📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 আবু সুফিয়ানের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 আবু সুফিয়ানের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


আবু সুফিয়ান কুরাইশের একজন সাধারণ ব্যক্তি ছিল না। তাকে প্রজ্ঞা ও দক্ষ নেতৃত্বের জন্য প্রসিদ্ধির শীর্ষে থাকা কয়েকজনের মধ্যে গণ্য করা হতো এবং ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু হওয়ার পরে সে নিরপেক্ষ ছিল না; বরং ইসলামের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছিল এবং ইসলামের ক্রমবৃদ্ধি ও অগ্রসরমানতাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সাধনায় লিপ্তদের মধ্যে আবু সুফিয়ান ছিল অন্যতম। ঐতিহাসিক আল্লামা তাবারী হিজরতের পূর্বে দারুন-নাদওয়াতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা পরিকল্পনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আবু সুফিয়ানের নামও উল্লেখ করেছেন। ¹⁹¹ মাদানী জীবনে উবায়দাহ ইবন হারেসের ¹⁹² নেতৃত্বে ইসলামের প্রথম সারিয়‍্যায়' ¹⁹³ (যুদ্ধাভিযানে) মক্কার কাফিরেদর সেনাপ্রধান ছিল এ আবু সুফিয়ান। সে কাফির সৈন্যদেরকে 'সানিয়‍্যাতুল মুররাহ' ¹⁹⁴ নামক স্থানে একত্রিত করেছিল। যে বণিক কাফেলাকে কেন্দ্র করে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল-আবু সুফিয়ান ছিল সে কাফেলার প্রধান এবং সে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিল। বদর যুদ্ধে শীর্ষ ও নেতৃস্থানীয় কাফিরদের সত্তর জন নিহত হওয়ার সুবাদে কুরাইশের সকল শাখার একমাত্র নেতৃত্ব আবু সুফিয়ানের হাতে এসে যায়। মক্কার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা এবং এজন্যই আবু সুফিয়ান ইসলাম বিরোধী যুদ্ধে কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহের একমাত্র সংগঠক ও সমন্বয়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বদরের যুদ্ধে তার এক পুত্র (হানযালাহ) নিহত হয় এবং অপর পুত্র (আমর) মুসিলমদের হাতে বন্দি হয়। ¹⁹⁵ ফলে তার প্রতিহিংসার আগুন আরো জলে ওঠে এবং সে সব সময় এ চেষ্টায় থাকত যে, সে নিজ হাতে একজন বিখ্যাত সাহাবী সা'দ ইবন নু'মান ইবন আকাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বন্দি করে তার পুত্রকে বন্দি করার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। সে এ মর্মে শপথ করেছে যে, মুহাম্মাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে স্ত্রী-সঙ্গম করবে না। বাস্তবেও করেছে তাই। দুইশত অশ্বারোহীকে একত্র করে রাতের অন্ধকারে মদীনার ওপর অতর্কিত হামলা করে বসে। এতে দুইজন আনসারী সাহাবী শহীদ হন। ¹⁹⁶ ইতিহাসে এটিকে গাযওয়াতুস-সুয়াইক নামে নামকরণ করা হয়। ¹⁹⁷ উহুদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ান মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে তিন হাজার কাফির সৈন্যের নেতৃত্বে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। উহুদ হচ্ছে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকট ও মুসীবতের ইতিহাস। যুদ্ধের শুরুতে সাহায্য আসলেও শেষের দিকে তা আবার মুসীবতে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং কাফিরদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। সেদিন সত্তরজন মুসলিম শহীদ হন। আবু সুফিয়ান সেদিন সালামা ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ¹⁹⁸ হত্যা করে। ¹⁹⁹ কেউ কেউ বলেন, গাসীলুল মালাইকাহ হানজালাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও²⁰⁰ আবু সুফিয়ানই হত্যা করেছিল এবং বলেছিল যে, 'হানযালার বিনিময়ে হানযালাহ'। অর্থাৎ আমার পুত্র হানযালার প্রতিশোধে সাহাবী হানযালাহকে হত্যা করা হয়েছে।²⁰¹ সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিলো আরবের যুদ্ধরীতিকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সেদিনের তার নির্লজ্জ উল্লাস প্রকাশের সে স্মৃতি। সেদিন উহুদ যুদ্ধের সমাপ্তি লগ্নে তার এবং মুসলিমদের মাঝে প্রত্যক্ষ কথোপকথন চলছিল। ইমাম বুখারী রহ. ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন যে, "উহুদের দিন যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর আবু সুফিয়ান একটি উঁচু স্থানে উঠে বলল, কাওমের মধ্যে মুহাম্মাদ জীবিত আছে কি? একথা সে তিনবার বলল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার কোনো উত্তর দিও না। সে আবার বলল, কাওমের মধ্যে ইবন আবু কুহাফা (আবু বকর) বেঁচে আছে কি? একথাও সে তিনবার বলল। সে পুনরায় বলল, কওমের মধ্যে ইবনুল খাত্তাব কি জীবিত আছে? একথাও সে তিনবার বলল। তারপর সে তার সাথীদের দিকে ফিরে বলল, এরা সকলেই নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকলে নিশ্চয় জবাব দিত। এ সময় উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিজেকে সামলাতে না পেরে বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। যে জিনিসে তোমাকে লাঞ্ছিত করবে আল্লাহ তা বাকি রেখেছেন'। পরিশেষে আবু সুফিয়ান বলল, আজকের দিন বদর যুদ্ধের বিনিময়ের দিন, যুদ্ধ কূপ থেকে পানি উঠানোর পাত্রের মতো (অর্থাৎ একবার এক হাতে আরেকবার অন্য হাতে)। (যুদ্ধের ময়দানে) তোমরা নাক-কান কাটা কিছু লাশ দেখতে পাবে। আমি এরূপ করতে আদেশ করি নি। অবশ্য আমি এতে অসন্তুষ্টও নই। অতঃপর সে চিৎকার করতে লাগল, 'হুবালের জয়, হুবালের জয়'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা তার উত্তর দাও। তারা বললেন, আমরা কী বলব? তিনি বললেন, তোমরা বল 'আল্লাহ সমুন্নত ও মহান'। আবু সুফিয়ান বলল 'আমাদের উযযা আছে, তোমাদের উযযা নেই'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার জবাব দাও। তারা বললেন, আমরা কী জবাব দেব? তিনি বললেন, বল 'আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের তো কোনো অভিভাবক নেই'। ²⁰²
এ কথোপকথনে আবু সুফিয়ান মুসলিম শহীদদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকৃতি, নাক-কান কাটা হওয়া ও পেট বিদীর্ণ হওয়ার প্রতি তার আনন্দ ও মনোতুষ্টি প্রকাশ করেছে। অথচ আরবরা জাহেলী যুগে কিংবা ইসলাম পরবর্তী যুগে কোনো কালেই এটি পছন্দ করতো না। এ সব কিছু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করা এবং তাদের ওপর ধ্বংসলীলা চালানোর প্রতি তার মনস্কামনা ও আগ্রহাতিশেয্যরই বহিঃপ্রকাশ।
যায়েদ ইবন দাসানাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ²⁰³-এর হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত হয়ে মুসলিমদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে গাদ্দারী-নীতি অবলম্বনের স্পষ্ট স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে তার এ মানসিকতা আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ²⁰⁴ শুধু তাই নয়, আবু সুফিয়ানের এ মানসিকতার সর্ববৃহৎ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পঞ্চম হিজরীতে সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদীনা অবরোধের সময়। সে অবরোধের সময় দশ হাজার কাফির সৈন্যের নেতৃত্বে থাকা আবু সুফিয়ানসহ সকলে মিলে মদীনাকে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম-শূন্য করে ফেলতে চেয়েছিল। শান্তি ও স্বস্তির শহর মদীনাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করা এবং সেখানকার ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকলকে ভীতি ও আতংকগ্রস্থ করে তোলার জন্য কাফিরদের সকল শাখা-উপশাখাকে সমবেত করা ছিল ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের এক ক্ষমার অযোগ্য মহা অপরাধ।
অষ্টম হিজরী পর্যন্ত আবু সুফিয়ান মক্কার অধিপতি ছিল। এর দু বছর পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। সন্ধি-চুক্তিতে বনু বকর গোত্র মুশরিকদের এবং খযা'আহ গোত্র মুসলিমদের পক্ষ অবলম্বন করে। অতঃপর বনু বকর কর্তৃক প্রসিদ্ধ সেই চুক্তিভঙ্গের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে এবং খোয'আহ গোত্রের কয়েকজন লোক নিহত হয়। এ ক্ষেত্রে কুরাইশরা বনু বকরকে সহযোগিতা করেছিল।²⁰⁵ ফলে হুদায়বিয়ার সন্ধি রহিত হয়ে যায় এবং এখান থেকেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ হাজার সাহাবীদের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয়ের অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঘটনা অনেক দীর্ঘ। বিস্তারিত বিবরণও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের লক্ষণীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে যে, ইসলাম বিরোধী যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ভূমিকা ছিল অন্যান্য শত্রুনেতাদের তুলনায় অনেক বেশি এবং মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে তার অবস্থান ছিল সকলের শীর্ষে।
প্রিয় পাঠক! এ সকল জটিল প্রেক্ষাপটগুলোকে মনের পর্দায় মেলে ধরুন! অতঃপর মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশের প্রাক্কালে গ্রেফতারকৃত আবু সুফিয়ানকে হাতে পেয়ে তার সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীরূপ আচরণ করেছিলেন সেদিকে দৃষ্টিপাত করুন! এ বিষয়ে ইসলামের সুমহান দর্শন ও নবী চরিত্রের মাহাত্ম্য ভালোভাবে অনুধাবনের জন্য আমরা পুরো ঘটনাটি সবিস্তারে উল্লেখ করছি-
যুগ পাল্টে গেছে। সময় বদলেছে অনেক। আবু সুফিয়ান তার জীবনের অত্যন্ত সংকীর্ণ অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। তার যাবতীয় কর্ম-তৎপরতা থেমে গেছে। সব ধরণের চিন্তা-ফিকির থেকেও সে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছে। এটা ঐ সময়ের কথা যখন মক্কার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে হঠাৎ করে মুসলিমদের বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হয়েছে এবং আবু সুফিয়ান ভালো করেই জানে যে, সে হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের প্রধান টার্গেট। ঐ সময় সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানতে মরিয়া হয়ে উঠলো এবং এক ধরণের ভীতি ও আতংক তাকে গ্রাস করে নিলো। ইতোমধ্যে সে তার এক পুরোনো দিনের বন্ধু-যিনি বর্তমানে মুসলিমদের দলভুক্ত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সামনে পেয়ে গেল। তখন তার সাহায্য কামনা করে বলে উঠল, 'আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক, এখন উপায়?'
এরপরে মক্কার এ শত্রুনেতা ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে যা ঘটেছিল চলুন তা আমরা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এর ভাষায় পাঠ করি-
সে দিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আবু সুফিয়ানকে বললেন,
«والله لئن ظفر بك ليضربن عنقك ..!!»
"আল্লাহর শপথ! তোমাকে গ্রেফতার করতে পারলে তো অবশ্যই তোমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে।"
এটি ছিলো আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। শুধু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-ই নন, ইসলামের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের অবস্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত যে কোনো ব্যক্তিই আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে এ একই কথা বলবে। কিন্তু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আবু সুফিয়ানের সাথে পূর্ব বন্ধুত্বের কারণে কিংবা কুরাইশদের প্রাণ রক্ষার প্রতি অত্যাধিক আগ্রহের কারণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবু সুফিয়ানের জন্য সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং বললেন, 'তুমি আমার সাথে এ খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে চল। আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাব এবং তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে নেব'। তাই আবু সুফিয়ান আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-র সাথে সওয়ার হলো। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, অতঃপর আমি তাকে নিয়ে রওয়ানা করলাম। যখনি মুসলিমদের কোনো আগুনের/মশালের/চুলার পাশ দিয়ে যেতাম তখনই তারা বলতো, 'কে এখানে?' পরে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চর এবং তাতে তাঁর চাচাকে দেখতে পেত তখন বলতো, 'এটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চর এবং এতে রয়েছে তাঁরই চাচা। এক পর্যায়ে আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর আগুনের/মশালের/চুলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, 'কে এখানে?' এ কথা বলে আমার দিকে এগিয়ে এসে খচ্চরের পেছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে চিনে ফেললেন এবং বলে উঠলেন, 'আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর দুশমন! সমস্ত প্রশংসা সে আল্লাহর যিনি তোকে পাইয়ে দিয়েছেন'। এ কথা বলেই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবুর দিকে দৌড়ে ছুটলেন। আমিও খচ্চরকে ছেড়ে দিলাম এবং ধীরগামী আরোহী ধীরগতির বাহনজন্তুকে যতটুকু পেছনে ফেলতে পারে ততটুকু খচ্চরকে পেছনে রেখে এগিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে প্রবেশ করলাম। ইতিমধ্যে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুও প্রবেশ করেছেন এবং বলছেন, 'এ হলো আল্লাহর দুশমন আবু সুফিয়ান, কোনো প্রকার শান্তি/সন্ধি চুক্তিকালীন সময়ের বাইরে আল্লাহ তাকে আমাদের হাতে এনে দিয়েছেন। সুতরাং আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই।'
তখন আমি (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে বসলাম এবং তার মাথায় হাত রেখে বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আজ রাতে আমি ছাড়া তাঁর সাথে আর কেউ একান্ত আলাপ করতে পারবে না'। উমার যখন বারবার একই কথা বলছিলেন তখন আমি তাকে বললাম, চুপ কর, হে উমার! আল্লাহর শপথ! যদি এ লোকটি বনু আদী গোত্রের কেউ হতো তাহলে তুমি এরূপ বলতে না। কিন্তু এ লোকটি হচ্ছে বনু আবদে মানাফ গোত্রের'। এটা শুনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আপনি চুপ করুন, হে আব্বাস! আপনি এ ধরণের কথা বলবেন না। আল্লাহর শপথ!
আপনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখন আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার বাবা খাত্তাব যদি ইসলাম গ্রহণ করতেন তার ইসলাম গ্রহণের চেয়েও অধিক প্রিয় ছিল। আর এটা এ জন্য যে, আমি জানতাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার বাবা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক প্রিয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আব্বাস! তুমি তাকে তোমার তাবুতে নিয়ে যাও, সকালে আমার নিকট নিয়ে এসো'। অতঃপর আমি তাকে আমার তাবুতে নিয়ে গেলাম। সে আমার নিকট রাত্রি যাপন করল। পরদিন সকালে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলে তিনি তাকে দেখেই বললেন,
«وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ، أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟»
"হে আবু সুফিয়ান! তোমার মঙ্গল হোক। তোমার কি এখনও এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আসে নি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই?"
আবু সুফিয়ান বলল, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি কতই না সম্মানিত, কতই না ধৈর্যশীল আর কতই না উত্তম সম্পর্ক স্থাপনকারী! এখন তো আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, যদি আল্লাহর সাথে কোনো মা'বুদ শরীক থাকত তবে অবশ্যই আমার কোনো কাজে আসত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ، أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ؟»
"হে আবু সুফিয়ান! তোমার মঙ্গল হোক, এখনও কি তোমার সময় আসে নি যে, আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস করবে?"
আবু সুফিয়ান বলল, 'আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি কতই না সম্মানিত, কতই না ধৈর্যশীল আর কতই না আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী! এ ব্যাপারে এখনও মনে কিছুটা খটকা রয়েছে'। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবু সফিয়ান, তোমার নাশ হোক! তোমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার আগেই মুসলিম হয়ে যাও এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা'বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল'।
এবার আবু সুফিয়ান কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুটা সম্মানপ্রিয় মানুষ। সুতরাং তাকে বিশেষ একটা কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে, যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ থাকবে, (এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থাকবে। ²⁰⁶) অতঃপর আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মক্কাবাসীকে এ সংবাদ দেওয়ার জন্য চলে যেতে উদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
يَا عَبَّاسُ، احْبِسُهُ بِمَضِيقِ الْوَادِي عِنْدَ حَظْمِ الْخَيْلِ ²⁰⁷، حَتَّى تَمُرَّ بِهِ جُنُودُ اللَّهِ
"হে আব্বাস! তাকে বাহিনীর ভিড়ের নিকট (অথবা নাকের মতো পাহাড়ের সেই বাড়তি অংশের ওপর) দাঁড় করাও যে দিকে পাহাড়ি সরুপথ গিয়েছে, যাতে সে আল্লাহর বাহিনীগুলো অতিক্রম করার দৃশ্য অবলোকন করতে পারে।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মতে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে নিয়ে সেখানে দাড়ালেন। (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন) প্রতিটি গোত্র নিজেদের বাহনজন্তুতে আরোহন করে অতিক্রম করছিল। যখনই কোনো গোত্র অতিক্রম করতো তখন তিনি বলতেন, এরা কারা? আমি বলতাম, বনু সালীম। তিনি বলতেন, বনু সালীমের সাথে আমার কী সম্পর্ক? অতঃপর অন্য গোত্র অতিক্রম করলে তিনি বলতেন, এরা কারা? আমি বলতাম, মুযাইনাহ। তিনি বলতেন, মুযাইনাহর সাথে আমার কী সম্পর্ক? তিনি এভাবেই বলছিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহিনী অতিক্রম করল যা বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্রের দরুন কালো বর্ণ দেখাতে লাগল। সেখানে আনসার এবং মুহাজিররা ছিলেন। লোহার বর্ম ও শিরস্ত্রাণের দরুন চক্ষু ছাড়া তাদের আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, এরা কারা? আমি বললাম, মুহাজির ও আনসারদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বললেন, 'কার ক্ষমতা আছে এদের মুকাবিলা করে? আল্লাহর শপথ! তোমার ভাতিজার রাজত্ব আজ অনেক বড় আকার ধারণ করেছে।' আমি বললাম, হে আবু সুফিয়ান! এটি হলো নবুওয়াত। তিনি বললেন, তা ঠিক। আমি বললাম, 'এবার দ্রুত আপনার কওমের নিকট যান'। এরপর তিনি চলে গেলেন এবং মক্কায় প্রবেশ করে ঘোষণা করতে লাগলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে গেছেন। তোমরা তাঁর মুকাবিলা করতে পারবে না। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাহ এ ঘোষণা শোনে এগিয়ে এলো এবং তার দাঁড়ি ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, اقْتُلُوا الدَّسَمَ الأَحْمَسَ ²⁰⁸، فَبِئْسَ طَلِيعَة قَوْمٍ!
"তোমরা এ কুশ্রী ইতরকে হত্যা করে দাও। হায়! কতই না খারাপ লক্ষণ!"
আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'তোমাদের নাশ হোক! এ মহিলা যেন তোমাদেরকে জীবন রক্ষা করা থেকে ধোকায় না ফেলে। যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ'। লোকেরা বলল, 'তোমার নাশ হোক, তোমার ঘরে আমাদের কী হবে?' তিনি বললেন, 'যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সেও নিরাপদ এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ'। এটা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর ও মসজিদের দিকে বিভক্ত হয়ে ছুটতে লাগল। ²⁰⁹
এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য উদারতা ও মানবতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এমনিভাবে এ ঘটনার মাঝে তাঁর একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া এবং দাওয়াতের প্রতি প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষারও অতুলনীয় নযীর স্থাপিত হয়েছে।
যেখানে নেতৃস্থানীয় সকলের মতে তরবারী-ই আবু সুফিয়ানের একমাত্র সমাধান সেখানে তিনি তার সাথে আন্তরিকতা পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিতে দলীল-প্রমাণের বিশ্লেষণমূলক সংলাপ চালিয়ে গেলেন। আবার তাওহীদের প্রশ্নে আবু সুফিয়ানের উত্তরও যথেষ্ট এবং সন্তোষজনক ছিলো না। তবে এটা ঠিক যে, সে তাওহীদকে একেবারেই অস্বীকারও করে নি; কিন্তু রেসালাতের প্রশ্নে সে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, তার মনে এখনো খটকা বা সন্দেহ রয়েছে। এরপর যখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে ভয় দেখালেন যে, তোমার হত্যা অত্যাসন্ন, ইসলাম ছাড়া তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল।
এখানে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু দীন ইসলামে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে বল প্রয়োগ করেন নি; বরং এতে তিনি শুধু আবু সুফিয়ানের প্রতিই নয় গোটা কুরাইশ সম্প্রদায়ের প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়েছেন। কেননা ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে আবু সুফিয়ানের হত্যাকে কেউই খারাপ দৃষ্টিতে দেখতো না এবং আগে ও পরের পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রনায়কই এ ব্যাপারে সমালোচনা করার মতো কিছু পেত না; বরং বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতিতে এ ধরণের ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া তো রীতিমত যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়ে। কারণ, এ আবু সুফিয়ানই মাত্র দু'বছর পূর্বে (পরীখার যুদ্ধে²¹⁰) মদীনাবাসীকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চক্রান্তে মেতে উঠেছিল এবং এ ব্যক্তিই কয়েকদিন আগে মুসলিমদের সাথে কৃত সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করেছিল যাতে (খোয'আহ গোত্রের ²¹¹) অনেক নারী-পুরুষকে জীবন দিতে হয়েছিল।
ব্যাপারটি তো এমনও হতে পারতো যে, আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণকে আন্তিরকতা থেকে নয়, শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য হয়েছে বলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহ করতে পারতেন এবং তা মেনে না নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষনণ না করে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তা মেনে নিলেন এবং তার দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার নিরিক্ষণও করলেন না; বরং মূহুর্তের মধ্যেই তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এক সেকেন্ডেই তিনি আবু সুফিয়ানের সকল কষ্টদায়ক স্মৃতি এবং এমন সকল যন্ত্রনাদায়ক ক্ষত ও আঘাতের কথা ভুলে গেলেন যার ঘা এখনো শুকায়নি। তাঁর অন্তরে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা কিছুই স্থান পায় নি। ইবলিস-শয়তানের সকল কারসাযি-ই এখানে চরম ব্যর্থ।
এ পর্যন্ত যা ঘটেছে তাতেই ক্ষমা ও উদারতার মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু, ঘটনা এখানেই শেষ নয়; এর পরে যা ঘটেছে তা পৃথিবীর সকল উত্তম আদর্শ ও মহৎ চরিত্রের সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা শুধু একটাই যে, তিনি ছিলেন একজন মহান নবী...।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ানকে এমন একটি জিনিস দিলেন যা অনন্তকাল তার সম্মান ও মর্যাদার বাহক হয়ে থাকবে। তিনি শুধু আবু সুফিয়ানকেই নিরাপত্তা দিলেন না; বরং ঐ সকল ব্যক্তিদেরকেও নিরাপত্তা দিলেন যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে। ঘোষণা করলেন,
من دخل دار أبي سفيان فهو آمن
"যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ হবে।
কতোই না ভাগ্য! কতইনা সম্মান ও মর্যাদা আবু সুফিয়ানের...!!
আমরা এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহাত্ম্যের সীমা ও পরিধি অনুমান করতে পারবো না যতক্ষণ না আমরা নিজেদেরকে এ ধরণের প্রেক্ষাপটে কল্পনা করতে পারবো।
সত্য ও বাস্তবকে সকলেরই স্বীকার করে নেওয়া উচিৎ। বিশ্ববাসীর নিকট আমরা বাস্তব-সত্যের স্বীকৃতি চাই এবং প্রশ্ন রাখতে চাই যে, মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো নিকট কি এমন আচরণ আশা করা যেতে পারে? এরপরেও কি কেউ এ দাবী করতে পারে যে, মুসলিমরা অন্যেদরকে স্বীকার করে না এবং অন্যদের সাথে সদাচরণ করে না? এখনো কি এমন কেউ আছেন যারা বলবেন যে, ইসলাম হচ্ছে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের ধর্ম?
আমাদের অভাব শুধু জ্ঞানালোকের। নবী চরিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা অতি সামান্য, শুধুমাত্র উপরের খোসা পর্যন্ত। আমরা যদি এর গভীরে প্রবেশ করতে পারি এবং জগতবাসীর সামনে তা তুলে ধরতে পারি তাহলে জ্ঞানদরিদ্র বিশাল জনগোষ্ঠীর চোখের সামনের পর্দা সরে যাবে। তারা সত্যালোককে চিনতে ও গ্রহণ করতে পারবে।
আবু সুফিয়ানের সাথে যা ঘটেছে তা নবীচরিত্রের কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং একই ধরণের আচরণ আমরা দেখতে পাই ইসলামের বিরুদ্ধে প্ররোচনাকারী ও ইসলাম বিরোধী আন্দোলনের অনেক সংগঠক নেতার সাথেও। ইকরামা ইবন আবু জাহালের সাথে তার এমনই আচরণ ছিল যা কখনো ভুলার মতো নয়।

