📄 ন্যাকামো
যদি বেঁচে যাও এবারের মতো
যদি কেটে যায় মৃত্যুর ভয়
জেনো বিজ্ঞান লড়েছিল একা
মন্দির-মসজিদ নয়
পদ্যখানা কোন কবি লিখেছেন, জানি না। যে উদ্দেশ্যেই লিখে থাকুন, আমি কথাটার সাথে শতভাগ একমত।
যদি মসজিদকে মন্দিরের কাতারে নামিয়ে আনা হয়, তবে সেই মসজিদের তো আসলেই জাগতিক সমস্যায় কোনো ভূমিকা না থাকারই কথা। মন্দির পুরোদস্তুর একটা আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান, জাগতিক ভূমিকাশূন্য বা ঊনশূন্য। মানত, পার্থিব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য মনের সান্ত্বনা, পার্বণের আনুষ্ঠানিকতা। এখন মসজিদও তাই। সংখ্যাগুরু মুসলিম সপ্তাহান্তে হাজিরা দেয়। মুষ্টিমেয় মুসলিম ৩ ওয়াক্ত। এক চিমটি মুসলিম ৫ ওয়াক্ত আধ্যাত্মিকতাহীন ওঠবস করে আসে। হাতেগোনা কিছু মানুষ আধ্যাত্মিকতার খোঁজ পায় এখানে এসে। একটাই জাগতিক ভূমিকা হতে পারত, জুমুআর আগে আধঘণ্টা জনসংযোগ। ওটুকুও সময় কই, সবাই আসে আরবি খুতবার মাঝে।
আসবাবপত্রের এক বিরাট রুম। পিপিই, ভেন্টিলেটর, ভ্যাকসিন রিসার্চ আধুনিক যন্ত্রপাতির যেখানে নাভিশ্বাস উঠে গেছে, সেখানে মহামারিতে কী ক্ষমতা থাকতে পারে একটা খালি রুমের? যে রুমটার শিক্ষাকার্যক্রম কেড়ে নিয়েছেন, বিচারকার্য কেড়ে নিয়েছেন, বাজার-নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছেন, প্রশাসনিক কার্যক্রম ছিনিয়ে নিয়েছেন, সমাজচর্চা কেড়ে নিয়েছেন। এখন বলছেন জাগতিক কোনো ভূমিকা নেই। যে রুমটা সুশিক্ষিত, আত্মসংযমী সোনার মানুষ তৈরি করত, তার হাত-পা বেঁধে দিয়ে দুর্নীতিবাজ-লোভী পুঁজিবাদী মানুষ তৈরির কারখানা বানিয়ে এখন এসব ন্যাকামো? পারেনও বস। এরপরও যেটুকু সুযোগ ছিল জুমআর মওকায়, ইমাম সাহেবরা জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখেননি, বলছেন?
বিজ্ঞানের কাজই জাগতিক। প্রকৃতিবাদকে ধর্ম হিসেবে মেনে নেওয়া বিজ্ঞানের সামনে খোদ স্রষ্টা এলেও বিজ্ঞান মুখ ফুটে বলতে পারবে না, ইনি স্রষ্টা। জাগতিক ব্যাখ্যা করবে, বলবে চোখের ভুল, বলবে এলিয়েন। সে রাস্তা শুরুতে বন্ধ করে নিয়েই বিজ্ঞান হাঁটে। প্রতিটি বিষয়ের জাগতিক ব্যাখ্যা দেবার মধ্যেই বিজ্ঞান সীমাবদ্ধ। বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা। তার চোখে 'মন' জাস্ট কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া। পৃথিবী-আমি-আপনি সব উদ্দেশ্যহীন এবং পরিণতিহীন। যা কিছু বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা হয় না, তা বিজ্ঞানের চোখে কুসংস্কার। মহামারি একটা ইহজাগতিক বস্তুগত বিষয়। সুতরাং,, বিজ্ঞান এখানে কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। এখানে আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকবে না, এটাও স্বাভাবিক।
এবার আসুন। হিন্দুধর্ম 'অজানা-উৎস' থেকে হাজার বছরের মানবসমাজের সৃষ্টি। আর ইসলাম ঐতিহাসিকভাবে সত্য ও নির্দিষ্ট উৎস থেকে আগত। টেক্সট প্রজন্মান্তরে সুরক্ষিত। সরাসরি স্রষ্টার প্রত্যাদেশ ও বিধান। আপনি বলবেন, সেটা তো হিন্দুধর্মও দাবি করে। আখেরে কার দাবি সত্য, কারটা মিথ্যা, এটা আপনাকেই যুক্তিবুদ্ধি খাটিয়ে বের করে নিতে হবে। হিন্দুধর্ম কিছু আধ্যাত্মিকতা, নীতিকথা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সমষ্টি। বিপরীতে ইসলাম টোটাল একটা সিস্টেম। আধ্যাত্মিকতা মেইন সফটওয়্যার; সাথে নীতিকথা-ব্যক্তিক লাইফস্টাইল, পরিবার