📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 শুরুর আগে

📄 শুরুর আগে


একদিন হঠাৎ ব্যাপারটা খুব ভাবাল আমায়। যেমন ধরেন, জ্ঞান হবার পর থেকে দেখে আসছি ৫ বছরের জন্য একজন দেশের 'রাজা' হয়, পরের ৫ বছরে আবার আরেকজন হয় ভোটে জিতে। ধরে নিয়েছিলাম, এটাই স্বাভাবিক ও শ্রেষ্ঠতম প্রক্রিয়া, যেন এটাই হবার, এটাই হয়, এটা ছাড়া আর কিছু হবার নেই। এমনি করে ঈদের দিন সেলামি পেতাম কচকচে নতুন নোট, তা দিয়ে আইসক্রিমট্রিম কেনা চলত। যেন এটাই অনাদি কাল থেকে চলে আসা সিস্টেম, অলঙ্ঘ্য, অপরিবর্তনীয়।
এই বিশেষ সুন্দর কাগজটা দিলেই দোকান থেকে অনেক কিছু পাওয়া যায়। শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে বিটিভিতে শুরু হতো পূর্ণদৈর্ঘ্য 'বাংলা ছায়াছবি'। অধিকাংশ সিনেমাতেই থাকত একটা আদালতের দৃশ্য। কাঠগড়া, কাঠের হাতুড়ি, অর্ডার অর্ডার... দুজন উকিল ঝগড়াঝাঁটি করে 'অবজেকশন মিলর্ড'। বিচার-সালিশের এই চিত্রটাই যেন চিরন্তন, এটা ছাড়া আর কিছু যেন হতেই পারে না।

এই যে আমাদের চারপাশে যে সিস্টেমটা আমরা দেখি, সবকিছুই একটা বিশেষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটা তো চিরটাকাল এমন ছিল না। কোত্থেকে এলো এই বিশেষ অলঙ্ঘ্য পদ্ধতিগুলো, যাদেরকে কোনো প্রশ্ন করা যায় না। যাদেরকে ছাড়া অন্যকিছু কল্পনা করা যায় না। আবার যেমন ধরেন, আমরা যে কাঠামোর ভেতরে চিন্তা করি, ঠিক-বেঠিক হিসেব করি, যা কিছুকে আমরা কাণ্ডজ্ঞান মনে করি; এগুলো এলো কোত্থেকে? যেমন: ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি— লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। বড় হতে হতে জানলাম, সবাই স্কুলে পড়ে না, অনেকে মাদরাসায় পড়ে, তারাও অনেক পড়াশোনা করে; কিন্তু তাদের নিজের গাড়িঘোড়া থাকে না। ভেবে দেখলাম, একটা ছেলে যা পারে, একটা মেয়ে তা পারে না। আবার মেয়েরা যা পারে, ছেলে হয়ে আমি তা পারি না; কিন্তু আমাকে কেউ জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইছে: একটা ছেলে যা যা পারে, মেয়েও তা পারে। মীনা কার্টুন ইত্যাদি দিয়ে এই কথাটাকে কেউ কাণ্ডজ্ঞান হিসেবে আমার ভেতর প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

