📄 অবশেষে জেগে ওঠা : রেনেসাঁ
ইউরোপের চিন্তার পরিবর্তনে মূল অবদান আরবদের।[১] প্যাগান গ্রিক দর্শনকে যাজকেরা প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু মুসলিমরা যখন সেই গ্রিক দর্শনকে একেশ্বরবাদের সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করলেন, সেটাই হয়ে উঠল ক্যাথেড্রাল স্কুলগুলোর পাঠ্য। ১৩২৫ সালের মাঝে University of Paris-এর কারিকুলামে আবার এরিস্টটল ফিরে আসে এই শর্তে যে, এরিস্টটলের যেটুকু ইবনু রুশদ গ্রহণ করেছেন, সেটুকুই পাঠ্য হবে।[২] যুক্তিপ্রিয় ও সুফিবাদী উভয় প্রকারের পাদরিদের জন্য দর্শনশাস্ত্র গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
রোমান ক্যাথলিকদের মাঝে সেসময় ছিল দুই ফিরকা : ডোমিনিকান আর ফ্রান্সিসকান। ডোমিনিকানদের কথা ছিল, যা-ই হোক আর তাই হোক, যুক্তি চলবে না। খ্রিষ্টবাদ হলো সর্বান্তকরণে বিশ্বাস। বার্সেলোনা শহরে তাদের ১২৯৯ সালের প্রোভিন্সিয়াল চ্যাপ্টারে (দাওয়াতি সম্মেলন) বিজ্ঞান পড়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি জারি করা হয়। বলা হয় -
বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের অবস্থান হলো, আমাদের ভ্রাতৃসংঘের কেউ মেডিসিন বা দুনিয়াবি যুক্তিবিদ্যা চর্চা করবে না। যা কিছু আমাদেরকে দুর্বল করে, বিতর্কিত করে এমন সবকিছু পরিহারে আমাদের দ্বিধা নেই। এইসব বিষয়ের বইপত্র ছাড়াই আমরা এগিয়ে যাব।[১]
আর প্রচলিত ধর্মতত্ত্বের বাইরে গিয়ে ফ্রান্সিসকানদের কথা ছিল, প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের দ্বারা স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করা। ক্যাথেড্রাল স্কুলের এই যাজক-পণ্ডিতদের হাতেই দর্শন ও প্রকৃতিবিজ্ঞান চর্চা আবার শুরু হয় ইউরোপে। ফ্রান্সিসকান পাদরিদের এই চেতনাকে বলা হচ্ছে ‘প্রোটো-রেনেসাঁ’ বা প্রাক-রেনেসাঁ। অক্সফোর্ড ছিল এই পাদরিদের চার্চস্কুল। ১২৩০ সালে বিশপ রবার্ট গ্রসটেস্ট প্রকৃতিদর্শনের ওপর ক্লাস শুরু করেন এখানে, যোগ দেন সিলসিলার সভ্য (ফ্রায়ার) রজার বেকন। তাহলে ১৩৫০-এর ঠিক আগে ইউরোপের হাতে রয়েছে-রোমান আইনের বিস্তৃত বইপুস্তক, আরবীয় মেডিসিন, এরিস্টটলীয় যুক্তি ও প্রকৃতিবিজ্ঞান (আরবি ব্যাখ্যা), গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা (আরবি-টু-ল্যাটিন অনুবাদ), লিখন-বর্ণমালা ও লেখ্যভাষা-অলংকার এবং ল্যাটিন কবিতার ভান্ডার।[২] এসব চর্চা করে রেনেসাঁর আগেই খ্রিষ্ট-ইউরোপে দাঁড়িয়ে গেছে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় -
* ইতালি তে সালের্নো মেডিকেল স্কুল (১০৭৭), বোলোগনা (১০৮৮), পদুয়া (১২২২), রোম বিশ্ববিদ্যালয় (১৩০৩), ফ্লোরেন্স (১৩২১)
* ইংল্যান্ডে অক্সফোর্ড (১১৬৭), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় (১২০৯)
* ফ্রান্সে প্যারিস (১১৫০-১১৭০), মন্টপিলিয়ার (১২২০), তুলোঁ (১২২৯)
* স্পেনে স্যালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয় (১২১৮)
* মধ্য ইউরোপে প্রাগ (১৩৪৮) ও ভিয়েনা (১৩৬৫)
ইউরোপে রেনেসাঁ (১৩০০-১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) বা নবজাগরণের আঁতুড়ঘর তো এগুলোই। শুরুটা যাজকদের হাত ধরে হলেও এই ইউনিভার্সিটিগুলোতে তৈরি হয়েছে অযাজক পণ্ডিতরা। গ্রিক-মুসলিম জ্ঞান-দর্শনের প্রভাবে শিক্ষিত-চিন্তক অযাজক সম্প্রদায় গড়ে ওঠাই ইউরোপের রেনেসাঁর কারণ।