কাঠামো, সমাজব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, রাষ্ট্রচিন্তা, স্বাস্থ্যনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও সমরনীতি, বিচারব্যবস্থা ও দর্শন। ইসলাম ধর্ম নয়, ধর্ম ইসলামের একটা অংশ। ইসলাম ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মিলিয়ে টোটাল সিস্টেম। এখন ইসলামের হাত-পা ছেঁটে দিয়ে ধর্মের খাপে ভরে দিয়ে আপনি বলছেন, ইসলাম দৌড়াতে পারে না। সব জাগতিক কর্মকাণ্ড, জাগতিক বিষয়াবলির সাথে ইসলামের সব সম্বন্ধ আপনি 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র কাঁচি দিয়ে চেঁছে এখন এসেছেন 'মহামারিতে ইসলামের কোনো ভূমিকা নেই' কাব্য নিয়ে।
ইসলাম তো বলেছিলই, রোগ (pathogenesis) সংক্রামক নয়; রোগের কারণ (pathogen) সংক্রমণ-ক্ষম। তাই—
১. সুস্থ উট আর অসুস্থ উট একসাথে রেখো না। (social distance)
২. মহামারি উপদ্রুত এলাকায় যেয়ো না, মহামারির এলাকা থেকে বের হয়ো না (lockdown)। মরে গেলে শহিদের ভিআইপি মর্যাদা পাবে ওপারে।
এই শিক্ষাটা তো আপনারা আমাদের শেখাতে দিলেন না। যারা মসজিদে-মাদরাসায় পড়েছে, তাদের কাছে এসব লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব নতুন কিছু তো নয়, বরং ধর্মীয় আদেশের মতো জরুরি। অথচ ওদিকে ইটালি-প্রবাসীদের শেখাতে ব্যর্থ আপনাদের সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। নারায়ণগঞ্জের অধিবাসীরা জলপথে ত্যাগ করছে নিজ জেলা, আপনার সেক্যুলার শিক্ষা ব্যর্থ। আর মসজিদকে, মানে ইসলামকেও আপনি শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব দেননি। আবার দায়ীও করছেন। বেশ। ক্ষমতাহীন দায়িত্ব, নাকি?
মনে রেখো তুমি, বিশ্বকাপের আঙিনায় শচীন মেরেছিল ছক্কা, লতা মুঙ্গেশকর নয়।
কবিতাটা হয়ে গেছে এরকম আরকি। আমার পয়েন্ট হলো, যদি মসজিদ-মন্দিরকে 'স্পিরিচুয়াল বিল্ডিং' ক্যাটাগরিতে ফেলেন, ইসলাম-হিন্দু ধর্মকে 'ধর্ম' হেডিংয়ে ফেলে বলেন, ইহজাগতিক মহামারিতে ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই। গুড, সহমত। আর যদি ইসলামকে ইসলামের মতো খেলতে দেন, তাহলে করোনাকে ব্যবহার করে যে যত ফায়দা উঠাচ্ছে, সেটা বিগ ফার্মাই হোক, আর চীনা মাস্ক-পিপিই ফ্যাক্টরিই হোক, তা ইসলাম বন্ধ করবে। আর্মি নামিয়ে লকডাউন-সোশ্যাল মানুষকে জোর করে ডিস্টেন্সিং করাতে হবে না, লোকে দ্বীন মনে করে ভালোবেসে করবে। শিক্ষাব্যবস্থায় তাকদির শিখে ফেলেছে বলে মানুষ হবে শান্ত। দলীয় বিদ্বেষের কারণে দেশীয় আবিষ্কৃত টেস্টকিটের লাইসেন্স সরকারি মারপ্যাঁচে আটকে থাকবে না। জনগণকে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসার শিকার হতে হবে না। কেউ গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লুটতে চাইলে পারবে না।
দিন বদলাবে। করোনার বহুরূপী রঙবদলে দিশেহারা বিজ্ঞান অপেক্ষা করছে একটা 'মিরাকেল'-এর, সব হাল ছেড়ে দিয়ে 'হার্ড ইমিউনিটি'র প্রতীক্ষায় বিজ্ঞানীমহল। WHO জানিয়ে দিয়েছিল, ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব নাও হতে পারে। ভ্যাকসিন এসেছে, তবে সাথে এসেছে অনেক কথাও। ভ্যাকসিন লাগছে ডোজের পর ডোজ। নতুন বিশ্ব-ব্যবস্থা হাতছানি দিচ্ছে। কী সেটা, সেটা নিয়ে আপনারা অনিশ্চিত, অস্থির। আমরা নিশ্চিত, কী হবে তা আমরা জানিই, আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বাস এমন একটা ইন্দ্রিয়, এটা যার আছে, সে চিরটাকালই স্থির-শান্ত-নিশ্চিন্ত।
