📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতা/নিরপেক্ষতা

📄 বিচার ব্যবস্থায় ন্যায়পরায়ণতা/নিরপেক্ষতা


অত্র গ্রন্থের বিগত দু'টি পরিচ্ছেদে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা দেখে যদি আমরা আশ্চর্যান্বিত হই। তাহলে এক মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে বিচার ব্যবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়-নিষ্ঠা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আদল একটি সাধারণ বিষয়। যা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের ভিন্নতায় কোনো স্বার্থ লঙ্ঘন, ভৌগলিক সম্পর্ক কিংবা দুনিয়াবী সূত্রের কারণে তারতম্যের অবকাশ রাখে না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারে এ ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্ত অনেক। তন্মধ্যে একটি হলো,
আনসার গোত্র বনী উবাইরাক ইবন যুফার ইবন হারিস-এর এক মুসলিম ব্যক্তি কতাদাহ ইবন নু'মান নামীয় এক প্রতিবেশীর একটি বর্ম চুরি করল। তার নাম ছিল ত্ব'মা ইবন উবাইরাক, অন্য এক বর্ণনা মতে তার নাম হলো বাশীর ইবন উবাইরাক। আর এ বর্মটি আটা ভরতি একটি খাপে ঢুকানো ছিল। কাজেই চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় খাপের ছিদ্র দিয়ে আটা ছড়াতে ছড়াতে নিজ ঘর পর্যন্ত গেল। তার পর সেটি যায়িদ ইবন সামীন নামীয় এক ইয়াহূদীর কাছে লুকিয়ে রাখল। অতপর ত্ব'মা ইবন উবাইরাকের কাছে বর্মের অনুসন্ধান চাইলে সে বর্ম নেয় নি মর্মে আল্লাহর নামে শপথ করল। তখন বর্মের মালিক বলল, আমি তার ঘরে আটার চিহ্ন দেখেছি। তারপরও যেহেতু সে শপথ করেছে তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো এবং সকলে মিলে আটার চিহ্ন অনুসরণ করে করে ঐ ইয়াহূদীর ঘর পর্যন্ত পৌঁছল এবং সেখানে বর্মটি পেয়ে গেল। তখন চাপের মুখে ইয়াহুদী স্বীকার করল যে, ত্ব'মা ইবন উবাইরাক আমাকে এটি দিয়েছে। ত্ব'মা ইবন উবাইরাকের এলাকাবাসী বনু যুফারের লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে তাদের সাথীর স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ইয়াহুদীর ঘরে বর্ম পাওয়া গেছে তাকে শাস্তি দেওয়ার মনস্থ করলেন। তখন সূরা নিসার নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়;
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَيْكَ اللَّهُ وَلَا تَكُن لِلْخَابِنِينَ خَصِيمًا وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا وَلَا تُجَادِلْ عَنِ الَّذِينَ يَخْتَانُونَ أَنفُسَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَانًا أَثِيمًا ﴾ [النساء: ١٠٥، ١০৭]
"নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। যারা মনে বিশ্বাসঘাতকতা পোষণ করে তাদের পক্ষ থেকে বিতর্ক করবেন না। আল্লাহ পছন্দ করেন না তাকে, যে বিশ্বাসঘাতক পাপী হয়।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১০৭]
একসাথে নিম্নের আয়াত পর্যন্ত নাযিল হয়:
﴿وَمَن يَكْسِبُ خَطِيَةً أَوْ إِثْمًا ثُمَّ يَرْمِ بِهِ بَرِيَا فَقَدِ احْتَمَلَ بُهْتَنَا وَإِثْمًا مُّبِينًا ﴾ [النساء: ১১৪ - ১১২]
“যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোনো নিরপরাধের ওপর অপবাদ আরোপ করে সে নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুনাহ।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১১২]
আটার নিদর্শন ও ঘরে বর্ম পাওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারণা ছিল যে, ইয়াহূদী লোকটিই চোর। কিন্তু তাঁর ধারণার বিপরীতে অহী নাযিল হলে তিনি তা লুকিয়ে রাখেন নি; বরং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন যে, ইয়াহুদী নিরপরাধ, চোর হচ্ছে মুসলিম ব্যক্তিটি..!
ব্যাপারটি কিন্তু এতো সহজ নয়..!!
দেখুন, সাফায়ীর ঘোষণা এসেছে ইয়াহূদী ব্যক্তির পক্ষে। যে ইয়াহুদী জাতি ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করা, ষড়যন্ত্র করা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং তাঁর অনুসারীদের মাঝে ফাটল সৃষ্টিতে সদাতৎপর থাকে। এতো কিছুর পরও এসব নেতিবাচক দিক ও প্রেক্ষাপটগুলোও একজন ইয়াহূদীকে অযথা দোষারোপ করার অনুমতি দেয় না।
আরো দেখুন, অভিযোগটি দাঁড়িয়েছে এক আনসারী মুসলিম ব্যক্তির বিপক্ষে। আপনি জানেন কি, কারা এ আনসার.?! তার ঐসব লোক যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর দূরাবস্থার সময় সাহায্য করেছে, আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভেতর বাহির সব। যারা ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার। যাদের কাঁধের উপর দিয়েই মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভীত রচিত হয়েছে। কিন্তু এসব কিছুও তাদের একজন চোরের পক্ষাবলম্বন ও সাফায়ী ঘোষণার অনুমোদন দেয় নি; যদিও প্রতিপক্ষের লোকটি একজন ইয়াহুদী। উপরন্তু এ ঘটনাটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের জন্য ইয়াহুদীদেরকে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে দেবে। ইয়াহুদীরা বলে বেড়াবে যে, দেখ, মুসলিমরা হলো চোরের জাতি। তারা নিজেরা অপরাধ করে তার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। তারা অত্যাচারীর পক্ষ অবলম্বন করে। তারা মিথ্যা কথা বলে ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের চরিত্রে ধারাবাহিক কুৎসা রটনা ও কলঙ্ক লেপনে ইয়াহুদীদের জন্য এক মহা সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে।
এতকিছুর পরও সত্যের সত্যায়ন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
এ ঘটনায় আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য শুধু একজনের দায়মুক্তি ও অন্যজনের ওপর অভিযোগ আরোপ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ ঘটনার মাধ্যমে তিনি উম্মতে মুসলিমাকে পৃথিবীর শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যাবতীয় যুলুম- নির্যাতনের মূলোৎপাটনের দীক্ষা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে মূলনীতি ঘোষণা করেছেন যে, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে কোনো স্বার্থ লঙ্ঘন, ভৌগলিক সম্পর্ক কিংবা পার্থিব কোনো ইস্যু দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে মানুষের মাঝে সত্য ফয়সালা করতে হবে।
বরাবরের মতো আবারো আমরা প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই যে, উম্মতে মুসলিমা ছাড়া অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ইতিহাসে কি এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে..?! সত্য প্রকাশ, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সততা ও উদারতা প্রদর্শনে পৃথিবীর কোনো নেতা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারে কাছেও পৌঁছতে পেরেছে..?!!
এখানে এ কথাও উল্লেখ করে দেওয়া জরুরী যে, পূর্বোক্ত ঘটনায় যে মুসলিম ব্যক্তিটি নিজে চুরি করে ইয়াহুদীর ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছিল সে ছিল প্রকৃত অর্থে মুনাফিক। যা এ ঘটনার পরে প্রকাশ পেয়েছে। ইমাম তিরমিযী বর্ণিত একটি হাদীসে এ ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাদীসটি হচ্ছে:
কাতাদাহ ইবন নু'মান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমাদের আনসারদের মধ্যে বনু উবাইরিক নামীয় একটি পরিবারে তিন ভাই ছিল। বাশার, বশীর ও মুবাশিশর। বশীর ছিল মুনাফিক। সে কবিতা চর্চা করতো। কবিতায় সে সাহাবীদেরকে কটূক্তি করতো এবং আরবের অন্যান্য কবিদের নামে তা চালিয়ে দিতো। বলতো যে, অমুক কবি এমন বলেছে, অমুক কবি এমন এমন বলেছে। সাহাবীগণ তার কথা শুনে নিজেরা বলাবলি করতো যে, আল্লাহর শপথ এ ধরণের কথা এ ইতর লোকটিই বলেছে। বশীর ইবন উবাইরিকই এগুলো বলেছে। (বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন), জাহেলী যুগে ও ইসলাম পরবর্তী সময়ে এটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার। সে সময় মদীনার মানুষের খাবার ছিল খেজুর ও যব। তবে কারো সামর্থ্য থাকলে সে শামের দিক থেকে আগমনকারী বণিক কাফেলার নিকট থেকে ময়দা ক্রয় করতো যা ক্রয়কারী নিজেই খেতো। পরিবারের অন্যদের খাবার খেজুর ও যবই হতো।
একবার শামের একটি ব্যবসায়ী কাফেলা আসলে আমার চাচা রিফা'আহ ইবন যায়েদ তাদের নিকট থেকে ময়দার একটি পুটলী ক্রয় করে নিজের যে ঘরে বর্ম, তরবারী ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র থাকতো সে ঘরে রাখলেন। একদিন কে যেন ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে যায়। সকালে আমার চাচা রিফা'আহ আমার নিকট এসে বলল, ভাতিজা! গতরাতে আমার প্রতি যুলুম করা হয়েছে। আমার ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে গেছে। অতঃপর আমরা যখন খোজ-খবর নিতে লাগলাম তখন মহল্লার লোকেরা বলল, আজ রাতে আমরা বনু উবাইরিককে আগুন জালাতে দেখেছি। আমাদের তো মনে হয় তোমাদের খাদ্যের ওপরই আগুন জ্বালানো হয়েছে। বনু উবাইরিককে জিজ্ঞাস করা হলে তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আমাদের মনে হয় চোর হচ্ছে তোমাদের মুসলিম ও নেককার ভাই লাবীদ ইবন সাহাল। লাবীদ ইবন সাহাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এটি শোনে তরবারী উত্তোলন করে বললেন, আমি করবো চুরি?! আল্লাহর শপথ! হয়তো তোমরা এ চুরির বাস্তবতা প্রকাশ করবে নয়তো তোমাদের ওপর আমার তরবারীর ধার পরীক্ষা করে নেবো। তারা বলল, তুমি তোমার তরবারী নিয়ে থাক, তুমি চোর নও। অতঃপর আমরা মহল্লায় আরো খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হলাম যে, বনু উবাইরিকই চোর। এরপর আমার চাচা আমাকে বলল, ভাতিজা! তুমি যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ঘটনাটি জানাতে তাহলে ভালো হতো। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের একটি পরিবার আমার চাচা রিফা'আহ ইবন যায়েদের ওপর যুলুম করেছে। তার ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে গেছে। এখান খাদ্য-দ্রব্যের আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদের যুদ্ধাস্ত্রগুলো ফেরত চাই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি অতি সত্ত্বর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বনু উবাইরিক এটি জানতে পেরে তাদের এক ব্যক্তি আসীর ইবন উরওয়াহ'র নিকট গিয়ে ঘটনা জানাল এবং স্বগোত্রীয় অনেকগুলো লোক একত্র হয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে আরয করল যে, হে আল্লাহর রাসূল! রিফা'আহ ও তার চাচা আমাদের এক সৎ ও মুসলিম পরিবারের ওপর দলিল প্রমাণ ছাড়া চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি একটি সৎ মুসলিম পরিবারকে প্রমাণ ছাড়া চুরির অপবাদ দিচ্ছ কেন? (কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন), এটি শোনে আমি বেরিয়ে আসলাম আর মনে মনে বললাম, হায়! যদি আমার কিছু সম্পদ চলে যেত এরপরেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতাম না। এরপর আমার চাচা রিফা'আহ এসে বলল, ভাতিজা! কী করতে পারলে? আমি তাকে ঘটনা জানালাম। সে বলল, আল্লাহই সাহায্যকারী। এরপর বেশি দেরি হয় নি। ইতোমধ্যে কুরআন আয়াত নাযিল হল:
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَبِّكَ اللَّهُ وَلَا تَكُن لِلْخَابِنِينَ خَصِيمًا وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا﴾ [النساء: ١০৫-১0৬]
"নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের (বনু উবাইরিকের) পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না। এবং আল্লাহর কাছে (কাতাদাহকে যা বলেছেন সেজন্য) ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১০৬]
আয়াত নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে আসা হলে তিনি তা রিফা'আহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ফিরিয়ে দিলেন। (কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন), আমি যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে চাচা রিফা'আহ'র নিকট আসলাম। সে জাহেলী যুগেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বৃদ্ধ হয়ে যায় এবং আমি মনে করতাম তার ঈমানে কিছুটা খটকা আছে। যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে আসা হলে সে বলল, ভাতিজা! আমি এগুলো আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলাম। এতে আমি বুঝলাম যে, তার ইসলাম গ্রহণ খাঁটিই ছিল। আয়াত নাযিলের পর বশীর মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সুলাফাহ বিনত সা'আদ ইবন সুমাইয়ার নিকট গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপর আয়াত নাযিল হয়:
﴿وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا * إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴾ [النساء: ١١٥ ، ١١٦]
"যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলিমের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫-১১৬]
বশীর সুলাফাহ'র নিকট গিয়ে অবস্থান করার পর হাসসান ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কয়েকটি কবিতায় সুলাফাহ'র নিন্দাবাদ করেন। ফলে সুলাফাহ বশীরের সামানাপত্র সব মাথায় তুলে বাইরে এনে ফেলে দেয় এবং বলে যে, তুমি কি আমার জন্য হাসসানের কবিতার হাদিয়া নিয়ে এসেছ? তোমার দ্বারা কখনো আমার কোনো উপকার হয় নি। অন্য বর্ণনাতে আছে সে মুরতাদ হয়ে পালিয়ে মক্কা চলে যায় এবং সেখানেই মারা যায়।"
এ ঘটনায় ইয়াহূদীর পক্ষে মুসলিমের বিরুদ্ধে রায়টি সে মুসলিমের ঈমানের দুর্বলতা কিংবা নিফাকের কারণে নয়; বরং তার অপরাধী হওয়ার কারণেই হয়েছে। কেননা, শরী'আত কারো জন্য একান্ত নয় এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ সাহাবী ও নিকটাত্মীয়দের প্রতি কোনোরূপ স্বজনপ্রীতি করতেন না।
প্রিয় পাঠক! আপনি যদি এ ব্যাপারে আরো সুস্পষ্ট ধারণা পেতে চান এবং এ বাস্তবতাকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চান তাহলে সামনের ঘটনাটির প্রতি লক্ষ্য করুন যা ঘটেছিল এক ইয়াহূদী ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত স্নেহভাজন একজন গুরুত্বপূর্ণ সম্মানিত সাহাবীর মধ্যে। তিনি হলেন জাবির ইবন আব্দুল্লাহ ইবন হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমা।
বাল্যকালে আক্বাবার দ্বিতীয় শপথে পিতা আব্দুল্লাহ ইবন হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উপস্থিত ছিলেন। উহুদ থেকে শুরু করে ইসলামের সবগুলো বড় বড় ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মদীনায় এক ইয়াহূদী ছিল। সে আমাকে কর্জ দিত! আমার খেজুর পাড়ার মেয়াদ পর্যন্ত। (রাওমা নামক স্থানে পথের ধারে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুর এক খণ্ড জমি ছিল)। একবার আমি কর্জ পরিশোধে এক বছর বিলম্ব করলাম। এরপর খেজুর পাড়ার মৌসুমে ইয়াহূদী আমার কাছে আসলো, আমি তখনো খেজুর পাড়তে পারি নি। আমি তার কাছে আগামী বছর পর্যন্ত অবকাশ চাইলাম। সে অস্বীকার করল। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান হলো। তিনি সাহাবীদের বললেন, চলো জাবিরের জন্য ইয়াহুদী থেকে অবকাশ নিই। তারপর তারা আমার বাগানে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীর সাথে এ নিয়ে কথাবার্তা বললেন। সে বললো, হে আবুল কাসিম। আমি তাকে আর অবকাশ দেব না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে তার এ কথা শুনে উঠলেন এবং বাগানটি প্রদক্ষিণ করে তার কাছে এসে আবার আলাপ করলেন। সে এবারও অস্বীকার করল। এরপর আমি উঠে পিঠে সামান্য কিছু তাজা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখলাম। তিনি কিছু খেলেন। তারপর বললেন, হে জাবির! তোমার ছাপড়াটা কোথায়? আমি তাকে জানিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, সেখানে আমার জন্য বিছানা দাও। আমি বিছানা বিছিয়ে দিলে তিনি এতে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হলে আমি তার কাছে এক মুষ্টি খেজুর নিয়ে আসলাম। তিনি তা থেকে খেলেন। তারপর উঠে আবার ইয়াহুদীর সাথে কথা বললেন। সে অস্বীকার করলো। তখন তিনি দ্বিতীয়বার খেজুর বাগানে গেলেন এবং বললেন, হে জাবির তুমি খেজুর কাটতে থাক এবং কর্জ পরিশোধ কর। এ বলে, তিনি খেজুর পাড়ার স্থানে অবস্থান করলেন, আমি খেজুর পেড়ে ইয়াহুদীর পাওনা শোধ করলাম। এরপর আরও সে পরিমাণ খেজুর উদ্বৃত্ত রইল। আমি বেরিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সুসংবাদ দিলাম। তিনি বললেন, তুমি স্বাক্ষী থাক যে, আমি আল্লাহর রাসূল।"
এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। যেখানে জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এক ইয়াহুদী থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। ঋণ পরিশোধের সময় এসে গেছে অথচ তার কাছে ঋন পরিশোধের মত কিছু নেই। জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র সাহাবী। তাই তিনি ইয়াহুদীর নিকট এক বছরের সময় চাচ্ছেন। কিন্তু সে অস্বীকার করল এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। অবশেষে জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ব্যাপারটি জানালেন এবং তাদের মাঝে মধ্যস্থতা করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে সুপারিশ করার জন্য ইয়াহুদীর নিকট গেলেন। কিন্তু ইয়াহূদী কোনো ভাবেই রাজি হল না। সে বার বার একই কথা বলল যে, হে আবুল কাসিম! আমি তাকে আর অবকাশ দেব না।
এ ঘটনা ঘটেছে গোটা মদীনার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত স্নেহভাজন এক সাহাবী এবং মদীনারই আরেক সাধারণ যিম্মী ইয়াহুদী নাগরিকের সাথে। ঋণী ব্যক্তি শুধু সময় চাচ্ছেন। টালবাহানাও করছেন না আবার অস্বীকারও করছেন না। উপরন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করলেন; কিন্তু ইয়াহুদী মানলো না। এতকিছুর পরও আমাদের নেতা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীকে সুপারিশ গ্রহণে বাধ্য করলেন না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীর দূর্বলতার দিকে তাকালেন না। জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালোবাসাকেও দৃষ্টির আড়াল করে দিলেন। না তাকালেন ইয়াহূদীর অতীতের দীর্ঘ কালো ইতিহাসের দিকে। এসবের কিছুই তিনি লক্ষ্য করেন নি; বরং তিনি শুধু উত্তমভাবে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন।
পাওনাদার একজন ইয়াহুদী। পরিশোধের সময়ও এসে গেছে। সুপারিশও প্রত্যাখ্যাত। তাই পরিশোধ করতেই হলো। রায় ইয়াহুদীর পক্ষেই গেল। যদিও তা ছিল একজন সম্মানিত সাহাবীর ছেলে সাহাবীর বিরুদ্ধে।
এটিই ইসলাম...!
এটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কৃত্রিমতা কিংবা সংযম প্রদর্শন কিছুই নয়; বরং এটি ছিল দীনের বিধানের স্বাভাবিক বাস্তবায়ন মাত্র। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا ﴾ [النساء: ١٣٥]
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৫]
দারিদ্র্যের কারণে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি সহানুভুতিও তার পক্ষে ইয়াহূদীর বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার অনুমতি দেয় না। ফাতহুল কাদীরে আল্লামা শাওকানী-কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়-একথার ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, প্রতিপক্ষ যদি ধনী হয় তাহলে তার সম্পদ থেকে উপকৃত হওয়া কিংবা তার ক্ষতি থেকে বাচার জন্য তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে না। আবার যদি দরিদ্র হয় তাহলে তার প্রতি সহানুভুতি প্রদর্শন পূর্বক তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া

টিকাঃ
121. তিরমিযী: কাতাদাহ ইবন নু'মান থেকে, হাদীস নং ৩০৩৬, ইমাম তিরমিযি বলেছেন, এটি গারীব হাদীস। হাকিম (৪/৩৮৫-৩৮৮) তিনি বলেছেন, এটি মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ; তবে বুখারী মুসলিমের কেউই এটি সংকলন করেন নি। তিনি তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থেও এটিকে ইবনুল মুনযির ও আবুশ- শায়খ ইস্পাহানীর নামে চালিয়ে দিয়েছেন। অধিকতর জানতে- তাফসীরুত তাবারী (৪০/২৬৫), তাফসীরুল কুরতুবী (৩/৩২৭), তাফসীরে ইবন কাসীর (১৫/৭৩১), শাওকানী: ফতহুল কাদীর (১/৭৭১), তাফসীরুল বাগবী (১/২৮৩), তাফসীরুল বায়যাবী (১/২৪৭), তাফসীরুল জালালাইন (১/১২০), আল্লামা ওয়াহেদী: আল- ওয়াজীয (১/২৮৭), তাফসীরু আবিস-সা'ঊদ (২/২২৯), আল্লামা সুয়ূতী: আদ-দুররুল মানসূর (২/৬৭১), তাফসীরুন নাসাফী (১/২৪৬), আল্লামা আলুসী: রুহুল মা'আনী (৫/১৪০), ইবনুল জাওযী: যাদুল মাসীর (২/১৯০), ইবন 'আশূর: আত-তাহরীর ওয়াত- তানবীর (১/১০২১), মা'আনী আল-কুরআন (২/১৮৫)।
122. তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন (২/৭৫৩)।
123. তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৩৬, আবু ঈসা বলেছেন, হাদীসটি গারীব। আল্লামা নাসীরুদ্দীন আলবানী একে হাসান বলেছেন।
124. তাফসীরে ইবন কাসীর (২/৪০৬,৪০৭), ইমাম রাযী: মাফাতীহুল গাইব (৫/৩৬৯)।
125. জাবির ইবন আব্দুল্লাহ ইবন হারাম। বাল্যকালে আক্কাবার দ্বিতীয় শপথে পিতার সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আঠারটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন অধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম।
126. আব্দুল্লাহ ইবন হারাম আস-সুলামী আল-আনসারী। আক্বাবার শপথের সময় প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। বদরেও ছিলেন। তিনি ছিলেন উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারীদের প্রথম ব্যক্তি। তাকে এবং আমর ইবনুল জুমূহকে একই কবরে দাফন করা হয়। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৮৪), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৪৮৩৬)।
127. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/২৪১)।
128. সহীহ বুখারী: (كتاب الأطعمة، باب الرطب والتمر) হাদীস নং ৫১২৮।
129. আল্লামা শাওকানী: ফাতহুল কাদীর (১/৭৯০)।

অত্র গ্রন্থের বিগত দু'টি পরিচ্ছেদে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা দেখে যদি আমরা আশ্চর্যান্বিত হই। তাহলে এক মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে বিচার ব্যবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়-নিষ্ঠা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আদল একটি সাধারণ বিষয়। যা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের ভিন্নতায় কোনো স্বার্থ লঙ্ঘন, ভৌগলিক সম্পর্ক কিংবা দুনিয়াবী সূত্রের কারণে তারতম্যের অবকাশ রাখে না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারে এ ধরনের ঘটনার দৃষ্টান্ত অনেক। তন্মধ্যে একটি হলো,
আনসার গোত্র বনী উবাইরাক ইবন যুফার ইবন হারিস-এর এক মুসলিম ব্যক্তি কতাদাহ ইবন নু'মান নামীয় এক প্রতিবেশীর একটি বর্ম চুরি করল। তার নাম ছিল ত্ব'মা ইবন উবাইরাক, অন্য এক বর্ণনা মতে তার নাম হলো বাশীর ইবন উবাইরাক। আর এ বর্মটি আটা ভরতি একটি খাপে ঢুকানো ছিল। কাজেই চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় খাপের ছিদ্র দিয়ে আটা ছড়াতে ছড়াতে নিজ ঘর পর্যন্ত গেল। তার পর সেটি যায়িদ ইবন সামীন নামীয় এক ইয়াহূদীর কাছে লুকিয়ে রাখল। অতপর ত্ব'মা ইবন উবাইরাকের কাছে বর্মের অনুসন্ধান চাইলে সে বর্ম নেয় নি মর্মে আল্লাহর নামে শপথ করল। তখন বর্মের মালিক বলল, আমি তার ঘরে আটার চিহ্ন দেখেছি। তারপরও যেহেতু সে শপথ করেছে তাই তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো এবং সকলে মিলে আটার চিহ্ন অনুসরণ করে করে ঐ ইয়াহূদীর ঘর পর্যন্ত পৌঁছল এবং সেখানে বর্মটি পেয়ে গেল। তখন চাপের মুখে ইয়াহুদী স্বীকার করল যে, ত্ব'মা ইবন উবাইরাক আমাকে এটি দিয়েছে। ত্ব'মা ইবন উবাইরাকের এলাকাবাসী বনু যুফারের লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে তাদের সাথীর স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ইয়াহুদীর ঘরে বর্ম পাওয়া গেছে তাকে শাস্তি দেওয়ার মনস্থ করলেন। তখন সূরা নিসার নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়;
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَيْكَ اللَّهُ وَلَا تَكُن لِلْخَابِنِينَ خَصِيمًا وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا وَلَا تُجَادِلْ عَنِ الَّذِينَ يَخْتَانُونَ أَنفُسَهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَانًا أَثِيمًا ﴾ [النساء: ١٠٥، ١০৭]
"নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। যারা মনে বিশ্বাসঘাতকতা পোষণ করে তাদের পক্ষ থেকে বিতর্ক করবেন না। আল্লাহ পছন্দ করেন না তাকে, যে বিশ্বাসঘাতক পাপী হয়।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১০৭]
একসাথে নিম্নের আয়াত পর্যন্ত নাযিল হয়:
﴿وَمَن يَكْسِبُ خَطِيَةً أَوْ إِثْمًا ثُمَّ يَرْمِ بِهِ بَرِيَا فَقَدِ احْتَمَلَ بُهْتَنَا وَإِثْمًا مُّبِينًا ﴾ [النساء: ১১৪ - ১১২]
“যে ব্যক্তি ভুল কিংবা গোনাহ করে, অতঃপর কোনো নিরপরাধের ওপর অপবাদ আরোপ করে সে নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গুনাহ।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১১২]
আটার নিদর্শন ও ঘরে বর্ম পাওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারণা ছিল যে, ইয়াহূদী লোকটিই চোর। কিন্তু তাঁর ধারণার বিপরীতে অহী নাযিল হলে তিনি তা লুকিয়ে রাখেন নি; বরং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন যে, ইয়াহুদী নিরপরাধ, চোর হচ্ছে মুসলিম ব্যক্তিটি..!
ব্যাপারটি কিন্তু এতো সহজ নয়..!!
দেখুন, সাফায়ীর ঘোষণা এসেছে ইয়াহূদী ব্যক্তির পক্ষে। যে ইয়াহুদী জাতি ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করা, ষড়যন্ত্র করা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং তাঁর অনুসারীদের মাঝে ফাটল সৃষ্টিতে সদাতৎপর থাকে। এতো কিছুর পরও এসব নেতিবাচক দিক ও প্রেক্ষাপটগুলোও একজন ইয়াহূদীকে অযথা দোষারোপ করার অনুমতি দেয় না।
আরো দেখুন, অভিযোগটি দাঁড়িয়েছে এক আনসারী মুসলিম ব্যক্তির বিপক্ষে। আপনি জানেন কি, কারা এ আনসার.?! তার ঐসব লোক যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর দূরাবস্থার সময় সাহায্য করেছে, আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভেতর বাহির সব। যারা ইসলামী রাষ্ট্রের কর্ণধার। যাদের কাঁধের উপর দিয়েই মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভীত রচিত হয়েছে। কিন্তু এসব কিছুও তাদের একজন চোরের পক্ষাবলম্বন ও সাফায়ী ঘোষণার অনুমোদন দেয় নি; যদিও প্রতিপক্ষের লোকটি একজন ইয়াহুদী। উপরন্তু এ ঘটনাটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের জন্য ইয়াহুদীদেরকে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে দেবে। ইয়াহুদীরা বলে বেড়াবে যে, দেখ, মুসলিমরা হলো চোরের জাতি। তারা নিজেরা অপরাধ করে তার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। তারা অত্যাচারীর পক্ষ অবলম্বন করে। তারা মিথ্যা কথা বলে ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের চরিত্রে ধারাবাহিক কুৎসা রটনা ও কলঙ্ক লেপনে ইয়াহুদীদের জন্য এক মহা সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে।
এতকিছুর পরও সত্যের সত্যায়ন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
এ ঘটনায় আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য শুধু একজনের দায়মুক্তি ও অন্যজনের ওপর অভিযোগ আরোপ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ ঘটনার মাধ্যমে তিনি উম্মতে মুসলিমাকে পৃথিবীর শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে যাবতীয় যুলুম- নির্যাতনের মূলোৎপাটনের দীক্ষা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে মূলনীতি ঘোষণা করেছেন যে, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে কোনো স্বার্থ লঙ্ঘন, ভৌগলিক সম্পর্ক কিংবা পার্থিব কোনো ইস্যু দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে মানুষের মাঝে সত্য ফয়সালা করতে হবে।
বরাবরের মতো আবারো আমরা প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই যে, উম্মতে মুসলিমা ছাড়া অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ইতিহাসে কি এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে..?! সত্য প্রকাশ, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সততা ও উদারতা প্রদর্শনে পৃথিবীর কোনো নেতা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারে কাছেও পৌঁছতে পেরেছে..?!!
