📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 নাজাত ও আধ্যাত্মিকতার নতুন ধারণা

📄 নাজাত ও আধ্যাত্মিকতার নতুন ধারণা


আদর্শগতভাবে অতিভাববাদী খ্রিষ্টধর্ম আর অতিবস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতার ঠিক মাঝখানে অবস্থান ইসলামের। আল্লাহ খোদ মুসলিমদের সম্বোধন করেছেন 'মধ্যপন্থি' উম্মত হিসেবে। ইসলামে আধ্যাত্মিকতা জগৎ-মায়া-চাহিদাকে ত্যাগ করে নয়, এগুলোকে সাথে নিয়ে এগুলোর ভেতরেই আধ্যাত্মিকতা।

মায়া ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে না। আল্লাহর বিধান মোতাবেক মায়ার যথার্থ লালনেই চূড়ান্ত মুক্তি।
মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। [২]
পিতা জান্নাতের দরজা।[৩]
সেই শ্রেষ্ঠ মুমিন যার ব্যবহার ভালো, তার ব্যবহারই ভালো যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো।[১] কেবল গরিব-দুঃখী, ধর্মপ্রতিষ্ঠানে দিলেই সাদাকা, তা না। স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া লোকমাও সাদাকা। স্ত্রীর জন্য খরচেরও উত্তম বদলা দেওয়া হবে আখিরাতে।[২]
কন্যা সন্তান লালনে জান্নাতের ওয়াদা।[৩]

উত্তম সন্তান সাদাকায়ে জারিয়া।[৪]

প্রতিবেশীর হক এত বেশি বলা হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশঙ্কা করেছেন, প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ না বানিয়ে দেওয়া হয়।[৫]
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।[৬]

■ নাজাতের ও আধ্যাত্মিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ সব চর্চা এই লোক-সমাজের মাঝে থেকেই করতে হয়-
» ইলম চর্চা
» জামাআতে সালাত
» জুমআ ও ঈদের সালাতে বাধ্যবাধকতা
» দান-খয়রাত, মিসকিন খাওয়ানো
» জিহাদ

■ 'তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলো না' [১]-ইসলামের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি। এমন কিছু করা যাবে না, যা ধ্বংসের মুখে, ক্ষতির মুখে, অহেতুক কষ্টের মুখে ফেলে দেয়। মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে অবদমন করে।
» পেটে ক্ষুধা থাকাবস্থায় খাবার প্রস্তুত হয়ে গেলে, আগে খাবার খেয়ে নাও; যদিও ওদিকে সালাতের ইকা-মত শুরু হয়ে যায়।[২]
» সাহারি খাওয়াটাও সাওয়াবের কাজ। এতে অনেক বারাকাহ আছে।[৩] সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত যতটা দেরি করে খাওয়া যায়।[৪]
» ইফতার যত দ্রুত সম্ভব, তত সাওয়াব, তত কল্যাণ। [৫]
» সিয়ামের রাতে স্ত্রী সহবাস অনুমোদিত। [৬]

■ খ্রিষ্টবাদে পাদরিদের বিয়ে যেখানে নিষেধ, তার বিপরীতে ইসলামে বিয়েই পূরণ করে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের অর্ধেক। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا تَزَوَّجَ العَبدُ فَقَد استكملَ نِصْفَ الدِّينِ فَلْيَتَّقِ اللَّهَ في النصف الباقي

বান্দা যখন বিয়ে করে, তখন তার অর্ধেক দ্বীন (ঈমান) পূর্ণ করে হয়ে যায়। অতএব বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে চলে।[১]
তিনজন সাহাবি একবার আম্মাজানদের কাছে এসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৈনন্দিন আমল সম্পর্কে জানতে চান। জানার পর তারা নবিজির আমলকে কম মনে করলেন, তিনি তো নবি, তার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট, কিন্তু আমাদের বাঁচতে হলে ওটুকুতে চলবে?

