📄 আল্লাহ কে?
গযব বা গদ্বব শব্দের অর্থ ক্রোধ, রাগ, Wrath, Anger. আল্লাহ আবার রাগেন?
জি। ক্রোধ আল্লাহর সিফাত। আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্য যেসব সিফাত বা গুণ সাব্যস্ত করেছেন। আমরাও সেগুলো সাব্যস্ত করি, কিন্তু এগুলোর ধরন জানি না এবং এগুলো আমাদের সদৃশ নয়। যেমন কালাম, আল্লাহ কথা বলেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি কথা বলেন, আমরাও মেনে নেব, তিনি কথা বলেন, কিন্তু কীভাবে বলেন তা জানি না, সেটা সৃষ্টির ধরনের নয়। আমাদের যেমন ফুসফুসের বাতাস বেরোতে থাকে আর দাঁত জিহ্বা ঠোঁটে ধ্বনি উচ্চারণ করে কথা বলি, তাঁর কথা এমন নয়। কেমন, আমরা জানি না। তবে আমাদের সদৃশ যে নয়, এটা নিশ্চিত। لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئُ (লাইসা কামিসলিহি শাইয়ুন)-কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। সৃষ্টিজগতে তাঁর কোনো সদৃশ নেই, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।। তিনি অমুখাপেক্ষী, কথা বলার জন্য তিনি ফুসফুস-জিহ্বা এগুলোর মুখাপেক্ষী নন। এগুলো সৃষ্টির লাগে, স্রষ্টার লাগে না।
» আমাদের আল্লাহ জড়বস্তু নন। তিনি জীবিত, চিরঞ্জীব (আল হাইয়্যু)।
» তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতি উদাসীন নন। তিনি কেয়ারিং। তিনি সব দেখছেন (বাছীর), সব শুনছেন (সামিউ), সব খবর রাখছেন (খাবীর)।
» তিনি সৃষ্টিকে ভালোবাসেন (রউফ), স্নেহ করেন (ওয়াদুদ) মাতৃপেক্ষা বেশি।
তিনি রহম করেন জালিম-মাজলুম সবাইকে (রাহমান), জালিমের ওপর ধৈর্য ধারণ করতেই থাকেন (হালীম/সবুর)।
মাফ করেন (গফুর), সর্বোচ্চ পর্যায় অব্দি মাফ করতে থাকেন (গাফফার)।
আবার তিনি প্রতিশোধ নেন (যুনতিকাম), ক্রোধান্বিত হন (কাহহার)। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে জালিমের ওপর তিনি প্রতিশোধ নেন। মাজলুমের পক্ষে।
তবে তাঁর রহম তাঁর ক্রোধের ওপর বিজয়ী।
তিনি ইনসাফ করেন (আদিল), ক্রোধে তিনি সৃষ্টির মতো ন্যায়হরণ করে বসেন না।
তিনি চান আমরা ভালো থাকি, সুখে থাকি। ন্যায় করি। অন্যায় করে তাঁর গযব ডেকে না আনি। এজন্য তিনি আমাদের সাথে কমিউনিকেট করেন। নবিদের মাধ্যমে কিতাব পাঠিয়ে সতর্ক করেন। কীভাবে চলতে হবে জানান। আমার জমিনে আমার দেখানো নিয়মে চলো, তোমরাও ভালো থাকো, আমার সৃষ্টিকেও ভালো থাকতে দাও। আমার অবাধ্য হয়ো না। 'আমার ক্রোধ তোমরা সহ্য করতে পারবে না, তারপরও তোমরা অবাধ্য হচ্ছো?'
তিনি স্বত্বাধিকারী (মালিক), শাসক (হাকাম), প্রতিপালক (রব)।
সুতরাং, ক্রোধ আল্লাহর সিফত বা গুণ। তিনি জড় নন, নির্জীব নন, বেখেয়াল নন। বান্দারা সীমা অতিক্রম করে ফেললে তিনি গযব পাঠান। কেন? وَلَئِذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ 'বড় আযাব (পরকালে)-এর আগে আমি অবশ্যই তাদেরকে ছোট কিঞ্চিৎ শাস্তি (দুনিয়াতে) আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ফেরানোর জন্য। মুমিনদের আল্লাহ আযাব পাঠান ফেরানোর জন্য। আর কাফিরদের পাঠান ধ্বংসের জন্য। কাফিরদের জন্য কখন পাঠান? তাদেরকে সুযোগের পর সুযোগ দেন। দুনিয়াতে কাফিরদেরকে আল্লাহ তাদের কুফরের জন্যও আযাব দেন না। শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ, এজন্যও আযাব পাঠান না। কাফিরের কুফর, মুশরিকের শিরকের শাস্তি জাহান্নামে অনন্তকাল চলবে। দুনিয়ায় আল্লাহ তাদের আরাম-আয়েশের সুযোগ দেন। বেশি করে দেন। তাহলে দুনিয়ায় গযব কখন আসে? দেখুন-
নুহ আলাইহিস সালামের জাতিকে সাড়ে ৯০০ বছর সুযোগ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নুহ আলাইহিস সালামকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। চূড়ান্ত স্পর্ধা। বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর দূতকে হত্যার হুমকি?
আদ জাতিকে ধরেছেন যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আবার কেডায়?'
সামুদ জাতির দাবিমতো পাথরের ভেতর থেকে উট বের করে দেখিয়েছেন আল্লাহ। সেই উটের স্পেশাল নাম দিয়েছেন 'নাক্বতুল্লাহ' (আল্লাহর উট)। এতকিছু চোখের সামনে দেখেও সেই উটকে তারা হত্যা করেছে। কত বড় স্পর্ধা!
ফিরআউন কতশত বছর বনি ইসরাইলের ওপর জুলুম করেছে। মায়ের কোল থেকে ছেলে বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছে। আল্লাহ শাস্তি দেননি। অবশেষে চূড়ান্ত স্পর্ধা দেখিয়েছে ফিরাউন, 'আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব?'
কওমে লুত শিরক করেছে, সমকাম করেছে শত শত বছর। আল্লাহ ধরেননি। কখন ধরেছেন? যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'লুত, তোমাকে আমরা বের করে দেবো, বেশি সুশীল হয়েছো, খুব পবিত্র হয়েছ, না?' তারা জানত তারা নাপাক কুৎসিত একটা কাজ করছে। সেটা জেনেই তারা করছে ও করবে। পারলে লুত কিছু কইরো।
কারুন তো বনি ইসরাইলেরই ছিল। যাকাতের হুকুম হয়েছে। সে দিলো তো না-ই, স্পর্ধা দেখাল, 'এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন নাকি? এগুলো তো আমি নিজ যোগ্যতায় কামিয়েছি।'
আল্লাহর গযবের একটা কমন প্যাটার্ন দেখুন : স্পর্ধা, অহংকার। শিরক-কুফর- জুলুম সব আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন দুনিয়াতে। গযবের এপিসেন্টার হলো এই ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, অহংকার, বড়াই। সভ্যতার চূড়ায় থাকা জাতিগুলো যখন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সাথে স্পর্ধা দেখিয়েছে, আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়েছে। আমি জানি আপনাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে। যদি আল্লাহর গযবই হয়, তাহলে মুসলিম মরে কেন রে ব্যাটা?
