📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


উত্তরসূরী হিসাবে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াও ইকরামার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। তার পিতাও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোরতর শত্রু ছিল। বদর যুদ্ধে সে নিহত হয়েছিল। সাফওয়ান এ ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে নিজের সর্ব শক্তি ব্যয় করতে নেমে পড়েছে। উহুদ যুদ্ধে পেছন থেকে আক্রমনকারীদের মধ্যে খালেদ ইবন ওয়ালীদদের সাথে এ সাফওয়ানও ছিলো। সত্তরজন সাহাবী হত্যায় এরই ভুমিকা ছিল অন্যতম। আহযাবের যুদ্ধেও সে অংশ নিয়েছিলো। মক্কার অভ্যন্তরে রণ-প্রস্তুতিতে লিপ্তদের তালিকায়ও ছিলো সে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যা চেষ্টায় সে এক স্বতন্ত্র পরিকল্পনা এঁকেছিলো। তারই চাচাতো ভাই উমায়ের ইবন ওয়াহাব তখনো ইসলাম গ্রহণ করে নি। সে তার সাথে চুক্তি করেছিলো যে, উমায়ের যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারে তাহলে সে উমায়েরের পরিবারের যাবতীয় ভরণ-পোষণ ও তার সকল ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেবে। তবে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। উমায়ের ইবন ওয়াহাব ২২২ মদীনায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাফওয়ান ও তার মাঝে সংঘটিত চুক্তির সব কথা অগ্রীম বলে দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়ে যান।
দিন অনেক কেটে গেল। মক্কা বিজয় হয়ে গেল। সফওয়ান পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। মক্কায় পালাবার কোনো স্থান খুঁজে পেল না। তার জানা হয়ে গেছে যে, আরব উপদ্বীপের কোথাও কেউ তাকে ঠাঁই দেবে না। ততক্ষণে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সে স্থীর করলো, সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। এ লক্ষ্যে সে ইয়াসার নামীয় তার এক গোলামকে সাথে নিয়ে লোহিত সাগরের দিকে রওয়ানা করলো। গোলাম ছাড়া তার সাথে আর কেউই ছিল না। ঐ সময় সে ছিল মানসিক বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে। হঠাৎ সে পেছনে অনেক দূরে একজন ব্যক্তিকে তাদের অনুসরণ করতে দেখল এবং ইয়াসারকে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমার নাশ হোক, পেছনে দেখ কাকে দেখা যায়?!' গোলাম ইয়াসার বলল, এ হচ্ছে উমায়ের ইবন ওয়াহাব। সফওয়ান বলল, উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে দিয়ে আমার কী হবে...?! আল্লাহর শপথ! সে আমাকে হত্যা করার জন্যই আসছে। সে মুহাম্মাদের দলভুক্ত হয়ে গেছে। আর মুহাম্মাদ এখন আমার উপর বিজয়ী। ইতোমধ্যে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিকটে এসে গেছেন। সাফওয়ান তাকে লক্ষ্য করে বলল, 'উমায়ের! তুমি আমার সাথে অনেক করেছ। তোমার ঋণ ও পরিবারের বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছ। আর এখন আমাকে হত্যা করতে এসেছ'। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবুল ওয়াহাব! আমার জীবন তোমার জন্য কুরবান হোক, আমি এখন সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে অধিক সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি।
উমায়ের ইবন ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন জানতে পারলেন যে, তার পুরোনো দিনের বন্ধু চাচাতো ভাই সাফওয়ান মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তখন তার দয়া হলো। তিনি দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রপতি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে গেছে। সে আশংকা করছে যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দেবেন না। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি তাকে নিরাপত্তা দিলাম'। এমনই তাঁর আচরণ ছিল সাফওয়ানের সাথে যেমন ছিল ইকরামার সাথে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটিই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাইফ স্টাইল।
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সাফওয়ানকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। সাফওয়ানের মনে ভয় ঢুকে গেল। সে বলল, আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার কথার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না আনলে আমি তোমার সাথে যাবো না। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারের দিকে ছুটলেন। লোহিত সাগরের পাড় থেকে মক্কা প্রায় আট কিলোমিটারের পথ তিনি সর্ব শক্তি ব্যয় করে দৌড়ে পাড়ি দিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে যাওয়া সফওয়ানের নিকট থেকে এসেছি। আমি তাকে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদানের সংবাদ দিয়েছি; কিন্তু সে কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার সাথে আসবে না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার এ পাগড়ি নিয়ে যাও তার কাছে!' উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সফওয়ানের কাছে ফিরে এসে পাগড়ি দেখিয়ে তাকে বললেন, হে আবুল ওয়াহাব! আমি এমন ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী, সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সবচেয়ে সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তি। যার গৌরব তোমারই গৌরব। যার সম্মান তোমারই সম্মান। যার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব। সে তোমারই আপন (বংশীয়) 224 ভাই। আত্মহত্যা করার ব্যাপারে আমি তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। সফওয়ান অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বলল, আমার আশংকা হচ্ছে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, না। তিনি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেছেন। তুমি গ্রহণ করলে তো ভালো। অন্যথায় তিনি তোমাকে নিরাপত্তার সাথে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদান্যতা দেখুন! সফওয়ান যদি ইসলাম গ্রহণে রাজি হয় তাহলে তো সে মুসলিমদের মতো সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করবে। আর যদি সে এখনো ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানায় তাহলে সে পূর্ণ দুই মাস চিন্তা-ভাবনার জন্য অবকাশ পাবে এবং এ দুই মাস সে মুসলিমদের মতোই পরিপূর্ণ নিরাপত্তা পাবে!