টিকাঃ
¹⁹¹. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (১/৫৬৬)।
¹⁹². উবায়দাহ ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব ইবন আবদি মানাফ আল-ক্বারাশী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়েও দশ বছর বেশি বয়সী ছিলেন। রাসূল দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নিজ দুই ভাইসহ মদীনায় হিজরত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার আলাদা সম্মান ও মর্যাদা ছিল। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/১৪১), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৪৪৮), ইবন হাজার: আল ইসাবাহ (৫৩৭৯)।
¹⁹³. সীরাতে ইবন হিসাম: (২/১৩৬)। ইবন ইসহাক বলেন, এটিই ইসলামের প্রথম সারিয়‍্যাহ। অন্যদের মতে প্রথম হচ্ছে, সারিয়‍্যায়ে হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব।
¹⁹⁴. মুররাহ বা মুরাহ উভয় উচ্চারণ সুদ্ধ। হিজরতের পথে একটি গলি ও একটি দুর্গন্ধময় পুকুরের মধ্যবর্তি প্রসিদ্ধ স্থান। সূত্র: মুহাম্মদ হাসান শুররাব: আল-মাআলিমুল আসীরাহ ফিস-সুন্নাতি ওয়াস-সীরাহ (২৫০)
¹⁹⁵. ইবনু সায়্যিদিন-নাস: উয়ূনুল আসার (১/৪৩২)
¹⁹⁶. একজন মা'বাদ ইবন আমর আরেকজন তার সাথী যার নাম জানা যায় নি। ইবন ইসহাক পুরা ঘটনা উল্লেখ করেছেন তবে কারো নাম লিখেন নি।
¹⁹⁷. ইবন কাসীর: আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ (২/৫৪০)
¹⁹⁸. সালামা ইবন সাবিত ইবন ওয়াকাশ আল-আনসারী আল-আশহালী। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তার ভাই আমর ইবন সাবিতসহ শহীদ হয়েছেন। তিনি নিহত হয়েছেন আবু সুফিয়ান ইবনুল হারাব এর হাতে। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (২/২০০), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/২৯১), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৩৩৬২)।
¹⁹⁹. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৪৬৬)।
²⁰⁰. হানজালাহ ইবন আবি আমের। বিয়ের রাতে যুদ্ধে গিয়েছেন। যুদ্ধের আহ্বান শুনেই বেরিয়ে পড়েছেন। ফরজ গোসলও করতে পারেননি। অতঃপর ফেরেস্তারা তাকে গোসল দিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তাকে আবু সুফিয়ান হত্যা করে নি; তাকে হত্যা করেছে শাদ্দাদ ইবন আসওয়াদ ইবন শু'ঊব আল-লাইসী। অধিকতর জানতে:- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (১/৪৩২), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৬২১), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১৮৫৮)।
²⁰¹. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/৬৮)।
²⁰². সহীহ বুখারী: (كتاب المغازي، باب غزوة أحد) হাদীস নং ৩৮১৭, আবু দাউদ: হাদীস নং ২৬৬২, নাসাঈ: হাদীস নং ৮৬৩৫
²⁰³. যায়েদ ইবন দাসানাহ ইবন বাইয়াযাহ আল-আনসারী আল-বাইয়াযী। বদর ও উহুদে অংশ নিয়েছেন। রজী' দিবসে খুবাইব ইবন 'আদী এর সাথে বন্দি হয়েছেন। মক্কায় সফওয়ান ইবন উমাইয়্যার নিকট বিক্রি করে দেওয়া হলে সে তাকে মেরে ফেলে। এটি ছিল চতুর্থ হিজরীতে। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (২/১২২), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২১/১৪৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (২৯০০)
²⁰⁴- তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/৭৮)।
²⁰⁵. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/১৫৪)
²⁰⁶. এ কথাটি লেখকের মূল বইতে নেই; কিন্তু প্রায় সব বর্ণনায় রয়েছে বলে সংযুক্ত করে দেওয়া হলো- অনুবাদক।
²⁰⁷. حظم শব্দটি ازدحام অর্থে। حظم الخيل অর্থ হচ্ছে, অশ্বারোহী বাহিনীর ভিড়। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে- خَظْمِ الْجَبَلِ শব্দটি أنف অর্থে। خَظْمِ الْجَبَلِ এর অর্থ হচ্ছে, নাকের মতো পাহাড়ের বাড়তি অংশ।
²⁰⁸. دسم শব্দের অর্থ হচ্ছে, ময়লাযুক্ত। এখানে أسود তথা কুশ্রী অর্থে ব্যবহৃত। আর أخمس শব্দের অর্থ হচ্ছে, সাহসী ও উত্তেজিত। এখানে دني তথা ইতর অর্থে ব্যবহৃত। সূত্র: আল- মু'জামুল ওয়াফী (৪৬৯ ও ৪৬-৪৭)।
²⁰⁹. তাবারী, সহীহ বুখারী (كتاب المغازي، باب أين ركز النبي صلى الله عليه وسلم الراية يوم الفتح( উরওয়াহ এর মুরসাল সমূহের মধ্যে (৪০৩০), আল-মাতালিবুল আলিয়া (৪৩৬২), দালাইলুল বায়হাকী (৫/৩৩-৩৫), সীরাতে ইবন হিশাম (২/৩৯৯-৪০৫)
²¹⁰. অনুবাদক।
²¹¹. অনুবাদক।