টিকাঃ
১. সুরা শুরা, আয়াত : ১১
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. সুরা নাযিয়াত, আয়াত: ২৪
২. 'নিশ্চয় কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল।' [সুরা কাসাস, আয়াত :৭৬] বাহ্যত এখান থেকে এ ধারণার উদ্রেক হতে পারে, সে সম্ভবত বনি ইসরাইলের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। কারণ, আয়াতে তাকে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলা হয়েছে, কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ, এখানে "মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলতে শুধু এটা বোঝানো হয়েছে যে, সে ছিল মুসা আলাইহিস সালামের বংশীয় লোক। অর্থাৎ সে মুসা আলাইহিস সালামের চাচাতো ভাই ছিল। এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরদের মত; যেমনটি ইমাম ইবনু জারির তাবারি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন। [তাফসিরত তাবারি, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৬১৫-৬১৬] আয়াতে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলে এ বংশীয় সম্পর্ক ও আত্মীয়তার কথাই বোঝানো হয়েছে। এটা বোঝানো হয়নি যে, সে মুসা আলাইহিস সালামের কওমের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। তার অন্যান্য কর্মকাণ্ডও প্রমাণ করে, সে মুমিন ছিল না; বরং সে ছিল একজন কাট্টা কাফির। শারয়ি সম্পাদক
📄 আল্লাহর আযাবে মুসলিম কেন মরে?
তিনটা পয়েন্টে আলোচনাটা শেষ করব, ইনশাআল্লাহ।
প্রথমত, আমরা দেখলাম আল্লাহর আযাব-গযবের এপিসেন্টার হলো স্পর্ধা। কাফির চিরকালই স্পর্ধা দেখিয়েছে, দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সে আল্লাহকে চেনে না। কিন্তু কাফিরদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা মুসলিমরা সমষ্টিগতভাবে গত এক শতকে যে স্পর্ধা দেখিয়েছি, আগের ১৩০০ বছরে এতখানি ঔদ্ধত্য মুসলিমরা দেখায়নি। আমি তো মনে করি, এ দিক বিবেচনায় কাফিরদের তুলনায় আমরাই আল্লাহর গযবের বেশি উপযুক্ত। কী সে স্পর্ধা, সেটা একটু পরে একসাথে আলোচনা করছি।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর আযাবের কিছু নিয়ম আছে। যখন দুনিয়ায় আযাব আসে, সেটা সবার জন্যই আসে। ইমাম মাহদির বিরুদ্ধে প্রেরিত বাহিনীকে বাইদা নামক জায়গায় ধসিয়ে দেওয়া হবে, শুনে আম্মাজান আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেন, বাইদা এলাকায় এমন অনেক লোকও তো থাকতে পারে, যারা ওই বাহিনীর লোক নয়। বাজার এলাকার আম পাবলিক। তারাও এই আযাব ভোগ করবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
হ্যাঁ, যখন কোনো এলাকায় আল্লাহর আযাব আসে, তখন সবার ওপরই আসে। পরে হাশরের মাঠে যার যার নিয়ত অনুসারে আলাদা হয়ে যাবে।
বিশেষ করে মহামারি সম্পর্কে নবিজি স্পষ্ট করেই বলেছেন—
মহামারি হলো রিযয় (গযব বা শাস্তি) বা আযাব, যা আল্লাহ বনি ইসরাইল বা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেদের ওপর দিয়েছিলেন। কতক জাতিকে এর দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাকি রয়ে গেছে, তাই কখনো তা আসে, কখনো চলে যায়। তবে মুমিনদের জন্য আল্লাহ একে রহমত বানিয়েছেন। যদি মুমিন ধৈর্য সহকারে নিজ শহরে অবস্থান করে, মৃত্যু হলে সে শহিদের সমান সাওয়াব পাবে।
তৃতীয়ত, মুসলিমদের ওপর একটা বিশেষ দায়িত্ব ছিল। মানুষকে আল্লাহ জমিনে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের কাছে এভাবেই তিনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন, 'আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করব।' মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব আল্লাহর ক্যানভাস করা (যেভাবে রাষ্ট্রদূত তার দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন) এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর বিধানমাফিক দুনিয়া শাসন করা। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর পরিচয় ভুলে 'ভুল উপাস্য' বেছে নিয়েছে তারা তাদের দায়িত্ব জানে না, সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানে না। আর যারা আল্লাহকে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ে চিনেছে তারা হলাম আমরা-মুসলিম। সুতরাং, প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এককভাবে আমাদের। দায়িত্ব কী ছিল? আল্লাহর পথে দাওয়াহ এবং আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ। আল্লাহর বিধানের দিকে আহ্বান এবং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনকারীদের রোধ। যার স্তর তিনটি—
■ হাত দ্বারা। এটা না পারলে...
জবান দ্বারা (দাওয়াহ/সৎকাজে আদেশ অসৎকাজে নিষেধ)। তাও না পারলে...