সাফওয়ান উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ফিরে এলো। মসজিদে হারাম প্রবেশ করলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করছিলেন। তারা সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
সাফওয়ান জানতে চাইল: উমায়ের, দিনে রাতে তোমরা কয়বার সালাত আদায় কর?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু: পাঁচ বার।
সাফওয়ান: সব সালাতেই কি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইমামতি করেন?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু: হ্যাঁ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরিয়ে সালাত থেকে অবসর হলেন তখন সফওয়ান তাঁকে সম্বোধন করে দূর থেকেই চিল্লিয়ে উঠল, হে মুহাম্মাদ! উমায়ের আমাকে আপনার পাগড়ি দেখিয়ে বলেছে, আপনি নাকি আমাকে আসতে বলেছেন এবং আপনার দাওয়াতে সাড়া না দিলে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ সরলভাবে বললেন, এসো হে আবু ওয়াহাব! (দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়ের সাথে তাকে তার উপনাম দ্বারা ডাকছেন।)
সাফওয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, না। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমাকে চার মাস অবকাশ দিলাম।
বাস্তবেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিন্তা-ভাবনার জন্য চার মাস অবকাশ দিয়ে দিলেন! 225
কিছুদিন পর হুনাইন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে মুসলিমদের কিছু লৌহবর্ম ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সফওয়ান ছিল মক্কার প্রসিদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে সময় সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ছাড়া গোটা মক্কাবাসী সবাই মুসলিম। এতো কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুর্বলতা ও দুরাবস্থার সুযোগ নিলেন না; বরং তিনি তার নিকট থেকে কিছু অস্ত্র ভাড়া নিলেন।
যুদ্ধের দিন মুসলিমদের সাথে সফওয়ানও তার ভাড়া দেওয়া যুদ্ধাস্ত্রের দেখা-শুনার জন্য বেরিয়েছে। হুনাইন যুদ্ধে প্রথমে মুসলিমদের মনোবল ভেঙ্গে গেলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে অসাধারণ ঐশ্বরিক সাহায্য এসেছিল এবং মুসলিমরা এতো বেশি গনীমতের সম্পদ অর্জন করেছে যা আরবের লোকেরা কখনো চোখেও দেখে নি। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে ইতিহাসের কোনো সেনাপ্রধানই যা করেন নি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। তিনি সকল সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বেশি বেশি করে ভাগ করে দিয়ে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। অনেক নও মুসলিমদেরকে মন গলানোর জন্য শত শত উট, বকরী দিয়ে দিলেন, যা তাদের বিবেককেও হয়রান করে দিয়েছে। 226 এমনকি অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমরাও সেদিন লজ্জা-শরম সব ভুলে গিয়ে বারবার চাইলেন, বারবার হাত পাতলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেদিন কারো আবেদনকেই ফিরিয়ে দেন নি, কোনো প্রার্থীকেই বঞ্চিত করেন নি।
সাফওয়ান দূরে দাঁড়িয়ে গনীমতের সম্পদ বণ্টন দেখছে আর আফসোস করছে। সে তো এখনো অমুসলিম, সে তো যুদ্ধাস্ত্রের ভাড়া ছাড়া আর কিছুই পাবে না। কিন্তু এরপরের মুহুর্তে যা ঘটেলো তা সফওয়ান স্বপ্নেও ভাবে নি। উপস্থিতদের মধ্যেও কেউ কল্পনা করতে পারে নি। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই শুনবে অবাক হয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ানকে ডাকলেন। মক্কার অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমদের মতো সাফওয়ানকেও এক শত উট দিয়ে দিলেন! দানশীলতা ও বদান্যতায় বিশ্ব-রেকর্ড করা ব্যক্তি হলেও কোনো মানব সন্তান দ্বারা কি এ ধরণের আচরণ সম্ভব?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, সাফওয়ান হুনাইনের উপাত্যকাগুলোর দিকে স্থীর তাকিয়ে রয়েছে যেগুলো উট ও বকরীতে ভর্তি হয়ে আছে। সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তার মধ্যে হতভম্ব ও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নম্র ও শান্ত স্বরে বললেন, হে আবু ওয়াহাব! তোমার কি এটি (উট ও বকরীতে ভর্তি একটি উপাত্যকার দিকে ইঙ্গিত করে) খুব পছন্দ হয়? সাফওয়ান অতি স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, হ্যাঁ। আর স্বীকার করতেই হবে সে দৃশ্য ছিল বাস্তবেই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অবাক করে দিয়ে একেবারে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, 'এ উপাত্যকা এবং এর মাঝে যত সম্পদ আছে সব তোমার'! 227
বিস্ময় তাকে হতবুদ্ধি করে ফেলল। আজ তার চোখের সামনে সে বাস্তব-সত্য উদ্ভাসিত হয়ে গেছে এতদিন যা সে বুঝতে পারে নি। সে আর কিছুই ভাবতে পারলো না। অকপটেই, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে বলে উঠল, 'নবী স্বত্তা ছাড়া এমন আচরণ আর কেউ করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সেখানেই মুসলিম হয়ে গেলেন। এরপর সফওয়ান ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দিয়েছেন। অনেক অনেক দিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত। আর (নিরাপত্তা, অবকাশ ও অগণিত সম্পদ) 228 দিতে দিতে এখন তিনি হলেন আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 229
কতইনা সৌভাগ্য সফওয়ানের...!
কতইনা সৌভাগ্য বনু জুমাহ গোত্রের যাদের অধিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন...!
কতইনা সৌভাগ্য মক্কাবাসীর...!
কতইনা সৌভাগ্য মুসলিমদের, যাদের দলে মক্কার প্রসিদ্ধ নেতা সফওয়ান ইবন উমাইয়া যোগদান করে আল্লাহর পথের খাঁটি মুজাহিদ হয়ে গেছেন...! আর এসব কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে উট-বকরীতে পূর্ণ একটি উপত্যকার বিনিময়ে।
এ উট ও বকরীগুলোর মূল্য কতই আর হবে?
এগুলো হয়তো খেয়ে ফেলা হবে কিংবা বয়সকালে মারা যাবে...।
শুধু উট ও বকরী কেন, এ ধ্বংসশীল গোটা পৃথিবীর মূল্যই বা কত! চিরসুখের এবং মহা-অমূল্য নি'আমত তো জান্নাতের নি'আমত। আর এ সামান্য এক উপাত্যকা ভর্তি উট-বকরীর বিনিময়ে সফওয়ান থেকে নিয়ে কতগুলো মানুষ চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হয়ে গেলো!
দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনামূলক মান নির্ণয় এবং কিছু গনীমতের মালের বিপরীতে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুচিত, যৌক্তিক ও অতি উন্নত বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা-ধারা নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তুলনা করে তিনি যা স্থীর করলেন এটা কি প্রজ্ঞাময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একশ ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো না?
গনীমতের মালের বিনিময়ে ইসলাম গ্রহণ..।
দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত..।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, গনীমতের মাল যত বেশিই হোক না কেন - একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের বিনিময় হিসেবে কিছুই না। শুধু গনীমতের মালই নয়, গোটা বিশ্বটাই তাঁর কাছে তুচ্ছ। তাই তিনি কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই এতগুলো সম্পদ দিয়ে দিলেন। দুনিয়ার মূল্য তো তাঁর নিকট মাছির ডানা পরিমানও নয়। তাঁর দৃষ্টিতে তো আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হচ্ছে বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ফোটা পানির ন্যায়। দুনিয়াকে তো তিনি ছোট ছোট কান বিশিষ্ট (বিশ্রী) মরা-পঁচা ছাগলছানার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করেন। দুনিয়া সম্পর্কে এসব দর্শন শুধু থিওরিক্যালই নয়; বরং সমসাময়িক সকলেই তাঁর প্রাকটিক্যাল লাইফে এবং সাহাবীদের জীবনেও এর সু-স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মুসলিম কিংবা অমুসলিম যারাই তাঁর সাথে উঠা-বসা চলা-ফেরা করেছেন সকলেই তা লক্ষ্য করেছেন।
হুনাইনের গনীমত থেকে তিনি নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না!