একজন শপথ করে ফেললেন, আমি লাগাতার সিয়াম রাখব, কখনো সিয়াম ভাঙব না। আরেকজন বললেন, আমি রোজ সারারাত ইবাদত করব, একদম ঘুমাব না। আরেক জন প্রতিজ্ঞা করলেন, আমি কোনোদিন নারীর কাছে যাব না, কোনোদিন বিয়ে করব না।

ঘটনাচক্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে কথাগুলো পৌঁছে গেল। তিনি তাদেরকে ডাকালেন।
- তোমরা কি এমন এমন বলেছ?
- জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ।
- তাহলে শুনে রাখো। তোমাদের মধ্যে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি। সেই আমি (কিছুদিন) সিয়াম রাখি, আবার (কিছুদিন) রাখিও না। রাতের কিছু অংশে (নফল ও তাহাজ্জুদ) সালাত আদায় করি, আবার কিছু অংশে ঘুমাই। নারীদেরকে আমি বিয়েশাদিও করি। কান খুলে শোনো, এগুলো আমার সুন্নাহ। যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমাদের কেউ না।
অর্থাৎ আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি। সেই আমিই শরীরের চাহিদাকে অস্বীকার করি না। ইবাদতও করি, আবার শরীরকেও কষ্ট দিই না।

'প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত, প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা আর প্রত্যেক পথভ্রষ্টতাই (মানুষকে) জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। [১] নিজ থেকে নতুন কোনো পদ্ধতি তৈরি করে তাতে নাজাত তালাশ করা যাবে না। অতিরিক্ত কিছু করে আল্লাহকে পাওয়া যাবে না। নিজেকে অহেতুক কষ্ট দিয়ে, শরীরকে অহেতুক বঞ্চিত করে নাজাত তো মিলবেই না, উলটো জাহান্নাম মিলবে।

ইসলামে প্রতিটি পার্থিব কাজই আধ্যাত্মিকতার সোপান। প্রতিটি দুনিয়াবি কাজও ধর্মীয় কাজ, আখিরাতের কাজ। খ্রিষ্টবাদের মতো 'ধর্মীয় কাজ আর পার্থিব কাজের মধ্যে পার্থক্য' ইসলাম স্বীকার করে না। একান্ত ব্যক্তিগত অভ্যাস, টয়লেট সারা, স্ত্রীসংসর্গ থেকে নিয়ে চুল কাটা, পোশাক-পরিচ্ছদ, সন্তান-লালন, ব্যবসা, আইন-বিচার, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সরকার-গঠন, যুদ্ধ-প্রতিটি কাজ, যা একজন মানুষকে করতে হয়, সবই ধর্মীয় কাজ, দ্বীনের কাজ। এসব কাজ যদি কেউ আল্লাহ ও রাসুলের দেখানো নীতিমালা মেনে করে, আল্লাহকে খুশি করার জন্য করে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণে করে, তাহলে খাওয়াটাও ইবাদত হয়ে যায়, পোশাকটাও হয়ে যায় ইবাদত। এসবের জন্যও সাওয়াব হতে থাকে, আল্লাহর নৈকট্য পেতে থাকে এবং মৃত্যুর পর এগুলোর বিনিময়ে মহাপুরস্কারের আশা করতে পারে।