অন্তর দ্বারা (বুগদ ফিল্লাহ বা আল্লাহর জন্য ঘৃণা রাখা)। নবিজি বলেছেন, এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। জোর করে বা মৌখিক বাধা দিচ্ছেন না, ওকে ফাইন। আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন যদি কমপক্ষে ঘৃণাও করতে না পারেন, তাহলে খুব সম্ভবত আল্লাহর খাতায় মুসলিম তালিকায় আপনার নাম নাও থাকতে পারে। এই 'আদি দায়িত্ব'-এ অবহেলার কারণে মুমিনদের প্রতিও আল্লাহর আযাব আসে।
আল্লাহ এক ফেরেশতাকে আদেশ করলেন, অমুক অমুক শহরকে তার অধিবাসীদের ওপর উল্টে দাও। ফেরেশতা সবিনয়ে আরজ করলেন, 'হে আল্লাহ, সেখানে তো আপনার অমুক বান্দা আছে, যে এক পলকের জন্যও আপনার অবাধ্য হয়নি।' আল্লাহ বললেন, 'তাকে-সহই পুরো জনপদ উল্টে দাও। কেননা তার চেহারা আমার তরে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন হয়নি। অর্থাৎ তার চারপাশে পাপ-জুলুমে সয়লাব, সমাজ অন্যায়-পাপাচারে পরিপূর্ণ, তবু সে আপন অবস্থায় ইবাদতে মগ্ন থেকেছে। সমাজে চলমান এতসব পাপ-অন্যায়-জুলুম দেখে তার মুখ মলিন হয়নি। তার ভ্রুও কুঞ্চিত হয়নি। তার অন্তরে খারাপও লাগেনি। ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের দায়িত্বও সে পালন করেনি।
আমাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের এই বার্তা, ইসলামের এই সুশাসনের আওতায় সকল মাজলুমকে নিয়ে আসা। যাতে মানবতার মুক্তি ঘটে। সব সামাজিক (দলিত, নিগ্রো, হিজড়া, হিন্দু, বিধবা, প্রথা, পেশাগত হীনম্মন্যতা) মাজলুম, সব অর্থনৈতিক মাজলুম, রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের মাজলুম, পুঁজিবাদের মাজলুম, ক্যারিয়ারিজমের মাজলুম সবার কাছে ইসলামের সমাধান পৌঁছে দেওয়া এবং ইসলামের সিস্টেমের ভেতর এনে এই নিগৃহীত মানবতাকে স্বস্তি দেওয়া ছিল আমাদের কাজ। বস্তুত জালিম জুলুমের মধ্য দিয়ে নিজের ওপরও জুলুম করে, যা থেকে তাকে বিরত রাখা আমাদের দায়িত্ব। জালিমকে জুলুম থেকে ফেরানো মানে খোদ তার ওপরও ইহসান বা দয়া করা। আমরা পুরো উম্মাহ একসাথে সেই 'আদি দায়িত্ব' ছেড়ে দিয়েছি।
গুনাহকে ঘৃণা করা তো দূর কি বাত। ঘৃণা করবার আগে সেটাকে গুনাহ তো মনে করতে হবে। গুনাহকে গুনাহ মনে করাই ছেড়ে দিয়েছি আমরা মুসলিমরা। আমরা অনেকেই মিউজিককে গুনাহ মনে করি না, অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিউজিক শুনলে কানে আঙুল দিয়ে সে জায়গা পার হতেন। বলেও গেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন দল বের হবে যারা ব্যভিচার-রেশম-মদ-বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। বলেছেন, আল্লাহ আমার উম্মতের ওপর মদ-জুয়া-বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন। অথচ বহু মুসলিমকে আপনি বোঝাতে পারবেন না। তারা একে ঘৃণা তো দূরের কথা, হারামই মনে করবে না। নিষেধ করাকে উগ্রতা মনে করবে। তার মানে নবিজি 'উগ্র' ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ। বহু মুসলিম ঘুষ-সুদকে 'ও-কিছু-না' মনে করে। বহু মুসলিমা পর্দা করাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে, মাহরাম ও নন-মাহরাম মেনে চলাকে বাড়াবাড়ি মনে করে। ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকানোকে গুনাহ মনে করে না, অথচ সুরা নুরে আল্লাহ নিজে এ থেকে বিরত থাকতে আদেশ করেছেন। বহু দ্বীনদার পর্দানশিন মুসলিমা গুনাহে লিপ্ত হবার প্রবল আশঙ্কা থাকাবস্থায় পুরুষের দিকে তাকানোকে তেমন কিছু গণ্য করে না, অথচ এ থেকে বিরত থাকা আল্লাহর আদেশ ছিল।
আল্লাহর শপথ, ইসলামের ইতিহাসে এমন সময় কোনোদিন আসেনি যে, এত বেশিসংখ্যক মুসলিম কুরআন-হাদিসে বর্ণিত স্পষ্ট অকাট্য সব হুকুমকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহর আদেশকে অদরকারি মনে করেছে। আল্লাহর আদেশকে ইনিয়ে-বিনিয়ে অজুহাত-সহ বা স্পষ্টভাবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমন ঔদ্ধত্য সামষ্টিকভাবে মুসলিমরা আগে কোনোদিন দেখায়নি। ক্যারিয়ার, আধুনিকতা, সামাজিকতা, মধ্যপন্থা ইত্যাদির অজুহাতে মহান আর-রাজ্জাক আল-মালিকের আদেশের প্রতি এতটা তাচ্ছিল্য আমরা আগে কখনো দেখাইনি। এমনকি এই লেখা পড়তে পড়তেও অনেক মুসলিম ভাইয়ের মনে নেগেটিভ অনুভূতি হচ্ছে। কী ভয়ংকর স্পর্ধা আমরা দেখাচ্ছি মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সাথে। সামনে আরো বিস্তারিত আসবে বিষয়গুলো। মোদ্দা কথা, সৎকাজের আদেশ আর অসৎকাজে নিষেধ করার 'আদি-কর্তব্য'তে অবহেলা আল্লাহর গযবের আরেকটি কারণ।
বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান-যা তোমরা পছন্দ করো, যদি (এসব কিছু) তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।
যদি ৮টা জিনিস বেশি প্রিয় হয় ৩টা জিনিসের চেয়ে, তাহলে অপেক্ষা করো আযাবের। আয়াতটি আমাদের মুসলিমদেরই উদ্দেশে। সমঝদারোঁ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়।
আযাব আসার যে কারণগুলো-ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের আদি দায়িত্বে অবহেলা সবই আমরা মুসলিমরা পূর্ণ করেছি। আর কাফিরদের জন্য হোক বা মুসলিমদের জন্য, আযাব যখন কোনো জনপদে আসে, সেটা ব্যাপকভাবে আসে। সবার জন্য আসে। কারো (কাফির) জন্য পাকড়াও, আর কারো (মুমিন) জন্য সতর্কবাণী। আশ্চর্য, আমরা আযাবকে আযাব বলতেই লজ্জা পাই, তাহলে সতর্ক হব কীভাবে? আর ছোট আযাবে যদি সতর্ক না হতে পারি তাহলে? 'বড় আযাবের আগে আমি তাদের ছোট আযাব আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ছোট আযাব টের পেতে ব্যর্থ হলে, আমার জন্য এর পরের আপ্যায়ন কেমন হবে? বড় আযাব। জাহান্নাম।
আফসোস, মুসলিম সন্তানের কাছে আজ জাহান্নামও মামুলি ব্যাপার। মুসলিম হয়ে যেহেতু জন্মেছি, সাজা খেটে একদিন তো জান্নাতে যাবই। আল্লাহর খাতায় আমি এখনো মুসলিম আছি, শিওর? শরিয়তের অকাট্য বিধান অস্বীকার করলে ঈমান থাকে না। আমল করতে পারছি না, সেটা ভিন্ন বিষয়। সেটা আমার ঈমানের দুর্বলতা। কিন্তু অস্বীকার করলে তো ঈমানটাই থাকবে না। দেখেন তো ভেবে, আল্লাহর কী কী হুকুম আমার পছন্দ হয় না। মনে হয়, কী দরকার ছিল এই বিধানের। কোনো কোনো বিধান শুনে মনে হয়- 'এ যুগে কী আর ওসব চলে' কিংবা 'এমন না হয়ে ওমন হলে ভালো হতো।' ওযুভঙ্গের কারণ যেমন আছে, ঈমানভঙ্গেরও কারণ আছে (শেষের দিকে আলোচনা আছে)। ক'জন জানি? আমার অজান্তেই ঈমান হারিয়ে বসে নেই তো আমি? ইয়া আল্লাহ, আমি জানতাম না, তাই অমন বলে ফেলেছি। 'না জানা'-কে আল্লাহ কাল-হাশরে কোনো ওজর হিসেবে গ্রহণ করবেন না। আমার কাছে আলিম ছিল, মসজিদে ইমাম ছিল, নেট ছিল, অসংখ্য ইসলামি বই ছিল, হাজারো পিডিএফ ছিল, দ্বীনি বন্ধু ছিল। আমার জানতে ইচ্ছে হয়নি, তাই জানিনি। জানার প্রয়োজন মনে করিনি, তাই জানিনি। জানাও ফরজ ছিল আমার ওপর। না জানাটা মানে আরেকটা ফরজ হুকুমের তোয়াক্কা না করা। সেদিন আর কাকে দোষ দেবো, যেদিন খোদ শয়তানও বলবে: 'খবরদার আমাকে দুষবে না, কেননা তোমাদের ওপর আমার কোনো আধিপত্য নেই। আমি কেবল রাস্তা দেখিয়েছি। গুনাহের রাস্তায় তুমি নিজেই হেঁটেছ।'