📄 চিনলি না রে পাগলা
এক প্রবাসী নাস্তিক নারী این কদিন আগে স্ট্যাটাস দিয়েছিল—আল্লাহতে বিশ্বাস না করলেও ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এ তিনি বিশ্বাস করেন। হ্যাঁ, নতুন কিছু না। প্রকৃতিপূজা, মাদার নেচার, প্রেতাত্মাপূজা, ভূত, এলিয়েন ইত্যাদি অদৃশ্য কাল্পনিক সব সত্তাই ওনারা বিশ্বাস করেন। শুধু স্রষ্টা ছাড়া। কারণ স্রষ্টা যে কিছু নিয়ম-কানুন বেঁধে দেন। প্রকৃতি-প্রেত-এলিয়েনদের মানলে আত্মপূজায় বাদ সাধে না। স্রষ্টা আবার যে ধর্মেই মানেন, কিছুটা কৃচ্ছতা, কিছুটা আত্মসংযম, কিছুটা নৈতিকতা আরোপ করেন যে। ওখানেই সমস্যা। সে যাকগে, আমার আলোচনা মুসলিমদের উদ্দেশ্যে যেহেতু, ওদিক পানে আজ গেলাম না।
ফেসবুকে ঢুকে সাধারণত করোনা আপডেট নিই। নতুন কোনো রিসার্চ এলো কি না। কে কী বলল, কর্তৃপক্ষ কী বলল, ডাক্তারদের গ্রুপে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে। পুরো টকশো দেখি না, নেট কিনে কিনে চালাচ্ছি তো, টকশোর ছোট ক্লিপ সামনে পেলে দেখি। কোনোখানে কেউ ভুলেও উচ্চারণ করছে না—এটা আল্লাহর গযব। সেক্যুলারিজমের পবিত্রতা নষ্ট হয়। নেহায়েত ধার্মিক কেউ খুব সাবধানে ধর্মনিরপেক্ষ কিছু শব্দ ব্যবহার করছেন : সৃষ্টিকর্তা, প্রার্থনা, পরম করুণাময়, কৃপা। যাতে ধর্মনিরপেক্ষতার মাবুদেরা (অমুসলিমদের সন্তুষ্টি, গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা) নারাজ না হয়। তাও মানলাম, কিন্তু মুসলিমরা যে ‘আল্লাহর গযব’ কী-কেমন-কেন তা সম্পর্কে কোনো ধারণা রাখে না, এটা দুঃখজনক। যারা রাখে তারাও মুখ ফুটে স্বীকার করছে না সেক্যুলারিতা অপবিত্র হবে বলে। বস্তুবাদী পাশ্চাত্য মনোবৃত্তি আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে এতটাই। আল্লাহর ক্রোধ যদি আপনি টেরই না পান, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করণীয় তা বুঝবেন কীভাবে। কী আশ্চর্য অবস্থা আমাদের ঈমানের? একজন নাস্তিক ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’-এ যতটুকু ঈমান রাখে, আমার কি ‘আল্লাহর গযব’-এ অতটুকু ঈমানও নেই?
অথচ একজন মুসলিম (আত্মসমর্পিত) হিসেবে আল্লাহর গযব চেনার কথা ছিল আমাদের। চিনতে পারাটা ছিল ঈমানের একটা আলামত।
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
আর যখন তারা রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়গুলো শ্রবণ করে, তখন আপনি দেখতে পাবেন, তাদের চক্ষু অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে; কারণ, তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা বলে, হে আমাদের রব, আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদের (সত্যের) সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
কথা ছিল, এই মহামারির ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের রবকে চিনে নেব, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হব। তাহলে কি পবিত্র রাসুলের কথার বিপরীতে পশ্চিমের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাকেই (বিজ্ঞান) আমরা দ্বীন হিসেবে নিলাম? মহামারি থেকে বাঁচার জন্য পশ্চিমের বস্তুবাদী রিসার্চের অপেক্ষাতেই আমরা থাকব, সেগুলোর কথাই আলোচনা করব, সেগুলোর মধ্যেই মুক্তি খুঁজব। তাহলে আমার ঈমান কোনটা? সেই ঈমানের চোখে কী দেখার কথা ছিল? মহামারি থেকে মুক্তির জন্য কী করার কথা ছিল?
