তাচ্ছিল্য করিনি? 'ঘরেই তো থাকো সারাদিন', 'কিছুই তো করো না', 'আমার স্ত্রী কিছু করে না, হাউজওয়াইফ।' ঘরের কাজ কোনো কাজই না, এই মাইন্ডসেটের জন্য দায়ী তো আমরাই, নাকি? ইউরোপের খ্রিষ্টান পুরুষ যা করেছে, আমরা আমাদের মেয়েদের সাথে ঠিক তাই করেছি। তাদের নারীরাও ধর্মকে ঝেড়ে ফেলেছে, আমাদের নারীরাও একই রাস্তায় বাঁচার উপায় খুঁজছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো এমন দিন আসেনি, আমাদের মেয়েরা আমাদেরকেই শত্রু ভেবেছে। পরিবারকে, পরিবার গঠনকে নিজের পিছুটান মনে করছে। নিজের সম্মানিত পিতা, খেলার সাথি বড়ভাই, প্রাণের স্বামী, কলিজার ছেলেকে মেয়েরা শত্রু ভাবছে : এরা তাকে আটকে রেখেছে, তাকে মুক্ত-স্বাধীন হতে দিচ্ছে না, তার 'নারী হয়ে ওঠা'র পেছনে জীবনকে নিজের মতো উপভোগ করার পেছনে এরাই বাধা। বাঁধ ভেঙে দাও... ন ডরাই...। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দিন কখনো আসেনি যে মেয়েরা গর্ভধারণকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। আহা, যে গর্ভধারণকে নারী নিজ নারীজন্মের পূর্ণতা ভাবত, তাকে ফেলে দেবার অধিকার চাইছে। পশ্চিমে গবেষণা হচ্ছে Risk of Pregnancy নিয়ে, যেন এটা একটা রোগ। সারা দুনিয়ার জনসংখ্যার হার কমে যাচ্ছে নারীবাদের কারণে, ইউরোপ-আমেরিকায় আরো বেশি কমে যাচ্ছে। পুরস্কার ঘোষণা করেও বিয়ে করানো যাচ্ছে না। কে টানে ওসব ঝক্কি। এর চেয়ে একা আছি, বেশ আছি। দরকার হলে হুক-আপ করি, প্রোটেকশান নিই, গর্ভপাত করি, সেক্সটয় আছে, ভালো চাকরি করি। কী দরকার বিয়েশাদি, বাচ্চাকাচ্চার।

মুক্ত হতে গিয়ে, স্বাধীন হতে গিয়ে, সাবলম্বী হতে গিয়ে সে প্রধান শত্রু হিসেবে চিনে নিয়েছে নিজের পরিবারকে ও ধর্মকে। পর্দার ফরজ বিধানকে ছুড়ে ফেলেছে। গরম লাগে, দমবন্ধ লাগে, বুড়ি-বুড়ি লাগে। এই মেয়ে, তুমি জানো তুমি কী বলছ? ধর্মকে সেকেলে, নারীবিদ্বেষী, পুরুষের জুলুমের হাতিয়ার মনে করছে। গত ১৪০০ বছরের আলিমসমাজকে, সাহাবিদেরকে, এমনকি খোদ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পুরুষতান্ত্রিক sexist বলতে ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই নারীবাদের প্যারাডাইমে ইসলামকে কুলিয়ে উঠতে পারেনি, ছেড়ে দিয়েছে ঈমানকেই। নারীবাদের শেষ গিয়ে ঠেকে কুফরে (কুরআনের একটা আয়াত বা একটা মুতাওয়াতির হাদিস অস্বীকার কুফর)। পশ্চিমের সুরে সুর মিলিয়ে আমাদের মেয়েরা নিজ পরিবার ও ধর্মকে কথায় কথায় sexist, পুরুষতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী, কুসংস্কার বলে গালি দিচ্ছে।

হাজারো মানুষের হাজারো মনমানস থেকে সুরক্ষার সকল স্তর নারী ত্যাগ করেছে। ইসলাম যে কয়েক স্তর বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নারীর জন্য দিয়েছিল, সেগুলোকে উঠিয়ে দিয়ে নারীকে ভিকটিম হিসেবে শিকারযোগ্য করে তুলেছে নারী নিজেই। পশ্চিমা সভ্যতার বড়ি গিলে তুলে নিয়েছে সব বাঁধ। সহশিক্ষা, সহকর্ম, বিয়েপূর্ব প্রেম, পরকীয়া। যে নারীকে পাওয়া ছিল কঠিন, নারীকে পেতে হলে পুরো সমাজকে সাক্ষী রেখে, উপযুক্ত সম্মানী পরিশোধ করে, স্বামী হিসেবে তার আজীবন সকল প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব নিয়ে এরপর তাকে একান্তে পেতে হতো। এখন সে নারীকে সহজেই পাওয়া যায় চোখের আড়ালে, কোনো প্রমাণ থাকে না, নিয়ে যাওয়া যায় পার্কের চিপায়, লাইব্রেরিতে স্টাডির অসিলায়, খালি ফ্ল্যাটে, হোটেলে, অফিসে কিংবা মিডিয়ায় সুযোগ দেবার লোভ দেখিয়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভোগ, গর্ভপাত, ড্রেনে পড়ে থাকা নবজাতক, ভিডিও তুলে ছেড়ে দেওয়া।

বেশ ইন্টেলেকচুয়াল এক এক্স-মুসলিম নাস্তিক নারীবাদী তার ফেসবুক প্রোফাইলে নিয়মিত তার গ্রুপসেক্স ও সেক্সটয়ের ছবি আপলোড করে। আরেক এক্স-মুসলিম নারীবাদীকে জিগ্যেস করা হয়ে ছিল: নাস্তিক ফেমিনিস্ট হয়ে আপনার অর্জন কী? তার উত্তর: আমি এখন নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারি। দেশী নারীবাদীদের প্রায়ই দেখা যায় পিরিয়ডের রক্তমাখা প্যাডের ছবি বা অন্তর্বাসের ছবি আপলোড দিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে। আহ কী অর্জন! আল্লাহ-রাসূল-সালাফদের অস্বীকার করে কতটুকু স্বাধীন হইবা বোন? এতটুকু হলে চলবে?

২য় স্পর্ধা : পুঁজিবাদ

আমাদের স্পর্ধা উদাসীনতার স্পর্ধা। আমি উদাসীন, আই ডোন্ট কেয়ার। এটাই প্রবল পরাক্রমশালী অধিকর্তা আল্লাহর তেজ, প্রাবল্য, বিক্রমের সাথে স্পর্ধা। তিনি বলছেন একটা কথা আমাকে আর আমি উদাসীন। ‘আল্লাহকে বের করে দেওয়া’ কথাটা খুব খারাপ শোনাচ্ছে, না? জি, এতটা দম্ভ আর অহংকারই আমরা দেখিয়েছি আমাদের রবের সাথে, আমাদের পালনকর্তা দয়াময় আল্লাহর সাথে। এবার চলে যাচ্ছি আমাদের দ্বিতীয় সামষ্টিক স্পর্ধায়।

পুঁজিবাদ একটা জীবনব্যবস্থা (দ্বীন)। ইসলাম যেমন জীবনের প্রতিক্ষেত্রে নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ইসলাম ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-বাজার-আদালত-রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, সুস্পষ্ট নীতিমালা দেয়। তেমনি পুঁজিবাদকে যদিও আমরা ‘অর্থব্যবস্থা’ হিসেবে পড়ি, কিন্তু ফাংশনালি এটা একটা দ্বীন। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সবকিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করে, নীতিমালা গড়ে দেয়। আজ আমরা নীতিমালা হিসেবে সর্বক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছি, মানে আমাদের দ্বীন পুঁজিবাদ। اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللّٰهِ الْاِسْلَامُ - ইন্নাদ্দীনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীনকে (ইসলাম) ছেড়ে দিয়েছি আমরা। এটা আমাদের দ্বিতীয় স্পর্ধা।

লিবারেলিজম
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ভোগবাদ ব্যক্তি জীবন
পরিবার
নৈতিকতা
মানুষের সংজ্ঞা মানুষ হল * • স্বার্থপর এবং বদ • Radical evil • একক সত্তা • প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ক্যারিয়ারিজম সমাজ
গণতন্ত্র
রাষ্ট্র
অর্থনীতি পুঁজিবাদ
ধর্মনিরপেক্ষতা

২.১ একটি ইতিহাস দেখে নিই। শিল্পবিপ্লবের আগে সারা দুনিয়া চলত কুটিরশিল্পে বা ক্ষুদ্রশিল্পে। যখন ইঞ্জিন আবিষ্কার হলো, তৈরি হলো বৃহৎ শিল্প। একব্যক্তির পক্ষে বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা কঠিন হতো, কারণ একজনের হাতে এত পুঁজি বা মূলধন থাকে না। ডেভলপ হলো ব্যাংক-ব্যবস্থা, যেখানে সমাজের সবাই টাকা রাখত। সমাজের সকলের পুঁজি একত্রিত হয়ে চলে যেত ওই পুঁজিপতির হাতে ঋণ হিসেবে, যাতে সে বড় কারখানা বানাতে পারে। কারখানা থেকে এদের প্রচুর লাভ করতে হবে। ব্যাংকের সুদ, শ্রমিকের মজুরি দিয়েথয়ে তাকে আরো লাভ করতে হবে যাতে সে আরো মেশিন কিনতে পারে, ব্যবসা আরো বড় করতে পারে। এই ক্রমাগত পুঁজি বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে পুঁজিবাদ (Capital-ism) শব্দের উদ্ভব। কিন্তু বর্তমানে পুজিবাদ কেবল ব্যাবসায়িক প্রবণতায় সীমাবদ্ধ নয়। পুজি বৃদ্ধির প্রবণতা আজ প্রতিটি মানুষের শিরায় শিরায় প্রবহমান। যেকোনো মূল্যে 'পুজির আমদানি' আজ আমাদের আরাধ্য দেবতা। Money is the second God.

