📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 চাপিয়ে দেওয়া আলো

📄 চাপিয়ে দেওয়া আলো


আবিষ্কারের দুয়ার খুলে দেয় যুদ্ধ। উন্নত মারণাস্ত্র, উন্নত সুরক্ষা প্রকৌশল, দ্রুততম বাহন-কামান, নৌযুদ্ধ, নৌপ্রকৌশল এসব আবিষ্কার হয় যুদ্ধের মওকায়। শান্তিপ্রিয় এলাকা এসব আবিষ্কার করতে পারে না। ইউরোপের শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩) নিজেদের মাঝে হানাহানির সুযোগে ইউরোপ সামরিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠে। ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদগণ জানাচ্ছেন, কলম্বাসের আগেও আমেরিকা মহাদেশে ভাইকিং জলদস্যু, আরব বণিকদের যাতায়াত ছিল। এসবের বহু প্রমাণ আমেরিকায় গিয়ে কলম্বাস নিজেই পেয়েছেন ও বর্ণনা করেছেন। আসলে 'আবিষ্কার' শব্দটার অর্থই বদলে দিয়েছে ইউরোপ। রবার্ট ব্রিফল্টের মেজাজই খারাপ—
কে experimental method-এর আবিষ্কর্তা, সেটা অন্যান্য আরব আবিষ্কারের মতোই— ১ম ইউরোপীয় যে সেটার উল্লেখ করবে সে-ই সেটার আবিষ্কারক। ঠিক যেমন কম্পাস Flavio Gioja-এর নামে, অ্যালকোহল Arnold of Villeneuve-এর নামে, লেন্স ও বারুদ Schwartz কিংবা Bacon-এর নামে। এসবই ইউরোপীয় সভ্যতার উৎসের ব্যাপারে বিরাট বিরাট ভুলবার্তার অংশ।
তো একইভাবে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন কে? ১৪৯৮ সালে জলদস্যু ভাস্কো-দা-গামা। অবাক হয়ে ইউরোপ দেখল, নিজেদের মাঝে মারামারি করে শক্তিক্ষয় আর কত? ইউরোপের বাইরে বিশাল এক অপ্রস্তুত দুনিয়া পড়ে আছে। ব্যবসায়ীরা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গড়ে বেরিয়ে পড়ল। পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ডাচ, ইংরেজ। এসব কোম্পানির সাথে আছে নিজস্ব সেনাবাহিনী। প্রথমে ব্যবসার অনুমতি, এরপর ব্যবসার নিরাপত্তার কথা বলে সেনাবাহিনী ঢুকানো, ক্যান্টনমেন্ট-দুর্গ নির্মাণ, এরপর নেটিভদের পরাজিত করে উপনিবেশি শাসন প্রতিষ্ঠা... এই ফর্মুলায় সারা দুনিয়ায় উপনিবেশ গাড়ল ইউরোপ।

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ডাকাতির গল্প

📄 ডাকাতির গল্প


ছোটবেলায় আবুব একটা বই কিনে দিয়েছিলেন—সব সেরা ডাকাতের গল্প। অস্থির লাগত পড়তে। বিশে ডাকাত, রঘু ডাকাত, রমা ডাকাতের গল্প। এখন আপনাদের যে ডাকাতের গল্প বলব, তার সাথে এদের কোনো তুলনা চলে না। ধনসম্পদ ডাকাতি তো করেছেই, মন-দিল-আক্কেল-বুদ্ধি সব ডাকাতি করে ইউরোপে নিয়ে গেছে। আবার দয়া করে ডাকাতি করেছে বলে সর্বস্বান্ত ঘরের মালিক-ছেলেপুলে সবাই সেই ডাকাতের প্রতি কৃতজ্ঞ। এমন দুর্দান্ত সে ডাকাত!