আবু সুফিয়ান কুরাইশের একজন সাধারণ ব্যক্তি ছিল না। তাকে প্রজ্ঞা ও দক্ষ নেতৃত্বের জন্য প্রসিদ্ধির শীর্ষে থাকা কয়েকজনের মধ্যে গণ্য করা হতো এবং ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু হওয়ার পরে সে নিরপেক্ষ ছিল না; বরং ইসলামের সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছিল এবং ইসলামের ক্রমবৃদ্ধি ও অগ্রসরমানতাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সাধনায় লিপ্তদের মধ্যে আবু সুফিয়ান ছিল অন্যতম। ঐতিহাসিক আল্লামা তাবারী হিজরতের পূর্বে দারুন-নাদওয়াতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা পরিকল্পনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আবু সুফিয়ানের নামও উল্লেখ করেছেন। ¹⁹¹ মাদানী জীবনে উবায়দাহ ইবন হারেসের ¹⁹² নেতৃত্বে ইসলামের প্রথম সারিয়‍্যায়' ¹⁹³ (যুদ্ধাভিযানে) মক্কার কাফিরেদর সেনাপ্রধান ছিল এ আবু সুফিয়ান। সে কাফির সৈন্যদেরকে 'সানিয়‍্যাতুল মুররাহ' ¹⁹⁴ নামক স্থানে একত্রিত করেছিল। যে বণিক কাফেলাকে কেন্দ্র করে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল-আবু সুফিয়ান ছিল সে কাফেলার প্রধান এবং সে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিল। বদর যুদ্ধে শীর্ষ ও নেতৃস্থানীয় কাফিরদের সত্তর জন নিহত হওয়ার সুবাদে কুরাইশের সকল শাখার একমাত্র নেতৃত্ব আবু সুফিয়ানের হাতে এসে যায়। মক্কার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য সাধারণ ঘটনা এবং এজন্যই আবু সুফিয়ান ইসলাম বিরোধী যুদ্ধে কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহের একমাত্র সংগঠক ও সমন্বয়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বদরের যুদ্ধে তার এক পুত্র (হানযালাহ) নিহত হয় এবং অপর পুত্র (আমর) মুসিলমদের হাতে বন্দি হয়। ¹⁹⁵ ফলে তার প্রতিহিংসার আগুন আরো জলে ওঠে এবং সে সব সময় এ চেষ্টায় থাকত যে, সে নিজ হাতে একজন বিখ্যাত সাহাবী সা'দ ইবন নু'মান ইবন আকাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বন্দি করে তার পুত্রকে বন্দি করার প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। সে এ মর্মে শপথ করেছে যে, মুহাম্মাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে স্ত্রী-সঙ্গম করবে না। বাস্তবেও করেছে তাই। দুইশত অশ্বারোহীকে একত্র করে রাতের অন্ধকারে মদীনার ওপর অতর্কিত হামলা করে বসে। এতে দুইজন আনসারী সাহাবী শহীদ হন। ¹⁹⁶ ইতিহাসে এটিকে গাযওয়াতুস-সুয়াইক নামে নামকরণ করা হয়। ¹⁹⁷ উহুদের যুদ্ধে আবু সুফিয়ান মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে তিন হাজার কাফির সৈন্যের নেতৃত্বে ময়দানে অবতীর্ণ হয়। উহুদ হচ্ছে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকট ও মুসীবতের ইতিহাস। যুদ্ধের শুরুতে সাহায্য আসলেও শেষের দিকে তা আবার মুসীবতে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং কাফিরদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। সেদিন সত্তরজন মুসলিম শহীদ হন। আবু সুফিয়ান সেদিন সালামা ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ¹⁹⁸ হত্যা করে। ¹⁹⁹ কেউ কেউ বলেন, গাসীলুল মালাইকাহ হানজালাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও²⁰⁰ আবু সুফিয়ানই হত্যা করেছিল এবং বলেছিল যে, 'হানযালার বিনিময়ে হানযালাহ'। অর্থাৎ আমার পুত্র হানযালার প্রতিশোধে সাহাবী হানযালাহকে হত্যা করা হয়েছে।²⁰¹ সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিলো আরবের যুদ্ধরীতিকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সেদিনের তার নির্লজ্জ উল্লাস প্রকাশের সে স্মৃতি। সেদিন উহুদ যুদ্ধের সমাপ্তি লগ্নে তার এবং মুসলিমদের মাঝে প্রত্যক্ষ কথোপকথন চলছিল। ইমাম বুখারী রহ. ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন যে, "উহুদের দিন যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর আবু সুফিয়ান একটি উঁচু স্থানে উঠে বলল, কাওমের মধ্যে মুহাম্মাদ জীবিত আছে কি? একথা সে তিনবার বলল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার কোনো উত্তর দিও না। সে আবার বলল, কাওমের মধ্যে ইবন আবু কুহাফা (আবু বকর) বেঁচে আছে কি? একথাও সে তিনবার বলল। সে পুনরায় বলল, কওমের মধ্যে ইবনুল খাত্তাব কি জীবিত আছে? একথাও সে তিনবার বলল। তারপর সে তার সাথীদের দিকে ফিরে বলল, এরা সকলেই নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকলে নিশ্চয় জবাব দিত। এ সময় উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিজেকে সামলাতে না পেরে বললেন, 'হে আল্লাহর দুশমন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। যে জিনিসে তোমাকে লাঞ্ছিত করবে আল্লাহ তা বাকি রেখেছেন'। পরিশেষে আবু সুফিয়ান বলল, আজকের দিন বদর যুদ্ধের বিনিময়ের দিন, যুদ্ধ কূপ থেকে পানি উঠানোর পাত্রের মতো (অর্থাৎ একবার এক হাতে আরেকবার অন্য হাতে)। (যুদ্ধের ময়দানে) তোমরা নাক-কান কাটা কিছু লাশ দেখতে পাবে। আমি এরূপ করতে আদেশ করি নি। অবশ্য আমি এতে অসন্তুষ্টও নই। অতঃপর সে চিৎকার করতে লাগল, 'হুবালের জয়, হুবালের জয়'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা তার উত্তর দাও। তারা বললেন, আমরা কী বলব? তিনি বললেন, তোমরা বল 'আল্লাহ সমুন্নত ও মহান'। আবু সুফিয়ান বলল 'আমাদের উযযা আছে, তোমাদের উযযা নেই'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার জবাব দাও। তারা বললেন, আমরা কী জবাব দেব? তিনি বললেন, বল 'আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের তো কোনো অভিভাবক নেই'। ²⁰²
এ কথোপকথনে আবু সুফিয়ান মুসলিম শহীদদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকৃতি, নাক-কান কাটা হওয়া ও পেট বিদীর্ণ হওয়ার প্রতি তার আনন্দ ও মনোতুষ্টি প্রকাশ করেছে। অথচ আরবরা জাহেলী যুগে কিংবা ইসলাম পরবর্তী যুগে কোনো কালেই এটি পছন্দ করতো না। এ সব কিছু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করা এবং তাদের ওপর ধ্বংসলীলা চালানোর প্রতি তার মনস্কামনা ও আগ্রহাতিশেয্যরই বহিঃপ্রকাশ।
যায়েদ ইবন দাসানাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ²⁰³-এর হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত হয়ে মুসলিমদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে গাদ্দারী-নীতি অবলম্বনের স্পষ্ট স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে তার এ মানসিকতা আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ²⁰⁴ শুধু তাই নয়, আবু সুফিয়ানের এ মানসিকতার সর্ববৃহৎ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পঞ্চম হিজরীতে সম্মিলিত বাহিনী কর্তৃক মদীনা অবরোধের সময়। সে অবরোধের সময় দশ হাজার কাফির সৈন্যের নেতৃত্বে থাকা আবু সুফিয়ানসহ সকলে মিলে মদীনাকে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম-শূন্য করে ফেলতে চেয়েছিল। শান্তি ও স্বস্তির শহর মদীনাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করা এবং সেখানকার ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকলকে ভীতি ও আতংকগ্রস্থ করে তোলার জন্য কাফিরদের সকল শাখা-উপশাখাকে সমবেত করা ছিল ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের এক ক্ষমার অযোগ্য মহা অপরাধ।
অষ্টম হিজরী পর্যন্ত আবু সুফিয়ান মক্কার অধিপতি ছিল। এর দু বছর পূর্বে হুদায়বিয়ার সন্ধি সংঘটিত হয়। সন্ধি-চুক্তিতে বনু বকর গোত্র মুশরিকদের এবং খযা'আহ গোত্র মুসলিমদের পক্ষ অবলম্বন করে। অতঃপর বনু বকর কর্তৃক প্রসিদ্ধ সেই চুক্তিভঙ্গের বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা ঘটে এবং খোয'আহ গোত্রের কয়েকজন লোক নিহত হয়। এ ক্ষেত্রে কুরাইশরা বনু বকরকে সহযোগিতা করেছিল।²⁰⁵ ফলে হুদায়বিয়ার সন্ধি রহিত হয়ে যায় এবং এখান থেকেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ হাজার সাহাবীদের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা বিজয়ের অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঘটনা অনেক দীর্ঘ। বিস্তারিত বিবরণও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের লক্ষণীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে যে, ইসলাম বিরোধী যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ভূমিকা ছিল অন্যান্য শত্রুনেতাদের তুলনায় অনেক বেশি এবং মুসলিম রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ক্ষেত্রে তার অবস্থান ছিল সকলের শীর্ষে।
প্রিয় পাঠক! এ সকল জটিল প্রেক্ষাপটগুলোকে মনের পর্দায় মেলে ধরুন! অতঃপর মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশের প্রাক্কালে গ্রেফতারকৃত আবু সুফিয়ানকে হাতে পেয়ে তার সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীরূপ আচরণ করেছিলেন সেদিকে দৃষ্টিপাত করুন! এ বিষয়ে ইসলামের সুমহান দর্শন ও নবী চরিত্রের মাহাত্ম্য ভালোভাবে অনুধাবনের জন্য আমরা পুরো ঘটনাটি সবিস্তারে উল্লেখ করছি-
যুগ পাল্টে গেছে। সময় বদলেছে অনেক। আবু সুফিয়ান তার জীবনের অত্যন্ত সংকীর্ণ অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। তার যাবতীয় কর্ম-তৎপরতা থেমে গেছে। সব ধরণের চিন্তা-ফিকির থেকেও সে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছে। এটা ঐ সময়ের কথা যখন মক্কার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে হঠাৎ করে মুসলিমদের বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হয়েছে এবং আবু সুফিয়ান ভালো করেই জানে যে, সে হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের প্রধান টার্গেট। ঐ সময় সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জানতে মরিয়া হয়ে উঠলো এবং এক ধরণের ভীতি ও আতংক তাকে গ্রাস করে নিলো। ইতোমধ্যে সে তার এক পুরোনো দিনের বন্ধু-যিনি বর্তমানে মুসলিমদের দলভুক্ত- রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সামনে পেয়ে গেল। তখন তার সাহায্য কামনা করে বলে উঠল, 'আমার মাতা-পিতা আপনার ওপর কুরবান হোক, এখন উপায়?'
এরপরে মক্কার এ শত্রুনেতা ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে যা ঘটেছিল চলুন তা আমরা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এর ভাষায় পাঠ করি-
সে দিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আবু সুফিয়ানকে বললেন,
«والله لئن ظفر بك ليضربن عنقك ..!!»
"আল্লাহর শপথ! তোমাকে গ্রেফতার করতে পারলে তো অবশ্যই তোমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে।"
এটি ছিলো আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্বাভাবিক অভিব্যক্তি। শুধু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-ই নন, ইসলামের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের অবস্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত যে কোনো ব্যক্তিই আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে এ একই কথা বলবে। কিন্তু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু আবু সুফিয়ানের সাথে পূর্ব বন্ধুত্বের কারণে কিংবা কুরাইশদের প্রাণ রক্ষার প্রতি অত্যাধিক আগ্রহের কারণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আবু সুফিয়ানের জন্য সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং বললেন, 'তুমি আমার সাথে এ খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে চল। আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাব এবং তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে নেব'। তাই আবু সুফিয়ান আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-র সাথে সওয়ার হলো। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, অতঃপর আমি তাকে নিয়ে রওয়ানা করলাম। যখনি মুসলিমদের কোনো আগুনের/মশালের/চুলার পাশ দিয়ে যেতাম তখনই তারা বলতো, 'কে এখানে?' পরে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চর এবং তাতে তাঁর চাচাকে দেখতে পেত তখন বলতো, 'এটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খচ্চর এবং এতে রয়েছে তাঁরই চাচা। এক পর্যায়ে আমরা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর আগুনের/মশালের/চুলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, 'কে এখানে?' এ কথা বলে আমার দিকে এগিয়ে এসে খচ্চরের পেছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে চিনে ফেললেন এবং বলে উঠলেন, 'আল্লাহর শপথ! হে আল্লাহর দুশমন! সমস্ত প্রশংসা সে আল্লাহর যিনি তোকে পাইয়ে দিয়েছেন'। এ কথা বলেই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাঁবুর দিকে দৌড়ে ছুটলেন। আমিও খচ্চরকে ছেড়ে দিলাম এবং ধীরগামী আরোহী ধীরগতির বাহনজন্তুকে যতটুকু পেছনে ফেলতে পারে ততটুকু খচ্চরকে পেছনে রেখে এগিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে প্রবেশ করলাম। ইতিমধ্যে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুও প্রবেশ করেছেন এবং বলছেন, 'এ হলো আল্লাহর দুশমন আবু সুফিয়ান, কোনো প্রকার শান্তি/সন্ধি চুক্তিকালীন সময়ের বাইরে আল্লাহ তাকে আমাদের হাতে এনে দিয়েছেন। সুতরাং আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই।'
তখন আমি (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে বসলাম এবং তার মাথায় হাত রেখে বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আজ রাতে আমি ছাড়া তাঁর সাথে আর কেউ একান্ত আলাপ করতে পারবে না'। উমার যখন বারবার একই কথা বলছিলেন তখন আমি তাকে বললাম, চুপ কর, হে উমার! আল্লাহর শপথ! যদি এ লোকটি বনু আদী গোত্রের কেউ হতো তাহলে তুমি এরূপ বলতে না। কিন্তু এ লোকটি হচ্ছে বনু আবদে মানাফ গোত্রের'। এটা শুনে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আপনি চুপ করুন, হে আব্বাস! আপনি এ ধরণের কথা বলবেন না। আল্লাহর শপথ!
আপনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখন আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার কাছে আমার বাবা খাত্তাব যদি ইসলাম গ্রহণ করতেন তার ইসলাম গ্রহণের চেয়েও অধিক প্রিয় ছিল। আর এটা এ জন্য যে, আমি জানতাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আপনার ইসলাম গ্রহণ আমার বাবা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক প্রিয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'হে আব্বাস! তুমি তাকে তোমার তাবুতে নিয়ে যাও, সকালে আমার নিকট নিয়ে এসো'। অতঃপর আমি তাকে আমার তাবুতে নিয়ে গেলাম। সে আমার নিকট রাত্রি যাপন করল। পরদিন সকালে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলে তিনি তাকে দেখেই বললেন,
«وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ، أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟»
"হে আবু সুফিয়ান! তোমার মঙ্গল হোক। তোমার কি এখনও এ সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আসে নি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই?"
আবু সুফিয়ান বলল, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি কতই না সম্মানিত, কতই না ধৈর্যশীল আর কতই না উত্তম সম্পর্ক স্থাপনকারী! এখন তো আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, যদি আল্লাহর সাথে কোনো মা'বুদ শরীক থাকত তবে অবশ্যই আমার কোনো কাজে আসত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«وَيْحَكَ يَا أَبَا سُفْيَانَ، أَلَمْ يَأْنِ لَكَ أَنْ تَعْلَمَ أَنِّي رَسُولُ اللَّهِ؟»
"হে আবু সুফিয়ান! তোমার মঙ্গল হোক, এখনও কি তোমার সময় আসে নি যে, আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস করবে?"
আবু সুফিয়ান বলল, 'আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! আপনি কতই না সম্মানিত, কতই না ধৈর্যশীল আর কতই না আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী! এ ব্যাপারে এখনও মনে কিছুটা খটকা রয়েছে'। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবু সফিয়ান, তোমার নাশ হোক! তোমার গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার আগেই মুসলিম হয়ে যাও এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা'বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল'।
এবার আবু সুফিয়ান কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ আবু সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিছুটা সম্মানপ্রিয় মানুষ। সুতরাং তাকে বিশেষ একটা কিছু দান করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে, যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ থাকবে, (এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থাকবে। ²⁰⁶) অতঃপর আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মক্কাবাসীকে এ সংবাদ দেওয়ার জন্য চলে যেতে উদ্যত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
يَا عَبَّاسُ، احْبِسُهُ بِمَضِيقِ الْوَادِي عِنْدَ حَظْمِ الْخَيْلِ ²⁰⁷، حَتَّى تَمُرَّ بِهِ جُنُودُ اللَّهِ
"হে আব্বাস! তাকে বাহিনীর ভিড়ের নিকট (অথবা নাকের মতো পাহাড়ের সেই বাড়তি অংশের ওপর) দাঁড় করাও যে দিকে পাহাড়ি সরুপথ গিয়েছে, যাতে সে আল্লাহর বাহিনীগুলো অতিক্রম করার দৃশ্য অবলোকন করতে পারে।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মতে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে নিয়ে সেখানে দাড়ালেন। (আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন) প্রতিটি গোত্র নিজেদের বাহনজন্তুতে আরোহন করে অতিক্রম করছিল। যখনই কোনো গোত্র অতিক্রম করতো তখন তিনি বলতেন, এরা কারা? আমি বলতাম, বনু সালীম। তিনি বলতেন, বনু সালীমের সাথে আমার কী সম্পর্ক? অতঃপর অন্য গোত্র অতিক্রম করলে তিনি বলতেন, এরা কারা? আমি বলতাম, মুযাইনাহ। তিনি বলতেন, মুযাইনাহর সাথে আমার কী সম্পর্ক? তিনি এভাবেই বলছিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহিনী অতিক্রম করল যা বর্ম ও অস্ত্রশস্ত্রের দরুন কালো বর্ণ দেখাতে লাগল। সেখানে আনসার এবং মুহাজিররা ছিলেন। লোহার বর্ম ও শিরস্ত্রাণের দরুন চক্ষু ছাড়া তাদের আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, এরা কারা? আমি বললাম, মুহাজির ও আনসারদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বললেন, 'কার ক্ষমতা আছে এদের মুকাবিলা করে? আল্লাহর শপথ! তোমার ভাতিজার রাজত্ব আজ অনেক বড় আকার ধারণ করেছে।' আমি বললাম, হে আবু সুফিয়ান! এটি হলো নবুওয়াত। তিনি বললেন, তা ঠিক। আমি বললাম, 'এবার দ্রুত আপনার কওমের নিকট যান'। এরপর তিনি চলে গেলেন এবং মক্কায় প্রবেশ করে ঘোষণা করতে লাগলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে গেছেন। তোমরা তাঁর মুকাবিলা করতে পারবে না। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাহ এ ঘোষণা শোনে এগিয়ে এলো এবং তার দাঁড়ি ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, اقْتُلُوا الدَّسَمَ الأَحْمَسَ ²⁰⁸، فَبِئْسَ طَلِيعَة قَوْمٍ!
"তোমরা এ কুশ্রী ইতরকে হত্যা করে দাও। হায়! কতই না খারাপ লক্ষণ!"
আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'তোমাদের নাশ হোক! এ মহিলা যেন তোমাদেরকে জীবন রক্ষা করা থেকে ধোকায় না ফেলে। যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ'। লোকেরা বলল, 'তোমার নাশ হোক, তোমার ঘরে আমাদের কী হবে?' তিনি বললেন, 'যে নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সেও নিরাপদ এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ'। এটা শুনে লোকেরা নিজেদের ঘর ও মসজিদের দিকে বিভক্ত হয়ে ছুটতে লাগল। ²⁰⁹
এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য উদারতা ও মানবতার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এমনিভাবে এ ঘটনার মাঝে তাঁর একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া এবং দাওয়াতের প্রতি প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষারও অতুলনীয় নযীর স্থাপিত হয়েছে।
যেখানে নেতৃস্থানীয় সকলের মতে তরবারী-ই আবু সুফিয়ানের একমাত্র সমাধান সেখানে তিনি তার সাথে আন্তরিকতা পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিতে দলীল-প্রমাণের বিশ্লেষণমূলক সংলাপ চালিয়ে গেলেন। আবার তাওহীদের প্রশ্নে আবু সুফিয়ানের উত্তরও যথেষ্ট এবং সন্তোষজনক ছিলো না। তবে এটা ঠিক যে, সে তাওহীদকে একেবারেই অস্বীকারও করে নি; কিন্তু রেসালাতের প্রশ্নে সে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, তার মনে এখনো খটকা বা সন্দেহ রয়েছে। এরপর যখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে ভয় দেখালেন যে, তোমার হত্যা অত্যাসন্ন, ইসলাম ছাড়া তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল।
এখানে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু দীন ইসলামে প্রবেশ করানোর ব্যাপারে বল প্রয়োগ করেন নি; বরং এতে তিনি শুধু আবু সুফিয়ানের প্রতিই নয় গোটা কুরাইশ সম্প্রদায়ের প্রতি অনুগ্রহ দেখিয়েছেন। কেননা ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে আবু সুফিয়ানের হত্যাকে কেউই খারাপ দৃষ্টিতে দেখতো না এবং আগে ও পরের পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রনায়কই এ ব্যাপারে সমালোচনা করার মতো কিছু পেত না; বরং বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতিতে এ ধরণের ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া তো রীতিমত যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়ে। কারণ, এ আবু সুফিয়ানই মাত্র দু'বছর পূর্বে (পরীখার যুদ্ধে²¹⁰) মদীনাবাসীকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চক্রান্তে মেতে উঠেছিল এবং এ ব্যক্তিই কয়েকদিন আগে মুসলিমদের সাথে কৃত সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করেছিল যাতে (খোয'আহ গোত্রের ²¹¹) অনেক নারী-পুরুষকে জীবন দিতে হয়েছিল।
ব্যাপারটি তো এমনও হতে পারতো যে, আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণকে আন্তিরকতা থেকে নয়, শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য হয়েছে বলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহ করতে পারতেন এবং তা মেনে না নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণে কোনো প্রকার সন্দেহ পোষনণ না করে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তা মেনে নিলেন এবং তার দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার নিরিক্ষণও করলেন না; বরং মূহুর্তের মধ্যেই তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এক সেকেন্ডেই তিনি আবু সুফিয়ানের সকল কষ্টদায়ক স্মৃতি এবং এমন সকল যন্ত্রনাদায়ক ক্ষত ও আঘাতের কথা ভুলে গেলেন যার ঘা এখনো শুকায়নি। তাঁর অন্তরে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা কিছুই স্থান পায় নি। ইবলিস-শয়তানের সকল কারসাযি-ই এখানে চরম ব্যর্থ।
এ পর্যন্ত যা ঘটেছে তাতেই ক্ষমা ও উদারতার মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু, ঘটনা এখানেই শেষ নয়; এর পরে যা ঘটেছে তা পৃথিবীর সকল উত্তম আদর্শ ও মহৎ চরিত্রের সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর ব্যাখ্যা শুধু একটাই যে, তিনি ছিলেন একজন মহান নবী...।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ানকে এমন একটি জিনিস দিলেন যা অনন্তকাল তার সম্মান ও মর্যাদার বাহক হয়ে থাকবে। তিনি শুধু আবু সুফিয়ানকেই নিরাপত্তা দিলেন না; বরং ঐ সকল ব্যক্তিদেরকেও নিরাপত্তা দিলেন যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে। ঘোষণা করলেন,
من دخل دار أبي سفيان فهو آمن
"যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ হবে।
কতোই না ভাগ্য! কতইনা সম্মান ও মর্যাদা আবু সুফিয়ানের...!!
আমরা এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহাত্ম্যের সীমা ও পরিধি অনুমান করতে পারবো না যতক্ষণ না আমরা নিজেদেরকে এ ধরণের প্রেক্ষাপটে কল্পনা করতে পারবো।
সত্য ও বাস্তবকে সকলেরই স্বীকার করে নেওয়া উচিৎ। বিশ্ববাসীর নিকট আমরা বাস্তব-সত্যের স্বীকৃতি চাই এবং প্রশ্ন রাখতে চাই যে, মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো নিকট কি এমন আচরণ আশা করা যেতে পারে? এরপরেও কি কেউ এ দাবী করতে পারে যে, মুসলিমরা অন্যেদরকে স্বীকার করে না এবং অন্যদের সাথে সদাচরণ করে না? এখনো কি এমন কেউ আছেন যারা বলবেন যে, ইসলাম হচ্ছে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের ধর্ম?
আমাদের অভাব শুধু জ্ঞানালোকের। নবী চরিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা অতি সামান্য, শুধুমাত্র উপরের খোসা পর্যন্ত। আমরা যদি এর গভীরে প্রবেশ করতে পারি এবং জগতবাসীর সামনে তা তুলে ধরতে পারি তাহলে জ্ঞানদরিদ্র বিশাল জনগোষ্ঠীর চোখের সামনের পর্দা সরে যাবে। তারা সত্যালোককে চিনতে ও গ্রহণ করতে পারবে।
আবু সুফিয়ানের সাথে যা ঘটেছে তা নবীচরিত্রের কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং একই ধরণের আচরণ আমরা দেখতে পাই ইসলামের বিরুদ্ধে প্ররোচনাকারী ও ইসলাম বিরোধী আন্দোলনের অনেক সংগঠক নেতার সাথেও। ইকরামা ইবন আবু জাহালের সাথে তার এমনই আচরণ ছিল যা কখনো ভুলার মতো নয়।

