📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 চিনলি না রে পাগলা

📄 চিনলি না রে পাগলা


এক প্রবাসী নাস্তিক নারী این কদিন আগে স্ট্যাটাস দিয়েছিল—আল্লাহতে বিশ্বাস না করলেও ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এ তিনি বিশ্বাস করেন। হ্যাঁ, নতুন কিছু না। প্রকৃতিপূজা, মাদার নেচার, প্রেতাত্মাপূজা, ভূত, এলিয়েন ইত্যাদি অদৃশ্য কাল্পনিক সব সত্তাই ওনারা বিশ্বাস করেন। শুধু স্রষ্টা ছাড়া। কারণ স্রষ্টা যে কিছু নিয়ম-কানুন বেঁধে দেন। প্রকৃতি-প্রেত-এলিয়েনদের মানলে আত্মপূজায় বাদ সাধে না। স্রষ্টা আবার যে ধর্মেই মানেন, কিছুটা কৃচ্ছতা, কিছুটা আত্মসংযম, কিছুটা নৈতিকতা আরোপ করেন যে। ওখানেই সমস্যা। সে যাকগে, আমার আলোচনা মুসলিমদের উদ্দেশ্যে যেহেতু, ওদিক পানে আজ গেলাম না।

ফেসবুকে ঢুকে সাধারণত করোনা আপডেট নিই। নতুন কোনো রিসার্চ এলো কি না। কে কী বলল, কর্তৃপক্ষ কী বলল, ডাক্তারদের গ্রুপে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে। পুরো টকশো দেখি না, নেট কিনে কিনে চালাচ্ছি তো, টকশোর ছোট ক্লিপ সামনে পেলে দেখি। কোনোখানে কেউ ভুলেও উচ্চারণ করছে না—এটা আল্লাহর গযব। সেক্যুলারিজমের পবিত্রতা নষ্ট হয়। নেহায়েত ধার্মিক কেউ খুব সাবধানে ধর্মনিরপেক্ষ কিছু শব্দ ব্যবহার করছেন : সৃষ্টিকর্তা, প্রার্থনা, পরম করুণাময়, কৃপা। যাতে ধর্মনিরপেক্ষতার মাবুদেরা (অমুসলিমদের সন্তুষ্টি, গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা) নারাজ না হয়। তাও মানলাম, কিন্তু মুসলিমরা যে ‘আল্লাহর গযব’ কী-কেমন-কেন তা সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না, এটা দুঃখজনক। যারা রাখে তারাও মুখ ফুটে স্বীকার করছে না সেক্যুলারিতা অপবিত্র হবে বলে। বস্তুবাদী পাশ্চাত্য মনোবৃত্তি আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে এতটাই। আল্লাহর ক্রোধ যদি আপনি টেরই না পান, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করণীয় তা বুঝবেন কীভাবে। কী আশ্চর্য অবস্থা আমাদের ঈমানের? একজন নাস্তিক ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এ যতটুকু ঈমান রাখে, আমার কি ‘আল্লাহর গযব’-এ অতটুকু ঈমানও নেই?

অথচ একজন মুসলিম (আত্মসমর্পিত) হিসেবে আল্লাহর গযব চেনার কথা ছিল আমাদের। চিনতে পারাটা ছিল ঈমানের একটা আলামত।

وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ

আর যখন তারা রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়গুলো শ্রবণ করে, তখন আপনি দেখতে পাবেন, তাদের চক্ষু অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে; কারণ, তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা বলে, হে আমাদের রব, আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদের (সত্যের) সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

কথা ছিল, এই মহামারির ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের রবকে চিনে নেব, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হব। তাহলে কি পবিত্র রাসুলের কথার বিপরীতে পশ্চিমের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাকেই (বিজ্ঞান) আমরা দ্বীন হিসেবে নিলাম? মহামারি থেকে বাঁচার জন্য পশ্চিমের বস্তুবাদী রিসার্চের অপেক্ষাতেই আমরা থাকব, সেগুলোর কথাই আলোচনা করব, সেগুলোর মধ্যেই মুক্তি খুঁজব। তাহলে আমার ঈমান কোনটা? সেই ঈমানের চোখে কী দেখার কথা ছিল? মহামারি থেকে মুক্তির জন্য কী করার কথা ছিল?

এখানে খুব সূক্ষ্ম একটা ডিমার্কেশন আছে। বর্তমান ‘আধুনিক’ বস্তুবাদী বিশ্বে এই সীমাটা প্রত্যেক মুসলিমের বোঝা দরকার। বিজ্ঞান একটা টুল (tool)। এই টুলটা এখন ব্যবহার করছে পুঁজিবাদী বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতা। একটা সময় আকরিক (ore) থেকে এই টুলটা ইসলাম বানিয়েছিল, শান দিয়েছে, ধারালো করেছে। সেটা দিয়ে সবজি কেটেছে, গোশত কেটেছে। নিজে খেয়েছে, অন্যকে খাইয়েছে। আজ সেই টুলটা পশ্চিমা সভ্যতা নিয়েছে। সেটা দিয়ে ইসলামকে কাটছে, মুসলিমদের কাটছে, তৃতীয় বিশ্বকে কাটছে, পুঁজিবাদের জিভ দিয়ে রক্ত চুষে ফুলছে ফাঁপছে। যখন ইসলাম টুলটা ইউজ করেছিল, পরতে পরতে স্রষ্টাকে চিনেছে। আর ইউরোপ যখন ইউজ করছে, তখন স্রষ্টাকে অস্বীকার করছে। তাই টুলটার সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। বিরোধ হলো—টুলটা যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, ওইভাবে ব্যবহার করে ‘যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে’—তার সাথে।

