📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 রিফর্মেশন

📄 রিফর্মেশন


১৫১৭ সালে জার্মান যাজক ও অধ্যাপক মার্টিন লুথার ক্যাথলিক চার্চের এইসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখেন ৯৫ দফা (Ninety five Theses)। লিখে টাঙিয়ে দেন উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে। পোপ থেকে নিয়ে সকল পাদরিকে আহ্বান জানান এই অভিযোগগুলো খণ্ডন করতে। জন্ম নিল 'রিফর্মেশন' আন্দোলন। মার্টিন লুথারকে বলা হয় প্রোটেস্ট্যান্ট-বাদের প্রবক্তা, [১] যার মূল থিম ছিল-
১. পোপের প্রাধান্য অস্বীকার
২. যাজকেরা ঈশ্বরের নিযুক্ত, এটা অস্বীকার
৩. রুটি ও মদ যীশুর মাংস-রক্ত হয়ে যাওয়ার আকিদা (trans-substantiation) অস্বীকার ইত্যাদি
মাত্র ২০ বছরে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে যায়। জার্মানির কিছু কিছু রাজ্যও লুথারিয়ান হয়ে যায়। সুইজারল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট-বাদের আরেক ভার্সন জুইংলির ধর্মমত জনপ্রিয় হয়। ফ্রান্স-স্কটল্যান্ড-জেনেভা-হল্যান্ডে জন ক্যালভিন প্রচারিত প্রেসবাইটারিয়ান ধর্মমত প্রতিষ্ঠা পায়। ইংল্যান্ড ১৫৩৪ সালে প্রতিষ্ঠা করে কিছুটা মধ্যপন্থি অ্যাংলিকান চার্চ। ৮ম হেনরি চাচ্ছিলেন পোপের প্রভাবমুক্ত ক্যাথলিক ধর্ম। পরের ধাপে তার ছেলে ৬ষ্ঠ এডওয়ার্ড ইংল্যান্ডকে পুরোদস্তুর প্রোটেস্ট্যান্টে রূপান্তর করে।
১. ইংরেজদের জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থনাপুস্তক
২. ৪২টি ধর্মনীতি সংবলিত আইন
৩. ম্যাস (mass) নামক ক্যাথলিক প্রার্থনা নিষিদ্ধ
৪. যাজকের বিয়ের অনুমতি
৫. গির্জা থেকে ছবি-মূর্তি অপসারণ
এডওয়ার্ডের পর কুইন মেরি আবার ক্যাথলিক ধর্ম পুনঃপ্রবর্তন করেন। গ্যাঞ্জামটা দেখেন। এরপর রানি ১ম এলিজাবেথ এসে একটা মীমাংসা করলেন। ৪২ নীতি থেকে ক্যাথলিক-বিরোধী নীতিগুলো বাদ দিয়ে ৩৯ দফা আইন বানিয়ে একটা সুরাহা হলো।

১৬১৮-১৬৪৮ এই ৩০ বছরব্যাপী যুদ্ধ চলে মূলত ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্টদের মাঝে। রোমান সাম্রাজ্যের পক্ষে ক্যাথলিক লিগ, আর ওদিকে প্রোটেস্ট্যান্ট ইউনিয়ন। যদিও শেষের দিকে ব্যাপারটা গিয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক (ফ্রান্স ও হ্যাবসবার্গ রাজবংশের দ্বন্দ্ব) মারা যায় ৮০ লাখ মানুষ। ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী, অর্থনীতি-জনজীবন বিধ্বংসী যুদ্ধের সমাপ্তি হয়। আজকের আমরা যে ফরমেটের রাষ্ট্র দেখি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেখি, তার শেকড় এই ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিতে। যত ধরনের রাষ্ট্রচিন্তা জন্ম নিয়েছে, ওয়েস্টফেলিয়া মাপকাঠিতে না মিললে তাকে failed, collapsed, fragile and weak state বলে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, বিশেষত নন-ওয়েস্টার্ন রাষ্ট্রকাঠামোগুলোকে (যেমন ইসলামি খিলাফত, ইমারত)। সামনে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ।

টিকাঃ
[১] Bandler, Gerhard. "Martin Luther : Theology and Revolution." Trans., Foster Jr., Claude R. New York : Oxford University Press, 1991.

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 এনলাইটেনমেন্ট

📄 এনলাইটেনমেন্ট


তো এতকাল চার্চের এইসব খবরদারি আর আবদার মানুষ মিটিয়েছে পরলোকের সাফল্যের জন্য। লেপ্টে থাকা আদিপাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য মানবজনমকে ঘৃণা করে, অবদমন করে মুক্তি তালাশ করেছে। এখন রেনেসাঁ থেকে তারা জেনেছে 'সবার ওপরে মানুষ সত্য', সাফল্য মানে ইহকালের সাফল্য। চেপে বসা বিদেশি মতাদর্শের (খ্রিষ্টবাদ) এইসব আদিপাপ-স্রষ্টা-নাজাত, এগুলোকে প্রশ্ন ও সমালোচনা করার স্বদেশি গ্রিক-রোমান তরিকা তারা শিখে গেছে। এখন ধর্মের এইসব উৎপাত আর সহ্য করা যায় না। ধর্মের কারণে ক্রুসেডে ইউরোপ বিপর্যস্ত, ৩০ বছর যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপ শেষ, কৃষকদের ধরে ধরে জমিদারেরা বাহিনী বানিয়ে নিয়ে রাজার রাজ্যজয়ের খায়েশ মিটিয়েছে। মানুষ শান্তি চায়, ইউরোপ শান্তি চায়। সমাধান কী?

