📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 শিল্প ধ্বংস

📄 শিল্প ধ্বংস


কীভাবে সর্বোচ্চ জিডিপির দেশে লাগাতার দুর্ভিক্ষ লাগাতে হয়, তা তো দেখেছেনই। এবার দেখুন কীভাবে শিল্পোন্নত একটা দেশকে কৃষিপ্রধান বানাতে হয়। মোগল আমলে ঠিক যে পরিমাণ মানুষের পেশা ছিল কৃষি, প্রায় কাছাকাছি (৪০%) মানুষের পেশা ছিল শিল্প। বাণিজ্যপ্রধান এলাকা ছিল এদেশ। প্রধান রপ্তানিপণ্য ছিল: মসলিন-সিল্ক-কিংখাব-প্রিন্টের কাপড়, অ্যাম্ব্রয়ডারি, পাটের গালিচা, তামা-পিতলের পাত্র, গহনা, লেদার প্রোডাক্ট, অস্ত্রপাতি, পারফিউম, হাতির দাঁতের কারুকাজ, কাগজ যেত ইউরোপ-আমেরিকায়[১]। সুলতান আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ের একটি চিঠি লেখেন ফ্রান্সের অর্থসচিব মশিয়ে কলবার্টকে। তাতে তিনি মুঘল আমলে ভারতের শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লেখেন-
G হিন্দুস্তান প্রসঙ্গে একটি বিষয় লক্ষণীয়। সোনা-রুপা পৃথিবীর অন্য সব জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত হিন্দুস্তানে এসে পৌঁছায় এবং হিন্দুস্থানের গুপ্ত-গহ্বরে অন্তর্ধান হয়ে যায়। আমেরিকা-ইউরোপের সোনা এসে জমে তুরস্কে, তুর্কী পণ্যের বিনিময়ে। আর যেত ইয়ামেনে, ইয়ামেনি কফির বদলে। আর তুরস্ক-ইয়ামেন- পারস্য সবারই দরকার হিন্দুস্তানি পণ্য। ডাচ ব্যবসায়ীরা জাপানের সাথে বাণিজ্য করে যা পেত, তাও এসে জমা হতো ভারতে। যা কিছু পর্তুগাল-ফ্রান্স থেকে আসে, তাও ফেরত যায় না। তার বদলে হিন্দুস্তানের পণ্যের চালান যেত।... এর কারণ হলো, হিন্দুস্তানের বণিকরা সোনা দিয়ে দাম শোধ না করে, পণ্য দিয়েই দাম দিত। আর পণ্যের পসরা নিয়ে দেশ-বিদেশে গেলে, সেই জাহাজেই তাল তাল সোনা বোঝাই করে ফেরত আসত [১]।

উপমহাদেশের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্প ছিল ইংল্যান্ডের তাঁতিদের চক্ষুশূল। সপ্তদশ শতকে ইংরেজ তাঁতিদের দাবির মুখে বাধ্য হয়ে আইন করে ভারতীয় কাপড়ের প্রবেশ বন্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। শিল্পবিপ্লব শুরুর পর যন্ত্রচালিত কারখানার নিম্নমানের কাপড় বিক্রির বাজার সৃষ্টি করার জন্য ভারতের বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করে দেবার বিকল্প ছিল না। নিজের বাজার ভারতীয় পণ্যের জন্য বন্ধ, আর ভারতের বাজার তাদের পণ্যের জন্য মুক্ত। ১৭ মার্চ ১৭৬৯-এর এক আদেশবলে কোম্পানি তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে: ভারতে কাঁচা রেশম উৎপাদন বাড়াতে হবে, রেশমবস্ত্র উৎপাদন কমাতে হবে। ঘরে উৎপাদন করতে দেওয়া যাবে না, বলপ্রয়োগে রেশমশিল্পীদের 'কোম্পানির ফ্যাক্টরি'-তে এসে কাজ করতে বাধ্য করা হবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই আদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। বলা হয়াখ—
এই আদেশ একটি নিখুঁত পলিসি-প্ল্যান—একই সাথে বাধ্য করা এবং উৎসাহিত করা। ফলে বাংলার শিল্পকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ধ্বংস করবে। এর ফলে ওই শিল্পোন্নত দেশটির চেহারাই পাল্টে যাবে, বরং গ্রেটব্রিটেনের শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামালের এক ময়দানে পরিণত করাই উদ্দেশ্য।
নিজ ঘরে রেশমশিল্পীরা যেন কাজ করতে না পারে, কোম্পানির স্বার্থে কেবল যেন কোম্পানির ফ্যাক্টরিতেই কাজ করে, এজন্য সরকারি ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হওয়া চাই। পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর শাস্তির দ্বারা সরকারি ক্ষমতাবলে এটা করা হোক তারা চায় (কোম্পানি)।

কারিগরদের বেতনের লোভ দেখিয়ে ফিরিয়ে রাখা হবে তাঁত থেকে, যাতে আমাদের জন্য কাঁচামাল রয়ে যায়। তাদেরকে আমাদের কারখানায় আটকে দেওয়া (locked up) হবে। তাদের যে পণ্য আগে বিকাশলাভ করেছিল, উচ্চমূল্য করে দিয়ে, তা ক্রমে ক্রমে নিঃশেষ করে দেওয়া হবে গ্রেটব্রিটেনের ক্ষমতাবলে।
এইসব বিধিনিষেধ আর উৎসাহের দ্বারাই বাংলায় আমাদের চাওয়া পূর্ণ হবে। শ্রমকে শিল্প থেকে কাঁচামালের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এই পলিসির ফলে কাঁচা রেশমের উৎপাদন ব্যাপক বেড়েছে।

ব্রিটিশ ব্যবসায়ী William Bolts তার Considerations on India Affairs পত্র সংকলনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভয়াবহ লুটপাটের খতিয়ান তুলে এনেছেন। তিনি লেখেন-
পুরো দেশজুড়ে শিল্পশ্রমিকদের ওপর হেন অত্যাচার নেই, যা করা হতো না। অত্যাচারের পরিমাণ বাড়তেই থাকত, বিশেষ করে তাঁতিদের ওপর। তাঁতি, দালাল ও পাইকারদেরকে উৎপাদন-সংগ্রহের কোটা পূরণ না হবার জন্য গ্রেপ্তার, জেল, মোটা জরিমানা, চাবুকপেটা এবং নিজ ভূমি থেকে বহিষ্কার করা হতো। কম উৎপাদন করলে তাঁতিদের পণ্য ছিনিয়ে নেয়া হতো দাম ছাড়াই। কাঁচা রেশমশিল্পীদের ওপরও এরকম অত্যাচার হতো। এমন ঘটনাও জানা গেছে, এই বাধ্যশ্রম থেকে বাঁচতে তাঁতিরা নিজেদের বৃদ্ধাঙ্গুলিই কেটে ফেলেছে। লর্ড ক্লাইভের সময় তো আর্মেনীয় বণিকদের কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়ে রেশমচাষীদের জোর করে ইংরেজ কারখানায় আনা হয়েছে। (পৃষ্ঠা : ১৯৪)।
শিল্পোন্নত ভারতবর্ষ-বাংলাকে এভাবেই সাম্য-ভ্রাতৃত্ব-স্বাধীনতা দিয়ে কৃষিপ্রধান দেশ বানিয়ে দেওয়া হলো। আর নেটিভরা ভাবল তারা উন্নত হচ্ছে, ব্রিটিশরা তাদের সভ্যতা শেখাচ্ছে। ইউরোপের ফর্মুলা মানলেই নেটিভরা উন্নত হতে পারবে, ঠিক একদিন, তোমরা দেখে নিয়ো।

টিকাঃ
[১] A journey from Madras through the countries of Mysore, Kanara and Malabar, Francis Buchanan MD, Fellow of Royal Society.
[১] বাদশাহি আমল, বিনয় ঘোষ, পৃষ্ঠা: ৬৯-৭১
[২] Ninth Report of the House of Commons Select Committee on Administration of Justice in India, 1783, আর্টিকেল ৯১-৯২-৯৩.
[১] William Bolts, Merchant And Alderman, Or Judge Of The Hon. The Mayor's Court Of Calcutta, Considerations on India Affairs, 1772

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 সব টাকার খেলা

📄 সব টাকার খেলা


প্রজা ও জমিদারের মাঝে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী অংশটার উৎপত্তি ষোড়শ শতক থেকে। উপনিবেশের মাধ্যমে ইউরোপের পুঁজি বাড়ছে, ব্যবসাপাতি বাড়ছে। জমিদারেরা ছিল এদের বিকাশে বাধা। কারণ এই বণিকেরা ছিল উৎপাদক প্রজা আর শোষক জমিদারের মাঝখানে, যাদেরকে জমিদারেরা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত, ব্যবসায় বিধিনিষেধ-খাজনাপাতি আরোপ করে।[১] অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড বলেন-
ষোড়শ শতকে এই নতুন শিশু অর্থনীতি (পুঁজিবাদ) থেকে জন্ম নিল নতুন মনোভাব-বাজার-মানসিকতা, যার মূল্যবোধগুলো ভিন্ন ধরনের।... ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেবার প্রচেষ্টা। ভ্রাতৃভাবের চেয়ে প্রতিযোগিতাই দরকারি মানসিকতা এই নতুন ব্যবস্থাতে।... ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।... অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝেই এই নব্য অর্থনৈতিক ধারণা একটা 'সর্বজনীন জীবনধারা'য় পরিণত হয়ে পড়ে (পুঁজিবাদ)। সেক্যুলার ও বস্তুবাদী মূল্যবোধ, যা দ্বারা পশ্চিম ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকার মানুষ প্রভাবিত, এই নতুন দর্শনই ছিল তার ভিত্তি।১]
সুতরাং,, জমিদারদের সাথে এই ব্যবসায়ীদের একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ওদিকে জমিদার-রাজাদেরকে হাওয়া দেয় চার্চ। জমিদার-চার্চ-রাজা— এই পুরো সিন্ডিকেটটাই ব্যবসায়ীদের শত্রু। অবশেষে বাটে পাওয়া গেল সিন্ডিকেটকে। যাজকদের অনৈতিকতা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ডাইনি-নিধন, বুবোনিক প্লেগ, চার্চ-সমর্থিত সামন্ততন্ত্রের অত্যাচার, ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট যুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ ইউরোপে শুরু হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন—এনলাইটেনমেন্ট। জমিদারদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেবার দর্শন দেওয়া হতে লাগল: মার্কেটাইল অর্থনীতি, ফিজিওক্রাট, এরপর লিবারেল। ব্যবসাপাতির পক্ষে যা উপকারী, যেমন : ক্রেতার ভোগের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মালিকানা, সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকা ইত্যাদি আলোচনা এনলাইটেনমেন্ট দর্শনে চলতে থাকল। জন্ম নিল পুঁজিবাদ, মুনাফাই যার লক্ষ্য। উপনিবেশ ও শিল্পবিপ্লবের মওকায় পুঁজির বিকাশে বিকশিত হলো এই মধ্যবিত্ত শিল্পপতিরা। শুধু কি তাই, এই এনলাইটেনমেন্ট ফিলোসফারদের একটা বড় অংশ নিজেরাই ছিলেন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী (জন লক, স্টুয়ার্ট মিল)।