এখানে খুব সূক্ষ্ম একটা ডিমার্কেশন আছে। বর্তমান ‘আধুনিক’ বস্তুবাদী বিশ্বে এই সীমাটা প্রত্যেক মুসলিমের বোঝা দরকার। বিজ্ঞান একটা টুল (tool)। এই টুলটা এখন ব্যবহার করছে পুঁজিবাদী বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতা। একটা সময় আকরিক (ore) থেকে এই টুলটা ইসলাম বানিয়েছিল, শান দিয়েছে, ধারালো করেছে। সেটা দিয়ে সবজি কেটেছে, গোশত কেটেছে। নিজে খেয়েছে, অন্যকে খাইয়েছে। আজ সেই টুলটা পশ্চিমা সভ্যতা নিয়েছে। সেটা দিয়ে ইসলামকে কাটছে, মুসলিমদের কাটছে, তৃতীয় বিশ্বকে কাটছে, পুঁজিবাদের জিভ দিয়ে রক্ত চুষে ফুলছে ফাঁপছে। যখন ইসলাম টুলটা ইউজ করেছিল, পরতে পরতে স্রষ্টাকে চিনেছে। আর ইউরোপ যখন ইউজ করছে, তখন স্রষ্টাকে অস্বীকার করছে। তাই টুলটার সাথে ইসলামের বিরোধ নেই। বিরোধ হলো—টুলটা যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, ওইভাবে ব্যবহার করে ‘যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে’—তার সাথে।
पश्चिमा সভ্যতা বিজ্ঞানের ঘোড়ার ওপর সওয়ার। আর বিজ্ঞানের ঘোড়াটার চোখে পরানো ঠুলি (blinders), ঠুলির নাম ‘প্রকৃতিবাদ’। জগতের প্রতিটি ঘটনাকে জাগতিক ব্যাখ্যা করা। বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা করা। যেমন ধরেন, মন কী? বিজ্ঞানের চোখে মন জাস্ট কিছু কেমিক্যাল ক্রিয়াবিক্রিয়া। কারণ ওটুকুই বিজ্ঞান মাপতে পারে।
যা মাপা যায় না, সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান যতটুকু পারে বস্তুগত সম্ভাবনার কথা বলবে, নয়তো চুপ হয়ে যাবে। এজন্য আত্মা, স্রষ্টা এসব বিষয়ে বিজ্ঞানের চুপ থাকার কথা। কিন্তু বাড়াবাড়িটা যে করে তার নাম ‘বিজ্ঞানবাদ’ (scientism)। বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদের মধ্যে পার্থক্য কী তাহলে?
টিকাঃ
১. সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮৩
📄 বিজ্ঞানবাদ
বিজ্ঞানের কাছেই সবকিছুর জবাব। বিজ্ঞান সবকিছু আমাদের জানিয়ে দেবে। সব সমাধান করে দেবে। যা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না তার অস্তিত্বই নেই। যার জবাব বিজ্ঞানের কাছে নেই, তা কুসংস্কার। এই অগাধ অতিবিশ্বাসকে বলে বিজ্ঞানবাদ।
বিজ্ঞান একটা টুল, আর বিজ্ঞানবাদ একটা ধর্মবিশ্বাস : বিজ্ঞান পারবেই। বিজ্ঞান যেখানে চুপ, বিজ্ঞানবাদ সেখানেও সরব। যেমন পীর চুপ, কিন্তু মুরিদ লাফায়, সেরকম। যার বস্তুগত ব্যাখ্যা করা যায় না, সেখানে বিজ্ঞান বলছে, এটা আমার ফিল্ড নয়। আর বিজ্ঞানবাদ বলছে, বিজ্ঞানের নীরবতা মানে ওটা আসলে নেই-ই, ওটা কুসংস্কার। এই জায়গাটা মুসলিম বিজ্ঞানপড়ুয়াদের বুঝতে হবে। King's University College-এর মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর Imants Barušs-এর মতে—
| বিজ্ঞান | বিজ্ঞানবাদ |
| :--- | :--- |
| open-ended exploration of reality, based on logical thinking about empirical observations. | বাস্তবতার ‘বস্তুবাদী ভার্সন’টার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকা, যা অনুসন্ধানকে আটকে দেয় কেবল ওই সকল বিষয়ের ভেতরেই, যেগুলো বস্তুবাদ অনুমোদন করে। |