দু-এক বছরের দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা জীবিকা নির্বাহ পরিমাণও না। অথচ তখন তাঁর বয়স ষাটেরও উপরে। তাঁর জন্য কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না দেখে উপস্থিত লোকদের বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পাওয়ার উপক্রম হলো। তারা কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেল। এদিকে গ্রাম্য লোকেরা নিজেদের জন্য কিছু ধন-সম্পদ ও জীব-জন্তু চেয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে ভিড়াভিড়ি ও পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। অথচ তিনি তখন একজন বিজয়ী সম্রাট ও সেনাপতি। ভিড়াভিড়ির ফাঁকে তারা তাঁর শরীরের চাদরটিও নিয়ে নিল। তিনি একজন মমতাময়ী নবী ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অত্যন্ত নম্র ও কোমল স্বরে বললেন,
«أيها الناس! ردوا علي ردائي، فوالذي نفسي بيده لو كان لكم عندي عدد شجر تهامة نعما لقسمته عليكم، ثم لا تجدوني بخيلا ولا جبانا ولا كذابا
"হে লোক সকল! তোমরা আমার চাদর আমাকে ফিরিয়ে দাও, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! আমার নিকট যদি তিহামা ²³⁰ অঞ্চলের/এ নিম্ন ভূমির বৃক্ষরাজি পরিমানও উট থাকতো তাহলে আমি তাও তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম এরপরও তোমরা আমাকে কৃপন, কাপুরুষ ও মিথ্যাবাদী হিসেবে দেখবে না।"²³¹
বাস্তবেও তিনি কোনো কৃপনতা, কাপুরুষতা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি।
এ সব শত্রুনেতাদের সাথে যা ঘটেছে হুবহু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সুহাইল ইবন আমরের ক্ষেত্রেও।

টিকাঃ
২২২. উমায়ের ইবন ওয়াহাব আল-জামহী আল-ক্বারশী। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষাবলম্বী হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো। তবে পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/২৯৪), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৭৯৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৬০৫৮)
২২৩. আবু ফুকাইহা ইয়াসার। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার গোলাম ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তার নিকটে নিপীড়ীত সাহাবীরা তথা খাব্বাব, আম্মার ও আবু ফুকাইহা ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহুম-গণ বসতেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৫/২৪৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১০৩৮৪)।
224. অনুবাদক।
225. পূর্ণ ঘটনাটি ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে (১১৩৩), মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: যুহরী থেকে (১২৬৪৬)
226. মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় নও মুসলিম। ইমানের দুর্বালতা হেতু তাদের পূর্বা জাতিয়তাবোধ যেন তাদেরকে কাফিরদের পক্ষাবলম্বনের দিকে নিয়ে না যায় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া ও তাদের মন গলানোর মতো আচরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন। আবার যেন এতে তারা নিজেদের অধীনস্তদেরকেও ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এদের মধ্যে ছিলেন, আকরা' ইবন হাবিস আত-তামীমী, আব্বাস ইবন মিরদাস আস-সুলামী, উয়াইনাহ ইবন হিসন আল-ফাযারী ও আবু সুফিয়ান ইবন হারব। সূত্র: আল্লামা ইবন মনযূর: লিসানুল আরব (৯/৯)।
227. ইবনু সাইয়্যিদিন নাস: উয়ুনুল আসার (২/২৫৩-৪৩৪)।
228. অনুবাদক।
229. সহীহ মুসলিম: (كتاب الفضائل، باب ما سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا قط فقال: لا وكثرة عطائه) হাদীস নং ২৩১৩।
230. তিহামাহ হচ্ছে নিম্নভূমি/হিজাযের একটি এলাকার নাম সূত্র: আল-মুজামুল ওয়াফী। (৩৩১)। -অনুবাদক।
231. সহীহ বুখারী: (كتاب الخمس، باب ما كان النبي صلى الله عليه وسلم يعطي المؤلفة قلوبهم) : যুবাইর ইবন মুত'ইম সূত্রে হাদীস নং ২৯৭৯, ইবন হিব্বান হাদীস নং ৪৮২০, আমর ইবন শু'আইব থেকে ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুআত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. হাদীস নং ৯৭৭।

উত্তরসূরী হিসাবে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াও ইকরামার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। তার পিতাও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোরতর শত্রু ছিল। বদর যুদ্ধে সে নিহত হয়েছিল। সাফওয়ান এ ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে নিজের সর্ব শক্তি ব্যয় করতে নেমে পড়েছে। উহুদ যুদ্ধে পেছন থেকে আক্রমনকারীদের মধ্যে খালেদ ইবন ওয়ালীদদের সাথে এ সাফওয়ানও ছিলো। সত্তরজন সাহাবী হত্যায় এরই ভুমিকা ছিল অন্যতম। আহযাবের যুদ্ধেও সে অংশ নিয়েছিলো। মক্কার অভ্যন্তরে রণ-প্রস্তুতিতে লিপ্তদের তালিকায়ও ছিলো সে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যা চেষ্টায় সে এক স্বতন্ত্র পরিকল্পনা এঁকেছিলো। তারই চাচাতো ভাই উমায়ের ইবন ওয়াহাব তখনো ইসলাম গ্রহণ করে নি। সে তার সাথে চুক্তি করেছিলো যে, উমায়ের যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারে তাহলে সে উমায়েরের পরিবারের যাবতীয় ভরণ-পোষণ ও তার সকল ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেবে। তবে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। উমায়ের ইবন ওয়াহাব ২২২ মদীনায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাফওয়ান ও তার মাঝে সংঘটিত চুক্তির সব কথা অগ্রীম বলে দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়ে যান।
দিন অনেক কেটে গেল। মক্কা বিজয় হয়ে গেল। সফওয়ান পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। মক্কায় পালাবার কোনো স্থান খুঁজে পেল না। তার জানা হয়ে গেছে যে, আরব উপদ্বীপের কোথাও কেউ তাকে ঠাঁই দেবে না। ততক্ষণে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সে স্থীর করলো, সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। এ লক্ষ্যে সে ইয়াসার নামীয় তার এক গোলামকে সাথে নিয়ে লোহিত সাগরের দিকে রওয়ানা করলো। গোলাম ছাড়া তার সাথে আর কেউই ছিল না। ঐ সময় সে ছিল মানসিক বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে। হঠাৎ সে পেছনে অনেক দূরে একজন ব্যক্তিকে তাদের অনুসরণ করতে দেখল এবং ইয়াসারকে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমার নাশ হোক, পেছনে দেখ কাকে দেখা যায়?!' গোলাম ইয়াসার বলল, এ হচ্ছে উমায়ের ইবন ওয়াহাব। সফওয়ান বলল, উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে দিয়ে আমার কী হবে...?! আল্লাহর শপথ! সে আমাকে হত্যা করার জন্যই আসছে। সে মুহাম্মাদের দলভুক্ত হয়ে গেছে। আর মুহাম্মাদ এখন আমার উপর বিজয়ী। ইতোমধ্যে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিকটে এসে গেছেন। সাফওয়ান তাকে লক্ষ্য করে বলল, 'উমায়ের! তুমি আমার সাথে অনেক করেছ। তোমার ঋণ ও পরিবারের বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছ। আর এখন আমাকে হত্যা করতে এসেছ'। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবুল ওয়াহাব! আমার জীবন তোমার জন্য কুরবান হোক, আমি এখন সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে অধিক সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি।
উমায়ের ইবন ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন জানতে পারলেন যে, তার পুরোনো দিনের বন্ধু চাচাতো ভাই সাফওয়ান মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তখন তার দয়া হলো। তিনি দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রপতি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে গেছে। সে আশংকা করছে যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দেবেন না। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি তাকে নিরাপত্তা দিলাম'। এমনই তাঁর আচরণ ছিল সাফওয়ানের সাথে যেমন ছিল ইকরামার সাথে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটিই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাইফ স্টাইল।
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সাফওয়ানকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। সাফওয়ানের মনে ভয় ঢুকে গেল। সে বলল, আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার কথার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না আনলে আমি তোমার সাথে যাবো না। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারের দিকে ছুটলেন। লোহিত সাগরের পাড় থেকে মক্কা প্রায় আট কিলোমিটারের পথ তিনি সর্ব শক্তি ব্যয় করে দৌড়ে পাড়ি দিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে যাওয়া সফওয়ানের নিকট থেকে এসেছি। আমি তাকে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদানের সংবাদ দিয়েছি; কিন্তু সে কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার সাথে আসবে না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার এ পাগড়ি নিয়ে যাও তার কাছে!' উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সফওয়ানের কাছে ফিরে এসে পাগড়ি দেখিয়ে তাকে বললেন, হে আবুল ওয়াহাব! আমি এমন ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী, সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সবচেয়ে সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তি। যার গৌরব তোমারই গৌরব। যার সম্মান তোমারই সম্মান। যার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব। সে তোমারই আপন (বংশীয়) 224 ভাই। আত্মহত্যা করার ব্যাপারে আমি তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। সফওয়ান অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বলল, আমার আশংকা হচ্ছে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, না। তিনি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেছেন। তুমি গ্রহণ করলে তো ভালো। অন্যথায় তিনি তোমাকে নিরাপত্তার সাথে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদান্যতা দেখুন! সফওয়ান যদি ইসলাম গ্রহণে রাজি হয় তাহলে তো সে মুসলিমদের মতো সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করবে। আর যদি সে এখনো ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানায় তাহলে সে পূর্ণ দুই মাস চিন্তা-ভাবনার জন্য অবকাশ পাবে এবং এ দুই মাস সে মুসলিমদের মতোই পরিপূর্ণ নিরাপত্তা পাবে!