আল্লাহর এই গযব আমি তো মনে করি আমাদেরই উদ্দেশে। আমাদেরকে সতর্ক করতে। আমাদের পাপের ভারা পূর্ণ। আমাদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, স্পর্ধা আর কাফিরপ্রেম চূড়ায় পৌঁছে গেছে। ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছি আমরা।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ২১১৬; সহিহ মুসলিম: ২৮৮২, ২৮৮৩; সুনানু নাসায়ি: ২৮৭৯; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০৬৪, ৪০৬৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৬৭৫৫, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৩২১; মুসনাদু আহমাদ: ২৬৪৮৭, ২৬৭০২, ২৬৮৬০
২. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৩, ৬৯৭৪; সহিহ মুসলিম: ২২১৮; জামি তিরমিযি : ১০৬৫; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৭৪৮১; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ২৯৫২, ২৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৫১, ২১৭৬৩, ২১৮০৬, ২১৮১৮; মুসনাদুল হুমাইদি: ৫৫৪
৩. সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০
৪. যদি কোথাও গান-বাজনা-বাদ্য বাজতে থাকে তাহলে সামর্থ্য থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়া: এমনকি বাদ্যযন্ত্র ও ঢোল-তবলা ভেঙে ফেলাও 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা'-এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ কোথাও মদ্যপানের আসর বসলে সেখানে গিয়ে মদের পানপাত্র ভেঙে ফেলা কিংবা কোথাও কারো ধনসম্পদ জবরদখল হতে দেখলে তা উদ্ধার করে মূল মালিককে পৌঁছে দেওয়া এসবই 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা' এর অন্তর্ভুক্ত। চাই এসব প্রতিরোধ সে সরাসরি নিজেই করুক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে করাক, উভয় ক্ষেত্রেই সে হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এটা তখনই করা যাবে, যখন তা করার পরিপূর্ণ সামর্থ্য থাকবে এবং এতে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা এমন ফিতনা সৃষ্টি হবে না, যার কারণে সমাজে আরো অধিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে কিংবা মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন হয়। এমন আশঙ্কা থাকলে সেক্ষেত্রে শুধু মৌখিকভাবে বাধাদান করবে এবং ওয়াজ-নসিহত করবে। আর এটার সামর্থ্যও না থাকলে সেক্ষেত্রে অন্তরে অন্যায় কাজের প্রতি ঘৃণা রাখবে, যেটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। ইমাম নাওয়াওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-সহ আরো অনেক হাদিসবিশারদ এমনটাই বলেছেন। দেখুন-শারহু মুসলিম, নাওয়াওয়ি, খণ্ড : ২; পৃষ্ঠা : ২৫
সরাসরি হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করার বিষয়টি মুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, আবার কাফিরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন তারা মুসলিম সমাজে অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে। এক্ষেত্রে জিম্মি অমুসলিমরাও অন্তর্ভুক্ত। আর কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন পৃথিবী থেকে কুফর-শিরক মূলোৎপাটন করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালিমা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ময়দানে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হবে। বোঝা গেল, 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ' কেবল কাফিরদের ক্ষেত্রেই নয়; বরং কাফির-মুসলিম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শারয়ি সম্পাদক
১. সহিহ মুসলিম: ৪৯
২. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৭৬৬১; শুআবুল ঈমান : ৭৪৯৮৯; মুজামু ইবনিল আরাবি: ২০১৬-হাদিসটির সনদ যইফ
১. সহিহ বুখারি : ২৪৪৪, ৬৯৫২; জামি তিরমিযি: ২২৫৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৫১৬৭, ৫১৬৮; মুসনাদু আহমাদ: ১৩০৭৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ১১৫০৯, ১১৫১০, ২০১৭৭
২. মুসনাদু আহমাদ: ৪৫৩৫, ৪৯৬৫; সুনানু আবি দাউদ: ৪৯২৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯০১; শুআবুল ঈমান: ৪৭৬০; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ২০৯৯৭; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ১১৭৩, ৬৭৬৭-হাদিসটির সনদ সহিহ
৩. সহিহ বুখারি ৫৫৯০; সহিহু ইবনি হিব্বาน ৬৭৫৪; আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৩৪১৭; শুআবুল ঈমান: খন্ড ৭; পৃষ্ঠা :১১৮; মুসনাদুশ শামিয়িান: ৫৮৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ২০৯৮৮; আস-সুনানুস সগির, বাইহাকি ৩৩৫৩
৪. মুসনাদু আহমাদ ২৪৭৬, ৬৫৯১, ৬৫৯৯; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৯৬; সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৩৬৫; আল-আহাদিসুল মুখতারা ৫৭, ৬০; মুসনাদু আবি ইয়ালা ২৭২৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২০৯৯১-হাদিসটির সনদ সহিহ
১. (হে নবি) আপনি মুমিন পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩০]
২. আর (হে নবি,) আপনি মুমিন নারীদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩১]
৩. সুরা তাওবা, আয়াত : ২৪
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. যখন সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, 'আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের ওপর কোনো আধিপত্য ছিল না। আমি শুধু তোমাদের আহ্বান করেছিলাম আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমায় দোষারোপ কোরো না, তোমরা বরং তোমাদের নিজেদেরই দোষারোপ করো। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা যে আমাকে (আল্লাহর সাথে) শরিক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করছি। আর জালিমদের জন্য তো আছে ভয়াবহ শাস্তি। সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২২]
📄 আযাব, না ভাইরাস?
আল্লাহর গযব বা আযাব প্রাথমিকভাবে সতর্ক করার জন্য আসে। কী কী দিয়ে দুনিয়াতে আযাব দেওয়া হয়। আযাবের জন্য আল্লাহ কী কী ব্যবহার করেন?
