📄 অমুসলিমদের সাথে কথোপকথনের মাধুর্য
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অমুসলিমদের সাথে আচার-আচরণের আদর্শিক পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন যে, অমুসলিমদেরকে শুধুমাত্র স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনও করতে হবে। আর এটা তিনি আল্লাহর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ইশারা ছাড়া শুধু ব্যক্তিগত চিন্তা থেকেই করেন নি; বরং তাঁর এ শিক্ষা পবিত্র কুরআনেরই প্রতিধ্বনি। পবিত্র কুরআনে অমুসলিমদের সাথে কথোপকথনের পদ্ধতি শিক্ষা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,
﴿قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ وَإِنَّا أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَى هُدًى أَوْ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ قُل لَّا تُسْلُونَ عَمَّا أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ قُلْ يَجْمَعُ بَيْنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ يَفْتَحُ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَهُوَ الْفَتَّاحُ الْعَلِيمُ ﴾ [سبا: ٢٤، ٢٦]
"বল, 'আসমানসমূহ ও জমিন থেকে কে তোমাদেরকে রিযিক দেন? বল, 'আল্লাহ', আর নিশ্চয় আমরা অথবা তোমরা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত। বল, 'আমরা যে অপরাধ করছি সে ব্যাপারে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আমাদেরকেও জিজ্ঞাসা করা হবে না'। বল, 'আমাদের রব আমাদেরকে একত্র করবেন। তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত'।" [সূরা সাবা, আয়াত: ২৪-২৬]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, তিনিই সত্য ও হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন তথাপিও আল্লাহ তা'আলা তাঁকে অমুসলিমদের সাথে এভাবে কথা বলতে আদেশ দিয়েছেন যে,
﴿وَإِنَّآ أَوْ إِيَّاكُمْ لَعَلَىٰ هُدًى أَوْ فِى ضَلَٰلٍ مُّبِينٍ ﴾ [সাবা: ২৪]
“নিশ্চয় আমরা অথবা তোমরা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত অথবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পতিত।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২৪]
এটি তো এ দুই প্রতিপক্ষের কথোপকথনের পদ্ধতি যাদের মধ্য হতে কোনো এক পক্ষের সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সুনিশ্চিত। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ পদ্ধতিতে কথা বলতে আদেশ করা হয়েছে। এটি ইসলামের উন্নত চরিত্র, চুড়ান্ত সভ্যতা ও কথোপকথনের সর্বোত্তম আদর্শিক পন্থা নির্ধারণ বৈ কিছুই নয়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা অমুসলিমদেরকে পূর্ণ ভদ্রতা বজায় রেখে সম্বোধন করার আদেশ দিয়ে বলেন,
﴿قُل لَّا تُسْـَٔلُونَ عَمَّآ أَجْرَمْنَا وَلَا نُسْـَٔلُ عَمَّا تَعْمَلُونَ ﴾ [সাবা: ২৫]
“আমরা যে অপরাধ করছি সে ব্যাপারে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে না আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আমাদেরকে ও জিজ্ঞাসা করা হবে না।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২৫]
এ আয়াতে (جرم) তথা ‘অপরাধ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মুসলিমদের বেলায়। বলা হয়েছে- ‘আমরা যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে সেজন্য তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না’। আর অমুসলিমদের বেলায় ব্যবহৃত হয়েছে (عمل) তথা ‘কাজ’ শব্দটি। বলা হয়েছে- ‘আর তোমরা যে সমস্ত কাজ করছ সেজন্য আমরা জিজ্ঞাসিত হব না’। আরো লক্ষ্য করার বিষয় হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিসাব-নিকাশের পূর্ণ দায়িত্ব আল্লাহর দিকে সমর্পিত করে দেওয়ার কথাটি নিজ ভাষায় বলেছেন এভাবে যে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন এবং সত্যের পক্ষে ফায়সালা দিয়ে দেবেন, তখন আমরা জানতে পারব- কে সঠিক পথে ছিল আর কে ভুল করেছিল"।
এটিই হলো পারস্পারিক কথোপকথনের সর্বোৎকৃষ্ট হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতি যেখানে পক্ষপাতমূলক চিন্তা কিংবা রূঢ়তা ও কঠোরতার লেশ মাত্রও নেই। যেখানে রয়েছে প্রতিপক্ষকে যথাযথ মূল্যায়ন ও পূর্ণ ভদ্রতা প্রকাশের বাস্তব প্রতিফলন। এমনিভাবে আহলে কিতাবদের সাথে কথোপকথনের পদ্ধতি নির্ধারণপূর্বক আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَلا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَقُولُوا ءَامَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ ﴾ [العنكبوت: ٤٦]
"আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সাথে বিতর্ক করো না। তবে তাদের মধ্যে ওরা ছাড়া যারা যুলুম করেছে। আর তোমরা বল, 'আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই। আর আমরা তারই সমীপে আত্মসমর্পানকারী।" [সূরা আল-'আনকাবুত, আয়াত: ৪৬]
বাহ! কি চমৎকার পদ্ধতি! আমাদেরকে আহলে কিতাবদের সাথে কেবল সুন্দর ও উত্তম পন্থায় কথোপকথনের জন্যই বলা হয় নি; বরং অতি সুন্দর, অতি উত্তম ও অতি উৎকৃষ্ট পদ্ধতিতে কথা বলার আদেশ দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দর্শন কিংবা মতোবাদে কী এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে যা এ ধরণের অনুপম চরিত্র বৈশিষ্ট্যের ধারে-কাছেও যেতে পারে? আরো লক্ষ্য করুন, প্রতিপক্ষের মন নরম করা ও অন্তর গলানোর মতো সম্বোধন দেখুন,
﴿وَقُولُوا ءَامَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَهُنَا وَإِلَهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ﴾ [العنكبوت: ٤٦]
"আর তোমরা বল, 'আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি এবং আমাদের ইলাহ ও তোমাদের ইলাহ তো একই। আর আমরা তারই সমীপে আত্মসমর্পনকারী।" [সূরা আল-'আনকাবুত, আয়াত: ৪৬]
এ ধরণের সম্বোধন আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের মনে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির মনোভাব জাগিয়ে তোলে। তারা এভাবে চিন্তা করার অবকাশ পায় যে, আমাদের উভয়ের ইলাহ এক ও অদ্বিতীয়। আমাদের ওপরও কিতাব নাযিল হয়েছে তাদের ওপরও কিতাব নাযিল হয়েছে। তারা উভয় কিতাবকে বিশ্বাসও করে। তাহলে আর অনৈক্য বা বিরোধ কিসের?
অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, পবিত্র কুরআনে এ ধরণের আয়াতের মহা সম্ভার বিদ্যমান রয়েছে। দেখুন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿قُلْ يَتَأَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ﴾ [آل عمران: ٦٤]
"বলুন, 'হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে আস, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসেবে গ্রহণ না করি'। তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বল, 'তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৪]
অন্যত্র তিনি বলেন,
﴿وََدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ﴾ [البقرة: ١٠٩]
"আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফির অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারতো! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশত (তারা এরূপ করে থাকে)। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল, যতক্ষন না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০৯]
এ ছোট্ট পরিসরে এ জাতীয় সকল আয়াত উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ গ্রন্থের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ জাতীয় কতিপয় আয়াতকে এবং এ বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনাবলীকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে প্রক্ষেপন করা, যাতে আমাদের সামনে অমুসলিমদের সাথে তাঁর আচরণ-বিধি ও অমুসলিমদের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাক্যালাপের সৌন্দর্য্যসমূহের মধ্যে আরেকটি হলো প্রতিপক্ষের কথা যত মিথ্যা, অশ্লীল, অবাস্তব ও কষ্টদায়কই হোক না কেন তিনি তা ধৈর্য সহকারে শুনতেন এবং প্রতিপক্ষের কথা বলার সময় পূর্ণ নিরব থাকতেন। নিম্মোক্ত কথোপকথনটি লক্ষ্য করুন। এখানে কুরাইশ নেতা উতবাহ ইবন রবী'আহ'র সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীর্ঘ আলাপচারিতার বিবরণ রয়েছে।
উতবাহ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলাম থেকে সরে আসার জন্য অত্যন্ত মনোযোগসহ বুঝাচ্ছিল, সে বলছে: হে ভাতিজা! আমাদের মাঝে এবং আমাদের সম্প্রদায়ের মাঝে তোমার মর্যাদা ও সম্মানের কথা তো তোমার জানা আছে। কিন্তু নিশ্চই তুমি অনেক বড় বিষয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছো। তুমি আমাদের সম্প্রদায়ের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করছো। তোমার অনুসারীদেরকে তুমি জান্নাত-জাহান্নামের মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছ। তুমি আমাদের দেব-দেবি ও ধর্মের নিন্দাবাদ করে বেড়াচ্ছ। আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে গাল-মন্দ করছ। আমি তোমার নিকট কয়েকটি বিষয় পেশ করছি, তুমি মনোযোগসহ শুন যাতে তন্মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিতে পার। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলুন, হে আবুল ওয়ালীদ! আমি শুনছি ওতবা বলল: ভাতিজা! তুমি এটা বলো যে, শেষ পর্যান্ত তুমি চাও কী? তুমি কি মক্কার সবচেয়ে বড় ধনী হতে চাও? তাহলে আমরা বহু ধন-সম্পদ এনে তোমার সামনে স্তুপ করে দেব। নাকি তুমি সম্মান চাও? তাহলে আমরা সবাই মিলে তোমাকে এমনভাবে সম্মান প্রদর্শন করবো যে, তোমাকে ছাড়া আমাদের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হবে না। নাকি তুমি মক্কার রাজত্ব চাও? তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেব। নাকি এসব কিছু তুমি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে করছ না বরং তোমার নিকট যে অদৃশ্য আগন্তুক আসে সে জিন্ন এবং তার হাত থেকে আত্মরক্ষায় তুমি যদি অক্ষম হয়ে থাক তাহলে বলো, আমরা আমাদের টাকা-পয়সা ব্যয় করে চিকিৎসা করে তোমাকে সুস্থ করে তুলব। কেননা, অনেক সময় অনুসঙ্গী তার মূল ব্যক্তির ওপর প্রাধান্য লাভ করে, ফলে চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়। এতক্ষণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উতবার কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। তার কথা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবুল ওয়ালীদ! আপনার বক্তব্য কি শেষ হয়েছে? সে বলল: হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার আমার কথা শুনুন। সে বলল, শুনছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়তে শুরু কলেন,
﴿ حمَ تَنزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ كِتَابٌ فُصِّلَتْ ءَايَتُهُ قُرْءَانًا عَرَبِيًّا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴾ ﴿ بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ * وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي ءَاذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَمِلُونَ ﴾ [فصلت: ١، ٥]
"হা-মীম। (এ গ্রন্থ) পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো জ্ঞানী কওমের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কুরআনরূপে, আরবী ভাষায়, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অতএব, তারা শুনবে না। আর তারা বলে, 'তুমি আমাদেরকে যার প্রতি আহ্বান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়। অতএব, তুমি (তোমার) কাজ কর, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ১-৫]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়েই যাচ্ছেন। ওতবা শুনতে শুনতে একেবারে নিরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেল এবং উভয় হাত পেছনে দিয়ে টেক লাগিয়ে শুনিতেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাজদাহর আয়াত পর্যন্ত পড়লেন এবং সাজদাহ আদায় করলেন। অতঃপর ওত্ববাকে লক্ষ্য করে বললেন,
﴿قَدْ سَمِعْتَ يَا أَبَا الْوَلِيدُ! مَا سَمِعْتَ فَأَنْتَ وَذَاكَ﴾
“হে আবুল ওয়ালীদ! তুমি যা শুনার শুনেছ? এটাই আমার পক্ষ থেকে তোমার বক্তব্যের উত্তর।”
এরপর ওতবা তার গোত্রের নিকট ফিরে গেল। ওত্বাহকে দেখে তার গোত্রের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল যে, আল্লাহর শপথ! ওতবা যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিল তার ভিন্ন চেহারা নিয়ে ফিরেছে। ওতবা যখন তাদের নিকট গিয়ে বসলো তখন তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, কী খবর হে আবুল ওয়ালীদ? সে বলল, আজ আমি যা শুনেছি জীবনে কোনো দিন তা শুনি নি। আল্লাহর শপথ! এটা কোনো কবিতা নয় এবং কোনো যাদুকর কিংবা গণকের কথাও নয়। হে কোরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা আমার কথা মেনে তার অনুসরণ কর এবং আমাকে তার অনুসরণ করতে দাও। আমার মতে, তোমরা তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। আল্লাহর শপথ! যা আমি শুনেছি তা অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ হতে প্রাপ্ত অহী বৈ অন্য কিছু নয়। সে যদি তার উদ্দেশ্যে অকৃতকার্য হয় তাহলে সে নিজে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি সে সফল হয়ে যায় তাহলে তাতে তোমাদেরই সম্মান। তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব। তার কারণে তোমরা হয়ে যাবে অন্য সকল জাতির চেয়ে সৌভাগ্যবান। উতবাহর এ কথাগুলো শুনে তারা বলতে লাগল, হে আবুল ওয়ালীদ! মুহাম্মাদ তার ভাষা দ্বারা তোমাকেও যাদু করে ফেলেছে। উতবাহ বলল, এটা আমার মতামত, তোমরা যা ইচ্ছা তাই করতে পার।