সাফওয়ান উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ফিরে এলো। মসজিদে হারাম প্রবেশ করলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করছিলেন। তারা সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
সাফওয়ান জানতে চাইল: উমায়ের, দিনে রাতে তোমরা কয়বার সালাত আদায় কর?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু: পাঁচ বার।
সাফওয়ান: সব সালাতেই কি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইমামতি করেন?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু: হ্যাঁ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরিয়ে সালাত থেকে অবসর হলেন তখন সফওয়ান তাঁকে সম্বোধন করে দূর থেকেই চিল্লিয়ে উঠল, হে মুহাম্মাদ! উমায়ের আমাকে আপনার পাগড়ি দেখিয়ে বলেছে, আপনি নাকি আমাকে আসতে বলেছেন এবং আপনার দাওয়াতে সাড়া না দিলে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ সরলভাবে বললেন, এসো হে আবু ওয়াহাব! (দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়ের সাথে তাকে তার উপনাম দ্বারা ডাকছেন।)
সাফওয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, না। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমাকে চার মাস অবকাশ দিলাম।
বাস্তবেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিন্তা-ভাবনার জন্য চার মাস অবকাশ দিয়ে দিলেন! 225
কিছুদিন পর হুনাইন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে মুসলিমদের কিছু লৌহবর্ম ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সফওয়ান ছিল মক্কার প্রসিদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে সময় সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ছাড়া গোটা মক্কাবাসী সবাই মুসলিম। এতো কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুর্বলতা ও দুরাবস্থার সুযোগ নিলেন না; বরং তিনি তার নিকট থেকে কিছু অস্ত্র ভাড়া নিলেন।
যুদ্ধের দিন মুসলিমদের সাথে সফওয়ানও তার ভাড়া দেওয়া যুদ্ধাস্ত্রের দেখা-শুনার জন্য বেরিয়েছে। হুনাইন যুদ্ধে প্রথমে মুসলিমদের মনোবল ভেঙ্গে গেলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে অসাধারণ ঐশ্বরিক সাহায্য এসেছিল এবং মুসলিমরা এতো বেশি গনীমতের সম্পদ অর্জন করেছে যা আরবের লোকেরা কখনো চোখেও দেখে নি। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে ইতিহাসের কোনো সেনাপ্রধানই যা করেন নি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। তিনি সকল সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বেশি বেশি করে ভাগ করে দিয়ে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। অনেক নও মুসলিমদেরকে মন গলানোর জন্য শত শত উট, বকরী দিয়ে দিলেন, যা তাদের বিবেককেও হয়রান করে দিয়েছে। 226 এমনকি অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমরাও সেদিন লজ্জা-শরম সব ভুলে গিয়ে বারবার চাইলেন, বারবার হাত পাতলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেদিন কারো আবেদনকেই ফিরিয়ে দেন নি, কোনো প্রার্থীকেই বঞ্চিত করেন নি।
সাফওয়ান দূরে দাঁড়িয়ে গনীমতের সম্পদ বণ্টন দেখছে আর আফসোস করছে। সে তো এখনো অমুসলিম, সে তো যুদ্ধাস্ত্রের ভাড়া ছাড়া আর কিছুই পাবে না। কিন্তু এরপরের মুহুর্তে যা ঘটেলো তা সফওয়ান স্বপ্নেও ভাবে নি। উপস্থিতদের মধ্যেও কেউ কল্পনা করতে পারে নি। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই শুনবে অবাক হয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ানকে ডাকলেন। মক্কার অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমদের মতো সাফওয়ানকেও এক শত উট দিয়ে দিলেন! দানশীলতা ও বদান্যতায় বিশ্ব-রেকর্ড করা ব্যক্তি হলেও কোনো মানব সন্তান দ্বারা কি এ ধরণের আচরণ সম্ভব?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, সাফওয়ান হুনাইনের উপাত্যকাগুলোর দিকে স্থীর তাকিয়ে রয়েছে যেগুলো উট ও বকরীতে ভর্তি হয়ে আছে। সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তার মধ্যে হতভম্ব ও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নম্র ও শান্ত স্বরে বললেন, হে আবু ওয়াহাব! তোমার কি এটি (উট ও বকরীতে ভর্তি একটি উপাত্যকার দিকে ইঙ্গিত করে) খুব পছন্দ হয়? সাফওয়ান অতি স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, হ্যাঁ। আর স্বীকার করতেই হবে সে দৃশ্য ছিল বাস্তবেই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অবাক করে দিয়ে একেবারে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, 'এ উপাত্যকা এবং এর মাঝে যত সম্পদ আছে সব তোমার'! 227
বিস্ময় তাকে হতবুদ্ধি করে ফেলল। আজ তার চোখের সামনে সে বাস্তব-সত্য উদ্ভাসিত হয়ে গেছে এতদিন যা সে বুঝতে পারে নি। সে আর কিছুই ভাবতে পারলো না। অকপটেই, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে বলে উঠল, 'নবী স্বত্তা ছাড়া এমন আচরণ আর কেউ করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সেখানেই মুসলিম হয়ে গেলেন। এরপর সফওয়ান ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দিয়েছেন। অনেক অনেক দিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত। আর (নিরাপত্তা, অবকাশ ও অগণিত সম্পদ) 228 দিতে দিতে এখন তিনি হলেন আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 229
কতইনা সৌভাগ্য সফওয়ানের...!