■ আদ জাতিকে প্রবল ঝড় দিয়ে। আজকের যুগে একে 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে উচ্চচাপের এলাকা থেকে নিম্নচাপের এলাকায় বায়ু প্রবাহিত হয়ে ঝড় হয়। এটুকু বিজ্ঞান আপনাকে বলবে। বস্তুজগতের বাইরে কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারে না। কোনো পিয়ার রিভিউ জার্নাল কখনোই বলবে না, 'আমরা এর কারণ খুঁজে পেতে ব্যর্থ, অতএব এটা একটা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা।' বরং প্রতিটি ঘটনার কোনো না কোনো বস্তুগত ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে চেষ্টা করে। কারণ এটাই তার কাজ। 'প্রকৃতিবাদ'কে নিজের চালকের আসনে বসিয়ে বিজ্ঞান অতিপ্রাকৃত কিছুকে কীভাবে মেনে নিতে পারে? বিজ্ঞান নামক tool-টার সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। প্রকৃতিবাদের নামে বিজ্ঞানবাদ স্রষ্টাকেই 'অপ্রয়োজনীয়' বলে বাতিল করে, তখন ইসলামের সাথে ১৮০ ডিগ্রি বিরোধ।
ইসলামের দর্শন হলো, আল্লাহ সৃষ্টিজগতে কারণ (cause) ও ঘটনা (effect)-কে ওতপ্রোতভাবে রেখেছেন। 'কারণ'-এর পর্দা না থাকলে সবাই আল্লাহর কুদরত (শক্তি-রহস্য) জেনে ঈমান এনে ফেলত। তখন দুনিয়া যে 'পরীক্ষাগার', সেই বিষয়টা আর থাকত না। সবাই অটোপাশ হয়ে যেত। বাহ্যদর্শী মানুষ (সেক্যুলার-বিজ্ঞানাখ) আটকে যায় শুধু 'কারণ'-এর বেড়াজালে। 'ঘটনা'র পেছনে 'কারণ' কেই দায়ী মনে করতে থাকে। ফলে 'কারণ'-এর আড়ালে যে আসল শক্তি (আল্লাহ) কারণ ও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তার দিকে তার দৃষ্টি যায় না। 'পশ্চিমা বিজ্ঞান' এই কারণ পর্যন্ত যায় এবং কারণের পরে আর যাবে না, সেই সংকল্প করেই সে রাস্তায় নামে। 'পশ্চিমা বিজ্ঞান' কেন বললাম, কারণ বিজ্ঞান একসময় মুসলিমদের tool ছিল। কুরআন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঈমানের ইন্দ্রিয় সাথে নিয়ে তারা বিজ্ঞানচর্চা করত। 'কারণ' তো বের করতেনই, কারণের পেছনে 'আল্লাহর শক্তি' কেও তারা বুঝতে পারতেন। আমার কাঠগড়া বইটাতে বিস্তারিত পাবেন। ফলে বিজ্ঞানকে কে চালাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে 'ফল কী পাচ্ছেন' -আল্লাহর পরিচয়? নাকি আল্লাহকে অস্বীকার?
■ সামুদ জাতিকে ফেরেশতার প্রচণ্ড আওয়াজের দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে। এখানেও কোনো বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব। কোনো ম্যাগনেটিক ইভেন্ট বা কসমিক ইভেন্ট বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
■ ফিরআউনের কিবতি সম্প্রদায়কে কয়েকটা আযাব দেওয়া হয়েছিল পরপর, যাতে তারা ফিরে আসে। প্রথমে দেওয়া হলো অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ।
তারপর আমি পাকড়াও করেছি-ফিরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। অতঃপর যখন কল্যাণ হতো, তখন তারা বলতে আরম্ভ করত যে, এটাই আমাদের প্রাপ্য
অর্থাৎ ছোট যে সতর্কীকরণ আযাব আসে তা এজন্য আসে না যে, সবাইকে শেষ করে না দেওয়া অব্দি চলবে; বরং সেটা এসে আবার চলে যায়। শুভদিন ফিরে আসে। এই করোনাও একদিন চলে যাবে ইনশাআল্লাহ। শুধু পার্থক্য হবে: কেউ একে আল্লাহর আযাব জেনে জীবনযাপনে সংযত হবে। ফিরে আসবে আল্লাহর দিকে। আর কেউ বলবে : 'করোনা চলে গেছে, এটাই তো আমাদের প্রাপ্য ছিল। কারণ আমাদের জ্ঞানবিজ্ঞান যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে করোনাকে আমরা পরাজিত করব, এটাই স্বাভাবিক।' দেখবেন, আজকেও অনেক মুসলিম এটাই বলবে যা ফিরআউনের সম্প্রদায় বলেছিল। তাদের আদর্শিক অনুসারীরা বলবে, 'এটাই তো হবার কথা যে আমরা নিজেরা এর মোকাবেলা করলাম, আর এমনটাই হওয়ার ছিল, 'মনে রেখো বিজ্ঞান লড়েছিল একা' - এই স্পর্ধার কারণে আযাবকে চিনতে ব্যর্থ হলো তারা। এরপর...
সুতরাং, আমি তাদের ওপর পাঠিয়ে দিলাম প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্তের আযাব, বিস্তারিত নিদর্শন হিসেবে। কিন্তু তারা ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল। বস্তুত তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।
আপনি চাইলে এই সবগুলোরই জাগতিক ব্যাখ্যা দিয়ে আল্লাহ, তাঁর সতর্কীকরণ সবকিছুকে বাইপাস করতে পারবেন। ফিরআউনের জাতি এগুলোকে মুসা আলাইহিস সালামের জাদু-ভেলকিবাজি বলে বাইপাস করেছিল। আপনি বিজ্ঞানের যুগে প্রাকৃতিক ঘটনা, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টেকটোনিক প্লেট নড়ে গেছে বলে সুনামি হয়ে গিয়েছিল, মাটিতে আয়রন বেশি হয়েছিল বলে পানি রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছিল-ইত্যাদি বলে অস্বীকার করবেন। এই যা। পরপর সতর্কবার্তা বুঝতে ব্যর্থ হওয়া, বারবার আল্লাহকে অস্বীকার করা, মুসলিমদের ওপর অত্যাচার অব্যাহত রাখা, ফিরআউনের নিজেকে 'আল্লাহ' বলে দাবি করা এবং তার সম্প্রদায়ের মেনে নেওয়া। এরপর ফাইনাল পাকড়াও এলো। তাহলে যেহেতু পিয়ার রিভিউড রিসার্চ জার্নাল করোনাকে অতিপ্রাকৃত কিছু বলছে না, তাহলে আমরাও অপেক্ষা করি ফাইনাল খেলার জন্য। নাকি?
হয়তো এটুকু বুঝতে পারলাম, সকল আসমানি বা জমিনি আযাব কিংবা আল্লাহর ক্রোধ 'বস্তু' দিয়েই দেওয়া হয়। ফলে চাইলেই এর বস্তুগত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, 'কারণ' অব্দি গিয়ে আটকে থাকা যায়। যা বিজ্ঞান করে থাকে। কিন্তু বস্তুগত পর্দার আড়ালে বা বস্তুগত কারণের আড়ালে এর মূল উৎস যে আল্লাহর শক্তি এবং মূল কারণ যে আমাদের আমল, সেটা কেবল গায়েবে বিশ্বাসীর ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ার কথা, যদি সেটা থাকে আর কি।
জলে-স্থলে যে বিপর্যয়, তা মানুষের দুহাতের কামাই...