টিকাঃ
[২] সুনানু নাসায়ি: ৩১০৪; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৭৮১; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৫০২, ৭২৪৮; মুসনাদু আহমাদ: ১৫৫৩৮; শুআবুল ঈমান: ৭৪৪৮, ৭৪৪৯। হাদিসটির সনদ হাসান।
[৩] জামি তিরমিযি: ১৯০০; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২০৮৯, ৩৬৬৩; মুসতাদরাকুল হাকিম: ২৭৯৯, ৭২৫১, ৭২৫২; সহিহ ইবনি হিব্বان: ৪২৫; মুসনাদু আহমাদ: ২১৭১৭, ২১৭২৬, ২৭৫১১, ২৭৫২৮, ২৭৫৫২; মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা: ২৫৪০০। হাদিসটি সহিহ।
[১] সর্বাধিক পরিপূর্ণ মুমিন সে, যার ব্যবহার-চরিত্র ভালো, আর (ব্যবহার-চরিত্রে) যে নিজের স্ত্রীর কাছে উত্তম সেই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। জামি তিরমিযি: ১১৬২ ও ৩৮৯৫; সহিহু ইবনি হিব্বান: ৪১৭৬; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৪৪২০; শুআবুল ঈমান: ২৭, ৭৬১২। হাদিসটির সনদ হাসান।
[২] 'সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যা-ই ব্যয় করো না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে; এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।' (সহিহ বুখারি: ৫৬) 'আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি একটি দিনার আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দিনার দাসমুক্তির জন্য ব্যয় করলে, একটি দিনার মিসকিনদের দান করলে এবং একটি দিনার তোমার স্ত্রী-পরিবারের জন্য ব্যয় করলে। এগুলোর মধ্যে সাওয়াবের দিক থেকে ওই দিনারটিই সর্বোত্তম, যা তুমি তোমার স্ত্রী-পরিবারের জন্য ব্যয় করেছ।' (সহিহ মুসলিম: ৯৯৫)
[৩] সহিহ মুসলিম: ১৬৩১; সুনানু আবি দাউদ: ২৮৮০; জামি তিরমিযি: ১৩৭৬; সুনানু নাসায়ি: ৩৬৫১; সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৪১, ২৪১; মুসনাদু আহমাদ: ৮৮৪৪
[৪] মুসতাদরাকুল হাকিম: ৭৩৪৬; মুসনাদু আহমাদ: ১৪২৪, ১৪২৪৭; মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২৫৪৪০; শুআবুল ঈমান: ৮০১১; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৬১৯৯। হাদিসটি হাসান
[৫] সহিহ বুখারি: ৬০১৪, ৬০১৫; সহিহ মুসলিম: ২৬২৫; সুনানু আবি দাউদ: ৫১৫২; জামি তিরমিযি : ১৯৪২, ১৯৪৩; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৭৩, ৩৬৭৪
[৬] সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম: ২৬৫৬; সুনানু আবি দাউদ: ১৬৯৬; জামি তিরমিযি : ১৯০৯; মুসনাদু আহমাদ: ১৬৭৩২, ১৬৭৩৩, ১৬৭৬৩, ১৬৭৭২
[১] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫
[২] সহিহ বুখারি : ৬৭১, ৬৭২, ৬৭৩, ৫৪৬৩, ৫৪৬৫; সহিহ মুসলিম: ৫৫৭, ৫৫৯, ৫৬০; সুনানু আবি দাউদ : ৮৯; জামি তিরমিযি : ৩৫৩; সুনানু নাসায়ি : ৮৫৩; সুনানু ইবনি মাজাহ : ৯৩৩
[৩] সহিহ বুখারি: ১৯২৩; সহিহ মুসলিম: ১০৯৫; সুনানু আবি দাউদ: ২৩৪৪, ২৩৪৫; জামি তিরমিযি: ৭০৮; সুনানু নাসায়ি: ২১৪৪, ২১৪৬, ২১৪৭, ২১৪৮, ২১৪৯, ২১৫০, ২১৫১; সুনান ইবনি মাজাহ: ১৬৯২; মুসনাদু আহমাদ: ৮৮৯৮, ১০১৮৫, ১১২৮১, ১১৯৫০, ১৩২৪৫, ১৩৩৯০, ১৩৫৫১, ১৩৭০৪, ১৩৯৯৩
[৪] সহিহ বুখারি: ১৯২১; সহিহ মুসলিম: ১০৯৭; জামি তিরমিযি ৭০৩; সুনানু নাসায়ি: ২১৫৫, ২১৫৬; সুনানু ইবনি মাজাহ ১৬৯৪; সহিহ ইবনি খুজাইমা ১৯৪১; সুনানুদ দারিমি: ১৭৩৭
[৫] সহিহ বুখারি: ১৯৫৭; সহিহ মুসলিম: ১০৯৮; জামি তিরমিযি ৬৯৯; সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৬৯৮; মুসনাদু আহমাদ: ২২৮০৪, ২২৮২৮, ২২৮৪৬, ২২৮৫৯, ২২৮৭০
[৬] সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭
[১] শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৫১০০, আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি: ৭৬৪৭, ৮৭৯৪; মুজামুশ শুয়ুখ, ইবনু জুমা'ই আস-সাইদাবি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২২; আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৯
[২] সহিহ বুখারি: ৫০৬৩; সহিহ মুসলিম: ১৪০১; সুনানু নাসায়ি: ৩২১৭; মুসনাদু আহমাদ : ১৩৫৩৪, ১৪০৪৫; সহিহু ইবনি হিব্বান: ৩১৭
[১] সহিহ মুসলিম: ৮৬৭; সুনানু নাসায়ি ১৫৭৮; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪৫; মুসনাদু আহমাদ: ১৪৩৩৪; ১৪৯৮৪; সহিহু ইবনি খুযাইমা: ১৭৮৫

