📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র vs ইসলামি খিলাফত

📄 খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র vs ইসলামি খিলাফত


অনেকে খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র ও ইসলামি শাসনকে Theocracy শিরোনামের অধীনে একই রকম মনে করেন। এই মৌলিক পার্থক্যগুলো না বুঝলে ইতিহাস পড়ার কোনো মানে নেই।

দুনিয়া-রাজ্য ও ধর্মরাজ্য পৃথক জিনিস। একসাথে মেলানো যাবে না—যীশুর ভাষায়: 'Render unto GOD that is GOD's. And render unto Caeser that is Caeser's [২] পরবর্তী সময়ে স্কলাস্টিক খ্রিষ্টবাদীদের মতেও City of God আর City of Man আলাদা। ধর্মরাজ্য শাসনের জন্য পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের মতো প্যারালাল আরেকটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা এই চার্চ বা যাজকতন্ত্র। পোপ এখানে ঈশ্বরের প্রতিনিধি, তিনি দেশে দেশে নিয়োগ দেন আর্চবিশপ। আর্চবিশপেরা নিয়োগ দেন স্থানীয় গির্জাপ্রধান ও মঠাধ্যক্ষদের। এরা ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের ওপর সীমাহীন প্রভাব রাখত। সমান্তরাল ব্যবস্থার দরুন এদেরকে সন্তুষ্ট রাখা জরুরি ছিল রাজা-জমিদারদের জন্য। বিপরীতে এরাও রাজাকে ‘ঐশ্বরিক প্রতিনিধি’ হিসেবে মেনে নিতে জনগণকে উৎসাহিত করত। এভাবে এক মিথোজীবী প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল পোপতন্ত্র।

বিপরীতে ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা কোনো প্যারালাল ব্যবস্থা নয়। ইসলামে দুনিয়ারাজ্য ও ধর্মরাজ্য একই জিনিস। দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র বা পরীক্ষাগার। পার্থিব প্রতিটি বিষয়ই ধর্মের আলোচ্য বিষয়। কেবল বিশ্বাস ও প্রথা-অনুষ্ঠান নয়, পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজ-বাজার-যুদ্ধ-বিচার সবকিছুই ধর্ম। সুতরাং, এখানে খলিফা একইসাথে ধর্মীয় প্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধান। খলিফার বৈধ সিদ্ধান্ত অনুসরণ জনগণের ধর্মীয় দায়িত্ব। তবে খলিফার এই সিদ্ধান্ত একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাচারী নয়। খলিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়-
১. কুরআন-সুন্নাহ তথা শারিয়া দ্বারা (শারিয়াবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত মানতে জনগণ বাধ্য নয়)
২. পরামর্শ পরিষদ দ্বারা (আহলে শুরা)
৩. আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ দ্বারা (খলিফা নির্বাচক যারা)
৪. খলিফার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ ও হিসেব চাওয়ার অধিকার প্রতিটি মুসলিমের
উদাহরণ-
» খলিফা উমারকে গণজমায়েতের মধ্যে দলিল দিয়ে চ্যালেঞ্জ করে মত পরিবর্তনে বাধ্য করলেন খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহা। [১]
» উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর নতুন পোশাক নিয়ে হিসাব চাইলেন এক বেদুইন।

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'যদি আমি কুরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিই, তোমরা কী করবে?' একজন জবাব দিলেন, 'বাঁকা তির যেভাবে সোজা করে, সেভাবে আপনাকে সোজা করে দেবো।'