পরবর্তী শতকগুলোতে ‘এনলাইটেনমেন্ট’-এর যুগে ইউরোপের নৈতিকতার যে বিবর্তন, তা যেন পুষ্টি জুগিয়েছে এই শিশু অর্থনীতিকেই, ব্যবসা-মনোবৃত্তিকেই। বলা হয়েছে—
■ মানুষ স্বভাবগতভাবে স্বার্থপর (Thomas Hobbes)। এমন পরিবেশ করে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যাতে প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বার্থ সর্বোচ্চ চরিতার্থ করতে পারে।
■ জীবনের লক্ষ্য হলো সর্বাধিক সুখ চরিতার্থ করা (ভোগ) এবং সর্বনিম্ন কষ্ট পাওয়া (maximizing pleasure and minimizing pain)। [hedonistic principle, John Locke]
∎ এটা করতে চাই সর্বাধিক স্বাধীনতা। জন্তু থেকে ব্যক্তি (human) তখনই হতে পারবেন, যখন হবেন ‘পরিপূর্ণ স্বাধীন’ (Jean-Paul Sartre)।

আর তখনই স্বাধীন বলা হবে-যখন কেউ আগের কোনো মূল্যবোধকে (ধর্ম) মেনে না নেবে। সে মূল্যবোধ-নৈতিকতা নিজে ঠিক করে। (Values are not recognized by you, values are determined by you)।[১] সে-ই স্বাধীন ‘ব্যক্তি’ যে নৈতিকতার স্রষ্টা, নিজের নৈতিকতা নিজেই ঠিক করে (creator of values) [Kierkegaard] [২] বাইরের কোনো নৈতিকতা (ধর্ম) তার ভোগ-ফুর্তিকে বাধা দেয় না।

রাষ্ট্রের কাজ হলো: সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক সুখ (ভোগ) নিশ্চিত করা (greatest good for the greatest number)। [utilitarianism, Jeremy Bentham]
এটা করতে গিয়ে কোনো কাজ ততক্ষণই বৈধ, যতক্ষণ তা অন্য কারো ক্ষতি না করছে। [harm principle, John Stuart Mill]
এজন্য যদি কোনো কাজে কারো সম্মতি থাকে, তাহলে তা বৈধ। সম্মতি না থাকলে অবৈধ। [consent-based model]

খেয়াল করলে দেখা যায়, এই প্রতিটি কথাই বৈধ-অবৈধের নতুন ধারণা দিচ্ছে, যা ব্যবসার অবাধ সুযোগ তৈরি করে। যা যা ব্যবসাকে, পণ্য বিক্রয়কে বাধা দেয়; মুনাফা ও ভোগের ওপর নৈতিকতা আরোপ করে, ভোগকে নয়, ত্যাগকে উৎসাহিত করে—এমন সবকিছুকে (ধর্ম, পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ) ভেঙে অকার্যকর করে দিতে পারলে লাভেই লাভ। আর রাষ্ট্র হবে সর্বশক্তিমান, যা সযত্নে রক্ষা করবে পুঁজিপতিদের অবাধ ব্যবসার স্বার্থ। কীভাবে করে—

ক. আগের ধর্মভিত্তিক নৈতিকতা ভোগকে নিরুৎসাহিত করে, ত্যাগকে উৎসাহিত করে। সুতরাং, ‘ব্যক্তি’র নতুন সংজ্ঞা দাও: যে নিজের ভালোমন্দ নিজে ঠিক করে সে human, সেই আলোকিত। বাকি সবাই অন্ধকার যুগের মানুষ। এভাবে ধর্মকে হটিয়ে হিউম্যানিজম, ধর্মনিরপেক্ষতা, লিবারেল ইথিক্সকে আনা হলো।
খ. পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য মানুষ ত্যাগ করে, sacrifice করে, যা ভোগকে কমায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আদর্শের দ্বারা তৈরি হবে স্বার্থপর মানুষ, যার ফোকাস হবে শুধু নিজের ভোগ। পরিবারের পিতা সন্তানকে Deterred consumption শেখায়, কম ভোগ করতে শেখায়। যে পরিবারে বাবা থাকে না, সে পরিবারের সন্তানরা হয় compulsive consumer.[১] সুতরাং, ব্যক্তিসাধীনতা, নারীবাদ প্রভৃতি ব্যবহার করে পরিবার ভেঙে দাও, দুর্বল করে দাও, পরিবার গঠন পিছিয়ে দাও, লিভ-টুগেদারভিত্তিক ভঙ্গুর পরিবার (fragile family) তৈরি করো। বাপকে সন্তান যেন না পায়, নিজের ভোগ স্যাক্রিফাইস করার মতো কেউ যেন না থাকে।
গ. স্বাধীন মানুষ নিজের ইচ্ছার দাসত্ব করবে। ফলে স্বাধীনতা বৃদ্ধি করবে ভোক্তাসংখ্যা। পরাধীন ব্যক্তির ভোগ সীমিত। নেগেটিভ ফ্রিডমকে প্রোমোট করো, সব বাধা ভেঙে দাও। কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না। লিবারেল, সমতা, সমানাধিকার। আগে স্বামী-স্ত্রী মিলে এক গাড়ি কিনত। এখন দুজনের দুটো গাড়ি, ডাবল ডাবল পণ্য বিক্রি হবে।
ঘ. সমতা ও তা থেকে উৎসারিত অন্যান্য আইন প্রত্যেকের ভোগের অধিকার নিশ্চিত করবে।

ঠিক এভাবেই এনলাইটেনমেন্টের পুরো কাঠামোটাই পুঁজিবাদের পক্ষে কাজ করবে। ভোগ বাড়লে ক্রেতা বাড়বে, ক্রেতা বাড়লে পণ্য বেশি বিক্রি হবে, বেশি বিক্রি মানে বেশি মুনাফা-পুঁজিবাদ। যা যা এই ভোগকে নিরুৎসাহিত করে, ভোগের অবাধ স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়: ধর্ম, পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ-সবকিছুকে ভেঙে অকার্যকর করে দিতে পারলে লাভেই লাভ। আর রাষ্ট্র হবে সর্বশক্তিমান, যা সযত্নে রক্ষা করবে পুঁজিপতিদের অবাধ ব্যবসার স্বার্থ।
সমতা-স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দগুলো কেবল শ্রুতিমধুর উন্নত মূল্যবোধ নয়, প্রতিটি শব্দের পেছনে আছে অর্থনৈতিক দর্শন। একটা উদাহরণ দিলেই বাকি সবগুলো একসাথে ধরতে পারবেন। যেমন: পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে মানবিক অর্জনের মাঝে একটি হলো পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিলোপ (?)। আসলেই বিলোপ হয়েছে কি না, সে আলাপ পরে। তারা আইনকানুন বানিয়ে ফুল স্কেল বিলোপ করেছে। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল এই ৩০০ বছর দাসব্যবসা ছিল ইউরোপের অন্যতম লাভের ব্যবসা। Bank of England, Lloyds of London, Barclays Bank এরা সবাই দাসব্যবসার বিনিয়োগকারী। যেমন ধরেন, ব্রিটেনের Royal Africa Company প্রতিটা ট্রিপে ৩৮% লাভ করত ১৬৮০ সালের দিকে, আফ্রিকা থেকে একটা দাস ৩ পাউন্ডে কিনে আমেরিকায় বেচত ২০ পাউন্ডে। কলোনিগুলো থেকে যা রপ্তানি হতো, তার ৭৫% ছিল দাসশ্রম; কিন্তু... কী হলো এরপর?
» ১৮০৩ সালে ডেনমার্ক দাস 'ব্যবসা'কে অবৈধ করে।
» ১৮০৭-০৮ এ আমেরিকা ও ব্রিটেন নিজ নিজ দেশে দাস আমদানিকে অপরাধ সাব্যস্ত করে।
» ডাচরা ১৮১৪ সালে
» পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্স ১৮২০ এর মধ্যে

সালগুলো লক্ষ করুন। ৩০০ বছর ধরে চলা আমেরিকা-ইউরোপের অন্যতম লাভের ব্যবসাটা ১৭ বছরের মধ্যে তারা ধুমধাম গুটিয়ে দিয়েছে। যেসব দেশ দাসব্যবসা থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো, তারা সবাই উনিশ শতকের প্রথম ২০ বছরেই কেন ব্যবসা বন্ধ করে দিলো? কী এমন ঘটল যে, পুরোপুরি দাসপ্রথা-নির্ভর অর্থনীতি যাদের তারাই হঠাৎ করে দাসপ্রথাবিরোধী (abolitionist) হয়ে গেল?
■ ১৭৬০ এর পরে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হয়। নিত্যনতুন মেশিন আবিষ্কারের ফলে মার্কেটে নতুন দাসের প্রয়োজন কমে আসে, মানবশ্রমের দরকার হ্রাস পায়। ব্যাংকগুলো দাসব্যবসার চেয়ে এখন শিল্প কারখানায় বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
∎ উঠতি শিল্পপতি সমাজ এবং পুরোনো জমিদার সমাজ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। জমিদার সমাজ ছিল এই দাসব্যবসার মূল বিনিয়োগকারী এবং দাস দ্বারা কৃষির (plantation sector) মাধ্যমে লাভবান। যেমন The Royal Adventurers কোম্পানির মাথাদের মধ্যে ছিল ২ জন আন্ডারম্যান, ৩ জন ডিউক, ৮ জন আর্ল, ৭ জন লর্ড, ১ জন কাউন্টেস, ২৭ জন নাইটান। দাসকোম্পানিগুলোর নাম দেখেন : The Royal Adventurers, The Royal African Company ... নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এখানে রাজপরিবারের বা তাদের সমর্থনপুষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতা বা বিনিয়োগ রয়েছে। মানে দাসব্যবসা জমিদারদের, শিল্প-কারখানা পুঁজিপতিদের।
ফলে জমিদারদের শক্তি নিঃশেষ করতে দাসব্যবসা বন্ধ করে দাসপ্রথা বিলোপ করা প্রয়োজন। ওদিকে শিল্পপতিদের দাসের দরকার নেই, তাদের আছে যন্ত্র।
শিল্প প্রোডাক্ট বিক্রি করে আনতে হচ্ছে চিনি, আবার ওদিকে দাসদের দিয়ে উৎপাদন করানো হচ্ছে চিনি, ফলে শিল্পপণ্য বিক্রি ব্যাহত হচ্ছে।
আফ্রিকাতে পণ্য বিক্রির জন্য স্বাধীন ক্রেতা চাই। তাদেরকে দাস বানিয়ে নিয়ে যাওয়াটা জমিদারদের জন্য লাভজনক হলেও, ব্যবসায়ীদের লোকসান। সবদিক দিয়েই দাসপ্রথা শিল্পপতিদের জন্য লোকসান।
ওয়েস্ট ইন্ডিয়া ছাড়াও বিশ্বের নানা জায়গায় ততদিনে ব্রিটেনের উপনিবেশ গড়ে উঠেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার ব্যবসাগুলোর কর্ণধার জমিদারেরা, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার হলো ব্যবসায়ীরা। দাসপ্রথার পক্ষে-বিপক্ষে কারা ছিল একটু দেখলেই বুঝতে পারা যায়।