কোনো পিয়ার রিভিউয়ে ঈমানদার এটা বুঝবে না। এখন আমি কোন ঈমানদার এটা আমাকে স্পষ্ট অবস্থানে যেতে হবে। ঈমান আর কুফরের মাঝে আর কোনো অবস্থান নেই। হয় আপনাকে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর সত্যবাদিতার ওপর ঈমান আনতে হবে-পূর্ণ আত্মসমর্পণ। নয়তো পিয়ার রিভিউয়ের কাছে কুরআন-হাদিস-ঈমানকে সেকেন্ডারি রাখতে হবে।
১৪০০ বছর আগের শ্রেষ্ঠ বংশে জন্ম নেওয়া একজন মানুষ, যে তার নবুওয়াতপূর্ব ৪০ বছরের কখনো মিথ্যা বলেছেন এমন রেকর্ড নেই, রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াসের সামনে তৎকালীন শত্রু আবু সুফইয়ান তার নামে মিথ্যাবাদিতার অভিযোগ করতে পারেনি বাকিদের সামনে নিজে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবার ভয়ে। মিথ্যা যে যে কারণে আমরা বলে থাকি, তার সবগুলো তাকে অফার করা হয়েছিল শুরুতেই। কুরাইশরা উতবা ইবনু রবিআকে পাঠাল নবিজির দাওয়াতি কার্যক্রম বন্ধ করার একটা চেষ্টা করতে। উতবার প্রস্তাব ছিল-
হে পুরুষ! তোমার যদি আর্থিক চাহিদা থাকে তাহলে বলো। আমাদের সকলের সম্পদ থেকে অংশবিশেষ জমা করে তোমাকে দেবো। তাতে তুমি বনে যাবে কুরাইশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। (সম্পদ)
যদি বিয়ের প্রয়োজন বোধ করেন, বলেন। কুরাইশ নারীদের মাঝে যাকে ইচ্ছা বেছে নেন। আমরা আপনার কাছে ১০ জনাকে বিয়ে দেবো। (নারী)
যদি রাজত্ব চান বলুন, আপনাকে বাদশাহ বানিয়ে দেবো। (ক্ষমতা)
আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় সম্মান-গৌরব হাসিল করা, তবে আমরা আপনাকে সসম্মানে আমাদের সরদার বানিয়ে দেবো, আপনার কথার বাইরে আমরা কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব না। (সম্মান)
আর আপনার মনে যদি নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে আমরা আমাদের সকল গোত্রের ঝান্ডা আপনার সামনে গেড়ে দেব। এরপর আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আপনিই হবেন আমাদের নেতা। (নিরঙ্কুশ আমৃত্যু নেতৃত্ব)
আমরা তো সাধারণত অর্থ-সম্মান-নারী-ক্ষমতার জন্যই মিথ্যা বলি। কিন্তু দেখুন, সকল প্রলোভন আর হুমকির মুখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব ছিল একটাই-
তোমরা কী বলছ তা আমি জানি না। আমি তোমাদের কাছে যে ঐশী বার্তা নিয়ে এসেছি তা তোমাদের সম্পদের লোভে নয়, তোমাদের নেতৃত্ব সম্মানলাভের উদ্দেশে নয় এবং তোমাদের ওপর রাজত্ব করার খায়েশেও নয়। বস্তুত আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, আমার ওপর তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ করেছেন, যেন আমি তোমাদের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হই। সুতরাং, আমি আমার রবের বার্তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছি। অতএব যদি তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দাও তাহলে সেটা তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য। আর যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান করো তাহলে আমি আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করব; যতক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।
আপনারা যদি সূর্যের আগুন দিয়ে একটা মশাল জ্বালিয়ে এনে দেন, তাতেও আমি আমার কার্যক্রম ছাড়তে পারব না। আমাকে যে কাজ দিয়ে পাঠানো হয়েছে, তা ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব
কুরাইশদের অব্যাহত হুমকির মুখে চাচা আবু তালিব যখন বাধ্য হয়ে ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার দাওয়াতি কাজ বন্ধ করার কথা বললেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তার চাচাকে জবাব দিয়েছিলেন :
'চাচাজান, আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তবু আমি এ কাজ (তাওহিদের দাওয়াহ) ছেড়ে দিতে পারব না; যতক্ষণ না আল্লাহ এ দ্বীনকে বিজয়ী করেন কিংবা এতে আমার মৃত্যু হয়ে যায়।'
অথচ তিনি তখন অভাবী, সংসার করছেন ৫৫ বছর বয়েসী এক নারীর সাথে। যদি মিথ্যাবাদীই হন, কুরাইশদের দেওয়া সেসব লোভনীয় অফার কেন ছাড়লেন? কী তার সেই বাধ্যবাধকতা?
যাদের চোখের সামনে তিনি চন্দ্রকলার মতো বড় হয়েছেন ৪০টা বছর যারা তার কাছে সম্পদ গচ্ছিত রেখেছে, আল-আমিন (বিশ্বস্ত) নামে ডেকেছে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আস্থা রেখেছে। সেই লোকগুলোকেই যখন আহ্বান করলেন : তোমাদের 'মনচাহি' জীবন থেকে ফিরে এসো দ্বীন ইসলামের দিকে। মিথ্যা উপাস্য থেকে ফিরে এসো সত্য মাবুদ আল্লাহর দিকে। তখন এতকালের সত্যবাদিতার সাক্ষী সেই লোকগুলোই তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে দিলো, যদিও তারা জানত তাদের সাথে কাটানো ৪০টা বছর আল-আমিন কখনো মিথ্যা বলেননি। তারা জানত তাঁর কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যও নেই। তারপরও তারা তাঁকে অস্বীকার করল কী কারণে?
মিলিয়ে দেখি তো। আমরাও কি সেই একই কারণে তাঁর আনীত দ্বীনকে নিজের জীবনে আনতে চাচ্ছি না? তাঁর আনীত শরিয়তের কাছে নিজের খেয়ালখুশিকে সমর্পণ করতে অনিচ্ছুক কি আমরাও সেই একই কারণে? ১৪০০ বছর পরেও কারণগুলো সেই একই। বংশগৌরব, লাইফস্টাইল, নেতৃত্ব, জীবিকা, খাহেশাত...