আমেরিকায় উপনিবেশে ইংল্যান্ড পেরে উঠছিল না অন্যদের সাথে, সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের পকেটের হালত সুবিধার ছিল না। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক James Mill বলছেন—
ইংরেজদের দেশ সরকারের ব্যর্থতা আর গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ছিল। এতটাই যে, বাণিজ্য প্রসার ও সুরক্ষার জন্য পুঁজিই ছিল না তাদের। ওলন্দাজদের সাথে চলত এক অসম প্রতিযোগিতা।[১]
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর সেই ইংল্যান্ডেরই 'আঙুল ফুলে কলাগাছ' অবস্থা। ১৭৫৭-তে বাংলা জয়, ১৭৬৫ সালে বাংলার দিওয়ানি (ট্যাক্স কালেকশনের ক্ষমতা) লাভ... ঠিক ১৭৬০-এর দশকেই ইংল্যান্ডে শুরু হয়ে গেল শিল্পবিপ্লব? আরিব্বাসরে! কীভাবে হলো শুনুন William Digby নামের এক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক-কাম-রাজনীতিবিদের ভাষায়—
পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ স্রোতের মতো এসে জমা হতে থাকে লন্ডনে। ১৭৬০ সালের আগে যেখানে শিল্পকারখানার নাম-গন্ধও ছিল না, সেখানে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। [১]
কী পরিমাণ সম্পদ গেছে ইংল্যান্ডে? সেটা শুনবেন P. Spear সাহেবের The Indian Nabobs-বই থেকে-

| বাবদ | হিসাবটা টাকায় নয়, পাউন্ডে |
|---|---|
| মুর্শিদাবাদের কোষাগার লুট | ১৫ লক্ষ |
| যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে | ৪ লক্ষ |
| কোম্পানির সিলেক্ট কমিটি | ৯ লক্ষ |
| কোম্পানির কাউন্সিল মেম্বাররা প্রত্যেকে | ৫০-৮০ হাজার করে |
| ক্লাইভ নিজে | ২ লক্ষ ৩৪ হাজার। সাথে বছরে ৩০ হাজার করে পাবে। |
| জামাই মির কাশিম দিলো | ২ লক্ষ |
| নজম-উদ্দৌলা দিলো | ১ লক্ষ ৪৯ হাজার |
| সাধারণ ব্রিটিশ সেনাদের লুটপাট | বেহিসেব |

লর্ড ক্লাইভ নিজেই স্বীকার করেছেন: এমন অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা-ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের পাশবিক চিত্র বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথায় পাওয়া যায়নি। (Malcom, Life of Clive) লর্ড মেকলে লিখেছেন[২]-
“ইংল্যান্ডে সম্পদ আসত সমুদ্রপথে। ওয়াট ও অন্যদের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইংল্যান্ডের যেটুকু কমতি ছিল, ইন্ডিয়া সেটুকু সরবরাহ করেছে। ইংল্যান্ডের পুঁজি বহুগুণে বাড়িয়েছে ভারতীয় সম্পদের প্রবেশ।... শিল্পবিপ্লব, যার ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সম্ভব হয়েছিল কেবল ইন্ডিয়ার সম্পদের কারণে। যা কোনো লোন ছিল না, এমনিতেই নিয়ে নেয়া হয়েছিল (লুট)। তা নাহলে স্টিম ইঞ্জিন ও যন্ত্রশিল্প পড়েই থাকত ইংল্যান্ডের। ইংল্যান্ডের উন্নতি মানে ভারতের লোকসান-এমনই লোকসান, যা ভারতে শিল্পকে ফাঁকা করে দিয়েছিল, কৃষিকে স্থবির করে দিয়েছিল। যেকোনো দেশ যদি এইভাবে পাচার করা হয়, সে ধনী-সম্পদশালী হলেও নিঃস্ব হয়ে যাবে।'