এখানে এ কথাও উল্লেখ করে দেওয়া জরুরী যে, পূর্বোক্ত ঘটনায় যে মুসলিম ব্যক্তিটি নিজে চুরি করে ইয়াহুদীর ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছিল সে ছিল প্রকৃত অর্থে মুনাফিক। যা এ ঘটনার পরে প্রকাশ পেয়েছে। ইমাম তিরমিযী বর্ণিত একটি হাদীসে এ ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাদীসটি হচ্ছে:
কাতাদাহ ইবন নু'মান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমাদের আনসারদের মধ্যে বনু উবাইরিক নামীয় একটি পরিবারে তিন ভাই ছিল। বাশার, বশীর ও মুবাশিশর। বশীর ছিল মুনাফিক। সে কবিতা চর্চা করতো। কবিতায় সে সাহাবীদেরকে কটূক্তি করতো এবং আরবের অন্যান্য কবিদের নামে তা চালিয়ে দিতো। বলতো যে, অমুক কবি এমন বলেছে, অমুক কবি এমন এমন বলেছে। সাহাবীগণ তার কথা শুনে নিজেরা বলাবলি করতো যে, আল্লাহর শপথ এ ধরণের কথা এ ইতর লোকটিই বলেছে। বশীর ইবন উবাইরিকই এগুলো বলেছে। (বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন), জাহেলী যুগে ও ইসলাম পরবর্তী সময়ে এটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার। সে সময় মদীনার মানুষের খাবার ছিল খেজুর ও যব। তবে কারো সামর্থ্য থাকলে সে শামের দিক থেকে আগমনকারী বণিক কাফেলার নিকট থেকে ময়দা ক্রয় করতো যা ক্রয়কারী নিজেই খেতো। পরিবারের অন্যদের খাবার খেজুর ও যবই হতো।
একবার শামের একটি ব্যবসায়ী কাফেলা আসলে আমার চাচা রিফা'আহ ইবন যায়েদ তাদের নিকট থেকে ময়দার একটি পুটলী ক্রয় করে নিজের যে ঘরে বর্ম, তরবারী ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র থাকতো সে ঘরে রাখলেন। একদিন কে যেন ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে যায়। সকালে আমার চাচা রিফা'আহ আমার নিকট এসে বলল, ভাতিজা! গতরাতে আমার প্রতি যুলুম করা হয়েছে। আমার ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে গেছে। অতঃপর আমরা যখন খোজ-খবর নিতে লাগলাম তখন মহল্লার লোকেরা বলল, আজ রাতে আমরা বনু উবাইরিককে আগুন জালাতে দেখেছি। আমাদের তো মনে হয় তোমাদের খাদ্যের ওপরই আগুন জ্বালানো হয়েছে। বনু উবাইরিককে জিজ্ঞাস করা হলে তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আমাদের মনে হয় চোর হচ্ছে তোমাদের মুসলিম ও নেককার ভাই লাবীদ ইবন সাহাল। লাবীদ ইবন সাহাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এটি শোনে তরবারী উত্তোলন করে বললেন, আমি করবো চুরি?! আল্লাহর শপথ! হয়তো তোমরা এ চুরির বাস্তবতা প্রকাশ করবে নয়তো তোমাদের ওপর আমার তরবারীর ধার পরীক্ষা করে নেবো। তারা বলল, তুমি তোমার তরবারী নিয়ে থাক, তুমি চোর নও। অতঃপর আমরা মহল্লায় আরো খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হলাম যে, বনু উবাইরিকই চোর। এরপর আমার চাচা আমাকে বলল, ভাতিজা! তুমি যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ঘটনাটি জানাতে তাহলে ভালো হতো। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললাম যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের একটি পরিবার আমার চাচা রিফা'আহ ইবন যায়েদের ওপর যুলুম করেছে। তার ঘরে সিদ কেটে চুরি করে আটা ও অন্যান্য সামানা সব নিয়ে গেছে। এখান খাদ্য-দ্রব্যের আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদের যুদ্ধাস্ত্রগুলো ফেরত চাই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি অতি সত্ত্বর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
বনু উবাইরিক এটি জানতে পেরে তাদের এক ব্যক্তি আসীর ইবন উরওয়াহ'র নিকট গিয়ে ঘটনা জানাল এবং স্বগোত্রীয় অনেকগুলো লোক একত্র হয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে আরয করল যে, হে আল্লাহর রাসূল! রিফা'আহ ও তার চাচা আমাদের এক সৎ ও মুসলিম পরিবারের ওপর দলিল প্রমাণ ছাড়া চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি একটি সৎ মুসলিম পরিবারকে প্রমাণ ছাড়া চুরির অপবাদ দিচ্ছ কেন? (কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন), এটি শোনে আমি বেরিয়ে আসলাম আর মনে মনে বললাম, হায়! যদি আমার কিছু সম্পদ চলে যেত এরপরেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতাম না। এরপর আমার চাচা রিফা'আহ এসে বলল, ভাতিজা! কী করতে পারলে? আমি তাকে ঘটনা জানালাম। সে বলল, আল্লাহই সাহায্যকারী। এরপর বেশি দেরি হয় নি। ইতোমধ্যে কুরআন আয়াত নাযিল হল:
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَبِّكَ اللَّهُ وَلَا تَكُن لِلْخَابِنِينَ خَصِيمًا وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا﴾ [النساء: ١০৫-১0৬]
"নিশ্চয় আমরা আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের (বনু উবাইরিকের) পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না। এবং আল্লাহর কাছে (কাতাদাহকে যা বলেছেন সেজন্য) ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৫-১০৬]
আয়াত নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে আসা হলে তিনি তা রিফা'আহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ফিরিয়ে দিলেন। (কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন), আমি যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে চাচা রিফা'আহ'র নিকট আসলাম। সে জাহেলী যুগেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বৃদ্ধ হয়ে যায় এবং আমি মনে করতাম তার ঈমানে কিছুটা খটকা আছে। যুদ্ধাস্ত্রগুলো নিয়ে আসা হলে সে বলল, ভাতিজা! আমি এগুলো আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলাম। এতে আমি বুঝলাম যে, তার ইসলাম গ্রহণ খাঁটিই ছিল। আয়াত নাযিলের পর বশীর মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সুলাফাহ বিনত সা'আদ ইবন সুমাইয়ার নিকট গিয়ে অবস্থান নেয়। এরপর আয়াত নাযিল হয়:
﴿وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا * إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا ﴾ [النساء: ١١٥ ، ١١٦]
"যে কেউ রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলিমের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৫-১১৬]
বশীর সুলাফাহ'র নিকট গিয়ে অবস্থান করার পর হাসসান ইবন সাবিত রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কয়েকটি কবিতায় সুলাফাহ'র নিন্দাবাদ করেন। ফলে সুলাফাহ বশীরের সামানাপত্র সব মাথায় তুলে বাইরে এনে ফেলে দেয় এবং বলে যে, তুমি কি আমার জন্য হাসসানের কবিতার হাদিয়া নিয়ে এসেছ? তোমার দ্বারা কখনো আমার কোনো উপকার হয় নি। অন্য বর্ণনাতে আছে সে মুরতাদ হয়ে পালিয়ে মক্কা চলে যায় এবং সেখানেই মারা যায়।"
এ ঘটনায় ইয়াহূদীর পক্ষে মুসলিমের বিরুদ্ধে রায়টি সে মুসলিমের ঈমানের দুর্বলতা কিংবা নিফাকের কারণে নয়; বরং তার অপরাধী হওয়ার কারণেই হয়েছে। কেননা, শরী'আত কারো জন্য একান্ত নয় এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজ সাহাবী ও নিকটাত্মীয়দের প্রতি কোনোরূপ স্বজনপ্রীতি করতেন না।
প্রিয় পাঠক! আপনি যদি এ ব্যাপারে আরো সুস্পষ্ট ধারণা পেতে চান এবং এ বাস্তবতাকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চান তাহলে সামনের ঘটনাটির প্রতি লক্ষ্য করুন যা ঘটেছিল এক ইয়াহূদী ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত স্নেহভাজন একজন গুরুত্বপূর্ণ সম্মানিত সাহাবীর মধ্যে। তিনি হলেন জাবির ইবন আব্দুল্লাহ ইবন হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমা।
বাল্যকালে আক্বাবার দ্বিতীয় শপথে পিতা আব্দুল্লাহ ইবন হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উপস্থিত ছিলেন। উহুদ থেকে শুরু করে ইসলামের সবগুলো বড় বড় ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মদীনায় এক ইয়াহূদী ছিল। সে আমাকে কর্জ দিত! আমার খেজুর পাড়ার মেয়াদ পর্যন্ত। (রাওমা নামক স্থানে পথের ধারে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুর এক খণ্ড জমি ছিল)। একবার আমি কর্জ পরিশোধে এক বছর বিলম্ব করলাম। এরপর খেজুর পাড়ার মৌসুমে ইয়াহূদী আমার কাছে আসলো, আমি তখনো খেজুর পাড়তে পারি নি। আমি তার কাছে আগামী বছর পর্যন্ত অবকাশ চাইলাম। সে অস্বীকার করল। এ খবর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানান হলো। তিনি সাহাবীদের বললেন, চলো জাবিরের জন্য ইয়াহুদী থেকে অবকাশ নিই। তারপর তারা আমার বাগানে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীর সাথে এ নিয়ে কথাবার্তা বললেন। সে বললো, হে আবুল কাসিম। আমি তাকে আর অবকাশ দেব না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে তার এ কথা শুনে উঠলেন এবং বাগানটি প্রদক্ষিণ করে তার কাছে এসে আবার আলাপ করলেন। সে এবারও অস্বীকার করল। এরপর আমি উঠে পিঠে সামান্য কিছু তাজা খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখলাম। তিনি কিছু খেলেন। তারপর বললেন, হে জাবির! তোমার ছাপড়াটা কোথায়? আমি তাকে জানিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, সেখানে আমার জন্য বিছানা দাও। আমি বিছানা বিছিয়ে দিলে তিনি এতে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হলে আমি তার কাছে এক মুষ্টি খেজুর নিয়ে আসলাম। তিনি তা থেকে খেলেন। তারপর উঠে আবার ইয়াহুদীর সাথে কথা বললেন। সে অস্বীকার করলো। তখন তিনি দ্বিতীয়বার খেজুর বাগানে গেলেন এবং বললেন, হে জাবির তুমি খেজুর কাটতে থাক এবং কর্জ পরিশোধ কর। এ বলে, তিনি খেজুর পাড়ার স্থানে অবস্থান করলেন, আমি খেজুর পেড়ে ইয়াহুদীর পাওনা শোধ করলাম। এরপর আরও সে পরিমাণ খেজুর উদ্বৃত্ত রইল। আমি বেরিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সুসংবাদ দিলাম। তিনি বললেন, তুমি স্বাক্ষী থাক যে, আমি আল্লাহর রাসূল।"
এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা। যেখানে জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু এক ইয়াহুদী থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। ঋণ পরিশোধের সময় এসে গেছে অথচ তার কাছে ঋন পরিশোধের মত কিছু নেই। জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র সাহাবী। তাই তিনি ইয়াহুদীর নিকট এক বছরের সময় চাচ্ছেন। কিন্তু সে অস্বীকার করল এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধের জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। অবশেষে জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ব্যাপারটি জানালেন এবং তাদের মাঝে মধ্যস্থতা করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে সুপারিশ করার জন্য ইয়াহুদীর নিকট গেলেন। কিন্তু ইয়াহূদী কোনো ভাবেই রাজি হল না। সে বার বার একই কথা বলল যে, হে আবুল কাসিম! আমি তাকে আর অবকাশ দেব না।
এ ঘটনা ঘটেছে গোটা মদীনার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত স্নেহভাজন এক সাহাবী এবং মদীনারই আরেক সাধারণ যিম্মী ইয়াহুদী নাগরিকের সাথে। ঋণী ব্যক্তি শুধু সময় চাচ্ছেন। টালবাহানাও করছেন না আবার অস্বীকারও করছেন না। উপরন্তু স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করলেন; কিন্তু ইয়াহুদী মানলো না। এতকিছুর পরও আমাদের নেতা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীকে সুপারিশ গ্রহণে বাধ্য করলেন না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীর দূর্বলতার দিকে তাকালেন না। জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালোবাসাকেও দৃষ্টির আড়াল করে দিলেন। না তাকালেন ইয়াহূদীর অতীতের দীর্ঘ কালো ইতিহাসের দিকে। এসবের কিছুই তিনি লক্ষ্য করেন নি; বরং তিনি শুধু উত্তমভাবে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছেন।
পাওনাদার একজন ইয়াহুদী। পরিশোধের সময়ও এসে গেছে। সুপারিশও প্রত্যাখ্যাত। তাই পরিশোধ করতেই হলো। রায় ইয়াহুদীর পক্ষেই গেল। যদিও তা ছিল একজন সম্মানিত সাহাবীর ছেলে সাহাবীর বিরুদ্ধে।
এটিই ইসলাম...!
এটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কৃত্রিমতা কিংবা সংযম প্রদর্শন কিছুই নয়; বরং এটি ছিল দীনের বিধানের স্বাভাবিক বাস্তবায়ন মাত্র। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا ﴾ [النساء: ١٣٥]
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্মীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৫]
দারিদ্র্যের কারণে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি সহানুভুতিও তার পক্ষে ইয়াহূদীর বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার অনুমতি দেয় না। ফাতহুল কাদীরে আল্লামা শাওকানী-কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়-একথার ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, প্রতিপক্ষ যদি ধনী হয় তাহলে তার সম্পদ থেকে উপকৃত হওয়া কিংবা তার ক্ষতি থেকে বাচার জন্য তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে না। আবার যদি দরিদ্র হয় তাহলে তার প্রতি সহানুভুতি প্রদর্শন পূর্বক তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া

টিকাঃ
121. তিরমিযী: কাতাদাহ ইবন নু'মান থেকে, হাদীস নং ৩০৩৬, ইমাম তিরমিযি বলেছেন, এটি গারীব হাদীস। হাকিম (৪/৩৮৫-৩৮৮) তিনি বলেছেন, এটি মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ; তবে বুখারী মুসলিমের কেউই এটি সংকলন করেন নি। তিনি তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থেও এটিকে ইবনুল মুনযির ও আবুশ- শায়খ ইস্পাহানীর নামে চালিয়ে দিয়েছেন। অধিকতর জানতে- তাফসীরুত তাবারী (৪০/২৬৫), তাফসীরুল কুরতুবী (৩/৩২৭), তাফসীরে ইবন কাসীর (১৫/৭৩১), শাওকানী: ফতহুল কাদীর (১/৭৭১), তাফসীরুল বাগবী (১/২৮৩), তাফসীরুল বায়যাবী (১/২৪৭), তাফসীরুল জালালাইন (১/১২০), আল্লামা ওয়াহেদী: আল- ওয়াজীয (১/২৮৭), তাফসীরু আবিস-সা'ঊদ (২/২২৯), আল্লামা সুয়ূতী: আদ-দুররুল মানসূর (২/৬৭১), তাফসীরুন নাসাফী (১/২৪৬), আল্লামা আলুসী: রুহুল মা'আনী (৫/১৪০), ইবনুল জাওযী: যাদুল মাসীর (২/১৯০), ইবন 'আশূর: আত-তাহরীর ওয়াত- তানবীর (১/১০২১), মা'আনী আল-কুরআন (২/১৮৫)।
122. তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন (২/৭৫৩)।
123. তিরমিযী, হাদীস নং ৩০৩৬, আবু ঈসা বলেছেন, হাদীসটি গারীব। আল্লামা নাসীরুদ্দীন আলবানী একে হাসান বলেছেন।
124. তাফসীরে ইবন কাসীর (২/৪০৬,৪০৭), ইমাম রাযী: মাফাতীহুল গাইব (৫/৩৬৯)।
125. জাবির ইবন আব্দুল্লাহ ইবন হারাম। বাল্যকালে আক্কাবার দ্বিতীয় শপথে পিতার সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আঠারটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন অধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের অন্যতম।
126. আব্দুল্লাহ ইবন হারাম আস-সুলামী আল-আনসারী। আক্বাবার শপথের সময় প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। বদরেও ছিলেন। তিনি ছিলেন উহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারীদের প্রথম ব্যক্তি। তাকে এবং আমর ইবনুল জুমূহকে একই কবরে দাফন করা হয়। অধিকতর জানতে- ইবনু আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (৩/৮৪), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (৪৮৩৬)।
127. ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/২৪১)।
128. সহীহ বুখারী: (كتاب الأطعمة، باب الرطب والتمر) হাদীস নং ৫১২৮।
129. আল্লামা শাওকানী: ফাতহুল কাদীর (১/৭৯০)।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ব্যক্তিগত অধিকার হরণকারীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা

📄 ব্যক্তিগত অধিকার হরণকারীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়পরায়ণাতার প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। এমনকি যদি সেটা নিজের ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়েও হতো। আর এর দৃষ্টান্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারে অনেক অ-নে-ক। কিন্তু অত্র গ্রন্থে আমরা শুধুমাত্র অমুসলিমদের সাথে ঘটমান অবস্থাগুলোই তুলে ধরার প্রয়াস চালাব। কাজেই এখানে সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁর অনুসারীদের সাথে ঘটমান অনন্য ন্যায়পরায়ণতার ঘটনাবলীর প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করব না; বরং অমুসলিমদের সাথে ঘটমান কিছু অনুপম ঘটনার বিবরণ উপস্থাপনেই সীমাবদ্ধ থাকব।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دَخَلَ رَهْطُ مِنْ الْيَهُودِ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا السَّامُ عَلَيْكَ فَفَهِمْتُهَا فَقُلْتُ عَلَيْكُمُ السَّامُ وَاللَّعْنَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَهْلًا يَا عَائِشَةُ فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالُوا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ قُلْتُ وَعَلَيْكُمْ»
"ইয়াহুদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসল। অতঃপর তারা বলল, 'আস-সামু আলাইকুম' তোমাদের ওপর মৃত্যু আসুক। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি এ কথার অর্থ বুঝলাম এবং বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস-সামু ওয়ালা'নাহ' তোমাদের ওপরও মৃত্যু ও লা'নত আসুক। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, থাম, হে আয়েশা! আল্লাহ সকল কাজে নম্রতা ভালোবাসেন। অন্য এক বর্ণনা মতে হে আয়েশা! তুমি সহিংসতা ও অশ্লীলতা মুক্ত থাক। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অপনি কি শোনেন নি তারা কী বলেছে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তো বলেছি 'ওয়া আলাইকুম' এবং তোমাদের ওপরও। "
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই মহানুভব ও সাম্যের প্রতিক ছিলেন যে, তিনি মদীনায় ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পরও একদল ইয়াহুদী তাঁর কার্যালয়ে প্রবেশ করে সামনাসামনী তাঁর মৃত্যু কামনা করল। ইয়াহূদীরা এ ক্ষেত্রে যে কুটকৌশলের অপচেষ্টা করল তা এ যে, 'সালাম' শব্দের প্রায় সমোচ্চারিত শব্দ 'সাম' ব্যবহার করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোকা বানিয়ে পাশ কেটে পার পেয়ে যেতে চাইল আর সীদ্ধান্ত নিয়ে রাখল যে, যদি এ জন্যে তিনি তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেন তাহলে তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলে দিবে আমরা তো 'আস-সালামু' বলেছি। অথচ বাস্তবতা তো এ যে, তারা যা বলতে চেয়েছে তার সবই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোভাবেই শুনেছেন এবং বুঝেছেন। তা ছাড়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিনিও সেভাবে শুনেছেন।
তারপরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যু কামনার মতো গুরুতর অপরাধের জন্য বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। বললেন না যে, আমি এবং আয়েশাই তোমাদের বিপক্ষের সাক্ষী। পক্ষান্তরে তিনি ভদ্রতাসূচক শব্দ 'ওয়া আলাইকুম' তোমাদের ওপরও বলে তাদের কথার জবাব দিলেন। শুধু তাই নয়; বরং তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সহিংসতা ও কঠোরতা থেকে নিষেধ করে সকল ক্ষেত্রে বিনম্র আচরণের আদেশ দিলেন। এমনকি সেটা যদি নিজের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু কামনাও হয়।
এর চেয়েও চমকপ্রদ ঘটনা হচ্ছে ইয়াহুদী পণ্ডিত যায়েদ ইবন সা'নাহ-এর সাথে সংঘটিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান। যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, আমি মুহাম্মাদ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চেহারায় দৃষ্টিপাত করে দু'টি ছাড়া নবুওয়তের বাকী সকল নিদর্শন চিনতে পেরেছি। আমি ঐ দু'টি নিদর্শন তাঁর থেকে যাচাই করতে পারি নি।
«يسبق حلمه جهله، ولا يزيد شدة الجهل عليه إلا حلما»
"তাঁর ধৈর্য ক্রোধ থেকে অগ্রগামী হবে। কারো প্রচণ্ড নির্বুদ্ধিতাও তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারবে না।"
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে কক্ষ থেকে বের হলেন এমতাবস্থায় রাখাল শ্রেণির মতো এক লোক নিজ বাহনে আরোহিত অবস্থায় তাঁর সামনে এলো। অতঃপর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক গোত্রের গ্রামবাসী ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর ইতোপূর্বে আমি তাদেরকে এ মর্মে অবহিত করেছিলাম যে, যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ রিযিক প্রাপ্ত হবে, অথচ এখন অনাবৃষ্টির কারণে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। হে আল্লাহর রাসূল, এহেন অবস্থায় আমি ভয় পাচ্ছি যে, ঐ লোকগুলো যেমন আশাবাদী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তেমনি দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচার তাগিদে আবার ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় কি না? অতএব, আপনি যদি মুনাসিব মনে করেন তাহলে তাদের নিকট এমন কাউকে প্রেরণ করুন যে তাদেরকে সাহায্য করবে।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগন্তুকের পাশে এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তির আর কিছু বলার নেই।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, তখন আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম এবং বললাম: হে মুহাম্মাদ! আপনি কি আমার কাছে অমুক গোত্রের বাগানের নির্ধারিত পরিমাণ খেজুর অমুক মেয়াদে বিক্রি করবেন? তিনি বললেন, হে ইয়াহুদী এমনটি নয়; বরং নির্ধারিত পরিমাণ খেজুর অমুক মেয়াদে বিক্রি করব। তিনি কোনো নির্দিষ্ট বাগানের নাম উল্লেখ করেন নি। আমি বললাম, ঠিক আছে। তখন তিনি আমার কাছে খেজুর বিক্রি করলেন, আমি আমার টাকার থলি বের করলাম এবং নির্ধারিত মেয়াদে নির্ধারিত খেজুরের জন্য তাঁকে আশিটি স্বর্ণ মুদ্রা দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণমুদ্রাগুলো আগন্তুককে দিলেন এবং বললেন খুব দ্রুত ঐ গোত্রে চলে যাও এবং তাদের সাহায্য কর। যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, চুক্তি অনুযায়ী দুই বা তিন দিন মেয়াদ অবশিষ্ট থাকাবস্থায় একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর, উমার, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ একদল সাহাবীকে নিয়ে এক আনসার ব্যক্তির জানাযায় শরীক হলেন। জানাযা শেষে একটি দেয়ালের কাছে তিনি বসলেন। তখন আমি গিয়ে তাঁর জামার কলার টেনে ধরলাম এবং তাঁর দিকে রূঢ় দৃষ্টিতে তাকালাম। আর বললাম হে মুহাম্মদ! তুমি আমার অধিকার কেন আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ না? আল্লাহ কসম! হে আব্দুল মোতালিবের সম্প্রদায়, তোমরা তো টালবাহানাকারী গোত্র। তোমাদের টালবাহানার ব্যাপারে আমি পূর্ব থেকেই জ্ঞাত আছি।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, তখন আমি উমার ইবনুল খাত্তাবের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম যে, ক্ষোভে তার চক্ষুদ্বয় ঘুর্ণায়মান নক্ষত্রের মতো তার চেহারায় আন্দোলিত হচ্ছে। অতঃপর আমার ওপর রূঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল: হে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যা করেছ এবং বলেছ আমি তা শুনেছি ও দেখেছি?! আফসোস! শপথ ঐ আল্লাহর যিনি তাঁকে সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি হারানোর ভয় না করতাম তাহলে আমার এ তরবারি দ্বারা তোমার গর্দান কেটে ফেলতাম। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারের দিকে শান্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, অতঃপর বললেন, হে উমার! আমি এবং সে তোমার কাছে এর থেকে ভিন্নতর কিছুর আশা করেছিলাম। আমরা আশাবাদী ছিলাম যে, তুমি আমাকে উত্তমভাবে পরিশোধের অনুরোধ করবে এবং তাকে উত্তম পন্থায় চাওয়ার আদেশ করবে। হে উমার! তুমি একে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা কর। আর তুমি তাকে ধমকানোর কারণে বিশ সা' খেজুর বেশি দিয়ে দিবে।
রাসূলের পথ ও নির্দেশ অমান্য হওয়া যার কারণে আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টি হারানোর ভয়। কেননা সে যে পরিমাণ অপরাধ করেছে, তাতে তাকে হত্যা করা বৈধ হয় না।
যায়েদ বলেন, উমার আমাকে নিয়ে গিয়ে আমার পাওয়া আদায় করে দিল, সাথে বিশ সা' খেজুর বেশি দিল। তখন আমি তাকে বললাম, অতিরিক্ত কী জন্যে দিচ্ছেন? উত্তরে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, তোমাকে ধমকানোর জন্যে এ অতিরিক্তগুলো দিয়ে দিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
(যায়েদ বলেন), আমি বললাম, হে উমার! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? উমার বললেন, না, তুমি কে? তখন আমি বললাম, আমি যায়েদ ইবন সা'নাহ, তিনি বললেন, ইয়াহুদী পণ্ডিত? আমি বললাম হ্যাঁ। আমিই পণ্ডিত। উমার বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যা বললে এবং যে জঘন্য আচরণ করলে তা করতে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? যায়েদ বলেন, আমি বললাম হে উমার, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় দৃষ্টিপাত করে দু'টি ছাড়া নবুওয়তের বাকী সকল নিদর্শন চিনতে পেরেছি। আমি যে দু'টি নিদর্শন তাঁর থেকে যাচাই করতে পারি নি তা হচ্ছে- এক. তাঁর ধৈর্য তাঁর ক্রোধ থেকে অগ্রগামী হবে।
দুই. কারো প্রচণ্ড নির্বুদ্ধিতাও তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারবে না।
এখন আমি এ দুইটাও যাচাই করে নিয়েছি। অতএব, হে উমার! আপনাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, 'আমি আল্লাহকে আমার রব হিসেবে, ইসলামকে আমার দীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে মেনে নিচ্ছি।' আমি আপনাকে এ কথারও সাক্ষ্য রাখছি যে, আমার পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে তা থেকে অর্ধেক উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য দান করে দিলাম। এ কথা শুনে উমার বললেন, উম্মতে মুহাম্মাদীর কিছু লোকের জন্য তুমি দান কর। কেননা সকলের জন্য দান করার সামর্থ্য তোমার নেই। তখন আমি বললাম, কিছু লোকের জন্যই আমার দান। অতঃপর উমার এবং যায়েদ উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এলেন এবং যায়েদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন,
«أَشْهَدُ أَنْ لَا إله إلا الله وأن محمداً عبده و رسوله»
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। "
প্রিয় পাঠক! আপনি ঐ ইয়াহূদীর প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন, সে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এ মর্মে পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা চালিয়েছে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্রোধকে ক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। আর এর দ্বারা সে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতাও যাচাই করে নিতে পারে। বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো অহী ছাড়া অদৃশ্যের ইলম জানতেন না। উক্ত ঘটনায়ও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যার দ্বারা ইয়াহূদীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ হবে। সে তার সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তীব্র ক্রোধান্বিত করে তুলতে পারে এবং এ জন্য সে এমন একাধিক পন্থা অবলম্বন করেছে যার কোনো একটিতেই সাধারণ মানুষ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যেত।
প্রথমত: সে নির্ধারিত সময়ের পুর্বেই তার পাওনা চাইতে এসেছে। যে সময়ে চাওয়ার অধিকারই সে রাখে না।
দ্বিতীয়ত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার কলার ও চাদরের সম্মুখভাগ কাছে ভিড়ানোর জন্য টেনে ধরেছে!! প্রিয় পাঠক! আপনি সে দৃশ্যটি একটু কল্পনা করে দেখুন যে, প্রকাশ্য জনসম্মুখে সাহাবাগণের মধ্যখানে এক ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার কলার ও চাদর টেনে ধরেছে। এটি কত বড় দৃষ্টতা!!
তৃতীয়ত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে কপট দৃষ্টিতে তাকিয়েছে।
চতুর্থত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো উপাধি বা উপনাম ব্যতিরেকে দৃষ্টতাবশত সরাসরি নাম ধরে ডেকেছে, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তুমি কি আমার পাওনা পরিশোধ করবে না?
পঞ্চমত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পূর্বসুরীগণ সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করে বলেছে যে, আল্লাহর কসম, তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরেরা টালবাহানাকারী গোত্র।
সূধীবৃন্দ! এ পাঁচটি কারণে যে ধরণের সীমালঙ্ঘণ ও আগ্রাসী চিত্র ফুটে উঠেছে তার সাথে আপনি এ বিষয়টিও যোগ করে ভেবে দেখুন যে, ঐ ইয়াহুদী এ দৃষ্টতাগুলো প্রদর্শন করছে এমন একজনের সাথে যিনি মদীনার প্রধান নেতা এবং মদীনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। শুধু তাই নয় সে সময়টাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান করছিলেন মুহাজির ও আনসারদের দ্বারা অর্জিত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার ষোলকলা বেষ্টনিতে। এ সকল প্রেক্ষাপট নিয়ে যদি আপনি ভাবেন তাহলে আপনিসহ অধিকাংশ মানুষই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, এ ধরণের সীমালঙ্ঘনকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বৈ কিছুই হতে পারে না। শুধু মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিটুকুও তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ শাস্তির প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ইতিহাস অবলোকন করেছি। আমাদের মনোজগতকে স্তব্ধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করেছেন?!!
তিনি সকল আক্রমনাত্মক অভিব্যক্তিকে হজম করে নিয়েছেন। আমি একথা বলব না যে, তিনি শুধুমাত্র তাকে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা বা বিবেচনাবোধের জন্য এমনটি করেছেন; বরং তিনি স্থির-মানসে মুসকি হেসে হর্ষচিত্তে সব কিছু মেনে নিয়েছেন। যেমনটি যায়েদ ইবন সা’নাহ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারের দিকে শান্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, অতঃপর বললেন, হে উমার! আমি এবং সে তোমার কাছে এর থেকে ভিন্নতর কিছু আশা করেছিলাম। আমরা আশাবাদী ছিলাম যে, তুমি আমাকে উত্তমভাবে পরিশোধের অনুরোধ করবে এবং তাকে উত্তম পন্থায় চাওয়ার আদেশ করবে!!