पश्चिमा সভ্যতা বিজ্ঞানের ঘোড়ার ওপর সওয়ার। আর বিজ্ঞানের ঘোড়াটার চোখে পরানো ঠুলি (blinders), ঠুলির নাম ‘প্রকৃতিবাদ’। জগতের প্রতিটি ঘটনাকে জাগতিক ব্যাখ্যা করা। বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা করা। যেমন ধরেন, মন কী? বিজ্ঞানের চোখে মন জাস্ট কিছু কেমিক্যাল ক্রিয়াবিক্রিয়া। কারণ ওটুকুই বিজ্ঞান মাপতে পারে।

যা মাপা যায় না, সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান যতটুকু পারে বস্তুগত সম্ভাবনার কথা বলবে, নয়তো চুপ হয়ে যাবে। এজন্য আত্মা, স্রষ্টা এসব বিষয়ে বিজ্ঞানের চুপ থাকার কথা। কিন্তু বাড়াবাড়িটা যে করে তার নাম ‘বিজ্ঞানবাদ’ (scientism)। বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদের মধ্যে পার্থক্য কী তাহলে?

টিকাঃ
১. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮৩

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 বিজ্ঞানবাদ

📄 বিজ্ঞানবাদ


বিজ্ঞানের কাছেই সবকিছুর জবাব। বিজ্ঞান সবকিছু আমাদের জানিয়ে দেবে। সব সমাধান করে দেবে। যা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না তার অস্তিত্বই নেই। যার জবাব বিজ্ঞানের কাছে নেই, তা কুসংস্কার। এই অগাধ অতিবিশ্বাসকে বলে বিজ্ঞানবাদ।

বিজ্ঞান একটা টুল, আর বিজ্ঞানবাদ একটা ধর্মবিশ্বাস : বিজ্ঞান পারবেই। বিজ্ঞান যেখানে চুপ, বিজ্ঞানবাদ সেখানেও সরব। যেমন পীর চুপ, কিন্তু মুরিদ লাফায়, সেরকম। যার বস্তুগত ব্যাখ্যা করা যায় না, সেখানে বিজ্ঞান বলছে, এটা আমার ফিল্ড নয়। আর বিজ্ঞানবাদ বলছে, বিজ্ঞানের নীরবতা মানে ওটা আসলে নেই-ই, ওটা কুসংস্কার। এই জায়গাটা মুসলিম বিজ্ঞানপড়ুয়াদের বুঝতে হবে। King's University College-এর মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর Imants Barušs-এর মতে—

| বিজ্ঞান | বিজ্ঞানবাদ |
| :--- | :--- |
| open-ended exploration of reality, based on logical thinking about empirical observations. | বাস্তবতার ‘বস্তুবাদী ভার্সন’টার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকা, যা অনুসন্ধানকে আটকে দেয় কেবল ওই সকল বিষয়ের ভেতরেই, যেগুলো বস্তুবাদ অনুমোদন করে। |
| বাস্তবতার অনুসন্ধানে অন্তহীন যাত্রা, যার ভিত্তি হলো পর্যবেক্ষণ-লব্ধ জ্ঞানের ওপর যুক্তিগ্রাহ্য চিন্তাভাবনা। | |

বিজ্ঞান হলো একটা চলমান অনুসন্ধানী কার্যক্রম, বিজ্ঞানবাদ হলো একটা দার্শনিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি (worldview)।
কখনোই বিজ্ঞান বলবে না, আল্লাহ আছেন কিংবা করোনা আল্লাহর গযব। আধুনিক বিজ্ঞান সবকিছুর একটা বস্তুগত ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। যেমন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনা। কুরআনে সুরা কমারে রয়েছে। সুতরাং, ধর্মীয়ভাবে অকাট্য আমাদের কাছে। প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ্দ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনা আছে যিনি ওই সময় নবিজির সাথেই বসা ছিলেন। সে হাদিস শুদ্ধতার ফিল্টারে উত্তীর্ণ। (এই শুদ্ধতার ফিল্টার সম্পর্কেও আমাদের আইডিয়া ভয়ংকর-রকম হতাশাজনক।) আবার সেসময় কাফিররা বহিরাগত নন-আরবদের থেকে যাচাইও করে নিয়েছিল যে, তারাও দেখেছে কি না।

সেসময় বিজ্ঞান থাকলে কী বলত? চন্দ্রে ভূমিকম্প হয়েছে, প্লেট সরে গেছে বা কোনো বড় গ্রহাণুর আকর্ষণে এমনটা হয়েছে। পরে আবার মহাকর্ষের কারণে জোড়া লেগে গেছে। এরকমই একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হতো। ব্যাখ্যা দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব, রাসুলের আগমন, মুজিযা এগুলো বাইপাস করে ফেলা হতো। এমন একটা ব্যাখ্যা দেয়া হত, যেন এটা এমনিতেই হতে পারে, স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। যেমন সরাসরি স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার না করে স্টিফেন হকিং বলেছেন: (মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য) স্রষ্টার দরকার নেই। যাদের বাইপাস করার, সেই যাদুবিদ্যা তুকতাকের যুগে 'যাদুকর' বলে বাইপাস করেছিল। এই বিজ্ঞানের যুগে হলে আমরা বিজ্ঞানের নামে বাইপাস করতাম। একই হলো। আজকের এই করোনা যে 'আল্লাহর গযব' এটা একজন মুসলিম হিসেবে আপনাকে চিনে নিতে হবে এবং সেটা 'পশ্চিমা বস্তুবাদী বিজ্ঞান' (নট বিজ্ঞান টুল) আপনাকে চেনাবে না। চেনাবে আপনার ঈমানের 'ইন্দ্রিয়'। ঈমানের ইন্দ্রিয় আপনাকে বিজ্ঞানের ফাইন্ডিং টুল আর ওহিকে (কুরআন-হাদিস) কো-রিলেট করিয়ে দেবে। আর যদি কো-রিলেট না করতে পারেন; ডাক্তারদের গ্রুপে কেন মধু-কালোজিরার পোস্ট দেওয়া হলো, সেজন্য হা হা রিয়‍্যাক্ট দিতে মনে চায়। তাহলে ধরে নেবেন কেবল নামটাই আরবি, ঈমানের ইন্দ্রিয় অন্ধ। 'তাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে'... 'দেখেও তারা দেখে না, শুনেও তারা শোনে না'... 'অন্ধ, বধির, মুক... তারা ফিরবে না।' মুসলিমের সন্তান হলেও আল্লাহর খাতায় হয়তো মুসলিমের তালিকায় আপনি নেই। অবশ্য না থাকলেই কী আসে যায়, এমনটা মনে হলে, নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনি আসলেই নেই।

