📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 দ্বিতীয় আবেদন: মুসলিম সমাজে বসবাসকারী অমুসলিমদের প্রতি।

📄 দ্বিতীয় আবেদন: মুসলিম সমাজে বসবাসকারী অমুসলিমদের প্রতি।


এটিই আমাদের ধর্ম।
এতে কি আপন বিধি-বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ভীতি সঞ্চার করার মতো কিছু আছে?
ইসলামি শরী'আতের মৌলিক নীতিমালা এবং সেগুলোর সরেজমিনে বাস্তবায়নের ইতিহাস এ কথার দাবী করে যে, অমুসলিমরা গোটা পৃথিবীতে ইসলামের মতো এতো অধিক সদাচারী, ন্যায়পরায়ণ ও মহৎ কোনো মতাদর্শ কোথাও দেখে নি। পৃথিবীর ইয়াহুদী-খ্রিস্টানরা ইসলামী রাষ্ট্রের ছায়াতলে যে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা পেয়েছে তা তারা নিজেদের রাষ্ট্রের স্বজাতীয় লোকদের ন্যায়পরায়ণতার মাঝেও পায় নি।
আমরা আমাদের ধর্মের বিস্তৃত ইতিহাসের কোথাও এমন কিছু খুঁজে পাই নি যা মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী সংখ্যালঘু অমুসলিমদের প্রতি কোনোরূপ অত্যাচার, নিপীড়ন বা পক্ষপাতমূলক আচরণের ইঙ্গিত বহন করে। আমরা ইসলামের উষালগ্ন থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত সকল শ্রেণির অমুসলিমদের সাথে লেন-দেনে সদাচারণ, বিচারে ন্যায়পরায়ণতা ও সামাজিকভাবে সম্মান প্রদর্শনের মূলনীতিকেই প্রতিপালন করে আসছি।
ইতিহাসের কোথাও কিংবা ঘটনাপ্রবাহের কোনো দৃশ্যে যদি আপনি কোনো মুসলিম শাসক বা বিচারক কর্তৃক যুলুম-নির্যাতনের কিছু দেখতে পান তাহলে সেটাকে নিশ্চয় বিচ্ছিন্ন ঘটনাই বলতে হবে এবং দেখবেন যে, সেখানে যুলুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে অবশ্যই মুসলিম ব্যক্তিরাও রয়েছেন। যালিম তো যুলুম করার ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিম বিচার করে না। একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমও তেমন। সে ইনসাফের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে কোনো পার্থক্য নির্ণয় করে না।
আমাদের দীনের ন্যায়পরায়ণতার সবচেয়ে স্পষ্ট ও সুন্দরতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে ন্যায়পরায়ণতা সর্বজনীন। মানুষই নয় শুধু বরং এখানে প্রতিটি সৃষ্টজীবের সাথে ইনসাফ করা হয়। যে দীনে কোনো বিড়াল কিংবা উষ্ট্রীর সাথে এমনকি কোনো উদ্ভিদের প্রতিও অবিচার করা নিষিদ্ধ সে দীনে কীভাবে মানুষের প্রতি অবিচারের অবকাশ থাকতে পারে?!!
মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও নির্ভরতার কারণ হলো যে, আমরা মুসলিমরা তাদের সাথে ইনসাফ ও তাদের প্রতি অনুগ্রহ করাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে ধর্মীয় ইবাদত হিসেবেই পালন করে থাকি। আমরা যদি অমুসলিমদের প্রতি কোনো প্রকার যুলুম-নির্যাতন করি এতে আমরা আমাদের রবের নিকট অপরাধী সাব্যস্ত হই। শরী'আতের দৃষ্টিতে বড় ধরণের অন্যায় কাজে জড়িত বলে বিবেচিত হই। পরকালে এর জন্য হিসাব ও জবাবদিহিতার ভয়ে শঙ্কিত থাকি।
يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ ) [الشعراء: ۸۸، ۸۹]
"যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি কোনো উপকারে আসবে না, তবে যে আল্লাহর কাছে আসবে সুস্থ অন্তরে।" [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ৮৮-৮৯]
ব্যক্তিগত সমালোচনা এবং আভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আমাদেরকে সংযত রাখে। আমাদের কোনো পুলিশ বা সভা-সংঘের প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা আমাদের অন্তরে গ্রথিত। তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন যেমনটি এ গ্রন্থে আমরা দেখেছি যে, আমরা যেন অমুসলিমদের প্রতি দয়াদ্র হই, তাদের সাথে নম্র ও কোমল আচরণ করি, তাদের কল্যাণে হস্ত প্রসারিত করি এবং তাদের স্বার্থে মন-প্রাণ উজাড় করে দেই।
এসব কিছু করতে আমরা কখনো চাপ বা কষ্ট অনুভব করি না; বরং এটিই আমাদের ধর্মের স্বভাবজাত প্রকৃতি এবং এমনই আমাদের লাইফ স্টাইল। সকলের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান হচ্ছে আমাদেরকে জানুন, বুঝুন এবং অনুধাবন করুন।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 তৃতীয় ও সর্বশেষ আবেদন: সর্বকালের সর্বসাধারণের প্রতি।