টিকাঃ
¹⁹¹. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (১/৫৬৬)।
¹⁹². উবায়দাহ ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব ইবন আবদি মানাফ আল-ক্বারাশী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়েও দশ বছর বেশি বয়সী ছিলেন। রাসূল দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নিজ দুই ভাইসহ মদীনায় হিজরত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তার আলাদা সম্মান ও মর্যাদা ছিল। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/১৪১), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৪৪৮), ইবন হাজার: আল ইসাবাহ (৫৩৭৯)।
¹⁹³. সীরাতে ইবন হিসাম: (২/১৩৬)। ইবন ইসহাক বলেন, এটিই ইসলামের প্রথম সারিয়‍্যাহ। অন্যদের মতে প্রথম হচ্ছে, সারিয়‍্যায়ে হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব।
¹⁹⁴. মুররাহ বা মুরাহ উভয় উচ্চারণ সুদ্ধ। হিজরতের পথে একটি গলি ও একটি দুর্গন্ধময় পুকুরের মধ্যবর্তি প্রসিদ্ধ স্থান। সূত্র: মুহাম্মদ হাসান শুররাব: আল-মাআলিমুল আসীরাহ ফিস-সুন্নাতি ওয়াস-সীরাহ (২৫০)
¹⁹⁵. ইবনু সায়্যিদিন-নাস: উয়ূনুল আসার (১/৪৩২)
¹⁹⁶. একজন মা'বাদ ইবন আমর আরেকজন তার সাথী যার নাম জানা যায় নি। ইবন ইসহাক পুরা ঘটনা উল্লেখ করেছেন তবে কারো নাম লিখেন নি।
¹⁹⁷. ইবন কাসীর: আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ (২/৫৪০)
¹⁹⁸. সালামা ইবন সাবিত ইবন ওয়াকাশ আল-আনসারী আল-আশহালী। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তার ভাই আমর ইবন সাবিতসহ শহীদ হয়েছেন। তিনি নিহত হয়েছেন আবু সুফিয়ান ইবনুল হারাব এর হাতে। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (২/২০০), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/২৯১), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৩৩৬২)।
¹⁹⁹. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৪৬৬)।
²⁰⁰. হানজালাহ ইবন আবি আমের। বিয়ের রাতে যুদ্ধে গিয়েছেন। যুদ্ধের আহ্বান শুনেই বেরিয়ে পড়েছেন। ফরজ গোসলও করতে পারেননি। অতঃপর ফেরেস্তারা তাকে গোসল দিয়েছে। কেউ কেউ বলেন, তাকে আবু সুফিয়ান হত্যা করে নি; তাকে হত্যা করেছে শাদ্দাদ ইবন আসওয়াদ ইবন শু'ঊব আল-লাইসী। অধিকতর জানতে:- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (১/৪৩২), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৬২১), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১৮৫৮)।
²⁰¹. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/৬৮)।
²⁰². সহীহ বুখারী: (كتاب المغازي، باب غزوة أحد) হাদীস নং ৩৮১৭, আবু দাউদ: হাদীস নং ২৬৬২, নাসাঈ: হাদীস নং ৮৬৩৫
²⁰³. যায়েদ ইবন দাসানাহ ইবন বাইয়াযাহ আল-আনসারী আল-বাইয়াযী। বদর ও উহুদে অংশ নিয়েছেন। রজী' দিবসে খুবাইব ইবন 'আদী এর সাথে বন্দি হয়েছেন। মক্কায় সফওয়ান ইবন উমাইয়্যার নিকট বিক্রি করে দেওয়া হলে সে তাকে মেরে ফেলে। এটি ছিল চতুর্থ হিজরীতে। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (২/১২২), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২১/১৪৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (২৯০০)
²⁰⁴- তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/৭৮)।
²⁰⁵. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/১৫৪)
²⁰⁶. এ কথাটি লেখকের মূল বইতে নেই; কিন্তু প্রায় সব বর্ণনায় রয়েছে বলে সংযুক্ত করে দেওয়া হলো- অনুবাদক।
²⁰⁷. حظم শব্দটি ازدحام অর্থে। حظم الخيل অর্থ হচ্ছে, অশ্বারোহী বাহিনীর ভিড়। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে- خَظْمِ الْجَبَلِ শব্দটি أنف অর্থে। خَظْمِ الْجَبَلِ এর অর্থ হচ্ছে, নাকের মতো পাহাড়ের বাড়তি অংশ।
²⁰⁸. دسم শব্দের অর্থ হচ্ছে, ময়লাযুক্ত। এখানে أسود তথা কুশ্রী অর্থে ব্যবহৃত। আর أخمس শব্দের অর্থ হচ্ছে, সাহসী ও উত্তেজিত। এখানে دني তথা ইতর অর্থে ব্যবহৃত। সূত্র: আল- মু'জামুল ওয়াফী (৪৬৯ ও ৪৬-৪৭)।
²⁰⁹. তাবারী, সহীহ বুখারী (كتاب المغازي، باب أين ركز النبي صلى الله عليه وسلم الراية يوم الفتح( উরওয়াহ এর মুরসাল সমূহের মধ্যে (৪০৩০), আল-মাতালিবুল আলিয়া (৪৩৬২), দালাইলুল বায়হাকী (৫/৩৩-৩৫), সীরাতে ইবন হিশাম (২/৩৯৯-৪০৫)
²¹⁰. অনুবাদক।
²¹¹. অনুবাদক।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ইকরামা ইবন আবু জাহলের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 ইকরামা ইবন আবু জাহলের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