এ কথোপকথনের মাঝে লক্ষ্য করার মতো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। উতবাহ তার কথা শুরুই করেছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অনেকগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে। তথাপিও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষনাত কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে অত্যন্ত ধৈর্য্য ও মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগলেন এবং উতবাহ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইসলামের দাওয়াত থেকে বিরত রাখার জন্য প্ররোচনা দিতে শুরু করলেও তিনি পূর্ণ নিরবতা পালন করলেন এবং বেশ শান্তস্বরে বললেন, 'বলুন, হে আবুল ওয়ালীদ! আমি শুনছি' এবং তিনি তাকে উতবাহ নামে সম্বোধন না করে তার সবচেয়ে প্রিয় তার উপনাম তথা 'আবুল ওয়ালীদ' দ্বারা সম্বোধন করলেন। আবার দেখুন, উতবাহ যখন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সম্পদ, সম্মান, রাজত্ব ইত্যাদি পার্থিব লোভ-লালসার বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে লাগল তখনও তিনি রাগান্বিত হন নি বরং শেষ পর্যন্ত শুনে গেলেন এবং চুড়ান্ত সম্মানপ্রদর্শন পূর্বক বললেন, হে আবুল ওয়ালীদ! আপনার বক্তব্য কি শেষ হয়েছে? সে বলল: হ্যাঁ। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এবার আমার কথা শুনুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে স্বাধীনভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপনের এবং নিজ মতামত পেশ করার পূর্ণ সুযোগ দিলেন। তার বক্তব্যের সমাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলা শুরু করলেন।
এখানে তিনি আমাদের জন্য অন্যদের সাথে এমনকি ভিন্ন মতাবলম্বীদের সাথেও কথোপকথনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
টিকাঃ
72. উতবাহ ইবন রাবী'আহ। কুরাইশদের অনেক বড় নেতা ছিল। তার কারণেই 'হরবুল ফুজ্জার' বন্ধ হয়েছিল। তবে সে মুসলিম হয় নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং সাহাবায়ে কেরামকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল। একদিন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকে অনেক প্রহার করেছিল। ফলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-এর গোত্র 'বনু তাইম'-এর লোকেরা বলেছিল, আল্লাহর শপথ! যদি আবু বকর এ প্রহারের কারণে মারা যায় তাহলে অবশ্যই আমরা উতবাহ ইবন রবী'আহকে হত্যা করবো। কাফের অবস্থায় নিজ ছেলে ওয়ালীদসহ বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
73. মুসনাদে আবী ইয়া'লা, হাদীস নং ১৮১৮; সীরাতে ইবন হিশাম (১/২৯৩-২৯৪), দালাইলুল বায়হাকী (১/২৩০-২৩১); দালাইলু আবী নাঈম (১৮২); মুসান্নাফে ইবন আবী শাইবাহ (১৪/২৯৫-২৯৬); মুনতাখাবে আব্দুর রহমান (১১২৩); মুসতাদরাকে হাকিম (২/২৫৩)।
📄 অমুসলিমদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বানের নববী পদ্ধতি
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের যাবতীয় কথা, কাজ ও ইসলামের প্রতি আহ্বানের ক্ষেত্রে ভীতি-প্রদর্শন বা সতর্ক করণের চেয়ে সুসংবাদদান তথা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অধিকহারে। কাফিরদের শত রূঢ়তা, কঠোরতা ও অবাধ্যতা সত্ত্বেও তার এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে নি। রবী'আহ ইবন আব্বাদ দাইলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু প্রথম যুগে কাফির ছিলেন, পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেন, আমি (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) 'যুল-মাজায' বাজারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বচক্ষে দেখেছি যে, তিনি লোকদেরকে সম্বোধন করে বলছেন,
«يا أيها الناس قولوا لا إله إلا الله تفلحوا»
"হে লোক সকল! তোমরা এটা মেনে নাও যে, এক আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হয়ে যাবে।” তিনি বাজারের প্রতিটি অলিতে-গলিতে প্রবেশ করেছেন এবং এ একই কথা বলে বেড়িয়েছেন। আর তার চতুর্পাশে লোকেরা ভিড়াভিড়ি করে জড়ো হয়ে গিয়েছিল। আমি কাউকেই কিছু বলতে শুনি নি, তবে তার পেছনে টেরা, স্বচ্ছ মুখাবয়ব ও মাথায় চুলের দু'টি বেণী বিশিষ্ট এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম, সে বলছে, 'এ লোকটি সাবে'ঈ, মিথ্যাবাদী'। আমি লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ব্যক্তিটি কে?' লোকেরা বলল, 'মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ, নবুওয়াতের দাবীদার'। আমি বললাম, 'তার পেছেনের লোকটি কে?' লোকেরা বলল, 'তারই চাচা আবু লাহাব'।
আবু লাহাব ও আবু জাহলদের এহেন স্পষ্ট বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি তার পদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধন করলেন না; বরং মানুষকে তিনি মুক্তি ও সফলতার প্রতিই আহ্বান করেছেন। শুধু তাই নয়, অনেক সময় তিনি ঈমান গ্রহণ ও শির্ক পরিহারের বিনিময়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী নি'আমতের পূর্বে দুনিয়াতেও সুখ-শান্তি ও রাজত্ব লাভের শুভ-সংবাদও দিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বর্ণনা করেন, আবু তালিব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কুরাইশের সবাই উপস্থিত হলো এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উপস্থিত হলেন। আবু তালিবের ঘরে উপস্থিতি অনেক। সেখানে আবু জাহল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবু তালিব থেকে দুরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এবং আবু তালিবের নিকট রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়াল এবং বলল; 'হে ভাতিজা! তুমি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট চাও কী?' রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তাদের নিকট চাই শুধু 'একটি বাক্য' যা দ্বারা গোটা আরববাসী তাদের অনুগত হয়ে যাবে এবং অনারবীরাও অধীনতা স্বীকার করে ট্যাক্স দিতে বাধ্য হবে। আবু জাহল বলল, 'শুধু একটি বাক্য?' রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, 'শুধু একটি বাক্য'। আর তা হচ্ছে হে চাচা! আপনারা বলুন, لا إله إلا الله "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।" আবু জাহল বলল, শুধুমাত্র এক ইলাহকে মানতে বল?! আমরা তো সর্বশেষ দীনে এমন কথা শুনি নি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয়। (বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন) সেসময় আবু জাহলের এ কথার প্রেক্ষিতে কাফিরদের ব্যাপারে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে:
﴿صَ وَالْقُرْآنِ ذِي الذِّكْرِ بَلِ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي عِزَّةٍ وَشِقَاقٍ كَمْ أَهْلَكْنَا مِن قَبْلِهِم مِنْ قَرْنٍ فَنَادَوا وَلَاتَ حِينَ مَنَاصٍ وَعَجِبُوا أَن جَاءَهُم مُّنذِرٌ مِّنْهُمْ وَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا سَاحِرٌ كَذَّابٌ أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَيْهَا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٍ عُجَابٌ وَانطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى وَالِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ ﴾ [ص: ١، ٧]
"সোয়াদ; কসম উপদেশপূর্ণ কুরআনের। বস্তুত কাফিররা আত্মম্ভরিতা ও বিরোধিতায় রয়েছে। তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি; তখন তারা আর্তচিৎকার করেছিল, কিন্তু তখন পলায়নের কোনো সময় ছিল না। আর তারা বিস্মিত হলো যে, তাদের কাছে তাদের মধ্যে থেকেই একজন সতর্ককারী এসেছে এবং কাফিররা বলে, 'এ তো যাদুকর, মিথ্যাবাদী'। 'সে কি সকল উপাস্যকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয় এ তো এক আশ্চর্য বিষয়'! আর তাদের প্রধানরা চলে গেল একথা বলে যে, 'যাও এবং তোমাদের উপাস্যগুলোর ওপর অবিচল থাক। নিশ্চয় এ বিষয়টি উদ্দেশ্য প্রণোদিত'। আমরা তো সর্বশেষ দীনে এমন কথা শুনি নি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয়।” [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ১-৭]