এ ধরণের উন্নত চরিত্র মাধুর্যের তাৎপর্য অনুধাবন করা সাধারণ রাজন্যবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রকারান্তে সকল মানুষের জন্যই অসাধ্য ও অকল্পনীয় ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয় দেখুন! তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধের নসীহতের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অথচ তখনও ঋণ পরিশোধের সময়ই হয় নি। সেখানে অন্যের উপদেশের প্রয়োজনীয়তার তো প্রশ্নই আসে না। তথাপি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র ইয়াহূদীর মনের প্রশান্তি ও তার সাথে সম্পর্ক অটুট রাখার মানসে এরূপ মন্তব্য করেছেন।
এখানেই শেষ নয়, এতকিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বলে বিবৃতি দিয়েছেন যে, ন্যায়পরায়ণতা তো হবে এটাই যে, উমারের ধমকে তার মধ্যে যেই ভীতি সঞ্চার হয়েছে তার বিনিময়ে তাকে কিছু দেওয়া হোক। আর সে জন্য তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিয়ে দিলেন।
এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক গৃহীত এ সকল সীদ্ধান্ত আবেগতাড়িত হয়ে সাময়িক আপোস চেষ্টা বা পরবর্তীতে সময় সাপেক্ষে চিন্তা-ভাবনা করে যথোপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণের বাসনা নয়; বরং এটিই তাঁর অকৃত্রিম যথাযথ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিক্রীয়া। সকল মানুষের সাথে তাঁর স্বভাবজাত আচরণই এমন। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক। চাই সে উত্তম উপস্থাপনায় নিজেকে প্রকাশ করুক বা মন্দভাবে উদিত হোক।
বিশ্বের সকল রাজণ্যবর্গ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও ক্ষমতাধরদের কি উচিত নয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অনুপম অবস্থানের ইতিবৃত্ত অধ্যয়ন করা? যেন নিজেদের পারিপার্শ্বিক কর্মকাণ্ডকে ন্যায়পরায়ণতার মানদণ্ডে যাচাই করে নিতে পারে!
পৃথিবীর সভ্যতার ধারকবাহকদের কি উচিত নয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গস করা? যেন নিজেদের চারিত্রিক মানদণ্ড ও মূল্যবোধকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র মাধুর্য্য অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারে!
বাস্তবিকই আজকের বিশ্ব নবী চরিত্রের এ স্বচ্ছ সুধার বড়ই মুখাপেক্ষী। যে দিন বিশ্ববাসী এ অনন্য মহান চরিত্রকে অনুধাবন করতে পারবে সেদিন সন্দেহাতীতভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি সমূলে পাল্টে যাবে এবং নানামুখী সংকট ও সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রসস্ত পথ খুলে যাবে।

টিকাঃ
130. আসসামু অর্থ মৃত্যু, ইবনুল মানযুর: লিসানুল আরব সোম অধ্যায় (১২/৩১৪)
131. সহীহ বুখারী (كتاب الأدب: باب الرفق في الأمر كله) হাদীস নং ৫৬৭৮; সহীহ মুসলিম (كتاب السلام: باب النهي عن ابتداء أهل الكتاب بالسلام وكيف يرد عليهم)
132. খোরপোশের ব্যায় রাখার থলি। যা কোমরে বেধে রাখা হয়। ইবন হাজার আসকালানী: ফাতহুলবারী (৩/৩৯৭), ইবন মানযুর: লিসানুল আরব (مادة: همي) (১৫/৩৬৪।
134. ইবন হিব্বান, হাদীস নং ২৮৮; মুসতাদরাক আল-হাকিম, হাদীস নং ৬৫৪৭; বায়হাকী, হাদীস নং ১১০৬৬। হাকিম বলেন এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ যদিও হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম তাখরীজ করেন নি। ত্বাবরানী বলেন, এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায়পরায়ণাতার প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। এমনকি যদি সেটা নিজের ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়েও হতো। আর এর দৃষ্টান্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারে অনেক অ-নে-ক। কিন্তু অত্র গ্রন্থে আমরা শুধুমাত্র অমুসলিমদের সাথে ঘটমান অবস্থাগুলোই তুলে ধরার প্রয়াস চালাব। কাজেই এখানে সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁর অনুসারীদের সাথে ঘটমান অনন্য ন্যায়পরায়ণতার ঘটনাবলীর প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করব না; বরং অমুসলিমদের সাথে ঘটমান কিছু অনুপম ঘটনার বিবরণ উপস্থাপনেই সীমাবদ্ধ থাকব।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دَخَلَ رَهْطُ مِنْ الْيَهُودِ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا السَّامُ عَلَيْكَ فَفَهِمْتُهَا فَقُلْتُ عَلَيْكُمُ السَّامُ وَاللَّعْنَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَهْلًا يَا عَائِشَةُ فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الرِّفْقَ فِي الْأَمْرِ كُلِّهِ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ أَوَلَمْ تَسْمَعْ مَا قَالُوا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ قُلْتُ وَعَلَيْكُمْ»
"ইয়াহুদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসল। অতঃপর তারা বলল, 'আস-সামু আলাইকুম' তোমাদের ওপর মৃত্যু আসুক। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি এ কথার অর্থ বুঝলাম এবং বললাম, 'ওয়া আলাইকুমুস-সামু ওয়ালা'নাহ' তোমাদের ওপরও মৃত্যু ও লা'নত আসুক। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, থাম, হে আয়েশা! আল্লাহ সকল কাজে নম্রতা ভালোবাসেন। অন্য এক বর্ণনা মতে হে আয়েশা! তুমি সহিংসতা ও অশ্লীলতা মুক্ত থাক। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অপনি কি শোনেন নি তারা কী বলেছে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তো বলেছি 'ওয়া আলাইকুম' এবং তোমাদের ওপরও। "
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনই মহানুভব ও সাম্যের প্রতিক ছিলেন যে, তিনি মদীনায় ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পরও একদল ইয়াহুদী তাঁর কার্যালয়ে প্রবেশ করে সামনাসামনী তাঁর মৃত্যু কামনা করল। ইয়াহূদীরা এ ক্ষেত্রে যে কুটকৌশলের অপচেষ্টা করল তা এ যে, 'সালাম' শব্দের প্রায় সমোচ্চারিত শব্দ 'সাম' ব্যবহার করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোকা বানিয়ে পাশ কেটে পার পেয়ে যেতে চাইল আর সীদ্ধান্ত নিয়ে রাখল যে, যদি এ জন্যে তিনি তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেন তাহলে তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলে দিবে আমরা তো 'আস-সালামু' বলেছি। অথচ বাস্তবতা তো এ যে, তারা যা বলতে চেয়েছে তার সবই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোভাবেই শুনেছেন এবং বুঝেছেন। তা ছাড়া আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিনিও সেভাবে শুনেছেন।
তারপরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যু কামনার মতো গুরুতর অপরাধের জন্য বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। বললেন না যে, আমি এবং আয়েশাই তোমাদের বিপক্ষের সাক্ষী। পক্ষান্তরে তিনি ভদ্রতাসূচক শব্দ 'ওয়া আলাইকুম' তোমাদের ওপরও বলে তাদের কথার জবাব দিলেন। শুধু তাই নয়; বরং তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে সহিংসতা ও কঠোরতা থেকে নিষেধ করে সকল ক্ষেত্রে বিনম্র আচরণের আদেশ দিলেন। এমনকি সেটা যদি নিজের সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু কামনাও হয়।
এর চেয়েও চমকপ্রদ ঘটনা হচ্ছে ইয়াহুদী পণ্ডিত যায়েদ ইবন সা'নাহ-এর সাথে সংঘটিত ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থান। যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, আমি মুহাম্মাদ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর চেহারায় দৃষ্টিপাত করে দু'টি ছাড়া নবুওয়তের বাকী সকল নিদর্শন চিনতে পেরেছি। আমি ঐ দু'টি নিদর্শন তাঁর থেকে যাচাই করতে পারি নি।
«يسبق حلمه جهله، ولا يزيد شدة الجهل عليه إلا حلما»
"তাঁর ধৈর্য ক্রোধ থেকে অগ্রগামী হবে। কারো প্রচণ্ড নির্বুদ্ধিতাও তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারবে না।"
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে কক্ষ থেকে বের হলেন এমতাবস্থায় রাখাল শ্রেণির মতো এক লোক নিজ বাহনে আরোহিত অবস্থায় তাঁর সামনে এলো। অতঃপর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক গোত্রের গ্রামবাসী ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর ইতোপূর্বে আমি তাদেরকে এ মর্মে অবহিত করেছিলাম যে, যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে স্বাচ্ছন্দপূর্ণ রিযিক প্রাপ্ত হবে, অথচ এখন অনাবৃষ্টির কারণে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। হে আল্লাহর রাসূল, এহেন অবস্থায় আমি ভয় পাচ্ছি যে, ঐ লোকগুলো যেমন আশাবাদী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তেমনি দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচার তাগিদে আবার ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় কি না? অতএব, আপনি যদি মুনাসিব মনে করেন তাহলে তাদের নিকট এমন কাউকে প্রেরণ করুন যে তাদেরকে সাহায্য করবে।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগন্তুকের পাশে এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তির আর কিছু বলার নেই।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, তখন আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম এবং বললাম: হে মুহাম্মাদ! আপনি কি আমার কাছে অমুক গোত্রের বাগানের নির্ধারিত পরিমাণ খেজুর অমুক মেয়াদে বিক্রি করবেন? তিনি বললেন, হে ইয়াহুদী এমনটি নয়; বরং নির্ধারিত পরিমাণ খেজুর অমুক মেয়াদে বিক্রি করব। তিনি কোনো নির্দিষ্ট বাগানের নাম উল্লেখ করেন নি। আমি বললাম, ঠিক আছে। তখন তিনি আমার কাছে খেজুর বিক্রি করলেন, আমি আমার টাকার থলি বের করলাম এবং নির্ধারিত মেয়াদে নির্ধারিত খেজুরের জন্য তাঁকে আশিটি স্বর্ণ মুদ্রা দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণমুদ্রাগুলো আগন্তুককে দিলেন এবং বললেন খুব দ্রুত ঐ গোত্রে চলে যাও এবং তাদের সাহায্য কর। যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, চুক্তি অনুযায়ী দুই বা তিন দিন মেয়াদ অবশিষ্ট থাকাবস্থায় একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর, উমার, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ একদল সাহাবীকে নিয়ে এক আনসার ব্যক্তির জানাযায় শরীক হলেন। জানাযা শেষে একটি দেয়ালের কাছে তিনি বসলেন। তখন আমি গিয়ে তাঁর জামার কলার টেনে ধরলাম এবং তাঁর দিকে রূঢ় দৃষ্টিতে তাকালাম। আর বললাম হে মুহাম্মদ! তুমি আমার অধিকার কেন আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছ না? আল্লাহ কসম! হে আব্দুল মোতালিবের সম্প্রদায়, তোমরা তো টালবাহানাকারী গোত্র। তোমাদের টালবাহানার ব্যাপারে আমি পূর্ব থেকেই জ্ঞাত আছি।
যায়েদ ইবন সা'নাহ বলেন, তখন আমি উমার ইবনুল খাত্তাবের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম যে, ক্ষোভে তার চক্ষুদ্বয় ঘুর্ণায়মান নক্ষত্রের মতো তার চেহারায় আন্দোলিত হচ্ছে। অতঃপর আমার ওপর রূঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল: হে আল্লাহর দুশমন! তুমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যা করেছ এবং বলেছ আমি তা শুনেছি ও দেখেছি?! আফসোস! শপথ ঐ আল্লাহর যিনি তাঁকে সত্য দীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি হারানোর ভয় না করতাম তাহলে আমার এ তরবারি দ্বারা তোমার গর্দান কেটে ফেলতাম। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারের দিকে শান্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, অতঃপর বললেন, হে উমার! আমি এবং সে তোমার কাছে এর থেকে ভিন্নতর কিছুর আশা করেছিলাম। আমরা আশাবাদী ছিলাম যে, তুমি আমাকে উত্তমভাবে পরিশোধের অনুরোধ করবে এবং তাকে উত্তম পন্থায় চাওয়ার আদেশ করবে। হে উমার! তুমি একে নিয়ে যাও এবং তার পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা কর। আর তুমি তাকে ধমকানোর কারণে বিশ সা' খেজুর বেশি দিয়ে দিবে।
রাসূলের পথ ও নির্দেশ অমান্য হওয়া যার কারণে আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টি হারানোর ভয়। কেননা সে যে পরিমাণ অপরাধ করেছে, তাতে তাকে হত্যা করা বৈধ হয় না।
যায়েদ বলেন, উমার আমাকে নিয়ে গিয়ে আমার পাওয়া আদায় করে দিল, সাথে বিশ সা' খেজুর বেশি দিল। তখন আমি তাকে বললাম, অতিরিক্ত কী জন্যে দিচ্ছেন? উত্তরে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, তোমাকে ধমকানোর জন্যে এ অতিরিক্তগুলো দিয়ে দিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
(যায়েদ বলেন), আমি বললাম, হে উমার! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? উমার বললেন, না, তুমি কে? তখন আমি বললাম, আমি যায়েদ ইবন সা'নাহ, তিনি বললেন, ইয়াহুদী পণ্ডিত? আমি বললাম হ্যাঁ। আমিই পণ্ডিত। উমার বললেন, তুমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যা বললে এবং যে জঘন্য আচরণ করলে তা করতে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? যায়েদ বলেন, আমি বললাম হে উমার, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারায় দৃষ্টিপাত করে দু'টি ছাড়া নবুওয়তের বাকী সকল নিদর্শন চিনতে পেরেছি। আমি যে দু'টি নিদর্শন তাঁর থেকে যাচাই করতে পারি নি তা হচ্ছে- এক. তাঁর ধৈর্য তাঁর ক্রোধ থেকে অগ্রগামী হবে।
দুই. কারো প্রচণ্ড নির্বুদ্ধিতাও তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারবে না।
এখন আমি এ দুইটাও যাচাই করে নিয়েছি। অতএব, হে উমার! আপনাকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, 'আমি আল্লাহকে আমার রব হিসেবে, ইসলামকে আমার দীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে মেনে নিচ্ছি।' আমি আপনাকে এ কথারও সাক্ষ্য রাখছি যে, আমার পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে তা থেকে অর্ধেক উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য দান করে দিলাম। এ কথা শুনে উমার বললেন, উম্মতে মুহাম্মাদীর কিছু লোকের জন্য তুমি দান কর। কেননা সকলের জন্য দান করার সামর্থ্য তোমার নেই। তখন আমি বললাম, কিছু লোকের জন্যই আমার দান। অতঃপর উমার এবং যায়েদ উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এলেন এবং যায়েদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন,
«أَشْهَدُ أَنْ لَا إله إلا الله وأن محمداً عبده و رسوله»
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। "
প্রিয় পাঠক! আপনি ঐ ইয়াহূদীর প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন, সে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এ মর্মে পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা চালিয়েছে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্রোধকে ক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। আর এর দ্বারা সে তাঁর নবুওয়াতের সত্যতাও যাচাই করে নিতে পারে। বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো অহী ছাড়া অদৃশ্যের ইলম জানতেন না। উক্ত ঘটনায়ও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যার দ্বারা ইয়াহূদীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ হবে। সে তার সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছে যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তীব্র ক্রোধান্বিত করে তুলতে পারে এবং এ জন্য সে এমন একাধিক পন্থা অবলম্বন করেছে যার কোনো একটিতেই সাধারণ মানুষ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যেত।
প্রথমত: সে নির্ধারিত সময়ের পুর্বেই তার পাওনা চাইতে এসেছে। যে সময়ে চাওয়ার অধিকারই সে রাখে না।
দ্বিতীয়ত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার কলার ও চাদরের সম্মুখভাগ কাছে ভিড়ানোর জন্য টেনে ধরেছে!! প্রিয় পাঠক! আপনি সে দৃশ্যটি একটু কল্পনা করে দেখুন যে, প্রকাশ্য জনসম্মুখে সাহাবাগণের মধ্যখানে এক ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামার কলার ও চাদর টেনে ধরেছে। এটি কত বড় দৃষ্টতা!!