ব্রিটেনের সকল যুদ্ধব্যয় (১৯১৩ সাল অব্দি ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ড), সকল বিজ্ঞানের ফান্ডিং, সকল প্রযুক্তির বাণিজ্যিকরণের পুঁজি সরবরাহ করেছে ভারত। ভারতকে নিংড়ে ব্রিটেন আজ বিজ্ঞান-দর্পী, ঝকঝকে তকতকে, উন্নত। Sir William Digby লিখেছেন: ১৯০০ পর্যন্ত ভারত থেকে আইনগতভাবেই (আইন বানিয়ে) আমরা নিয়েছি ৬,০৮০ মিলিয়ন পাউন্ড (৬০৮০,০০০,০০০ পাউন্ড) [১]। Mr. A.J.Wilson মার্চ ১৮৮৪-এর Fortnightly Review ম্যাগাজিনে লেখেন : ভারতীয়দের বছরে মাথাপিছু আয়ই সর্বোচ্চ ৫ পাউন্ড। সেখানে প্রতিবছর আমরা কোনো না কোনোভাবে ৩ কোটি পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছি।
আগের ৭০০ বছরে যে ভারতে মাত্র ১৭ বার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেই ভারতে ১৭৭০-১৮৫০-এর মাঝে ৮০ বছরের ভেতরে অলরেডি ১২ বার দুর্ভিক্ষ হয়ে গেছে, না খেয়ে মারা গেছে ৬০ লাখ মানুষ [২]। সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহিমাহুল্লাহর সময়ে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনকে পেছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে (World's Largest Economy) পরিণত হয়, যার মূল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর জিডিপি ছিল সে সময়ের সমগ্র বিশ্বের ৪ ভাগের ১ ভাগ। [৩] সেই দেশটা ঠিক কী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে ১৭৬৯-১৮০০ এর মাঝে ৭ দফা দুর্ভিক্ষের শিক্ষার হতে পারে? ঠিক কী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশে ১৮০১-১৯০০ পর্যন্ত ১০০ বছরে ৩১ টা মন্বন্তরে (মহাদুর্ভিক্ষ) মরে যায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ—'না খেয়ে'[৪] সেটা আশা করি বলে বোঝাতে হবে না। আজকের উন্নত ইউরোপ-আমেরিকা এনলাইটেনমেন্টের উন্নততর মানবিকতার ফসল নয়, সাম্য-স্বাধীনতা-ভ্রাতৃত্বের ফসল নয়; আজকের সাদা-সভ্যতা, তাদের বিজ্ঞান, তাদের উন্নতি উপনিবেশগুলোতে কোটি কোটি নেটিভের জীবনের ফসল, চূড়ান্ত পাশবিকতার ফসল।

টিকাঃ
[১] James Mill এর বরাতে Unhappy India, Lala Lajpat Rai, 1928 : page : 322
[১] Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
[২] Unhappy India, Lala Lajpat Rai, 1928
[১] 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
[২] প্রাগুক্ত
[৩] The World Economy, Angus Maddison, OECD Publishing (2003), page : 261
[৪] 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ব্যবসা

📄 ব্যবসা


সময়টা ১৮১৩। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 'কোম্পানি চার্টার' নবায়নের সময় জিজ্ঞাসা করা হলো মাদ্রাজের গভর্নর কর্নেল Thomas Munro-কে, -আচ্ছা, যদি ইন্ডিয়ার বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় (free trade), তাহলে কি সম্ভাবনা আছে, যে, নেটিভরা (স্থানীয়রা) ব্রিটিশ পণ্য কিনবে? -আমার মনে হয় না, এতে কাজ হবে। অর্থাৎ ব্রিটিশ-উৎপাদিত পণ্য দিয়ে ভারতের বাজার ভরে ফেললেও এতে ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা বাড়ানো যাবে না। কেন যাবে না? কী কারণ দেখিয়েছেন কর্নেল মুনরো? তিনি বলেন-
“আমাদের সবচেয়ে পুরোনো যে উপনিবেশ, সেখানেও নেটিভরা আমাদের জীবনযাত্রা গ্রহণ করেনি। আমাদের পণ্য সেখানে নামেমাত্র বিক্রি হয়। আর ইউরোপীয় গৃহস্থালি পণ্য তো মোটেও বিক্রি হয় না। এমনকি বাপে যদি ইউরো-স্টাইলের কিছু কেনেও, পরের প্রজন্মে ছেলে এসে সেটা ঘর থেকে বের করে দেয়। আমার মনে হয়, এজন্য উচ্চমূল্য দায়ী নয়, অন্য কোনো কারণ আছে ইউরোপীয় পণ্য গ্রহণযোগ্যতা না পাবার, যা আরো স্থায়ী কারণ। আমার খেয়ালে, কারণগুলো আবহাওয়াগত, ধর্মীয় এবং আদব-কায়দা-সম্পর্কিত এবং তাদের দেশি পণ্যের উচ্চমান। যেমন ধরুন, একজন হিন্দু মেঝেতে বসে খায় মাটির থালায়, মাদুর-পাটি ছাড়া তার ঘরে কোনো ফার্নিচার নেই। এজন্য আমাদের খাবার টেবিল, সোফা জাতীয় পণ্য তাদের প্রয়োজনও নেই। [১]
অর্থাৎ ভারতীয়দের রুচি আলাদা, ইউরোপীয় রুচির পণ্য বিক্রি হচ্ছে না বেনিয়াদের। বিক্রি করতে হলে রুচি বদলে ইউরোপীয় রচি করে দিতে হবে। তাহলে তারা ব্রিটিশ পণ্য কিনবে। এটা ছিল ১৮১৩ সালের চিত্র। স্যার উইলিয়াম ডিগবি তার বইয়ে ১৮৯৮-৯৯ সালের চিত্রে দেখাচ্ছেন ২০ লক্ষ ইউরোপীয়-ওয়াশড ইন্ডিয়ান (Europeanized Indian)-এর জন্য বিলাতি পোশাক, খাবার, আসবাবপত্র আমদানি হয়েছে এদেশে। তার মানে এই ৮০-৯০ বছরে ভারতীয়দের রচির বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তুলনা করুন লর্ড মেকলের বিখ্যাত উক্তিটা- (১৮৩৫-এর শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা এমন প্রজন্ম তৈরি হবে) এরা হবে এমন একটা শ্রেণি, যারা রক্তে-গায়ের রঙে তো ভারতীয়, কিন্তু রুচি-মতামত-নীতি-বিচারবুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। (মনোরাজ্যে উপনিবেশ)

শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ৬০ বছরে এক প্রজন্মের ব্যবধানে ২০ লক্ষ ক্রেতা তৈরি করে ফেলা হলো রুচির পরিবর্তন ঘটিয়ে। ভারতবর্ষ হয়ে গেল ব্রিটেনের প্রধান বাজার।

টিকাঃ
[১] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৫

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


উপনিবেশ আমল শুরু হওয়ার আগে উসমানি-অধীন এলাকা (পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা), পশ্চিম আফ্রিকা (মালি, ঘানা, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া) এবং উপমহাদেশে (পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান) একটা শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। উইলিয়াম হান্টার তার ইন্ডিয়ান মুসলমানস গ্রন্থে লেখেন-
" এ দেশটা আমাদের হুকুমতে আসার আগে মুসলিমরা শুধু শাসনের ব্যাপারেই নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও ছিল ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতি। ভারতের যে প্রসিদ্ধ (ইংরেজ) রাষ্ট্রনেতা তাদের ভালোভাবে জানেন, তার কথায়: ভারতীয় মুসলিমদের এমন একটা শিক্ষাপ্রণালি ছিল, যেটা আমাদের আমদানি করা (ব্রিটিশ) প্রণালির চেয়ে নিম্ন হলেও (!) কোনো ক্রমেই ঘৃণার যোগ্য ছিল না। তার দ্বারা উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন হতো। সেটা পুরোনো ছাঁচের হলেও তার ভিত্তিমূল সুদৃঢ় ছিল এবং সেকালের অন্য সব প্রণালির চেয়ে নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট ছিল। এই শিক্ষাব্যস্থায়ই তারা মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য সহজেই অধিকার করেছিল।'

সেই শিক্ষাটা কেমন ছিল একটু ধারণা করা যেতে পারে। উপনিবেশ শুরুর ঠিক আগের শতকে আওরঙ্গজেবের মেয়ে শাহজাদি যাইবুন্নিসার সিলেবাস ছিল আরবি গ্রামার, গণিত, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন এবং অন্যান্য বিজ্ঞান সহযোগে। এটা ছিল ঘরোয়া একটা অনানুষ্ঠানিক কারিকুলাম। এ থেকে আনুষ্ঠানিক কারিকুলামের একটা ধারণা নিতে পারি আমরা। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদরাসা ছিল, যেখানে উইলিয়াম হান্টারের বিবরণ অনুযায়ী 'ব্রিটিশ কারিকুলামের মতো না হলেও ঘৃণার যোগ্য ছিল না', বরং 'উচ্চস্তরের জ্ঞান বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তি পরিচ্ছন্ন' হবার জন্য এবং 'মানসিক ও আর্থিক প্রাধান্য' অর্জনের উপযোগী ৮০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল আমাদের ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষের জন্য শুধু 'বাংলায়'।