কতইনা সৌভাগ্য বনু জুমাহ গোত্রের যাদের অধিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন...!
কতইনা সৌভাগ্য মক্কাবাসীর...!
কতইনা সৌভাগ্য মুসলিমদের, যাদের দলে মক্কার প্রসিদ্ধ নেতা সফওয়ান ইবন উমাইয়া যোগদান করে আল্লাহর পথের খাঁটি মুজাহিদ হয়ে গেছেন...! আর এসব কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে উট-বকরীতে পূর্ণ একটি উপত্যকার বিনিময়ে।
এ উট ও বকরীগুলোর মূল্য কতই আর হবে?
এগুলো হয়তো খেয়ে ফেলা হবে কিংবা বয়সকালে মারা যাবে...।
শুধু উট ও বকরী কেন, এ ধ্বংসশীল গোটা পৃথিবীর মূল্যই বা কত! চিরসুখের এবং মহা-অমূল্য নি'আমত তো জান্নাতের নি'আমত। আর এ সামান্য এক উপাত্যকা ভর্তি উট-বকরীর বিনিময়ে সফওয়ান থেকে নিয়ে কতগুলো মানুষ চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হয়ে গেলো!
দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনামূলক মান নির্ণয় এবং কিছু গনীমতের মালের বিপরীতে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুচিত, যৌক্তিক ও অতি উন্নত বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা-ধারা নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তুলনা করে তিনি যা স্থীর করলেন এটা কি প্রজ্ঞাময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একশ ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো না?
গনীমতের মালের বিনিময়ে ইসলাম গ্রহণ..।
দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত..।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, গনীমতের মাল যত বেশিই হোক না কেন - একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের বিনিময় হিসেবে কিছুই না। শুধু গনীমতের মালই নয়, গোটা বিশ্বটাই তাঁর কাছে তুচ্ছ। তাই তিনি কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই এতগুলো সম্পদ দিয়ে দিলেন। দুনিয়ার মূল্য তো তাঁর নিকট মাছির ডানা পরিমানও নয়। তাঁর দৃষ্টিতে তো আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হচ্ছে বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ফোটা পানির ন্যায়। দুনিয়াকে তো তিনি ছোট ছোট কান বিশিষ্ট (বিশ্রী) মরা-পঁচা ছাগলছানার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করেন। দুনিয়া সম্পর্কে এসব দর্শন শুধু থিওরিক্যালই নয়; বরং সমসাময়িক সকলেই তাঁর প্রাকটিক্যাল লাইফে এবং সাহাবীদের জীবনেও এর সু-স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মুসলিম কিংবা অমুসলিম যারাই তাঁর সাথে উঠা-বসা চলা-ফেরা করেছেন সকলেই তা লক্ষ্য করেছেন।
হুনাইনের গনীমত থেকে তিনি নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না!
দু-এক বছরের দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা জীবিকা নির্বাহ পরিমাণও না। অথচ তখন তাঁর বয়স ষাটেরও উপরে। তাঁর জন্য কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না দেখে উপস্থিত লোকদের বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পাওয়ার উপক্রম হলো। তারা কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেল। এদিকে গ্রাম্য লোকেরা নিজেদের জন্য কিছু ধন-সম্পদ ও জীব-জন্তু চেয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে ভিড়াভিড়ি ও পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। অথচ তিনি তখন একজন বিজয়ী সম্রাট ও সেনাপতি। ভিড়াভিড়ির ফাঁকে তারা তাঁর শরীরের চাদরটিও নিয়ে নিল। তিনি একজন মমতাময়ী নবী ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অত্যন্ত নম্র ও কোমল স্বরে বললেন,
«أيها الناس! ردوا علي ردائي، فوالذي نفسي بيده لو كان لكم عندي عدد شجر تهامة نعما لقسمته عليكم، ثم لا تجدوني بخيلا ولا جبانا ولا كذابا
"হে লোক সকল! তোমরা আমার চাদর আমাকে ফিরিয়ে দাও, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! আমার নিকট যদি তিহামা ²³⁰ অঞ্চলের/এ নিম্ন ভূমির বৃক্ষরাজি পরিমানও উট থাকতো তাহলে আমি তাও তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম এরপরও তোমরা আমাকে কৃপন, কাপুরুষ ও মিথ্যাবাদী হিসেবে দেখবে না।"²³¹
বাস্তবেও তিনি কোনো কৃপনতা, কাপুরুষতা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি।
এ সব শত্রুনেতাদের সাথে যা ঘটেছে হুবহু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সুহাইল ইবন আমরের ক্ষেত্রেও।

টিকাঃ
২২২. উমায়ের ইবন ওয়াহাব আল-জামহী আল-ক্বারশী। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষাবলম্বী হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো। তবে পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/২৯৪), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৭৯৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৬০৫৮)
২২৩. আবু ফুকাইহা ইয়াসার। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার গোলাম ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তার নিকটে নিপীড়ীত সাহাবীরা তথা খাব্বাব, আম্মার ও আবু ফুকাইহা ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহুম-গণ বসতেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৫/২৪৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১০৩৮৪)।
224. অনুবাদক।
225. পূর্ণ ঘটনাটি ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে (১১৩৩), মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: যুহরী থেকে (১২৬৪৬)
226. মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় নও মুসলিম। ইমানের দুর্বালতা হেতু তাদের পূর্বা জাতিয়তাবোধ যেন তাদেরকে কাফিরদের পক্ষাবলম্বনের দিকে নিয়ে না যায় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া ও তাদের মন গলানোর মতো আচরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন। আবার যেন এতে তারা নিজেদের অধীনস্তদেরকেও ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এদের মধ্যে ছিলেন, আকরা' ইবন হাবিস আত-তামীমী, আব্বাস ইবন মিরদাস আস-সুলামী, উয়াইনাহ ইবন হিসন আল-ফাযারী ও আবু সুফিয়ান ইবন হারব। সূত্র: আল্লামা ইবন মনযূর: লিসানুল আরব (৯/৯)।
227. ইবনু সাইয়্যিদিন নাস: উয়ুনুল আসার (২/২৫৩-৪৩৪)।
228. অনুবাদক।
229. সহীহ মুসলিম: (كتاب الفضائل، باب ما سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا قط فقال: لا وكثرة عطائه) হাদীস নং ২৩১৩।
230. তিহামাহ হচ্ছে নিম্নভূমি/হিজাযের একটি এলাকার নাম সূত্র: আল-মুজামুল ওয়াফী। (৩৩১)। -অনুবাদক।
231. সহীহ বুখারী: (كتاب الخمس، باب ما كان النبي صلى الله عليه وسلم يعطي المؤلفة قلوبهم) : যুবাইর ইবন মুত'ইম সূত্রে হাদীস নং ২৯৭৯, ইবন হিব্বান হাদীস নং ৪৮২০, আমর ইবন শু'আইব থেকে ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুআত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. হাদীস নং ৯৭৭।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 সুহাইল ইবন আমরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 সুহাইল ইবন আমরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


শুধু কুরাইশই নয় গোটা মক্কা নগরীর প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের একজন ছিল এ সুহাইল। সে ঐ সব শত্রুনেতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাদের দীর্ঘ কালো ইতিহাস রয়েছে। অধিক বয়সী ও বহু সন্তানের অধিকারী ছিল। যাদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ী মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর এতদিন তার সাথে যে সব নেতারা ছিল তাদের কারো নিকট থেকেই কোনো সাহায্য পাওয়া গেল না। সকলেই মুসলিম সৈন্যদের সামনে দিয়েই দৌড়ে পালাল। তাই সেও পালিয়ে নিজ ঘরে গিয়ে উঠল। যেমনটি সে নিজেই বর্ণনা করছে,
'সে দিন আমি দৌড়ে এসে আমার ঘরে উঠেই দরজা বন্ধ করে দিলাম!'