| বাস্তবতার অনুসন্ধানে অন্তহীন যাত্রা, যার ভিত্তি হলো পর্যবেক্ষণ-লব্ধ জ্ঞানের ওপর যুক্তিগ্রাহ্য চিন্তাভাবনা। | |
বিজ্ঞান হলো একটা চলমান অনুসন্ধানী কার্যক্রম, বিজ্ঞানবাদ হলো একটা দার্শনিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি (worldview)।
কখনোই বিজ্ঞান বলবে না, আল্লাহ আছেন কিংবা করোনা আল্লাহর গযব। আধুনিক বিজ্ঞান সবকিছুর একটা বস্তুগত ব্যাখ্যা দাঁড় করাবে। যেমন: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনা। কুরআনে সুরা কমারে রয়েছে। সুতরাং, ধর্মীয়ভাবে অকাট্য আমাদের কাছে। প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ্দ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনা আছে যিনি ওই সময় নবিজির সাথেই বসা ছিলেন। সে হাদিস শুদ্ধতার ফিল্টারে উত্তীর্ণ। (এই শুদ্ধতার ফিল্টার সম্পর্কেও আমাদের আইডিয়া ভয়ংকর-রকম হতাশাজনক।) আবার সেসময় কাফিররা বহিরাগত নন-আরবদের থেকে যাচাইও করে নিয়েছিল যে, তারাও দেখেছে কি না।
সেসময় বিজ্ঞান থাকলে কী বলত? চন্দ্রে ভূমিকম্প হয়েছে, প্লেট সরে গেছে বা কোনো বড় গ্রহাণুর আকর্ষণে এমনটা হয়েছে। পরে আবার মহাকর্ষের কারণে জোড়া লেগে গেছে। এরকমই একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হতো। ব্যাখ্যা দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব, রাসুলের আগমন, মুজিযা এগুলো বাইপাস করে ফেলা হতো। এমন একটা ব্যাখ্যা দেয়া হত, যেন এটা এমনিতেই হতে পারে, স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। যেমন সরাসরি স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার না করে স্টিফেন হকিং বলেছেন: (মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য) স্রষ্টার দরকার নেই। যাদের বাইপাস করার, সেই যাদুবিদ্যা তুকতাকের যুগে 'যাদুকর' বলে বাইপাস করেছিল। এই বিজ্ঞানের যুগে হলে আমরা বিজ্ঞানের নামে বাইপাস করতাম। একই হলো। আজকের এই করোনা যে 'আল্লাহর গযব' এটা একজন মুসলিম হিসেবে আপনাকে চিনে নিতে হবে এবং সেটা 'পশ্চিমা বস্তুবাদী বিজ্ঞান' (নট বিজ্ঞান টুল) আপনাকে চেনাবে না। চেনাবে আপনার ঈমানের 'ইন্দ্রিয়'। ঈমানের ইন্দ্রিয় আপনাকে বিজ্ঞানের ফাইন্ডিং টুল আর ওহিকে (কুরআন-হাদিস) কো-রিলেট করিয়ে দেবে। আর যদি কো-রিলেট না করতে পারেন; ডাক্তারদের গ্রুপে কেন মধু-কালোজিরার পোস্ট দেওয়া হলো, সেজন্য হা হা রিয়্যাক্ট দিতে মনে চায়। তাহলে ধরে নেবেন কেবল নামটাই আরবি, ঈমানের ইন্দ্রিয় অন্ধ। 'তাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে'... 'দেখেও তারা দেখে না, শুনেও তারা শোনে না'... 'অন্ধ, বধির, মুক... তারা ফিরবে না।' মুসলিমের সন্তান হলেও আল্লাহর খাতায় হয়তো মুসলিমের তালিকায় আপনি নেই। অবশ্য না থাকলেই কী আসে যায়, এমনটা মনে হলে, নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনি আসলেই নেই।
এগুলো সব রিসার্চ রেজাল্ট। প্যারাডক্সগুলো দেখেন। কীভাবে গত ৫ মাসে তথ্যগুলো বদলে গেছে খেয়াল করেন। হাবুডুবু নাকানি-চোবানিটা লক্ষ্য করতে হবে।