এ হাদীসে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি ভ্রু-কুঞ্চিত করলেন না এবং সভা ভঙ্গ হওয়ার মতো অশালীন কোনো আচরণ কিংবা দাম্ভিকতা বা বিমুখতা প্রদর্শনও করলেন না; বরং তিনি তাঁর স্বভাব-সুলভ নম্রতা দ্বারা তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে দুনিয়ার রাজত্ব ও আখিরাতের নি'আমত উভয়েরই সুসংবাদ প্রদান করলেন।
টিকাঃ
74. সাবেঈ ধর্মাবলম্বী, তারকা পূজারী (কারো মতে ফিরিশতাদের উপাসনাকারী) একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায়। এখানে উদ্দেশ্য 'পথভ্রষ্ট'। -অনুবাদক
75. মুসনাদে আহমদ (৩৪১, ৪৯১, ৪৯২, ৪৯৩); মুসতাদরাকে হাকিম (১/১৫); মু'জামুত তাবরানী (৫/৫৫)। আল্লামা সা'আতী আল-ফাতহুর-রাব্বানী (২০/২১৬) তে বলেছেন, 'এর সনদ উত্তম'। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন হাজারের 'আল-মাতালিবুল আলিয়া' (৪২৭৭)।
76. তিরমিযী (كتاب تفسير القرآن، باب سورة (ص; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২০০৮; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৩৬১৭।
📄 অমুসলিমদের প্রশংসা করা প্রসঙ্গে
সম্বোধনের ক্ষেত্রে নম্রতা, কোমলতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশই শুধু নয় বরং আরো আগে বেড়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো অমুসলিমদের প্রশংসা এবং গুণাগুণও করতেন। নিম্নে কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখুন।
এক. হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির ব্যাপারে কথা বলতে আসা মক্কার প্রতিনিধি কাফির নেতা সুহাইল ইবন আমরের প্রশংসা করতে গিয়ে মুসলিমদেরকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لقد سهل أمركم»
"(প্রতিনিধি হিসেবে সুহাইলের আগমনের ফলে) তোমাদের জন্য ব্যাপারটি অনেক সহজ হয়ে গেছে।"
কারণ, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বভাবগত নম্রতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন।
দুই. সপ্তম হিজরীর ঘটনা। খালেদ ইবন ওয়ালীদ তখনো ইসলাম গ্রহণ করেন নি। ইতিঃপূর্বে তিনি উহুদ, খন্দক ও হুদায়বিয়ার ঘটনাসহ বিভিন্ন রণক্ষেত্রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালন করেছেন। তার ভাই ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ তখন ছিলেন মুসলিম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়ালীদকে লক্ষ্য করে আশ্চার্যান্বিত হওয়ার ভঙ্গিতে বলছেন, খালেদ কোথায়? (অর্থ্যাৎ সে কেন এখনো ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে না?)। ওয়ালীদ বলল, 'আল্লাহ তাকেও নিয়ে আসবেন'। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«ما مثله جهل الإسلام، ولو كان جعل نكايته وجده مع المسلمين على المشركين لكان خيرا له، ولقدمناه على غيره»
"তার মতো (বিচক্ষণ) ব্যক্তি তো ইসলামকে না বুঝার কথা নয়। সে যদি তার শক্তি-সামর্থ্যকে ইসলামের পক্ষে কাফিরদের বিরুদ্ধে ব্যয় করতো তাহলে এটা তার জন্য অনেক ভালো হতো এবং আমরা তাকে অন্যান্যদের তুলনায় এগিয়ে দিতাম।"
দেখুন, খালেদ ইবন ওয়ালীদের সাথে সম্পৃক্ত অনেকগুলো কষ্টদায়ক ঘটনা স্মৃতিতে থাকা সত্ত্বেও বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধের যন্ত্রনাদায়ক ভোগান্তির কথাও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার প্রশংসা থেকে বিরত রাখতে পারে নি। তিনি তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার প্রতি আশ্চার্যান্বিত হয়ে বলছেন যে, 'সে কেন এখনো ইসলাম থেকে দূরে? তিনি তাঁর যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা ও সৈনিক হিসেবে অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলছেন যে, 'সে যদি আমাদের পক্ষে চলে আসে তাহলে আমরা তাকে অন্যান্যদের তুলনায় এগিয়ে দেব।' এতদিন যারা জীবন বাজি রেখে ইসলামের জন্য যুদ্ধ করেছে ঐ সকল অগ্রজ ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবীদের তুলনায় তিনি তাকে এগিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন। এটা খালেদ ইবন ওয়ালীদের আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন বৈ কিছুই নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাহলে একজন সেনাপ্রধানের জন্য নিজের ঘোরতর শত্রু এক প্রতিপক্ষ সৈনিকের এহেন অকৃত্রিম প্রশংসা করা কি এত সহজ ব্যাপার?
তিন. আরবের কবি লবীদ ইবন রবী'আহ তখনো কাফির ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কবিতার প্রশংসা করে বলেন:
«أصدق كلمة قالها الشاعر كلمة لبيد "ألا كل شيء ما خلا الله باطل"»
"কবিরা যেসব কথা বলে, তন্মধ্যে লবীদের কথাটাই সবচেয়ে বেশি সত্য যে, (সে বলেছে) 'শোন! আল্লাহ ব্যতীত সব কিছুই বাতিল।"
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কবিতার চর্চা করতেন না এবং তেমন বেশি শুনতেনও না। তারপরও কবিতায় ভালো বিষয়বস্তু উপস্থাপনের কারণে তিনি একজন মুশরিক কবির প্রশংসা করতেও দ্বিধাবোধ করেন নি। অথচ মুসলিমদের মধ্যেও হাসসান ইবন সাবিত, কা'আব ইবন মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা প্রমুখ ভালো ভালো কবি ও সাহিত্যিকগণ বিদ্যমান ছিলেন।
চার. এবার দেখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি মুশরিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা করছেন যারা তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেয় নি, তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে নি এবং ইসলাম গ্রহণ করতে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেছিল। এর কারণ হলো, তিনি যখনই নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাদের মধ্যে কোনো ইতিবাচক গুণ দেখতে পেলেন তখনই তার প্রশংসাও করে দিলেন অথচ তাদের মধ্যে অনেক নেতিবাচক দিক বা দোষও বিদ্যমান ছিল। এটি ছিল বনু শায়বান গোত্র। এরা ইরাকের নিকটবর্তী আরব উপদ্বীপের উত্তর পূর্ব এলাকায় বসবাস করত এবং ফারস্য সাম্রাজ্যের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদের অধীনতা স্বীকার করে থাকত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলে তারা অত্যন্ত সদাচরণ করেছিল এবং কথাবার্তায় বেশ ভদ্রতার পরিচয় দিয়েছিল; কিন্তু তারা ফারস্য সম্রাটের ভয়ে ইসলাম গ্রহণে স্পষ্ট অসম্মতি জানিয়ে ছিল। দেখুন, এখানে সভ্যতা ও আভিজাত্য পরিপন্থি তাদের কতগুলো নেতিবাচক দিক বা দোষ ফুটে উঠেছে। যেমন, ইসলামের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাব হেতু ইসলাম গ্রহণে পিছিয়ে থাকা, ফারস্য সম্রাট কিসরার ভয়ে কাপুরুষতা প্রদর্শন, মযলুম মুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে না আসা এবং সংকল্প ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধা-দন্ধে ভোগা ইত্যাদি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসবের দিকে দৃষ্টি না রেখে শুধুমাত্র তাদের অন্য একটি ইতিবাচক গুণের প্রশংসা করে বললেন,
«ما أسأتم في الرد إذ أفصحتم بالصدق وإن دين الله لن ينصره إلا من حاطه من جميع جوانبه أرأيتم أن لم تلبثوا إلا قليلا حتى يورثكم الله أرضهم وديارهم وأموالهم ويفرشكم نساءهم أتسبحون الله وتقدسونه»
"তোমরা স্পষ্ট অপারগতা প্রকাশ করে কোনো মন্দ কাজ করো নি। বস্তুত যেই আল্লাহর দীনকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে তার ওপরই সব দিক থেকে বিপদাপদ নেমে এসেছে। তোমাদের কী অভিমত, যদি আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে না হয় যে, আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের বাস্তুভিটা, তাদের জনপদ ও ধন-সম্পদের মালিক বানিয়ে দেন এবং তাদের মহিলাদেরকে তোমাদের অধীন করে দেন তাহলে কি তোমরা এক আল্লাহর তাসবীহ পাঠ ও তার পবিত্রতা বর্ণনা করবে না?"