দাসপ্রথার পক্ষে রাজা ৩য় জর্জ রাজা ৪র্থ উইলিয়াম চার্চ
তৎকালীন প্রধান মানবাধিকার কর্মীরা:
» John Cay
» Bryan Blundell
» Foster Cunliffe
» মেয়র Thomas Leyland
» Heywood পরিবার
» Tarlton পরিবার
দাসপ্রথার বিপক্ষে
■ Thornton পরিবার (ইস্ট ইন্ডিয়া স্টকের মালিক)
■ Zachary Macaulay (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার)
■ James Cropper (ইস্ট ইন্ডিয়ার চিনির প্রধান আমদানিকারক)
■ Thomas Whitmore (পার্লামেন্টে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি)

দ্বিতীয়ত : অন্য কিছু বেশি লাভজনক ছিল ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য আফ্রিকার বাজারও প্রয়োজন, যে প্রয়োজনটা আগে ছিল না। সব কর্মক্ষম আফ্রিকানকে ধরে নিয়ে এলে পণ্য কিনবে কে?[১]
■ নতুন অর্থনীতিতে (পুঁজিবাদ) দাসপ্রথার চেয়ে waged labour বা বেতনভুক্ত শ্রমিক বেশি লাভের। কেননা দাস তো স্বাধীন ভোক্তা নয়; বরং বেতনভুক্ত শ্রমিক নিজেই ভোক্তা। আধুনিক অর্থনীতির জনক Adam Smith-এর মতে, যে ব্যক্তি সম্পত্তি অর্জন করতে পারে না, তার প্রবণতাই থাকে : খাবে বেশি, শ্রম দেবে কম। বেশি শ্রম সে কেন দেবে? তার তো লাভ নেই বেশি কষ্ট করে। সুতরাং,, দাসের চেয়ে স্বাধীন ভাড়াটে শ্রমিক বেশি economically superior. দাসের পেছনে যা খরচা হতো, সেটাই বেতনাকারে দেওয়া হবে। শ্রমিক ওভারটাইম করে করে ভোগ বাড়ানোর চেষ্টা করবে। কাজও পাওয়া গেল বেশি, ভোক্তার মার্কেটও বড় হলো।

সুতরাং, ব্যবসায়ীদের নতুন অর্থনীতির জন্য দাসপ্রথা ছিল একটা লস-প্রোজেক্ট। যার কারণে উনিশ শতকের নতুন অর্থনীতি, নতুন রাজনীতি এবং নতুন সমাজের জন্য দাসপ্রথার আর প্রয়োজন নেই। সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসের জন্যও তাদের শক্তির উৎস ধ্বংস করা দরকার ছিল, কারণ এখন শিল্পপতিদের শাসন শুরু হবে, যার নাম গণতন্ত্র। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে এদের হাতেই পতন ঘটল জমিদারতন্ত্রের, এরাই দেশে পত্তন করল গণতন্ত্রের, যাতে নিজেদের ব্যবসার অনুকূলে শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করা যায়। সেই সাথে নিজেরাও সরাসরি মন্ত্রী ইত্যাদি হবার দ্বারা শাসনে হস্তক্ষেপ করা যায়।
উপনিবেশ-যুগে তারা যা করেছে, ঠিক একই কাজ তারা নব্য-উপনিবেশি যুগেও করে চলেছে। অষ্টাদশ শতকের সেই মধ্যবিত্ত পুঁজিপতিরা আজকের মাল্টিন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রির মালিক। পার্থক্য হলো, তখন কোম্পানিগুলোরই নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল। আর এখনকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির নিজের বাহিনী থাকে না, তবে গণতন্ত্রের মাধ্যমে যে পুতুল সরকার তারা বানায়, সেই সরকারি বাহিনীকে ব্যবহার করেই একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার জুটিয়ে নেয়। নিজ দেশের সরকার, ইইউ, জাতিসংঘ দিয়ে বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করে, কিংবা তাদের সাপ্লায়ারদের দিয়ে ভেতর থেকে চাপ দিয়ে ৩য় বিশ্বের সরকারকে তাদের মনমতো পলিসি করতে বাধ্য করে। দেশে দেশে সরকার যা আমরা দেখি, এরা পুতুল। সরকারে বসায় এরা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-মিডিয়া-রাষ্ট্র এসবকিছু এই শ্রেণির হাতে। ৫০% সম্পদ যে ১%-এর হাতে, এরা হচ্ছে সেই তারা। পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, যুদ্ধ থেকে নিয়ে রিঅ্যাডুকেশন ক্যাম্প, আইন থেকে নিয়ে নারীবাদ-সবকিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই অংশটাকেই লাভবান করে। এরাই একসময় দাসব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে, এরাই পরে দাসপ্রথা বন্ধে আইন করেছে নিজেদের স্বার্থে, আবার এরাই সীমিত আকারে ভিন্ন নামে দাসপ্রথা টিকিয়ে রেখেছে নিজেদেরই স্বার্থে।
■ উপনিবেশবাদ হলো : গরু পরাধীন, আমিই পালব, আমিই খাওয়াব, আমিই দুধ নেব। আর নব্য-উপনিবেশবাদ হলো : গরু আমি পালব না, গরু স্বাধীন, নিজের মতো চরে খাবে, আমি দিনশেষে শুধু দুধটুকু দুয়ে নেব। আগে ব্রিটিশ দাদন দিয়ে, পিটিয়ে মেরে নীল চাষ করাত, দোষ হতো ব্রিটিশের। এখন নেয় এদেশীয় সরকার দিয়ে পলিসি করিয়ে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে, ব্রিটিশের হাত ময়লা হয় না। ম্যাপটা থাকে সাদা সাদা। আর ভারতের ম্যাপ হয় কালো কালো। গরিব দেশের সরকার আইন বানায় গরিব দেশের প্রডিউসার সাপ্লায়ারদের চাপে কিংবা আমেরিকান গ্লোবাল কোম্পানি আমেরিকা সরকারকে দিয়ে গরিব দেশের সরকারকে চাপ দেওয়ায়। গরিব দেশে এই সাপ্লায়াররা-শিল্পপতিরাই মন্ত্রিসভা আলো করে বসে থাকে। Govt. of the Capitalist, by the Capitalist, for the Capitalist. এর নাম 'গণতন্ত্র'। কেউ যদি মনমতো কাজ না করে, পরের টার্মে বদলে দেওয়া যায়। সাপ্লাই চেইন ঠিক রয়ে যায়। দাসরা দাস রয়ে যায়। আর যে দেশে এই মজার সিস্টেমটা নেই, সেখানে গিয়ে জোর করে 'গণতন্ত্র' দেওয়া হয়। অবশ্য স্বৈরশাসক বা বাদশাহ অতখানি সুযোগ দিলে গণতন্ত্র তখন আর জরুরি থাকে না। দেশে দেশে দুনিয়া চালায় পুঁজিপতিরা। এই দুনিয়া ওদের, আমাদের নয়।
একদিকে তারা পুরো দুনিয়াকে এনলাইটেনমেন্টের স্বাধীনতা-সমতা শেখাচ্ছে, অন্যদিকে ৪.৫ কোটি মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছে ব্যবসার খাতিরে।[১]
প্রতি বছর দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে ২০ লক্ষ শিশু ইউরোপে-যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়। [২]

পূর্ব ইউরোপ থেকে প্রতি বছর বহু নারী ও শিশু আমেরিকাতে পাচার করা হয় পর্নোগ্রাফির জন্য।