কেজি ক্লাসে ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়লাম, সালাত পড়তে হয় দিনে ৫ বার। কিন্তু আশেপাশে বেশিরভাগ মানুষই পড়ছে না। আরো বড় হয়ে বুঝলাম 'সালাত না পড়লে কী হবে, আমার ঈমান কিন্তু ঠিকই আছে।' ২৬ বছর বয়সের আগে ধর্মকর্ম নিয়ে ভাবার ফুরসত মেলেনি। অনেকের তো শেষ বেলায়ও মেলে না, শোকর আলহামদুলিল্লাহ। কুরআনের অনুবাদ পড়তে গিয়ে দেখলাম, অনেক কিছুই আমার চেনা দুনিয়ার সাথে মিলছে না। দুনিয়ার যে সিস্টেমটার সাথে আমি বড় হয়েছি; যা যা ধ্রুবসত্য হিসেবে জেনে, আধুনিক-ভালো-শ্রেষ্ঠ জেনে, কাণ্ডজ্ঞান হিসেবে বিনা প্রশ্নে মেনে এসেছি, তার অনেক কিছুর সাথেই কুরআন মিলছে না। কুরআন যা বলছে, তা কেউ মানছে না। পাটিগণিতে সুদকষার অঙ্ক করানোর সময়ই বাবা বলে দিয়েছিলেন 'সুদ কী', 'সুদ ইসলামে হারাম' ইত্যাদি। তাহলে আমি করছি কেন এই অঙ্ক? তাহলে কেন তোমরা ব্যাংকে টাকা রাখছো সবাই? কোনো ক্লাসের বাংলা বইয়ে বেগম রোকেয়ার একটা প্রবন্ধ ছিল : 'পুরুষ যখন পৃথিবী-সূর্যের দূরত্ব মাপে, আমরা নারীরা তখন বালিশের ওয়ারের দৈর্ঘ্য মাপি। শকটের (গাড়ির) এক চাকা ছোট, আরেক চাকা বড় হলে সে শকট চলবে কী করে?'
» ঠিকই তো, অর্ধেক জনসংখ্যা ঘরে 'পড়ে থাকলে' জাতি কীভাবে উন্নত হবে?
» ঠিকই তো, ধর্মের ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয় না, বাংলাদেশের স্বাধীনতাই তার প্রমাণ।
» ঠিকই তো, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
» ঠিকই তো, মুদ্রা তো কাগজেরই হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেন তো ডলারেই হয়, ডলারেই হতে হয়।
» ঠিকই তো, কুরআনের যে আইন (হাত কাটা, পাথর ছুড়ে হত্যা, বেত্রাঘাত), এগুলো আজকের যুগে 'চলে না'। 'অচল, বর্বর, অমানবিক'।
» ঠিকই তো, জীবন তো একটাই। কাল হো না হো।

এরকম বহু 'ঠিকই তো'-রা এসে ভিড় করে কুরআন আর আপনার মাঝে, আল্লাহ আর আপনার মাঝে। কারা কীভাবে কখন এই 'ঠিকই তো'-গুলোকে সেট করে দিলো আমাদের মনে। ২০০১ সালেও সমকামিতাকে আমরা শতভাগ ছেলেই ঘৃণা করতাম আমাদের আবাসিক স্কুলটাতে, কেউ ধরা খেলে পুরো ব্যাচ মিলে ট্রায়ালে তোলা হতো তাকে। আজ ২০ বছরের মাথায় শুনছি অনেকেই একে স্বাভাবিক মনে করছে, পক্ষে ওকালতি করছে, বরং একে খারাপ ভাবাটাই নাকি মানসিক সমস্যা। তার মানে আমাদের 'ঠিকই তো'-র স্কেল বদলায়। গতকাল যা ঠিক, আজ তা ঠিক না। আবার গতকাল যা ঠিক ছিল না, আজ সেটাই ঠিক।

সুতরাং, মানুষের চিন্তার ইতিহাস আমাদের জানতে হবে। কীভাবে মানুষের চিন্তাগুলো বদলে গেল, এটা না জানলে 'আজকের আমাদেরকে' আমরা চিনতে পারব না। আজকে আমাদের চিন্তাগত যে অবস্থান, সেটা প্রাকৃতিক নাকি কৃত্রিম? আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত? নাকি অন্য কারো অভিজ্ঞতাকে আমি আমার জন্য ধ্রুব হিসেবে মেনে নিয়েছি, যদিও আমার অভিজ্ঞতাটা ছিল ভিন্ন? আমার চিন্তার ছকটা কি আমাদের বেছে নেওয়া, নাকি কারো চাপিয়ে দেওয়া?