ইসলাম ও পুঁজিবাদের পার্থক্যটা বুঝতে হবে আমাদের। বিশ্বের একক হচ্ছে মানুষ। মানুষের সংজ্ঞা কেমন, তার ওপর নির্ভর করবে পুরো সিস্টেমটা কেমন। ইসলামের মতে মানুষ একটি আধ্যাত্মিক (spiritual) জীব। মানুষের উন্নতি মানে তার আধ্যাত্মিক উন্নতি। একজন মানুষ যত আধ্যাত্মিক ভাবে উন্নত হতে থাকবে তত সে তার অস্তিত্বের পূর্ণতায় পৌঁছাবে। তার অস্তিত্বই 'আবদ' হিসেবে (দাস বান্দা)। আমি জীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের (দাসত্বের) জন্য। অর্থাৎ একজন 'আবদ' বা দাস হিসেবে আপনি যত পারফেকশনের দিকে যাবেন, তত আপনি আপনার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেন, মানবজনম তত সার্থক হতে থাকবে। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু 'ইবাদতের জন্য' অংশটুকুর অর্থ করেছেন 'লিয়া'রিফুন' (চেনার জন্য)। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁকে চেনার জন্য। যত চেনা হবে, তত আমার আবদিয়্যাত (দাসত্ব) পরিপূর্ণ হবে, আধ্যাত্মিকভাবে আমার উন্নতি হবে। মানুষের এই সংজ্ঞাটুকুর ওপর ইসলামের পুরো সিস্টেমটা দাঁড়ানো।

মানুষের সাথে আল্লাহর এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক 'ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র'-র ইসলামি সংজ্ঞা দেয়। আমার প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে আল্লাহ আছেন। রাষ্ট্র-প্রজা, বিচারক-বাদী, ক্রেতা-বিক্রেতা, সেবাদাতা-গ্রহীতা, উৎপাদক-ভোক্তা, চুক্তির দুইপক্ষ, পাড়াপড়শি, কাফির-মুসলিম, আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, ভাই-বোন, এমনকি বাথরুমে একেলা বাসায় একাকী আমি। প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে আল্লাহ রয়েছেন, এই বোধের জন্ম দেয় আবদিয়ত দাসত্বানুভূতি। ফলে প্রতিটি সম্পর্কের মাঝে এক আশ্চর্য জবাবদিহিতা-সংযম-পরোপকার এবং ওহিভিত্তিক নীতিমালা মেনে চলার প্রবণতা ব্যক্তিকে জীবনের প্রতি কদমে 'ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাড়না' যোগায়। কারণ তাকে তো আবদিয়্যাতের পূর্ণতা দ্বারা আধ্যাত্মিক উন্নতি করে রবকে খুশি করতে হবে। এটা একটা সফটওয়্যার যা 'বাথরুম থেকে রাষ্ট্র' সবখানে তাকে জুলুম করতে বাধা দেবে, ইনসাফ ও কল্যাণ সাধনে তাড়িয়ে বেড়াবে।

২.২

পুঁজিবাদের চোখে মানুষ কেবল একজন ‘ভোক্তা’। তার ভোগের চাহিদা সীমাহীন। অর্থনীতির সংজ্ঞা কী পড়েছিলাম, মনে আছে? অসীম চাহিদা ও সীমিত সম্পদের মাঝে ব্যালেন্স। পুঁজিবাদ প্রোডাক্ট বানাবে আর বিক্রি করে মুনাফা কামাবে, তার পুঁজি বাড়বে। তার চোখে মানুষ একজন ভোক্তা (consumer/customer), আপনি যত ভোগ করতে আগ্রহী হবেন, তার প্রোডাক্ট তত বিক্রি হবে। অতএব সে বলবে : মানবজনমের সার্থকতা হলো ভোগে। কয়দিনই বাঁচবা, ভোগ করে নাও, 'YOLO= you only live once', 'জী ভারকে জীও, কাল হো না হো'-মিডিয়া, বিনোদনের নামে এগুলো শেখানো পুঁজিবাদের কাজ। এটা করতে গিয়ে তো ধর্ম আধ্যাত্মিকতাকে বাতিল করতে হবে। সেজন্য লাগবে নাস্তিকতা-বিবর্তন-নারীবাদ-মানবতাবাদ। তাকে টিকে থাকতে হলে মানুষকে পরিপূর্ণ ভোক্তা বানাতে হবে, সংযমের সব বেড়া উঠিয়ে দিতে হবে।

পুঁজিবাদ আপনার মধ্যে ভোক্তা হবার অনুপ্রেরণা দেয়, আপনার ভোক্তা হওয়াকে যারা বাধা দেয় (ধর্ম), তাদেরকে ভিলেন বানিয়ে ছাড়ে। তার চোখে আপনি যত বড় ভোক্তা, আপনার তত উন্নতি হয়েছে। গাড়ি-বাড়ি-ফোন-পোশাক-গগলস-খাবার। যত দামি যত ফ্যাশনেবল, যত বেশি, জীবনে আপনি তত সার্থক। সমস্ত হাতিয়ার (মিডিয়া, অ্যাডুকেশন) ইউজ করে এমনভাবে আপনার মাথায় পুঁজিবাদ ঢুকিয়েছে যে, আপনিও একজন উন্নত ভোক্তা হবার চেষ্টায় দৌড়াচ্ছেন। যেকোনো মূল্যে আপনাকে একজন পাক্কা ভোক্তা হতে হবে, এজন্য চাই প্রচুর টাকা। আপনার বাবা যে লেভেলের ভোক্তা ছিলেন, তার চেয়ে আপনাকে ওপরের লেভেলের ভোক্তা হতে হবে। সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি-ভূমিদস্যুতা-খুন-প্রতিজ্ঞাভঙ্গ-অর্থনৈতিক সব অপরাধ করে হলেও ভোগের তাড়না মেটানো চাই।

» এখানে ব্যক্তি পুঁজিবাদী (ভোগের তাড়না, ক্যারিয়ারিস্টিক, অপরাধপ্রবণ)

» পরিবার পুঁজিবাদী (চাকরিজীবী মা; সন্তানের চোখে ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’)

» সমাজ পুঁজিবাদী (অপরাধ ও কলহপ্রবণ, আত্মকেন্দ্রিক)

» বাজার পুঁজিবাদী (মাপে কম, মজুতদারি, সিন্ডিকেট, প্রতারণা)

» অর্থনীতি পুঁজিবাদী (সুদি, খেলাপি, একমুখী প্রবাহ, পাচার)

রাষ্ট্র পুঁজিবাদী (পুঁজিপতি নিয়ন্ত্রিত সরকার, পুঁজিপতিরাই মন্ত্রী, পুঁজিপতি-বান্ধব পলিসি)

প্রতিটি মানুষ পুঁজিবাদী। যেকোনো মূল্যে পুঁজি বাড়ানো চাই। দুটো সিস্টেমের কনট্রাস্ট দেখেন। একটা জুলুম করতে বাধা দিচ্ছিল। আরেকটা জুলুম করতে উৎসাহিত করছে। ফলে আবশ্যিকভাবে প্রতিটি মানুষ কিছু না কিছু জুলুম করছে। এই পুজিবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে আমরা দ্বীন হিসেবে নিয়েছি। 'টাকা' আমাদের আরাধ্য দেবতা, যার বেদীতে আর সব কিছুকে এমনকি আল্লাহ-রাসুলের আদেশ-নিষেধকেও বলি দিয়ে চলেছি। এ দীনের কালিমা হচ্ছে-লা ইলাহা ইল্লাল মাল (অর্থসম্পদ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই)। এ এক আজব দ্বীন, যেখানে মাজলুম নিজেও জালিম। আবার জালিম নিজেও মাজলুম।

২.৩ বর্তমান পৃথিবী যে সিস্টেম বা অর্ডার অনুযায়ী চলছে তা হলো 'পুঁজিবাদ-ভোগবাদ' সিস্টেম। এটা এমন দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা যা গ্রহণ করে নিয়েছে কাফির-মুমিন সবাই। খুব ভেবে দেখুন, পুরো সিস্টেমটায় ওপরের স্তরগুলো লাভবান হচ্ছে। এখানে-

■ অর্থব্যবস্থা: পুঁজিবাদ (ওয়ান-ওয়ে)। অর্থনৈতিক কাঠামোয় যে যত ওপরে তার দিকে লাভের স্রোত, পুঁজির স্রোত। উৎপাদক/মজুর/শ্রমিক নিম্নতম মজুরি পায়। ভোক্তা থেকে অর্জিত লাভের বলতে গেলে কিছুই পৌঁছে না উৎপাদকের হাতে। ধনী হয় আরো ধনী, গরিব থেকে হয় আরো গরিব।

■ ব্যক্তিব্যবস্থা ও পরিবার-ব্যবস্থা: জানি না শব্দটা বানালাম কি না। সেলফ-মোটিভেশন বা সেলফ-অপারেটিং-সিস্টেম। এটা আজ 'ক্যারিয়ারিজম'। ধর্ম শব্দের অর্থ যদি (√ধৃ+অনট) হয় ধারণ করা, তবে মুমিন-কাফির নির্বিশেষে প্রত্যেকের অসাম্প্রদায়িক ধর্ম হলো ক্যারিয়ারিজম। আরো ওপরের স্তরের ভোক্তা হবার প্রতিযোগিতা। সবাই এই ক্যারিয়ারিজম টার্গেট রেখে ভাবে। সন্তানকে ক্যারিয়ারের জন্য বড় করে। অধিক হারে ভোক্তা তৈরি, বেশি ভোক্তা তৈরি। দুনিয়া উপভোগই লক্ষ্য।

■ সমাজ-ব্যবস্থা : ইনডিভিজুয়ালিস্টিক। সেলফ-সেন্টার্ড। অনেক প্রয়োজন সমাজ মেটাত। সমাজের সেই ফাংশনগুলো শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আর পজিবাদ সেগুলোর ভার নিয়েছে। ভোক্তা বাড়িয়ে নিয়েছে। যাকাতের জায়গা নিয়েছে মাইক্রোসুদ। মেহমানদারি ও পান্থশালার জায়গা নিয়েছে হোটেলব্যবসা। আত্মীয়-সংযোগের স্থান নিয়েছে ক্যাবল-টিভি। একাকী জীবন, একক পরিবার।

বিচার-ব্যবস্থা: ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থা। কোর্ট-উকিল নিয়োগ-জেল। ডেটের পর ডেট, আরো ডেট। আইনের প্যাঁচ, প্রচুর ফাঁক। পুঁজিপতিদের জন্য কোনো আইন নেই। ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে। ফাঁসির আসামির রাষ্ট্রীয় ক্ষমার ব্যবস্থা। বাদীর কোনো say নেই। বিস্তারিত এবং বিকল্প পরে কোনোদিন আলোচনায় আসবে হয়তো।

রাষ্ট্রব্যবস্থা: সেক্যুলার সোকল্ড 'গণ'তন্ত্র। যেখানে সরকার বসাবে পুঁজিপতিরা (গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকরা)। Government by the পুঁজিপতি, of the পুঁজিপতি, for the পুঁজিপতি। নির্বাচনের ডোনার পুঁজিপতিরা, মন্ত্রিপরিষদে পুঁজিপতিরা, পলিসি হবে তাদের পক্ষে। অর্থপাচার, ঋণখেলাপি, কালোটাকা, শেয়ার বাজারে পুঁজিলোপাট সব তারা করবে। কিন্তু তাদের পুতুল তাদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করবে না। ৩য় বিশ্বের পুঁজিপতিদের ওপরে আছে ১ম বিশ্বের পুঁজিপতিরা (Buyer-রা, সাপ্লায়াররা)। তারা বসায় তাদের সরকার।