ফ্রান্সের নিষ্পেষণে নিঃসু আফ্রিকার সোনার দেশ, 'মানসা মুসা'র দেশ মালি। উপনিবেশ হবার আগে টিম্বাকত শহরে ৩টা ভার্সিটি, ১৬শ শতকে। শহরে ১ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ২৫ হাজারই ছিল ভার্সিটি স্টুডেন্ট। কুরআন-হাদিস-ফিকহ-সাহিত্য ছিল প্রধান বিষয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে থাকত-মেডিসিন-সার্জারি, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ফিজিক্স, রসায়ন, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস, চিত্রকলা। ভার্সিটির সামনে বহু ট্রেড-শপ থাকত, ছাত্ররা এখানে হাতেকলমে ব্যবসা শিখত। এখানে কাঠের কাজ, কৃষি, মাছ ধরা, চামড়া শিল্প, সূচিকর্ম, নৌবিদ্যা শিখত।
'এনলাইটেনমেন্ট'-এর যুগে ইউরোপ যখন 'খ্রিষ্টধর্ম-সামন্তসমাজ' (রাজতন্ত্র+পোপতন্ত্র) থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষ-পুঁজিবাদ' (গণতন্ত্র+পুঁজিপতি) সেট-আপে আসছে। নতুন করে সবকিছুর সংজ্ঞা ঠিক করা হচ্ছে। ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র- ধর্ম-উদ্দেশ্য-সত্য-নৈতিকতা-সবকিছুর নতুন নতুন ধারণা দিচ্ছেন ইউরোপীয় দার্শনিকরা। পুরোপুরি ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার আলোকে। সুতরাং, 'শিক্ষা'র সংজ্ঞাও বদলে গেল। Encyclopedia Britannica বলছে-
“ The new social and economic changes (এনলাইটেনমেন্ট) also called upon the schools (public and private) to broaden their aims and curricula. Schools were expected not only to promote literacy, mental discipline, and good moral character (শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য) but also to help prepare children for citizenship, for jobs, and for individual development and success. (পরের উদ্দেশ্য)
আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল-লিখতে-পড়তে পারা (promote literacy), শৃঙ্খলা শেখানো (mental discipline) আর নৈতিক চরিত্র গঠন (good moral character)। আর এখন তার সাথে যোগ হলো-
১. নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি (citizenship)
২. নতুন অর্থ-ব্যবস্থার (পুঁজিবাদী) জন্য কর্মী তৈরি, যারা চাকুরিতে আসবে (jobs)
৩. নতুন সংজ্ঞার 'ব্যক্তি' তৈরি (individual development), যারা 'সফলতা'র নতুন সংজ্ঞার (material success) জন্য প্রস্তুত হবে।
তাহলে 'নারীশিক্ষা' মানে কী দাঁড়াচ্ছে?
১. মেয়েদেরকে তাদের দেওয়া রাষ্ট্র-কাঠামোর যোগ্য নাগরিক বানানো
২. পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থার কর্মী বানানো
৩. 'ব্যক্তি' হিসেবে মেয়েদের তৈরি করা, যারা ধর্মকে ঝেড়ে ফেলে নিজের নৈতিকতার মাপকাঠি ঠিক করতে পারে। নিজেকে পশ্চিমাদের সংজ্ঞায় 'সফল' হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। খ্যাতি-অর্থ-পদ-আধুনিকতার দাসে পরিণত হতে পারে।

'শিক্ষা' মানে 'নারীশিক্ষা' মানে যদি হয় 'এই', তাহলে ইউরোপের বাকি সব সংজ্ঞার মতো, ওই 'শিক্ষা' 'নারীশিক্ষা'র সাথেও ইসলাম একমত নয়। এই যে এদেশের বড় বড় আলিমগণ যে এই সেক্যুলar 'শিক্ষা' 'নারীশিক্ষা'র বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং শুরু থেকেই বলে এসেছেন-এই কারণে বলেন। আমরা না বুঝলেও আলিমরা ঠিকই বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা কী করতে যাচ্ছে। বিপদ আঁচ করেই তারা অনেকে 'ইংরেজি শিক্ষার' বিরোধিতা করেছিলেন।