-আবু জাহলের নিকট থেকে ইসলাম বিরোধিতা ও শত্রুতার শরাব পান করেছে। শুধু তাই নয়, তার উগ্রতা ও বিরোধিতা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন সে সাধারণ ক্ষমা প্রাপ্তদের তালিকায় ছিল না। ইকরামা ছিল খালিদ ইবন ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর বিরুদ্ধে খানদামার ২১২ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী কয়েকজনের অন্যতম। কিন্তু, পরাস্ত হওয়ার পর পালিয়ে মক্কা ছেড়ে ইয়ামেন চলে যেতে চাইল এবং সে জন্য নৌকা বা সামুদ্রিক জাহাজ জাতীয় কোনো বাহন খুঁজতে লাগল। ২১৩
কুফুরীতে তার পথ-চলা ছিল অনেক দূরের এবং তার অবস্থান ছিল অতি কট্টর। এজন্য মক্কা বিজয়ের পর সে ছিল হত্যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের টার্গেটকৃতদের অন্যতম। তাকে যেখানেই পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে।
তার স্ত্রী-উম্মে হাকীম বিনত হারিস ইবন হিশাম ২১৪-স্বামীকে বাঁচাতে চাইল। তাই সে ইকরামার নিরাপত্তা ও তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করার জন্য আগে নিজে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে আরয করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইকরামা আপনার ভয়ে মক্কা ছেড়ে ইয়ামানের দিকে পালিয়ে গেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তা দান করুন'। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজে এবং স্বাভাবিকভাবেই বলে দিলেন, فهو آمن "সে নিরাপদ।"২১৫
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইকরামার স্ত্রীকে এটা বলেন নি যে, সে তো আবশ্যিক হত্যার তালিকাভুক্ত। তার পিছনের দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন নি। এটাও বলেন নি যে, 'তুমি নিজেই নব মুসলিমা, তুমি কীভাবে অন্যের জন্য সুপারিশ করতে পার?' এগুলোর কিছুই বলেন নি এবং ইকরামা কিংবা তার স্ত্রীর ওপর কোনো শর্তারোপও করেন নি। শুধু বললেন, فهو آمن "সে নিরাপদ”।
এরপর স্ত্রী উম্মে হাকীম রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বামী ইকরামাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। অনেক খোজাখোজি ও দীর্ঘ সফরের পর তাকে পেলেন-সে লোহিত সাগরের কিনারায় ইয়ামেনগামী একটি জাহাজে আরোহণের চেষ্টায় রত আছে। উম্মে হাকীম রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! আমি এখন সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে বেশি আত্মিয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি। তুমি নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে এনেছি।
উত্তরে ইকরামা বললো, তুমি করতে পেরেছো এটা? স্ত্রী: হ্যাঁ। ২১৬
ইকরামা সে সময় চোখে শর্ষে ফুল দেখছিল। সে ইয়ামান যেতে চাচ্ছে অথচ ইয়ামানও তখন ইসলামের আলোয় আলোকিত। পৃথিবীর চতুর্দিকেই মানুষ দলে দলে ইসলামের সু-শীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে কিংবা বশ্যতা স্বীকার করে থাকতে শুরু করছে। গোটা পৃথিবী তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তাই সে দীর্ঘ চিন্তা-ফিকির বাদ দিয়ে তৎক্ষনাত স্ত্রীর সাথে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল।
ইকরামা মক্কায় ফিরে আসছে। সে এখনো মক্কায় প্রবেশ করে নি এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে বলছেন,
يأتيكم عكرمة بن أبي جهل مؤمنا مهاجرا، فلا تسبوا أباه، فإن سب الميت يؤذي الحي، ولا يبلغ الميت».
"ইকরামা কুফুরী ছেড়ে ইসলাম গ্রহণের জন্য তোমাদের নিকট আসছে তোমরা তার বাবাকে গালি দিও না, কেননা মৃতদের গালি দেওয়া জীবিতদেরকে কষ্ট দেয় এবং তা মৃতদের পর্যন্ত পৌঁছে না।"২১৭
আল্লাহু আকবার! এ কেমন চরিত্র মাধুর্য্য?
আবু জাহল ছিলো এ উম্মতের ফির'আউন। তথাপি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলে ইকরামার সামনে তাকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন। যেন ইকরামার অনুভুতিতে আঘাত না লাগে। অথচ ইকরামা এখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নি।
ইকরামা মক্কায় প্রবেশ করেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দূর থেকে দেখলেন। দেখে কী করলেন? আবু জাহলের কথা মনে করলেন? যে সব যুদ্ধে ইকরামা ইসলামের বিরুদ্ধে নিজের সৌর্য-বির্য প্রদর্শন করেছিল সে সকল যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলেন। মাত্র কয়েক দিন পূর্বে খানদামায় ইকরামা যে মুসলিমদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল তার কথা ভাবছিলেন নাকি ইকরামার বর্তমান দুরাবস্থার কথা ভেবে তাকে ইসলামের শক্তি ও ক্ষমতা দেখিয়ে ছাড়ার মনস্থ করলেন?
না, পৃথিবীর অন্য সাধারণ রাজনীতিকদের মতো এ ধরণের কোনো কিছুই তিনি করলেন না; বরং তিনি খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন যে, তার শরীরে চাদরও ছিল না। ২১৮ ইকরামা ইবন আবু জাহল ফিরে আসছে এ জন্য তাঁর অবয়বে খুশীর বদনদীপ্তি ফুটে উঠেছে। অথচ সে এখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নি। এটি কোনো কৃত্তিমতা নয় বরং এটি ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবজাত প্রকৃতি।
ইকরামা এসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বসে বলল, 'হে মুহাম্মদ! এ (নিজ স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে) আমাকে বলেছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই বললেন, 'হ্যাঁ, সে সত্য বলেছে, তুমি নিরাপদ'। ইকরামা বলল, এখন আপনি আমাকে কী করতে বলেন? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাকে আহ্বান করছি যে, তুমি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, এবং আমি আল্লাহর রাসূল। সালাত আদায় করবে। যাকাত দেবে। এভাবে ইসলামের বিধি-বিধান ও যাবতীয় উত্তম গুণাবলীর কথা উল্লেখ করলেন। ইকরামা বলল, আপিন আমাকে সত্য, সুন্দর ও ভালোর দিকেই আহ্বান করেছেন।
মানুষের অন্তর তো দয়াময় আল্লাহর কুদরতি আঙ্গুলের মাঝে, তিনি যার অন্তরকে যখন যেদিকে ইচ্ছা ফিরিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতক্ষণ যা বললেন এসব কথা হিজরতের পূর্বে মক্কী জীবনেও সত্য ছিল, হিজরত পরবর্তী মাদানী জীবনেও সত্য ছিল এবং মক্কা বিজয়ের পর এতদিনও সত্যই ছিল এবং অহী ও নবুওয়াতেরই অংশ ছিল; কিন্তু এতদিন পরে ইকরামা ইবন আবু জাহলের বুঝে আসছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সত্য, সুন্দর ও ভালোর দিকেই আহ্বান করছেন এবং এ পর্যায়ে এসে ইকরামা বলছেন যে, আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে যে দিকে আহ্বান করছেন সব সময় আপনি সে দিকেই আহ্বান করতেন আর আপনি আমাদের মধ্যে আচরণে সবচেয়ে সদাচারী, কথায় সবচেয়ে সত্যবাদী, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
মুহুর্তের ব্যবধানেই কাফির সৈন্য ইকরামা ইসলামের সৈনিকে রূপান্তরিত হয়ে গেল। এরপরে ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উত্তম জিনিস শিক্ষা দিন'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি বল যে,
أشهد أن لا إلاه إلا الله وأن محمدا عبده و رسوله
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।"
ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, এরপর কী? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বল যে, আমি আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে এবং উপস্থিত সকলকে স্বাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি মুসলিম, মুহাজির ও মুজাহিদ। ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু হুবহু সে কথাগুলোই বললেন। অতঃপর এ নও মুসলিম ইকরামাকে ইসলামের সাথে আরো আন্তিরকভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আজকে তুমি আমার নিকট যা চাইবে কাউকে না দিলেও আমি তোমাকে দেব'। ইকরামা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কোনো ধন-সম্পদ, মান-সম্মান কিংবা নেতৃত্ব কিছুই চাইলেন না; বরং তিনি চাইলেন ক্ষমা। তিনি বললেন, 'আমি আপনার নিকট চাই যে, আপনি আমার সকল শত্রুতা, সকল পদক্ষেপ, সামনা-সামনি সকল মুকাবিলা এবং আপনার সামনে বা পেছনে যত কটুক্তি করেছি সব কিছুর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন'।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আল্লাহ! সে আমার বিরুদ্ধে যত শত্রুতা করেছে এবং আপনার দীনের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যত স্থানে যত সফর করেছে সেগুলোর জন্য আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং সে আমার সামনে বা পেছনে আমার যত সম্মানহানী করেছে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন।" এটা শুনে ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, 'আমি সন্তুষ্ট, হে আল্লাহর রাসূল!' এবং তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরো বললেন, 'এতদিন আমি আল্লাহর পথের বিরুদ্ধে যত সম্পদ ব্যয় করেছি, এখন থেকে আল্লাহর পথে তার দ্বিগুণ ব্যয় করবো, এতদিন আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরানোর জন্য যত লড়াই করেছি, এখন থেকে আল্লাহর পথে এর দ্বিগুণ নিজেকে বিলিয়ে দিবো'। ২১৯ বাস্তবেও তিনি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য নিজের পরবর্তী পুরা জীবনটাকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। কখনো ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযানে আবার কখনো শামের কোনো না কোনো বিজয়াভিযানে। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাকে গ্রহণ করা, নিরাপত্তা দেওয়া ও অতীতের সব কালো অধ্যায়কে ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে পরিপূর্ণ পাল্টে দিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতইনা সুন্দর কথা বলেছেন,
«لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خير لك من حمر النعم»
"তোমার দ্বারা একজন ব্যক্তির হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া তোমার জন্য অনেকগুলো লাল উটের চেয়েও উত্তম।”২২০ অন্য বর্ণনায় আছে, যার উপর সূর্য উদিত হয় (অর্থাৎ গোটা পৃথিবী) তার চেয়েও উত্তম। ২২১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ও ইকরামার সাথে যেমন আচরণ করেছেন এরা দুজন ছাড়া অন্য অনেকের সাথেও একই আচরণ করেছেন। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে তাঁর আচরণ ছিল সবদিক থেকেই ইতিহাসের অপূর্ব ও চমৎকার ঘটনা।

টিকাঃ
২১২. খানদামা মক্কার নিকটবর্তী একটি স্থান। ইবনুল আসীর বলেছেন, খানদামা হচ্ছে মক্কার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়ের নাম। ইবন বারীয় বলেছেন, মক্কা বিজয়ের দিন সেখানে একটি সংঘর্ষ ঘটেছিল। অধিকতর জানতে- ফিরোযাবাদী: আল-কামুসুল মুহীত (১৪২৭), ইবনুল আসীর: আন-নিহায়াতু ফী গারীবিল আসার (২/১৬১)।
২১৩. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/১৬০)
২১৪. উম্মে হাকীম বিনত হারিস ইবন হিশাম, ইকরামার চাচাতো ভাই। মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা ও নিরাপত্তা চেয়ে নিয়ে তাকে খুঁজে বের করলেন এবং ইকরামাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর উভয়ে পূর্বের বিয়েতেই বহাল থাকলেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/৩২৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১১৯৭৩)।
২১৫. মুহাম্মদ ইবন হাসান আশ-শায়বানী-এর সূত্রে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক রহ. (৬০১)।
২১৬. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৯৬)।
২১৭. মুহাম্মদ ইবন হাসান আশ-শায়বানী এর সূত্রে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক রহ. (৬০১), মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৬৯), ইমাম যাহাবী হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন।
২১৮. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৬৯)।
২১৯. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৭০)।
২২০. সহীহ বুখারী: (كتاب المناقب، باب مناقب علي بن أبي طالب) সাহাল ইবন সা'দ-এর সূত্রে, হাদীস নং ৩৪৯৮; সহীহ মুসলিম: (كتاب فضائل الصحابة، باب فضائل علي بن أبي طالب) হাদীস নং ২৪০৬।
২২১. মুসতাদরাকে হাকিম: আবু রাফে' সূত্রে (৬৫৩৭), তাবরানী: আল-মু'জামুল কাবীর (৯৩০)।

-আবু জাহলের নিকট থেকে ইসলাম বিরোধিতা ও শত্রুতার শরাব পান করেছে। শুধু তাই নয়, তার উগ্রতা ও বিরোধিতা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মক্কা বিজয়ের দিন সে সাধারণ ক্ষমা প্রাপ্তদের তালিকায় ছিল না। ইকরামা ছিল খালিদ ইবন ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর বিরুদ্ধে খানদামার ২১২ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী কয়েকজনের অন্যতম। কিন্তু, পরাস্ত হওয়ার পর পালিয়ে মক্কা ছেড়ে ইয়ামেন চলে যেতে চাইল এবং সে জন্য নৌকা বা সামুদ্রিক জাহাজ জাতীয় কোনো বাহন খুঁজতে লাগল। ২১৩
কুফুরীতে তার পথ-চলা ছিল অনেক দূরের এবং তার অবস্থান ছিল অতি কট্টর। এজন্য মক্কা বিজয়ের পর সে ছিল হত্যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের টার্গেটকৃতদের অন্যতম। তাকে যেখানেই পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে।
তার স্ত্রী-উম্মে হাকীম বিনত হারিস ইবন হিশাম ২১৪-স্বামীকে বাঁচাতে চাইল। তাই সে ইকরামার নিরাপত্তা ও তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করার জন্য আগে নিজে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে আরয করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! ইকরামা আপনার ভয়ে মক্কা ছেড়ে ইয়ামানের দিকে পালিয়ে গেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তা দান করুন'। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজে এবং স্বাভাবিকভাবেই বলে দিলেন, فهو آمن "সে নিরাপদ।"২১৫
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইকরামার স্ত্রীকে এটা বলেন নি যে, সে তো আবশ্যিক হত্যার তালিকাভুক্ত। তার পিছনের দীর্ঘ ইতিহাসও তুলে ধরেন নি। এটাও বলেন নি যে, 'তুমি নিজেই নব মুসলিমা, তুমি কীভাবে অন্যের জন্য সুপারিশ করতে পার?' এগুলোর কিছুই বলেন নি এবং ইকরামা কিংবা তার স্ত্রীর ওপর কোনো শর্তারোপও করেন নি। শুধু বললেন, فهو آمن "সে নিরাপদ”।
এরপর স্ত্রী উম্মে হাকীম রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বামী ইকরামাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। অনেক খোজাখোজি ও দীর্ঘ সফরের পর তাকে পেলেন-সে লোহিত সাগরের কিনারায় ইয়ামেনগামী একটি জাহাজে আরোহণের চেষ্টায় রত আছে। উম্মে হাকীম রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! আমি এখন সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে বেশি আত্মিয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি। তুমি নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে এনেছি।
উত্তরে ইকরামা বললো, তুমি করতে পেরেছো এটা? স্ত্রী: হ্যাঁ। ২১৬
ইকরামা সে সময় চোখে শর্ষে ফুল দেখছিল। সে ইয়ামান যেতে চাচ্ছে অথচ ইয়ামানও তখন ইসলামের আলোয় আলোকিত। পৃথিবীর চতুর্দিকেই মানুষ দলে দলে ইসলামের সু-শীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে কিংবা বশ্যতা স্বীকার করে থাকতে শুরু করছে। গোটা পৃথিবী তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তাই সে দীর্ঘ চিন্তা-ফিকির বাদ দিয়ে তৎক্ষনাত স্ত্রীর সাথে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিল।
ইকরামা মক্কায় ফিরে আসছে। সে এখনো মক্কায় প্রবেশ করে নি এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে বলছেন,
يأتيكم عكرمة بن أبي جهل مؤمنا مهاجرا، فلا تسبوا أباه، فإن سب الميت يؤذي الحي، ولا يبلغ الميت».
"ইকরামা কুফুরী ছেড়ে ইসলাম গ্রহণের জন্য তোমাদের নিকট আসছে তোমরা তার বাবাকে গালি দিও না, কেননা মৃতদের গালি দেওয়া জীবিতদেরকে কষ্ট দেয় এবং তা মৃতদের পর্যন্ত পৌঁছে না।"২১৭
আল্লাহু আকবার! এ কেমন চরিত্র মাধুর্য্য?
আবু জাহল ছিলো এ উম্মতের ফির'আউন। তথাপি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলে ইকরামার সামনে তাকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন। যেন ইকরামার অনুভুতিতে আঘাত না লাগে। অথচ ইকরামা এখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নি।
ইকরামা মক্কায় প্রবেশ করেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দূর থেকে দেখলেন। দেখে কী করলেন? আবু জাহলের কথা মনে করলেন? যে সব যুদ্ধে ইকরামা ইসলামের বিরুদ্ধে নিজের সৌর্য-বির্য প্রদর্শন করেছিল সে সকল যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলেন। মাত্র কয়েক দিন পূর্বে খানদামায় ইকরামা যে মুসলিমদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল তার কথা ভাবছিলেন নাকি ইকরামার বর্তমান দুরাবস্থার কথা ভেবে তাকে ইসলামের শক্তি ও ক্ষমতা দেখিয়ে ছাড়ার মনস্থ করলেন?
না, পৃথিবীর অন্য সাধারণ রাজনীতিকদের মতো এ ধরণের কোনো কিছুই তিনি করলেন না; বরং তিনি খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন যে, তার শরীরে চাদরও ছিল না। ২১৮ ইকরামা ইবন আবু জাহল ফিরে আসছে এ জন্য তাঁর অবয়বে খুশীর বদনদীপ্তি ফুটে উঠেছে। অথচ সে এখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নি। এটি কোনো কৃত্তিমতা নয় বরং এটি ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবজাত প্রকৃতি।
ইকরামা এসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বসে বলল, 'হে মুহাম্মদ! এ (নিজ স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে) আমাকে বলেছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াই বললেন, 'হ্যাঁ, সে সত্য বলেছে, তুমি নিরাপদ'। ইকরামা বলল, এখন আপনি আমাকে কী করতে বলেন? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাকে আহ্বান করছি যে, তুমি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, এবং আমি আল্লাহর রাসূল। সালাত আদায় করবে। যাকাত দেবে। এভাবে ইসলামের বিধি-বিধান ও যাবতীয় উত্তম গুণাবলীর কথা উল্লেখ করলেন। ইকরামা বলল, আপিন আমাকে সত্য, সুন্দর ও ভালোর দিকেই আহ্বান করেছেন।
মানুষের অন্তর তো দয়াময় আল্লাহর কুদরতি আঙ্গুলের মাঝে, তিনি যার অন্তরকে যখন যেদিকে ইচ্ছা ফিরিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতক্ষণ যা বললেন এসব কথা হিজরতের পূর্বে মক্কী জীবনেও সত্য ছিল, হিজরত পরবর্তী মাদানী জীবনেও সত্য ছিল এবং মক্কা বিজয়ের পর এতদিনও সত্যই ছিল এবং অহী ও নবুওয়াতেরই অংশ ছিল; কিন্তু এতদিন পরে ইকরামা ইবন আবু জাহলের বুঝে আসছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সত্য, সুন্দর ও ভালোর দিকেই আহ্বান করছেন এবং এ পর্যায়ে এসে ইকরামা বলছেন যে, আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে যে দিকে আহ্বান করছেন সব সময় আপনি সে দিকেই আহ্বান করতেন আর আপনি আমাদের মধ্যে আচরণে সবচেয়ে সদাচারী, কথায় সবচেয়ে সত্যবাদী, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
মুহুর্তের ব্যবধানেই কাফির সৈন্য ইকরামা ইসলামের সৈনিকে রূপান্তরিত হয়ে গেল। এরপরে ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে উত্তম জিনিস শিক্ষা দিন'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তুমি বল যে,
أشهد أن لا إلاه إلا الله وأن محمدا عبده و رسوله
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।"
ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, এরপর কী? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বল যে, আমি আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে এবং উপস্থিত সকলকে স্বাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি মুসলিম, মুহাজির ও মুজাহিদ। ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু হুবহু সে কথাগুলোই বললেন। অতঃপর এ নও মুসলিম ইকরামাকে ইসলামের সাথে আরো আন্তিরকভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আজকে তুমি আমার নিকট যা চাইবে কাউকে না দিলেও আমি তোমাকে দেব'। ইকরামা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কোনো ধন-সম্পদ, মান-সম্মান কিংবা নেতৃত্ব কিছুই চাইলেন না; বরং তিনি চাইলেন ক্ষমা। তিনি বললেন, 'আমি আপনার নিকট চাই যে, আপনি আমার সকল শত্রুতা, সকল পদক্ষেপ, সামনা-সামনি সকল মুকাবিলা এবং আপনার সামনে বা পেছনে যত কটুক্তি করেছি সব কিছুর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন'।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আল্লাহ! সে আমার বিরুদ্ধে যত শত্রুতা করেছে এবং আপনার দীনের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যত স্থানে যত সফর করেছে সেগুলোর জন্য আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং সে আমার সামনে বা পেছনে আমার যত সম্মানহানী করেছে আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন।" এটা শুনে ইকরামা রাদিযাল্লাহু 'আনহু বললেন, 'আমি সন্তুষ্ট, হে আল্লাহর রাসূল!' এবং তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরো বললেন, 'এতদিন আমি আল্লাহর পথের বিরুদ্ধে যত সম্পদ ব্যয় করেছি, এখন থেকে আল্লাহর পথে তার দ্বিগুণ ব্যয় করবো, এতদিন আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরানোর জন্য যত লড়াই করেছি, এখন থেকে আল্লাহর পথে এর দ্বিগুণ নিজেকে বিলিয়ে দিবো'। ২১৯ বাস্তবেও তিনি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য নিজের পরবর্তী পুরা জীবনটাকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। কখনো ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযানে আবার কখনো শামের কোনো না কোনো বিজয়াভিযানে। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাকে গ্রহণ করা, নিরাপত্তা দেওয়া ও অতীতের সব কালো অধ্যায়কে ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ তা'আলা তার জীবনকে পরিপূর্ণ পাল্টে দিলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতইনা সুন্দর কথা বলেছেন,
«لأن يهدي الله بك رجلا واحدا خير لك من حمر النعم»
"তোমার দ্বারা একজন ব্যক্তির হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া তোমার জন্য অনেকগুলো লাল উটের চেয়েও উত্তম।”২২০ অন্য বর্ণনায় আছে, যার উপর সূর্য উদিত হয় (অর্থাৎ গোটা পৃথিবী) তার চেয়েও উত্তম। ২২১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ান ও ইকরামার সাথে যেমন আচরণ করেছেন এরা দুজন ছাড়া অন্য অনেকের সাথেও একই আচরণ করেছেন। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে তাঁর আচরণ ছিল সবদিক থেকেই ইতিহাসের অপূর্ব ও চমৎকার ঘটনা।