২.৪

এবার তাকান। পুরো সিস্টেমটার পুঁজির স্রোত ওপরে। শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরি দেওয়া, ভোক্তাদের ঠকানো, পণ্যে ভেজাল, বেশিদিন টেকানোর জন্য বিষ দেওয়া, জমিতে যথেচ্ছা সার কীটনাশক থেকে নিয়ে ঘুষ-দুর্নীতি সবকিছুর মূলে এই সিস্টেমটা। প্রতি স্তরে যে বসে আছে, সে চাচ্ছে আরো লাভ করতে, আরো পুঁজি বাড়াতে। যে করেই হোক। ব্যবসায়ী হিসেবে সে চাচ্ছে আরো পুঁজি বাড়াতে আর একই লোক ভোক্তা হিসেবে চাচ্ছে আরো বেশি ভোগ করতে, আরো ওপরের স্তরের ভোক্তা হতে।

ফলে প্রতিটি ব্যক্তি নিজে নিচের স্তরে জুলুম করছে পুঁজি বাড়ানোর জন্য। আর ওপরের স্তরের কাছে সেই ব্যক্তিটিই মাজলুম হচ্ছে ভোক্তা হিসেবে। পুরো সিস্টেমটাই নষ্ট। যে মাছওয়ালা আমাকে ১০০ গ্রাম কম দিলো কেজিতে, সেও পাইকারের কাছে মণে ৩ কেজি কম পেয়েছে। বেশি লাভ সবাই করতে চাচ্ছে। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে। যে অফিসার আজ আমার থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিল, ওই চেয়ারে থাকতে তাঁকেও কোথাও ঢেলে আসতে হচ্ছে মাসে কিছু। একটা সিস্টেম। উন্নত বিশ্ব হয়তো এভাবে নিচ্ছে না, কিন্তু ভিন্ন কোনোভাবে এই পুঁজির একমুখী স্রোত চালু রেখেছে।

দুটো উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। আমি সবার সাথে খুব গল্প করি। ইমার্জেন্সিতে রোগী না থাকলে ওয়ার্ডবয় থেকে নিয়ে স্থানীয় পরিচিতমুখ সবার সাথে। তো রাতে অন-ডিউটি পুলিশ কনস্টেবল এস-আই, উনাদের সাথেও খুব খাতির গপসপ করতাম। একদিন একজন কনস্টেবল এসে দুঃখের কথা শোনালেন: স্যার, আসামি ধরতে অনেকগুলো সোর্স পালি। তাদের টাকা না দিলে ইনফো দেবে না। আবার এদের পালার জন্য বরাদ্দ পাই না। কিংবা বরাদ্দ থাকে, সিনিয়ররা নিয়ে নেয়। ওদিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আসামি ধরতে না পারলে প্রোমোশনের স্কোর তুলতে পারব না। বেতনও বাড়বে না, জিনিসপত্রের যা দাম। তো কী আর করব, নিরপরাধ লোক ধরে থানায় দিতে হয়, যাতে আমার কোটা পূরণ হয়। প্রোমোশন যেন পাই। দেখেন সিস্টেমে পড়ে বেচারা জুলুম করতে বাধ্য হচ্ছে নিরপরাধের ওপর, সে নিজেও মাজলুম।

শেষ উদাহরণ। আমার চেম্বার। রোগী এসেছে। লাইপোমা জাতীয় টিউমার। অনেকগুলো, একটা আবার ব্যথা, দ্রুত বড় হচ্ছে। আমি দেখেটেখে বললাম: ব্যথা না হলে সমস্যা ছিল না। যেহেতু ব্যথা, আর বড় হচ্ছে, অপারেশন করাতে হবে বড় ডাক্তার দিয়ে। অপারেশনের পর আবার বায়োপসি করতে হবে খারাপ কিছু কি না বুঝতে। আপনি কুষ্টিয়া মেডিকেলে যাবেন, যত দ্রুত সম্ভব। আর কিছু ব্যথার ওষুধ লিখে দিলাম। ৩০০ টাকা ভিজিট দিলো, বের হয়ে বাইরে গিয়ে বসল। যে ডায়াগনস্টিকে বসি, তার মালিক এসে বলল: স্যার, রোগীটাকে পাঠিয়েছে পল্লীচিকিৎসক, তাকেও একটা পার্সেন্টিজ দেওয়া লাগে। আপনি যদি টেস্ট না দেন, তাহলে ওকে ওর পার্সেন্টিজ দেবো কোত্থেকে? পকেট থেকে? সে রোগীটাকে আবার পাঠাল ভেতরে, অশিক্ষিত গ্রাম্য কৃষক। খচখচ করে লিখলাম রক্ত পরীক্ষা আর প্রস্রাব পরীক্ষা। আর ভিজিটে পাওয়া আমার ৩০০ টাকা দিলাম ফিরিয়ে। সিস্টেম।

পুলিশ-ডাক্তারদের সবাই গালি দেয়। দোষ করলে তো দেবেই। কিন্তু সিস্টেমটাকে কেউ গালি দেয় না। সিস্টেমটাকে কেউ বদলাতে চায় না। সিস্টেমের কর্তারা এসে ঠ্যাঙাবে বলে? প্রতিটা পুলিশ-ডাক্তার-শিক্ষক সেবার ব্রত পোষণ করে। মনের গভীরে। কিন্তু এই লোভী সিস্টেম তাকে করে তোলে লোভী-কঠোর। যে সিস্টেম ঘুষখোর তৈরি করে, কসাই তৈরি করে, ফাঁকিবাজ তৈরি করে, সে সিস্টেমের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। সমাধান ইসলাম নিয়ে এসেছিল, হুজুরদের কথাটা একবার বসে শুনুন। একবার বসেন। কী অর্থনীতি, বিচার-ব্যবস্থা, রাষ্ট্রপদ্ধতির কথা তারা বলে, একটাবার শোনেন। নাকি জানেন? জানেন বলেই শোনেন না? কার স্বার্থে? জুলুম করা যাবে না আর, তাই?

কত মাজলুমের চোখের পানি আজ করোনা ডেকে এনেছে, আমফান (ঘূর্ণিঝড়ের নাম) ডেকে এনেছে, সেটা কেউ বলবে না। সবাই বলবে নিম্নচাপ হয়ে আমফান এসেছে। মুমিন এটা বলবে না। মুমিন বলবে, 'মাজলুমের দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল, এমনকি মাজলুম কাফির হলেও।' কত মজুরের বেদামি ঘাম, কত কয়েদির উতলা মন, কত সর্বসান্ত বাদীর দীর্ঘশ্বাস, কত সেবাগ্রহীতার তিতে মন, কত চোখের পানি এই সিস্টেমের কারণে আল্লাহর দরবারে নালিশ করেছে বছরের পর বছর। পুরো দুনিয়ায়। আল্লাহর ক্রোধ না আসার কোনো কারণই তো আমি খুঁজে পাই না। আপনারা কীভাবে এত নিশ্চিন্ত, এত প্রশান্ত?

স্পর্ধা ৩ : বক্রতা, ইলহাদ

৩.১ শরিয়তে মুহাম্মাদিকে আল্লাহ তাআলা সুরক্ষিত রেখেছেন। কীভাবে সংরক্ষিত রেখেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে আরেক মুজিযা। কী এক আশ্চর্য উপায়ে আল্লাহ—

» তাঁর কালামকে সংরক্ষিত রেখেছেন (একেবারে নবিজির জীবদ্দশা থেকে আজ অব্দি একটানা, লিখিত-মুখস্থ দুভাবেই, প্রতি প্রজন্মেই বহুসংখ্যক লোকের দ্বারা)

» কালামের ভাষাকে সংরক্ষণ করেছেন (আরবি ভাষা দুনিয়ার সবচেয়ে 'অ-তরল' মানে কম পরিবর্তিত ভাষা, বিস্তারিত সামনে ইনশা আল্লাহ)

» কালামের ব্যাখ্যাকে সংরক্ষণ করেছেন (নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস। এটাও তাঁর জীবদ্দশা থেকে একটানা লিখিত প্লাস মুখস্থ, দুটোই। উদাহরণটা একটু কেমন হয়, তারপরও বলি। গার্মেন্টস থেকে প্রোডাক্ট ডেলিভারির সময় একটাতে খুঁত পেলে যেমন পুরো লট বাতিল, একেবারে তেমন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে আল্লাহর রাসুলের মুখের কথা)

» কালাম যার ওপর নাযিল হয়েছে, তার জীবন-চরিতকে সংরক্ষণ করেছেন। (হাদিসের মতো করেই)

» কালামের বুঝ সংরক্ষণ করেছেন। এই কালামের প্রথম ছাত্ররা (সাহাবিরা) যা বুঝেছেন, যেভাবে প্রয়োগ শিখেছেন শিক্ষক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে, সেটাকেও একইভাবে সংরক্ষণ করেছেন। (সাহাবিদের কথাও হাদিসের মতো করেই সংরক্ষণ করা হয়েছে)

প্রথম ছাত্রদের, তাদের ছাত্র, তাদের ছাত্র, তাদের ছাত্র এভাবে যারা যারা প্রতি জেনারেশনে তার কালাম-ব্যাখ্যা-বুঝ-ইতিহাস বহন করে পরের জেনারেশনে পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের সবার জীবন-চরিত, চরিত্র বিশ্লেষণ সংরক্ষণ করেছেন। এই শাস্ত্রের নাম 'আসমাউর রিজাল'।

ধরুন, নবিজির একটা হাদিস হঠাৎ করে উদয় হলো, যেটা কেউ শোনেনি। তখনই সেটার উৎস খোঁজা হবে, কোন চেইনে (সনদ) কথাটা এলো। এই বর্ণনা চেইন ছাড়া একটা লাইনও পাত্তা পাবে না। নতুন করে কিছু ঢুকবার সুযোগই নেই। না আয়াত, না হাদিস, না নতুন কোনো ব্যাখ্যা, না নতুন কোনো বুঝ। এরপর দেখা হবে, সেই চেইনে কারা কারা আছে, এই হাদিসের বাহক কারা প্রজন্মান্তরে। তাদের জীবনী সংরক্ষিত। বের করা হবে ৮০ ভল্যুম, ৬০ ভল্যুমের সেসব বই। এমন কেউ যদি চেইনে থাকে যার নাম এসব বইয়ে নেই (মাজহুল বা অজ্ঞাত), নগদে সে হাদিস বাদ। এমন কেউ যদি থাকে যার নামে অবজেকশন আছে, হয় সে মিথ্যুক, নয় হাদিস জালের হিস্ট্রি আছে, সাথে সাথে বাদ। কী কী খুঁত থাকলে হাদিস বাদ হবে, কী খুঁত থাকলে বাদ হবে না তবে ওজন কমে যাবে, দালিলিক গুরুত্ব কমে যাবে। সবখানে সে হাদিস ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। আকিদা প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের হাদিস, বিধান প্রমাণের জন্য কোন লেভেল, উৎসাহ-সতর্কবাণী প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের, ইতিহাস প্রমাণের জন্য কোন লেভেলের বর্ণনা নেয়া যাবে, এগুলো সব নীতিমালা করা রয়েছে।