এ কথার পর তাদের মধ্য থেকে নু'মান ইবন শারীক বলে উঠল, 'হে আল্লাহ! যেন তাই হয়' (আল্লাহ আপনার কথা কবুল করুন)। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় তেলাওয়াত করলেন:
﴿يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا * وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ، وَسِرَاجًا مُنِيرًا﴾ [الاحزاب: ٤٥، ٤٦]
"হে নবী, আমরা আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী ও আলোকদৃপ্ত প্রদীপ হিসেবে।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪৫-৪৬]
অতঃপর তিনি উঠে গেলেন এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর হাত ধরে বললেন,
«يا أبا بكر أية أخلاق في الجاهلية ما أشرفها بها يدفع الله عز وجل بأس بعضهم عن بعض وبها يتحاجزون فيما بينهم»
"হে আবু বকর, জাহেলী যুগে কোন মহান চরিত্রের দ্বারা আল্লাহ তাদের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে তাদেরকে রক্ষা করতেন এবং তারা নিজেদের ঝগড়া-বিবাধের সমাধান করত?"
দেখুন, এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কোনো মন্তব্য করেন নি। বলেন নি যে, তোমাদের মধ্যে অমুক অমুক গুণের অভাব রয়েছে; বরং তিনি তাদের ইতিবাচক গুণটির প্রশংসা করেছেন। আর তা হলো তাদের সদাচরণ ও স্পষ্টবাদিতা। কেননা, প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে কিছুদিন পর ধর্মত্যাগ করে পূণরায় আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া সবদিক থেকেই ক্ষতিকর। তাই কোনো ভয়-ভীতি বা উদ্বেগের কারণে ইসলাম গ্রহণ করতে না পারলে প্রথমেই তা বলে দেওয়া। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য সময় নেওয়া অনেক ভালো এবং তাদের ইসলাম গ্রহণের অপারগতা প্রকাশের ধরণটিও ছিল বেশ ভদ্রতা ও শিষ্টাচারপূর্ণ।
তারা কোনো প্রকার দাম্ভিকতা ও অহংকার প্রকাশ না করেই বিনয়ের সাথে আরয করল যে, যদি ইসলাম পারস্য সম্রাটের চেয়েও অধিক শক্তিশালী হয়ে যায় তাহলে তারা নিজেদের মতো থেকে ফিরে আসবে এবং অবশ্যই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেবে।
মুশরিক সম্প্রদায়টির সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত আচরণগত অবস্থানটি ইসলাম ধর্মের কেন্দ্রীয় নীতিমালাসমূহেরই অংশ। যাকে অমুসলিমদের সাথে আলাপচারিতার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া ছাড়াই অন্যের মাঝে বিদ্যমান সৌন্দর্য্য ও গুণাবলীর প্রশংসা করেছেন। এটা মূলত বাস্তব-সত্যকে স্বীকৃতিদানের প্রবণতা বৈ কিছুই নয়। আবার অমুসলিমদের মন গলানো ও তাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি ধাবিতকরণের জন্যেও এ ধরণের আচরণ অনেক ফল বয়ে আনে।
পাঁচ. অমুসলিমদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান প্রদর্শনের আরেকটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হলো আবিসিনিয়ার খৃস্টান রাজা নাজ্জাসীর অনবরত প্রশংসা করার আগ্রহবোধ। তিনি কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই প্রায় বলতেন:
«فَإِنَّ بِهَا مَلِكًا لَا يُظْلَمُ عِنْدَهُ أَحَدٌ ، وَهِيَ أَرْضُ صِدْقٍ»
"সেখানকার বাদশার নিকট কেউ অত্যাচারিত হয় না। সে দেশ সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।"
এখানে তিনি নাজ্জাশীর মাঝে বিদ্যমান একটি গুণের প্রশংসা করেছেন। এ ধরণের দু একটি প্রশংসনীয় গুণ তো মানুষ হিসেবে সব মানুষের মাঝেই আছে; কিন্তু কয়জন আমরা অন্যের সে গুণের অকপটে স্বীকৃতি দান বা প্রশংসা করতে পারি। এমনকি অনেক স্বল্প-জ্ঞানী সংকীর্ণমনা মুসলিমরা পর্যন্ত অমুসলিমদের প্রশংসা করা বা তাদের সাথে সদাচরণ করা থেকে বিরত থাকেন। তারা এ আশংকা বোধ করেন যে, এ ধরণের সদাচরণ তাদের সাথে এমন বন্ধুত্ব-স্থাপনের পর্যায়ে পড়ে কি না, যা আল-কুরআনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। আমার মনে হয়, এখানে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধকালীন সময়ের বা শত্রু কাফিরদের সাথে আচরণ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় বা চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের সাথে আচরণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম হয়েছেন।
এখানে আমরা নবী জীবনের একটি সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আলোচনা করছি যা সবার আগে আমাদের মুসলিমদের সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা জরুরী এবং এটাও বুঝা জরুরী যে, এটি আমাদের দীন; আমরা যার অনুসারী এবং যাকে নিয়ে আমাদের গর্ব করি। আর এ হচ্ছে আমাদের নবী; আমরা যার অনুকরণ করি এবং যাকে নিয়ে আমরা সম্মানবোধ করি।
আর এটি নিশ্চিত যে, বর্তমান বিশ্বের যে কোনো স্থানের মতো তৎকালীন আবিসিনিয়ার খৃস্টধর্মীয় কিতাবগুলোও বিকৃত ছিল। তথাপি এ বিকৃতিও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের গুণ বর্ণনা থেকে বিরত রাখতে পারে নি। শুধু তাই নয় বরং আরো আগে বেড়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হাবীবাহ বিনতে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহাকে বিবাহ করার জন্য নাজ্জাশীকে উকিল নিযুক্ত করে তাকে আরো সম্মানিত করেছেন। উম্মে হাবীবাহ রমলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তার স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবন জাহাশসহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছেন। কিন্তু উবায়দুল্লাহ সেখানে গিয়ে দীন ত্যাগ করে খৃস্টান হয়ে যায়। ফলে উম্মে হাবীবাহ তাকে ছেড়ে দেন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করে নেন। আর সে বিয়ের উকিল নিযুক্ত করেন নাজ্জাশীকে। অথচ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারতেন জা'ফর ইবন আবু তালেবকে উকিল বানাতে। কেননা সে ছিল মুহাজিরদের দলপতি আবার তাঁর আপন চাচাত ভাই কিংবা তিনি পারতেন উম্মে হাবীবার গোত্র তথা বনু উমাইয়্যার মধ্য হতে হিজরতকারীদের কাউকে উকিল বানাতে। কিন্তু তিনি নাজ্জাশী অবস্থানকে তা'যীম করতে এবং তাকে সম্মান প্রদর্শন করতে চাইলেন।
টিকাঃ
77. সুহাইল ইবন আমর ইবন লুওয়াই ইবন গালিব। জাহেলী যুগে কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের একজন ছিলেন। অনেক বড় বাগ্মী বক্তা ছিলেন। বদর যুদ্ধে মুসলিমদের হাতে যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন। যুদ্ধবন্দি থাকাকালে উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেছিলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার সামনের দাঁতগুলো ফেলে দেব, ফলে সে আর আপনার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে পারবে না।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না তাকে ছেড়ে দাও, হয়ত একদিন সে এমন অবস্থানে গিয়ে দাড়াবে যে, তুমিও তার প্রশংসা করবে'। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পরে মক্কার অনেক নতুন মুসলিমরা যখন মুরতাদ হয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিলেন এবং মুসলিম হয়ে গেলেন। তখন এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, "আল্লাহর শপথ! এ দীন সূর্যের উদয়স্থল থেকে অস্ত যাওয়ার স্থান পর্যন্ত প্রসার লাভ করবে" এবং রাসূলের ইন্তেকাল পরবর্তী সময়টিতে মদীনায় আবু বকরের ন্যায় মক্কায় তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের ভূমিকা পালন করেছেন।