টিকাঃ
১. 'তারপর আমি পাকড়াও করেছি-ফিরআউনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। যখন তাদের কোনো কল্যাণ হতো, তারা বলত, 'এটাই তো আমাদের প্রাপ্য।' আর যখন তাদের কোনো অকল্যাণ হতো, তখন তারা মুসা ও তার সঙ্গীদেরকে অলক্ষুণে মনে করত। সাবধান! তাদের অকল্যাণ তো কেবল আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণাধীন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। সুরা আরাফ, আয়াত: ১৩০-১৩১
১. সুরা আরাফ, আয়াত : ১৩৩
২. সুরা রুম, আয়াত : ৪১
১. মুসনাদু আবি ইয়ালা: ১৮১৮; মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা: ৩৬৫৬০; দালায়িলুন নবুওয়াহ, বাইহাকি : খণ্ড: ২ পৃষ্ঠা: ২০২; দালায়িলুন নবুওয়াহ, আবু নুআইম: ১৮২। -হাদিসটির সনদ হাসান
২. প্রাগুক্ত
৩. সিরাত ইবনি হিশাম খন্ড ১, পৃষ্ঠা: ২৯৩; সিরাত ইবনি ইসহাক: খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯৭; আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ইবন কাসির খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭৯; আর-রাহিকুল মাখতুম খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৯৪
৪. প্রাগুক্ত
১. দালায়িলুন নুবুওয়াহ, বাইহাকি : খণ্ড: ২পৃষ্ঠা: ২০২। -হাদিসটির সনদ হাসান
২. সিরাতু ইবনি ইসহাক: খণ্ড: ১পৃষ্ঠা: ১৯৮
৩. মুসনাদু আবি ইয়ালা, তাবারানি আওসাত ও তাবারানি কাবিরে বিশুদ্ধ সনদে। সিরাতন নবি সা., শাইখ ইবরাহিম আলি, মাকতাবাতুল বায়ান
১. তাফসির ইবনি কাসির, খন্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৪৮, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের বর্ণনা। সিরাত ইবনি হিশাম : খন্ড, ১; পৃষ্ঠা, ২৬৬
📄 গযবের সাথে যুদ্ধ
এই করোনা আল্লাহর গযব এবং 'আল-আযাবুল আদনা' (ছোট আযাব)। আল্লাহর সমস্ত গযবই বস্তু দিয়ে হয়, যার ফলে সবকিছুরই বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হয়। কোনো কিছুর বস্তুবাদী ব্যাখ্যা জানি বলে তা আল্লাহর আযাব নয়, এই ধারণা ঠিক নয়। করোনা তো একটা জীবাণু, একটা ভাইরাস। এটা আল্লাহর আযাব হবে কেন? এটা অজ্ঞতাপ্রসূত প্রশ্ন। আল্লাহ তাঁর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যেকোনো কিছুকেই ব্যবহার করতে পারেন। মশা, পঙ্গপাল, উকুন, দাবানল, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প যেকোনো কিছু। যেমন এক হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
যে জাতির মাঝে (ব্যাপকভাবে) অশ্লীলতা-কুকর্ম দেখা যাবে এবং তা প্রকাশ্যেই করা হবে, সে জাতির মাঝে মহামারি ও এমন সব রোগ-ব্যাধির আবির্ভাব ঘটবে, যা পূর্বের জাতিসমূহের মাঝে কখনো দেখা যায়নি। রোগ আপতিত করবেন, যা তোমাদের পূর্বে হতো না
অর্থাৎ এই যে নতুন নতুন রোগ, এগুলো আমাদের কৃতকর্মের দরুন আল্লাহর ক্রোধের প্রকাশ। আমরা আরো দেখলাম, আল্লাহর গযব একটা ব্যাপক বিষয়। তাঁর রহমত যেমন একটা ব্যাপক বিষয়। আল্লাহকে যে গালি দেয়, তাকেও আল্লাহ একটা নির্দিষ্ট সময় অব্দি অবকাশ দেন। তাকেও রিজিক দেন, প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা আটকে দেন না, সন্তান দেন। তেমনি তাঁর গযবও ব্যাপক। যে এলাকায় আসে সে এলাকায় কাফির-মুমিন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আযাবে গ্রেপ্তার হয়। এই কমন আযাবটাই কাফিরের জন্য 'ফাইনাল ধরা' হয়, মুমিনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে যায়। মহামারিতে দুজন মরল, কাফিরের জাহান্নামের জীবন শুরু হলো। ধৈর্যধারণকারী ও সাওয়াবপ্রত্যাশী মুমিনের শহিদের মর্যাদা শুরু হলো। দুনিয়ার আযাবটা মুমিনের জন্য আখিরাতের পুরস্কার হয়ে ধরা দিলো।
» আর জীবিত উদাসীন মুমিনদের জন্য ওয়ার্নিং। এ ওয়ার্নিংয়ের পর কেউ কেউ শুদ্ধ হয়ে গেল।
» আর কেউ কেউ গুনাহে হঠকারিতা করতেই থাকল। ক্রমাগত গুনাহ করতে থাকা বা গুনাহের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যাওয়া এই মুমিনটির ঈমান চলে যাওয়ার কারণ হবে। যেমন: 'সালাত হলো ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্যসৃষ্টিকারী' - এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ইচ্ছাকৃত সালত ছেড়ে দেয় সে কাফির। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ ও ইসহাক ইবনু রাহওয়াই রাহিমাহুমাল্লাহও একই মত পোষণ করেছেন। আর অধিকাংশ আলিম বলেন, বেনামাযি নগদে কাফির হবে না, তবে তার ক্রমাগত সালাত ত্যাগ তাকে কুফুরির দিকে ধাবিত করবে।
ভ্যাকসিন বা ওষুধ তৈরি হলো, করোনা চলে গেল; তবু এটা প্রমাণ হয় না যে, এটা আযাব নয়। কারণ-
“ ...কতক জাতিকে এর দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাকি রয়ে গেছে, তাই কখনো তা আসে, কখনো চলে যায়। তবে মুমিনদের জন্য আল্লাহ একে রহমত বানিয়েছেন...
হাদিস বলছে: মহামারি আসবে এবং চলেও যাবে। গযব যেমন আসে বস্তুগত মাধ্যম দিয়ে। গযব চলেও যেতে পারে বস্তুগত মাধ্যম দিয়ে (ভ্যাকসিন/ওষুধ)। মাধ্যমের পর্দার আড়ালে আল্লাহর একচ্ছত্র রাজত্ব ও ক্ষমতার প্রকাশ বিশ্বাসীর বিশ্বাসের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়ে। গাছপালা, আকাশ, ফুল, বৃষ্টি সবকিছুর অন্তরালে সে মহাশিল্পীর নিপুণ কারিগরি দেখে, ফিজিক্সের সূত্রের খটমটে ধ্রুবকগুলোর মাঝে মহাপরিকল্পনা-প্রসূত হিসেবি টিউনিং অনুভব করে। জীবকোষের ভেতর এই মুহূর্তে হাজারো বিক্রিয়া একই সাথে আনইন্টেরাপ্টেড চলতে দেখে সে এক মহানিয়ন্ত্রকের অমোঘ নিয়মকে উপলব্ধি করে। করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পেছনে বিশ্বাসী দেখে করুণাময়ের করুণা, নগণ্য মানুষকে দেওয়া যোগ্যতার জন্য সে মহান দাতার বদান্যতার শোকর করে। আর বস্তুবাদী কেবল বস্তুর উপাসনা করে। বস্তুর সাফল্যে অহংকারী হয়ে ওঠে। বস্তুর ব্যর্থতায় আশাহত হয়। অন্ধ সূর্য দেখে না, তাই বলে কি সূর্য নেই?