তৃতীয়ত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে কপট দৃষ্টিতে তাকিয়েছে।
চতুর্থত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোনো উপাধি বা উপনাম ব্যতিরেকে দৃষ্টতাবশত সরাসরি নাম ধরে ডেকেছে, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তুমি কি আমার পাওনা পরিশোধ করবে না?
পঞ্চমত: সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পূর্বসুরীগণ সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করে বলেছে যে, আল্লাহর কসম, তোমরা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধরেরা টালবাহানাকারী গোত্র।
সূধীবৃন্দ! এ পাঁচটি কারণে যে ধরণের সীমালঙ্ঘণ ও আগ্রাসী চিত্র ফুটে উঠেছে তার সাথে আপনি এ বিষয়টিও যোগ করে ভেবে দেখুন যে, ঐ ইয়াহুদী এ দৃষ্টতাগুলো প্রদর্শন করছে এমন একজনের সাথে যিনি মদীনার প্রধান নেতা এবং মদীনার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। শুধু তাই নয় সে সময়টাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান করছিলেন মুহাজির ও আনসারদের দ্বারা অর্জিত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার ষোলকলা বেষ্টনিতে। এ সকল প্রেক্ষাপট নিয়ে যদি আপনি ভাবেন তাহলে আপনিসহ অধিকাংশ মানুষই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে, এ ধরণের সীমালঙ্ঘনকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বৈ কিছুই হতে পারে না। শুধু মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিটুকুও তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ শাস্তির প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ইতিহাস অবলোকন করেছি। আমাদের মনোজগতকে স্তব্ধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করেছেন?!!
তিনি সকল আক্রমনাত্মক অভিব্যক্তিকে হজম করে নিয়েছেন। আমি একথা বলব না যে, তিনি শুধুমাত্র তাকে ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা বা বিবেচনাবোধের জন্য এমনটি করেছেন; বরং তিনি স্থির-মানসে মুসকি হেসে হর্ষচিত্তে সব কিছু মেনে নিয়েছেন। যেমনটি যায়েদ ইবন সা’নাহ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমারের দিকে শান্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, অতঃপর বললেন, হে উমার! আমি এবং সে তোমার কাছে এর থেকে ভিন্নতর কিছু আশা করেছিলাম। আমরা আশাবাদী ছিলাম যে, তুমি আমাকে উত্তমভাবে পরিশোধের অনুরোধ করবে এবং তাকে উত্তম পন্থায় চাওয়ার আদেশ করবে!!
এ ধরণের উন্নত চরিত্র মাধুর্যের তাৎপর্য অনুধাবন করা সাধারণ রাজন্যবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রকারান্তে সকল মানুষের জন্যই অসাধ্য ও অকল্পনীয় ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয় দেখুন! তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধের নসীহতের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অথচ তখনও ঋণ পরিশোধের সময়ই হয় নি। সেখানে অন্যের উপদেশের প্রয়োজনীয়তার তো প্রশ্নই আসে না। তথাপি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র ইয়াহূদীর মনের প্রশান্তি ও তার সাথে সম্পর্ক অটুট রাখার মানসে এরূপ মন্তব্য করেছেন।
এখানেই শেষ নয়, এতকিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বলে বিবৃতি দিয়েছেন যে, ন্যায়পরায়ণতা তো হবে এটাই যে, উমারের ধমকে তার মধ্যে যেই ভীতি সঞ্চার হয়েছে তার বিনিময়ে তাকে কিছু দেওয়া হোক। আর সে জন্য তাকে বিশ সা' খেজুর বেশি দিয়ে দিলেন।
এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক গৃহীত এ সকল সীদ্ধান্ত আবেগতাড়িত হয়ে সাময়িক আপোস চেষ্টা বা পরবর্তীতে সময় সাপেক্ষে চিন্তা-ভাবনা করে যথোপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণের বাসনা নয়; বরং এটিই তাঁর অকৃত্রিম যথাযথ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিক্রীয়া। সকল মানুষের সাথে তাঁর স্বভাবজাত আচরণই এমন। চাই সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক। চাই সে উত্তম উপস্থাপনায় নিজেকে প্রকাশ করুক বা মন্দভাবে উদিত হোক।
বিশ্বের সকল রাজণ্যবর্গ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও ক্ষমতাধরদের কি উচিত নয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ অনুপম অবস্থানের ইতিবৃত্ত অধ্যয়ন করা? যেন নিজেদের পারিপার্শ্বিক কর্মকাণ্ডকে ন্যায়পরায়ণতার মানদণ্ডে যাচাই করে নিতে পারে!
পৃথিবীর সভ্যতার ধারকবাহকদের কি উচিত নয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গস করা? যেন নিজেদের চারিত্রিক মানদণ্ড ও মূল্যবোধকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র মাধুর্য্য অনুযায়ী পরিবর্তন করে নিতে পারে!
বাস্তবিকই আজকের বিশ্ব নবী চরিত্রের এ স্বচ্ছ সুধার বড়ই মুখাপেক্ষী। যে দিন বিশ্ববাসী এ অনন্য মহান চরিত্রকে অনুধাবন করতে পারবে সেদিন সন্দেহাতীতভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি সমূলে পাল্টে যাবে এবং নানামুখী সংকট ও সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রসস্ত পথ খুলে যাবে।

টিকাঃ
130. আসসামু অর্থ মৃত্যু, ইবনুল মানযুর: লিসানুল আরব সোম অধ্যায় (১২/৩১৪)
131. সহীহ বুখারী (كتاب الأدب: باب الرفق في الأمر كله) হাদীস নং ৫৬৭৮; সহীহ মুসলিম (كتاب السلام: باب النهي عن ابتداء أهل الكتاب بالسلام وكيف يرد عليهم)
132. খোরপোশের ব্যায় রাখার থলি। যা কোমরে বেধে রাখা হয়। ইবন হাজার আসকালানী: ফাতহুলবারী (৩/৩৯৭), ইবন মানযুর: লিসানুল আরব (مادة: همي) (১৫/৩৬৪।
134. ইবন হিব্বান, হাদীস নং ২৮৮; মুসতাদরাক আল-হাকিম, হাদীস নং ৬৫৪৭; বায়হাকী, হাদীস নং ১১০৬৬। হাকিম বলেন এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ যদিও হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম তাখরীজ করেন নি। ত্বাবরানী বলেন, এ হাদীসের সকল বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 একের পাপের বোঝা অন্যে বহন করবে না

📄 একের পাপের বোঝা অন্যে বহন করবে না


অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতার একটি দিক এটাও ছিল যে, তিনি এক জনের অপরাধের কারণে সামষ্টিকভাবে সকলকে শাস্তি দিতেন না। প্রত্যেক গোত্রেই ভালো-মন্দ উভয় শ্রেণির লোকই রয়েছে। প্রত্যেক দলেই বিশ্বস্ত ও বিশ্বাসঘাতক উভয় প্রকৃতির লোক থাকে। অপরাধ যত বড়ই হোক কখনোই তিনি একজনের অপরাধের কারণে অন্যকে অভিযুক্ত করতেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ ﴾ [المدثر: ٣٨]
"প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৩৮]
তিনি আরো বলেন, وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى [الانعام: ١٦٤]
"একের পাপের বোঝা অন্যে বহন করবে না।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৬৪]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এ বিষয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে বীরে মা'ঊনার ¹⁴⁴ যুদ্ধের পরে সাহাবী আমর ইবন উমাইয়া আদ-দ্বমরী ¹⁴⁵ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সংশ্লীষ্ট ঘটনাটি। পুরো ঘটনাটি আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَاهُ رِعْلٌ وَذَكْوَانُ وَعُصَيَّةٌ وَبَنُو لَحْيَانَ فَزَعَمُوا أَنَّهُمْ قَدْ أَسْلَمُوا وَاسْتَمَدُّوهُ عَلَى قَوْمِهِمْ فَأَمَدَّهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبْعِينَ مِنْ الْأَنْصَارِ قَالَ أَنَسٌ كُنَّا نُسَمِّيهِمُ الْقُرَّاءَ يَحْطِبُونَ بِالنَّهَارِ وَيُصَلُّونَ بِاللَّيْلِ فَانْطَلَقُوا بِهِمْ حَتَّى بَلَغُوا بِثْرَ مَعُونَةً غَدَرُوا بِهِمْ وَقَتَلُوهُمْ فَقَنَتَ شَهْرًا يَدْعُو عَلَى رِعْلٍ وَذَكْوَانَ وَبَنِي لَحْيَانَ »
"রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট রি'ল, যাকওয়ান, 'উসাইয়া ও বানু লাহইয়ান গোত্রের কিছু লোক এসে বলল, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং তারা তাঁর নিকট তাদের সম্প্রদায়ের মোকাবেলায় সাহায্য প্রার্থনা করলো।
তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্তর জন আনসার পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করলেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আমরা তাদের ক্বারী নামে আখ্যায়িত করতাম। তারা দিনের বেলায় লাকড়ী সংগ্রহ করতেন, আর রাত্রিকালে সালাতে মগ্ন থাকতেন। তারা তাঁদের নিয়ে রওয়ারা হয়ে গেল। যখন তাঁরা বীরে মা'উনা নামক স্থানে পৌঁছালো, তখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং তাঁদের হত্যাকরে ফেলল। এ সংবাদ শোনার পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রি'ল, যাকওয়ান ও বানু লাহইয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে দো'আ করে একমাস যাবত কুনূতে নাযিলা পাঠ করেন।"¹⁴⁶
এটি মুসলিমদের জন্য অনেক বড় দূর্ঘটনা। গাদ্দারীর ফলস্বরূপ সত্তর জন সাহাবীকে জীবন দিতে হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে এ পরিমাণ ব্যথা পেলেন যে, তিনি একমাস যাবৎ সেসব বিশ্বাসঘাতকদের জন্য বদ-দো'আ করেছেন। এ ধরণের ঘটনা তাঁর জীবনে এ একটিই। ভাবুন তো! কী পরিমাণ ব্যথা পেলে তিনি শত্রুপক্ষকে অভিশাপ দিতে পারেন..!!
এ হত্যাযজ্ঞ থেকে একজন সাহাবী শুধু মুক্তি পেলেন। তিনি হলেন আমর ইবন উমাইয়া আদ-দ্বামরী রাদিয়াল্লাহু আনহু। আমের ইবন তোফায়েল¹⁴⁷ তার মায়ের ওপর একটি গোলাম মুক্ত করার যিম্মা ছিল বলে আমর ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মুক্তি দিয়ে দিল। আমর ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মদীনায় ফিরে আসলেন। ফেরার পথে তিনি সত্তর জন সাহাবী হত্যায় জড়িত থাকা বানু সুলাইমের একটি শাখা গোত্র বানু আমেরের দুই মুশরিককে পেয়ে গেলেন। তিনি মনে করলেন যে, এদের হত্যা করতে পারলে কিছুটা হলেও সাথীদেরকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তাই এ দু'জনকে হত্যা করে ফেললেন। পরক্ষণেই তার মনে পড়লো যে, এরা তো চুক্তিবদ্ধ। এদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপত্তা দিয়েছেন। তাই তিনি দ্রুত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে পুরো ঘটনা জানালেন।
প্রিয় পাঠক! চলুন দেখি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিক্রিয়া কী ছিল..?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহুর্তের মধ্যেই সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গেলেন। আবেগ, অনুভূতি ও প্রবৃত্তিকে ঝেড়ে ফেলে বিবেক ও ধর্মীয় বিধান কার্যকরী করতে ব্রতী হয়ে ওঠলেন। তিনি আমর ইবন উমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, তুমি যে দু'জনকে হত্যা করে ফেলেছ আমি তাদের রক্তপণ আদায় করে দেব। ১৪৮
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিহত দু'জনের পরিবারকে রক্তপণ আদায় করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন..!!