ILO-এর মতে, আধুনিক দাসদের কারণে বছরে ১৫০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা হয়। টপ ৫টা ইন্ডাস্ট্রির নাম যদি বলা যায়, যারা এই দাসপ্রথার ওপর মুনাফা করছে এবং টিকে আছে-
• ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি
• গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি
• ফুড এন্ড অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি
• সেক্স ইন্ডাস্ট্রি (বার ও নাইটক্লাব)
• ক্যাসিনো ও হোটেল
Oxfam, UK-এর ethical trade manager Rachel Wilshaw বলেন-
আমরা এখন জানি, অধিকাংশ গ্লোবাল কোম্পানিরই সাপ্লাই চেইনে কোথাও না কোথাও আধুনিক দাসপ্রথা রয়েছে।
■ নব্য-উপনিবেশবাদের ন্যাক্কারজনক খুল্লমখুল্লা প্রদর্শনী করে চলেছে ফ্রান্স।
>> স্বাধীনতার পর গত ৬০ বছর ধরে প্রতি বছর ফরাসি সেন্ট্রাল ব্যাংকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার জমা দেয় ১৪টা আফ্রিকান দেশ colonial debt হিসেবে।
>> ফ্রান্স তাদের এই শর্তে স্বাধীনতা দিয়েছে, মোট বৈদেশিক রিজার্ভের ৮৫% ফ্রান্সে পাঠাতে হবে। আর বাকি ১৫% দিয়ে আফ্রিকা চলবে।
>> না দিলে হয় আর্মি দিয়ে ক্যু করিয়ে বা গুপ্তহত্যা করে সরকার বদলে দেওয়া হবে।
>> আফ্রিকার খনিজের ওপর একচেটিয়া অধিকার থাকবে ফরাসি কোম্পানিগুলোর। পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ, টেলিফোন, বন্দর, ব্যাংক, বাণিজ্য, নির্মাণশিল্প, কৃষিসহ সকল সেক্টরে ফরাসি কোম্পানি অগ্রগণ্য থাকবে। 'France Diplomatie' অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ২১০৯টির বেশি কোম্পানি আফ্রিকা মহাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করছে।
'GOLD DIGGERS'
এখন আমাকে বলেন, ২০১৬-১৭ তে আইভরি কোস্টের ২৩ লাখ এডাল্ট যে কোকো ফ্যাক্টরিতে দাসত্ব করে, সে দায় কি আফ্রিকার, না অন্য কারো? সেদেশের ১০-১৭ বছরের ৮৯১,০০০ শিশু যে স্কুলে না গিয়ে কোকো মাঠে নামমাত্র মূল্যে শ্রম দেয়, সে দায় কার?[১] আফ্রিকার, নাকি যারা আফ্রিকার ৮৫% সম্পদ নিয়ে যায় প্রতিবছর, তাদের?
উন্নত মূল্যবোধের নামে, সভ্যতার নামে যেসব মতবাদ তারা ফেরি করছে, চাপিয়ে দিচ্ছে সেগুলো ৩য় বিশ্বে ব্যবসার নতুন নতুন ফ্রন্ট খোলার পাঁয়তারা। তাদের দেশে তো তাদের বাজার আছেই, ৩য় বিশ্বের ধর্ম-পরিবার-সমাজ ধ্বংস করে দিয়ে আমাদেরকে তাদের পণ্য-সেবা গ্রহণে বাধ্য করার কৌশল হিসেবে আমাদের রুচি-মূল্যবোধ, ভালোমন্দের মাপকাঠি বদলে দেওয়ার চেষ্টা আজও অব্যাহত, সে উপনিবেশ যুগের মতোই। দেখুন...
EMIS-২০১৭ রিপোর্টে এসেছে ইউরোপের ১,২৭,৭৯২ জন গে-পুরুষের ৯৪% অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল প্রোফাইল্যাক্সিস নিচ্ছে। গে, লেসবিয়ানদের জন্য আলাদা কেয়ার আলাদা ডিপার্টমেন্ট করার পরও বছরে ৩০-৪০ হাজার এইডস কেস সমকামীদের ভেতর থেকে।
safer sex এর নামে ডেন্টাল ড্যাম (ওরাল সেক্সের জন্য), সেক্স টয়, লুব্রিকেন্ট দেদারসে ইউজ করতে হয়।
এই লক্ষ লক্ষ সমকামীকে কন্টিনিউয়াস স্ক্রিনিং, প্রোফাইল্যাক্সিস করাতে হয়।
আমেরিকাতে একজন পুরুষকে নারী হতে গড়ে গুনতে হয় ১ লক্ষ ডলার। পেনসিলভ্যানিয়ার Philadelphia Center for Transgender Surgery তাদের খরচ জানিয়েছে: পুরুষ থেকে নারী হতে $১৪০,৪৫০ এবং নারী থেকে পুরুষ হতে $১২৪,৪০০ মাত্র।[২] লিঙ্গ সার্জারিতে লাগে ৩০,০০০ ডলার প্লাস। চেহারার সার্জারিতে লাগে ২৫,০০০-৬০,০০০ ডলার। স্তন সার্জারিতে লাগে ৫,০০০-১০,০০০ ডলার।[৩]
২০১৭ সালে শুধু পুরুষ-টু-নারী সার্জারির মার্কেট ছিল সাড়ে ১১ কোটি ডলারের। ২০১৬ সালে মোট এই সার্জারি হয়েছে ৩২৫০ টা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯% বেশি, মানে মার্কেট ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই মার্কেট গিয়ে দাঁড়াবে বছরে ১৫০ কোটি ডলারে [১]।
শুধু সার্জারির কথা বললাম। বাকিটা জীবন তাকে হরমোন থেরাপি নিতে হয়, যার খরচ বছরে ১৫০০ ডলার।

সমকামিতাকে প্রোমোট করা, জেন্ডার ডিসফোরিয়াকে উসকে দেওয়া, জেন্ডার আইডেনটিটির নামে বায়োলজিক্যাল সেক্স নিয়ে অতৃপ্তি জাগানো এগুলো ১ম বিশ্বের আরেকটা পুঁজিবাদী অ্যাজেন্ডা। মিডিয়া তাদের হাতে, বিজ্ঞান তাদের হাতে। এগুলো ব্যবহার করে ৩য় বিশ্ব থেকে আরো মুনাফা লুটে নেবার একটা 'কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি' প্রকল্প। সেই ১৮১৩ সালে মাদ্রাজের গভর্নর কর্নেল মুনরোর কথাটা মনে করুন, রুচি বদলে না দিলে বিলাতি পণ্য কেনানো যাবে না নেটিভদেরকে দিয়ে। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে রুচি বদলানোর কাজটা করেছিলেন লর্ড মেকলে।
আজও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ দিলো [২]। কোন ইইউ? যার দূতাবাসগুলোয় সমকামিতার পতাকা ওড়ে। যে ইইউ গাম্বিয়াকে চাপ দিয়ে সমকামিতা বৈধ করাতে চেয়েছিল, না পেরে মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রত্যাহার করেছে। সেই ইইউ আমাদের লোন দিয়েছে, কী দাবি তাদের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়? বোঝা যায়?

প্রতিটি নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী, প্রতিটি নারীবাদী, প্রতিটি সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট, প্রতিটি পশ্চিমান্ধ বিজ্ঞানবাদী সজ্ঞানে-অজ্ঞানে নব্য উপনিবেশবাদের রাজাকার... ১ম বিশ্বের দালাল ছাড়া আর কিছুই নয়।

টিকাঃ
[১] অর্থনীতিবিদদের যুগ, ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড
[১] অর্থনীতিবিদদের যুগ, পৃষ্ঠা: ১১-১৭; ড্যানিয়েল ফাসফেল্ড,
[১] প্রাগুক্ত। দর্শনের সব আলোচনাগুলো এখানে থেকে নেয়া: The Human Person in Contemporary Philosophy, Frederick C. Copleston; PHILOSOPHY; Vol. 25, No. 92 (Jan., 1950), page: 3-19
[২] A man becomes an ‘individual/person’ by exercising his free choice, by freely giving form and direction of his life. - Kierkegaard, father of modern existentialism
[১] Aric Rindfleisch et al. (1997). Family Structure, Materialism And Compulsive Consumption, Jounal of Consumer Research, vol 23, no.4, pp. 312-325
[১] এগুলো অভিজাত পরিবার, সামন্ত ও জমিদারদের নানান পদ-পদবী, মর্যাদার ক্রমধারা রাফলি এমন- duke/duchess > marquess/marchioness > earl/countess > viscount/viscountess > baron/baroness. BRETTE WARSHAW (SEP 17, 2019) What's the Difference.
[১] Trevor Getz. Why Was Slavery Abolished? : Three Theories. Khan Academy
[১] Global Slavery Index-2016
[২] Child Sex Trafficking In Latin America, United Nations Human Rights Council.
[১] Global slavery index 2018 report
[২] Alyssa Jackson (July 31, 2015), The high cost of being transgender, CNN Health
[৩] www.teenvogue.com
[১] Sex Reassignment Surgery Market - Global Industry Analysis, Size, Share, Growth, Trends, and Forecast 2018 - 2026, Transparency Market Research
[২] দেশের শিক্ষাখাতে ৪২৮ কোটি টাকা দিয়েছে ইইউ, ইনকিলাব (১৯ মে, ২০২০,)

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 আধুনিকতা

📄 আধুনিকতা


এনলাইটেনমেন্টের পর ইউরোপের চিন্তাজগৎ প্রবেশ করল রোমান্টিক যুগে (১৮০০-১৮৫০)। এনলাইটেনমেন্ট যুক্তি শিখিয়ে গিয়েছিল, রোমান্টিসিজম সেখানে আবেগের ওপর জোর দিলো। আলোকায়ন শিখিয়েছিল প্রকৃতিতে মুগ্ধ না হয়ে বরং প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ। আর রোমান্টিকতা শেখালো প্রকৃতি নিয়ে বিমুগ্ধতা।
এনলাইটেনমেন্ট বলেছিল গ্রেকো-রোমান যুক্তি-বস্তু-মানববাদে ফেরত যাবার কথা। বিপরীতে রোমান্টিসিজম এসে বলল, মধ্যযুগীয় ভাবালুতার কথা, মধ্যযুগের বীরদের বীরত্বগাথা শুনিয়ে জাতীয়তাকে আবেগের পর্যায়ে নিয়ে গেল (তুলনা করুন আজকের দেশপ্রেম চেতনার সাথে), Romantic nationalism বলে একে।
এনলাইটেনমেন্টের বিরোধিতা করতে গিয়ে সে বরং আলোকায়ন প্রকল্পতেই আরো ঘি ঢেলে গেল। যুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে বরং মানুষকে আরো আত্মমগ্ন করে গেল। অযৌক্তিক আবেগ-কর্মকেও জাস্টিফাই করে দিলো নিয়ম-শৃঙ্খলা-কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ধর্মকে কেবল 'স্রষ্টার সাথে একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এনলাইটেনমেন্টের সেই ধর্মনিরপেক্ষতা কনসেপ্টকেই আরো সাহায্য করে গেল। এমন এক গডের ধারণা দিলো, যে গড কোনো নিয়মকানুন আরোপ করেন না। আপনি নিজে যা বুঝবেন, তাই ধর্ম (ধর্ম যার যার)। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের কফিনে শেষ পেরেক বলা যেতে পারে। আলোকায়নের বিরোধিতা করতে গিয়ে আলোকায়ন যুগের ব্যক্তিবাদ (individualism)-কেই আরো ঘনীভূত করল রোমান্টিকতা। বলা হল:
» ধর্ম যার যার বুঝমতো। যে যা বোঝে, সেটাই ধর্ম।
» অন্যের আবেগকে সম্মান করা
» প্রত্যেকের মত প্রকাশের অধিকার
» ঐতিহ্য-প্রথার নিয়ন্ত্রণকে আরো অস্বীকার
আসল কথা হলো, ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যালভিনিজম নামে প্রোটেস্ট্যান্টদের একটা ধার্মিক মতবাদ বেশ প্রসার পাচ্ছিল। একই সাথে যুক্তি-স্বাধীনতা-সমতা এবং ধর্মকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার দরুন ক্যালভিনিজম খ্রিষ্টদুনিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, যা (ধর্মীয় কর্তৃত্ব অস্বীকারের) এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করছিল। রোমান্টিকতা এসে আটকাল ক্যালভিনিজমকে। ইসলামোফোবিয়া থেকে বাঁচতে আমরা যেমন অনেকে ইসলামকেই কাটছাঁট করে ফেলি, তেমনি এ পর্যায়ে মডার্নিস্ট খ্রিষ্টবাদ জন্ম নেয়। আত্মার গভীরে আত্মিক বিষয়ের যে অনুভূতি, তাই ধর্ম। খ্রিষ্টবাদের আজ তো এই অবস্থা যে, সমকামী পাদরিও তারা মেনে নিয়েছে।