আমরা প্রত্যেকে মৃত্যুকালে শয়তানের চূড়ান্ত প্রচেষ্টার সম্মুখীন হব, ফিতনাতুল মামাত (মৃত্যুকালীন পরীক্ষা)। শয়তান তার সর্বশক্তি দিয়ে শেষ চেষ্টা করবে ঈমানহরণের। যে জীবিতকালে শয়তানের সামান্য ইন্ধনেই কাত হতো, সে শয়তানের সর্বশক্তি নিয়োগে ঈমান ছেড়ে দেবে। হয়তো সে মারা গেল, দাফন হলো, জানাযা হলো, কুরআন খতম হলো। কিন্তু সে কাফির হয়ে মরেছে। মৃত্যুর মুহূর্তে সে ঈমান ত্যাগ করে মরেছে। সুতরাং, 'মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া'টা আপনাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দেয় না। বরং 'ঈমান নিয়ে মৃত্যু' আপনাকে জান্নাতে পৌঁছাবে। আর ঈমান নিয়ে মৃত্যু তখনই গ্যারান্টেড যখন আপনি পুরোটা জীবন ঈমানের ওপর চলে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরি করবেন, তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসবেন আল্লাহর দিকে। আল্লাহ বলছেন—
নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের রব (প্রতিপালক+অধিকারী Master) আল্লাহ। অতঃপর (এই কথার ওপরেই) অবিচল থাকে। তাদের কাছে (মৃত্যুকালে) নাযিল হয় ফেরেশতা। (এবং বলে) ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না। সেই জান্নাতের সুসংবাদ নাও, যার ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল
মৃত্যুকালে আল্লাহ ফেরেশতা পাঠিয়ে আপনার ঈমান নিশ্চিত করে, আপনাকে কমফোর্ট করে জান্নাত নিশ্চিত করবেন। শর্ত হলো আল্লাহকে তাঁর অধিকার দিতে হবে, রব হিসেবে, আপনার মালিক হিসেবে, আপনার পালনকর্তা হিসেবে তাঁর যে স্থান আপনার জীবনযাত্রায় তাঁর প্রাপ্য, সেটা তাঁকে দিতে হবে এবং মৃত্যু তক সেই জীবনের ওপর আপনাকে অটল থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এটা আপনারই কাজ। নয়তো আল্লাহর নিজস্ব কোনো ঠেকা নেই, মুসলিম পরিবারে জন্ম বলে আমাকে জান্নাত দিতেই হবে।
তো, করোনা আল্লাহর ক্রোধের প্রকাশ। আপনার ঈমানের এন্টেনায় এটুকু ধরা পড়তে হবে। না হলে প্রবলেম। প্রশ্ন আসতে পারে : তাহলে আল্লাহর গযব ঠেকানোর জন্য এই যে মাস্ক-পিপিই-ভ্যাকসিন এগুলো তো বেয়াদবি হচ্ছে, আল্লাহর রাগকে কাউন্টার দেওয়া কি ঠিক? দেখুন—
» গযব এসেছে রোগের সুরতে
» নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা-আরোগ্য সৃষ্টি করেননি। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে মুসলিম সভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞান সাধন করেছিল অভূতপূর্ব উন্নতি। বিভিন্ন সভ্যতার গ্রন্থানুবাদ—বিশ্লেষণ, নতুন ওষুধ সন্ধান, ডোজিং, ফার্মাকোলজি ডেভলপ করেছিল, যার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ইউরোপীয় মেডিসিন গড়ে উঠেছে। সার্জারি যন্ত্রপাতি ডেভলপ, সার্জারি প্রক্রিয়া গঠন হয়েছিল যার অনেক কিছু আজও আমরা ব্যবহার করি। সুতরাং, রোগ নিয়ে গবেষণা, এটাও ইসলামের বিধান থেকে উৎসারিত ও উৎসাহিত।
» হাদিসের হুকুম হলো—মহামারি গযব। মহামারির সময় যথোচিত বস্তুগত ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। নিজেকে দূরে রাখো, ওই স্থানে যেয়ো না, সেখান থেকে বের হয়ো না। সুস্থ উটের সাথে অসুস্থ উট মিশিয়ো না। পবিত্রতা মেইনটেইন করো (তাহারাত)। ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা করো।
সুতরাং, বস্তুবাদ বলছে, মহামারি বস্তুগত কারণে হলো (ভাইরাস ইত্যাদি), বস্তু দিয়ে সমাধান করো (ভ্যাকসিন ইত্যাদি)। আর ইসলাম বলছে, বস্তুগত মাধ্যমের (ভাইরাস) আড়ালে আসল উৎস আল্লাহর ক্রোধ (তোমাদের গুনাহের কারণে), ফলে আসল উৎস সামলাও (তাওবা-আমল দ্বারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো) এবং মাধ্যম সামলাও (ওষুধ, হাইজিন ইত্যাদি)। ইসলাম হলিস্টিক সিস্টেম—টোটাল (ইহজগত+পরজগত), উট বেঁধে তাওয়াক্কুল। শুধু বিশ্বাসে ভর করে হাত গুটিয়ে থাকা নয়, আবার বিশ্বাসহীন বস্তুগত গোঁড়ামিও নয়। এটাই ইসলাম আর অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য।
টিকাঃ
১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০১৯; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৬২৩; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৪৬৭১; শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৩০৪২, ৩০৪৩; ১০০৬৬; মুসনাদুশ শামিয়্যিন: ১৫৫৮; আশা-উকুবাত, ইবনু আবিদ দুনইয়া: : ১১; হিলইয়াতুল আউলিয়া: খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৩৩- হাদিসটি হাসান
১. শারহু মুসলিম, নাওয়াওয়ি খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৯৪
২. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৩, ৬৯৭৪; সহিহ মুসলিম: ২২১৮; জামি তিরমিযি: ১০৬৫; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৭৪৮১; সহিহ ইবনি হিব্বาน: ২৯৫২, ২৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৫১, ২১৭৬৩, ২১৮০৬, ২১৮১৮; মুসনাদুল হুমাইদি: ৫৫৪
৩. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৪, ৫৭৩৪, ৬৬১৯; মুসনাদু আহমাদ: ২৪৩৫৮, ২৫২১২, ২৬১৩৯; মুসনাদু ইসহাক ইবনি রাহওয়াই: ১৩৫৩, ১৭৬১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ৬৫৬০; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি: ৭৪৮৫
১. সুরা ফুসসিলাত (হা-মীম-সাজদাহ), আয়াত: ৩০
১. সহিহ বুখারি: ৫৭৭৮; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৪৩৯; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৭৫১৩; মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২৩৪১৬; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ১৯৫৫৭