সমাধান হলো ধর্মকে রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি থেকে তাড়িয়ে এক্কেবারে ব্যক্তিগত জীবনে আটকে দেওয়া। একমাত্র এভাবেই মুক্তি পাওয়া যেতে পারে ধর্মের জ্বালাতন থেকে। ১৭শ শতক থেকে ইউরোপে শুরু হলো সেই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন- এনলাইটেনমেন্ট। যার শেকড় সেই রেনেসাঁ আর সামনে মডার্নিটির ফল ধরবে। এনলাইটেনমেন্ট (আলোকায়ন) রেনেসাঁ হিউম্যানিজম বা মানবকেন্দ্রিকতারই পরিণত রূপ। এর মূল বৈশিষ্ট্য ৩টি-
১. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য (individualism) : আগের সমাজ কাঠামোয় এক স্তর আরেক স্তরকে নিয়ন্ত্রণ করত (social hierarchy)। যেমন রাজা জমিদারদেরকে, আর জমিদারেরা কৃষক-ব্যবসায়ীদেরকে, মালিকেরা দাসদেরকে, স্বামীরা স্ত্রীদেরকে। এখন বলা হচ্ছে : না, সবাই সমান, কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। স্বাধীনতা ও সমতা জন্মগত অধিকার।
২. সংশয়বাদ (skepticism) : বিনা প্রশ্নে কিছু মেনে নেওয়া হবে না। খ্রিষ্টবাদকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়ে চার্চের হাতে ইউরোপ অনেক ভুগেছে। আর নয়, পুরোনো সকল ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করা হবে, সন্দেহ করা হবে। আগে ভুল ধরে নিয়ে যুক্তিতর্ক শুরু করা হবে।
৩. যুক্তি (reason) : যুক্তিতে না ধরলে তা মেনে নেওয়া হবে না। যুক্তিসংগত হতে হবে। যুক্তিগ্রাহ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য না হলে হাওয়ার ওপর কারো দাবি, কোনো অলৌকিকতা মেনে নেওয়া হবে না।

এই তিন খুঁটিকে সামনে নিয়ে পেছনের অভিজ্ঞতা থেকে এসময়ের দার্শনিকগণ যেসব আইডিয়া তৈরি করলেন, মোটাদাগে সেগুলো এমন—
■ স্বর্গীয় জ্ঞানের ওপর মানবজ্ঞান-যুক্তির সার্বভৌমত্ব
∎ কর্তৃপক্ষ ও ক্ষমতার বৈধতার উৎস কী বা কে? (ঈশ্বর যাকে মনোনীত করেছে সে? যেমন রাজা বা পোপ? নাকি মানুষ যাকে মনোনীত করবে সে? অর্থাৎ গণতন্ত্র)
■ জ্ঞানের প্রধান উৎস ওহি নয়, বরং ইন্দ্রিয়। [বিজ্ঞান]
■ পার্থিব কল্যাণ বা সুখই আরাধ্য, কোনো নাজাত মানবজীবনের সার্থকতা নয়।
■ রাষ্ট্র ও চার্চকে আলাদা রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয়-অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে চার্চ হস্তক্ষেপ করবে না। [সব জায়গায় ধর্ম টেনে আনবেন না]
■ উন্নত নৈতিকতা যেমন : সামাজিক নিয়ন্ত্রণের (hierarchy) বদলে ব্যক্তিসাধীনতা, যুদ্ধের বদলে ভ্রাতৃত্ব-সহিষ্ণুতা, মানবকেন্দ্রিক মানবজ্ঞানভিত্তিক প্রগতি, বংশীয় সাম্রাজ্যের বদলে সাংবিধানিক সরকার, সামাজিক পদক্রমের বদলে সমতাভিত্তিক সমাজ ইত্যাদি।
■ প্রকৃতিকে আর ভয় নয়। প্রকৃতির কিছু নিয়ম রয়েছে, সেগুলো জানা যাচ্ছে (নিউটনের কাজ থেকে এই ধারণা জন্মালো)। প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর বস্তুগত কারণ খুঁজে বের করে আমরা কমন প্যাটার্ন বের করব। সেই মূলসূত্রগুলো ব্যবহার করে আমরাই প্রকৃতিকে ব্যবহার করব। মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণে ব্যবহৃত হবে প্রাকৃতিক শক্তি।