সামনে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠক পেতে থাকবেন। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকবেন। আমি কে? আমি এমন কেন? আমি এমন করেই ভাবি কেন? কেন অন্যরকম করে ভাবি না? আমি কি স্বাধীনভাবে ভাবি, না কেউ আমার ভাবনার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে? ইউরোপ সেই ১৬শ শতক থেকে পুরো দুনিয়া শাসন করে আসছে, আজও করছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই নেটিভদের আইন-বিচার-অর্থনীতি-শিক্ষাকে তারা নিজেদের সুবিধার্থে সাজিয়ে নিয়েছে, যেকোনো শাসক তাই করবে। নিজস্ব একটা বিশেষ পরিস্থিতির অভিজ্ঞতায় ইউরোপ একটা বিশেষ চিন্তাধারা গ্রহণ করেছে, যাকে তারা নাম দিয়েছে 'সভ্যতা' বা 'আধুনিকতা'। এটাকে একটা সু-আরোপিত দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে যে, এই সভ্যতা তাকে পৌঁছে দিতে হবে সারা দুনিয়ায়—সভ্যতার দায় (White Man's Burden)। তাই ইউরোপের নিজস্ব অভিজ্ঞতাপ্রসূত আইডিয়াগুলো উপনিবেশ আমলে আমাদেরকে তারা মেনে নিতে পদ্ধতিগতভাবে বাধ্য করেছে, যদিও তাদের অভিজ্ঞতা আর আমাদের অভিজ্ঞতা এক নয়। সুতরাং,, আমরা চিন্তা-কাঠামোর ক্ষেত্রে ইউরোপের অনুসারী বা উত্তরাধিকারী। ইউরোপের মতো করেই আমরা চিন্তা করি, তাদের মতো করে চিন্তা করাকে আধুনিকতা বা প্রগতি মনে করি, তাদের সমস্যার সমাধানকে নিজের সমস্যারও সমাধান মনে করি। ইউরোপীয় স্কেলে সবকিছু মাপতে শিখেছি আমরা, আমাদের বাবারা, তাদের বাবারা, কিন্তু কুরআন-হাদিস-ফিকহের ঠিক-বেঠিক, নৈতিকতা, আইন, সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় স্কেলে ঠিক যায় না। তাইলে সমাধানটা আসলে কী?

কেউ ইসলামকে ত্যাগ করে (নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী)
কেউ ইউরোপীয় খাপে যেটুকু আঁটে সেটুকু রাখার পক্ষে, বাকিটুকু হেঁটে ফেলার পক্ষে (মডার্নিস্ট রিডাকশনিস্ট মুসলিম)
আবার কেউ ইউরোপের মনরক্ষা করে ইসলামকে পুনর্ব্যাখ্যা করার পক্ষে (মডারেট মুসলিম)

প্রথমটি তো ইসলাম থেকেই খারিজ, পরের দুটোও প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং ইসলামের অপভ্রংশ। বহু মুসলিম সন্তান ইসলামের চিরন্তন অবস্থান ত্যাগ করে, এই ৩টিতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। তিনটা অবস্থানেরই গোড়া এক জায়গায় : ইউরোপীয় মাপকাঠিকে ধ্রুব মেনে নেওয়া। এজন্য ইউরোপকে চিনলে নিজেকে চেনা যাবে। প্রতিটি মুসলিমের প্রয়োজন ইউরোপকে চেনা, ইউরোপের চিন্তার ইতিহাস জেনে নিজেকে প্রশ্ন করা। ইউরোপ, তুমি কার? আর আমি কার?

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 চাপিয়ে দেওয়া আলো

📄 চাপিয়ে দেওয়া আলো


আবিষ্কারের দুয়ার খুলে দেয় যুদ্ধ। উন্নত মারণাস্ত্র, উন্নত সুরক্ষা প্রকৌশল, দ্রুততম বাহন-কামান, নৌযুদ্ধ, নৌপ্রকৌশল এসব আবিষ্কার হয় যুদ্ধের মওকায়। শান্তিপ্রিয় এলাকা এসব আবিষ্কার করতে পারে না। ইউরোপের শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩) নিজেদের মাঝে হানাহানির সুযোগে ইউরোপ সামরিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠে। ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে। যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদগণ জানাচ্ছেন, কলম্বাসের আগেও আমেরিকা মহাদেশে ভাইকিং জলদস্যু, আরব বণিকদের যাতায়াত ছিল। এসবের বহু প্রমাণ আমেরিকায় গিয়ে কলম্বাস নিজেই পেয়েছেন ও বর্ণনা করেছেন। আসলে 'আবিষ্কার' শব্দটার অর্থই বদলে দিয়েছে ইউরোপ। রবার্ট ব্রিফল্টের মেজাজই খারাপ—
কে experimental method-এর আবিষ্কর্তা, সেটা অন্যান্য আরব আবিষ্কারের মতোই— ১ম ইউরোপীয় যে সেটার উল্লেখ করবে সে-ই সেটার আবিষ্কারক। ঠিক যেমন কম্পাস Flavio Gioja-এর নামে, অ্যালকোহল Arnold of Villeneuve-এর নামে, লেন্স ও বারুদ Schwartz কিংবা Bacon-এর নামে। এসবই ইউরোপীয় সভ্যতার উৎসের ব্যাপারে বিরাট বিরাট ভুলবার্তার অংশ।
তো একইভাবে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন কে? ১৪৯৮ সালে জলদস্যু ভাস্কো-দা-গামা। অবাক হয়ে ইউরোপ দেখল, নিজেদের মাঝে মারামারি করে শক্তিক্ষয় আর কত? ইউরোপের বাইরে বিশাল এক অপ্রস্তুত দুনিয়া পড়ে আছে। ব্যবসায়ীরা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি গড়ে বেরিয়ে পড়ল। পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ডাচ, ইংরেজ। এসব কোম্পানির সাথে আছে নিজস্ব সেনাবাহিনী। প্রথমে ব্যবসার অনুমতি, এরপর ব্যবসার নিরাপত্তার কথা বলে সেনাবাহিনী ঢুকানো, ক্যান্টনমেন্ট-দুর্গ নির্মাণ, এরপর নেটিভদের পরাজিত করে উপনিবেশি শাসন প্রতিষ্ঠা... এই ফর্মুলায় সারা দুনিয়ায় উপনিবেশ গাড়ল ইউরোপ।