এরপর এলো আধুনিকতা। এনলাইটেনমেন্টের গাছটা আরো ডালপালা মেলে দিলো, ডালে ডালে ধরল ফল। আধুনিকতার শুরুটা যে ঠিক কখন, সে ব্যাপারে মতানৈক্য আছে। কেউ বলেন সেই রেনেসাঁর সময়ই আধুনিকতার যুগ শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলছেন ১৭শ-১৮শ শতকের এনলাইটেনমেন্ট থেকেই আধুনিকতার শুরু। কেউ আরো কেঁচে এনেছেন, বলছেন আধুনিক যুদ্ধের (দুটো বিশ্বযুদ্ধ) সময়টাই মডার্নিটি। সাধারণভাবে ১৯শ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের শুরুকে (১৮৭০-১৯৩০) মডার্নিটি ধরা হয়। আসলে একেক ফিল্ডে কথিত 'আধুনিক চিন্তাকাঠামো' একেক সময়ে এসেছে। মডার্নিটি হলো সময়কাল, আর মডার্নিজম হলো দৃষ্টিভঙ্গিটা। তাই ব্যাপারটাকে সময়কাল দিয়ে না বুঝে ঠিক কী কী বস্তুকে 'মডার্নিজম' বলা হচ্ছে, তা বুঝলে আপনি নিজেই আঁচ করতে পারবেন-কখন থেকে ইউরোপ মডার্নিটিতে প্রবেশ করেছে। মডার্নিজম বা আধুনিক চিন্তার বিশিষ্ট দিকগুলো হলো-

১. রাষ্ট্রনীতিতে
» রাজতন্ত্রের বদলে গণতন্ত্রের জনপ্রিয়তা
» সাংবিধানিক ক্ষমতা ভাগাভাগি (আইনসভা, বিচারবিভাগ, নির্বাহী বিভাগ)
» যুদ্ধ-সংঘর্ষের বদলে ফর্মাল রাজনৈতিক সংগ্রাম (মাঠের রাজনীতি) ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা
» জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থা

২. অর্থব্যবস্থায়
» জটিল অর্থনীতি
» কৃষির বদলে বৃহৎ শিল্পায়ন
» মার্কেট ইকোনমি
» অর্থনীতির বৈশ্বিক রূপ (economic globalization)
» ব্যাপক শহরায়ণ ও শহরে বসবাসে আগ্রহ
» পুঁজিবাদ ও অধিক ভোগের মানসিকতা

৩. বিশ্বাসগত
» দুনিয়ার প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, মানব প্রচেষ্টা (বিজ্ঞান-প্রযুক্তি) দিয়ে দুনিয়া বদলে দেওয়া সম্ভব। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে দুনিয়াকে আরো ভোগ্য করা সম্ভব।
» প্রগতিতে (constant progress) বিশ্বাস। গতকালের চেয়ে আজ মানবজাতি যেকোনো দিক দিয়েই (প্রযুক্তি, রাজনীতি ও নৈতিকতায়) আরো বেশি উন্নত। আমরা এভাবে উন্নত হতেই থাকব।
» ধর্মীয় টেক্সটের সত্যতা অস্বীকার। সত্যের মাপকাঠি হিসেবে ওহি এবং ওহির ব্যাখ্যাদাতাদের কর্তৃত্ব বাতিল। মানুষের নিজ নিজ বিচারবুদ্ধিই সত্যের পথ।
» নতুন যা কিছু, পুরোনোর চেয়ে (ধর্ম) তা কল্যাণকর।
৪. ব্যক্তি পর্যায়ে
» গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ও শক্তিশালী সমাজের বিপরীতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনা
» আগের কমন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ (ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক) থেকে সরে আসা
» মানুষে-মানুষে এবং মানবসমাজে বিচ্ছিন্নতা বেড়ে যাওয়া

৫. জ্ঞানগত
» যা ইন্দ্রিয় দ্বারা বোঝা যাবে, তাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য তথ্য। অতীন্দ্রিয় বা মেটাফিজিক্যাল কোনোকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের জ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতির ফলে একসময় ধর্ম হারিয়ে যাবে; দর্শন ও অপরাপর মানবিক জ্ঞান ক্রমেই বস্তুবাদী হয়ে উঠবে এবং পুরো মানবজ্ঞানই বিজ্ঞানের অধীনে চলে আসবে।
» ২ ধরনের কথার অর্থ হয়- যুক্তি-বিশ্লেষণ (analytical statement) আর পর্যবেক্ষণলব্ধ (empirical statement); এই ছকের বাইরে বাকি সব অনর্থক।
প্রতিটি বিষয়কে আবার বিচার করতে হবে, দেখতে হবে কী কী প্রগতিকে বাধা দিচ্ছে, তদস্থলে নতুন আইডিয়া আনতে হবে, যা বাধাদানকারী বিষয় (ধর্ম)-কে রিপ্লেস করবে। যেমন :
* মানুষের উৎপত্তির উত্তর দেবে ডারউইনবাদ
* প্রতিটি হিউম্যান সায়েন্সকে ‘বিবর্তন’ দিয়ে বুঝতে হবে
* বিশ্বের উৎপত্তির উত্তর দেবে আধুনিক কসমোলজি
* আইন-নৈতিকতার শূন্যস্থান পূরণ করবে লিবারেল ইথিক্স
* আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন পূরণ করবে মেডিটেশন, স্ট্রেস রিলিভিং কাজকর্ম
* আত্মার প্রশ্নের জবার দেবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্স।

চাই এই নতুন রিপ্লেসমেন্ট যতই হাস্যকর শোনাক, যতই অযৌক্তিক হোক। আমেরিকান evolutionary biologist ও জিনবিজ্ঞানী Richard Lewontin-এর সরল স্বীকারোক্তি-
আমরা সর্বদা বিজ্ঞানের পক্ষ নিই, যদিও বিজ্ঞানের কিছু কিছু দাবি হাস্যকর; যদিও বিজ্ঞানীমহল মেনে নিয়েছেন কিছু ছেলে-ভোলানো গাল্পগল্প, যার প্রমাণ নেই। কারণ আমরা আগে থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রকৃতিবাদের কাছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কোনোভাবে বাধ্য করে জাগতিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে; বরং আগে থেকেই (a priori adherence) বস্তুগত কারণ খোঁজার ওয়াদা আমাদেরকে ঠেলে দেয় এমন কিছু উপকরণ ও ধারণা তৈরির দিকে- যা শুধু বস্তুগত ব্যাখ্যাই উৎপাদন করবে। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হোক, আমজনতার কাছে যতই দুর্বোধ্য ঠেকুক। আর যেহেতু আমরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব মেনে নেব না, সুতরাং, বস্তুবাদই শেষকথা। [১]

যেকোনো মূল্যে ধর্মের আবেদন-কর্তৃত্ব-অংশগ্রহণকে বাতিল করে জীবনকে ভোগ করে যাওয়ার এই পুরো চিন্তাকাঠামোটাকে বলা হচ্ছে আধুনিকতা বা আধুনিক চিন্তা। এভাবে চিন্তা করতে পারলে আপনি আধুনিক, না পারলে আপনি মধ্যযুগীয়-জঙ্গি।

খ্রিষ্টান ধর্মতাত্ত্বিক থমাস ওডেনের মতে মডার্নিটির ৪টি বেসিক নীতি হলো—
১. Moral relativism : মানে, নৈতিকতার স্কেল ফিক্সড নয় (যেমনটা ধর্ম বলতে চায়); বরং ব্যক্তিভেদে, সমাজভেদে, অবস্থাভেদে, যুগভেদে ভালোমন্দের ধারণা বদলায়। যেমন: ব্যভিচার-সমকামিতা এখন ভালো।
২. Autonomous individualism : আমার নৈতিকতা (ধর্ম) কেউ ঠিক করে দেবে না। আমি নিজেই নিজের বৈধ-অবৈধ ঠিক করব। আমি আমার ভালোমন্দের নির্ধারক।
৩. Narcissistic hedonism : আত্মপ্রেম; নিজেকে খুশি করার, খুশি রাখার নিরন্তর চেষ্টা। শিশ্লোদরপরায়ণ ভোক্তা।
৪. Reductive naturalism : যা কিছু দেখা যায়, শোনা যায়, ধরা যায় বা অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, তার বাইরে কিছুই নেই।

মডার্নিটির বিপরীত শব্দ হলো ঐতিহ্য (Tradition)। মূল কথা হলো, আগে যা ঘটেছে তা হলো ট্রাডিশন বা প্রথা। প্রথা (মূলত ধর্ম) সমাজকে এগোতে দেয় না, আটকে রাখে। আজকের দিন অতীতের চেয়ে উত্তম, ভবিষ্যৎ আজকের চেয়ে উত্তম। অতীতের চেয়ে আজ যেমন জ্ঞানবিজ্ঞানে মানুষ উন্নত হয়েছে, তেমনি নৈতিকতায়ও উন্নত হয়েছে। আজকের সেক্যুলার-লিবারেল নৈতিকতা আগের ধর্মের নৈতিকতা থেকে উত্তম এবং যত দিন যাচ্ছে আমরা উত্তম হচ্ছি। প্রথাকে ঝেড়ে না ফেলতে পারলে আমরা উন্নত হতে পারব না। ভবিষ্যতে আমরা আরো উন্নত হতে থাকব সমকাম মেনে নিয়ে, ব্যক্তিস্বাধীনতা মেনে নিয়ে, নারীবাদ- বিজ্ঞানবাদ মেনে নিয়ে, ফ্রি-সেক্স মেনে নিয়ে।