এগুলো সব রিসার্চ রেজাল্ট। প্যারাডক্সগুলো দেখেন। কীভাবে গত ৫ মাসে তথ্যগুলো বদলে গেছে খেয়াল করেন। হাবুডুবু নাকানি-চোবানিটা লক্ষ্য করতে হবে।

১ক ফ্লু ভাইরাসগুলো এনভেলপড (আবরণযুক্ত)। উচ্চতাপমাত্রায় আবরণ নষ্ট হয়ে ভাইরাস অকেজো হয়। ফ্লু-ভাইরাসেরই জাত করোনা। ফলে গরম পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে। ভৌগোলিকভাবে এত থেকে এত অক্ষাংশের শীতপ্রধান দেশগুলোই আক্রান্ত।

১খ কয়েকদিন পর সৌদি-ইরান-মালয়-ইন্ডিয়া সব গরমের দেশগুলো আক্রান্ত। ল্যাবে ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তক গরমে ভাইরাসটা কর্মক্ষম।

২ক শুধু ম্যান-টু-ম্যান কনটাক্টে ছড়ায়।

২খ বাতাসে ৩ ফুট পর্যন্ত যায়, এরপর মাটিতে পড়ে যায়।

২গ বাতাসে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাসে।

৩ক সার্ফেসে (বস্তুর ওপর) ৭২ ঘণ্টা বাঁচে। এর মধ্যে মানবদেহে ঢুকতে না পারলে অকেজো হয়।

৩খ সার্ফেসে ৭-১০ দিন পর্যন্ত বাঁচে।

৪ক শুধু বয়স্করা মরছে। যুবকরা লক্ষণই প্রকাশ করে না। করলেও সামান্য, ঠিক হয়ে যায়। শিশুরা তো একেবারেই সেফ।

৪খ আমেরিকা হাসপাতাল ভর্তি ২৯%-এর বয়স ১৮-৪৪। নিউইয়র্কে ৫০%। আইসিইউ লেগেছে যাদের, তাদের ১২%-এর বয়স ১৯-৪৪। বাংলাদেশে ২১-৪৬ রোগী ৪৬%।

৫ক হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (HCQ) আমাদের আশা। সব মার্কেট আউট।

৫খ HCQ এর খুব একটা উপকার নেই; বরং আইসিইউতে মরেছে বেশি।

৬ ভ্যাকসিন তৈরি করতে ১-২ বছর সময় তো লাগবে।

৭ ভ্যাকসিন তৈরি না-ও হতে পারে। (WHO)। বহু ভাইরাসের ভ্যাকসিন হয়নি (ইবোলা, এইডস)

জাপানি ওষুধটা কার্যকর। দাম ফুল কোর্স ৬ লাখ টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ Remdesivir মানব পরীক্ষায় ব্যর্থ।

ভাইরাসটা নতুন, আমরা এখনো এটা সম্পর্কে সব জানি না, জানছি।

ভাইরাস বারবার জিন মিউটেশন করছে। চরিত্র বদলাচ্ছে।

এ তো গেল প্রথম ৬ মাসে। আর গত দেড় বছরে কত পরস্পরবিরোধী কথা আমরা শুনেছি। ভ্যাকসিন নিয়ে কত মতামত-কাউন্টার, কত জল্পনা কল্পনা। বিজ্ঞানের এই হাবুডুবু-র সিরিয়ালটা আর কতদূর গেলে আমার সোকল্ড আত্মসমর্পিত 'মুসলিম মন' স্বীকার করবে এটা 'আল্লাহর গযব'। মানবজাতির অহংকার, দ্য গ্রেট 'সায়েন্স' বিগত দিনগুলোতে এটা-ওটা-সেটা বলছে। আশায় বুক বেঁধে সামনে যা পাচ্ছে আঁকড়ে ধরছে। কখনো বয়স, কখনো তাপমাত্রা, কখনো ভূগোল, কখনো বিসিজি ভ্যাকসিন, কখনো হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। 'ফী নারি জাহান্নামা খলিদীনা ফীহা' মিস্টার অভিজিৎ রায় লিখেছিল, 'বিজ্ঞান এতদূর এগিয়েছে, এতদূর এগিয়েছে, যদি স্রষ্টা থাকতই, তাহলে এতদিনে আবিষ্কার হয়ে যেত।' আর এদিকে পিকোমিটার, ফেমটোমিটারের ক্ষুদ্র একটা ভাইরাস এখনো বিজ্ঞানের কাছে অচেনা রয়ে গেল। উনি বেঁচে থেকে দেখে গেলে ভালো হতো। বস্তুবাদী সভ্যতা বস্তুর বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। আমি আপনিও কি তাই? তাহলে যা পার্থক্য গড়ে দেবে সেটা কই? ঈমান কোথায়? ঈমানের অস্তিত্ব, উপযোগিতা, ব্যবহার, কার্যক্ষমতা কোথায়? নাকি শুধু মুখে, শুধু নামে, শুধু দাবিতে। একটা রূপকথার মতো, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। 'অস্তিত্বহীন ঈমান'কে কী বলে? এত অস্পষ্ট কেন আমার পরিচয়? কে আমি?