78. كتاب الشروط، باب الشروط في الجهاد والمصالحة مع أهل الحرب ২৫৮১।
79. ইমাম যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ১/২৯৩।
৪০. কবি লবীদ ইবন রবী'আহ আমেরী, পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন হাজার-এর 'আল-ইসাবাহ' (৭৫৪০)।
81. সহীহ বুখারী, )کتاب الآداب ، باب ما يجوز من الشعر والرجز( হদীস নং ৫৭৯৫; সহীহ মুসলিম )کتاب الشعر( হাদীস নং ২২৫৬।
82. দালাইলুন নাবুওয়াহ লিল বায়হাকী (২/৪২২-৪২৭); দালাইলু আবী নাঈম (১/২৩৭-২৪২); ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ (৩/২৬৪-২৬৫)।
83. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৮৩০৪; সীরাতে ইবন হিশাম (২/১৬৪)।
84. ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (৪/১৬১)।
85. উবায়দুল্লাহ ইবন জাহাশ, মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করে স্বীয় স্ত্রী উম্মে হাবীবাহ রমলাহ বিনতে আবু সুফিয়ানসহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে যান এবং খ্রিস্টান অবস্থায়ই মৃত্যু হয়। অতঃপর উম্মে হাবীবাহকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করে নেন।
86. মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ২৭৪৪৮, মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৬৭৭০।
87. জা'ফর ইবন আবু তালিব ইবন আবদুল মুত্তালিব, আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-এর আপন ভাই। আকৃতি ও চারিত্রিক দিক থেকে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। হাবশায় হিজরত করেছেন এবং খায়বার বিজয়ের দিন সেখান থেকে ফিরে আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আলিঙ্গন করে বললেন, আমি জানি না যে, কোন কারণে আমি বেশি খুশি; খায়বার বিজয়ের কারণে নাকি জা'ফরের আগমনে? মু'তার যুদ্ধের তিন প্রধানের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন এবং সে যুদ্ধেই শাহাদাত বরণ করেন। অধিকতর জানতে: ইবন হাজার-এর 'আল-ইসাবাহ' (১১৬৭)।
📄 অমুসলিমদের দূত ও প্রতিনিধিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নববী প্রটোকল
এ বিষয়ে সবচেয়ে অবাক করা মতো ঘটনা হচ্ছে, ফারস্য সম্রাট কিসরার পক্ষ থেকে মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রেফতার করার জন্য প্রেরিত দূতদ্বয়ের সাথে তাঁর আচরণ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র প্রেরণ করতে লাগলেন তখন পারস্য সম্রাট কিসরা-এর নিকটও একটি পত্র পাঠান। পত্র পড়ে কিসরার মেজাজ বিগড়ে গেল, সে পত্রটাকে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলল এবং ইয়ামানের গভর্ণর বাযানের কাছে পত্র লিখল যাতে সে তার বাহিনী প্রেরণ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গ্রেফতারপূর্বক তার সামনে হাযির করে। এ অস্বাভাবিক উত্তেজনাকর মুহুর্তেও অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ কেমন ছিল তা জানতে হলে চলুন আমরা ঘটনাটি শুরু থেকে অধ্যয়ন করি। ইয়াযীদ ইবন হাবীব বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমীকে পারস্য সম্রাট কিসরা (আবরুভেজ/খসরু পারভেজ ইবন হরমুজ)-এর নিকট পত্র দিয়ে প্রেরণ করেন। প্রেরিত পত্রটি ছিল নিম্নরূপ:
«بسم الله الرحمن الرحيم.. من محمد رسول الله إلى كسرى عظيم فارس، سلام على من اتبع الهدى، وآمن بالله ورسوله، وشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأن محمدا عبده ورسوله، وأدعوك بدعاء الله، فإني أنا رسول الله إلى الناس كافة، لأنذر من كان حيا، ويحق القول على الكافرين، فَأَسْلِمُ تَسْلَمْ، فَإِن أَبَيْتَ فإن إثم المجوس عليك»
"এ পত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে পারস্যের মহান সম্রাট কিসরার প্রতি। যারা সত্য-কঠিন পথের অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদের প্রতি সালাম। আমি আপনাকে মহান আল্লাহর আহ্বানের দ্বারাই আহ্বান জানাচ্ছি। নিশ্চয়ই আমি গোটা মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি। যাতে, যারা জীবিত আছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি এবং কাফিরদের জন্য আল্লাহর বাণী সত্যে পরিণত হবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তি ও নিরাপদে থাকুন। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তাহলে এ মাজুসীদের (অগ্নি উপাসক) সকল পাপ আপনার ওপর বর্তাবে।”
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র পেয়ে কিসরা পত্রটি ছিড়ে ফেলে এবং বলে যে, 'এ লোক আমার নিকট পত্র লেখে অথচ এ আমার অধীনস্ত!' সাথে সাথে সে ইয়ামেনে তার প্রতিনিধি শাসক বাযানকে লিখল, 'তুমি হিজাযের এ ব্যক্তির (মুহাম্মাদ) নিকট দু'জন এমন সাহসী লোক পাঠাও, যারা তাকে পাকড়াও করে আনতে পারে।' কিসরার এ পত্রের প্রেক্ষিতে 'বাযান' রাসূলুল্লাহর নিকট একটি পত্রসহ দু'জন দূত পাঠায়। একজনের নাম বাবওয়াইহ, অন্যজন খারাখসারাহ। পত্রে সে বাহকদ্বয়ের সাথে রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার নিকট উপস্থিত হবার নির্দেশ দেন এবং পত্রবাহকদ্বয়ের প্রধান বাবওয়াইহকে বলে দেয় যে, 'এ লোকের শহরে যাও, তার সাথে কথা বল এবং আমাকে তার সংবাদ এনে দাও'। পত্রসহ বাহকদ্বয় তায়েফে উপস্থিত হয়। সেখানে তারা মক্কার কুরাইশ বংশের কিছু লোকের দেখা পায় এবং তাদের নিকট রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাস করে অবগত হয় যে, তিনি মদিনায়। কুরাইশ ব্যক্তিবর্গ লোক দু'টির পরিচয় ও উদ্দেশ্য অবগত হয়ে দারুণ উৎফুল্ল হয়। তাদের একজন আনন্দের আতিশয্যে এমনও বলে যে, তোমাদের জন্য সুসংবাদ! এবার শাহেনশাহ ইরান কিসরা তাকে দেখে নেবেন। লোকটির জন্য তিনিই উপযুক্ত। লোক দু'টি মদিনার পথে রওয়ানা হলো এবং এক সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদের পরিচয় দিল এবং বাবওয়াইহ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বলল, কিসরা বাযানের কাছে পত্র লিখেছেন বাযান যেন আপনার কাছে এমন কাউকে পাঠায় যে আপনাকে কিসরার কাছে নিয়ে যাবে। বাযান আপনাকে আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমাদের সাথে যেতে রাজি হন তাহলে বাযান সম্রাট কিসরা-এর নিকট আপনার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন। ফলে সম্রাট আপনার কোনো ক্ষতি করবেন না। আর যদি আপনি যেতে না চান তাহলে আপনি তো তাকে চেনেন, তিনি আপনাকে আপনার সম্প্রদায় ও দেশ সব কিছুকেই ধ্বংস করে দিতে পারেন। পত্রবাহক দুইজন দাঁড়ি মুণ্ডিত এবং দীর্ঘ গোঁফধারী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের চেহারার প্রতি তাকাতে বিরক্তিবোধ করলেন এবং বললেন, তোমাদের নাশ হোক! কে তোমাদের এরূপ (দাঁড়ি মণ্ডিত এবং গোঁফ লম্বা) করতে নির্দেশ দিয়েছে? তারা উত্তর করল, 'আমাদের রব (কিসরা)'। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আর আমার রব আমাকে দাঁড়ি বড় করতে এবং গোঁফ ছাঁটতে নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি বললেন, 'এখন আপনারা যান, আগামীকাল আমার কাছে আসুন'। এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসমান থেকে এ খবর এসে গেল যে, 'আল্লাহ কিসরা আবরুভেজের ওপর তার পুত্র শিরাওয়ায়হিকে ক্ষমতাবান করেছেন। সে তার পিতাকে হত্যা করেছে' এবং এ সংবাদও এসেছে যে, কোন শহরে কীভাবে ও কখন এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। পরের দিন লোক দু'টি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এলে তিনি তাদেরকে এ সংবাদটি জানালেন। তারা বললো, আমরা কি আপনার পক্ষ থেকে এ সংবাদ আমাদের রাজাকে জানাবো? বললেন, 'হ্যাঁ, তোমরা আমার পক্ষ থেকে তাকে এ সংবাদ অবহিত করো। তাকে এ কথাও বলো যে, আমার এ দীন, আমার এ রাষ্ট্র কিসরার সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তাকে আরো বলবে, যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন তাহলে যেসব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী আপনার শাসনাধীনে আছে তা সবই ঠিক থাকবে।' যাওয়ার সময় তিনি খারাখসারাহকে উপঢৌকন স্বরূপ স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত একটি কমরবন্দ (বেল্ট) দিয়েছিলেন।
লোক দু'টি ইয়ামেনে ফিরে গেল এবং বাযানের নিকট রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব কথা খুলে বললো। বাযান সব কথা শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! এ কোনো রাজা-বাদশাহর কথা নয়। তিনি যেমন বলেছেন, আমার মনে হয় তিনি একজন নবী। আমরা তাঁর কথার সত্য-মিথ্যা নিরূপণের জন্য অপেক্ষা করবো। যদি সত্য হয় তাহলে তিনি অবশ্যই একজন নবী। আর সত্য প্রমাণিত না হলে পরবর্তীতে তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এ কথা বলার অল্পক্ষণের মধ্যে তার হাতে 'শিরাওয়ায়হি'-এর একখানা পত্র এসে পৌঁছে, অতঃপর এই যে, আমি কিসরাকে (আবরুভেজ) হত্যা করেছি। আমার এ পত্র আপনার নিকট পৌঁছার পর আপনি ও আপনার নিকট যারা আছে, আমার আনুগত্য মেনে নিবেন। আর ইতিঃপূর্বে কিসরা যে ব্যক্তির ব্যাপারে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনাকে লিখেছিলেন, আমার পরবর্তী নির্দেশ না পৌঁছা পর্যন্ত তাঁকে কোনো রকম বিরক্ত করবেন না।
শিরাওয়ায়হির এ পত্র পাঠ শেষে বাযান বলে উঠেন, নিশ্চয়ই এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি এবং তার সাথে ইয়ামেনের মাটিতে পারস্যের যত লোক ছিলেন সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। বাবওয়াইহ বাযানকে বলে, 'আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর মতো প্রভাবশালী কোনো মানুষের সাথে কখনো কথা বলি নি'। বাযান জানতে চাইল, 'কেন তার সাথে কি পুলিশ ছিল?' সে বলল, 'না, কোনো পুলিশ কিংবা বাহিনী ছিল না'।
এ পয়েন্টে এসে আমরা বিরোধীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে নবী চরিত্রের এমন কিছু অবাক করার মতো বিষয় লক্ষ্য করলাম যা প্রকাশ করার সঠিক ভাষা আমাদের জানা নেই। দেখুন, কিসরার এ দূতদ্বয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায়, রাসূলের ভূমিতে, রাসূলের বাড়িতে এসেছে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং তাদের আচরণও ছিল সম্রাট কিসরার ন্যায়ই মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ!! এতকিছুর পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধীরতা, স্থীরতা ও স্বভাবসুলভ নম্রতার বিচ্যুতি ঘটে নি; বরং তিনি অত্যন্ত নির্ভরতা ও পরম নিশ্চয়তার সাথে তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত আসমানী সংবাদ প্রদান করলেন এবং বললেন যে, ইয়ামেনের গভর্ণর বাযানকে আমার পক্ষ থেকে বলবে যে, 'যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন তাহলে যেসব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী আপনার শাসনাধীনে আছে তা সবই ঠিক থাকবে' এবং যাওয়ার সময় তিনি দূতদ্বয়ের একজন (খারাখসারাহ) কে মূল্যবান উপঢৌকনও দিয়েছিলেন, যা ছিল স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত একটি কমরবন্দ (বেল্ট)।
ধর্ম-বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, স্বভাব-প্রকৃতি ও চিন্তা-চেতনা সবদিক থেকেই বিরোধী প্রতিপক্ষের কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের সাথে এ ধরণের উন্নত কুটনৈতিক আচরণ সত্যিই মনুষ্য-বিবেক স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো, যা চিন্তার জগৎকে ভাবিয়ে তোলে এবং মানবতাবোধকে জাগ্রত করে। এখানে এমন কোনো সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক নিয়মনীতি ছিল না যা একজন সেনাপ্রধানকে তার প্রাণ-নাশের হুমকিদাতা ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনকারী কট্টরবিরোধী প্রতিপক্ষের সাথে এ ধরণের নম্র ব্যবহার করতে বাধ্য করেছিল; বরং এটা ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে সদা বিদ্যমান সেই প্রবণতা যা তার সকল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে আল্লাহ প্রদত্ত আদেশ ও শর'ঈ বিধানের আওতায় পরিচালিত করে। আর এ বৈশিষ্ট্য-শ্রেষ্ঠত্ব শুধু ইসলামেই রয়েছে। কেননা, যে তার জীবনের প্রতিটি নড়া-চড়ায় আপন প্রতিপালককে অনুসরণ করে আর যে শুধুই কামনা তাড়িত হয়ে ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে উভয় কি সমান হতে পারে? এ তো আসমান জমিনের পার্থক্য।
অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আচরণ গতানুগতিক ধারার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটা ছিল সকল অমুসলিমদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তার অবশ্য পালনীয় মূলনীতি। পৃথিবীর বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের নিকট প্রেরিত তাঁর পত্রাবলী থেকে এ কথাটি আরো স্পষ্ট উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল অমুসলিমদের সাথেই সর্বোত্তম কুটনৈতিক আচরণ করতেন। ইহুদী, খ্রিস্টান, মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক, আরব কিংবা অনারব সকল রাজন্যবর্গকেই তিনি সমান মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তৎকালীন পৃথিবীর সকল রাজা-বাদশাহদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত অনেকগুলো পত্র প্রেরণ করেছেন। সকলকেই তিনি মহান, প্রধান, সম্রাট ইত্যাদি গুণবাচক বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। কোনো একজন অমুসলিমকেও বিশেষায়িত করতে সংকীর্ণতা বোধ করেন নি।
রোম সম্রাটের প্রতি প্রেরিত চিঠির শুরুতে তিনি লিখেছেন,
«من محمد رسول الله إلى هرقل عظيم الروم...»