আধুনিকতাবাদ একটা স্বতন্ত্র দ্বীন, যা বাকি সব ধর্মকে অকেজো-সেকেলে-বাতিল সাব্যস্ত করে। এমনকি নৈতিকতার ক্ষেত্রেও ধর্মকে নিষ্প্রয়োজন সাব্যস্ত করে নিজেকে ধর্মের আসনে বসায়। মানুষের চিন্তাজগতে ধর্মের আবেদন চিরতরে শেষ করে দেয়। এটা এমন ধর্ম যার সমালোচনা সহ্য করা হয় না। এই ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে আপনার মনুষ্যত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আপনি মধ্যযুগীয়, বর্বর, বিপজ্জনক এবং পটেনশিয়াল জঙ্গি।

পাঠক এবার মিলিয়ে নিন: সেই রেনেসাঁ থেকে শুরু, যাকে বলা হচ্ছিল ir-religion বা অধর্ম। পরের ধাপে এনলাইটেনমেন্টের মূল আহ্বান secularization বা ধর্মকে সব জায়গা থেকে হটিয়ে দেওয়া। রোমান্টিক যুগে এসে ধর্মকে নিছক অনুভবের জায়গায় আটকে দেওয়া। আর মডার্নিটিতে এসে নৈতিকতা ও জ্ঞানতত্ত্বের যে প্রশ্নগুলোর উত্তর ধর্ম ছাড়া আর কারো কাছে ছিল না, সেগুলো থেকেও ধর্মকে বিতাড়িত করল ইউরোপ। ইউরোপের যুদ্ধটাই ধর্মের সাথে। ধর্মের সাথে ব্যবসায়ীদের হাজার বছরের সংগ্রাম শেষে আজকের আধুনিক ইউরোপ আমরা পেলাম। আবার এভাবেও বলতে পারেন ক্যাথলিক কর্তৃত্বের সাথে বণিক সম্প্রদায়ের (প্রধানত ইহুদি) লড়াইয়ের দ্বারা নতুন এক ব্যবসাবান্ধব পৃথিবী তৈরি, পুঁজিবাদী জুলুমের কারাগার তৈরি। মানব-রচিত (সেন্টপল) খ্রিষ্টধর্মের অন্যায়-দুর্নীতির নাগপাশ ছিন্ন করার একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যা প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো-'ধর্মীয় নৈতিকতা অস্বীকার'-এর মাধ্যমে অবাধ ভোগ-লালসার দরজা খুলে দেওয়া। ক্রেতার অবাধ ভোগ তথা বিক্রেতার অবাধ ব্যবসাকে যা যা বাধাগ্রস্ত করে, সবকিছুকে অযৌক্তিক ও অজ্ঞতা বলা হলো। আর মডার্নিটির উদ্দেশ্যই হলো সকল 'অজ্ঞতা-কুসংস্কার' থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দেওয়া। এজন্যই আপনি দেখবেন ব্যবসায়ী-চালিত দেশ (১ম বিশ্ব) সবাইকে লিবারেট করে বেড়ায়।

টিকাঃ
[১] Richard C. Lewontin (1997), Billions and Billions of Demons (a review of Carl sagan's The Demon-Haunted World), The New York Review

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 প্রশ্ন

📄 প্রশ্ন


পশ্চিমা সভ্যতা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নতি করেছে (সে যেভাবেই হোক, টাকার উৎস যা-ই হোক)। তাদের জীবনযাত্রা সহজ হয়েছে, নতুন নতুন পণ্যসেবা ভোগ করছে তারা, সকল ভিন্নমত সফলভাবে দমন করে মানুষের চিন্তায় সমতা এনেছে, ফলে একটা টেকসই সিস্টেম ডেভলপ করেছে। এসব দেখে নেটিভদের চোখ গেছে ধাঁধিয়ে। যে নেটিভদের (উপনিবেশ-শাসিত) চুষে খেয়ে দুর্ভিক্ষে মেরে আজ ১‍ম বিশ্ব '১‍ম বিশ্ব' হয়েছে। তাদের উত্তরপুরুষ আমরা সেই জোঁকের প্রতি মুগ্ধ-কৃতজ্ঞ। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এই উন্নতি দেখে আমরা ভাবছি, হুবহু ওদের অনুকরণ করলেই বুঝি আমরাও ওদের মতো লাইফস্টাইল পাব। ওদের মতো আইন, ওদের মতো রাষ্ট্র, ওদের নৈতিকতা, ওদের পরিবার-কাঠামো। ওরা যেমন ধর্মকে ঝেটিয়ে আজ উন্নত হয়েছে, আমাদেরকেও আমাদের ধর্মকে হটাতে হবে। ধর্মান্ধ না হয়ে 'আধুনিক' হতে হবে, 'আলোকিত মানুষ চাই'। এজন্য আছে প্রথম 'আলো'। এনলাইটেনমেন্টের ফেরিওয়ালা।

৩টা ভুল আছে এখানে।

প্রথমত, হিউম্যান সায়েন্স (মানবিক বিভাগ) আর ন্যাচারাল সায়েন্স (বিজ্ঞান বিভাগ) এক নয়। বিজ্ঞান বিভাগে যেমন ২+২=৪, ওপর থেকে ফেললে নিচেই পড়বে, ২ অণু হাইড্রোজেন আর ১ অণু অক্সিজেন মিলে যেমন পানিই হবে। হিউম্যান সায়েন্স ব্যাপারটা এমন ধ্রুব নয়। মানবমন, পরিবার, সমাজ, চিন্তা এগুলো অনেক বেশি জটিল। এগুলোর ক্ষেত্রে ছোট্ট স্যাম্পলের ওপর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাপ্ত ফলকে পুরো মানবজাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সত্য থেকে দূরেই নিয়ে যায়। আমরা পশ্চিমা সামাজিক বিজ্ঞানকে পশ্চিমা প্রকৃতিবিজ্ঞানের মতোই অকাট্য সত্য মনে করি, কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞানগুলো পশ্চিমা সমাজের অভিজ্ঞতা বা ফলাফল। একই সূত্র চীন বা মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রেও সত্য হবে, তা নয়; কিন্তু আমরা ইউরোপীয় চিন্তাপদ্ধতি, তাদের নৈতিকতা, তাদের রাষ্ট্রচিন্তা, তাদের আইন জোর করে আমাদের দেশগুলোতে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি।
যেমন : আধুনিককালে নারী সকল সমাজেই নিগৃহীত হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু পশ্চিমা স্টাইলের নারীবাদই যে সকল সমাজের জন্য সমাধান, এটা বাড়াবাড়ি। কেন আফগান নারীদেরকে ইউরোপীয় নারীদের মতোই স্বাধীন হতে হবে? তারা যেমন থাকতে চায়, থাকতে দিন না। না, তা হবে না। তাদেরকে স্বাধীন হতেই হবে, আফগান পরিবারগুলোও ইউরোপের পরিবারের মতো ভেঙে দিতে হবে। পরিবার যে চাহিদাগুলো মেটাত, সেগুলো নিয়ে ১ ম বিশ্ব ব্যবসা করবে। আফগান নারীদেরকে কর্মক্ষেত্রে এনে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিতে হবে। যাতে কম বেতনে শ্রম পাওয়া যায়, গার্মেন্টস সেক্টরের মতো সস্তায় শ্রম মেলে। এনলাইটেনমেন্টকে ব্যাবহারিক প্রয়োগ করার দরুন সমাজে অকস্মাৎ শূন্যতা দেখা দেয়। আগে শ্রেণি দ্বারা, নানান প্রতিষ্ঠান দ্বারা (ধর্ম, পরিবার, দাসপ্রথা, ভূস্বামী) যে সমাজের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত হতো, নতুন সমতাভিত্তিক সমাজে এইসব নিয়ামকগুলো উপেক্ষিত হলো। এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী মডার্নিটিতে এইসব সামাজিক সমস্যা নিরসনের জন্য নতুন এক সাবজেক্টই তৈরি হলো, যাকে আমরা sociology নামে চিনি। সাবজেক্টটাই হলো ধর্মকে হটিয়ে কীভাবে শূন্যতা পুরণ করা যায়, তা নিয়ে। সুতরাং,, এর গবেষণাগুলো কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য।

আর দ্বিতীয় ভুলটা হলো, ধর্ম-প্রথাকে ঝেড়ে ইউরোপীয় মানে 'আধুনিক' হওয়া। ধর্ম নিয়ে ইউরোপের অভিজ্ঞতা আর মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতা তো এক নয়। তাহলে একই ফর্মুলা কেন প্রয়োগ করতে হবে? যেসময় ওদের ধর্ম ওদের গলার কাঁটা হয়ে আছে, ঠিক একই মুহূর্তে আমাদের ধর্ম আমাদেরকে সুপার পাওয়ার করে দিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইনের শাসন, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, নারীবৈষম্য বিলোপ, দাসদের অবস্থার মানবিকিকরণ, ভারসাম্যপূর্ণ সরকারব্যবস্থা এসব তো আমাদেরকে আমাদের ধর্মই দিয়েছে। ইউরোপীয় কায়দায় 'ধর্ম থেকে মুক্তি' কি দরকার ছিল আমাদের? যখন আমাদের আইনে ধর্ম ছিল, রাষ্ট্রে ধর্ম ছিল, পরিবারে-সমাজে-বাজারে-আদালতে ধর্ম ছিল, তখনই আমরা শ্রেষ্ঠ ছিলাম।

আমাদের তো শ্রেষ্ঠ হতে ধর্মকে ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ওরা গলার বেড়ি খুলেছে, আর ওদের দেখাদেখি আমরা খুলেছি সোনার হার। ওদের ধর্ম অজ্ঞতা-কুসংস্কার, কারণ খ্রিষ্টবাদসহ যেকোনো বাতিল মতবাদের ভিত্তিই হলো অলীক কল্পকাহিনি-কেরামতি। আর আমাদের ধর্ম শিখিয়েছে জ্ঞান-যুক্তি-বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ। বিনা যাচাইয়ে মেনে নেওয়াকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। কেবল আল্লাহ-রাসুল যা বলেছেন (যা তাদের কথা হিসেবে প্রমাণিত ও যাচাইকৃত), তা ছাড়া কোনো অলৌকিকত্ব শরিয়তের অংশ নয়, বিধান নয়। ইসলাম যৌক্তিকভাবে ‘প্রমাণিত’ ওহি, বিচারবুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রাপ্তজ্ঞানের সম্মিলন। বাছবিচারহীন দাবিকৃত ওহি ও তার কর্তৃপক্ষের মনগড়া ফাতওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি কেবল ক্ষীণদৃষ্টি ইন্দ্রিয় ও মানবিক-বিচারবুদ্ধি থেকে পাওয়া জ্ঞানও সমাধান নয়। খ্রিষ্টবাদের মতো ইসলামকেও অজ্ঞতা-কুসংস্কার-অযুক্তি মনে করাটা ইসলাম সম্পর্কেই অজ্ঞতার প্রকাশ।