সুতরাং, মনে চাইল একটা হাদিস বানিয়ে ঢুকোলাম, একটা হাদিস মনমতো ব্যাখ্যা মেরে দিলাম, কুরআনের আয়াতের একটা ব্যাখ্যা দিয়ে দিলাম, সে সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলাম হলো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (কুরআন), নবিজি যা বুঝেছেন, যা বুঝিয়েছেন (হাদিস)। সাহাবিরা যা বুঝেছেন-বুঝিয়েছেন (আছার)। এটুকু যুগের সাথে সম্পর্কিত নয়। কুরআনকে সেই যুগে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে বুঝেছেন, সাহাবিদের যেমনিভাবে বুঝিয়েছেন। আজকের যুগে সেই কুরআনকে আমরা অন্যভাবে বুঝব, সে সুযোগ নেই। কাণ্ডজ্ঞান (আকল) খাটিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হাদিস, সুপ্রতিষ্ঠিত বুঝ বাইপাস করার সুযোগ নেই।

৩.২ ইসলাম এসে যুগকে বদলায়, দেশকে বদলায়, মানুষকে বদলায়। যুগভেদে, দেশভেদে, জাতিভেদে ইসলাম বদলায় না। বর্তমান যুগের খাপে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসকে জোর করে সেট করতে চায় অনেকে, কুরআনের আয়াত সেট করতে চায়। এটা ভুল। বর্তমান যুগের খাপে কুরআন-হাদিস বসবে না, বরং কুরআন-হাদিসের উপযোগী খাপে যুগকে বসতে হবে। এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। সাইয়িদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন: 'ইসলাম ছাড়া বাকি সব জাহিলিয়্যাত। শুধু ইসলামই সভ্যতা।' আসলেই তাই। আজ আমরা জাহিলিয়াত পরম ধরে ইসলামকে ভ্যারিয়েবল নিচ্ছি।

» অবিবাহিত নারী-পুরুষ সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তার থেকে সাহাবিদের 'কোর্টশিপ' টেনে বের করছি।

» ব্যভিচারকে, সমকামকে, শিরককে একটা 'অধিকার' ধরে নিয়ে বলছি 'ইসলাম মানবাধিকারের কথা বলে'।

» জন্ম-নিয়ন্ত্রণকে আগে অপরিহার্য ধরে নিয়ে এরপর সাহাবিদের আযল (withdrawl method)-এর দলিল খুঁজে বের করছি। তাই বলে জায়িয হয়ে গেল জন্মনিয়ন্ত্রণের অবৈধ উদ্দেশ্যে পিল খাওয়া, যার রয়েছে ভয়াবহ শারীরিক ক্ষতি? জায়িয হয়ে গেল চামড়ার ইমপ্ল্যান্ট, ভ্যাসেকটমির মতো সৃষ্টি-বিকৃতি?

» জাতিরাষ্ট্র সীমাকে সর্বৈব পরম ধরে নিয়ে লজিক দিচ্ছি, জন্মনিয়ন্ত্রণ না করলে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাবে যে!

গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-মানববাদ-ব্যক্তিস্বাধীনতার খাপ অপরিবর্তনীয়। খালি আল্লাহর কালাম-রাসুলের হাদিস-সাহাবিদের বুঝই মোয়া? আল্লাহকেই আমার চিন্তার মাঝে পশ্চিমা জীবনধারার মাঝে ফিট হতে হবে? নইলে আল্লাহ বাদ, কিংবা ব্যাখা করতে হবে ঘুরিয়ে যাতে কোনোমতে আল্লাহকে রাখা যায়, কিন্তু কাফিরদের সামনে ছোট হতে না হয়। আল্লাহর রাসুলকেই আমার মানসিকতায় সেট হতে হবে? নইলে হাদিস বাদ। আমি আত্মসমর্পণ করছি, নাকি আল্লাহ-রাসুলকে বলছি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে? (নাউযুবিল্লাহ)

কুরআনের আয়াত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের বক্র অর্থ করা এক বিশেষ প্রকারের কুফর। এমন অর্থ করা যা গত ১৪০০ বছরে আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত ওই বিধানের চেহারা-অর্থ-বুঝ-সুরূপ থেকে ভিন্ন। একে বলে 'ইলহাদ', যে করবে তাকে বলা হবে মুলহিদ। আমার আপনার মনের কাছে ইসলাম আত্মসমর্পণ করে না। হয় আমি এগুলোর কাছে নিজেকে মিটিয়ে দেবো, নচেৎ ইসলাম আমাকে সশব্দে ডিজ-ঔন করবে। এবং আমার বাকি সব আমল নষ্ট হয়ে যাবে। হাশর হবে কাফিরদের সাথে।

আল্লাহ বলেন- إِنَّ الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي آيَاتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَا أَفَمَن يُلْقَىٰ فِي النَّارِ خَيْرٌ أَم مَّن يَأْتِي آمِنًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ إِنَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করে তারা আমার অগোচর নয়। যে ব্যক্তি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে সে শ্রেষ্ঠ; নাকি যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে (ও প্রশান্ত চিত্তে) উপস্থিত হবে সে (শ্রেষ্ঠ)? তোমাদের যা ইচ্ছা কর; তোমরা যা করো, তিনি তার প্রত্যক্ষদর্শী।

ইসলাম 'আধুনিক' 'সর্বাধুনিক' ধর্ম। এর মানে এটা নয় যে, বর্তমান আধুনিকতার সংজ্ঞায় ইসলামকে আসতে হবে। আপনার আমার আধুনিকতার খাপে ইসলামকে ঢুকতে হবে। বরং 'ইসলাম আধুনিক' মানে হলো ইসলামটাই আধুনিক, বাকি সব অ-আধুনিক। আমাকে আপনাকেই আমাদের অজ্ঞতা থেকে ইসলামের আধুনিকতায় এসে ঢুকতে হবে। ইসলাম কোনো সমঝোতায় আসে না। আর যদি আমি আমার কুফরি চিন্তা-চেতনা, জাহিলি জীবন-বোধ, জুলুমি-সিস্টেমের সাথে ইসলামের সমঝোতা চাই, তবে যেন আমি জেনে নিই, 'লাকুম দ্বীনুকুম ওয়া লিয়া দ্বীন।' আমার জাহিলি দ্বীন, আমার সোকল্ড আধুনিক চিন্তাচেতনার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম ইসলামের মতো, আমি আমার মতো।

ইসলাম নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

ইসলাম ছাড়া বাকি সকল ধর্মই ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা। কেবল কিছু আকিদা-বিশ্বাস আর সচ্চরিত্র গঠনমূলক নীতিকথা। আর কিছু সামাজিক প্রথা-পার্বণ। নওমুসলিম প্রফেসর জেফ্রি লাং তার ‘আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্ব’ বইয়ে খুব চমৎকার তুলে ধরেছেন, যদিও আমি বইটা গণহারে পড়তে নিষেধ করি, ‘আমেরিকান ইসলাম’ সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা পড়তে পারেন। তিনি বলেন, অমুসলিমদের দাওয়াহর ক্ষেত্রে আমরা যে স্ট্র্যাটেজি নিই (তাদের ধর্মগ্রন্থ ভুল প্রমাণ, ইসলামকে সঠিক প্রমাণ, বিতর্ক) এসব সংশয়ীদের ক্ষেত্রে কাজ করে (সংশয়ী খ্রিষ্টান বা সংশয়ী হিন্দু)। কিন্তু প্র্যাকটিসিং হিন্দু বা প্র্যাকটিসিং খ্রিষ্টান এগুলোতে প্রভাবিত হয় না। কারণ তাদের কাছে তাদের ধর্মগ্রন্থের ভুলগুলোর (যেগুলো আমরা খণ্ডন করি) একটা ব্যাখ্যা আছে। যেমন আছে আমাদের কাছে, যখন ওরা কুরআনের কোনো ভুল ধরে। বরং প্র্যাকটিসিং অমুসলিম খোঁজে ‘আধ্যাত্মিকতা’। বর্তমান ধর্মে আমি ‘এক ধরনের’ আধ্যাত্মিক খোরাক পাচ্ছি, ইসলাম আমাকে কী এমন বেশি দেবে? সুতরাং, ইসলামের আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরতে হবে আমাদের। এটুকু ওনার বক্তব্য। দেখুন, তারা ধর্ম বলতে যেমন ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা (personal spirituality) বোঝে, ইসলামকেও সেটাই বোঝে। তখনই প্রশ্ন ওঠে ইসলামের আইন নিয়ে, জিহাদ নিয়ে, অনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা নিয়ে। একটা ব্যক্তিক অধ্যাত্মবাদের (ধর্মের) ভেতর এত কিছু থাকবে কেন?

ইসলাম নিয়ে খুব কমন একটা আপত্তি আসে পশ্চিমা-মনস্কদের তরফ থেকে। ইসলাম তো তরবারির জোরে ছড়িয়েছে। এই আপত্তির বিপরীতে হীনম্মন্য মুসলিমরা চিঁটি করে জবাব দেবার চেষ্টা করে : আরে না না, ইসলাম মানেই তো শান্তি। ইসলামে তো যুদ্ধই নেই, যা হয়েছে সব ডিফেন্সিভ। অফেন্সিভ যুদ্ধ ইসলামে নেই। ব্লা ব্লা... প্রশ্নটা ওঠে ঠিক এই কারণে কেবলই যেটা বললাম। ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের মতো কেবল ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা আর নৈতিকতার সমষ্টি ভাবার কারণে। কেমন ধর্ম (পড়ুন ব্যক্তিক আধ্যাত্মিকতা), যে যুদ্ধ করে দেশ জয় করে? কেমন ধর্ম (নৈতিকতা) যে, তরবারি ধরে চাপিয়ে দেয়? ইসলাম সম্পর্কে নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের অধিকাংশ প্রশ্ন এই ‘আলাদা করতে না পারা’ থেকে উৎসারিত। আর আমাদের ভুল হলো আমরাও তাদের কোণা থেকেই জবাব দেবার চেষ্টা করি। ফলে হয় ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’।

খেয়াল করলে দেখবেন, উপমহাদেশে হিন্দুরা বিদেশিদের করা সকল ব্যবস্থা দ্রুততার সাথে আত্মীকরণ করে ফেলেছে। মুসলিমদের আনুগত্য মেনেছে, ব্রিটিশদের আনুগত্য মেনেছে। দ্রুততম সময়ে। তেমন কোনো বৃহৎ প্রতিবন্ধক ছাড়াই। এসব ধর্ম ব্যক্তিক নীতিমালা দেয়, বেশির চেয়ে বেশি সমাজনীতি দেয়। ফলে অর্থনীতি, বিচারনীতি, রাষ্ট্রনীতিতে একটা শূন্যতা রয়ে যায়। সেটা যখন যে পাত্রে তখন সে পাত্রের আকার ধারণ করে। এই শূন্যতাটাই ইউরোপে জমিদার-রাজাদের যথেচ্ছাচারিতার কারণ, খ্রিষ্টবাদের ব্যর্থতার কারণ। যে শূন্যতাটা পূরণ করতে জন্ম হয়েছে সেক্যুলার লিবারেল হিউম্যানিজমের ভিত্তিতে নয়া রাষ্ট্রচিন্তার। ইসলামের বিষয়টা ভিন্ন, ভিন্নরকম ভিন্ন। ইসলামের এই শূন্যস্থানটা নেই। তাই ব্রিটিশ আইন, বিচার, অর্থ, রাষ্ট্রকাঠামো হিন্দুরা যত সহজে মেনেছে, মুসলিমরা তত সহজে পারেনি। প্রায় ১০০ বছর লেগেছে সাধারণ মুসলিমদের পোষ মানাতে। ইসলামের স্বতন্ত্র পরিপূর্ণ বিচার-বাজার-রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে নতুন আনা কোনো ব্যবস্থা টক্কর লাগবেই।