আলোকায়নের ঠিক আগের জনকদের মাঝে আছেন ফ্রান্সিস বেকন, থমাস হবস এবং রেনে দেকার্ত। আর বিজ্ঞানী-দার্শনিকদের মাঝে আছেন গ্যালিলিও, কেপলার, লিবনিজ প্রমুখ। রেনেসাঁর শুরুটা ইতালিতে হলেও এনলাইটেনমেন্টের শুরু কিন্তু ইংল্যান্ডে। ৩ ভাগে ভাগ করা হয় এই যুগকে—
» Early Enlightenment (1685-1730)
» High Enlightenment (1730-1780)
» Late Enlightenment (1790-1815)

নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (১৬৮৬) প্রকাশ এবং জন লকের মানব বোধ সংক্রান্ত রচনাবলি (১৬৮৯) থেকে আলোকায়নের শুরু ধরা হয়। বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তায় এই দুটো কাজ মূল হাতিয়ার হিসেবে ছিল।

ফরাসি দার্শনিকদের হাত ধরে এলো পরের ধাপ। ভলতেয়ার, রুশো, মন্তেকু, বুফন, দিদেরো-দের লেখাজোখায়...। কফিহাউজ, পাঠচক্র, একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রপত্রিকা, বই, লিফলেট দিয়ে এইসব নতুন আইডিয়া ছড়িয়ে পড়ল।

এ পর্যায়ে এনলাইটেনমেন্টের আইডিয়াগুলো আমরা ব্যাবহারিক প্রয়োগ হতে দেখব। * প্রুশিয়ার রাজা মহান ফেডেরিক এই নতুন ধ্যানধারণা ব্যবহার করে প্রুশিয়াকে আধুনিকায়ন করেন। * রাশিয়ার ২য় ক্যাথরিন, অস্ট্রিয়ার ২য় জোসেফও একই কাজ করেন। * জন লকের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হলো আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। যার ওপর ভিত্তি করে হলো আমেরিকা বিপ্লব (১৭৭৬)। মন্তেকুর সরকারে ক্ষমতা বণ্টন ধারণা (আইন-বিচার-নির্বাহী বিভাগ) গৃহীত হয় আমেরিকার সংবিধানে। হিউমের দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট জেমস ম্যাডিসন, তাই আমেরিকার সংবিধানও এনলাইটেনমেন্টের বাস্তবায়ন। * ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে ২য় ধাপের সমাপ্তি হলো। মোটকথা সর্বক্ষেত্র থেকে চার্চকে ও খ্রিষ্টবাদকে হটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সমাজ তৈরি হলো, আলোকায়নের নব্য চিন্তাধারা প্রয়োগ হলো বাস্তবে। পুরোনো অর্থব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ-কর্তৃত্ব ঝেড়ে ফেলে আমরা পেলাম আলোকিত ইউরোপ-আমেরিকা।

কিছুটা 'নাস্তিক-নাস্তিক' শোনালেও এনলাইটেনমেন্ট দার্শনিকদের মাঝে সবাই নাস্তিক ছিল না; বরং অধিকাংশ ছিল আস্তিকই, কিন্তু ক্যাথলিক চার্চের বেঁধে দেওয়া 'ঈশ্বর'-এ বিশ্বাসী ছিল না। তারা বিশ্বাস করতেন, ওহি (বাইবেল) বা যাজকতন্ত্রের প্রয়োজন নেই, যুক্তি এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের দ্বারাই স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণিত (natural theology)। যুক্তিই ঐশী জ্ঞানের একচ্ছত্র উৎস। তারা প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলোর ধর্মীয় কিতাবপত্র (পড়ুন বাইবেল) যুক্তিতর্কের দ্বারা বাতিল করেন। দার্শনিকরা মোটাদাগে ২ ধরনের ছিলেন—

র‍্যাডিকাল : ধর্মসমাজ থেকে বহিষ্কৃত ইহুদি দার্শনিক স্পিনোজার দর্শন থেকে এর উৎপত্তি। এরা বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় কর্তৃত্বপনার পূর্ণ বিলোপের পক্ষে। এমনকি নৈতিকতার থেকেও ধর্মকে পৃথক রাখার পক্ষে এই দল।

মডারেট : যারা তৎকালীন ক্ষমতা-ধর্মের কাঠামোর সংস্কার চেয়েছিলেন, উৎখাত না। যেমন : দেকার্ত, জন লক, ক্রিশ্চিয়ান উলফ। তুলনামূলক মডারেট বলে পরিচিত ইমানুয়েল কান্টের আহ্বান : 'Dare to know! Have courage to use your own reason!' (সাহস করে জানো! নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের সাহস আনো)। মানে বাইবেল ও পাদরিদের অন্ধভাবে না মেনে নিজের বিবেক প্রয়োগ করো। এই সক্ষমতাই ‘এনলাইটেনমেন্ট’। এই ক্ষমতা যার আছে, সে-ই আলোকিত মানুষ।

হিউম্যানিজম ধর্ম, বস্তুবাদী দর্শন, পুঁজিবাদী অর্থনীতি, ভোগবাদী জীবনধারা, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ-রাষ্ট্রের সমন্বয়ে এলো নতুন সভ্যতা—পাশ্চাত্য সভ্যতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00