সে আরো বর্ণনা করছে, 'অতঃপর আমি বিজয়ী সৈন্যদের মাঝে থাকা আমার ছেলে আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইলের নিকট খবর পাঠালাম যেন সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে নেয়। কেননা আমি আশংকা করছিলাম যে, আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। কারণ, আমি ছিলাম সবচেয়ে দাগী অপরাধী। হুদায়বিয়ার দিন আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যা করেছি অন্য কেউ তা করে নি। আমিই সন্ধি-চুক্তি লিপিবদ্ধ করেছি। আবার উহুদ এবং বদরেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আমি লড়েছি। ²³³
আল্লাহর পথ থেকে লোকদেরকে বিরত রাখার ব্যাপারে তার ইতিহাস ছিল অনেক দীর্ঘ। হুদায়বিয়ার দিন সে ছিল অনেক কঠোর ও একগুঁয়ে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বার বার সুফারিশের পরও তার ছেলেকে মুসলিমদের সাথে যুক্ত হতে সে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সে এমন এক মহা আশংকাজনক অবস্থানে এসে উপনীত হয়েছে যা তার প্রাণকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। মৃত্যুভয় তাকে এমন ভাবে গ্রাস করে নিয়েছে যে, সে তার ছোট ছেলেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে পৌঁছার অসীলাহ হিসেবে গ্রহণ করতেও দ্বিধাবোধ করে নি।
সুহাইল ইবন আমরেরই বর্ণনা: “(আমার ছেলে) আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তাকে (আমার বাবাকে) নিরাপত্তা দান করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো দ্বিধা-দন্ধ না করেই বললেন, ‘সে আল্লাহর নিরাপত্তা দ্বারা নিরাপদ, সে বাইরে আসতে পারে’। ”²³⁴
বর্তমান পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তখন সেখানে তারা যেরূপ আচরণ করে থাকে তার সাথে মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিপক্ষ নেতাদের সাথে আচরণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আমরা দেখতে পাই যে, পরাজিত রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ভাগ্যে হত্যা, দেশান্তর কিংবা দীর্ঘ মেয়াদী জেল-যুলুম ছাড়া আর কিছুই জোটে না। আর লাঞ্চনা ও অপদস্থতার কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুনেতাদেরকে শুধু নিরাপত্তাই দেন নি; বরং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং যাবতীয় নিন্দাবাদ এমনকি কটাক্ষ দৃষ্টির অবসান কল্পেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। চূড়ান্ত সভ্যতা ও অসাধারণ মানবতা প্রদর্শনপূর্বক সাহাবীদেরকে তিনি বলছেন,
«فمن لقي سهيل بن عمرو فلا يشد النظر إليه»
"সুহাইল ইবন আমরের সাথে সাক্ষাৎ হলে তোমাদের কেউ যেন তার দিকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে না তাকায়।"²³⁵
দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যের বিপদে আনন্দ প্রকাশের ভিত্তিতে হোক কিংবা শত্রুকে কাছে পেয়ে মনোতুষ্টি লাভের ভিত্তিতে কোনোভাবেই সুহাইলের প্রতি কটু দৃষ্টিপাত করতে সাহাবীদেরকে নিষেধ করেছেন। বরং আরো আগে বেড়ে তিনি তার প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করছেন। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন, "সুহাইল একজন জ্ঞানী ও সম্মানী মানুষ। সুহাইলের মতো ব্যক্তির ইসলামকে অনুধাবন না করে থাকার কথা না। সে বুঝতে পেরেছে যে, এতোদিন সে যার ওপর প্রতিস্থাপিত ছিল তা তার জন্য উপকারী নয়।"
সুবহানাল্লাহ! এ জাতীয় বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করার ভাষা আমাদের নেই। আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল পিতাকে নিরাপত্তা প্রাপ্তির সংবাদ দিতে গিয়ে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব বক্তব্যের কথা বললেন, তখন সুহাইল বলে উঠল, 'আল্লাহর শপথ! তিনি ছোট-বড় সকলের সাথেই সদাচারী'। ²³⁶
সুহাইল ইবন আমর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং ইসলামের পরশে ধন্য হলেন। পরবর্তী জীবনকে তিনি পরিপূর্ণাভাবে পাল্টে ফেললেন। যেমনটি বিভিন্ন রেওয়ায়াতে পাওয়া যায় যে, তিনি খুব বেশি বেশি সালাত আদায়, সাওম পালন ও দান-সদকা করতেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের একটি গ্রুপের প্রধান ছিলেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৃষ্টিকর্ম দেখুন, কীভাবে তিনি মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। যা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। এটা একমাত্র সদাচরণ, অন্তরের প্রসস্ততা ও উদারতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতা ভুলে যাওয়ার কারণেই হয়েছ।

টিকাঃ
232. আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল ইবন আমর আল-ক্বারশী আল-আমেরী। উপনাম আবু সুহাইল। দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। মক্কায় ফিরে আসার পরে তার পিতা তাকে ধরে বেঁধে রাখে এবং ইসলাম গ্রহণের কারণে অনেক নির্যাতন করে। বদর যুদ্ধের দিন তিনি ইসলামের কথা গোপন রেখে তার পিতার সাথে বেরিয়েছেন। যুদ্ধমাঠে এসে মুশরিকদের পক্ষ ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হয়ে যান। ১২ হিজরীতে ইয়ামামার ঘটনার দিন শহীদ হন। অধিকতর জানতে- ইবন আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৪৭৩৪)।
233. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/২১৯)।
234. ইবন আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৩/২১৯)।
235. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/৩৪৬)।
236. ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭)।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ফুযালাহ ইবন উমায়রের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 ফুযালাহ ইবন উমায়রের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


ফুযালাহ ইবন উমায়েরও ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোরতর শত্রুদের একজন। তার শত্রুতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। সেটি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ষড়যন্ত্র। সেদিন সেনানায়ক হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ হাজার সাহাবীদের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিলেন। ফুযালাহ নিশ্চিত জানতো যে, এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলে তার প্রাণে রক্ষা নেই। তারপরও সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে তৈরী হয়ে গেল...।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ করছিলেন। ফুযালাহ পোষাকের নিচে তরবারী লুকিয়ে রেখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশে পাশে ঘুরাঘুরি করছিলো। যখন খুব নিকটবর্তী হলো তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, 'ফুযালাহ নাকি?' সে বলল, 'হ্যাঁ আমি ফুযালাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!' (ঐ সময় সে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিমদের বেশ ধরে ছিল)।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি মনে মনে কী ভাবছ?