তিনি তো এটাও বলতে পারতেন যে, তাদের গোত্রের লোকেরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাদের সত্তর জনকে হত্যা করেছে, বিনিময়ে আমরা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের দু'জনকে তো মারতেই পারি। কিন্তু না। তিনি একের অপরাধের জন্য অন্যকে শাস্তি দেন নি। কারণ, 'আমেরী দু'ব্যক্তি তো এমন কোনো আপরাধ করে নি যেজন্য তাদেরকে হত্যা করা যেতে পারে। আবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ। তাই তাদেরকে হত্যা করা কোনোভাবেই বৈধ হয় নি।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য সত্তর জন খ্যাতনামা সাহাবীকে হারানোর বেদনা ও রাজনৈতিক সংকটই একমাত্র সংকট ছিল না; বরং এর পরিপ্রেক্ষিতে দু'জন মুশরিক হত্যার জন্য রক্তপণ আদায় করার যে বাধ্য-বাধকতা তৈরি হলো এতে আরেকটি অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হলো। কারণ, এ ঘটনা ছিল উহুদ যুদ্ধ পরবর্তী কয়েক মাসের ভেতরে। তখন মদীনায় চরম দারিদ্র্যাবস্থা চলছিল। আবার রক্তপণের এ মোটা অংক জোগাড় করতে তিনি চুক্তিবদ্ধতার দাবি নিয়ে বনু নাদ্বীরের ইয়াহুদীদের সাথে সাক্ষাৎ করে সাহায্য চাইলেন। এতে ইয়াহুদীদের সাথে আরেকটি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে এবং এ সাক্ষাতের ঘটনাই পরবর্তীতে বানু নাদ্বীরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। ¹⁴⁹
অতীত কিংবা বর্তমানে এ স্তরের ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার নযীর কি অন্য কোথাও কেউ দেখাতে পারবে..?! এতকিছুর পরও কি কেউ এ দাবী করতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদেরকে সামাজিক স্বীকৃতি দিতেন না, সম্মান প্রদর্শন করতেন না বা তাদের প্রতি ইনসাফ করতেন না...?! আমাদের এসব আলোচনাকে অনেকেই অলিক কল্পনা বা পূর্বকালের রূপকথার বানানো গল্প মনে করতে পারেন, কিন্তু না। ইসলাম এসব কিছুকে এমনভাবে বাস্তবে রূপদান করে দেখিয়েছে যা অন্য কারো দ্বারা স্বপ্নেও কল্পনা করা সম্ভব নয়।
বানু আমের গোত্রের দু'জন মুশরিকের নিহত হওয়া এবং এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদক্ষেপের এ ঘটনাকে বিশাল সমুদ্রের মাঝে এক ফোটা পানির ন্যায়ই মনে হবে। তাঁর ঐ আচরণের সাথে তুলনা করলে যে আচরণ তিনি মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়ে মদীনা পানে হিজরত করার সময় মক্কাবাসীর আমানতের মালের ব্যাপারে করেছেন।
ঘটনা সবারই জানা। কিন্তু প্রয়োজন গভীর চিন্তা ও অনুধাবনের...।
মক্কাবাসীদের রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো প্রতিই পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। ফলে সকলেই নিজেদের অর্থকড়ি ও বিভিন্ন জিনিষপত্র তাঁর কাছেই আমানত রাখতো। কোনো অতিরঞ্জন নয় বাস্তবেই তিনি ছিলেন মহা বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী। এমনকি কুরাইশ কর্তৃক নানাভাবে কঠিন নির্যাতন করা এবং তাঁকে জাদুকর, মিথ্যুক, গণক, কবি ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত করার পরও তারা নিয়মিত তাদের ধন-সম্পদের আমানত তাঁর কাছেই রাখতো। আর তিনিও তাদের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড বিরোধিতা ও শত্রুতা চলাকালীন সময়েও তাদের সম্পদ হিফাযতের গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন।
অতঃপর এসে গেলো মদীনায় পাড়ি জমানোর পালা।
কাজ-কর্ম, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ সব ত্যাগ করার পালা।
কুরাইশের পক্ষ থেকে যুলুম-নির্যাতন চুড়ান্ত পর্বে এসে দেশত্যাগে বাধ্য করার পালা।
অসভ্যতা ও অমানবিকতার সর্বসীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পালা।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহা যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। তাঁর নিজ মাতৃভূমি, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় ভূখণ্ড 'মক্কা' ত্যাগের বিরহ যন্ত্রণা। যেমন, বিদায়কালে মক্কানগরীকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন: "আমি জানি তুমি আল্লাহর সৃষ্ট সবচেয়ে উত্তম ভূমি এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় ভূমি। তোমার অধিবাসীরা যদি বের করে না দিত তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।"¹⁵⁰
এতসব ব্যথা-বেদনার পরেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্ভাব্য সর্বোত্তম পন্থায় ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেলেন। তিনি সকল গচ্ছিত সম্পদ আলী ইবন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট রেখে তাকে এ আদেশ দিয়ে গেলেন যে, সবগুলো সম্পদ পাওনাদারদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তিন দিন মক্কায় অবস্থান করে সকল আমানত মালিকদের নিকট পৌঁছে দিয়ে গেলেন।¹⁵¹
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্য কারো দ্বারা এ ধরণের উত্তম চরিত্র ও পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে-এটা আমি বিশ্বাস করি না।
এমন পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থানে অন্য যে কেউ হলে আমানতের এ মালগুলো আত্মসাৎ করে ফেলার জন্য কোনো না কোনো একটি অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলত এবং সেগুলো যথাযথ মালিকদের নিকট আদৌ পৌঁছে দিত না।
কেউ কেউ এ ব্যাখ্যা দিত যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘর-বাড়ি ধন-সম্পদ সব দখল করে নিয়েছে। বিনিময়ে তাদের আমানতের মালগুলো ফেরত না দেওয়া তো অন্যায় হওয়ার কথা না...।
আবার কেউ বলত যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিল...।
কেউ বলত, তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাণ নাশের ষড়যন্ত্র করেছিল। এমনকি ষড়যন্ত্র প্রায় বাস্তবায়নও হতে চলেছিল। যদি না তিনি শেষ মুহুর্তে মু'জিযার মাধ্যমে তাদের ফাঁদ ভেদ করে বেরিয়ে না যেতেন...।
কেউ বলত যে, এ সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ইসলামের প্রচার প্রসারে ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে মদীনার প্রাথমিক দিনগুলোতে এর বেশ প্রয়োজনও ছিল...।
হ্যাঁ, আপনি যা ইচ্ছা ব্যাখ্যা করতে পারেন; কিন্তু আপনি যখন ব্যক্তিগত চিন্তা ও নিজস্ব প্রবৃত্তির চাহিদা বাদ দিয়ে নিরপেক্ষভাবে বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য করবেন তখন বুঝতে পারবেন যে, এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। আমানতের সম্পদগুলো নির্দিষ্ট কিছু লোকের ব্যক্তি-স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত। যারা পূর্ণ হিফাযতে রাখার শর্তে/চুক্তিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আমানত রেখেছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজের সম্পদের চেয়েও যত্ন ও নিরাপত্তার সাথে সেগুলো সংরক্ষণ করতেন। তাই পরিস্থিতি যাই হোক এবং তাদের পক্ষ থেকে নির্যাতনের মাত্রা যে পর্যায়েই পৌঁছুক তিনি তাদের সম্পদগুলো আত্মসাৎ করে ফেলতে বা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না। তাঁর প্রাণনাশের তদবীরকারীদের অপরাধের কারণে যারা তাঁকে বিশ্বাস করে আমানত রেখেছিল তাদেরকে শাস্তি না দেওয়াই হলো ন্যায়পরায়ণতার দাবী।
তারা মগ্ন হয়ে আছে তাঁর প্রাণ নাশের তদবীরে...।
আর তিনি ব্যস্ত হয়ে গেলেন তাদের আমানত রক্ষায়...।
তারা রয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার চুড়ান্ত পর্যায়ে...।
আর তিনি আছেন বিশ্বস্ততার উচ্চ শিখায়...।
তারা হলো মুশরিক...।
আর তিনি হলেন জগৎসমূহের রবের প্রেরিত রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)...।
তাঁর মাঝে ও তাদের মাঝে আসমান-জমিনের ফারাক...।
আরো সৌন্দর্যের ব্যাপারটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব আচরণ কৃত্রিমতা বা অনুগ্রহ প্রকাশের জন্য করতেন না...।
তিনি সদাচরণ ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা এজন্য করতেন না যে, চারিদিকে তার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক। সকলেই তাকে বাহবা দিক...।
তাঁর কবি ও সাহিত্যিক শিষ্যদেরকে তিনি তাঁর প্রশংসা ও গুণগান করে সাহিত্য কিংবা কবিতা রচনা করতেও বলেন নি...।
আল্লাহ তাঁকে মহৎ চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে আদেশ করেছেন। এ আদেশই তাঁকে উপরোক্ত সব চিন্তা ভুলিয়ে দিয়েছে। তিনি শুধু আল্লাহর আদেশ পালনার্থে তাঁরই জন্য একান্ত ও একনিষ্ঠভাবে এসব আচরণ করতেন। এজন্য আল্লাহর বান্দাদের নিকট তিনি কোনোরূপ প্রতিদান, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও সুনাম-সুখ্যাতি কিছুরই আশা করতেন না।
﴿ قُلْ مَا أَسْلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ ﴾ [ ص: ٨٦]
“বলুন, ‘এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না আর আমি ভানকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৮৬]
فصل اللهم عليك وسلم يا إمام العادلين، وسيد النبيين والمرسلين.

টিকাঃ
¹⁴⁴. বীরে মা'ঊনা। বানু আমের ও বানু সুলাইমের প্রস্তরময় ভুমির মাঝামাঝি একটি স্থান। বানু সুলাইমের অধিক নিকটবর্তী এবং তাদের মালিকানাধীন। কেউ কেউ বলেছেন, এটি মক্কা থেকে মদীনার দিকে ওঠার পথে। সেখানেই রাজী'-এর ঘটনা সংঘটিত হয়। দেখুন: ইয়াকৃত আল-হামাওয়ী: মু'জামুল বুলদান (১/৩০২)।
¹⁴⁵. আমর ইবন উমাইয়া আয-যামরী রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন কাজে তাকে নিজ প্রতিনিধি বানাতেন। তিনি ছিলেন বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য আরবের খ্যাতিমান ব্যক্তি। বীরে মা'ঊনা হলো তার প্রথম অভিযান। তাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। ষষ্ঠ হিজরীতে নাজ্জাশীর নিকট ইসলামের দাওয়াত পত্র নিয়ে তাকে পাঠানো হয় এবং সে পত্রটি তিনি নিজ হাতে লিখেন। এ প্রেক্ষিতে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। অধিকতর জানতে: ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৩/৬৮৯), ইবন হাজর: আল-ইসাবাহ (৫৭৬৫)।
¹⁴⁶. সহীহ বুখারী: (كتاب الجهاد والسير، باب العون والمدد) হাদীস নং ২৮৯৯; আহমদ, হাদীস নং ১৩৭০৭; বায়হাকী, হাদীস নং ২৯১৫।
¹⁴⁷. আমের ইবন তোফায়েল। বানু আমের গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল। বীরে মা'ঊনায় সত্তর জন সাহাবী হত্যায় জড়িত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বদ-দো'আ করেছেন এবং সে কারণেই সে মারা যায়।
¹⁴⁸. যাইলা'ঈ: নাসবুর রায়াহ (৪/৩৯৬), ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/৮৫)।
¹⁴⁹. সহীহ বুখারী: كتاب المغازي، باب حديث بني النضير ومخرج رسول الله صلى الله عليه وسلم إليهم في ( دية الرجلين وما أرادوا من الغدر برسول الله صلى الله عليه وسلم( অধিকতর জানতে: তাবারী: তারীখুল উমামি ওয়ালমুলুক (২/৮৩), ইবন কাসীর: আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/৮৪)।
¹⁵⁰. তিরমিযী: আব্দুল্লাহ ইবন আদী আয-যুহরী থেকে, হাদীস নং ৩৯২৫। আবু ঈসা বলেছেন, হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ। আহমদ, হাদীস নং ১৮৭৩৭। আদ-দারমী, হাদীস নং ২৫১০। মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৫২২০। আন-নাসায়ী: আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ৪২৫২। মিশকাত, হাদীস নং ২৭২৫। আলবানী বলেছেন, হাদীসটি সহীহ। দেখুন: সাহীহুল জামে' (৭০৮৯)।
¹⁵¹. ইবন কাসীর: আস-সীরাতুন নাববিয়্যাহ (২/২৭০), ইবন হিশাম: আস-সীরাতুন নাববিয়্যাহ (২/২১), মোবারকপুরী: আর-রাহীকুল মাখতুম (১২১)।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 অত্যন্ত বিরাজভাজনদের সাথেও ন্যায়পরায়ণতা

📄 অত্যন্ত বিরাজভাজনদের সাথেও ন্যায়পরায়ণতা


রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্য ন্যায়পরায়ণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, অপরাধ যত মারাত্মকই হোক না কেন তিনি কাউকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও ইনসাফের সীমা অতিক্রম করতেন না। তাঁর ও মুসলিমদের অধিকার হরণের ব্যাপারে কেউ যত বড় সীমালঙ্ঘনই করুক না কেন।
উবাই ইবন কা'আব বর্ণনা করেন, "উহুদ যুদ্ধে আনসারদের ৬৪ জন এবং মুহাজিরদের ছয়জন শাহাদাত বরণ করেন। যাদের মধ্যে হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। সবকটি লাশেরই অঙ্গ-প্রতঙ্গের বিকৃতি সাধন করে ফেলা হয়। আনসাররা বললেন, 'যদি কোনো দিন আমাদের হাতে এমন সুযোগ আসে তাহলে আমরাও দেখিয়ে ছাড়বো'।"
যখন মক্কা বিজয় হয়ে গেল আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করলেন,
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّبِرِينَ [النحل:
[১২৬
"আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়। যদি সবর কর, তবে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৬]
এক ব্যক্তি বলে উঠলেন, 'আজকের পরে কোনো কুরাইশ থাকবে না'। উবাই ইবন কা 'আব থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«كفوا عن القوم إلا أربعة»
"(কুরাইশের) চারজন ব্যতীত আর কাউকে হত্যা করবে না।"¹⁵²
উহুদ যুদ্ধের এ কঠিন মুসীবত এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে এত মারাত্মক আঘাত প্রাপ্তির পরেও তিনি শুধু আল্লাহর বিধানই বাস্তবায়ন করলেন। কোনো প্রকার বাড়াবাড়ির অনুমতি দিলেন না। ন্যূনতম সীমালঙ্ঘনকেও মেনে নিলেন না।
আর এ আয়াতের অবতরণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কথিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের দিন আপন চাচা হামযাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিকৃত লাশ দেখে বলেছিলেন, 'আমরা অবশ্যই তাদের সত্তরটি লাশের বিকৃতি সাধন করে ছাড়বো'। ¹⁵³ ফতহুল বারীতে আল্লামা ইবন হাজার এটিকে দুর্বল বলেছেন। ¹⁵⁴ এবং পূর্বের যে হাদীসে এ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে যে, আয়াতটি নাযিল হয়েছে উহুদ যুদ্ধের সময় নয়, মক্কা বিজয়ের দিন; সে হাদীসটিও এ মতের সাথে সাংঘর্ষিক। আর যেমনটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবও এমন ছিল না যে, তিনি আবেগতাড়িত হয়ে এ ধরণের মন্তব্য করতে পারেন। আবার এ মতের হাদীসটিকে যদি সহীহও ধরে নেওয়া হয় তাহলেও বলবো যে, সত্তরটি লাশের বিকৃতি সাধন করার মন্তব্যটি ছিল তাঁর সাময়িক চিন্তা থেকে যা কুরআনের আয়াত নাযিলের পর স্থায়িত্ব পায় নি। কারণ, তিনি ছিলেন পবিত্র কুরআনেরই বাস্তব অনুশীলন ক্ষেত্র। আর তিনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর যদি তার বিপরীতে এর চেয়ে ভালো কিছু দেখতেন তাহলে প্রথম সিদ্ধান্ত ত্যাগ করতেন এবং যা অধিক সঠিক ও সুন্দর তাই করতেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ، فَرَأَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا، فَلْيَأْتِ الَّذِي هُوَ خَيْرٌ، وَلْيُكَفِّرْ عَنْ يَمِينِهِ "যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম খায়, পরে তার বিপরীতটিকে তা থেকে উত্তম মনে করে, সে যেন তা করে ফেলে এবং নিজের কসমের কাফফারা দেয়।"¹⁵⁵
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিস্ময়কর ন্যায়পরায়ণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, তিনি যাদেরকে অত্যাধিক অপছন্দ করতেন তাদের প্রতিও কোনো প্রকার আবিচার করা থেকে বিরত থাকতেন। এ ব্যাপারে তিনি কুরআনের এ মৌলিক আয়াতকে লক্ষ্য রাখতেন,
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا [المائدة: ٨] "কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনো ভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করেব না।" [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৮]
এ আয়াতেরই বাস্তব প্রতিফলন আমরা মুসায়লামা কাযযাবের দূতদ্বয়ের সাথে আলাপকালে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দেখতে পেয়েছি।
দূতদ্বয় স্পষ্ট বলেছে যে, তারা মুসায়লামা কাযযাবকে নবী হিসাবে স্বীকার করে এবং তার মতাদর্শ মেনে চলে। এক কথায় স্বঘোষিত মুরতাদ। যাদের হত্যা করে ফেলার বিধান রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«لا يحل دم امرئ مسلم يشهد أن لا إلاه إلا الله و أني رسول الله إلا بإحدى ثلاث: الثيب الزاني والنفس بالنفس، والتارك لدينه المفارق للجماعة»
"যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল তাকে তিন কারণ ব্যতীত হত্যা করা বৈধ নয়।
এক. বিবাহিত যিনাকারী।
দুই. প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ।
তিন, ধর্মত্যাগী দল পরিহারকারী।"¹⁵⁶
এ হলো ধর্মত্যাগী দল পরিহারকারীর শর'ঈ বিধান। এ দূতদ্বয় শুধু স্বধর্ম ত্যাগ ও দল পরিহারই করে নি; বরং মানুষের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে এবং মুসায়লামার মতাদর্শের প্রতি অন্যদেরকে দাওয়াতও দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, আরো একধাপ এগিয়ে তারা এসেছে নবুওয়াতকে ভাগাভাগি কিংবা রদবদল করে নেওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দর কষাকষি করতে।
কেউ যদি প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে জীবন যাপন করে এবং ন্যায়পরায়ণতা ও শরী'আতের বিধানের প্রতি লক্ষ্য না রেখে শুধু নিজ স্বার্থ চিন্তা করে তাহলে এহেন পরিস্থিতিতে এ দূতদ্বয়কে হত্যা করে ফেলা তার জন্য আবশ্যকীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরণের অসাধারণ পরিস্থিতিতেও দূতদ্বয়ের প্রাণ রক্ষা করলেন। কারণ, তারা ছিল দূত বা প্রতিনিধি। সে সময় বিশ্বের কোথাও দূত হত্যার প্রচলন ছিল না। ইসলামী শরী'আতও পৃথিবীর এ প্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বহাল রেখেছে। দূতদ্বয়কে সম্বোধন করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
أما والله لو لا أن الرسل لا تقتل لضربت أعناقكما»
"জেনে রেখো, আল্লাহর শপথ! যদি দূত হত্যা না করার প্রচলন না থাকতো তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের দু'জনের গর্দান উড়িয়ে দিতাম। "¹⁵⁷
দেখুন, এ দূত-দয়ের স্ব-ধর্ম ত্যাগ করে কাফির হয়ে যাওয়া এবং তাদের এ ধরণের অসভ্য আচরণ কোনো কিছুই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের ওপর অবিচার কিংবা বাড়াবাড়ি করার দিকে নিয়ে যেতে পারে নি; বরং তিনি তাদেরকে নিরাপত্তা দিলেন। তাদের সাথে উন্নত নৈতিকতা প্রদর্শন করলেন। অনেক শত্রু কাফিররা না মানলেও তিনি দূত হত্যা না করার প্রাচীন রীতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়ে সে রীতির ওপর অটল রইলেন। স্বয়ং মুসায়লামা কায্যাব নিজে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক দূত হাবীব ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বাগে পেল তখন তাকে মেরে তার লাশ কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলেছিল।
বাস্তবতা আর কতো অধিক থেকে অধিকতর স্পষ্ট হওয়ার বাকি আছে...?। ইসলামী বিধি-বিধান ও অন্যান্য রীতি-নীতির বিরাট পার্থক্য সকলেই বুঝুক...! আসমানী আইন ও মানব-রচিত মতাদর্শের মধ্যকার ব্যতিক্রমধর্মী দূরত্ব সবাই অনুধাবন করুক...!!