দেশে দেশে উপনিবেশবাদ জেঁকে বসল। ইংরেজরা সুবে বাংলার খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে লক্ষ্য করল যে, ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তব ও মাদরাসা ছিল। এই ৮০ হাজার মক্তব, মাদ্রাসা ও খানকার জন্য বাংলার চার ভাগের এক ভাগ জমি লাখেরাজভাবে বরাদ্দ ছিল। আরে? ৪ ভাগের ১ ভাগ খাজনা হাতছাড়া হবে, তাই কি হয়? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমেই এই লাখেরাজ সম্পত্তি বিভিন্ন আইন, বিধিবিধান প্রণয়ন ও জোরজবরদস্তি করে দেশের হিন্দু জমিদারদের কাছে ইজারা দিতে থাকে। এ-সংক্রান্ত তিনটি বিধান হলো-
(১) ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন-১৯, (২) ১৯১৮ সালের রেগুলেশন-২, (৩) রিজাম্পশান ল' অব ১৮২৮ (লাখেরাজ ভূমি পুনঃগ্রহণ আইন)।
ফলে মাদ্রাসার আয় কমতে থাকে। বহু মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। ১৭৬৫ সালে বাংলায় মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল আশি হাজার (Max Muller)। ২০০ বছর পর ১৯৬৫ সালে এ সংখ্যা দুই হাজারের নিচে নেমে আসে।

১৮৩০ সালের পর তাদের খেয়াল হলো। কী খেয়াল? এই মূর্খ নেটিভদের শিক্ষিত করা দরকার—এই দয়া? জি না। তাদের খেয়াল হলো, এই বিশাল দেশ দীর্ঘমেয়াদে শাসন করতে হলে আমাদের কিছু অনুগত সেবাদাস তৈরি করা দরকার, আমাদের পণ্যের বিক্রি বাড়াতে এদের রুচি বদলে দেওয়া দরকার। যারা আমাদের আর এই বাদামি নেটিভদের মধ্যস্থতা করবে (দালাল), এদেশে রক্ষা করবে আমাদের স্বার্থ (এমনকি আমরা চলে গেলেও)। ১৮৩৪ সালে ভারতে শিক্ষা প্রসারের জন্য (?) কমিটি করা হয়। এর প্রধান ছিলেন লর্ড মেকলে। স্কিমের রিপোর্টে কমিটির উদ্দেশ্য হিসেবে লেখেন (কথাগুলো খেয়াল করুন)—
বর্তমানে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা নেওয়া উচিত, যারা আমাদের ও আমাদের মিলিয়ন মিলিয়ন প্রজাদের মাঝে ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করবে। (উদ্দেশ্য শিক্ষার প্রসার নয়)
এরা হবে এমন একটা শ্রেণি, যারা রক্তে-গায়ের রঙে তো ভারতীয়, কিন্তু রুচি-মতামত-নীতি-বিচারবুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। (মনোরাজ্যে উপনিবেশ)
এই শ্রেণির কাছে আমরা দায়িত্ব দেবো তাদের দেশের প্রচলিত কথাগুলোকে সংস্কার করার এবং পশ্চিমা পরিভাষা নিয়ে তাদের স্থানীয় ভাষাগুলোকে সমৃদ্ধ করার। (পশ্চিমা দর্শন-সংজ্ঞা-পরিভাষা গ্রহণ ও আত্মীকরণ)
তাদেরকে আমরা বাহন হিসেবে দেবো বিভিন্ন ডিগ্রি, যাতে চড়ে তারা এই জ্ঞান পৌঁছে দেবে বাকি জনগণকে। (ডক্টরেট-নোবেল প্রাইজ-স্যার-রায়বাহাদুর-খানবাহাদুর) [১]
পশ্চিমা শিক্ষা দর্শনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল—
পাশ্চাত্য সভ্যতার মহান ধারণাগুলো (এনলাইটেনমেন্ট থেকে পাওয়া) যেন বুঝিয়ে দেওয়া যায় শিক্ষার্থীদের। কারণ এই আইডিয়াগুলো চিরন্তন, ধ্রুব সত্য এবং সর্বযুগের সমাধান। [২]
এভাবেই ইউরোপের নিজের অভিজ্ঞতা (আলোকায়নের তরিকা) 'সর্বজনীন পরম সত্য' হিসেবে পুরো দুনিয়ার ওপর চাপানোর এজেন্ডা নেওয়া হলো। যদিও ইসলামি ভূখণ্ডে, চীনের অভিজ্ঞতা ইউরোপ থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। উপনিবেশের মওকায় এভাবেই তারা সেই শ্রেণিটা তৈরি করে ফেলল, 'যারা চামড়ায় ভারতীয়, মগজে ইউরোপীয়'।