ফুযালাহ বলল, না না কিছু না, আমি আল্লাহর যিকির করছিলাম।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেঁসে ফেললেন এবং বললেন, ফুযালাহ, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। অতঃপর তিনি তার বক্ষে হাত রাখলেন। ফলে তার অন্তর প্রশান্ত হয়ে গেল। সে নিজেই বর্ণনা করছেন, 'তিনি আমার বক্ষ থেকে হাত উঠানোর সাথে সাথেই আমার অনুভব হলো যে, পৃথিবীতে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি তিনিই'। ²³⁷
এটা ছিল ঐ ব্যক্তির সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ যে তাঁকে হত্যা করার পরিকল্পনাই করে নি শুধু; বরং তা বাস্তবায়নের চেষ্টাও করেছে এবং তরবারী বহন করে তার কাছাকাছিও চলে এসেছিলো। যদি না আল্লাহ তাঁর রাসূলকে হিফাযত করতেন।

টিকাঃ
237. ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/৩৪২)।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 হিন্দ বিনত উতবা-র সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 হিন্দ বিনত উতবা-র সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


হিন্দ বিনত উতবাহ-র সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণের ঘটনাটিও উল্লিখিত ঘটনাবলীর চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে ঐ সব মহিলাদের একজন, যারা দীর্ঘকাল ইসলাম বিরোধী সংগ্রামে ব্রতী ছিল। মুসলিমদের মনে তাকে নিয়ে অনেকগুলো পীড়াদায়ক স্মৃতি জমে আছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনেও। সে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু-র স্ত্রী এবং প্রসিদ্ধ কুরাইশ নেতা উতবাহ ইবন রবী'আর মেয়ে। ইসলামের প্রথম দিন থেকেই সে প্রচণ্ড ইসলাম বিদ্বেষী ছিল। কিন্তু বদর যুদ্ধের পরে তা আরো বহু গুণে বেড়ে যায়। কারণ, বদর যুদ্ধে তার পিতা উতবাহ ইবন রাবী'আহ, তার চাচা শাইবাহ ইবন রবী'আহ, তার ছেলে হানযালা ইবন আবু সুফিয়ান ও তার ভাই ওয়ালীদ ইবন উতবাহ নিহত হয়েছিল। এ চারজনই তার অতি নিকটাত্মীয় এবং কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তাই এদের নিহত হওয়ার ঘটনা তার মনে অভাবনীয় ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বদর থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত সে এ ক্ষোভ লালন করে এসেছে। উহুদ যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর সাথে সেও এসেছিল। সে তাদের বাহিনীকে সাধ্য অনুযায়ী মুসলিম নিধনে উত্তেজিত করতো। যুদ্ধের প্রথম দিকে যখন কুরাইশরা মুসলিমদের সামনে থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলো তখন সে তাদের চেহারায় বালি নিক্ষেপ করছিলো এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছিলো। কুরাইশ পুরুষদের মতো সে ময়দান থেকে পালিয়েও যায় নি...!! শেষের দিকে যখন কুরাইশদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন সে একটি অত্যন্ত জঘন্যতম নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সে একর পর এক মুসলিম শহীদদের লাশগুলোর রূপ বিকৃত করতে থাকে। একাধারে সে সকল লাশের নাক-কান কাটতে থাকে। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হামযা ইবন আব্দুল মুত্তালিবের লাশের সামনে গিয়ে স্থীর হয় এবং তার পেট বিদীর্ণ করে কলিজা বের করে আনে। প্রচণ্ড বিদ্বেষে উত্তেজিত হয়ে এক পর্যায়ে সে কলিজার একাংশ চাবাতে শুরু করে। পরে স্বাদ অনুভব না করায় দূরে ছুড়ে মারে..!!
এ দৃশ্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কঠিনভাবে প্রভাবিত করেছে এবং তার মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিকৃত লাশের নিকট দাঁড়ালেন তখন মনে হলো এর চেয়ে বেদনাদায়ক কোনো দৃশ্য তিনি আর কখনো দেখেন নি। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বললেন, "হে চাচা! আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, আপনি ছিলেন অধিক আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী এবং অধিক দান-খয়রাতকারী। "²³⁸
প্রিয় পাঠক! হিনদ বিনত উতবাহ-র ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্রোধের পরিমাণটা এবার আপনি একটু কল্পনা করুন। আবার সে আহযাবের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিল; বরং মক্কা বিজয়ের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সব সময় সে ইসলামের বিরুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এমনকি মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে তার স্বামী আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দুর্বলতা প্রদর্শন করছিল এবং নিরাপত্তার জন্য সকলকে নিজ ঘরে প্রবেশের আহ্বান করছিল তখন সে তার বিরোধিতা করেছিল। মক্কাবাসীকে আবু সুফিয়ানের হত্যা ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল। ²³⁹
সে অনেক দীর্ঘ ইতিহাস। মুসলিমদের সাথে এ মহিলার দুর্বৃত্তির উপাখ্যান অনেক বিস্তৃত। এরপরও হাজারো বাধা-বিপত্তির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয় করে নিলেন। চতুর্দিক থেকে মক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আসছেন আর বায়'আত গ্রহণ করছেন। অনেক দিন পর হিন্দ বিনত উতবাহও ঘোমটা পরে নিজের বেশ-ভূষা পাল্টিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আসল। তার ইচ্ছা ছিল, সাধারণ মহিলাদের ভিড়ে সেও বায়'আত গ্রহণ করে নিবে। সে সময় মহিলাদের বায়'আত ছিল তারা এ মর্মে শপথ করবে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা-ব্যভিচার করবে না, নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, কারো ওপর মিথ্যা অপবাদ দেবে না এবং সৎ কাজের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হবে না।
হিন্দ বিনত উতবাহ-র অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তি মাত্রই তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমনের কথা কল্পনাও করতে পারবে না। সবার একই ধারণা যে, সে নিশ্চিত হত্যার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু, বাস্তব অবস্থা ছিল মানুষের সকল চিন্তা-ভাবনারও অনেক ঊর্ধ্বে। চলুন, দেখি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথে কী আচরণ করেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একসাথে অনেক মহিলার বায়'আত গ্রহণ করছিলেন। তিনি তাদেরকে বললেন,
بايعنني على ألا تشركن بالله شيئا
"তোমরা আমার হাতে এ মর্মে বায়'আত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না।”
হিনদ বিনত উতবাহ মুখোষ পরা অবস্থাতেই বলে উঠল, (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখনো তাকে চিনতে পারেন নি) আল্লাহর শপথ! আপনি আমাদের বেলায় এমন কিছু বাড়াবাড়ি করছেন যা পুরুষদের বেলায় করেন না। (অর্থাৎ, পুরুষরা শুধু একটি বাক্য দ্বারা মুসলিম হয়ে যায়, কিন্তু মহিলাদেরকে বিস্তারিতভাবে অনেক কথার শপথ করানো হয়)।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আপত্তির দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে শপথ বাক্য পূর্ণ করার দিকে এগুলেন এবং বললেন,
ولا تسرقن»
"এবং তোমরা চুরি করবে না।"
এখানে এসে হিনদ চুপ হয়ে গেল (এ বাক্য পাঠ করল না)। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান অত্যন্ত কৃপণ মানুষ। সে আমার ও সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচ দেয় না। আমি কি তার অনুমতি ব্যতীত তার সম্পদ থেকে আমাদের প্রয়োজন পরিমাণ খরচ করতে পারবো?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সততার সাথে তোমার ও সন্তানদের একান্ত প্রয়োজন পরিমান সম্পদ তুমি খরচ করতে পারবে।"²⁴⁰
এতক্ষণে তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। বুঝতে পারলেন যে, তিনি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিনদ বিনত উতবাহ-র সাথেই এতক্ষণ কথা বলছেন। চমকে উঠে বললেন, 'তুমিই কি হিনদ বিনত উতবাহ?' সে বলল, হ্যাঁ, আমি হিনদ বিনত উতবাহ, অতীতের সব কিছুর জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।
এ মুহুর্তটি হিনদ এর জীবনের বাঁচা-মরার চূড়ান্ত ফয়সালার মুহুর্ত। দেখা যাক রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সকল অতীত ইতিহাসকে স্মরণ করে বিশেষ করে চাচা হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার কার্যকলাপের স্মৃতিচারণ করে তার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন?