ইউরোপকে যদি ধর্মকে ফেলে দিয়ে উন্নত জীবন খুঁজতে হয়, আমাদেরকে তাহলে উন্নত জীবন খুঁজতে হবে ধর্মের কোলে ফিরে গিয়ে। আমাদের...
» জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা
» দ্বিমুখী সম্পদ-প্রবাহের দ্বারা দারিদ্র্য বিমোচন
» নৈতিকতা পরিচালিত জবাবদিহি-তাড়িত অফিস-আদালত-বাজার
» স্ট্রেসমুক্তির জায়গা প্রশান্তিময় পরিবার
» অপরাধের শাস্তি দেবে আদালত আর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করবে সমাজ। সেই ফাংশনিং সমাজ
» মানুষের সামগ্রিক সংজ্ঞা ও সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিতকারী শিক্ষা
» জালিম পুঁজিবাদের থাবামুক্ত সত্যান্বেষী জ্ঞান-বিজ্ঞান
» নীতিবোধ-চালিত মানুষ (নট ভোগ-তাড়িত)
» প্লেটোর তথাকথিত আদর্শ-রাষ্ট্র ও ‘জ্ঞানী-রাজা’র শাসন

এগুলো আমরা পেছনে রেখে এসেছি। দিন যত যাচ্ছে উন্নত হচ্ছি, এটা ইউরোপের ইতিহাস, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ‘১ম বিশ্ব’ হয়ে ওঠার ইতিহাস। মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস হলো: আমরা উন্নত ছিলাম, দিন যত যাচ্ছে তত নতজানু হচ্ছি, অবনত হচ্ছি, গোল্লায় যাচ্ছি। মদিনায় সিনেমা-হল হচ্ছে, মুসলিম দেশে ব্যভিচার- সমকামিতা বৈধ হচ্ছে। যুবসমাজের মাঝে অপরাধ-মাদক-বেকারত্ব-হতাশা বেড়েই চলেছে। যত দিন যাবে, ১ম বিশ্বের ব্যবসার বস্তু হতেই থাকব, আমাদের রুচি বদলে দিয়ে তাদের পণ্য কিনতে বাধ্য করবে। গরিব আরো গরিব হতেই থাকবে, ধনীরা হবে আরো ধনী। মডার্নিজম আমাদের সমাধান নয়।
তার মানে ৩য় ভুলটা হচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে, আমরা সব দিক দিয়েই উন্নত হচ্ছি, তা কিন্তু মোটেও নয়। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নতি মানেই নৈতিকতা-মূল্যবোধে উন্নতি নয়; বরং কমনসেন্স ও অভিজ্ঞতা এটাই বলে যে- 'তামার বিষে' স্বভাব নষ্ট হয়, আর 'অভাবে স্বভাব নষ্ট' হয়। সুতরাং,, ১ম ও ৩য় বিশ্ব, উভয়েরই নৈতিকতা যত দিন যাচ্ছে, কমছে। ইতিহাসও তাই বলছে-
■ ইবনু খালদুন বিভিন্ন আরব সভ্যতার ওপর গবেষণা করে সাধারণ ফর্মুলা বের করেছেন : রুক্ষ বেদুইন জীবনযাপনে ধর্ম ও নীতিবোধ প্রবল থাকে, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় বিভবশক্তি মজুত হয়। রাজ্য স্থাপনের পর যত শহরায়ণ, আরাম-আয়েশ, বিলাসদ্রব্য বাড়ে; তত অনৈতিক কার্যকলাপ বেড়ে যায়। শেষে গিয়ে সাম্রাজ্যটা ধ্বংস হয়, রুক্ষ-ধার্মিক অন্য কোনো জাতির হাতে, তারা আবার একই চক্রে পড়ে যায়।
■ নৃতাত্ত্বিক Joseph Daniel Unwin MC (1895-1936) প্রায় ৫ হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ৮৬টি আদিম গোত্র ও ৫টি বৃহৎ সভ্যতার ওপর একটি পর্যালোচনা করেন। Sex and Culture (1934) বইয়ে তিনি ফলাফল তুলে ধরেন বিস্তারিত আকারে। তার মতে, প্রতিটি সমাজ শুরুতে যৌনতা ও নৈতিকতার ব্যাপারে কঠোর থাকে, সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছে তাদের ভেতরে শুরু হয় নৈতিক অবক্ষয়। ব্যভিচার-সমকাম-প্রকাশ্য অশ্লীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকার অর্থ সভ্যতার পতন আসন্ন।

অর্থাৎ সভ্যতার উন্নতি ও নৈতিকতার উন্নতি বস্তুত ব্যস্তানুপাতিক। তার মানে, মডার্নিজম ওদেরও সমাধান নয়। মানবজাতির সমস্যার সমাধান একমাত্র ইসলাম। আগের দুই গবেষণার সাথে মিলিয়ে নিন। মডার্নিজমের এই পুরো ধারণাটা বিকশিত হয়েছে ভোক্তা-পুজিবাদী কালচারে। ১৯৬০-এর দশকে ভোগবাদী মানসিকতার সাথে মডার্নিজমের চূড়া একাকার হয়ে গেছে। এর ফলে পশ্চিমা সমাজ আজ যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, তা হলো-
পরিবার-ব্যবস্থার ভাঙন
>> ১৯৭০ সালে আমেরিকায় লিভ-টুগেদার পরিবারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫ লাখ, ২০০২ এসে সেটা হলো ৪৯ লাখ।[১] ১ম বাচ্চা জন্মের পর এসব পরিবার টেকে ৩৫%, মানে ভেঙেই যায় ৬৫% (Donahue et al, 2010)।
>> আমেরিকার ৫০% ১ম বিয়ে বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয় (Bramlett & Mosher, 2001)। রিসার্চ জানাচ্ছে, মোট ডিভোর্সির ৪২%-এরই বিবাহিত জীবনে ব্যভিচারের ইতিহাস আছে (Janus, 1993)।
জনসংখ্যা হ্রাস
>> একটা দেশের জনসংখ্যা স্থির রাখতে প্রয়োজনীয় জন্মহার ২.১%। অর্থাৎ প্রতি নারীকে তার জীবদ্দশায় ২.১ জন সন্তান জন্ম দিতে হবে, নইলে সে দেশের জনসংখ্যা কমে যাবে। সভ্য দেশগুলোর জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে দ্রুত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ১.৬%, আমেরিকার ১.৭৭%। মূল কারণ গত ৫০ বছরের নারীবাদী এজেন্ডা। অনেক উন্নত দেশকেই (South Korea, Singapore, France, Australia, Canada, Russia, Poland) বিয়ে ও সন্তান জন্মদানকে উৎসাহিত করতে হচ্ছে ট্যাক্স মাফ, বাড়িভাড়া প্রদান, গণপরিষেবায় বিশেষ ছাড়, বেবি-বোনাস ইত্যাদি অফারের দ্বারা।[২]
>> আমেরিকাতে প্রতি বছরে প্রায় ১০ লক্ষ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে, যার এক তৃতীয়াংশই গর্ভধারণের ৬ষ্ঠ সপ্তাহের পর।[৩] ব্রিটেনে টোটাল গর্ভধারণের ২৪% ফেলে দেওয়া হয় (induced abortion)[৪]

মনোবিকল ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম
আমেরিকায় মোট জন্মের ৪১% শিশুই বিয়ে বহির্ভূত বাবা-মায়ের সন্তান। ২০১৬ সালে ইউরোপ-আমেরিকার অর্ধেক শিশু বিয়ে-ছাড়া (out-of- wedlock) জন্ম[১]। যে পরিবারের ৬৫%-ই ভেঙে যায়, ভাঙার জন্যই যার সৃষ্টি। যতদিন ভালো লাগবে একসাথে থাকব, ভালো না লাগলে থাকব না।

এসব বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের—
• স্বাস্থ্য ২০% কম।
• আচরণগত সমস্যা থাকে বেশি। সাইকোলজিস্টের সাহায্য প্রয়োজন পড়ে ৩০০% বেশি।
• আত্মহত্যা-প্রচেষ্টার সম্ভাবনা দ্বিগুণ।
• স্কুলে মারপিট ও চুরিচামারিতে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি। সিঙ্গেল মা-বাবা ও লিভ-টুগেদারের বাচ্চাদের ৪২%-ই স্কুলে মারপিট করে।
• স্কুলে রেজাল্ট খারাপ হয় বেশি।
• স্কুল থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ।
• কারাগারে যাবার সম্ভাবনা নর্মাল পরিবারের চেয়ে ১২ গুণ বেশি।[২]
• ভবিষ্যতে কিশোর অপরাধ ও প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধের প্রবণতা (Farrington, 1990)।
ব্রিটেনে এক-তৃতীয়াংশ বাচ্চা এমন, ব্রোকেন ফ্যামিলির[৩] আমেরিকার ৫০% শিশু বাপ-মায়ের ডিভোর্স দেখে। এই ৫০%-এর ৫০% আবার বাপ-মায়ের ২য় বিয়েও ভাঙতে দেখে। ৪২% ডিভোর্সের কারণ ব্যভিচার।