যেহেতু শিক্ষার সংজ্ঞা হলো 'ইউরোপের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি শেখা-ধারণ করা ও আত্মীকরণ করে চামড়ায় ভারতীয় মগজে ইউরোপীয় হওয়া'। এই সংজ্ঞায় যারা পড়বে, তারা হচ্ছে 'শিক্ষিত'। আর যারা এই সংজ্ঞায় আসবে না, তারা 'অশিক্ষিত', 'মূর্খ', 'প্রস্তর যুগের লোক', 'পশ্চাৎপদ'। তারা কারা? তারা হচ্ছে, যারা প্যারালাল শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে সেই আগেরটা লালন করে চলে। বিপদ টের পেয়ে ১৮৬৬ সালে আলিমগণ প্রতিষ্ঠা করেন দেওবন্দ মাদরাসা। সমাজের অর্থায়নে টিকে গেল এনলাইটেনমেন্ট-বিরোধী শিক্ষাধারা।
ব্রিটিশরা যখন ক্ষমতা দিয়ে গেল, কাদের কাছে দিয়ে গেল? এই 'চামড়ায় ভারতীয় মগজে ব্রিটিশ'দের হাতেই, যাদের আদর করে ডাকা হয় Children of Macaulay। এরাই আমাদের প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-আমলা-শিক্ষক-বাবা-দাদা হলেন। তারাই আমাদের কারিকুলাম বানালেন, তারাই পলিসি করলেন, তারাই পরস্পর যুদ্ধ করলেন। বলা হয় দেশভাগ নাকি হয়েছিল 'ধর্মের ভিত্তিতে'... বাংলাদেশের জন্মই নাকি প্রমাণ করে দিলো 'ধর্ম' কোথাও ভিত্তি হতে পারে না, ধর্ম ব্যর্থ। বাজারে খুব চলে এই চেতনাটা। আচ্ছা, সেক্যুলার ব্রিটিশ দেশভাগ করল খাবলা খাবলা করে। দেশ দিয়ে গেল সেক্যুলারদের হাতেই: জিন্নাহ-নেহেরু দুজনই বিলাতের ব্যারিস্টারি পড়াকালীন দোস্ত। যুদ্ধ করল সেক্যুলারে-সেক্যুলারে। বাঙালি মা-বোনদের ধর্ষণ করল পাক সেক্যুলার দেশের সেক্যুলার আর্মি। এই পুরো নাটকে 'ধর্ম' 'ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ' 'আলিমসমাজ'-এর দোষটা কোথায়? সব রোল প্লে করল 'চামড়ায় ভারতীয় মগজে ইংরেজ'রা। দোষ হচ্ছে ধর্মের। মজা তো, মজা না?

সেই লর্ড মেকলের শিক্ষায় আমরাও 'শিক্ষিত', আমরা 'Children of Macaulay'। মনেপ্রাণে আমরা ধারণ করি ইউরোপীয় চেতনা। এনলাইটেনমেন্ট থেকে মডার্নিটি হয়ে পাওয়া ইউরোপীয় অভিজ্ঞতাপ্রসূত দৃষ্টিভঙ্গি। ধর্ম মানে যদি হয় 'ধারণ করা', তবে আমাদের ধর্ম 'পাশ্চাত্য দর্শন', কারণ জেনে না-জেনে ওটাই আমরা ধারণ করি। যদিও মুখে বলি 'আমি মুসলিম' বা 'আমি হিন্দু'।

টিকাঃ
[১] Minute on Indian Education, 2nd February, 1935; Thomas Babington Macaulay, point 12.
[২] Perennialism দর্শন। [Philosophical Perspectives in Education, Oregon State University ওয়েবসাইট]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00