১ক ফ্লু ভাইরাসগুলো এনভেলপড (আবরণযুক্ত)। উচ্চতাপমাত্রায় আবরণ নষ্ট হয়ে ভাইরাস অকেজো হয়। ফ্লু-ভাইরাসেরই জাত করোনা। ফলে গরম পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে। ভৌগোলিকভাবে এত থেকে এত অক্ষাংশের শীতপ্রধান দেশগুলোই আক্রান্ত।
১খ কয়েকদিন পর সৌদি-ইরান-মালয়-ইন্ডিয়া সব গরমের দেশগুলো আক্রান্ত। ল্যাবে ৯২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তক গরমে ভাইরাসটা কর্মক্ষম।
২ক শুধু ম্যান-টু-ম্যান কনটাক্টে ছড়ায়।
২খ বাতাসে ৩ ফুট পর্যন্ত যায়, এরপর মাটিতে পড়ে যায়।
২গ বাতাসে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ভাসে।
৩ক সার্ফেসে (বস্তুর ওপর) ৭২ ঘণ্টা বাঁচে। এর মধ্যে মানবদেহে ঢুকতে না পারলে অকেজো হয়।
৩খ সার্ফেসে ৭-১০ দিন পর্যন্ত বাঁচে।
৪ক শুধু বয়স্করা মরছে। যুবকরা লক্ষণই প্রকাশ করে না। করলেও সামান্য, ঠিক হয়ে যায়। শিশুরা তো একেবারেই সেফ।
৪খ আমেরিকা হাসপাতাল ভর্তি ২৯%-এর বয়স ১৮-৪৪। নিউইয়র্কে ৫০%। আইসিইউ লেগেছে যাদের, তাদের ১২%-এর বয়স ১৯-৪৪। বাংলাদেশে ২১-৪৬ রোগী ৪৬%।
৫ক হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (HCQ) আমাদের আশা। সব মার্কেট আউট।
৫খ HCQ এর খুব একটা উপকার নেই; বরং আইসিইউতে মরেছে বেশি।
৬ ভ্যাকসিন তৈরি করতে ১-২ বছর সময় তো লাগবে।
৭ ভ্যাকসিন তৈরি না-ও হতে পারে। (WHO)। বহু ভাইরাসের ভ্যাকসিন হয়নি (ইবোলা, এইডস)
জাপানি ওষুধটা কার্যকর। দাম ফুল কোর্স ৬ লাখ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ Remdesivir মানব পরীক্ষায় ব্যর্থ।
ভাইরাসটা নতুন, আমরা এখনো এটা সম্পর্কে সব জানি না, জানছি।
ভাইরাস বারবার জিন মিউটেশন করছে। চরিত্র বদলাচ্ছে।
এ তো গেল প্রথম ৬ মাসে। আর গত দেড় বছরে কত পরস্পরবিরোধী কথা আমরা শুনেছি। ভ্যাকসিন নিয়ে কত মতামত-কাউন্টার, কত জল্পনা কল্পনা। বিজ্ঞানের এই হাবুডুবু-র সিরিয়ালটা আর কতদূর গেলে আমার সোকল্ড আত্মসমর্পিত 'মুসলিম মন' স্বীকার করবে এটা 'আল্লাহর গযব'। মানবজাতির অহংকার, দ্য গ্রেট 'সায়েন্স' বিগত দিনগুলোতে এটা-ওটা-সেটা বলছে। আশায় বুক বেঁধে সামনে যা পাচ্ছে আঁকড়ে ধরছে। কখনো বয়স, কখনো তাপমাত্রা, কখনো ভূগোল, কখনো বিসিজি ভ্যাকসিন, কখনো হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। 'ফী নারি জাহান্নামা খলিদীনা ফীহা' মিস্টার অভিজিৎ রায় লিখেছিল, 'বিজ্ঞান এতদূর এগিয়েছে, এতদূর এগিয়েছে, যদি স্রষ্টা থাকতই, তাহলে এতদিনে আবিষ্কার হয়ে যেত।' আর এদিকে পিকোমিটার, ফেমটোমিটারের ক্ষুদ্র একটা ভাইরাস এখনো বিজ্ঞানের কাছে অচেনা রয়ে গেল। উনি বেঁচে থেকে দেখে গেলে ভালো হতো। বস্তুবাদী সভ্যতা বস্তুর বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। আমি আপনিও কি তাই? তাহলে যা পার্থক্য গড়ে দেবে সেটা কই? ঈমান কোথায়? ঈমানের অস্তিত্ব, উপযোগিতা, ব্যবহার, কার্যক্ষমতা কোথায়? নাকি শুধু মুখে, শুধু নামে, শুধু দাবিতে। একটা রূপকথার মতো, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। 'অস্তিত্বহীন ঈমান'কে কী বলে? এত অস্পষ্ট কেন আমার পরিচয়? কে আমি?
টিকাঃ
১. সুরা কমার, আয়াত : ১
২. সহিহ বুখারি: ৩৮৬৯; সহিহ মুসলিম: ২৮০০; জামি তিরিমিযি: ৩২৮৫; মুসনাদ আহমাদ: ৪৩৬০
📄 আল্লাহ কে?