উপসংহারে আমরা এ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তথা অমুসলিমদের সাথে ন্যায়পরায়ণতা বিধানে তাঁর কর্মপন্থা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটির অবতারণা করতে চাই। তা হচ্ছে খায়বার বিজয়ের পর ইয়াহুদী সম্প্রদায় কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
"لَمَّا فُتِحَتْ خَيْبَرُ أُهْدِيَتْ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَاةٌ فِيْهَا سَمُّ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اِجْمَعُوْا إِلَيَّ مَنْ كَانَ هُنَا مِنْ يَهُوْدِ فَجُمِعُوْا لَهُ فَقَالَ إِنِّيْ سَائِلُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَهَلْ أَنْتُمْ صَادِقِيَّ عَنْهُ فَقَالُوْا نَعَمْ قَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَبُوْكُمْ قَالُوْا فُلَانٌ فَقَالَ كَذَبْتُمْ بَلْ أَبُوْكُمْ فُلَانٌ فَقَالُوْا صَدَقْتَ"
شَيْءٍ إِنْ سَأَلْتُ عَنْهُ فَقَالُوا نَعَمْ يَا أَبَا الْقَاسِمِ وَإِنْ كَذَبْنَا عَرَفْتَ كَذِبَنَا كَمَا عَرَفْتَهُ فِي أَبِينَا فَقَالَ لَهُمْ مَنْ أَهْلُ النَّارِ قَالُوا تَكُونُ فِيهَا يَسِيرًا ثُمَّ تَخْلُفُونَا فِيهَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخْسَنُوا فِيهَا وَاللَّهِ لَا نَخْلُقُكُمْ فَأَبَدًا ثُمَّ قَالَ هَلْ أَنْتُمْ صَادِقِ عَنْ شَيْءٍ إِنْ سَأَلْتُكُمْ عَنْهُ فَقَالُوا نَعَمْ يَا أَبَا الْقَاسِمِ قَالَ هَلْ جَعَلْتُمْ فِي هَذِهِ الشَّاةِ سُمَّا قَالُوا نَعَمْ قَالَ مَا حَمَلَكُمْ عَلَى ذَلِكَ قَالُوا أَرَدْنَا إِنْ كُنْتَ كَاذِبًا نَسْتَرِيحُ وَإِنْ كُنْتَ نَبِيًّا لَمْ يَضُرَّكَ.»
"খায়বার যখন বিজয় হয়, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হাদীয়াস্বরূপ একটি (ভুনা) বকরী প্রেরিত হয়। এর মধ্যে ছিল বিষ।
তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এখানে যত ইয়াহুদী আছে আমার কাছে তাদের জমায়েত কর। তার কাছে সবাইকে জমায়েত করা হলো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সম্বোধন করে বললেন, আমি তোমাদের নিকট একটি বিষয়ে জানতে চাই, তোমরা কি সে বিষয়ে আমাকে সত্য কথা বলবে? তারা বলল: হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের পিতা কে? তারা বলল, আমাদের পিতা অমুক। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা মিথ্যা বলেছ; বরং তোমাদের পিতা অমুক। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন ও সঠিক বলেছেন। এরপর তিনি বললেন, আমি যদি তোমাদের নিকট আর একটি প্রশ্ন করি, তা হলে কি তোমরা সে ব্যাপারে আমাকে সত্য কথা বলবে? তারা বলল, হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা মিথ্যা বলি তবে তো আপনি আমাদের মিথ্যা জেনে ফেলবেন, যেমনিভাবে জেনেছেন আমাদের পিতার ব্যাপারে। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, জাহান্নামী কারা? তারা বলল, আমরা সেখানে অল্প দিনের জন্যে থাকবো। তারপর আপনারা আমাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাই সেখানে লাঞ্ছিত হয়ে থাকো। আল্লাহর কসম! আমরা কখনও সেখানে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত হবো না। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলেন, আমি যদি তোমাদের কাছে আর একটি বিষয়ে প্রশ্ন করি, তবে কি তোমরা সে ব্যাপারে আমার কাছে সত্য কথা বলবে? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি এ বকরীর মধ্যে বিষ মিশ্রিত করেছ? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন, কিসে তোমাদের এ উদ্বুদ্ধ করেছে? তারা বলল: আমরা চেয়েছি, যদি আপনি (নবুওয়াতের দাবীতে) মিথ্যাবাদী হন, তবে আমরা আপনার থেকে মুক্তি পেয়ে যাব। আর যদি আপনি সত্য নবী হন, তবে এ বিষ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।"¹⁵⁹
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনোরূপ প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ না করে অত্যন্ত ধীরতার সাথে তাঁর প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা ইয়াহূদীদের নিকট থেকে আগে ঘটনাটি যাচাই করলেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রমান সাব্যস্ত করলেন। এমনকি তারা নিজেরাই স্বীকার করল যে, হত্যা প্রচেষ্টায় তারা জড়িত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাও খুজে বের করলেন যে, এসব ইহুদীরা এক ইয়াহুদী মহিলাকে আদেশ করেছে যে, সে যেন একটি ভুনা করা বকরীর মধ্যে বিষ মিশিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যায়। পুরুষরা হলো হুকুমের আসামী। আর যে বাস্তবায়ন করেছে সে হলো একজন নারী।
প্রিয় পাঠক! এ ঘটনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিক্রিয়া জানার আগে এক মূহুর্ত একটু ভাবুন তো এ ধরণের ঘটনা যদি পৃথিবীর অন্য কোনো রাজা-বাদশাহ, নেতা-নেত্রী ও আমীর-উমারাদের বেলায় ঘটতো তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া কী দাড়াত...?! এ ধরণের পরিস্থিতিতে ঘটনার উদ্দোক্তা, পরামর্শদাতা, আদেশদাতা, বাস্তবায়নকারী, অবগত ব্যক্তিসহ এহেন ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত সকলকেই হত্যার আদেশ দেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুই কেউ ভাবতে পারতো না। কখনো কখনো এ ধরণের অপরাধে অপরাধী ব্যক্তির গোটা এলাকা জুড়ে গণ-গ্রেফতার চালিয়ে দেওয়া হয়। কোনো অতিরঞ্জন নয়; এটাই বাস্তবতা!! এবার চলুন, দেখি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কী করেছিলেন?! সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মহিলাটিকে হত্যা করছেন না কেন?! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বারণ করলেন। বললেন, 'এটা তো হত্যা প্রচেষ্টা মাত্র। বাস্তব হত্যা নয়। এর কারণে মহিলাকে হত্যা করা যাবে না'। তিনি মহিলাকে কোনো শাস্তিও দিলেন না। মহিলাকে আদেশ দানকারী ইয়াহুদীদের কাউকেও না। কারণ, তিনি তাদের ব্যাখ্যা মেনে নিয়েছেন। বিষ প্রয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তারা বলেছিল যে, আমরা চেয়েছি, যদি আপনি (নবুওয়াতের দাবীতে) মিথ্যাবাদী হন তাহলে আমরা মুক্তি পেলাম। আর যদি সত্য নবী হন তাহলে বিষ আপনার কিছুই করতে পারবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাখ্যা মেনে নিলেন। অথচ তাদের কেউই তখন মুসলিম ছিল না এবং পরবর্তীতেও ইসলাম গ্রহণ করে নি। এতে বুঝা যায় যে, তারা তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী নবুওয়াতের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং হিংসা বশতঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার জন্যই তা করেছে।
এতকিছুর পরও তাদের কাউকেই কোনো শাস্তি দেওয়া হয় নি...।
তবে হ্যাঁ, বিশর ইবনুল বারা ইবন মা'রূর ¹⁶⁰ নামীয় এক সাহাবীও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উক্ত বিষাক্ত বকরীর গোশত খেয়েছেন। পরবর্তীতে সে বিষের প্রভাবেই তিনি মারা যান। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিসাসস্বরূপ ঐ মহিলাকে হত্যা করার আদেশ দেন। মহিলা ব্যতীত অন্য কাউকেই হত্যা করা হয় নি। আল্লামা কাজী 'ইয়ায ¹⁶¹ বলেন, "রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষ প্রয়োগের কথা জানতে পেরে সাথে সাথেই মহিলাকে হত্যা করেন নি। তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, না। পরবর্তীতে বিশর ইবনুল বারা যখন সে বিষের ক্রিয়ায়ই মারা গেলেন তখন কিসাস স্বরূপ মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে।"¹⁶²
একটু ভেবে দেখুন তো, পৃথিবীর অতীত কিংবা বর্তমানের কোনো নেতা- নেত্রীদের হত্যা প্রচেষ্টায় তদবীরকারীদের সাথে তাদের আচরণ কীরূপ হয়?! তাদের নিকটতম কোনো সহচরের মৃত্যুতেই বা তাদের প্রতিক্রিয়া কী হয়?!! গবেষণা দ্বারাই অস্পষ্টতা দূরিভূত হয়..!
তুলনা করলেই পার্থক্য ফুটে ওঠে..!
পৃথিবীর অন্যান্য মানুষের চরিত্রের সাথে নবী চরিত্রের তুলনা করার দুঃসাহস কে দেখাবে..? সাধারণ মানুষের আখলাক এক জিনিষ আর নববী আখলাক তো সম্পূর্ণ অন্য জিনিষ...!!
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِأُولِي الْأَلْبَابِ) [الزمر: ٢١]
"এতে অবশ্যই উপদেশ রয়েছে বুদ্ধিমানদের জন্য।" [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২১]

টিকাঃ
¹⁵². তিরমিযী, হাদীস নং ৩১২৯; ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৪৮৭; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৩৩৬৮; বায়হাকী: শু'আবুল ঈমান, হাদসি নং ৯৭০৪; নাসায়ী: আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ১১২৭৯। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, এটি গারীব হাদীস। হাকিম বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ সনদের হাদীস। দু'জনের কেউই এর তাখরীজ করেন নি। ইমাম যাহবীও ঐক্যমত পোষণ করেছেন। আলবানী বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ সনদের হাদীস।
¹⁵³. মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৪৮৯৪। ইমাম যাহাবী 'তালখীস' গ্রন্থে, আল্লামা হায়সামী 'মাজমাউয যাওয়ায়েদ' গ্রন্থে আল্লামা নাসীরুদ্দীন আলবানী 'আস-সিলসিলাতুয দ্ব'য়ীফাহ' গ্রন্থের ৫৫০ পৃষ্ঠায় এ হাদীসের বর্ণনাকারী সালেহ ইবন বশীরকে দুর্বল বলেছেন।
¹⁵⁴. ইবন হাজার: ফতহুল বারী (৭/৩৭২)।
¹⁵⁵. সহীহ মুসলিম: (كتاب الأيمان، باب من حلف يمينا، فرأى غيرها خيرا منها) হাদীস নং ১৬৫০। আবু দাউদ, হাদীস নং ৩২৭৪। তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৫০। নাসায়ী, হাদীস নং ৩৭৮১। ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২১০৮। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৮৭১৯।
¹⁵⁶. সহীহ বুখারী: (كتاب الديات، باب قول الله تعالى "أن النفس بالنفس হাদীস নং ৬৪৮৪; সহীহ মুসলিম: (کتاب القسامة، باب ما يباح به دم المسلم( হাদীস নং ১৬৭৬ শব্দ মুসলিমের।
¹⁵⁷. সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ২৭৬১; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ২৬৩২; আহমদ, হাদীস নং ১৬০৩২। আল্লামা নাসীরুদ্দীন আলবানী বলেছেন, এটি হাসান হাদীস। দেখুন: সাহীহুল জামি' (১৩৩৯)।
¹⁵⁸. হাবীব ইবন যায়দ আল-আনসারী আন-নাজ্জারী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামামার মুসায়লামা কাযযাবের নিকট পাঠালেন। মুসায়লামা যখন তাকে প্রশ্ন করল, তুমি কি এটা বিশ্বাস কর যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর প্রশ্ন করল, তুমি কি এটা জান যে, আমি আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, আমি বধির, আমি তোমার কথা শুনি না। এ উত্তর শুনে তাকে শহীদ করে ফেলা হয়। অধিকতর জানতে- ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (১৮৯০), ইবন সা'দ: আত-তাবাকাতুল কুবরা (১/৩২৬), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৫০৪)।
¹⁵⁹. সহীহ বুখারী: (كتاب الطب، باب ما يذكر في سم النبي صلى الله عليه وسلم) হাদীস নং ২৯৯৮; সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৫০৮; আহমদ, হাদীস নং ৯৮২৬।
¹⁶⁰. বিশর ইবনুল বারা ইবন মা'রূর আল-আনসারী আল-খাযরাজী। আকাবার শপথ, বদর, উহুদ ও খনদকে অংশগ্রহণ করেছেন। সপ্তম হিজরীতে খায়বর বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাওয়া বিষের ক্রিয়ায় শাহাদাত বরণ করেন। অধিকতর জানতে- ইবন হাজর: আল-ইসাবাহ (৬৫৪), ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/১১৫,১১৬), ইবন আবদিল বার: আল-ইসতি'আব (১/১৫)।
¹⁶¹. কাজী 'ইয়ায। আবুল ফযল 'ইয়ায ইবন মূসা ইবন 'ইয়ায আল- হাইসাবী আস-সাবতী। (৪৭৬-৫৪৪ হি. মোতাবেক ১০৮৩-১১৪৯ ইং) তার সময়ে তিনি হাদীস, নাহু, ভাষা ও বিভিন্ন শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন। প্রথমে নিজ জন্মস্থান সাবতাহ শহরের ও পরে গারতানাহ শহরের বিচারক ছিলেন। মারাকাশে মারা যান। দেখুন- আয-যারাকলী: আল'লাম (৫/৯৯)।
¹⁶². আল্লামা নববী: শরহে সহীহ মুসলিম (১৪/১৭৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00