স্পর্ধা ৪ : অশ্লীলতা

৪.১ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর প্রতি আল্লাহর আযাবের প্যাটার্নটা যদি লক্ষ্য করি। সব জাতিকেই আল্লাহ একটা আযাবে ধ্বংস করেছেন, সিঙ্গেল আযাব।

» কওমে নুহকে মহাপ্লাবন

» আদ জাতিকে প্রবল ঝড়

» সামুদ জাতিকে ফেরেশতার প্রচণ্ড আওয়াজ

» আসহাবুল আইকা-কে মন্দা-খরা

» কওমে সাবাকে বাঁধ ধ্বসে প্লাবন

শুধু একটা জাতিকে ধ্বংস করেছেন ৪টা আযাব একসাথে দিয়ে, করুণভাবে। কওমে লুত।

» দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়া

» প্রচণ্ড নিনাদ

» নগরকে উলটে দেওয়া

» পাথর-বর্ষণ

স্পর্ধা তো সবার কমন কারণ। তাহলে কওমে লুত কেন ভাগে এতগুলো পেল। কারণ আমরা সবাই জানি। বিরল প্রজাতির অশ্লীলতার প্রসার। মূলত সমকামিতা ছিল তাদের অশ্লীলতার চরমতম পর্যায়। এর আগের পর্যায়গুলো ছিল তাদের কাছে পানিভাত। স্বাভাবিক যৌনতা যখন সয়লাব, তখন মানুষ আরো বৈচিত্র্য খোঁজে। মানসাঙ্ক বইয়ে বহু আলোচনা করেছি যৌন-মনোবিজ্ঞান নিয়ে। সুতরাং,, অশ্লীলতার সয়লাব আল্লাহর ক্রোধকে বাড়িয়ে তোলে। অশ্লীলতা বিষয়টি চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ে, মানুষ চিত্ত-বিনোদনের জন্য নতুন নতুন অশ্লীলতা খুঁজে নেয়। অলরেডি পশ্চিমে সমকামিতা গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে, ফলে আওয়াজ উঠেছে ড্র্যাগকুইনের নামে বালক-কামের। নেদারল্যান্ডে শিশুকামীদের ম্যাগাজিন আছে PAIDIKA নামে। ডার্ক-ওয়েবে টেরাবাইট টেরাবাইট শিশুপর্ন, মৃতদেহের সাথে পর্ন। জার্মানিতে পশুকামীদের সংগঠন নিজেদের অধিকারের জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছে।

৪.২

লিবারেলদের কথাবার্তার মূল ভিত্তি হলো 'সম্মতি'। সম্মতি থাকলে সব বৈধ, ধর্মটর্ম গোনার টাইম নাই। এখন কানাডার আদালত বলছে, 'সম্মতির ব্যাপারটা যেহেতু নেই, অতএব যৌনাঙ্গে প্রবেশ ছাড়া পশুর সাথে সবকিছু করা বৈধ।' পশুকামীরা বলছে, পশুরাও এক বিশেষ ধরনের সম্মতি দেয়, অতএব পশুকাম বৈধ। 'জেন্ডার আইডেন্টিটি'র পুরোধা মনোবিদ জন মানি এক সাক্ষাৎকারে শিশুকামী ম্যাগাজিনকে বলেন : 'বালক যদি সম্মতি দেয়, তবে বালক-কাম হতে পারে দুই প্রজন্মের এক অপূর্ব সম্মিলন।' অথচ, সম্মতি ছাড়া স্বামী কিচ্ছু করতে পারবে না-'বৈবাহিক ধর্ষণ' হবে সেটা। এই হলো সোকল্ড 'সম্মতি'র বাস্তব চেহারা। অন্য কোনোদিনের জন্য সে আলাপ তোলা থাক।

৪.৩ ইসলামি মুআশারাত (ধরে নেন কালচার) এর একদম বেসিক এসেন্স হলো 'হায়া' বা লজ্জাশীলতা। ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক হিন্দু সমাজের অংশ হওয়ায় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের প্রেতাত্মা সওয়ার রয়ে গেছে। শূদ্র-বৌদ্ধ-বৈশ্য-নারী কেউই বাদ যায়নি ব্রাহ্মণ্যবাদের জুলুম থেকে, কেবল অস্ত্রধারী রাষ্ট্রকর্তা ক্ষত্রিয়রা ছাড়া। নারীর প্রতি হিন্দু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আজও ছাড়েনি। সেজন্য ইসলাম যখন 'হায়া'র কথা বলে তখন আমাদের চোখেও লজ্জাশীলা নারীর ব্রীডানত লাজনম্র দৃষ্টিটাই চোখে ভাসে। আমাদের বুলিই হয়ে গেছে, 'লজ্জা নারীর ভূষণ, পুরুষের দূষণ।' যেন পুরুষের লজ্জা থাকতে নেই, পুরুষ হবে বেহায়া-নির্লজ্জ।

ইসলামি এই 'হায়া' সর্বজনীন, নারী-পুরুষ সবারই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ নিজে লজ্জাশীল, তিনি লজ্জাশীলতা পছন্দ করেন।' ইসলাম তার বিভিন্ন বিধানের দ্বারা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য এই 'হায়া'-কে প্রোমোট করে এবং বে'হায়া'পনা-কে দমন করে। যে সমাজ 'হায়া' বা modesty'র ভিত্তিতে নির্মিত সে সমাজ হয় পবিত্র, সুসংহত। আজ আমাদের সমাজে অমুকের মেয়ে তমুকের সাথে ভেগে যাচ্ছে, অমুক প্রবাসীর বউয়ের ঘরে লোকের আনাগোনা, রাস্তাঘাটে ভ্রূণ-নবজাতকের লাশ পড়ে থাকা, পরকীয়ার বলি, প্রেমের বলি, ধর্ষণ, ভিড়ে-বাসে হাতাহাতি, পার্কে-রিকশায় উন্মত্ত নারী-পুরুষ, এগুলো একটা সমাজে 'হায়া' না থাকার প্রমাণ। আর 'হায়া' না থাকা সমাজ যেকোনো সভ্যতার আসন্ন ধ্বংসের আলামত।

৪.৪ সোশ্যাল নৃতাত্ত্বিক Joseph Daniel Unwin MC প্রায় ৫ হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র ও ৫টি বৃহৎ সভ্যতার ওপর একটি পর্যালোচনা করেন। Sex and Culture (1934) বইয়ে তিনি ফলাফল তুলে ধরেন বিস্তারিত আকারে। যেকোনো সমাজ বা সভ্যতার বিকাশ তাদের যৌনসংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। প্রতিটি সমাজ শুরুতে যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে কঠোর থাকে, যতদিন তারা এর ব্যাপারে সংযমী থাকে ততদিন তাদের বিকাশ ও উন্নতি হতে থাকে। সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছে তাদের ভেতরে শুরু হয় অবক্ষয়। যৌনতার ব্যাপারে উদার হতে থাকে। ব্যভিচার-সমকাম-প্রকাশ্য অশ্লীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এগুলো স্বাভাবিক প্র্যাকটিসে পরিণত হয়। ফলে কমে যেতে থাকে সামাজিক শক্তি। অশ্লীলতার প্রসার মানে পতনের বিউগল।

ইসলামি সমাজ-ব্যবস্থার বুনিয়াদ এই 'হায়া' বা লজ্জা। দেখুন কীভাবে ইসলাম 'হায়া'কে বিভিন্ন বিধানাবলির দ্বারা প্রতিষ্ঠা করে-

» বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দৃষ্টি অবনত রাখা।

» নারীর খিমার-জিলবাব-নিকাব। পুরুষের ঢিলেঢালা পোশাক। মোদ্দা কথা ইসলামি ড্রেসকোড।

» মাহরাম ও গাইরে মাহরাম মেনে চলা। এই ফরজ বিধান তো আমরা মুসলিমরা অস্বীকারই করে বসি।

» বাবার সামনে মেয়ে, ছেলের সামনে মা, ছেলেরা ছেলেরা, মেয়েরা মেয়েরা কতটুকু খোলা রাখবে কতটুকু ঢেকে রাখবে তার বিধান।

» সতর-আওরাতের বিধান।

» একজন আরেকজনের ঘরে, আরেকজনের বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি গ্রহণের বিধান। উঁকিঝুঁকি নিষিদ্ধ।

» একটা বয়সের পর সন্তানকে পৃথক বিছানায় প্রেরণ।

'হায়া' প্রোমোটিং কিছু বিধান ফরজ, কিছু মুস্তাহাব। আবার কিছু আছে ব্যক্তিগত তাকওয়া ও গাইরাত (আত্মমর্যাদাবোধ)। আবার এমনও কিছু আছে যা শুনতে অ্যাবসার্ডও মনে হতে পারে। এগুলো একটু বলি, তাহলে 'হায়া'র কনসেপ্টটা ক্লিয়ার হবে। 'হায়া'র বাংলাটা ঠিক লজ্জাশীলতায় পরিপূর্ণতা পায় না। অপরে দেখবে বলে সংকোচটাকে আমরা লজ্জা বলি। কিন্তু 'হায়া' অর্থ এটাও, প্লাস আত্মলজ্জা। অনেকটা 'আমি এমন কাজ কীভাবে করি!' স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো পর্দা নেই, তারপরও স্ত্রীর শরমগাহে না তাকানো। গুনাহ হবে, তা কিন্তু না। জাস্ট আত্মলজ্জা। আত্মলজ্জার কয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে-

উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হতো সবচেয়ে লজ্জাশীল, অত্যন্ত দুর্বল একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো নিজের ডান হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করেননি।

আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে যাই তখন আল্লাহকে লজ্জা করে আমার মাথার কাপড় দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে নিই।

আবু মুসা আশআরি রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি অন্ধকার কামরায় গোসল করি, এরপরও আল্লাহর লজ্জায় কাপড় পরার আগ পর্যন্ত আমার পিঠ সোজা করি না, ঝুঁকিয়ে কুঁজো করে রাখি।

৪.৫ মেয়েদের 'হায়া' বললে তো চট করে বুঝে ফেলি আমরা। লজ্জা নারীর ভূষণই নয় কেবল, ইসলামি কালচারে পুরুষেরও অলংকার এই লজ্জা। পুরুষের জন্যও ইসলাম 'হায়া'র কিছু বিধানকে ফরজ করেছে, কিছু মুস্তাহাব, কিছু আদব, আবার কিছু আছে কিছুই না, স্রেফ আত্মলজ্জা। ওপরের হাদিসটা মনে করুন, 'আল্লাহ লজ্জাশীল, ভালোও বাসেন লজ্জাশীলদের।'

» পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু সর্বাবস্থায় ঢেকে রাখা

» চোখ নামিয়ে চলা

» গাইরে মাহরাম নারীদের এড়িয়ে চলা (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ)

» বেশভূষায়, চুলের কাটে ইসলামি কোড মেনে চলা।

» পুরুষ হয়ে নারীর পোশাক না পরা

» স্বচ্ছ পোশাক না পরা

৪.৬ পারিবারিক কিছু 'হায়া' (আত্মলজ্জা) আছে। এখন মুসলিম পরিবার থেকে 'হায়া' বিদায় নিয়েছে। পুরো পরিবার একসাথে বসে ফরাসি-চুম্বনদৃশ্য উপভোগ করছে। 'লিটনের ফ্ল্যাট'-টাইপ নোংরা ডায়লগ বাপের সাথে মেয়ে বসে দেখে। অভিনেতাদের পোশাকে 'আই অ্যাম পর্নস্টার', 'ব্লো-জব', 'ডগিস্টাইল' লেখা- সবাই মিলে দেখছে। ছেলের সাথে মা বসে দেখে, ভাইবোন একসাথে দেখে। নায়ক নায়িকাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছে, থুতনি ওপরে তুলে ধরে এরপর দুটো ফুল একটা আরেকটাকে ঠোকরাচ্ছে-এ ধরনের সিম্বোলিক দৃশ্য তো একদমই স্বাভাবিক হয়ে গেছে আরো আগে। গুনাহের প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া ঈমানহীনতার আলামত। হাদিস আমাদেরকে জানিয়েছে: অন্তরে ঘৃণা করার নিচে ঈমানের আর স্তর নেই। তাহলে এইসব জঘন্য অশ্লীলতার প্রতি ঘৃণা উঠে যাওয়া, এগুলোকে নর্মাল মনে হওয়া কীসের আলামত?

৪.৭ যেকোনো খারাপ বিষয় নর্মালাইজ করার কয়েকটা ধাপ আছে। প্রথমে সেটাকে সবাই ঘৃণা করত। এরপর সেটা নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে। এরপর সেটা সিম্প্যাথাইজ করে, ওর কী দোষ। এরপর সেটা নর্মাল হয়ে যায় সমাজে। পর্নো, সমকামিতা এখন আমাদের সমাজে ঠাট্টার স্তরে আছে, একটা সময় ঘৃণার বিষয় ছিল। বিনোদনের নামে (নাটক-সিনেমা) মিডিয়া এই কাজগুলো করে। ছেলে-মেয়ে লিভ-টুগেদার আমাদের সমাজে একটা ঘৃণার জিনিস ছিল। 'লিটনের ফ্ল্যাট' জাতীয় ডায়লগ ও নাটকের দ্বারা এগুলোকে প্রচলিত করে দেওয়া হয়েছে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে। পরের ধাপে সেটা নর্মাল একটা ব্যাপার হয়ে যাবে, বা অলরেডি হওয়ার পথে। সমাজে গ্রহণযোগ্য একটা সম্পর্কে পরিণত অলরেডি হচ্ছে। যেমন ধরুন, প্রেমটা। একসময় আমাদের বাবাদের যুগেও সামাজিকভাবে ঘৃণ্য একটা ব্যাপার ছিল, এখন নাটক-সিনেমার সুবাদে 'কিছুই না' বা 'ছেলের নিজের পছন্দ আছে' হয়ে গেছে। টিভি প্রোগ্রামগুলো আমাদের মনস্তত্ত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। একই ধরনের মেসেজ বারবার পেতে পেতে, একই ধরনের সিনারিও বারবার দেখতে দেখতে সেটাকে বাস্তবজীবনেও স্বাভাবিক মনে হয়। 'ও তো জাস্ট অভিনয়'-এভাবে ফু মেরে উড়িয়ে দিলেও ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ঘটনাপ্রবাহ, পটভূমি, সিনারিও, চরিত্রায়ণ, ডায়লগ, পোশাক, ভাষা, ভঙ্গিমা সকল কিছু দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় 'হায়া' বিরুদ্ধ, ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সব জীবনাচরণ-বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, ফাহশা। যেমন করছে ক্লোজ-আপ: কাছে আসার গল্প। একটু একটু করে আমাদের মানসিক প্রতিরোধকে ভেঙে দিয়েছে।

৪.৮ মিডিয়াকর্মীদের মাঝে যারা এখনো নিজেদের মুসলিম ভাবেন, আখিরাতের ওপর, বিচার দিবসে জবাবদিহিতার ওপর এখনো বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য জাস্ট একটা আয়াত কুরআনের। কোনো তাফসির দরকার নেই, এমন দিবালোকের মতো স্পষ্ট আয়াত।

যারা চায় ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে যাক, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ভোগ করবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

যন্ত্রণাদায়ক আযাব দুনিয়াতেও, আখিরাতেও। খেয়াল করলে দেখবেন অধিকাংশ মিডিয়াকর্মী, নাট্যাভিনেতা-অভিনেত্রীর জীবন সুখের হয় না। ড্রাগ-ডিভোর্স-পরকীয়া-ড্রিংক্স-আত্মহত্যা প্রভৃতির ঘূর্ণাবর্তে এক অস্থির জীবন কাটায় তারা। পত্রপত্রিকাতেই অহরহ আমরা পেয়ে থাকি। এটা তাদের জন্য দুনিয়ার আযাব। এটা এজন্য, তারা মুসলিম সমাজে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাত, পশ্চিমের অশ্লীল জীবনাচারকে নর্মালাইজ করত। আর এর চেয়ে শত-সহস্রগুণ শাস্তি তারা ভোগ করবে আখিরাতে।

বহু মুসলিম ভাই, যারা আখিরাতে জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, তারাও নিজেদের অজান্তেই এই গর্হিত গুনাহ করে যাচ্ছেন। অনেকের জীবিকা উপার্জনের উপায়ই (ক্যারিয়ার) এটি, অশ্লীলতার প্রসার। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থও হারাম হয়ে যাচ্ছে তাদের অজান্তে। বিনোদনের নামে জনপ্রিয়তা অর্জনের দিকে তাদের ঝোঁক। জনপ্রিয়তা, নিশ্চিন্ত জীবিকা—এগুলো ভেদ করে আল্লাহর আহ্বান কানে আসাই কঠিন হয়ে যায়। দুনিয়ার জীবনের এসব ধোঁকা থেকে আল্লাহ কুরআনে বারবার সতর্ক করেছেন। অনেকে আল্লাহর দয়ায় উঠে আসতে পারেন এই পঙ্কিল জীবন থেকে। আল্লাহর জন্য বিসর্জন দেওয়া জনপ্রিয়তা ও জীবিকা আল্লাহ দুনিয়াতেই তাদেরকে ফিরিয়ে দেন শতগুণে, হালালের মাঝে। জুনাইদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহর উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে।

মিডিয়া দ্বারা প্রচারিত বা ইন্সটিলড এই সিনারিওগুলোর প্রয়োগ দর্শকের কাছে বাস্তবজীবনে এভেইলেবল করে দেয় সহশিক্ষা ও সহকর্ম। নাটক-সিনেমার শোনা-দেখা (প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীর) ডায়লগ, ভঙ্গিমা, ভাষা, চরিত্রায়ণগুলো ফ্যানরা এখানে প্র্যাকটিস করে। এটাই প্রমাণ করে এগুলো কেবলই নির্দোষ 'অভিনয়' নয়, এগুলোর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। আপনারা বহু ঘটনা পাবেন যেখানে 'ক্রাইম পেট্রোল' জাতীয় প্রোগ্রাম থেকে অপরাধের আইডিয়া নেওয়া হয়েছে। আমি বলতে চাইছি—এগুলো থেকে ‘নেওয়া’ হয় অনেক কিছুই। ‘জাস্ট বিনোদন’ বলার সুযোগ নেই।

৪.৯

‘হায়া’ মানুষের এক্সক্লুসিভ বৈশিষ্ট্য। পশুর কাছে নিজের চোখ আর লজ্জাস্থান সমান। কুকুর তার জিভও বের করে রাখে, তার পায়খানার রাস্তাও বের করে রাখে। সবই তো অঙ্গ, লজ্জার কিছু নেই। ‘লজ্জার কী আছে?’ এটা পশুর মুখে মানায়। বস্তুবাদ বা মানব-ইতিহাসের বস্তুবাদী দর্শন (ডারউইনিজম) মানুষকে একটা উন্নত পশু ছাড়া আর কিছু হিসেবে দেখে না। তাই বস্তুবাদীদের কাছে ‘লজ্জা’ অনর্থক একটা শব্দ, কারণ বস্তুবাদ দিয়ে ‘লজ্জা’কে ব্যাখ্যা করা যায় না। অথচ মানবেতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ লজ্জা পেয়েছে, পোশাক পরেছে। লিঙ্গ আর হাতের পার্থক্য করেছে, যদিও দুটোই শরীরের প্রত্যঙ্গ। এটা মানুষেরই বৈশিষ্ট্য। যে কারণে আমরা মানুষ, যে কারণে আমরা জন্তু নই, এগুলো সেই বৈশিষ্ট্য যা আমাদের মানুষ করেছে। কোনো পশু লজ্জা পায়নি, কোনো পশু ধর্ম পালন করেনি, কবিতা লেখেনি। এজন্য শুধু বস্তুবাদ দিয়ে মানুষকে ও মানুষের ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু ভাববাদ দিয়েও যায় না। ড. আলিজা আলি ইজাতবেগোভিচ তার Islam between East and West বইতে চমৎকারভাবে এটা আলোচনা করেছেন। ইসলামই মানুষের সত্তা ও জিজ্ঞাসাগুলোর পরিপূর্ণ উত্তর দেয়। বস্তুবাদ ও ভাববাদের সমন্বয় করেছে ইসলাম, মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে শেষ নির্দেশনা। মানুষ বলেই আমাদের কাছে আমার শার্ট আর জাঙ্গিয়া এক জিনিস নয়, যদিও দুটোই পোশাক। মানুষ বলেই আমরা পিরিয়ডের রক্ত দেখিয়ে রাস্তায় ঘুরতে পারি না। মানুষ বলেই আমরা লিপস্টিক নিজে কিনে, প্যাড বাপকে দিয়ে কেনাতে পারি না। মানুষ বলেই নিজেদের অন্তর্বাস ছাদে মেলে তার ফটো ফেসবুকে আমরা দিতে পারি না। এগুলো যতখানি ‘লোকলজ্জা’র বিষয়, এর চেয়ে বেশি ‘আত্মলজ্জা’র বিষয়। মনুষ্যত্ব মানে ধর্ম ছেড়ে দিয়ে ‘হিউম্যান’ হওয়া নয়। যদি বিবর্তন সঠিক ধরেও নিই, বস্তুবাদের অবোধ্য এই বিষয়গুলোকেই মনুষ্যত্ব বলে। এগুলোই অন্যান্য জন্তু থেকে আমাদের আলাদা করেছিল, আমাদেরকে 'এইপ' (Ape) থেকে 'ম্যান' করেছিল।

৪.১০

তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, সমাজে বে'হায়া'পনা ছড়ানোর শাস্তি হিসেবে আল্লাহ আযাব পাঠান। সমাজে অশ্লীলতার প্রসারে কিছুই করতে আমরা বাকি রাখিনি। পোশাকের ডিজাইন থেকে নিয়ে নাটক, পত্রিকার বিনোদনপাতা থেকে নিয়ে গানের লিরিক্স-প্রতিটি রাস্তাকে ব্যবহার করে আমাদের সমাজে 'হায়া'কে নষ্ট করা হয়েছে। আজ দেখেন চারিদিকে। মুসলিম-সন্তানদের আমরা 'হায়া' শেখাতে পারিনি। পাশ্চাত্য সভ্যতার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ওদের মতো আমাদের সমাজ থেকেও 'হায়া', শ্লীলতা, মডেস্টি, ডিসেন্সি শব্দগুলো উঠে গেছে। যা গোপনে করা হতো, তা প্রকাশ্যে করা হয়। সমকামিতার মতো ঘৃণার্হ কাজকে 'অধিকার' হিসেবে দাবি করা হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার পশ্চিমা সংজ্ঞা গ্রহণ, নারীবাদ ও এলজিবিটি আন্দোলনের নামে নির্লজ্জতাকে মূলধারায় আনা, স্কুলে যৌনশিক্ষার নামে 'হায়া' ভাঙানো, নাটক-সিনেমা-বিনোদনের নামে পারিবারিক 'হায়া' ধ্বংস করা—ধ্বংসের কিছুই কি বাকি রেখেছি আমরা?