গযব বা গদ্বব শব্দের অর্থ ক্রোধ, রাগ, Wrath, Anger. আল্লাহ আবার রাগেন?
জি। ক্রোধ আল্লাহর সিফাত। আল্লাহ স্বয়ং নিজের জন্য যেসব সিফাত বা গুণ সাব্যস্ত করেছেন। আমরাও সেগুলো সাব্যস্ত করি, কিন্তু এগুলোর ধরন জানি না এবং এগুলো আমাদের সদৃশ নয়। যেমন কালাম, আল্লাহ কথা বলেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি কথা বলেন, আমরাও মেনে নেব, তিনি কথা বলেন, কিন্তু কীভাবে বলেন তা জানি না, সেটা সৃষ্টির ধরনের নয়। আমাদের যেমন ফুসফুসের বাতাস বেরোতে থাকে আর দাঁত জিহ্বা ঠোঁটে ধ্বনি উচ্চারণ করে কথা বলি, তাঁর কথা এমন নয়। কেমন, আমরা জানি না। তবে আমাদের সদৃশ যে নয়, এটা নিশ্চিত। لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئُ (লাইসা কামিসলিহি শাইয়ুন)-কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। সৃষ্টিজগতে তাঁর কোনো সদৃশ নেই, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই।। তিনি অমুখাপেক্ষী, কথা বলার জন্য তিনি ফুসফুস-জিহ্বা এগুলোর মুখাপেক্ষী নন। এগুলো সৃষ্টির লাগে, স্রষ্টার লাগে না।
» আমাদের আল্লাহ জড়বস্তু নন। তিনি জীবিত, চিরঞ্জীব (আল হাইয়্যু)।
» তিনি সৃষ্টিজগতের প্রতি উদাসীন নন। তিনি কেয়ারিং। তিনি সব দেখছেন (বাছীর), সব শুনছেন (সামিউ), সব খবর রাখছেন (খাবীর)।
» তিনি সৃষ্টিকে ভালোবাসেন (রউফ), স্নেহ করেন (ওয়াদুদ) মাতৃপেক্ষা বেশি।
তিনি রহম করেন জালিম-মাজলুম সবাইকে (রাহমান), জালিমের ওপর ধৈর্য ধারণ করতেই থাকেন (হালীম/সবুর)।
মাফ করেন (গফুর), সর্বোচ্চ পর্যায় অব্দি মাফ করতে থাকেন (গাফফার)।
আবার তিনি প্রতিশোধ নেন (যুনতিকাম), ক্রোধান্বিত হন (কাহহার)। ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে জালিমের ওপর তিনি প্রতিশোধ নেন। মাজলুমের পক্ষে।
তবে তাঁর রহম তাঁর ক্রোধের ওপর বিজয়ী।
তিনি ইনসাফ করেন (আদিল), ক্রোধে তিনি সৃষ্টির মতো ন্যায়হরণ করে বসেন না।
তিনি চান আমরা ভালো থাকি, সুখে থাকি। ন্যায় করি। অন্যায় করে তাঁর গযব ডেকে না আনি। এজন্য তিনি আমাদের সাথে কমিউনিকেট করেন। নবিদের মাধ্যমে কিতাব পাঠিয়ে সতর্ক করেন। কীভাবে চলতে হবে জানান। আমার জমিনে আমার দেখানো নিয়মে চলো, তোমরাও ভালো থাকো, আমার সৃষ্টিকেও ভালো থাকতে দাও। আমার অবাধ্য হয়ো না। 'আমার ক্রোধ তোমরা সহ্য করতে পারবে না, তারপরও তোমরা অবাধ্য হচ্ছো?'
তিনি স্বত্বাধিকারী (মালিক), শাসক (হাকাম), প্রতিপালক (রব)।
সুতরাং, ক্রোধ আল্লাহর সিফত বা গুণ। তিনি জড় নন, নির্জীব নন, বেখেয়াল নন। বান্দারা সীমা অতিক্রম করে ফেললে তিনি গযব পাঠান। কেন? وَلَئِذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ 'বড় আযাব (পরকালে)-এর আগে আমি অবশ্যই তাদেরকে ছোট কিঞ্চিৎ শাস্তি (দুনিয়াতে) আস্বাদন করাই, যাতে তারা ফিরে আসে।' ফেরানোর জন্য। মুমিনদের আল্লাহ আযাব পাঠান ফেরানোর জন্য। আর কাফিরদের পাঠান ধ্বংসের জন্য। কাফিরদের জন্য কখন পাঠান? তাদেরকে সুযোগের পর সুযোগ দেন। দুনিয়াতে কাফিরদেরকে আল্লাহ তাদের কুফরের জন্যও আযাব দেন না। শিরক সবচেয়ে বড় গুনাহ, এজন্যও আযাব পাঠান না। কাফিরের কুফর, মুশরিকের শিরকের শাস্তি জাহান্নামে অনন্তকাল চলবে। দুনিয়ায় আল্লাহ তাদের আরাম-আয়েশের সুযোগ দেন। বেশি করে দেন। তাহলে দুনিয়ায় গযব কখন আসে? দেখুন-
নুহ আলাইহিস সালামের জাতিকে সাড়ে ৯০০ বছর সুযোগ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নুহ আলাইহিস সালামকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। চূড়ান্ত স্পর্ধা। বিশ্বজাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহর দূতকে হত্যার হুমকি?