পরে খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্রের উদ্ভব হলো, তখনো 'শাইখুল ইসলাম'-এর মতামত ও অনুমোদনকে খলিফাগণ জরুরি মনে করতেন। আর বিচারিক কার্যাবলী পুরোটাই দেখভাল করতেন প্রধান কাজি, যিনি হতেন সামসময়িক শ্রেষ্ঠ ফকিহদের একজন, যে বিচারের আওতার বাইরে স্বয়ং খলিফাও ছিলেন না।
মিথোজীবিতা যে একদমই ছিল না, তা বলা সমীচীন নয়; তবে এমন প্রাতিষ্ঠানিক মিথোজীবিতা (চার্চ-রাষ্ট্র) ছিল না, যেহেতু চার্চের মতো পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না। আলিম-সমাজ কোনো প্যারালাল ব্যবস্থা ছিল না। সুলতানদের শারিয়া-বিরোধী কার্যক্রমের প্রতিবাদ করাকে আলিমগণ ঈমানি দায়িত্ব মনে করতেন ও সুস্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ করতেন। এর প্রমাণ হলো: ইসলামি সভ্যতায় আলিমদের ব্যাপক কারাবরণ। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইমাম ইবনু তাইমিয়া, ইমাম মালিক, ইবনুল কাইয়িম, ইবনু কাসির, ইবনু হাজার আসকালানি, ইবনু হাযম, ইবনুল আসির-সহ অধিকাংশ বড় বড় আলিমকে শাসকের শারিয়াহ-বিরোধী কাজের বিরোধিতা করার জন্য কারাবরণ করতে হয়েছে। এছাড়া নিহত ও দেশান্তরিত আলিমদের সংখ্যাও প্রচুর।
সুতরাং, পোপতন্ত্র ও ইসলামি শাসনকে এক করে ফেলা নিতান্তই শিশুসুলভ ইতিহাস পাঠ। পোপতন্ত্রের স্বতন্ত্র আরো দুটি দিক হলো : বাইবেল থেকে সাধারণকে দূরে রাখা। মার্টিন লুথার জার্মানে অনুবাদ করার আগে শুধু ল্যাটিনেই বাইবেল পাঠ করা হতো, যাতে আম-পাবলিকের প্রবেশাধিকার ছিল না। আর দ্বিতীয়ত, নিজস্ব কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হাসিলের অনুকূল ব্যাখ্যা দেওয়া, ধর্মের নামে। পোপতন্ত্র ও আলিম-সমাজ, দুটো যে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, তার প্রমাণ হলো ইসলামি শাসনের অধীনে ইসলামি সভ্যতার অবস্থা পোপতন্ত্রের অধীনে ইউরোপের অবস্থার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত।
ইউরোপ এনলাইটেনমেন্টে এসে যে লাগামছাড়া উন্নত আইডিয়াগুলোর কথা বলছে; ইসলাম সেই ৭ম শতকে বসে তার চেয়ে বহুগুণে উন্নত আইডিয়ার কথা বলছে।
এনলাইটেনমেন্ট সমতা ব্যক্তিস্বাধীনতা যুক্তির প্রভুত্ব মানবজ্ঞানভিত্তিক লাগামহীন প্রগতি সাংবিধানিক অধিকাংশের সরকার সমতাভিত্তিক সমাজ সংশয় থেকে শুরু সর্বোচ্চ ও সর্বাধিকের উপভোগ ব্যবসার বিধিনিষেধ বিলোপ
সুষমতা ইসলাম
সামষ্টিক স্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যালেন্স মানবযুক্তির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে যুক্তিপ্রয়োগ নৈতিকতা-নিয়ন্ত্রিত প্রগতি আইনের অধীনস্থ যোগ্যতাভিত্তিক সরকার ইনসাফভিত্তিক সমাজ যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্বাস থেকে শুরু সংযমী ভোগ ব্যবসার অনুমোদন ও ধরন নিয়ন্ত্রণ

এনলাইটেনমেন্টের চিন্তাধারার মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ইসলামে রয়েছে, যা নিছক তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য। কারণ ইসলাম স্রেফ কিছু দার্শনিকের চিন্তার সমষ্টি নয়, ইসলাম সুশৃঙ্খল এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার পাঠানো সুশৃঙ্খল জীবন-ব্যবস্থাপনার প্রেসক্রিপশন। ওষুধ খেলে সুস্থ থাকবে মানবজাতি, ওষুধ না খেলে রোগ বাড়বে।
ইউরোপের সাথে মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতার এই পার্থক্যটা মুসলিমদের বুঝতে হবে। ইউরোপ শিকল খুলে ফেলেছে আর আমরা খুলে ফেলেছি সোনার হার। রাষ্ট্র থেকে চার্চকে সরিয়ে ইউরোপ মাথা থেকে বোঝা নামিয়েছে আর সেই অনুকরণ করে আমরা মাথা থেকে নামিয়েছি মুকুট। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট ইউরোপের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ফল, আমাদের অভিজ্ঞতা এমন নয়। তাহলে কেন ইউরোপের ফর্মুলা, তাদের লাগামছাড়া ‘উন্নত’ মূল্যবোধ, লাগামছাড়া প্রগতির সংজ্ঞা, ভালোমন্দের মাপকাঠি আমাকে মেনে নিতে হবে? কোন যুক্তিতে ইউরোপ তার একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতা মেনে নিতে আমাদেরকে বাধ্য করছে? কেন ইউরোপীয় ধাঁচের রাষ্ট্রই আমাদের হতে হবে, কেন ইউরোপীয় ধাঁচের গণতন্ত্রই আমাদের লাগবে, কেন ইউরোপীয় বিজ্ঞান-দর্শন মেনে নিয়ে আমাকে বিজ্ঞান করতে হবে, কেন ইউরোপীয় স্কেলেই আমার উন্নতি মাপতে হবে, কেন ইউরোপের নারীদের মতোই স্বাধীন হতে হবে আমাদের নারীদের? কেন ইউরোপীয় স্টাইলের সমাজ-পরিবার-ব্যক্তিই হতে হবে আমাদের? কেন আমরা আমাদের মতো হতে পারব না?
দেখো না ইউরোপ কত উন্নত! ওদের মতন উন্নত-সভ্য হতে হলে আমাদেরকেও ওদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। তাই নাকি? ওরা কি এসব সমতা-স্বাধীনতা-ভ্রাতৃত্ব করেই উন্নত হয়েছে? আসলেই?

টিকাঃ
[২] Mark 12:17
[১] আল-ইস্তিয়াব, ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ সূত্রে প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৮৯; সাখিরাতুল উকবা শারহু সুনানিন নাসায়ি, খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৬৭-৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00