টিকাঃ
২১২. খানদামা মক্কার নিকটবর্তী একটি স্থান। ইবনুল আসীর বলেছেন, খানদামা হচ্ছে মক্কার একটি প্রসিদ্ধ পাহাড়ের নাম। ইবন বারীয় বলেছেন, মক্কা বিজয়ের দিন সেখানে একটি সংঘর্ষ ঘটেছিল। অধিকতর জানতে- ফিরোযাবাদী: আল-কামুসুল মুহীত (১৪২৭), ইবনুল আসীর: আন-নিহায়াতু ফী গারীবিল আসার (২/১৬১)।
২১৩. তারীখুত-তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়াল মুলুক (২/১৬০)
২১৪. উম্মে হাকীম বিনত হারিস ইবন হিশাম, ইকরামার চাচাতো ভাই। মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা ও নিরাপত্তা চেয়ে নিয়ে তাকে খুঁজে বের করলেন এবং ইকরামাও ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর উভয়ে পূর্বের বিয়েতেই বহাল থাকলেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/৩২৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১১৯৭৩)।
২১৫. মুহাম্মদ ইবন হাসান আশ-শায়বানী-এর সূত্রে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক রহ. (৬০১)।
২১৬. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৯৬)।
২১৭. মুহাম্মদ ইবন হাসান আশ-শায়বানী এর সূত্রে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক রহ. (৬০১), মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৬৯), ইমাম যাহাবী হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন।
২১৮. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৬৯)।
২১৯. মুসতাদরাকে হাকিম (৩/২৭০)।
২২০. সহীহ বুখারী: (كتاب المناقب، باب مناقب علي بن أبي طالب) সাহাল ইবন সা'দ-এর সূত্রে, হাদীস নং ৩৪৯৮; সহীহ মুসলিম: (كتاب فضائل الصحابة، باب فضائل علي بن أبي طالب) হাদীস নং ২৪০৬।
২২১. মুসতাদরাকে হাকিম: আবু রাফে' সূত্রে (৬৫৩৭), তাবরানী: আল-মু'জামুল কাবীর (৯৩০)।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 সফওয়ান ইবন উমাইয়ার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


উত্তরসূরী হিসাবে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াও ইকরামার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। তার পিতাও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোরতর শত্রু ছিল। বদর যুদ্ধে সে নিহত হয়েছিল। সাফওয়ান এ ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে নিজের সর্ব শক্তি ব্যয় করতে নেমে পড়েছে। উহুদ যুদ্ধে পেছন থেকে আক্রমনকারীদের মধ্যে খালেদ ইবন ওয়ালীদদের সাথে এ সাফওয়ানও ছিলো। সত্তরজন সাহাবী হত্যায় এরই ভুমিকা ছিল অন্যতম। আহযাবের যুদ্ধেও সে অংশ নিয়েছিলো। মক্কার অভ্যন্তরে রণ-প্রস্তুতিতে লিপ্তদের তালিকায়ও ছিলো সে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যা চেষ্টায় সে এক স্বতন্ত্র পরিকল্পনা এঁকেছিলো। তারই চাচাতো ভাই উমায়ের ইবন ওয়াহাব তখনো ইসলাম গ্রহণ করে নি। সে তার সাথে চুক্তি করেছিলো যে, উমায়ের যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারে তাহলে সে উমায়েরের পরিবারের যাবতীয় ভরণ-পোষণ ও তার সকল ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেবে। তবে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। উমায়ের ইবন ওয়াহাব ২২২ মদীনায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাফওয়ান ও তার মাঝে সংঘটিত চুক্তির সব কথা অগ্রীম বলে দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়ে যান।
দিন অনেক কেটে গেল। মক্কা বিজয় হয়ে গেল। সফওয়ান পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। মক্কায় পালাবার কোনো স্থান খুঁজে পেল না। তার জানা হয়ে গেছে যে, আরব উপদ্বীপের কোথাও কেউ তাকে ঠাঁই দেবে না। ততক্ষণে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সে স্থীর করলো, সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। এ লক্ষ্যে সে ইয়াসার নামীয় তার এক গোলামকে সাথে নিয়ে লোহিত সাগরের দিকে রওয়ানা করলো। গোলাম ছাড়া তার সাথে আর কেউই ছিল না। ঐ সময় সে ছিল মানসিক বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে। হঠাৎ সে পেছনে অনেক দূরে একজন ব্যক্তিকে তাদের অনুসরণ করতে দেখল এবং ইয়াসারকে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমার নাশ হোক, পেছনে দেখ কাকে দেখা যায়?!' গোলাম ইয়াসার বলল, এ হচ্ছে উমায়ের ইবন ওয়াহাব। সফওয়ান বলল, উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে দিয়ে আমার কী হবে...?! আল্লাহর শপথ! সে আমাকে হত্যা করার জন্যই আসছে। সে মুহাম্মাদের দলভুক্ত হয়ে গেছে। আর মুহাম্মাদ এখন আমার উপর বিজয়ী। ইতোমধ্যে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিকটে এসে গেছেন। সাফওয়ান তাকে লক্ষ্য করে বলল, 'উমায়ের! তুমি আমার সাথে অনেক করেছ। তোমার ঋণ ও পরিবারের বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছ। আর এখন আমাকে হত্যা করতে এসেছ'। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবুল ওয়াহাব! আমার জীবন তোমার জন্য কুরবান হোক, আমি এখন সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে অধিক সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি।
উমায়ের ইবন ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন জানতে পারলেন যে, তার পুরোনো দিনের বন্ধু চাচাতো ভাই সাফওয়ান মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তখন তার দয়া হলো। তিনি দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রপতি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে গেছে। সে আশংকা করছে যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দেবেন না। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি তাকে নিরাপত্তা দিলাম'। এমনই তাঁর আচরণ ছিল সাফওয়ানের সাথে যেমন ছিল ইকরামার সাথে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটিই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাইফ স্টাইল।
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সাফওয়ানকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। সাফওয়ানের মনে ভয় ঢুকে গেল। সে বলল, আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার কথার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না আনলে আমি তোমার সাথে যাবো না। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারের দিকে ছুটলেন। লোহিত সাগরের পাড় থেকে মক্কা প্রায় আট কিলোমিটারের পথ তিনি সর্ব শক্তি ব্যয় করে দৌড়ে পাড়ি দিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে যাওয়া সফওয়ানের নিকট থেকে এসেছি। আমি তাকে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদানের সংবাদ দিয়েছি; কিন্তু সে কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার সাথে আসবে না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার এ পাগড়ি নিয়ে যাও তার কাছে!' উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সফওয়ানের কাছে ফিরে এসে পাগড়ি দেখিয়ে তাকে বললেন, হে আবুল ওয়াহাব! আমি এমন ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী, সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সবচেয়ে সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তি। যার গৌরব তোমারই গৌরব। যার সম্মান তোমারই সম্মান। যার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব। সে তোমারই আপন (বংশীয়) 224 ভাই। আত্মহত্যা করার ব্যাপারে আমি তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। সফওয়ান অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বলল, আমার আশংকা হচ্ছে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, না। তিনি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেছেন। তুমি গ্রহণ করলে তো ভালো। অন্যথায় তিনি তোমাকে নিরাপত্তার সাথে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদান্যতা দেখুন! সফওয়ান যদি ইসলাম গ্রহণে রাজি হয় তাহলে তো সে মুসলিমদের মতো সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করবে। আর যদি সে এখনো ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানায় তাহলে সে পূর্ণ দুই মাস চিন্তা-ভাবনার জন্য অবকাশ পাবে এবং এ দুই মাস সে মুসলিমদের মতোই পরিপূর্ণ নিরাপত্তা পাবে!
সাফওয়ান উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ফিরে এলো। মসজিদে হারাম প্রবেশ করলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করছিলেন। তারা সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
সাফওয়ান জানতে চাইল: উমায়ের, দিনে রাতে তোমরা কয়বার সালাত আদায় কর?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু: পাঁচ বার।
সাফওয়ান: সব সালাতেই কি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইমামতি করেন?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু: হ্যাঁ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরিয়ে সালাত থেকে অবসর হলেন তখন সফওয়ান তাঁকে সম্বোধন করে দূর থেকেই চিল্লিয়ে উঠল, হে মুহাম্মাদ! উমায়ের আমাকে আপনার পাগড়ি দেখিয়ে বলেছে, আপনি নাকি আমাকে আসতে বলেছেন এবং আপনার দাওয়াতে সাড়া না দিলে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ সরলভাবে বললেন, এসো হে আবু ওয়াহাব! (দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়ের সাথে তাকে তার উপনাম দ্বারা ডাকছেন।)
সাফওয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, না। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমাকে চার মাস অবকাশ দিলাম।
বাস্তবেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিন্তা-ভাবনার জন্য চার মাস অবকাশ দিয়ে দিলেন! 225
কিছুদিন পর হুনাইন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে মুসলিমদের কিছু লৌহবর্ম ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সফওয়ান ছিল মক্কার প্রসিদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে সময় সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ছাড়া গোটা মক্কাবাসী সবাই মুসলিম। এতো কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুর্বলতা ও দুরাবস্থার সুযোগ নিলেন না; বরং তিনি তার নিকট থেকে কিছু অস্ত্র ভাড়া নিলেন।
যুদ্ধের দিন মুসলিমদের সাথে সফওয়ানও তার ভাড়া দেওয়া যুদ্ধাস্ত্রের দেখা-শুনার জন্য বেরিয়েছে। হুনাইন যুদ্ধে প্রথমে মুসলিমদের মনোবল ভেঙ্গে গেলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে অসাধারণ ঐশ্বরিক সাহায্য এসেছিল এবং মুসলিমরা এতো বেশি গনীমতের সম্পদ অর্জন করেছে যা আরবের লোকেরা কখনো চোখেও দেখে নি। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে ইতিহাসের কোনো সেনাপ্রধানই যা করেন নি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। তিনি সকল সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বেশি বেশি করে ভাগ করে দিয়ে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। অনেক নও মুসলিমদেরকে মন গলানোর জন্য শত শত উট, বকরী দিয়ে দিলেন, যা তাদের বিবেককেও হয়রান করে দিয়েছে। 226 এমনকি অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমরাও সেদিন লজ্জা-শরম সব ভুলে গিয়ে বারবার চাইলেন, বারবার হাত পাতলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেদিন কারো আবেদনকেই ফিরিয়ে দেন নি, কোনো প্রার্থীকেই বঞ্চিত করেন নি।
সাফওয়ান দূরে দাঁড়িয়ে গনীমতের সম্পদ বণ্টন দেখছে আর আফসোস করছে। সে তো এখনো অমুসলিম, সে তো যুদ্ধাস্ত্রের ভাড়া ছাড়া আর কিছুই পাবে না। কিন্তু এরপরের মুহুর্তে যা ঘটেলো তা সফওয়ান স্বপ্নেও ভাবে নি। উপস্থিতদের মধ্যেও কেউ কল্পনা করতে পারে নি। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই শুনবে অবাক হয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ানকে ডাকলেন। মক্কার অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমদের মতো সাফওয়ানকেও এক শত উট দিয়ে দিলেন! দানশীলতা ও বদান্যতায় বিশ্ব-রেকর্ড করা ব্যক্তি হলেও কোনো মানব সন্তান দ্বারা কি এ ধরণের আচরণ সম্ভব?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, সাফওয়ান হুনাইনের উপাত্যকাগুলোর দিকে স্থীর তাকিয়ে রয়েছে যেগুলো উট ও বকরীতে ভর্তি হয়ে আছে। সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তার মধ্যে হতভম্ব ও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নম্র ও শান্ত স্বরে বললেন, হে আবু ওয়াহাব! তোমার কি এটি (উট ও বকরীতে ভর্তি একটি উপাত্যকার দিকে ইঙ্গিত করে) খুব পছন্দ হয়? সাফওয়ান অতি স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, হ্যাঁ। আর স্বীকার করতেই হবে সে দৃশ্য ছিল বাস্তবেই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অবাক করে দিয়ে একেবারে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, 'এ উপাত্যকা এবং এর মাঝে যত সম্পদ আছে সব তোমার'! 227
বিস্ময় তাকে হতবুদ্ধি করে ফেলল। আজ তার চোখের সামনে সে বাস্তব-সত্য উদ্ভাসিত হয়ে গেছে এতদিন যা সে বুঝতে পারে নি। সে আর কিছুই ভাবতে পারলো না। অকপটেই, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে বলে উঠল, 'নবী স্বত্তা ছাড়া এমন আচরণ আর কেউ করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সেখানেই মুসলিম হয়ে গেলেন। এরপর সফওয়ান ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দিয়েছেন। অনেক অনেক দিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত। আর (নিরাপত্তা, অবকাশ ও অগণিত সম্পদ) 228 দিতে দিতে এখন তিনি হলেন আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 229
কতইনা সৌভাগ্য সফওয়ানের...!
কতইনা সৌভাগ্য বনু জুমাহ গোত্রের যাদের অধিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন...!
কতইনা সৌভাগ্য মক্কাবাসীর...!
কতইনা সৌভাগ্য মুসলিমদের, যাদের দলে মক্কার প্রসিদ্ধ নেতা সফওয়ান ইবন উমাইয়া যোগদান করে আল্লাহর পথের খাঁটি মুজাহিদ হয়ে গেছেন...! আর এসব কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে উট-বকরীতে পূর্ণ একটি উপত্যকার বিনিময়ে।
এ উট ও বকরীগুলোর মূল্য কতই আর হবে?
এগুলো হয়তো খেয়ে ফেলা হবে কিংবা বয়সকালে মারা যাবে...।
শুধু উট ও বকরী কেন, এ ধ্বংসশীল গোটা পৃথিবীর মূল্যই বা কত! চিরসুখের এবং মহা-অমূল্য নি'আমত তো জান্নাতের নি'আমত। আর এ সামান্য এক উপাত্যকা ভর্তি উট-বকরীর বিনিময়ে সফওয়ান থেকে নিয়ে কতগুলো মানুষ চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হয়ে গেলো!
দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনামূলক মান নির্ণয় এবং কিছু গনীমতের মালের বিপরীতে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুচিত, যৌক্তিক ও অতি উন্নত বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা-ধারা নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তুলনা করে তিনি যা স্থীর করলেন এটা কি প্রজ্ঞাময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একশ ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো না?
গনীমতের মালের বিনিময়ে ইসলাম গ্রহণ..।
দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত..।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, গনীমতের মাল যত বেশিই হোক না কেন - একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের বিনিময় হিসেবে কিছুই না। শুধু গনীমতের মালই নয়, গোটা বিশ্বটাই তাঁর কাছে তুচ্ছ। তাই তিনি কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই এতগুলো সম্পদ দিয়ে দিলেন। দুনিয়ার মূল্য তো তাঁর নিকট মাছির ডানা পরিমানও নয়। তাঁর দৃষ্টিতে তো আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হচ্ছে বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ফোটা পানির ন্যায়। দুনিয়াকে তো তিনি ছোট ছোট কান বিশিষ্ট (বিশ্রী) মরা-পঁচা ছাগলছানার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করেন। দুনিয়া সম্পর্কে এসব দর্শন শুধু থিওরিক্যালই নয়; বরং সমসাময়িক সকলেই তাঁর প্রাকটিক্যাল লাইফে এবং সাহাবীদের জীবনেও এর সু-স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মুসলিম কিংবা অমুসলিম যারাই তাঁর সাথে উঠা-বসা চলা-ফেরা করেছেন সকলেই তা লক্ষ্য করেছেন।
হুনাইনের গনীমত থেকে তিনি নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না!
দু-এক বছরের দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা জীবিকা নির্বাহ পরিমাণও না। অথচ তখন তাঁর বয়স ষাটেরও উপরে। তাঁর জন্য কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না দেখে উপস্থিত লোকদের বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পাওয়ার উপক্রম হলো। তারা কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেল। এদিকে গ্রাম্য লোকেরা নিজেদের জন্য কিছু ধন-সম্পদ ও জীব-জন্তু চেয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে ভিড়াভিড়ি ও পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। অথচ তিনি তখন একজন বিজয়ী সম্রাট ও সেনাপতি। ভিড়াভিড়ির ফাঁকে তারা তাঁর শরীরের চাদরটিও নিয়ে নিল। তিনি একজন মমতাময়ী নবী ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অত্যন্ত নম্র ও কোমল স্বরে বললেন,
«أيها الناس! ردوا علي ردائي، فوالذي نفسي بيده لو كان لكم عندي عدد شجر تهامة نعما لقسمته عليكم، ثم لا تجدوني بخيلا ولا جبانا ولا كذابا
"হে লোক সকল! তোমরা আমার চাদর আমাকে ফিরিয়ে দাও, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! আমার নিকট যদি তিহামা ²³⁰ অঞ্চলের/এ নিম্ন ভূমির বৃক্ষরাজি পরিমানও উট থাকতো তাহলে আমি তাও তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম এরপরও তোমরা আমাকে কৃপন, কাপুরুষ ও মিথ্যাবাদী হিসেবে দেখবে না।"²³¹
বাস্তবেও তিনি কোনো কৃপনতা, কাপুরুষতা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি।
এ সব শত্রুনেতাদের সাথে যা ঘটেছে হুবহু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সুহাইল ইবন আমরের ক্ষেত্রেও।