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র vs ইসলামি খিলাফত

📄 খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র vs ইসলামি খিলাফত


অনেকে খ্রিষ্টীয় পোপতন্ত্র ও ইসলামি শাসনকে Theocracy শিরোনামের অধীনে একই রকম মনে করেন। এই মৌলিক পার্থক্যগুলো না বুঝলে ইতিহাস পড়ার কোনো মানে নেই।

দুনিয়া-রাজ্য ও ধর্মরাজ্য পৃথক জিনিস। একসাথে মেলানো যাবে না—যীশুর ভাষায়: 'Render unto GOD that is GOD's. And render unto Caeser that is Caeser's [২] পরবর্তী সময়ে স্কলাস্টিক খ্রিষ্টবাদীদের মতেও City of God আর City of Man আলাদা। ধর্মরাজ্য শাসনের জন্য পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের মতো প্যারালাল আরেকটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা এই চার্চ বা যাজকতন্ত্র। পোপ এখানে ঈশ্বরের প্রতিনিধি, তিনি দেশে দেশে নিয়োগ দেন আর্চবিশপ। আর্চবিশপেরা নিয়োগ দেন স্থানীয় গির্জাপ্রধান ও মঠাধ্যক্ষদের। এরা ধর্মভীরু সাধারণ মানুষের ওপর সীমাহীন প্রভাব রাখত। সমান্তরাল ব্যবস্থার দরুন এদেরকে সন্তুষ্ট রাখা জরুরি ছিল রাজা-জমিদারদের জন্য। বিপরীতে এরাও রাজাকে ‘ঐশ্বরিক প্রতিনিধি’ হিসেবে মেনে নিতে জনগণকে উৎসাহিত করত। এভাবে এক মিথোজীবী প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করেছিল পোপতন্ত্র।

বিপরীতে ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা কোনো প্যারালাল ব্যবস্থা নয়। ইসলামে দুনিয়ারাজ্য ও ধর্মরাজ্য একই জিনিস। দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র বা পরীক্ষাগার। পার্থিব প্রতিটি বিষয়ই ধর্মের আলোচ্য বিষয়। কেবল বিশ্বাস ও প্রথা-অনুষ্ঠান নয়, পরিবার-রাষ্ট্র-সমাজ-বাজার-যুদ্ধ-বিচার সবকিছুই ধর্ম। সুতরাং, এখানে খলিফা একইসাথে ধর্মীয় প্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধান। খলিফার বৈধ সিদ্ধান্ত অনুসরণ জনগণের ধর্মীয় দায়িত্ব। তবে খলিফার এই সিদ্ধান্ত একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাচারী নয়। খলিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়-
১. কুরআন-সুন্নাহ তথা শারিয়া দ্বারা (শারিয়াবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত মানতে জনগণ বাধ্য নয়)
২. পরামর্শ পরিষদ দ্বারা (আহলে শুরা)
৩. আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ দ্বারা (খলিফা নির্বাচক যারা)
৪. খলিফার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ ও হিসেব চাওয়ার অধিকার প্রতিটি মুসলিমের
উদাহরণ-
» খলিফা উমারকে গণজমায়েতের মধ্যে দলিল দিয়ে চ্যালেঞ্জ করে মত পরিবর্তনে বাধ্য করলেন খাওলা বিনতু সালাবা রাযিয়াল্লাহু আনহা। [১]
» উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুর নতুন পোশাক নিয়ে হিসাব চাইলেন এক বেদুইন।

উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'যদি আমি কুরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিই, তোমরা কী করবে?' একজন জবাব দিলেন, 'বাঁকা তির যেভাবে সোজা করে, সেভাবে আপনাকে সোজা করে দেবো।'

পরে খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্রের উদ্ভব হলো, তখনো 'শাইখুল ইসলাম'-এর মতামত ও অনুমোদনকে খলিফাগণ জরুরি মনে করতেন। আর বিচারিক কার্যাবলী পুরোটাই দেখভাল করতেন প্রধান কাজি, যিনি হতেন সামসময়িক শ্রেষ্ঠ ফকিহদের একজন, যে বিচারের আওতার বাইরে স্বয়ং খলিফাও ছিলেন না।
মিথোজীবিতা যে একদমই ছিল না, তা বলা সমীচীন নয়; তবে এমন প্রাতিষ্ঠানিক মিথোজীবিতা (চার্চ-রাষ্ট্র) ছিল না, যেহেতু চার্চের মতো পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠানই ছিল না। আলিম-সমাজ কোনো প্যারালাল ব্যবস্থা ছিল না। সুলতানদের শারিয়া-বিরোধী কার্যক্রমের প্রতিবাদ করাকে আলিমগণ ঈমানি দায়িত্ব মনে করতেন ও সুস্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ করতেন। এর প্রমাণ হলো: ইসলামি সভ্যতায় আলিমদের ব্যাপক কারাবরণ। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইমাম ইবনু তাইমিয়া, ইমাম মালিক, ইবনুল কাইয়িম, ইবনু কাসির, ইবনু হাজার আসকালানি, ইবনু হাযম, ইবনুল আসির-সহ অধিকাংশ বড় বড় আলিমকে শাসকের শারিয়াহ-বিরোধী কাজের বিরোধিতা করার জন্য কারাবরণ করতে হয়েছে। এছাড়া নিহত ও দেশান্তরিত আলিমদের সংখ্যাও প্রচুর।
সুতরাং, পোপতন্ত্র ও ইসলামি শাসনকে এক করে ফেলা নিতান্তই শিশুসুলভ ইতিহাস পাঠ। পোপতন্ত্রের স্বতন্ত্র আরো দুটি দিক হলো : বাইবেল থেকে সাধারণকে দূরে রাখা। মার্টিন লুথার জার্মানে অনুবাদ করার আগে শুধু ল্যাটিনেই বাইবেল পাঠ করা হতো, যাতে আম-পাবলিকের প্রবেশাধিকার ছিল না। আর দ্বিতীয়ত, নিজস্ব কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হাসিলের অনুকূল ব্যাখ্যা দেওয়া, ধর্মের নামে। পোপতন্ত্র ও আলিম-সমাজ, দুটো যে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, তার প্রমাণ হলো ইসলামি শাসনের অধীনে ইসলামি সভ্যতার অবস্থা পোপতন্ত্রের অধীনে ইউরোপের অবস্থার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত।
ইউরোপ এনলাইটেনমেন্টে এসে যে লাগামছাড়া উন্নত আইডিয়াগুলোর কথা বলছে; ইসলাম সেই ৭ম শতকে বসে তার চেয়ে বহুগুণে উন্নত আইডিয়ার কথা বলছে।
এনলাইটেনমেন্ট সমতা ব্যক্তিস্বাধীনতা যুক্তির প্রভুত্ব মানবজ্ঞানভিত্তিক লাগামহীন প্রগতি সাংবিধানিক অধিকাংশের সরকার সমতাভিত্তিক সমাজ সংশয় থেকে শুরু সর্বোচ্চ ও সর্বাধিকের উপভোগ ব্যবসার বিধিনিষেধ বিলোপ
সুষমতা ইসলাম
সামষ্টিক স্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যালেন্স মানবযুক্তির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে যুক্তিপ্রয়োগ নৈতিকতা-নিয়ন্ত্রিত প্রগতি আইনের অধীনস্থ যোগ্যতাভিত্তিক সরকার ইনসাফভিত্তিক সমাজ যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্বাস থেকে শুরু সংযমী ভোগ ব্যবসার অনুমোদন ও ধরন নিয়ন্ত্রণ