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ডাকাতির গল্প

📄 ডাকাতির গল্প


ছোটবেলায় আবুব একটা বই কিনে দিয়েছিলেন—সব সেরা ডাকাতের গল্প। অস্থির লাগত পড়তে। বিশে ডাকাত, রঘু ডাকাত, রমা ডাকাতের গল্প। এখন আপনাদের যে ডাকাতের গল্প বলব, তার সাথে এদের কোনো তুলনা চলে না। ধনসম্পদ ডাকাতি তো করেছেই, মন-দিল-আক্কেল-বুদ্ধি সব ডাকাতি করে ইউরোপে নিয়ে গেছে। আবার দয়া করে ডাকাতি করেছে বলে সর্বস্বান্ত ঘরের মালিক-ছেলেপুলে সবাই সেই ডাকাতের প্রতি কৃতজ্ঞ। এমন দুর্দান্ত সে ডাকাত!

আমেরিকায় উপনিবেশে ইংল্যান্ড পেরে উঠছিল না অন্যদের সাথে, সপ্তদশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের পকেটের হালত সুবিধার ছিল না। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক James Mill বলছেন—
ইংরেজদের দেশ সরকারের ব্যর্থতা আর গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ছিল। এতটাই যে, বাণিজ্য প্রসার ও সুরক্ষার জন্য পুঁজিই ছিল না তাদের। ওলন্দাজদের সাথে চলত এক অসম প্রতিযোগিতা।[১]
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর সেই ইংল্যান্ডেরই 'আঙুল ফুলে কলাগাছ' অবস্থা। ১৭৫৭-তে বাংলা জয়, ১৭৬৫ সালে বাংলার দিওয়ানি (ট্যাক্স কালেকশনের ক্ষমতা) লাভ... ঠিক ১৭৬০-এর দশকেই ইংল্যান্ডে শুরু হয়ে গেল শিল্পবিপ্লব? আরিব্বাসরে! কীভাবে হলো শুনুন William Digby নামের এক ব্রিটিশ ঐতিহাসিক-কাম-রাজনীতিবিদের ভাষায়—
পলাশির যুদ্ধের পর বাংলার সম্পদ স্রোতের মতো এসে জমা হতে থাকে লন্ডনে। ১৭৬০ সালের আগে যেখানে শিল্পকারখানার নাম-গন্ধও ছিল না, সেখানে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। [১]
কী পরিমাণ সম্পদ গেছে ইংল্যান্ডে? সেটা শুনবেন P. Spear সাহেবের The Indian Nabobs-বই থেকে-

| বাবদ | হিসাবটা টাকায় নয়, পাউন্ডে |
|---|---|
| মুর্শিদাবাদের কোষাগার লুট | ১৫ লক্ষ |
| যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে | ৪ লক্ষ |
| কোম্পানির সিলেক্ট কমিটি | ৯ লক্ষ |
| কোম্পানির কাউন্সিল মেম্বাররা প্রত্যেকে | ৫০-৮০ হাজার করে |
| ক্লাইভ নিজে | ২ লক্ষ ৩৪ হাজার। সাথে বছরে ৩০ হাজার করে পাবে। |
| জামাই মির কাশিম দিলো | ২ লক্ষ |
| নজম-উদ্দৌলা দিলো | ১ লক্ষ ৪৯ হাজার |
| সাধারণ ব্রিটিশ সেনাদের লুটপাট | বেহিসেব |