যৌনবিপ্লব
>> আমেরিকার ৩.৫% মানুষ সমকামী হিসেবে নিজেদের আইডেন্টিফাই করে, অথচ শিশু ভিকটিমদের এক-তৃতীয়াংশই ছেলে বাচ্চা। তার মানে ১-৩% মানুষ দায়ী ৩৩% শিশুধর্ষণের জন্য। এ-সংক্রান্ত সব রিসার্চও সরিয়ে ফেলা হয়েছে নেট থেকে।[১]
>> ইউরোপের ৯৪% সমকামী অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল প্রোফাইল্যাক্সিস নেবার পরও, গে-লেসবিয়ানদের জন্য আলাদা কেয়ার আলাদা ডিপার্টমেন্ট করার পরও বছরে ৩০-৪০ হাজার এইডস কেস সমকামীদের ভেতর থেকে।
>> টপ ৫টা পর্নসাইট প্রতিদিন ২০ কোটি বার ভিজিট হচ্ছে। ১৩-২৪ বছর বয়েসী ৬৪% তরুণ-তরুণী সপ্তাহে কমসে কম ১ বার ইন্টারনেটে পর্ন খোঁজে। ডার্ক ওয়েবে শিশুপর্ন, শবদেহপর্ন কী নেই। ক্রমবর্ধমান যৌন অপরাধের জন্য দায়ী বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের এই পর্নো ইন্ডাস্ট্রি।
>> শুধু জার্মানিতে প্রায় ৪ লক্ষ পতিতা দৈনিক ১ মিলিয়ন পুরুষকে যৌন সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে।[২]
>> ২০১৮ সালে এসে ILO জানাচ্ছে লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ- আমেরিকায় পাচারই হচ্ছে ২০ লক্ষ শিশু।[৩] আর লাতিন আমেরিকার ভেতরে আরো ৪০ লক্ষ পথশিশু যৌনপেশায় নিয়োজিত।[৪]
>> আমেরিকার ১ম শিশুদের ৪৮% অবিবাহিত মায়ের সন্তান।[৫]
ব্রিটেনের ৮১% গর্ভপাত করে অবিবাহিত মেয়েরা।[১]

ব্রিটেনে প্রতি চার জন নারীর মধ্য থেকে অন্তত একজন নারী অফিস-সেক্স করে।[২]

প্রযুক্তির অপব্যবহার
আধুনিকতার আইডিয়া (জাতিরাষ্ট্র, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ইউরোসেন্ট্রিজম, শ্বেত-শ্রেষ্ঠত্ব, সেক্যুলারিজম-লিবারেলিজম চাপিয়ে দেওয়া, পুঁজিবাদের বিশ্বায়ন) থেকে গত শতকে সবচেয়ে গণবিধ্বংসী যুদ্ধগুলো হয়েছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা, আরব-ইসরাইল সমস্যা, স্নায়ুযুদ্ধের অংশ (কোরিয়া-ভিয়েতনাম) মিলে গত শতকে নিহত হয়েছে ১৭-২৫ কোটি মানুষ।[৩] আর এই শতকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মারা গেছে ৬ মিলিয়ন।
অস্ত্রবাণিজ্যে ৫টা টপ কোম্পানির মার্কেট ২০১৯ সালে ছিল ১৬৬ বিলিয়ন ডলার। টপ ২৫টা মিলে ৩৬১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে ২০১৮ সালে।[৪] একদিকে মহাকাশ গবেষণায় বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে উন্নত দেশগুলো,[৫] আরেকদিকে প্রতিবছর ৯০ লক্ষ মানুষ এই দুনিয়ায় মারা যাচ্ছে না খেয়ে বা ক্ষুধাকেন্দ্রিক অসুখে।[৬] এই মুহূর্তে পৃথিবীর ১.০২ বিলিয়ন (১০২ কোটি) মানুষ ক্ষুধার্ত। [১] ১% মানুষের হাতে বিশ্বের ৫০% সম্পদ, [২] যা আরো বাড়ছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে।
২০২০ সালের অক্টোবর অব্দি আমেরিকা ৯৩৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে সামরিক খাতে। সেই আমেরিকারই ৩৮ মিলিয়ন মানুষ ওই বছর ক্ষুধায় কষ্ট করেছে। সেই আমেরিকারই ৩৭.২৫ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে (দিনে ৩৫ ডলার আয়) সেই বছর। সেই আমেরিকারই ১০% লোক মিনিমাম স্বাস্থ্যসেবাও পায়নি সে বছর, অথচ মঙ্গলে-চাঁদে বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এবার ভাবেন বাকি দুনিয়ার কি কল্যাণ হচ্ছে।

অপরাধ বৃদ্ধি
আমেরিকাতে প্রতি ৫ জনে ১ জন হাইস্কুলের ছাত্রী তাদের প্রেমিকের দ্বারা (dating partner) যৌন-নিগ্রহের শিকার।
২০-২৫% নারী তাদের কলেজ জীবনে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার শিকার হচ্ছে।
আমেরিকার ৮১% নারী যৌন হয়রানির শিকার, তার ৩৮% যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে কর্মস্থলে
পতিতাদের মাঝে ৭১% শারীরিক প্রহারের শিকার, আর ৬২% নিয়মিত ধর্ষণের শিকার। ৮৯% এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু তাদের আর উপায় নেই (Farley et al. 2003)।
নৈতিক প্রগতি (?)
পশ্চিমা নৈতিকতার নতুন সংজ্ঞায়—অনাগত শিশু তো nonexistence! একজন nonexistence-এর ক্ষতির আশঙ্কায় জীবিত মানুষের হিউম্যান রাইটসে (পড়ুন ‘ফুর্তিতে’) হস্তক্ষেপ করা যাবে না।[৩] এই নৈতিকতায় গর্ভপাত ‘তেমন কিছু না’। আমেরিকার গর্ভপাতের এক-তৃতীয়াংশই হয় গর্ভধারণের ৬ষ্ঠ সপ্তাহের পর[১]
ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে এখন নবজাতক-হত্যার (after-birth abortion) বৈধতার আলাপ চলছে। বলা হচ্ছে, ভ্রুণ আর নবজাতকের মাঝে স্ট্যাটাসগত কোনো পার্থক্য নেই। যে যুক্তিতে গর্ভপাত করা যায়, সেই একই যুক্তিতে নবজাতককে হত্যাও করা যেতে পারে, কেননা দুটোর কোনোটাকেই Person বলে ধরা হয় না।[২]

ফিনল্যান্ড, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরিতে পশুকে আহত না করে যৌনসঙ্গম বৈধ।[৩] আমেরিকার Hawaii, Kentucky, Nevada, New Mexico, Ohio, Texas, Vermont, West Virginia, Wyoming এবং the District of Columbia-তে পশুমৈথুন আইনত বৈধ।[৪]

এনলাইটেনমেন্ট-মডার্নিটিতে খোদ পশ্চিমেরই মুক্তি মেলেনি। সেই ১৮শ শতকের শেষেই এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাধারার সমালোচনা শুরু হয়েছে, যাকে পরে নাম দেওয়া হয় কাউন্টার-এনলাইটেনমেন্ট। আসলেই আলোকায়ন মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে কি না, তা নিয়ে কথা বলেছেন একাডেমিকরা। মডার্নিজম চিন্তার সমালোচনা হচ্ছে পোস্ট-মডার্নিজম শিরোনামে। আজ ৩য় বিশ্ব অন্ধভাবে ১ম বিশ্বের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। আম গাছ লাগিয়ে কাঁঠাল খেতে চাইলে তো হবে না। এনলাইটেনমেন্ট-মডার্নিটির সব কনসেপ্ট হুবহু কপি-পেস্ট করবেন, আর তার ফলাফল হুবহু নেবেন না, তাই কি হয়? নিজেদের এই প্রতিটি পরিণতির দিকেই ডাকছে ১ম বিশ্ব আমাদেরকে। তাদের প্রগতির যে ফর্মুলা, তার রেজাল্ট এই ঘুণেধরা নষ্ট সভ্যতা। বাঁচতে চাইলে এই কালো-সভ্যতার প্রতিটি উপাদানকে হয় ত্যাগ করুন, নইলে যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করুন; চোখ বুজে ঝাঁপ দেবেন না।

টিকাঃ
[১] US Census Bureau. 2003. ‘Unmarried-Couple Households, by Presence of Children : 1960 to Present,’ Table UC-1, June 12, 2003.
[২] Neil Howe (Mar 29, 2019), Nations Labor To Raise Their Birthrates, Forbes
[৩] U.S. Abortion Statistics [abort73.com]
[৪] U.K. Abortion Statistics, Department of Health and Social Care (England and Wales), National Services Scotland, and the Department of Health (Northern Ireland).
[১] https://twitter.com/spectatorindex/status/988307897955237888?lang=en
[২] Wisconsin Department of Health and Social Services, Division of Youth Services, 'Family Status of Delinquents in Juvenile Correctional Facilities in Wisconsin' (1994).
[৩] STEVE DOUGHTY (2010). Nation of broken families : One in three children lives with a single-parent or with step mum or dad. THE DAILY MAIL. Study by Office for National Statistics
[১] Freund, K., & Watson, R. J. (1992). The proportions of heterosexual and homosexual pedophiles among sex offenders against children: an exploraton study. Journal of sex & marital therapy, 18(1), 34-43. [resulting proportion of true pedophiles among persons with a homosexual erotic development is greater than that in persons who develop heterosexually.]
[২] Prostitution in Germany: A giant Teutonic brothel, The Economist (Nov 16th 2013)
[৩] Child Sex Trafficking In Latin America, United Nations Human Rights Council.
[৪] Ann Barger Hannum. ReVista : Harvard Review of Latin America. (Winter 2002)
[৫] Knot Yet : The Benefits and Costs of Delayed Marriage in America, a new
[১] Abortion Statistics, England and Wales : 2019, Department of Health and Social Care (England and Wales) 2020
[২] Klein, L. B., & Martin, S. L. (2021). Sexual Harassment of College and University Students: A Systematic Review. Trauma, violence & abuse, 22(4), 777-792.
[৩] necrometrics.com
[৪] Global arms industry : Sales by the top 25 companies up 8.5 per cent; Big players active in Global South, Stockholm International Peace Research Institute (7 December 2020)
[৫] Space Market Research Reports & Consulting, MarketsandMarkets Research Private Ltd.
[৬] Mercy Corps : What you need to know about global hunger (2017 estimate).
[১] UN Food and Agriculture Organization : 1.02 billion people hungry
[২] Half of world's wealth now in hands of 1% of population, The Guardian (Oct 2015) Oxfam says wealth of richest 1% equal to other 99%, BBC (Jan 2016)
[৩] Stuebing অজাচার কেস। ২০০৮ সালে জার্মান ফেডারেল কোর্ট (সুপ্রিম কোর্ট)-এর ৭ জন বিচারকের ১ জন অজাচারের পক্ষ নেন। তার যুক্তি। সেক্যুলার লিবারেল নৈতিকতা এটাই
[১] U.S. Abortion Statistics [abort73.com]
[২] Giubilini A, Minerva F (2013), After-birth abortion : why should the baby live? Journal of Medical Ethics 2013;39:261-263.
[৩] The Animal Prostitution and Bestiality Brothels in Europe: The 50 Shades of Shame. sarahmaxresearch.com [June 27, 2017]
[৪] The dark truth about bestiality parties, Metro [Apr 2017]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00