এনলাইটেনমেন্টের চিন্তাধারার মূল সমস্যাগুলোর সমাধান ইসলামে রয়েছে, যা নিছক তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য। কারণ ইসলাম স্রেফ কিছু দার্শনিকের চিন্তার সমষ্টি নয়, ইসলাম সুশৃঙ্খল এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার পাঠানো সুশৃঙ্খল জীবন-ব্যবস্থাপনার প্রেসক্রিপশন। ওষুধ খেলে সুস্থ থাকবে মানবজাতি, ওষুধ না খেলে রোগ বাড়বে।
ইউরোপের সাথে মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতার এই পার্থক্যটা মুসলিমদের বুঝতে হবে। ইউরোপ শিকল খুলে ফেলেছে আর আমরা খুলে ফেলেছি সোনার হার। রাষ্ট্র থেকে চার্চকে সরিয়ে ইউরোপ মাথা থেকে বোঝা নামিয়েছে আর সেই অনুকরণ করে আমরা মাথা থেকে নামিয়েছি মুকুট। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট ইউরোপের নিজস্ব অভিজ্ঞতার ফল, আমাদের অভিজ্ঞতা এমন নয়। তাহলে কেন ইউরোপের ফর্মুলা, তাদের লাগামছাড়া ‘উন্নত’ মূল্যবোধ, লাগামছাড়া প্রগতির সংজ্ঞা, ভালোমন্দের মাপকাঠি আমাকে মেনে নিতে হবে? কোন যুক্তিতে ইউরোপ তার একান্ত নিজস্ব অভিজ্ঞতা মেনে নিতে আমাদেরকে বাধ্য করছে? কেন ইউরোপীয় ধাঁচের রাষ্ট্রই আমাদের হতে হবে, কেন ইউরোপীয় ধাঁচের গণতন্ত্রই আমাদের লাগবে, কেন ইউরোপীয় বিজ্ঞান-দর্শন মেনে নিয়ে আমাকে বিজ্ঞান করতে হবে, কেন ইউরোপীয় স্কেলেই আমার উন্নতি মাপতে হবে, কেন ইউরোপের নারীদের মতোই স্বাধীন হতে হবে আমাদের নারীদের? কেন ইউরোপীয় স্টাইলের সমাজ-পরিবার-ব্যক্তিই হতে হবে আমাদের? কেন আমরা আমাদের মতো হতে পারব না?
দেখো না ইউরোপ কত উন্নত! ওদের মতন উন্নত-সভ্য হতে হলে আমাদেরকেও ওদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। তাই নাকি? ওরা কি এসব সমতা-স্বাধীনতা-ভ্রাতৃত্ব করেই উন্নত হয়েছে? আসলেই?

টিকাঃ
[২] Mark 12:17
[১] আল-ইস্তিয়াব, ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ সূত্রে প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৮৯; সাখিরাতুল উকবা শারহু সুনানিন নাসায়ি, খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৬৭-৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00