টিকাঃ
১. সুরা কমার, আয়াত : ১
২. সহিহ বুখারি: ৩৮৬৯; সহিহ মুসলিম: ২৮০০; জামি তিরিমিযি: ৩২৮৫; মুসনাদ আহমাদ: ৪৩৬০

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 আল্লাহ কে?

📄 আল্লাহ কে?


গযব বা গদ্বব শব্দের অর্থ ক্রোধ, রাগ, Wrath, Anger. আল্লাহ আবার রাগেন?

জি। ক্রোধ আল্লাহর সিফাত। আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্য যেসব সিফাত বা গুণ সাব্যস্ত করেছেন। আমরাও সেগুলো সাব্যস্ত করি, কিন্তু এগুলোর ধরন জানি না এবং এগুলো আমাদের সদৃশ নয়। যেমন কালাম, আল্লাহ কথা বলেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি কথা বলেন, আমরাও মেনে নেব, তিনি কথা বলেন, কিন্তু কীভাবে বলেন তা জানি না, সেটা সৃষ্টির ধরনের নয়। আমাদের যেমন ফুসফুসের বাতাস বেরোতে থাকে আর দাঁত জিহ্বা ঠোঁটে ধ্বনি উচ্চারণ করে কথা বলি, তাঁর কথা এমন নয়। কেমন, আমরা জানি না। তবে আমাদের সদৃশ যে নয়, এটা নিশ্চিত। لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئُ (লাইসা কামিসলিহি শাইয়ুন)-কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। সৃষ্টিজগতে তাঁর কোনো সদৃশ নেই, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।। তিনি অমুখাপেক্ষী, কথা বলার জন্য তিনি ফুসফুস-জিহ্বা এগুলোর মুখাপেক্ষী নন। এগুলো সৃষ্টির লাগে, স্রষ্টার লাগে না।

» আমাদের আল্লাহ জড়বস্তু নন। তিনি জীবিত, চিরঞ্জীব (আল হাইয়্যু)।

» তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতি উদাসীন নন। তিনি কেয়ারিং। তিনি সব দেখছেন (বাছীর), সব শুনছেন (সামিউ), সব খবর রাখছেন (খাবীর)।

» তিনি সৃষ্টিকে ভালোবাসেন (রউফ), স্নেহ করেন (ওয়াদুদ) মাতৃপেক্ষা বেশি।

তিনি রহম করেন জালিম-মাজলুম সবাইকে (রাহমান), জালিমের ওপর ধৈর্য ধারণ করতেই থাকেন (হালীম/সবুর)।

মাফ করেন (গফুর), সর্বোচ্চ পর্যায় অব্দি মাফ করতে থাকেন (গাফফার)।

আবার তিনি প্রতিশোধ নেন (যুনতিকাম), ক্রোধান্বিত হন (কাহহার)। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে জালিমের ওপর তিনি প্রতিশোধ নেন। মাজলুমের পক্ষে।

তবে তাঁর রহম তাঁর ক্রোধের ওপর বিজয়ী।

তিনি ইনসাফ করেন (আদিল), ক্রোধে তিনি সৃষ্টির মতো ন্যায়হরণ করে বসেন না।

তিনি চান আমরা ভালো থাকি, সুখে থাকি। ন্যায় করি। অন্যায় করে তাঁর গযব ডেকে না আনি। এজন্য তিনি আমাদের সাথে কমিউনিকেট করেন। নবিদের মাধ্যমে কিতাব পাঠিয়ে সতর্ক করেন। কীভাবে চলতে হবে জানান। আমার জমিনে আমার দেখানো নিয়মে চলো, তোমরাও ভালো থাকো, আমার সৃষ্টিকেও ভালো থাকতে দাও। আমার অবাধ্য হয়ো না। 'আমার ক্রোধ তোমরা সহ্য করতে পারবে না, তারপরও তোমরা অবাধ্য হচ্ছো?'

তিনি স্বত্বাধিকারী (মালিক), শাসক (হাকাম), প্রতিপালক (রব)।

সুতরাং, ক্রোধ আল্লাহর সিফত বা গুণ। তিনি জড় নন, নির্জীব নন, বেখেয়াল নন। বান্দারা সীমা অতিক্রম করে ফেললে তিনি গযব পাঠান। কেন? وَلَئِذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ 'বড় আযাব (পরকালে)-এর আগে আমি অবশ্যই তাদেরকে ছোট কিঞ্চিৎ শাস্তি (দুনিয়াতে) আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ফেরানোর জন্য। মুমিনদের আল্লাহ আযাব পাঠান ফেরানোর জন্য। আর কাফিরদের পাঠান ধ্বংসের জন্য। কাফিরদের জন্য কখন পাঠান? তাদেরকে সুযোগের পর সুযোগ দেন। দুনিয়াতে কাফিরদেরকে আল্লাহ তাদের কুফরের জন্যও আযাব দেন না। শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ, এজন্যও আযাব পাঠান না। কাফিরের কুফর, মুশরিকের শিরকের শাস্তি জাহান্নামে অনন্তকাল চলবে। দুনিয়ায় আল্লাহ তাদের আরাম-আয়েশের সুযোগ দেন। বেশি করে দেন। তাহলে দুনিয়ায় গযব কখন আসে? দেখুন-

নুহ আলাইহিস সালামের জাতিকে সাড়ে ৯০০ বছর সুযোগ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নুহ আলাইহিস সালামকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। চূড়ান্ত স্পর্ধা। বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর দূতকে হত্যার হুমকি?

আদ জাতিকে ধরেছেন যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আবার কেডায়?'