ফিরে যাই শুরুতে। লুত আলাইহিস সালামের কওমে তিনিই ছিলেন সংখ্যালঘু, এমনকি তার স্ত্রীও ছিল অশ্লীল-মতাদর্শী। আজ আপনি সমাজে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কিছু বলে দেখেন, আজ এই লেখায় যা বললাম এগুলো বলে দেখেন। আপনিও টের পাবেন আপনি সংখ্যালঘু। আপনার স্ত্রী-বোন-বেস্টফ্রেন্ডও আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। লুত আলাইহিস সালামের জাতি তাকে শাসিয়েছিল : 'বেশি পবিত্র সেজেছ, বেশি পবিত্র হতে চাও?' আপনার জাতিও আজ আপনাকে শাসাবে : 'বেশি হুজুর হয়েছো, উগ্রবাদ ভালো না, টিভি-সিনেমা দেখে না তো জঙ্গিরা।' তাই যদি হয়, প্রবল পরাক্রমশালী সর্বশক্তিমান আল্লাহর রোষ কেন আসবে না, সেইটে আমাকে বুঝায়ে বলেন।

'করোনা' কেন শুধু, খেল তো সবে শুরু। এ তো একটা, পিকচার আভি বাকি হ্যায়। তবু যদি আমরা কেউ কেউ ফিরে আসি। তবু যদি আমাদের কারো হুঁশ হয়। আসেন আমরা আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাওবা করি, আত্মীয়-বন্ধুদের পক্ষ থেকে করি, পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে তাওবা করি। ফিরে আসি। إن عذابك بالكفار মুলহিক্ক’। আয় মালিক, আপনার আযাব কাফিরদের জন্য। আল্লাহ, আমরা আপনাকে চিনি, আপনার আযাবকে ভয় করি। আল্লাহ, আমরা ঈমান এনেছি, আমাদের মাফ করে দেন। আমরা আর ফিরে যাব না আগের অন্ধকার জীবনে। এবারের মতো আমাদের মাফ করে দেন।