টিকাঃ
২২২. উমায়ের ইবন ওয়াহাব আল-জামহী আল-ক্বারশী। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষাবলম্বী হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো। তবে পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/২৯৪), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৭৯৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৬০৫৮)
২২৩. আবু ফুকাইহা ইয়াসার। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার গোলাম ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তার নিকটে নিপীড়ীত সাহাবীরা তথা খাব্বাব, আম্মার ও আবু ফুকাইহা ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহুম-গণ বসতেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৫/২৪৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১০৩৮৪)।
224. অনুবাদক।
225. পূর্ণ ঘটনাটি ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে (১১৩৩), মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: যুহরী থেকে (১২৬৪৬)
226. মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় নও মুসলিম। ইমানের দুর্বালতা হেতু তাদের পূর্বা জাতিয়তাবোধ যেন তাদেরকে কাফিরদের পক্ষাবলম্বনের দিকে নিয়ে না যায় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া ও তাদের মন গলানোর মতো আচরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন। আবার যেন এতে তারা নিজেদের অধীনস্তদেরকেও ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এদের মধ্যে ছিলেন, আকরা' ইবন হাবিস আত-তামীমী, আব্বাস ইবন মিরদাস আস-সুলামী, উয়াইনাহ ইবন হিসন আল-ফাযারী ও আবু সুফিয়ান ইবন হারব। সূত্র: আল্লামা ইবন মনযূর: লিসানুল আরব (৯/৯)।
227. ইবনু সাইয়্যিদিন নাস: উয়ুনুল আসার (২/২৫৩-৪৩৪)।
228. অনুবাদক।
229. সহীহ মুসলিম: (كتاب الفضائل، باب ما سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا قط فقال: لا وكثرة عطائه) হাদীস নং ২৩১৩।
230. তিহামাহ হচ্ছে নিম্নভূমি/হিজাযের একটি এলাকার নাম সূত্র: আল-মুজামুল ওয়াফী। (৩৩১)। -অনুবাদক।
231. সহীহ বুখারী: (كتاب الخمس، باب ما كان النبي صلى الله عليه وسلم يعطي المؤلفة قلوبهم) : যুবাইর ইবন মুত'ইম সূত্রে হাদীস নং ২৯৭৯, ইবন হিব্বান হাদীস নং ৪৮২০, আমর ইবন শু'আইব থেকে ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুআত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. হাদীস নং ৯৭৭।

উত্তরসূরী হিসাবে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াও ইকরামার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলো না। তার পিতাও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোরতর শত্রু ছিল। বদর যুদ্ধে সে নিহত হয়েছিল। সাফওয়ান এ ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে নিজের সর্ব শক্তি ব্যয় করতে নেমে পড়েছে। উহুদ যুদ্ধে পেছন থেকে আক্রমনকারীদের মধ্যে খালেদ ইবন ওয়ালীদদের সাথে এ সাফওয়ানও ছিলো। সত্তরজন সাহাবী হত্যায় এরই ভুমিকা ছিল অন্যতম। আহযাবের যুদ্ধেও সে অংশ নিয়েছিলো। মক্কার অভ্যন্তরে রণ-প্রস্তুতিতে লিপ্তদের তালিকায়ও ছিলো সে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যা চেষ্টায় সে এক স্বতন্ত্র পরিকল্পনা এঁকেছিলো। তারই চাচাতো ভাই উমায়ের ইবন ওয়াহাব তখনো ইসলাম গ্রহণ করে নি। সে তার সাথে চুক্তি করেছিলো যে, উমায়ের যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে পারে তাহলে সে উমায়েরের পরিবারের যাবতীয় ভরণ-পোষণ ও তার সকল ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেবে। তবে পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। উমায়ের ইবন ওয়াহাব ২২২ মদীনায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাফওয়ান ও তার মাঝে সংঘটিত চুক্তির সব কথা অগ্রীম বলে দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়ে যান।
দিন অনেক কেটে গেল। মক্কা বিজয় হয়ে গেল। সফওয়ান পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। মক্কায় পালাবার কোনো স্থান খুঁজে পেল না। তার জানা হয়ে গেছে যে, আরব উপদ্বীপের কোথাও কেউ তাকে ঠাঁই দেবে না। ততক্ষণে ইসলাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সে স্থীর করলো, সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে। এ লক্ষ্যে সে ইয়াসার নামীয় তার এক গোলামকে সাথে নিয়ে লোহিত সাগরের দিকে রওয়ানা করলো। গোলাম ছাড়া তার সাথে আর কেউই ছিল না। ঐ সময় সে ছিল মানসিক বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে। হঠাৎ সে পেছনে অনেক দূরে একজন ব্যক্তিকে তাদের অনুসরণ করতে দেখল এবং ইয়াসারকে লক্ষ্য করে বলল, 'তোমার নাশ হোক, পেছনে দেখ কাকে দেখা যায়?!' গোলাম ইয়াসার বলল, এ হচ্ছে উমায়ের ইবন ওয়াহাব। সফওয়ান বলল, উমায়ের ইবন ওয়াহাবকে দিয়ে আমার কী হবে...?! আল্লাহর শপথ! সে আমাকে হত্যা করার জন্যই আসছে। সে মুহাম্মাদের দলভুক্ত হয়ে গেছে। আর মুহাম্মাদ এখন আমার উপর বিজয়ী। ইতোমধ্যে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নিকটে এসে গেছেন। সাফওয়ান তাকে লক্ষ্য করে বলল, 'উমায়ের! তুমি আমার সাথে অনেক করেছ। তোমার ঋণ ও পরিবারের বোঝা আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছ। আর এখন আমাকে হত্যা করতে এসেছ'। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, 'হে আবুল ওয়াহাব! আমার জীবন তোমার জন্য কুরবান হোক, আমি এখন সবচেয়ে সদাচারী ও সবচেয়ে অধিক সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি।
উমায়ের ইবন ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু যখন জানতে পারলেন যে, তার পুরোনো দিনের বন্ধু চাচাতো ভাই সাফওয়ান মক্কা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তখন তার দয়া হলো। তিনি দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রপতি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে গেছে। সে আশংকা করছে যে, আপনি তাকে নিরাপত্তা দেবেন না। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমি তাকে নিরাপত্তা দিলাম'। এমনই তাঁর আচরণ ছিল সাফওয়ানের সাথে যেমন ছিল ইকরামার সাথে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটিই হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাইফ স্টাইল।
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সাফওয়ানকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। সাফওয়ানের মনে ভয় ঢুকে গেল। সে বলল, আল্লাহর শপথ! তুমি তোমার কথার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না আনলে আমি তোমার সাথে যাবো না। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারের দিকে ছুটলেন। লোহিত সাগরের পাড় থেকে মক্কা প্রায় আট কিলোমিটারের পথ তিনি সর্ব শক্তি ব্যয় করে দৌড়ে পাড়ি দিলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য পালিয়ে যাওয়া সফওয়ানের নিকট থেকে এসেছি। আমি তাকে আপনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদানের সংবাদ দিয়েছি; কিন্তু সে কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার সাথে আসবে না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'আমার এ পাগড়ি নিয়ে যাও তার কাছে!' উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সফওয়ানের কাছে ফিরে এসে পাগড়ি দেখিয়ে তাকে বললেন, হে আবুল ওয়াহাব! আমি এমন ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি যিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সদাচারী, সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও সবচেয়ে সু-সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তি। যার গৌরব তোমারই গৌরব। যার সম্মান তোমারই সম্মান। যার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব। সে তোমারই আপন (বংশীয়) 224 ভাই। আত্মহত্যা করার ব্যাপারে আমি তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। সফওয়ান অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বলল, আমার আশংকা হচ্ছে আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, না। তিনি তোমাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করেছেন। তুমি গ্রহণ করলে তো ভালো। অন্যথায় তিনি তোমাকে নিরাপত্তার সাথে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদান্যতা দেখুন! সফওয়ান যদি ইসলাম গ্রহণে রাজি হয় তাহলে তো সে মুসলিমদের মতো সব সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করবে। আর যদি সে এখনো ইসলাম গ্রহণে অসম্মতি জানায় তাহলে সে পূর্ণ দুই মাস চিন্তা-ভাবনার জন্য অবকাশ পাবে এবং এ দুই মাস সে মুসলিমদের মতোই পরিপূর্ণ নিরাপত্তা পাবে!
সাফওয়ান উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ফিরে এলো। মসজিদে হারাম প্রবেশ করলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সাহাবীদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করছিলেন। তারা সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
সাফওয়ান জানতে চাইল: উমায়ের, দিনে রাতে তোমরা কয়বার সালাত আদায় কর?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু: পাঁচ বার।
সাফওয়ান: সব সালাতেই কি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইমামতি করেন?
উমায়ের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু: হ্যাঁ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাম ফিরিয়ে সালাত থেকে অবসর হলেন তখন সফওয়ান তাঁকে সম্বোধন করে দূর থেকেই চিল্লিয়ে উঠল, হে মুহাম্মাদ! উমায়ের আমাকে আপনার পাগড়ি দেখিয়ে বলেছে, আপনি নাকি আমাকে আসতে বলেছেন এবং আপনার দাওয়াতে সাড়া না দিলে দুই মাস অবকাশ দিয়েছেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহজ সরলভাবে বললেন, এসো হে আবু ওয়াহাব! (দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়ের সাথে তাকে তার উপনাম দ্বারা ডাকছেন।)
সাফওয়ান ভয়ে ভয়ে বলল, না। আল্লাহর শপথ! আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বরং তোমাকে চার মাস অবকাশ দিলাম।
বাস্তবেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চিন্তা-ভাবনার জন্য চার মাস অবকাশ দিয়ে দিলেন! 225
কিছুদিন পর হুনাইন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হলে মুসলিমদের কিছু লৌহবর্ম ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সফওয়ান ছিল মক্কার প্রসিদ্ধ অস্ত্র ব্যবসায়ী। সে সময় সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ছাড়া গোটা মক্কাবাসী সবাই মুসলিম। এতো কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুর্বলতা ও দুরাবস্থার সুযোগ নিলেন না; বরং তিনি তার নিকট থেকে কিছু অস্ত্র ভাড়া নিলেন।
যুদ্ধের দিন মুসলিমদের সাথে সফওয়ানও তার ভাড়া দেওয়া যুদ্ধাস্ত্রের দেখা-শুনার জন্য বেরিয়েছে। হুনাইন যুদ্ধে প্রথমে মুসলিমদের মনোবল ভেঙ্গে গেলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে অসাধারণ ঐশ্বরিক সাহায্য এসেছিল এবং মুসলিমরা এতো বেশি গনীমতের সম্পদ অর্জন করেছে যা আরবের লোকেরা কখনো চোখেও দেখে নি। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে ইতিহাসের কোনো সেনাপ্রধানই যা করেন নি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করলেন। তিনি সকল সম্পদ মুজাহিদদের মাঝে বেশি বেশি করে ভাগ করে দিয়ে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। অনেক নও মুসলিমদেরকে মন গলানোর জন্য শত শত উট, বকরী দিয়ে দিলেন, যা তাদের বিবেককেও হয়রান করে দিয়েছে। 226 এমনকি অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমরাও সেদিন লজ্জা-শরম সব ভুলে গিয়ে বারবার চাইলেন, বারবার হাত পাতলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেদিন কারো আবেদনকেই ফিরিয়ে দেন নি, কোনো প্রার্থীকেই বঞ্চিত করেন নি।
সাফওয়ান দূরে দাঁড়িয়ে গনীমতের সম্পদ বণ্টন দেখছে আর আফসোস করছে। সে তো এখনো অমুসলিম, সে তো যুদ্ধাস্ত্রের ভাড়া ছাড়া আর কিছুই পাবে না। কিন্তু এরপরের মুহুর্তে যা ঘটেলো তা সফওয়ান স্বপ্নেও ভাবে নি। উপস্থিতদের মধ্যেও কেউ কল্পনা করতে পারে নি। কিয়ামত পর্যন্ত যারাই শুনবে অবাক হয়ে যাবে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফওয়ানকে ডাকলেন। মক্কার অনেক নেতৃস্থানীয় নও মুসলিমদের মতো সাফওয়ানকেও এক শত উট দিয়ে দিলেন! দানশীলতা ও বদান্যতায় বিশ্ব-রেকর্ড করা ব্যক্তি হলেও কোনো মানব সন্তান দ্বারা কি এ ধরণের আচরণ সম্ভব?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, সাফওয়ান হুনাইনের উপাত্যকাগুলোর দিকে স্থীর তাকিয়ে রয়েছে যেগুলো উট ও বকরীতে ভর্তি হয়ে আছে। সম্পদের প্রাচুর্য দেখে তার মধ্যে হতভম্ব ও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নম্র ও শান্ত স্বরে বললেন, হে আবু ওয়াহাব! তোমার কি এটি (উট ও বকরীতে ভর্তি একটি উপাত্যকার দিকে ইঙ্গিত করে) খুব পছন্দ হয়? সাফওয়ান অতি স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, হ্যাঁ। আর স্বীকার করতেই হবে সে দৃশ্য ছিল বাস্তবেই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অবাক করে দিয়ে একেবারে সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, 'এ উপাত্যকা এবং এর মাঝে যত সম্পদ আছে সব তোমার'! 227
বিস্ময় তাকে হতবুদ্ধি করে ফেলল। আজ তার চোখের সামনে সে বাস্তব-সত্য উদ্ভাসিত হয়ে গেছে এতদিন যা সে বুঝতে পারে নি। সে আর কিছুই ভাবতে পারলো না। অকপটেই, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে বলে উঠল, 'নবী স্বত্তা ছাড়া এমন আচরণ আর কেউ করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সেখানেই মুসলিম হয়ে গেলেন। এরপর সফওয়ান ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে দিয়েছেন। অনেক অনেক দিয়েছেন। তিনি ছিলেন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত। আর (নিরাপত্তা, অবকাশ ও অগণিত সম্পদ) 228 দিতে দিতে এখন তিনি হলেন আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। 229
কতইনা সৌভাগ্য সফওয়ানের...!
কতইনা সৌভাগ্য বনু জুমাহ গোত্রের যাদের অধিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন...!
কতইনা সৌভাগ্য মক্কাবাসীর...!
কতইনা সৌভাগ্য মুসলিমদের, যাদের দলে মক্কার প্রসিদ্ধ নেতা সফওয়ান ইবন উমাইয়া যোগদান করে আল্লাহর পথের খাঁটি মুজাহিদ হয়ে গেছেন...! আর এসব কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জিত হয়েছে উট-বকরীতে পূর্ণ একটি উপত্যকার বিনিময়ে।
এ উট ও বকরীগুলোর মূল্য কতই আর হবে?
এগুলো হয়তো খেয়ে ফেলা হবে কিংবা বয়সকালে মারা যাবে...।
শুধু উট ও বকরী কেন, এ ধ্বংসশীল গোটা পৃথিবীর মূল্যই বা কত! চিরসুখের এবং মহা-অমূল্য নি'আমত তো জান্নাতের নি'আমত। আর এ সামান্য এক উপাত্যকা ভর্তি উট-বকরীর বিনিময়ে সফওয়ান থেকে নিয়ে কতগুলো মানুষ চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হয়ে গেলো!
দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনামূলক মান নির্ণয় এবং কিছু গনীমতের মালের বিপরীতে একজন মানুষের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুচিত, যৌক্তিক ও অতি উন্নত বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা-ধারা নয়। তাৎক্ষনিকভাবে তুলনা করে তিনি যা স্থীর করলেন এটা কি প্রজ্ঞাময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একশ ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো না?
গনীমতের মালের বিনিময়ে ইসলাম গ্রহণ..।
দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত..।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, গনীমতের মাল যত বেশিই হোক না কেন - একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের বিনিময় হিসেবে কিছুই না। শুধু গনীমতের মালই নয়, গোটা বিশ্বটাই তাঁর কাছে তুচ্ছ। তাই তিনি কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই এতগুলো সম্পদ দিয়ে দিলেন। দুনিয়ার মূল্য তো তাঁর নিকট মাছির ডানা পরিমানও নয়। তাঁর দৃষ্টিতে তো আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া হচ্ছে বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ফোটা পানির ন্যায়। দুনিয়াকে তো তিনি ছোট ছোট কান বিশিষ্ট (বিশ্রী) মরা-পঁচা ছাগলছানার চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করেন। দুনিয়া সম্পর্কে এসব দর্শন শুধু থিওরিক্যালই নয়; বরং সমসাময়িক সকলেই তাঁর প্রাকটিক্যাল লাইফে এবং সাহাবীদের জীবনেও এর সু-স্পষ্ট বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মুসলিম কিংবা অমুসলিম যারাই তাঁর সাথে উঠা-বসা চলা-ফেরা করেছেন সকলেই তা লক্ষ্য করেছেন।
হুনাইনের গনীমত থেকে তিনি নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না!
দু-এক বছরের দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা জীবিকা নির্বাহ পরিমাণও না। অথচ তখন তাঁর বয়স ষাটেরও উপরে। তাঁর জন্য কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না দেখে উপস্থিত লোকদের বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পাওয়ার উপক্রম হলো। তারা কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেল। এদিকে গ্রাম্য লোকেরা নিজেদের জন্য কিছু ধন-সম্পদ ও জীব-জন্তু চেয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে ভিড়াভিড়ি ও পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। এক পর্যায়ে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের সাথে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। অথচ তিনি তখন একজন বিজয়ী সম্রাট ও সেনাপতি। ভিড়াভিড়ির ফাঁকে তারা তাঁর শরীরের চাদরটিও নিয়ে নিল। তিনি একজন মমতাময়ী নবী ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অত্যন্ত নম্র ও কোমল স্বরে বললেন,
«أيها الناس! ردوا علي ردائي، فوالذي نفسي بيده لو كان لكم عندي عدد شجر تهامة نعما لقسمته عليكم، ثم لا تجدوني بخيلا ولا جبانا ولا كذابا
"হে লোক সকল! তোমরা আমার চাদর আমাকে ফিরিয়ে দাও, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ! আমার নিকট যদি তিহামা ²³⁰ অঞ্চলের/এ নিম্ন ভূমির বৃক্ষরাজি পরিমানও উট থাকতো তাহলে আমি তাও তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম এরপরও তোমরা আমাকে কৃপন, কাপুরুষ ও মিথ্যাবাদী হিসেবে দেখবে না।"²³¹
বাস্তবেও তিনি কোনো কৃপনতা, কাপুরুষতা কিংবা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেন নি।
এ সব শত্রুনেতাদের সাথে যা ঘটেছে হুবহু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সুহাইল ইবন আমরের ক্ষেত্রেও।