📄 তৃতীয় ও সর্বশেষ আবেদন: সর্বকালের সর্বসাধারণের প্রতি।


আপনারা ইসলামের বিধি-বিধান ও মুসলমিদের ইতিহাসকে তার সঠিক উৎস থেকে জানুন। আমরা অতীত ও বর্তমানে ইতিহাসে ও বাস্তবে অনেক যুলুমের স্বীকার হয়েছি। আমাদের অনেক ইতিহাস লিখিত হয়েছে আমাদের শত্রুদের হাতে। আমাদের অনেক সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় ও অনেক ভেদ-রহস্যের কথা রচিত হয়েছে আমদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের কলমে। এটি তো ইনসাফের কথা হতে পারে না যে, মানুষ আমাদের ঘটনা শুনবে এমন কারো নিকট থেকে যে আমাদেরকে ঘৃণা করে। এটাও ইনসাফের দাবী নয় যে, আমরা ইসলামের একনিষ্ঠ ধারক-বাহকদের রচনা বাদ দিয়ে অন্যদের মিথ্যা ও বানোয়াট কথার ওপর নির্ভর করবো।
ইসলামের ইতিহাসকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে জাল করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এর বিকৃতি সাধন করা হয়েছে। পশ্চিমারা ও স্বার্থবাদী মহলের অনেকেই মুসলিম উম্মাহর মস্তিস্ক বিকৃত করা ও সভ্যতার ইতিহাসকে কলংকিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। তাদের কেউ জাল ইতিহাস রচনা করেছে আবার কেউ করেছে বিকৃতি সাধন। কেউ সঠিককে ভুলে যাওয়ার ভান করে অশুদ্ধকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আবার কেউ মানবীয় দোষ-ত্রুটিকে প্রকাশ করে গুণ-গরিমা সম্পর্কে নিরবতা প্রদর্শন করেছে। এসব কিছু করেছে তারা গভীর ষড়যন্ত্র সুবিন্যস্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ফলে ইসলামী ইতিহাসের নতুন এক বিকৃত রূপ ও কাঠামো তৈরি হয়েছে, বাস্তবতার সাথে যার কোনো মিল-ই নেই। আমি পৃথিবীর সত্য সন্ধানী গবেষকদেরকে এবং শান্তি ও উন্নতি প্রত্যাশী সকলকে আহ্বান করবো যে, আসুন, আমরা দীন ইসলাম ও মুসলিমদের ইতিহাসকে তার সঠিক উৎস এবং স্বচ্ছ উৎপত্তিস্থল থেকে অধ্যয়ন করি।
পৃথিবী যদি আমাদের ইতিহাস অধ্যয়নের পাঠ ছেড়ে দেয় এবং আমাদের সভ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণসমূহ ভুলে যায় তাহলে অনেক মঙ্গল ও কল্যাণকে হারাবে এবং এক মহা সম্পদের অবহেলা ও অপচয় করা হবে।
মানবতার দীর্ঘ ইতিহাসে ইসলাম কোনো গতানুগতিক কিছু নয়; বরং ইসলাম হচ্ছে মানব ইতিহাসের মেরুদণ্ডতুল্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের পূর্বে যেসব কল্যাণকর বিষয় পৃথিবীতে ছিল আমরা সেগুলোকে বহাল রেখেছি, সেগুলোর সাথে সংযোজন করেছি এবং সেগুলোকে আরো ত্বরান্বিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত করেছি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّمَا بُعِثْتُ لأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ» "নিশ্চয় আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম গুণাবলীর পূর্ণতা বিধানের জন্যে।"²⁶¹
যার ফলে ইসলাম উন্নত চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখড়ে উপনীত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়ে উঠেছেন প্রশংসনীয় গুণাবলীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হে সর্বকালের ইনসাফপ্রিয় লোক সকল! ইসলামকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখুন, তার সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের সীমাহীনতা দেখে অবাক হয়ে যাবেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনুন, জানুন। আপনাদের প্রতি এটি অনেক বড় অবিচার যে, আপনারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পারেন নি।
হে লোক সকল!
পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে বসবাসকারী হে মানবগোষ্ঠী! আমাদের দ্বারা সম্ভব নয় এবং এটা আমাদের দায়িত্বও নয় যে, আমরা তোমাদের মুসলিম বানিয়ে ফেলবো। আমরা যেটি পারবো এবং যে জন্য আমরা আদিষ্ট তা হচ্ছে আমরা তোমাদের নিকট আমাদের স্বচ্ছ-সুন্দর বাণী পৌছে দিতে পারি, অতঃপর তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারে তোমরা পূর্ণ স্বাধীন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ عَامِنُوا بِهِ أَوْ لَا تُؤْمِنُوا [الاسراء: ١٠٧]
"বলো, 'তোমরা এতে ঈমান আন বা না আন'।" [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১০৭]
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, অবশ্যই এমন একটি দিন আসবে যেদিন মহান আল্লাহ আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিবেন। সেদিন সকলেই বুঝতে পারবে যে, কে সঠিক পথে ছিল আর কে ভুলের মধ্যে ছিল। কে হিদায়াতের অনুসারী ছিল আর কে স্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ رَبَّكَ يَقْضِي بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ﴾ [يونس: ٩٣]
"নিশ্চয় তোমার রব কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে ফয়সালা করবেন যা নিয়ে তারা মতবিরোধ করত।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯৩]

টিকাঃ
261. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৪২২১, বায়হাকী, হাদীস নং ২০৫৭১, আলবানী: সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ (৪৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00