টিকাঃ
১. সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৭
১. সুরা আরাফ, আয়াত: ১৬৭
২. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এদুয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর সার্বভৌমত্ব-রাজত্ব একমাত্র আল্লাহরই। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১২০)
১. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৯
২. সুরা মুজাদালাহ, আয়াত :৪
১. সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহিমাহুল্লাহর সময়ে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনকে পেছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে (World's Largest Economy) পরিণত হয়, যার মূল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর জিডিপি ছিল সে সময়ের সমগ্র বিশ্বের ৪ ভাগের ১ ভাগ।
Angus Maddison, The World Economy,, OECD Publishing (2003), page: 261
২. Dean Nelson (25 June 2012), India 'the world's largest open air toilet', The Telegragh
৩. Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
'পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ স্রোতের মতো এসে জমা হতে থাকে লন্ডনে। ১৭৬০ সালের আগে যেখানে শিল্পকারখানার নাম-গন্ধও ছিল না, সেখানে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে' লর্ড মেকলে লিখেছেন (Lajpat Rai, Unhappy India, 1928):
'ইংল্যান্ডে সম্পদ আসত সমুদ্রপথে। ওয়াট ও অন্যদের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইংল্যান্ডের যেটুকু কমতি ছিল, ইন্ডিয়া সেটুকু সরবরাহ করেছে। ইংল্যান্ডের পুঁজি বহুগুণে বাড়িয়েছে ভারতীয় সম্পদের প্রবেশ।... শিল্পবিপ্লব, যার ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সম্ভব হয়েছিল কেবল ইন্ডিয়ার সম্পদের কারণে। যা লোন ছিল না, এমনিতেই নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তা নাহলে স্টিম ইঞ্জিন ও যন্ত্রশিল্প পড়েই থাকত ইংল্যান্ডের। ইংল্যান্ডের উন্নতি মানে ভারতের লোকসান-এমনই লোকসান, যা ভারতে শিল্পকে ফাঁকা করে দিয়েছিল, কৃষিকে স্থবির করে দিয়েছিল। যেকোনো দেশ যদি এইভাবে পাচার করা হয়, সে ধনী-সম্পদশালী হলেও নিঃস্ব হয়ে যাবে।'
৪. ১৮০১ থেকে ১৯০০ পর্যন্ত ১০০ বছরে ৩১টা মন্বন্তরে ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ মরেছে- 'না খেয়ে'। 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
১. আবু সাইদ খুদরি রাযিয়াল্লাহু আনহু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, 'অবশ্য অবশ্যই তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দবের (গুইসাপ-গিরগিটির) গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, (পূর্ববর্তী জাতি বলতে) এরা কি ইহুদি-নাসারা? তিনি বললেন, তাহলে আর কারা?' (সহিহ বুখারি: ৭৩২০; সুনান ইবনি মাজাহ: ৩৯৯৪; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৬৭০৩; মুসনাদু আহমাদ: ৯৮১৯, ১০৬৪১)
২. উইলিয়াম হান্টার তার ইন্ডিয়ান মুসলিমস গ্রন্থে লেখেন-
'এ দেশটা আমাদের শাসনে আসার আগে মুসলিমরা শুধু শাসন ব্যাপারেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতি ছিল। ভারতের যে প্রসিদ্ধ (ইংরেজ) রাষ্ট্রনেতা তাদের ভালোভাবে জানেন, তার কথায়: ভারতীয় মুসলিমদের এমন একটা শিক্ষাপ্রণালি ছিল, যেটা আমাদের আমদানি করা (ব্রিটিশ) প্রণালির চেয়ে নিম্ন হলেও (!) কোনো ক্রমেই ঘৃণার যোগ্য ছিল না। তার দ্বারা উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন হতো। সেটা পুরোনো ছাঁচের হলেও তার ভিত্তিমূল সুদৃঢ় ছিল এবং সেকালের অন্য সব প্রণালির চেয়ে নিঃসন্দেহে উত্কৃষ্ট ছিল। এই শিক্ষাব্যবস্থায়ই তারা মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য সহজেই অধিকার করেছিল।' [ইন্ডিয়ান মুসলিমস, উইলিয়াম হান্টার, পৃষ্ঠা: ১১৬]
১. বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সময় ভারতে এসেছিলেন স্যার থমাস রো (১৫৮১ - ১৬৪৪)। তিনি তাঁর ভ্রমণগাঁথায় উল্লেখ করেন: সকলের ভিতর আতিথেয়তা ও দানের ঝোঁক, তার চেয়েও বড় কথা দুর্বলকে রক্ষা করা ও তাদের জানমালের নিরাপত্তার প্রতি খেয়াল রাখা— এসব এমন বৈশিষ্ট্য যা দেখে এ জাতিকে অশিক্ষিত বর্বর বলা যায় না। তাদের যেসকল গুণের কথা বললাম, তাতে ভারতীয়দেরকে ইউরোপীয় জাতিসমূহের তুলনায় কোনোভাবেই নীচ বলা যায় না। [The Embassy of Sir Thomas Roe to India 1615-1619]
২. আকবরের আমলে ১৪ জন হিন্দুকে 'মনসবদার' উচ্চপদে নিয়োগ দেন। আর আওরঙ্গজেব ওই পদে ১৪৮ জন হিন্দুকে নিয়োগ দিয়েও দিলেন। [মোগল গবর্নমেন্ট, শ্রীশর্মা, পৃষ্ঠা: ১১১] গভর্নর পদেও হিন্দুদের নিয়োগ দেওয়া হতো। যশোবন্ত সিংকে মুসলিম এলাকা কাবুলের গভর্নর বানিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। এমনকি শত্রু শিবাজির আপন জামাই অচলাজি ৫ হাজারি মনসবের সেনাপতি ছিল, আরেক আত্মীয় আজুজি ছিল ২ হাজারি। এছাড়া তার সেনাপতিদের মাঝে ছিল রাজা রাজরূপ, অর্ঘ্যনাথ সিং, দিলীপ রায়, কবির সিং, প্রেমদেব সিং। রাজস্ব বিভাগের প্রধান ছিলেন রসিকলাল ক্রোরী। [চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম মোর্তজা] ভূমি ব্যবস্থাপনা (কানুনগো বিভাগ) ছিল একচেটিয়া হিন্দুদের হাতে। সামগ্রিকভাবে হিন্দু-মুসলিমে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য ছিল। [বাংলার আর্থিক ইতিহাস, সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৫]
হিন্দুদের ব্যাপারে মোগল সম্রাটগণ, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ প্রমুখের এই উদারনীতি মুসলিমদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি। অমুসলিমদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ আলিমদের নিষেধাজ্ঞা আছে। যার বাস্তবতা হলো, মুসলিম ভূমি বারবার হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
১. সুরা ত-হা, আয়াত: ৮১
১. জামি তিরমিযি: ১২০৬; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮
২. সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৫-২৭৯
১. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪৪, ৪৫, ৪৭
২. কুরআনের স্পষ্ট আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, আল্লাহর দেওয়া আইন অনুসারে বিচার না করলে সে কাফির, ফাসিক ও জালিম। আমাদের জানার বিষয় হলো, মানব-রচিত আইনে বিচার করা সুস্পষ্ট বড় কুফর নাকি কুফর দুনা কুফর (ছোট কুফর) তথা ফিসক? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া মুশকিল। মৌলিকভাবে বলা যায়- ■ কেউ আল্লাহর আইনের বিপরীতে কোনো আইন প্রণয়ন করলে সে সুনিশ্চিতই কাফির। ■ অনুরূপ যে এ ধরনের কাজ সাপোর্ট করে মানব-রচিত আইনকে সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে তারও একই বিধান। ■ আর আইন নিজে না বানিয়ে কেবল আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনে বিচার করলে সেক্ষেত্রে এর উত্তর হবে, যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সে আল্লাহর আইনকে সঠিক এবং সে অনুসারে বিচার করাকে আবশ্যক বলে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও পার্থিব স্বার্থে কখনো ভিন্ন আইনে বিচার করে অথবা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তাহলে সে কাফির নয়; বরং জালিম বা ফাসিক। এ ধরনের কুফরকে বলা হবে 'কুফর দুনা কুফর।' অর্থাৎ এর কারণে সে মারাত্মক গুনাহগার হলেও দ্বীন ইসলাম থেকে বের হয়ে মুরতাদ হয়ে যাবে না। ■ আর যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর আইনের পরিবর্তে মানব-রচিত আইন প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং এটার প্রতি কোনো ঘৃণা ও বিদ্বেষ না রেখে সেই আইন অনুসারেই সে নিয়মিত বিচার-আচার করে থাকে কিংবা সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে মানব-রচিত আইনকেই সঠিক ও শ্রদ্ধাযোগ্য মনে করে অথবা মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকল্পে এ আইন অনুসারে ফয়সালা করাকে বাধ্যতামূলক বিশ্বাস করে তাহলে তার কুফর ও ইরতিদাদের বিষয়টি সুস্পষ্ট। এখানে তার কুফরির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এটাকে 'কুফর দুনা কুফর' (ছোট কুফর বা ফিসক, যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ করে না) বলে যারা বিষয়টিকে হালকা করে প্রচার করে, তারা নিশ্চিত দ্বীনের অপব্যাখ্যা করে আল্লাহদ্রোহীদের খুশি করতে চায়। আমরা এদের থেকে মুক্ত এবং তারাও আমাদের থেকে মুক্ত। শারয়ি সম্পাদক
১. আদি ইবনু হাতিম থেকে তিরমিযির বর্ণনা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, আল্লাহ অবশ্যই এ দ্বীনকে এমন পূর্ণতা দেবেন, একাকিনী নারী হাওদার ওপর চড়ে সুদূর হিরা শহর থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তাতে কোনো লোকের আশ্রয় দানের প্রয়োজন তার হবে না।... আদি ইবনু হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এই তো আমি দেখছি হাওদানশিনা নারী কারো নিরাপত্তা সঙ্গী ছাড়াই হিরা থেকে এসে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে যাচ্ছে। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৯-১৩০)
২. ঘটনা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময়কার। খলিফা আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেন এক ইহুদির দায়ের করা মামলায়। বর্মের মালিকানা নিয়ে খলিফা আর ইহুদির মাঝে বিরোধের ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। (তাবিয়িদের ঈমানদীপ্ত জীবন, ড. আব্দুর রহমান রাফাত পাশা, রাহনুমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ১০৮) এবং (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া ই.ফা., ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৫)
৩. সুরা ইনফিতার, আয়াত : ৬
১. সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
২. অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। [সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫২]
৩. আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। [সুরা গাফির, আয়াত : ৬০]
৪. বান্দা আমার দিকে একহাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে এক বাঁও (প্রসারিত দুই বাহু পরিমাণ) এগিয়ে যাই। সে আমার দিকে হেঁটে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই। (হাদিসে কুদসি) সহিহ বুখারি: ৭৪০৫; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫]
১. 'নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমি আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া দেবো, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা নিসা, আয়াত: ৫৬]
২. 'তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে, তা দ্বারা তারা দেখে না; তাদের কান আছে, তা দ্বারা তারা শোনে না।' [সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯]
১. (ذُقْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْكَرِيمُ )বলা হবে, আজ জাহান্নামের) স্বাদ গ্রহণ করো, তুমি তো (দুনিয়ায়( ছিলে সম্মানিত, অভিজাত!' [সুরা দুখান, আয়াত: ৪৯]
১. সেই তো উত্তম সঙ্গী, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কথা শুনলে আমলের উৎসাহ বৃদ্ধি পায় এবং যার কাজে আখিরাতের স্মরণ আসে। মুসনাদ আবি ইয়ালা: ২৪৩৭; শুআবুল ঈমান: ৯০০০; আল-আওলিয়া, ইবনু আবিদ দুনইয়া: ২৫; আত-তারগিব ফি ফাজাইলিল আমাল: ৪৮২; আল-মুনতাখাব মিন আবদ বিন হুমাইদ: ৬৩১; আল-মাতালিবুল আলিয়া: ২৮১৭, ৩২৪৬/ হাদিসটির সনদ সামান্য দুর্বল।]
২. শারহুল হামওয়ি আলাল আশবাহি ওয়ান নাযায়ির খন্ড ২, পৃষ্ঠা৩৮; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়‍্যা : খন্ড :১৬, পৃষ্ঠা :১৯৯
১. ৭ বছর বয়সে তোমাদের সন্তানকে সালাত আদায়ের জন্য আদেশ করো আর ১০ বছর বয়সে সালাত আদায় না করার জন্য প্রহার করো।-সুনানু আবি দাউদ: ৪৯৫, মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৮৯, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭০৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৩২৩৩, ৩২৩৪, ৩২৩৫, ৫০৯২; সুনানু দারাকুতনি: ৮৮৭, ৮৮৮। হাদিসটি সহিহ
১. তারা (জাহান্নামিরা) আরো বলবে, 'হে আমাদের রব, আমরা আমাদের "নেতা ও বড়দের (সিনিয়রদের)" আনুগত্য করেছিলাম, আর ওরাই আমাদেরকে ভুলপথে নিয়েছে। হে আমাদের রব, ওদের “দ্বিগুণ শাস্তি” দিন আর তাদেরকে দিন মহা-অভিসম্পাত।' [সুরা আহযাব, আয়াত : ৬৭-৬৮]
২. সহিহ বুখারি: ৩২২৫, ৩২২৬, ৩৩২২, ৪০০২, ৫৯৪৯, ৫৯৫৮; সহিহ মুসলিম: ২১০৬; সুনানু আবি দাউদ: ৪১৫৩, ৪১৫৫; জামি তিরমিযি: ২৮০৪; সুনানু নাসায়ি: ৪২৮২, ৫৩৪৭, ৫৩৪৮, ৫৩৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৪৯
১. আম্মার ইবনু ইয়াসির রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন প্রকারের লোক কোনোদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যথা: দাইয়ুস, পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি।' [শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ১০৩১০; মারিফাতুস সাহাবা, আবু নুআইম : ৫২০৮, ৫২০৯; মুসনাদু আবি দাউদ তায়ালিসি ৬৭৭; আত-তাওহিদ, ইবনু খুযাইমা: খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা : ৮৬৫; সহিহুল জামি: ৩০৬২। হাদিসটি সহিহ।]
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—'তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে হারাম (নিষিদ্ধ) করেছেন—মদে আসক্ত ব্যক্তি, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ুস, যে তার পরিবারে নোংরামি সমর্থন করে।' [মুসনাদু আহমাদ: ৫৩৭২, ৬১১৩, ৬১৮০; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৪৪; মুসনাদুল বাযযার : ৬০৫০, ৬০৫১; শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৭৪১৬; সহিহুল জামি: ৩০৫২, ৩০৬৩। হাদিসটি সহিহ।]
এখানে একটি মূলনীতি স্মরণ রাখা দরকার, কুফর-শিরকে লিপ্ত না হয়ে থাকলে ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করা প্রত্যেক মুমিনই একদিন না একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। গুনাহের কারণে যতদিনই সে জাহান্নামে থাকুক না কেন, আল্লাহ একদিন না একদিন তার ঈমানের বদৌলতে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাত দান করবেন। এটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাহর স্বীকৃত মূলনীতি ও আকিদা। সুতরাং, যেসব আয়াত-হাদিসে কোনো গুনাহের কারণে স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকা কিংবা জান্নাতে কোনোদিনও প্রবেশ না করার কথা বলা হয়েছে সেগুলো ধমকের অর্থে ধরা হবে। অর্থাৎ সেসব আয়াত-হাদিসে প্রকৃত অর্থেই চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকা বা কোনোদিনও জান্নাতে না যাওয়ার কথা বোঝানো হয়নি; বরং গুনাহের ক্ষেত্রে এ ধরনের কথা সাধারণত কঠিন ধমক ও দীর্ঘ শাস্তি বোঝানোর উদ্দেশেই বলা হয়ে থাকে। গুনাহের জঘন্যতা ও ভয়াবহতা বোঝানোর জন্যই অনেক সময় এমন কঠিন ধমকি দেওয়া হয়ে থাকে। আরবি ভাষায় শব্দের এমন রূপক ব্যবহারের অনেক প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত আছে। তাই এ ব্যাপারটিতে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, যেন কোনোরূপ বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়।—শারয়ি সম্পাদক
২. সহিহ বুখারি : ৬৯১৪; সহিহ মুসলিম: ২১২৮; জামি তিরমিযি: ১৪০৩; সুনানু নাসায়ি: ৪৭৪৯, ৪৭৫০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২০৫৪, ২৬১১, ২৬৮৬, ২৬৮৭; মুসনাদ আহমাদ ৬৭৪৫, ১৬৫৯০, ১৮০৭২, ২০৫০৬, ২০৫১৫।
১. এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত জানতে লেখকের রচিত 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০' বইটি দেখা যেতে পারে।
১. সুরা আলি ইমরান, আয়াত: ১৯
১. সুরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬
১. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৪৯; সহিহ ইবন হিব্বান: ৮৭৫; মাকারিমুল আখলাক, তাবারানি: ১২৭; জামিউল মাসানিদ, ইবনুল জাওযি, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৫৬
১. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪০ এর তাফসির, তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন দ্রষ্টব্য
২. সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪০
১. সুরা কমার, আয়াত: ৩৭
২. সুরা হিজর, আয়াত: ৭৩
১. সুরা হুদ, আয়াত : ৮২
২. সুরা হিজর, আয়াত : ৭৪
১. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪-হাদিসটি সহিহ
২. মৃত্যু: ১৮৯৫-১৯৩৬
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৫০৬১
২. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ১১২৭; আয-যুহদ, আহমাদ বিন হাম্বল : ১১৬৮; শুআবুল ঈমান : ৭৩৩৭; তাযিমু কাদরিস সালাহ: ৮২৮; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৪
৩. আয-যুহদ, আহমাদ ইবনু হাম্বল : ১১০০; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা : ১১২৮; তাযিম কাদরিস সালাহ : ৮৩৯; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬০-শারয়ি সম্পাদক
৪. সুনানু আবি দাউদ: ৪০১২; সুনানু নাসায়ি ৪০৬; মুসান্নাফ আব্দির রাজ্জাক ১১১১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ৯৫৬; শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৪। -হাদিসটি সহিহ
১. নিশ্চয় যারা ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। [সুরা নূর, আয়াত : ১৯]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00