সামুদ জাতির দাবিমতো পাথরের ভেতর থেকে উট বের করে দেখিয়েছেন আল্লাহ। সেই উটের স্পেশাল নাম দিয়েছেন 'নাক্বতুল্লাহ' (আল্লাহর উট)। এতকিছু চোখের সামনে দেখেও সেই উটকে তারা হত্যা করেছে। কত বড় স্পর্ধা!

ফিরআউন কতশত বছর বনি ইসরাইলের ওপর জুলুম করেছে। মায়ের কোল থেকে ছেলে বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছে। আল্লাহ শাস্তি দেননি। অবশেষে চূড়ান্ত স্পর্ধা দেখিয়েছে ফিরাউন, 'আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব?'

কওমে লুত শিরক করেছে, সমকাম করেছে শত শত বছর। আল্লাহ ধরেননি। কখন ধরেছেন? যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'লুত, তোমাকে আমরা বের করে দেবো, বেশি সুশীল হয়েছো, খুব পবিত্র হয়েছ, না?' তারা জানত তারা নাপাক কুৎসিত একটা কাজ করছে। সেটা জেনেই তারা করছে ও করবে। পারলে লুত কিছু কইরো।

কারুন তো বনি ইসরাইলেরই ছিল। যাকাতের হুকুম হয়েছে। সে দিলো তো না-ই, স্পর্ধা দেখাল, 'এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন নাকি? এগুলো তো আমি নিজ যোগ্যতায় কামিয়েছি।'

আল্লাহর গযবের একটা কমন প্যাটার্ন দেখুন : স্পর্ধা, অহংকার। শিরক-কুফর- জুলুম সব আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন দুনিয়াতে। গযবের এপিসেন্টার হলো এই ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, অহংকার, বড়াই। সভ্যতার চূড়ায় থাকা জাতিগুলো যখন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সাথে স্পর্ধা দেখিয়েছে, আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়েছে। আমি জানি আপনাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে। যদি আল্লাহর গযবই হয়, তাহলে মুসলিম মরে কেন রে ব্যাটা?

টিকাঃ
১. সুরা শুরা, আয়াত : ১১
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. সুরা নাযিয়াত, আয়াত: ২৪
২. 'নিশ্চয় কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল।' [সুরা কাসাস, আয়াত :৭৬] বাহ্যত এখান থেকে এ ধারণার উদ্রেক হতে পারে, সে সম্ভবত বনি ইসরাইলের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। কারণ, আয়াতে তাকে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলা হয়েছে, কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ, এখানে "মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলতে শুধু এটা বোঝানো হয়েছে যে, সে ছিল মুসা আলাইহিস সালামের বংশীয় লোক। অর্থাৎ সে মুসা আলাইহিস সালামের চাচাতো ভাই ছিল। এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরদের মত; যেমনটি ইমাম ইবনু জারির তাবারি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন। [তাফসিরত তাবারি, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৬১৫-৬১৬] আয়াতে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলে এ বংশীয় সম্পর্ক ও আত্মীয়তার কথাই বোঝানো হয়েছে। এটা বোঝানো হয়নি যে, সে মুসা আলাইহিস সালামের কওমের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। তার অন্যান্য কর্মকাণ্ডও প্রমাণ করে, সে মুমিন ছিল না; বরং সে ছিল একজন কাট্টা কাফির। শারয়ি সম্পাদক

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 আল্লাহর আযাবে মুসলিম কেন মরে?

📄 আল্লাহর আযাবে মুসলিম কেন মরে?


তিনটা পয়েন্টে আলোচনাটা শেষ করব, ইনশাআল্লাহ।

প্রথমত, আমরা দেখলাম আল্লাহর আযাব-গযবের এপিসেন্টার হলো স্পর্ধা। কাফির চিরকালই স্পর্ধা দেখিয়েছে, দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সে আল্লাহকে চেনে না। কিন্তু কাফিরদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা মুসলিমরা সমষ্টিগতভাবে গত এক শতকে যে স্পর্ধা দেখিয়েছি, আগের ১৩০০ বছরে এতখানি ঔদ্ধত্য মুসলিমরা দেখায়নি। আমি তো মনে করি, এ দিক বিবেচনায় কাফিরদের তুলনায় আমরাই আল্লাহর গযবের বেশি উপযুক্ত। কী সে স্পর্ধা, সেটা একটু পরে একসাথে আলোচনা করছি।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর আযাবের কিছু নিয়ম আছে। যখন দুনিয়ায় আযাব আসে, সেটা সবার জন্যই আসে। ইমাম মাহদির বিরুদ্ধে প্রেরিত বাহিনীকে বাইদা নামক জায়গায় ধসিয়ে দেওয়া হবে, শুনে আম্মাজান আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেন, বাইদা এলাকায় এমন অনেক লোকও তো থাকতে পারে, যারা ওই বাহিনীর লোক নয়। বাজার এলাকার আম পাবলিক। তারাও এই আযাব ভোগ করবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

হ্যাঁ, যখন কোনো এলাকায় আল্লাহর আযাব আসে, তখন সবার ওপরই আসে। পরে হাশরের মাঠে যার যার নিয়ত অনুসারে আলাদা হয়ে যাবে।

বিশেষ করে মহামারি সম্পর্কে নবিজি স্পষ্ট করেই বলেছেন—

মহামারি হলো রিযয় (গযব বা শাস্তি) বা আযাব, যা আল্লাহ বনি ইসরাইল বা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেদের ওপর দিয়েছিলেন। কতক জাতিকে এর দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কিছু এখনো বাকি রয়ে গেছে, তাই কখনো তা আসে, কখনো চলে যায়। তবে মুমিনদের জন্য আল্লাহ একে রহমত বানিয়েছেন। যদি মুমিন ধৈর্য সহকারে নিজ শহরে অবস্থান করে, মৃত্যু হলে সে শহিদের সমান সাওয়াব পাবে।