আদ জাতিকে ধরেছেন যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আবার কেডায়?'
সামুদ জাতির দাবিমতো পাথরের ভেতর থেকে উট বের করে দেখিয়েছেন আল্লাহ। সেই উটের স্পেশাল নাম দিয়েছেন 'নাক্বতুল্লাহ' (আল্লাহর উট)। এতকিছু চোখের সামনে দেখেও সেই উটকে তারা হত্যা করেছে। কত বড় স্পর্ধা!
ফিরআউন কতশত বছর বনি ইসরাইলের ওপর জুলুম করেছে। মায়ের কোল থেকে ছেলে বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করার মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ করেছে। আল্লাহ শাস্তি দেননি। অবশেষে চূড়ান্ত স্পর্ধা দেখিয়েছে ফিরাউন, 'আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব?'
কওমে লুত শিরক করেছে, সমকাম করেছে শত শত বছর। আল্লাহ ধরেননি। কখন ধরেছেন? যখন তারা স্পর্ধা দেখিয়েছে, 'লুত, তোমাকে আমরা বের করে দেবো, বেশি সুশীল হয়েছো, খুব পবিত্র হয়েছ, না?' তারা জানত তারা নাপাক কুৎসিত একটা কাজ করছে। সেটা জেনেই তারা করছে ও করবে। পারলে লুত কিছু কইরো।
কারুন তো বনি ইসরাইলেরই ছিল। যাকাতের হুকুম হয়েছে। সে দিলো তো না-ই, স্পর্ধা দেখাল, 'এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন নাকি? এগুলো তো আমি নিজ যোগ্যতায় কামিয়েছি।'
আল্লাহর গযবের একটা কমন প্যাটার্ন দেখুন : স্পর্ধা, অহংকার। শিরক-কুফর- জুলুম সব আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন দুনিয়াতে। গযবের এপিসেন্টার হলো এই ঔদ্ধত্য, স্পর্ধা, অহংকার, বড়াই। সভ্যতার চূড়ায় থাকা জাতিগুলো যখন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর সাথে স্পর্ধা দেখিয়েছে, আল্লাহর ক্রোধ আপতিত হয়েছে। আমি জানি আপনাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে। যদি আল্লাহর গযবই হয়, তাহলে মুসলিম মরে কেন রে ব্যাটা?
টিকাঃ
১. সুরা শুরা, আয়াত : ১১
১. সুরা সাজদা, আয়াত: ২১
১. সুরা নাযিয়াত, আয়াত: ২৪
২. 'নিশ্চয় কারুন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল।' [সুরা কাসাস, আয়াত :৭৬] বাহ্যত এখান থেকে এ ধারণার উদ্রেক হতে পারে, সে সম্ভবত বনি ইসরাইলের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। কারণ, আয়াতে তাকে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলা হয়েছে, কিন্তু এ ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ, এখানে "মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলতে শুধু এটা বোঝানো হয়েছে যে, সে ছিল মুসা আলাইহিস সালামের বংশীয় লোক। অর্থাৎ সে মুসা আলাইহিস সালামের চাচাতো ভাই ছিল। এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরদের মত; যেমনটি ইমাম ইবনু জারির তাবারি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন। [তাফসিরত তাবারি, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৬১৫-৬১৬] আয়াতে 'মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত' বলে এ বংশীয় সম্পর্ক ও আত্মীয়তার কথাই বোঝানো হয়েছে। এটা বোঝানো হয়নি যে, সে মুসা আলাইহিস সালামের কওমের অন্য লোকদের মতো মুমিন ছিল। তার অন্যান্য কর্মকাণ্ডও প্রমাণ করে, সে মুমিন ছিল না; বরং সে ছিল একজন কাট্টা কাফির। শারয়ি সম্পাদক