লর্ড ক্লাইভ নিজেই স্বীকার করেছেন: এমন অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা-ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের পাশবিক চিত্র বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথায় পাওয়া যায়নি। (Malcom, Life of Clive) লর্ড মেকলে লিখেছেন[২]-
“ইংল্যান্ডে সম্পদ আসত সমুদ্রপথে। ওয়াট ও অন্যদের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইংল্যান্ডের যেটুকু কমতি ছিল, ইন্ডিয়া সেটুকু সরবরাহ করেছে। ইংল্যান্ডের পুঁজি বহুগুণে বাড়িয়েছে ভারতীয় সম্পদের প্রবেশ।... শিল্পবিপ্লব, যার ওপর ভিত্তি করে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সম্ভব হয়েছিল কেবল ইন্ডিয়ার সম্পদের কারণে। যা কোনো লোন ছিল না, এমনিতেই নিয়ে নেয়া হয়েছিল (লুট)। তা নাহলে স্টিম ইঞ্জিন ও যন্ত্রশিল্প পড়েই থাকত ইংল্যান্ডের। ইংল্যান্ডের উন্নতি মানে ভারতের লোকসান-এমনই লোকসান, যা ভারতে শিল্পকে ফাঁকা করে দিয়েছিল, কৃষিকে স্থবির করে দিয়েছিল। যেকোনো দেশ যদি এইভাবে পাচার করা হয়, সে ধনী-সম্পদশালী হলেও নিঃস্ব হয়ে যাবে।'

ব্রিটেনের সকল যুদ্ধব্যয় (১৯১৩ সাল অব্দি ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ড), সকল বিজ্ঞানের ফান্ডিং, সকল প্রযুক্তির বাণিজ্যিকরণের পুঁজি সরবরাহ করেছে ভারত। ভারতকে নিংড়ে ব্রিটেন আজ বিজ্ঞান-দর্পী, ঝকঝকে তকতকে, উন্নত। Sir William Digby লিখেছেন: ১৯০০ পর্যন্ত ভারত থেকে আইনগতভাবেই (আইন বানিয়ে) আমরা নিয়েছি ৬,০৮০ মিলিয়ন পাউন্ড (৬০৮০,০০০,০০০ পাউন্ড) [১]। Mr. A.J.Wilson মার্চ ১৮৮৪-এর Fortnightly Review ম্যাগাজিনে লেখেন : ভারতীয়দের বছরে মাথাপিছু আয়ই সর্বোচ্চ ৫ পাউন্ড। সেখানে প্রতিবছর আমরা কোনো না কোনোভাবে ৩ কোটি পাউন্ড নিয়ে যাচ্ছি।
আগের ৭০০ বছরে যে ভারতে মাত্র ১৭ বার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেই ভারতে ১৭৭০-১৮৫০-এর মাঝে ৮০ বছরের ভেতরে অলরেডি ১২ বার দুর্ভিক্ষ হয়ে গেছে, না খেয়ে মারা গেছে ৬০ লাখ মানুষ [২]। সম্রাট আওরঙ্গজেব রাহিমাহুল্লাহর সময়ে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে চীনকে পেছনে ফেলে ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতিতে (World's Largest Economy) পরিণত হয়, যার মূল্যমান ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এর জিডিপি ছিল সে সময়ের সমগ্র বিশ্বের ৪ ভাগের ১ ভাগ। [৩] সেই দেশটা ঠিক কী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে ১৭৬৯-১৮০০ এর মাঝে ৭ দফা দুর্ভিক্ষের শিক্ষার হতে পারে? ঠিক কী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশে ১৮০১-১৯০০ পর্যন্ত ১০০ বছরে ৩১ টা মন্বন্তরে (মহাদুর্ভিক্ষ) মরে যায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ—'না খেয়ে'[৪] সেটা আশা করি বলে বোঝাতে হবে না। আজকের উন্নত ইউরোপ-আমেরিকা এনলাইটেনমেন্টের উন্নততর মানবিকতার ফসল নয়, সাম্য-স্বাধীনতা-ভ্রাতৃত্বের ফসল নয়; আজকের সাদা-সভ্যতা, তাদের বিজ্ঞান, তাদের উন্নতি উপনিবেশগুলোতে কোটি কোটি নেটিভের জীবনের ফসল, চূড়ান্ত পাশবিকতার ফসল।