তৃতীয়ত, মুসলিমদের ওপর একটা বিশেষ দায়িত্ব ছিল। মানুষকে আল্লাহ জমিনে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতাদের কাছে এভাবেই তিনি ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন, 'আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করব।' মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। তার দায়িত্ব আল্লাহর ক্যানভাস করা (যেভাবে রাষ্ট্রদূত তার দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন) এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর বিধানমাফিক দুনিয়া শাসন করা। মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহর পরিচয় ভুলে 'ভুল উপাস্য' বেছে নিয়েছে তারা তাদের দায়িত্ব জানে না, সৃষ্টির উদ্দেশ্য জানে না। আর যারা আল্লাহকে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ে চিনেছে তারা হলাম আমরা-মুসলিম। সুতরাং, প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এককভাবে আমাদের। দায়িত্ব কী ছিল? আল্লাহর পথে দাওয়াহ এবং আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ। আল্লাহর বিধানের দিকে আহ্বান এবং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনকারীদের রোধ। যার স্তর তিনটি—

■ হাত দ্বারা। এটা না পারলে...

জবান দ্বারা (দাওয়াহ/সৎকাজে আদেশ অসৎকাজে নিষেধ)। তাও না পারলে...

অন্তর দ্বারা (বুগদ ফিল্লাহ বা আল্লাহর জন্য ঘৃণা রাখা)। নবিজি বলেছেন, এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। জোর করে বা মৌখিক বাধা দিচ্ছেন না, ওকে ফাইন। আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন যদি কমপক্ষে ঘৃণাও করতে না পারেন, তাহলে খুব সম্ভবত আল্লাহর খাতায় মুসলিম তালিকায় আপনার নাম নাও থাকতে পারে। এই 'আদি দায়িত্ব'-এ অবহেলার কারণে মুমিনদের প্রতিও আল্লাহর আযাব আসে।

আল্লাহ এক ফেরেশতাকে আদেশ করলেন, অমুক অমুক শহরকে তার অধিবাসীদের ওপর উল্টে দাও। ফেরেশতা সবিনয়ে আরজ করলেন, 'হে আল্লাহ, সেখানে তো আপনার অমুক বান্দা আছে, যে এক পলকের জন্যও আপনার অবাধ্য হয়নি।' আল্লাহ বললেন, 'তাকে-সহই পুরো জনপদ উল্টে দাও। কেননা তার চেহারা আমার তরে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন হয়নি। অর্থাৎ তার চারপাশে পাপ-জুলুমে সয়লাব, সমাজ অন্যায়-পাপাচারে পরিপূর্ণ, তবু সে আপন অবস্থায় ইবাদতে মগ্ন থেকেছে। সমাজে চলমান এতসব পাপ-অন্যায়-জুলুম দেখে তার মুখ মলিন হয়নি। তার ভ্রুও কুঞ্চিত হয়নি। তার অন্তরে খারাপও লাগেনি। ঈমানের সর্বনিম্ন স্তরের দায়িত্বও সে পালন করেনি।

আমাদের দায়িত্ব ছিল ইসলামের এই বার্তা, ইসলামের এই সুশাসনের আওতায় সকল মাজলুমকে নিয়ে আসা। যাতে মানবতার মুক্তি ঘটে। সব সামাজিক (দলিত, নিগ্রো, হিজড়া, হিন্দু, বিধবা, প্রথা, পেশাগত হীনম্মন্যতা) মাজলুম, সব অর্থনৈতিক মাজলুম, রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের মাজলুম, পুঁজিবাদের মাজলুম, ক্যারিয়ারিজমের মাজলুম সবার কাছে ইসলামের সমাধান পৌঁছে দেওয়া এবং ইসলামের সিস্টেমের ভেতর এনে এই নিগৃহীত মানবতাকে স্বস্তি দেওয়া ছিল আমাদের কাজ। বস্তুত জালিম জুলুমের মধ্য দিয়ে নিজের ওপরও জুলুম করে, যা থেকে তাকে বিরত রাখা আমাদের দায়িত্ব। জালিমকে জুলুম থেকে ফেরানো মানে খোদ তার ওপরও ইহসান বা দয়া করা। আমরা পুরো উম্মাহ একসাথে সেই 'আদি দায়িত্ব' ছেড়ে দিয়েছি।

গুনাহকে ঘৃণা করা তো দূর কি বাত। ঘৃণা করবার আগে সেটাকে গুনাহ তো মনে করতে হবে। গুনাহকে গুনাহ মনে করাই ছেড়ে দিয়েছি আমরা মুসলিমরা। আমরা অনেকেই মিউজিককে গুনাহ মনে করি না, অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিউজিক শুনলে কানে আঙুল দিয়ে সে জায়গা পার হতেন। বলেও গেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন দল বের হবে যারা ব্যভিচার-রেশম-মদ-বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। বলেছেন, আল্লাহ আমার উম্মতের ওপর মদ-জুয়া-বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন। অথচ বহু মুসলিমকে আপনি বোঝাতে পারবেন না। তারা একে ঘৃণা তো দূরের কথা, হারামই মনে করবে না। নিষেধ করাকে উগ্রতা মনে করবে। তার মানে নবিজি 'উগ্র' ছিলেন? নাউযুবিল্লাহ। বহু মুসলিম ঘুষ-সুদকে 'ও-কিছু-না' মনে করে। বহু মুসলিমা পর্দা করাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে, মাহরাম ও নন-মাহরাম মেনে চলাকে বাড়াবাড়ি মনে করে। ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকানোকে গুনাহ মনে করে না, অথচ সুরা নুরে আল্লাহ নিজে এ থেকে বিরত থাকতে আদেশ করেছেন। বহু দ্বীনদার পর্দানশিন মুসলিমা গুনাহে লিপ্ত হবার প্রবল আশঙ্কা থাকাবস্থায় পুরুষের দিকে তাকানোকে তেমন কিছু গণ্য করে না, অথচ এ থেকে বিরত থাকা আল্লাহর আদেশ ছিল।