এই পণ্ডিতদের মাঝেই পাবেন ভবিষ্যৎ রেনেসাঁর জনক Petrarch [১] আর Giovanni Boccaccio [২] তাদের হাত ধরে ইতালিতে শুরু হলো এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন- 'হিউম্যানিজম', যাকে বলা যায় রেনেসাঁর প্রাণভোমরা। Gianozzo Manetti, Leonardo Bruni, Marsilio Ficino, Giovanni Pico della Mirandola, Lorenzo Valla এবং Coluccio Salutati-দের মাধ্যমে গ্রিক ও রোমান মূল্যবোধগুলো পুনর্পাঠ ও চর্চা চলতে থাকে। প্রধান চেতনাগুলো ছিল-
» এই বিশ্বের কেন্দ্রবস্তু মানুষ নিজে [সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই, আগে মানুষ হন]। মানুষের জ্ঞান, মানুষের অর্জন, মানুষের জীবনই সত্য। (কোনো স্রষ্টা-স্রষ্টাপুত্র-পরকাল নয়)
» মানবতার মর্যাদা : বিশ্বাসের অনুতাপে পুড়ে নাজাতের মাঝে মর্যাদা নেই (খ্রিষ্টবাদের চেতনা); বরং সংগ্রাম ও প্রকৃতিকে জয় করাতেই মানুষের মর্যাদা।
» মনের ওপর জেঁকে বসা বিদেশি মতবাদের (খ্রিষ্টবাদ ইউরোপে বিদেশিই) শেকল ভেঙে মুক্তচিন্তা ও সমালোচনা।
ইউরোপে চিন্তার এই নবজাগরণকেই বলা হয় রেনেসাঁ (নবজন্ম)। দীর্ঘ এক হাজার বছরের অবরুদ্ধ মনন খোলস ছেড়ে বেরিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখল। ঠিক কবে থেকে রেনেসাঁ শুরু হলো, তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলছেন ১৩০০-১৬০০ পর্যন্ত, কেউ বলেন ১৩৫৮-১৬৫৮ পর্যন্ত; আবার কেউ বলছেন ১৪৫৩-১৫২৭ সময়টুকুই আসলে মূল জাগরণ হয়েছে। মধ্যযুগের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে খ্রিষ্ট-ইউরোপ এখন প্রবেশ করছে আধুনিক যুগে। রেনেসাঁ শব্দের অর্থই 'নবজন্ম'। বিদেশি খ্রিষ্টবাদ পরিহার করে ইউরোপের নিজস্বতায় (ক্ল্যাসিকাল) ফিরে যাওয়াকে বলা হচ্ছে পুনর্জন্ম। ক্ল্যাসিকাল অর্থ গ্রেকো-রোমান সভ্যতা, যা ইউরোপের নিজস্বতা, খ্রিষ্টবাদ তো ইউরোপের বাইরের জিনিস।
সাহিত্য, কবিতা, চিত্রশিল্প, ভাস্কর্য ইত্যাদির মাধ্যমে এই চেতনাগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতে লাগল। অনেক ইতিহাসবিদ রেনেসাঁকে ir-religion বা un-christianizing বলেছেন। ধর্মের ব্যাপারে গ্রেকো-রোমান সর্বজনীন natural religion (এক জাতীয় সর্বেশ্বরবাদ) প্রোমোটকারী আলোচনাও নিজে থেকেই চলে আসে। ১৪৩৬ সালের দিকে গুটেনবার্গ আবিষ্কার করেন ছাপাখানা। যার ফলে রেনেসাঁর চেতনা ছড়িয়ে যায়। নাটক-সাহিত্য-কবিতা-চিত্রকর্মের মাধ্যমে ব্যাপকতা লাভ করে। বাইবেলও ব্যাপক মুদ্রণের ফলে হাতে হাতে পৌঁছে যায়। একসময় চার্চই বাইবেল ব্যাখ্যার অধিকার রাখত। ক্যাথলিকদের বহু ব্যাখ্যা প্রশ্নবিদ্ধ হতে লাগল শিক্ষিত মানুষের কাছে। যাকে পরবর্তী সময়ে আমরা প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন হিসেবে দেখব।
এভাবেই যাজকদের অনৈতিকতা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ডাইনি-নিধন, বুবোনিক প্লেগ, চার্চ-সমর্থিত সামন্ততন্ত্রের অত্যাচার, ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট যুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ ইউরোপ চিনেছে ধর্মকে শত্রু হিসেবে। বিকাশ, জ্ঞান, চিন্তা, মুক্তি, জীবনের বাধা হিসেবে। কীভাবে বাঁচবে ইউরোপ? কোন সে রাস্তা যা ইউরোপকে দুদণ্ড শান্তি দেবে? কোন সে আলো যা পথ দেখাবে আঁধারে বন্দি ইউরোপকে?
টিকাঃ
[১] বিস্তারিত জানতে লেখকের কাঠগড়া বইটি দেখতে পারেন
[২] Rashdall, Universities, i.368 সূত্রে The Legacy of Islam, Page. 276
[১] (Douais, “Acta Capitulorum Provincialium O. P.,” Toulouse, 1894, Page. 648, No. 14) সূত্রে John M. Lenhart (1924). Science In The Franciscan Order : A Historical Sketch. Franciscan Studies, (1), 5-44.
[২] Paul Oskar Kristeller, Renaissance Thought, 1961
[১] মৃত্যু: ১৩৭৪
[২] মৃত্যু:১৩৭৫