টিকাঃ
২২২. উমায়ের ইবন ওয়াহাব আল-জামহী আল-ক্বারশী। বদর যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষাবলম্বী হয়ে অংশগ্রহণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলো। তবে পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/২৯৪), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৭৯৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৬০৫৮)
২২৩. আবু ফুকাইহা ইয়াসার। সফওয়ান ইবন উমাইয়ার গোলাম ছিল। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মজলিসে বসতেন তখন তার নিকটে নিপীড়ীত সাহাবীরা তথা খাব্বাব, আম্মার ও আবু ফুকাইহা ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহুম-গণ বসতেন। অধিকতর জানতে- ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৫/২৪৯), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১০৩৮৪)।
224. অনুবাদক।
225. পূর্ণ ঘটনাটি ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে (১১৩৩), মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: যুহরী থেকে (১২৬৪৬)
226. মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় নও মুসলিম। ইমানের দুর্বালতা হেতু তাদের পূর্বা জাতিয়তাবোধ যেন তাদেরকে কাফিরদের পক্ষাবলম্বনের দিকে নিয়ে না যায় সেজন্য আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া ও তাদের মন গলানোর মতো আচরণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন। আবার যেন এতে তারা নিজেদের অধীনস্তদেরকেও ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এদের মধ্যে ছিলেন, আকরা' ইবন হাবিস আত-তামীমী, আব্বাস ইবন মিরদাস আস-সুলামী, উয়াইনাহ ইবন হিসন আল-ফাযারী ও আবু সুফিয়ান ইবন হারব। সূত্র: আল্লামা ইবন মনযূর: লিসানুল আরব (৯/৯)।
227. ইবনু সাইয়্যিদিন নাস: উয়ুনুল আসার (২/২৫৩-৪৩৪)।
228. অনুবাদক।
229. সহীহ মুসলিম: (كتاب الفضائل، باب ما سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا قط فقال: لا وكثرة عطائه) হাদীস নং ২৩১৩।
230. তিহামাহ হচ্ছে নিম্নভূমি/হিজাযের একটি এলাকার নাম সূত্র: আল-মুজামুল ওয়াফী। (৩৩১)। -অনুবাদক।
231. সহীহ বুখারী: (كتاب الخمس، باب ما كان النبي صلى الله عليه وسلم يعطي المؤلفة قلوبهم) : যুবাইর ইবন মুত'ইম সূত্রে হাদীস নং ২৯৭৯, ইবন হিব্বান হাদীস নং ৪৮২০, আমর ইবন শু'আইব থেকে ইয়াহইয়া লাইসীর বর্ণনায় মুআত্তায়ে ইমাম মালেক রহ. হাদীস নং ৯৭৭।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 সুহাইল ইবন আমরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ

📄 সুহাইল ইবন আমরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদাচরণ


শুধু কুরাইশই নয় গোটা মক্কা নগরীর প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের একজন ছিল এ সুহাইল। সে ঐ সব শত্রুনেতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাদের দীর্ঘ কালো ইতিহাস রয়েছে। অধিক বয়সী ও বহু সন্তানের অধিকারী ছিল। যাদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ী মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর এতদিন তার সাথে যে সব নেতারা ছিল তাদের কারো নিকট থেকেই কোনো সাহায্য পাওয়া গেল না। সকলেই মুসলিম সৈন্যদের সামনে দিয়েই দৌড়ে পালাল। তাই সেও পালিয়ে নিজ ঘরে গিয়ে উঠল। যেমনটি সে নিজেই বর্ণনা করছে,
'সে দিন আমি দৌড়ে এসে আমার ঘরে উঠেই দরজা বন্ধ করে দিলাম!'
সে আরো বর্ণনা করছে, 'অতঃপর আমি বিজয়ী সৈন্যদের মাঝে থাকা আমার ছেলে আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইলের নিকট খবর পাঠালাম যেন সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আমার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে নেয়। কেননা আমি আশংকা করছিলাম যে, আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে। কারণ, আমি ছিলাম সবচেয়ে দাগী অপরাধী। হুদায়বিয়ার দিন আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যা করেছি অন্য কেউ তা করে নি। আমিই সন্ধি-চুক্তি লিপিবদ্ধ করেছি। আবার উহুদ এবং বদরেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে আমি লড়েছি। ²³³
আল্লাহর পথ থেকে লোকদেরকে বিরত রাখার ব্যাপারে তার ইতিহাস ছিল অনেক দীর্ঘ। হুদায়বিয়ার দিন সে ছিল অনেক কঠোর ও একগুঁয়ে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বার বার সুফারিশের পরও তার ছেলেকে মুসলিমদের সাথে যুক্ত হতে সে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু এখন সে এমন এক মহা আশংকাজনক অবস্থানে এসে উপনীত হয়েছে যা তার প্রাণকেও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। মৃত্যুভয় তাকে এমন ভাবে গ্রাস করে নিয়েছে যে, সে তার ছোট ছেলেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে পৌঁছার অসীলাহ হিসেবে গ্রহণ করতেও দ্বিধাবোধ করে নি।
সুহাইল ইবন আমরেরই বর্ণনা: “(আমার ছেলে) আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তাকে (আমার বাবাকে) নিরাপত্তা দান করুন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো দ্বিধা-দন্ধ না করেই বললেন, ‘সে আল্লাহর নিরাপত্তা দ্বারা নিরাপদ, সে বাইরে আসতে পারে’। ”²³⁴
বর্তমান পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তখন সেখানে তারা যেরূপ আচরণ করে থাকে তার সাথে মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিপক্ষ নেতাদের সাথে আচরণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আমরা দেখতে পাই যে, পরাজিত রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ভাগ্যে হত্যা, দেশান্তর কিংবা দীর্ঘ মেয়াদী জেল-যুলুম ছাড়া আর কিছুই জোটে না। আর লাঞ্চনা ও অপদস্থতার কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রুনেতাদেরকে শুধু নিরাপত্তাই দেন নি; বরং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং যাবতীয় নিন্দাবাদ এমনকি কটাক্ষ দৃষ্টির অবসান কল্পেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। চূড়ান্ত সভ্যতা ও অসাধারণ মানবতা প্রদর্শনপূর্বক সাহাবীদেরকে তিনি বলছেন,
«فمن لقي سهيل بن عمرو فلا يشد النظر إليه»
"সুহাইল ইবন আমরের সাথে সাক্ষাৎ হলে তোমাদের কেউ যেন তার দিকে কটাক্ষ দৃষ্টিতে না তাকায়।"²³⁵
দেখুন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যের বিপদে আনন্দ প্রকাশের ভিত্তিতে হোক কিংবা শত্রুকে কাছে পেয়ে মনোতুষ্টি লাভের ভিত্তিতে কোনোভাবেই সুহাইলের প্রতি কটু দৃষ্টিপাত করতে সাহাবীদেরকে নিষেধ করেছেন। বরং আরো আগে বেড়ে তিনি তার প্রশংসা ও গুণাগুণ বর্ণনা করছেন। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন, "সুহাইল একজন জ্ঞানী ও সম্মানী মানুষ। সুহাইলের মতো ব্যক্তির ইসলামকে অনুধাবন না করে থাকার কথা না। সে বুঝতে পেরেছে যে, এতোদিন সে যার ওপর প্রতিস্থাপিত ছিল তা তার জন্য উপকারী নয়।"
সুবহানাল্লাহ! এ জাতীয় বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করার ভাষা আমাদের নেই। আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল পিতাকে নিরাপত্তা প্রাপ্তির সংবাদ দিতে গিয়ে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব বক্তব্যের কথা বললেন, তখন সুহাইল বলে উঠল, 'আল্লাহর শপথ! তিনি ছোট-বড় সকলের সাথেই সদাচারী'। ²³⁶
সুহাইল ইবন আমর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং ইসলামের পরশে ধন্য হলেন। পরবর্তী জীবনকে তিনি পরিপূর্ণাভাবে পাল্টে ফেললেন। যেমনটি বিভিন্ন রেওয়ায়াতে পাওয়া যায় যে, তিনি খুব বেশি বেশি সালাত আদায়, সাওম পালন ও দান-সদকা করতেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের একটি গ্রুপের প্রধান ছিলেন।
প্রিয় পাঠক! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৃষ্টিকর্ম দেখুন, কীভাবে তিনি মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। যা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। এটা একমাত্র সদাচরণ, অন্তরের প্রসস্ততা ও উদারতা এবং হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতা ভুলে যাওয়ার কারণেই হয়েছ।

টিকাঃ
232. আব্দুল্লাহ ইবন সুহাইল ইবন আমর আল-ক্বারশী আল-আমেরী। উপনাম আবু সুহাইল। দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। মক্কায় ফিরে আসার পরে তার পিতা তাকে ধরে বেঁধে রাখে এবং ইসলাম গ্রহণের কারণে অনেক নির্যাতন করে। বদর যুদ্ধের দিন তিনি ইসলামের কথা গোপন রেখে তার পিতার সাথে বেরিয়েছেন। যুদ্ধমাঠে এসে মুশরিকদের পক্ষ ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হয়ে যান। ১২ হিজরীতে ইয়ামামার ঘটনার দিন শহীদ হন। অধিকতর জানতে- ইবন আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৪৭৩৪)।
233. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/২১৯)।
234. ইবন আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৩/২১৯)।
235. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (২/৩৪৬)।
236. ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৫৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00