📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ‘আদী ইবন হাতেম তাঈ’র সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 ‘আদী ইবন হাতেম তাঈ’র সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


মালেক ইবন 'আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতো একই ধরণের আচরণ করেছেন তিনি তাঈ গোত্রের অধিপতি 'আদী ইবন হাতেম তাঈ'র সাথেও। বনু তাঈ ছিল দীর্ঘদিন থেকে ইসলামের বিরোধিতায় অতি কট্টর একটি গোত্র। তাদের অতীত প্রেক্ষাপটে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা তাদের এ নতুন দীন ইসলামে প্রবেশকে আরো কঠিন করে দিয়েছে। এটি ছিল কাহতানী ²⁴⁴ শাখাসমূহের একটি। যাদের অবস্থান ছিল আদনানী শাখা কুরাইশ থেকে অনেক দিক থেকেই দূরে। এজন্যই উভয়ের মাঝের গোত্রগত বিভেদ-বিভাজন ছিল সর্বোচ্ছ পর্যায়ের। বনু তাঈ গোত্রের নিজস্ব একটি দেবতা ছিল। যার নাম ছিল 'ফিলস'। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকেরা তা দেখার জন্য আসত। আবার তাদের মধ্যে কিছুলোক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে রোম সম্রাজ্যের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলে এবং তাদের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে চলতে শুরু করে। এজন্যই এ গোত্রের ইসলামি চিন্তা-চেতনাকে গ্রহণ করার পেছনে অনেকগুলো বিষয় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোত্রীয় বিভেদ, চিন্তাগত অনৈক্য ও তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র তথা রোম সম্রাজ্যের সাথে তাদের বন্ধুত্ব স্থাপন তার মধ্যে অন্যতম। উপরন্তু সে সময় তারা ছিল ঐ সমস্ত গোত্রসমূহের মধ্যে একটি, যারা আরব উপ-দ্বীপের অনেক দূর পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। এমনকি বনু তাঈ গোত্রের লোকদের সন্তুষ্টি ও অনুমোদন ব্যতীত ইরাক কিংবা শাম অভিমুখে কেউ নিরাপদে সফর পর্যন্ত করতে পারতো না। এবার একটু ভেবে দেখুন যে, তাদের ইসলাম গ্রহণ করা কতটা দুরূহ ব্যাপার ছিল। ইসলাম বিরোধিতায় তাদের অবস্থান আরো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন যখন আপনি শুনবেন যে, কুখ্যাত ইয়াহুদী নেতা কা'ব ইবন আশরাফ এ গোত্রেরই লোক ছিল। যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিমদের জন্য শত্রুতার জাল বিছিয়ে রাখতো। তার পিতা ছিল তাঈ গোত্রের। মাতা বনু নাদ্বীরের। যখন তার ষড়যন্ত্র মাত্রারিক্ত বেড়ে গিয়েছিল এবং গোটা আরব ভূ-খণ্ডকে সে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী তাকে হত্যা করে ফেলা হয়। তাঈ গোত্র আরবের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য যতগুলো পয়েন্ট ছিল কা'ব ইবন আশরাফের হত্যার মধ্য দিয়ে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট ঝরে গেল। এ প্রভাবশালী গোত্রের গোত্রপতি ছিল দানশীলতা ও মেহমানদারীর প্রবাদপুরুষ প্রখ্যাত আরবনেতা হাতেম তাঈ'র ছেলে 'আদী ইবন হাতেম তাঈ। 'আদী ইবন হাতেম তাঈ দেখল যে, তার পায়ের নিচের জমিন সংকীর্ণ হয়ে আসছে। আরব উপ-দ্বীপে তার অবস্থান অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। তাই সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রচণ্ডরকম হিংসা করতে শুরু করল। এমনকি সে বলে ফেলল যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন প্রেরিত হয়েছেন তখন তার চেয়ে অধিক ঘৃণা আমি কখনো কোনো কিছুকেই করি নি। ²⁴⁵
অনেক দিন পরের কথা। মক্কা বিজয় হয়ে গেল। মক্কাবাসীরা নিরাপত্তার সাথে বসবাস করছে। হাওয়াযিনও ইসলামের ছায়াতলে এসে গেল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন স্থানে মানুষের গড়া দেব-দেবিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য অনেকগুলো সারিয়‍্যাহ (অভিযান) প্রেরণ করলেন। বনু তাঈ গোত্রের দেবতা 'ফিলস'কে ধ্বংস করার জন্যও আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর নেতৃত্বে একটি অভিযান প্রেরণ করেন। প্রথমে তারা এ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিল। অনেকে বন্দি হয়। 'আদী ইবন হাতেম তাঈ পালিয়ে শামের মিত্রদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। তার বোনকেও বন্দি করা হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দিলেন। ছাড়া পেয়ে সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে আসার জন্য শামের বিভিন্ন অঞ্চলে তার ভাইকে খুঁজতে লাগল। এক পর্যায়ে ভাইকে খুঁজে পেয়ে বলল, 'তুমি এমন কাজ করেছ যা তোমার বাবা কখনো করে নি। ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক চল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে যাই। ' ²⁴⁶
সে সময় অন্য দেশে আশ্রিত হয়ে থাকার জন্য 'আদী ইবন হাতেম তাঈ নিজেই নিজ জীবনের ওপর ছিল অতীষ্ট। সে সময়কার তার অবস্থার চিত্রায়ন তার মুখ থেকেই শুনুন- 'আদী ইবন হাতেম বলেন, "সে সময় আমার অবস্থানের ওপর আমি নিজেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমার মনে হলো যে, পালিয়ে না এসে যুদ্ধমাঠে নিহত হয়ে যাওয়াই আমার জন্য অনেক ভালো ছিল। তাই আমি আমার বোনকে বললাম যে, আমি তার (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) নিকট যাবো। যদি তিনি সত্যবাদী হন তাহলে আমি তার কথা মেনে নেব। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে সে আমার কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না। "²⁴⁷
ভগ্ন হৃদয়, দুর্বল চিত্ত ও বিপর্যস্ত মানসিকতা নিয়ে 'আদী ইবন হাতেম তাঈ মদীনায় ফিরে আসল। আর তার দুরাবস্থার কথা তো কারো কাছেই অজানা নয়। দেখা যাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কেমন আচরণ করেন।
আদী'র নিজেরই বর্ণনা, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে আদী ইবন হাতেম! ইসলাম গ্রহণ কর, শান্তিতে থাকতে পারবে। একথা তিনি তিনবার বললেন।
আমি বললাম, আমি তো একটি দীনের ওপর রয়েছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার দীন সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমি বেশি জানি।
আমি বললাম: আপনি আমার দীন সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানেন?!