আল্লাহর শপথ, ইসলামের ইতিহাসে এমন সময় কোনোদিন আসেনি যে, এত বেশিসংখ্যক মুসলিম কুরআন-হাদিসে বর্ণিত স্পষ্ট অকাট্য সব হুকুমকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহর আদেশকে অদরকারি মনে করেছে। আল্লাহর আদেশকে ইনিয়ে-বিনিয়ে অজুহাত-সহ বা স্পষ্টভাবে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমন ঔদ্ধত্য সামষ্টিকভাবে মুসলিমরা আগে কোনোদিন দেখায়নি। ক্যারিয়ার, আধুনিকতা, সামাজিকতা, মধ্যপন্থা ইত্যাদির অজুহাতে মহান আর-রাজ্জাক আল-মালিকের আদেশের প্রতি এতটা তাচ্ছিল্য আমরা আগে কখনো দেখাইনি। এমনকি এই লেখা পড়তে পড়তেও অনেক মুসলিম ভাইয়ের মনে নেগেটিভ অনুভূতি হচ্ছে। কী ভয়ংকর স্পর্ধা আমরা দেখাচ্ছি মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সাথে। সামনে আরো বিস্তারিত আসবে বিষয়গুলো। মোদ্দা কথা, সৎকাজের আদেশ আর অসৎকাজে নিষেধ করার 'আদি-কর্তব্য'তে অবহেলা আল্লাহর গযবের আরেকটি কারণ।

বলে দিন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান-যা তোমরা পছন্দ করো, যদি (এসব কিছু) তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না।

যদি ৮টা জিনিস বেশি প্রিয় হয় ৩টা জিনিসের চেয়ে, তাহলে অপেক্ষা করো আযাবের। আয়াতটি আমাদের মুসলিমদেরই উদ্দেশে। সমঝদারোঁ কে লিয়ে ইশারা হি কাফি হ্যায়।

আযাব আসার যে কারণগুলো-ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের আদি দায়িত্বে অবহেলা সবই আমরা মুসলিমরা পূর্ণ করেছি। আর কাফিরদের জন্য হোক বা মুসলিমদের জন্য, আযাব যখন কোনো জনপদে আসে, সেটা ব্যাপকভাবে আসে। সবার জন্য আসে। কারো (কাফির) জন্য পাকড়াও, আর কারো (মুমিন) জন্য সতর্কবাণী। আশ্চর্য, আমরা আযাবকে আযাব বলতেই লজ্জা পাই, তাহলে সতর্ক হব কীভাবে? আর ছোট আযাবে যদি সতর্ক না হতে পারি তাহলে? 'বড় আযাবের আগে আমি তাদের ছোট আযাব আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ছোট আযাব টের পেতে ব্যর্থ হলে, আমার জন্য এর পরের আপ্যায়ন কেমন হবে? বড় আযাব। জাহান্নাম।

আফসোস, মুসলিম সন্তানের কাছে আজ জাহান্নামও মামুলি ব্যাপার। মুসলিম হয়ে যেহেতু জন্মেছি, সাজা খেটে একদিন তো জান্নাতে যাবই। আল্লাহর খাতায় আমি এখনো মুসলিম আছি, শিওর? শরিয়তের অকাট্য বিধান অস্বীকার করলে ঈমান থাকে না। আমল করতে পারছি না, সেটা ভিন্ন বিষয়। সেটা আমার ঈমানের দুর্বলতা। কিন্তু অস্বীকার করলে তো ঈমানটাই থাকবে না। দেখেন তো ভেবে, আল্লাহর কী কী হুকুম আমার পছন্দ হয় না। মনে হয়, কী দরকার ছিল এই বিধানের। কোনো কোনো বিধান শুনে মনে হয়- 'এ যুগে কী আর ওসব চলে' কিংবা 'এমন না হয়ে ওমন হলে ভালো হতো।' ওযুভঙ্গের কারণ যেমন আছে, ঈমানভঙ্গেরও কারণ আছে (শেষের দিকে আলোচনা আছে)। ক'জন জানি? আমার অজান্তেই ঈমান হারিয়ে বসে নেই তো আমি? ইয়া আল্লাহ, আমি জানতাম না, তাই অমন বলে ফেলেছি। 'না জানা'-কে আল্লাহ কাল-হাশরে কোনো ওজর হিসেবে গ্রহণ করবেন না। আমার কাছে আলিম ছিল, মসজিদে ইমাম ছিল, নেট ছিল, অসংখ্য ইসলামি বই ছিল, হাজারো পিডিএফ ছিল, দ্বীনি বন্ধু ছিল। আমার জানতে ইচ্ছে হয়নি, তাই জানিনি। জানার প্রয়োজন মনে করিনি, তাই জানিনি। জানাও ফরজ ছিল আমার ওপর। না জানাটা মানে আরেকটা ফরজ হুকুমের তোয়াক্কা না করা। সেদিন আর কাকে দোষ দেবো, যেদিন খোদ শয়তানও বলবে: 'খবরদার আমাকে দুষবে না, কেননা তোমাদের ওপর আমার কোনো আধিপত্য নেই। আমি কেবল রাস্তা দেখিয়েছি। গুনাহের রাস্তায় তুমি নিজেই হেঁটেছ।'

আল্লাহর এই গযব আমি তো মনে করি আমাদেরই উদ্দেশে। আমাদেরকে সতর্ক করতে। আমাদের পাপের ভারা পূর্ণ। আমাদের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, স্পর্ধা আর কাফিরপ্রেম চূড়ায় পৌঁছে গেছে। ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছি আমরা।

টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ২১১৬; সহিহ মুসলিম: ২৮৮২, ২৮৮৩; সুনানু নাসায়ি: ২৮৭৯; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪০৬৪, ৪০৬৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৬৭৫৫, ৬৭৫৬; মুসতাদরাকুল হাকিম: ৮৩২১; মুসনাদু আহমাদ: ২৬৪৮৭, ২৬৭০২, ২৬৮৬০
২. সহিহ বুখারি: ৩৪৭৩, ৬৯৭৪; সহিহ মুসলিম: ২২১৮; জামি তিরমিযি : ১০৬৫; আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ি : ৭৪৮১; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ২৯৫২, ২৯৫৪; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭৫১, ২১৭৬৩, ২১৮০৬, ২১৮১৮; মুসনাদুল হুমাইদি: ৫৫৪
৩. সুরা বাকারা, আয়াত: ৩০
৪. যদি কোথাও গান-বাজনা-বাদ্য বাজতে থাকে তাহলে সামর্থ্য থাকলে তা বন্ধ করে দেওয়া: এমনকি বাদ্যযন্ত্র ও ঢোল-তবলা ভেঙে ফেলাও 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা'-এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ কোথাও মদ্যপানের আসর বসলে সেখানে গিয়ে মদের পানপাত্র ভেঙে ফেলা কিংবা কোথাও কারো ধনসম্পদ জবরদখল হতে দেখলে তা উদ্ধার করে মূল মালিককে পৌঁছে দেওয়া এসবই 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করা' এর অন্তর্ভুক্ত। চাই এসব প্রতিরোধ সে সরাসরি নিজেই করুক কিংবা অন্য কারো মাধ্যমে করাক, উভয় ক্ষেত্রেই সে হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এটা তখনই করা যাবে, যখন তা করার পরিপূর্ণ সামর্থ্য থাকবে এবং এতে বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় বা এমন ফিতনা সৃষ্টি হবে না, যার কারণে সমাজে আরো অধিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে কিংবা মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন হয়। এমন আশঙ্কা থাকলে সেক্ষেত্রে শুধু মৌখিকভাবে বাধাদান করবে এবং ওয়াজ-নসিহত করবে। আর এটার সামর্থ্যও না থাকলে সেক্ষেত্রে অন্তরে অন্যায় কাজের প্রতি ঘৃণা রাখবে, যেটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। ইমাম নাওয়াওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-সহ আরো অনেক হাদিসবিশারদ এমনটাই বলেছেন। দেখুন-শারহু মুসলিম, নাওয়াওয়ি, খণ্ড : ২; পৃষ্ঠা : ২৫
সরাসরি হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ করার বিষয়টি মুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, আবার কাফিরদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন তারা মুসলিম সমাজে অন্যায় কাজে লিপ্ত হবে। এক্ষেত্রে জিম্মি অমুসলিমরাও অন্তর্ভুক্ত। আর কাফিরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যখন পৃথিবী থেকে কুফর-শিরক মূলোৎপাটন করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালিমা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ময়দানে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা হবে। বোঝা গেল, 'হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিরোধ' কেবল কাফিরদের ক্ষেত্রেই নয়; বরং কাফির-মুসলিম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শারয়ি সম্পাদক
১. সহিহ মুসলিম: ৪৯
২. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৭৬৬১; শুআবুল ঈমান : ৭৪৯৮৯; মুজামু ইবনিল আরাবি: ২০১৬-হাদিসটির সনদ যইফ
১. সহিহ বুখারি : ২৪৪৪, ৬৯৫২; জামি তিরমিযি: ২২৫৫; সহিহু ইবনি হিব্বาน: ৫১৬৭, ৫১৬৮; মুসনাদু আহমাদ: ১৩০৭৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ১১৫০৯, ১১৫১০, ২০১৭৭
২. মুসনাদু আহমাদ: ৪৫৩৫, ৪৯৬৫; সুনানু আবি দাউদ: ৪৯২৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৯০১; শুআবুল ঈমান: ৪৭৬০; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি ২০৯৯৭; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ১১৭৩, ৬৭৬৭-হাদিসটির সনদ সহিহ
৩. সহিহ বুখারি ৫৫৯০; সহিহু ইবনি হিব্বาน ৬৭৫৪; আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি: ৩৪১৭; শুআবুল ঈমান: খন্ড ৭; পৃষ্ঠা :১১৮; মুসনাদুশ শামিয়িান: ৫৮৮; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ২০৯৮৮; আস-সুনানুস সগির, বাইহাকি ৩৩৫৩
৪. মুসনাদু আহমাদ ২৪৭৬, ৬৫৯১, ৬৫৯৯; সুনানু আবি দাউদ: ৩৬৯৬; সহিহ ইবনি হিব্বান: ৫৩৬৫; আল-আহাদিসুল মুখতারা ৫৭, ৬০; মুসনাদু আবি ইয়ালা ২৭২৯; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি : ২০৯৯১-হাদিসটির সনদ সহিহ
১. (হে নবি) আপনি মুমিন পুরুষদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩০]
২. আর (হে নবি,) আপনি মুমিন নারীদেরকে তাদের দৃষ্টি অবনত করতে বলুন... [সুরা নূর, আয়াত : ৩১]
৩. সুরা তাওবা, আয়াত : ২৪
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. যখন সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, 'আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের ওপর কোনো আধিপত্য ছিল না। আমি শুধু তোমাদের আহ্বান করেছিলাম আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমায় দোষারোপ কোরো না, তোমরা বরং তোমাদের নিজেদেরই দোষারোপ করো। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা যে আমাকে (আল্লাহর সাথে) শরিক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করছি। আর জালিমদের জন্য তো আছে ভয়াবহ শাস্তি। সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২২]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00