কিন্তু তিনি নিজ স্বভাবজাত অবস্থানে অটল ছিলেন। অতীতের পীড়াদায়ক স্মৃতিগুলো নিয়ে একটি মন্তব্যও করলেন না; বরং সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে তার ইসলাম গ্রহণকে আন্তরিকভাবে মেনে নিলেন এবং যেন তার সাথে কিছুই হয় নি -এমন ভঙ্গিতে অন্যান্য মহিলাদের সাথে তারও বায়'আত পূর্ণ করার দিকে এগিয়ে গেলেন, বললেন,
«ولا تزنين»
"এবং তোমরা যিনা-ব্যভিচার করবে না।"
হিনদ বিনত উতবাহ আপত্তি উত্থাপন করেই যাচ্ছে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভ্রান্ত মহিলারা কি যিনা-ব্যভিচার করে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথায়ও কান দিলেন না। বায়'আতের পরবর্তী বাক্য বললেন,
«ولا تقتلن أولادكن» "এবং নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।"
হিনদ বলে উঠল, সন্তানদেরকে তো আমরা ছোটকালে লালন-পালন করে দিয়েছি আর বড় হওয়ার পর আপনি তাদেরকে মেরে ফেললেন। বদরের দিন কি আপনি আমাদের কোন সন্তান বাকি রেখেছেন? আপনি বদর যুদ্ধে সন্তানদের পিতাদেরকে হত্যা করে এখন বলছেন আমরা যেন সন্তান হত্যা না করি। (হত্যা করার জন্য সন্তান আমরা পাবো কোথায়?) এখানেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নি। এ কথাও বলেন নি যে, বদরে আমরা তাদেরকে কেন হত্যা করেছি? তাদেরকে কি এজন্য হত্যা করা হয় নি যে, তারা ছিল মুশরিক-যাদের মধ্যে তোমার বাবা, চাচা, ভাই এবং ছেলেও ছিল। যারা দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা আমাদেরকে আমাদের দীন থেকে বিচ্যুত করার ধান্ধায় থাকতো। যারা আমাদের ওপর অত্যাচারের স্টীম-রোলার চালিয়ে ছিল। আমাদেরকে দেশান্তর করে আমাদের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ দখল করে নিয়েছিলো?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোর কিছুই বললেন না; বরং তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল অসাধারণ। তিনি মুসকি হাঁসলেন এবং বিষয়টিকে অত্যন্ত সহজভাবে নিলেন। হিনদ বিনত উতবাহ-র অবস্থান হিসেবে তার উপর আঘাত হানা ইসলামের পদক্ষেপগুলো কঠিনই ছিল। বিষয়টি তিনি বিবেচনায় নিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ولا تأتين ببهتان تفترينه بين أيديكن وأرجلكن
"এবং তোমরা নিজেদের পক্ষ থেকে বানিয়ে কারো ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে না।"
হিনদ বিনত উতবাহ বলল, আল্লাহর শপথ! অপবাদ আরোপ করা আসলেই অত্যন্ত মন্দ কাজ।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ولا تعصينني في معروف
"সৎ কাজের ক্ষেত্রে আমার অবাধ্য হবে না।"
হিনদ বলল, আল্লাহর শপথ! আপানার অবাধ্য হওয়ার মানসিকতা নিয়ে আমাদের কেউ এখানে বসে নি। ²⁴¹
এভাবেই মক্কার নারীরা এ বরকতময় বায়'আতের মাধ্যমে চির সুখের জান্নাত পানে যাত্রা শুরু করেন। যাদের মধ্যে হিনদ বিনত উতবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা- ও ছিলেন।
কত মহান আমার আল্লাহ যিনি অন্তরসমূহের গতি-প্রকৃতির মালিক। হিনদ বিনত উতবাহ কতইনা আন্তরিকভাবে ইসলামকে গ্রহণ ও বরণ করে নিয়েছেন। আগে যেমন কাফির সৈনিকদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য যুদ্ধে যেতেন ইসলাম গ্রহণের পর তার চেয়ে আরো অনেকগুণ বেশি আগ্রহের সাথে মুজাহিদদেরকে কাফিরদের বিরুদ্ধে উৎসাহিত করার জন্য জিহাদের ময়দানে অংশ গ্রহণ করতেন। এ ব্যাপারে তিনি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছেন ইয়ারমুকের দিন। দুই লক্ষ্য রোমীয় সৈন্যের মুকাবিলায় সাহাবীদের প্রলয়ংকরী সে যুদ্ধে ভিড়ের ভেতরে প্রবেশ করে মুজাহিদদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টিতে তার অসামান্য অবদান ছিল সেদিনের সফলতার কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম।
হিন্দ বিনত উতবাহ-র মাধ্যমে উম্মতে মুসলিমার অগ্রযাত্রা আরো এক ধাপ বেড়ে গেল। যার সুচনায় ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি অমায়িক সদাচরণ। এমনিভাবে যেসব ঘোরতর শত্রুরা পরিশেষে খাঁটি বন্ধুতে পরিণত হয়েছেন তাদের অনেকেরই এ পথে আসার শুভ-সূচনা হয়েছিল তাঁর এ অনন্য গুণ-বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই।

টিকাঃ
238. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৬০৪)।
239. ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/৩২৪)।
240. صحيح البخاري: كتاب البيوع، باب من أجرى أمر الأمصار على ما يتعارفون بينهم في البيوع ) والإجارة( حديث رقم ٢٠٥٩ ، صحيح مسلم: )كتاب الأقضية، باب قضية هند( حديث رقم ١٧١٤।
241. ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/৩৫৪-৩৫৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00