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি কি রকুসিয়্যাহ ²⁴⁸ সম্প্রদায়ের লোক নও? তুমি কি তোমার সম্প্রদায়ের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক চতুর্থাংশ খেয়ে ফেলো না?
আমি বললাম: হ্যাঁ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: তোমার দীন অনুযায়ী এটা তোমার জন্য বৈধ নয়।
('আদী ইবন হাতেম বলেন) এরপর তিনি যাই বললেন আমি অবনত মস্তকে শুধু শুনে গেলাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কেন এখনো ইসলাম গ্রহণ করতে পারছো না তাও আমি জানি। তুমি ভাবছো যে, আমার অনুসারীগণ সবাই দরিদ্র শ্রেণির লোক। আমাদের কোন শক্তি-সামর্থ্য নেই। আরবরা আমাদেরকে একবার তাড়িয়ে দিয়েছিল। আচ্ছা তুমি কি হেরাত ²⁴⁹ চেনো?
আমি বলল: নাম শুনেছি। কখনো দেখি নি।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ অবশ্যই এ দীনের পরিপূর্ণতা দান করবেন। এমন এক সময় আসবে যখন হেরাত থেকে একজন উষ্ট্রারোহিনী নারী একাকি ভ্রমন করে কা'বা ঘর তাওয়াফ করে নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে। আল্লাহ অবশ্যই কিসরা ইবন হরমুজের ধন-ভাণ্ডারকেও আমাদের হস্তগত করে দেবেন।
আমি বললাম, কিসরা ইবন হরমুজের?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হ্যাঁ, কিসরা ইবন হরমুজের এবং মুসলিমদেরকে এত বেশি সম্পদের মালিক বানিয়ে দেওয়া হবে যে, দান করার জন্য লোক খুঁজা হবে; কিন্তু কেউ তা গ্রহণ করবে না।"²⁵⁰
এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত সহজেই এক প্রসিদ্ধ কাফির নেতাকে মুসলিমদের সারিতে যুক্ত করে নিলেন। এটাও ভাবলেন না যে, হতে পারে সে ভেতরে ভেতরে বনু তাঈ গোত্রকে আবারও ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। তাকে অতীতের তার ইসলাম বিরোধী যুদ্ধগুলোর কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন না। তার সাথে কোনোরূপ অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশও করলেন না; বরং তিনি তার সাথে ধৈর্য ও নম্রতার সাথে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করলেন।
পরবর্তীতে 'আদী ইবন হাতেম তাঈ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলতেন: "এখন তো একজন উষ্ট্রারোহিনী নারী হেরাত থেকে একাকি ভ্রমন করে কা'বা ঘর তাওয়াফ করে নিরাপদে ঘরে ফিরে যেতে পারে। কিসরা ইবন হরমুজের ধন-ভাণ্ডারের বিজয়াভিযানে আমি নিজেই উপস্থিত ছিলাম। আর তৃতীয় কথাটিও (দান গ্রহণ করার মতো লোক পাওয়া না যাওয়ার কথা) অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বলেছেন।"

টিকাঃ
244. আরবের গোত্রগুলো প্রধানত দু'টি শাখায় বিভক্ত। আদনান ও কাহতান। আদনানের উপশাখা হচ্ছে- সাক্বীফ, বনু কিলাব ও বনু বকর ইবন ওয়ায়েল। কাহতানের উপশাখা হলো- বুজাইলাহ ও বনু তাঈ।
245. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৫০৪), আয-যাহবী: তারীখুল ইসলাম (১/৩৫৪)।
246. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৯৪০০; ইবন হিব্বান হাদীস নং ৭২০৬; তাবরানী, হাদীস নং ১৩৯২৫।
247. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৯৩৯৭; মুসতাদরাকে হাকিম হাদীস নং ৮৫৮২; ইবন হিব্বান হাদীস নং ৬৬৭৯; ইমাম বুখারীও নবুওয়াতের আলামত অধ্যায়ে এ হাদীসের কিছু অংশ উল্লেখ করেছেন: হাদীস নং ৩৪০০।
248. খ্রিস্টানদের একটি বিকৃত শাখা।
249. ইরাকের কুফা নগরীর একটি স্থান。
250. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৯৩৯৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00