টিকাঃ
[১] James Mill এর বরাতে Unhappy India, Lala Lajpat Rai, 1928 : page : 322
[১] Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
[২] Unhappy India, Lala Lajpat Rai, 1928
[১] 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901
[২] প্রাগুক্ত
[৩] The World Economy, Angus Maddison, OECD Publishing (2003), page : 261
[৪] 'Prosperous' British India, Sir William Digby, 1901

📘 অবাধ্যতার ইতিহাস > 📄 ব্যবসা

📄 ব্যবসা


সময়টা ১৮১৩। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 'কোম্পানি চার্টার' নবায়নের সময় জিজ্ঞাসা করা হলো মাদ্রাজের গভর্নর কর্নেল Thomas Munro-কে, -আচ্ছা, যদি ইন্ডিয়ার বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় (free trade), তাহলে কি সম্ভাবনা আছে, যে, নেটিভরা (স্থানীয়রা) ব্রিটিশ পণ্য কিনবে? -আমার মনে হয় না, এতে কাজ হবে। অর্থাৎ ব্রিটিশ-উৎপাদিত পণ্য দিয়ে ভারতের বাজার ভরে ফেললেও এতে ব্রিটিশ পণ্যের চাহিদা বাড়ানো যাবে না। কেন যাবে না? কী কারণ দেখিয়েছেন কর্নেল মুনরো? তিনি বলেন-
“আমাদের সবচেয়ে পুরোনো যে উপনিবেশ, সেখানেও নেটিভরা আমাদের জীবনযাত্রা গ্রহণ করেনি। আমাদের পণ্য সেখানে নামেমাত্র বিক্রি হয়। আর ইউরোপীয় গৃহস্থালি পণ্য তো মোটেও বিক্রি হয় না। এমনকি বাপে যদি ইউরো-স্টাইলের কিছু কেনেও, পরের প্রজন্মে ছেলে এসে সেটা ঘর থেকে বের করে দেয়। আমার মনে হয়, এজন্য উচ্চমূল্য দায়ী নয়, অন্য কোনো কারণ আছে ইউরোপীয় পণ্য গ্রহণযোগ্যতা না পাবার, যা আরো স্থায়ী কারণ। আমার খেয়ালে, কারণগুলো আবহাওয়াগত, ধর্মীয় এবং আদব-কায়দা-সম্পর্কিত এবং তাদের দেশি পণ্যের উচ্চমান। যেমন ধরুন, একজন হিন্দু মেঝেতে বসে খায় মাটির থালায়, মাদুর-পাটি ছাড়া তার ঘরে কোনো ফার্নিচার নেই। এজন্য আমাদের খাবার টেবিল, সোফা জাতীয় পণ্য তাদের প্রয়োজনও নেই। [১]
অর্থাৎ ভারতীয়দের রুচি আলাদা, ইউরোপীয় রুচির পণ্য বিক্রি হচ্ছে না বেনিয়াদের। বিক্রি করতে হলে রুচি বদলে ইউরোপীয় রচি করে দিতে হবে। তাহলে তারা ব্রিটিশ পণ্য কিনবে। এটা ছিল ১৮১৩ সালের চিত্র। স্যার উইলিয়াম ডিগবি তার বইয়ে ১৮৯৮-৯৯ সালের চিত্রে দেখাচ্ছেন ২০ লক্ষ ইউরোপীয়-ওয়াশড ইন্ডিয়ান (Europeanized Indian)-এর জন্য বিলাতি পোশাক, খাবার, আসবাবপত্র আমদানি হয়েছে এদেশে। তার মানে এই ৮০-৯০ বছরে ভারতীয়দের রচির বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তুলনা করুন লর্ড মেকলের বিখ্যাত উক্তিটা- (১৮৩৫-এর শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারা এমন প্রজন্ম তৈরি হবে) এরা হবে এমন একটা শ্রেণি, যারা রক্তে-গায়ের রঙে তো ভারতীয়, কিন্তু রুচি-মতামত-নীতি-বিচারবুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। (মনোরাজ্যে উপনিবেশ)

শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ৬০ বছরে এক প্রজন্মের ব্যবধানে ২০ লক্ষ ক্রেতা তৈরি করে ফেলা হলো রুচির পরিবর্তন ঘটিয়ে। ভারতবর্ষ হয়ে গেল ব্রিটেনের প্রধান বাজার।

টিকাঃ
[১] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00