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের মহান সম্রাট 'হিরাক্লিয়াসের প্রতি।"
ফারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি প্রেরিত চিঠির শুরুতে তিনি লিখেছেন,
«من محمد رسول الله إلى كسرى عظيم فارس....»
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে ফারস্যের মহান সম্রাট কিসরার প্রতি।”
মিসরের অধিপতি মুকাওকিসের নিকট প্রেরিত চিঠিতে তিনি লিখেছেন,
«من محمد بن عبد الله إلى المقوقس عظيم القبط ...»
“মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে কিবত'র মহান অধিপতি মুকাওকিস সমীপে।”
হাবশা (আবিসিনিয়া)’র প্রধানকে তিনি লিখেছেন,
«هذا كتاب من محمد النبي إلى النجاشي الأصحم ، عظيم الحبشة...»
“নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হাবশার মহান অধিপতি আসহাম নাজ্জাশী সমীপে।”
এমনই ছিল তাঁর প্রতিটি চিঠির ধরণ এবং অগ্রহণযোগ্য ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসা কিসরার দূতদ্বয়ের মতো মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগত সকল দূতের সাথেই তাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই একই ধরণের আচরণ। যদিও দূতদের সাথে সাধারণত তাদের মর্যাদাগত অবস্থান অনুযায়ীই আচরণ করা হয়ে থাকে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূতদের অভ্যর্থনা, থাকা-খাওয়া ও উপঢৌকন প্রদানসহ যাবতীয় আরাম-আয়েশের দিকে অত্যন্ত সযত্ন দৃষ্টি রাখতেন। তিনি দূতদেরকে স-সম্মানে অভ্যর্থনা জানাতেন, তাদের সম্মানে বনভোজনের আয়োজন করতেন, বারবার খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাদের সামনে সুন্দর পোষাক পরে আসতেন” এবং দূতদের অভ্যর্থনা ও বাসস্থানের জন্য নির্দিষ্ট ঘর প্রস্তুত করে রাখতেন। যেমন, সালমান গোত্রের প্রতিনিধিরা আগমন করলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গোলাম সাওবানকে বললেন,
«أنزل هؤلاء الوفد حيث ينزل الوفود»
"দূত ও প্রতিনিধিরা যেখানে থাকেন এদেরকে সেখানে নিয়ে যাও।"
এ কথার দ্বারা বুঝা যায় যে, দূত ও প্রতিনিধিদের জন্য ঘর নির্ধারণ করা ছিল। কোনো কোনো বর্ণনাতে পাওয়া যায় যে, এটি ছিল রমলাহ বিনতে হারেস নাজ্জারীয়্যাহ-এর ঘর। এমনিভাবে কিলাব, মাহারেব, আযরাহ, আবদে কায়েস, তাগলাব ও গাসসান ইত্যাদি গোত্রের প্রতিনিধিদেরকেও একই ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছিল” এবং দূত ও প্রতিনিধিদেরকে হাদিয়া-তোহফা দেওয়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল। অধিকাংশ সময় তা হতো রৌপ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- দূত ও প্রতিনিধিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগ্রহ ও আন্তরিকতা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিনি জীবনের অন্তীম মূহুর্তগুলোতেও সাহাবায়ে কেরামগণকে অসিয়ত করে বলেছেন যে,
«أجيزوا الوفد بنحو ما كنت أجيزهم»
"তোমরা দূত ও প্রতিনিধিদেরকে উপঢৌকন প্রদান করবে, যেমন আমি তাদেরকে উপঢৌকন প্রদান করতাম।"
এ অধ্যায়ের সমাপ্তিলগ্নে আমরা উল্লেখ করতে চাই যে, অমুসলিমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যে, তিনি অমুসলিমদের জন্যে তাদের ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অথচ তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, এটি মূল আসমানী কিতাব নয়। এতে বিকৃতি সাধন করা হয়েছে এবং নবী-রাসূলগণের ব্যাপারে অযৌক্তিক ও মনগড়া অনেক কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও তিনি তাদের ধর্মীয় বই সংরক্ষনের দায়িত্ব পালন করেছেন। খায়বার দূর্গ বিজয়ের পর সেখানে কতগুলো ধর্মগ্রন্থ পাওয়া গিয়েছিল। তন্মধ্যে তাওরাতও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবগুলোকে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখলেন। ইয়াহূদীরা তাদের তাওরাত চাইতে আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত তাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন।
পৃথিবীর আদি থেকে এ পর্যন্ত মানব জাতির ইতিহাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত বিরোধীদের সাথে এ ধরণের উন্নত আচরণ-বিধি মেনে চলার মতো কোনো মহা মানবের সন্ধান দিতে পারে নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত পারবেও না। যাচাই করতে চাইলে চলুন, ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টাই। দেখে আসি, স্পেন পতনের সময় খ্রিস্টানরা কী করেছিল এবং কী আচরণ করেছিল জেরুযালেম পতনের সময় রোমীয়রা? প্রতিটি বস্তুকে তার বিপরীত বস্তুর মুখোমুখি দাঁড়া করালে স্পষ্ট ফুটে উঠে!!
টিকাঃ
88. প্রখ্যাত তাবে'ঈ ইয়াযীদ ইবন হাবীব এ বর্ণনাটি উকবাহ ইবন আমের জুহানী থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবন সাঈদ বলেন, ইয়াযীদ ইবন হাবীব অধিক হাদীস বর্ণনাকারী, নির্ভরযোগ্য। মৃত্যু ১২৮ হিজরীতে।
89. আব্দুল্লাহ ইবন হুযাফা ইবন কায়স আস-সাহমী আল-কারাশী। প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং দ্বিতীয় দফা আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের মধ্যে ছিলেন। বদর যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর যুগে রোমীয়দের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তারা তাকে ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করতে চেয়েছিল; কিন্তু পারে নি। অবশেষে আল্লাহ তাকে মুক্তি দিয়েছেন এবং তার উসিলায় অন্য বন্দিদেরকেও। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন হাজার: 'আল-ইসাবাহ' (৪৬২০); ইবন আব্দুল বার: 'আল-ইসতি'আব' (২/২৬৭); ইবনুল আসীর: 'উসদুল গাবাহ' (৩/১০৬)।
৯০. তারীখুত-তাবারী (৩/৯০), ইবন কাসীর, আস-সীরাতুন-নববিয়্যাহ (২/১৫৮-১৬১)।
91. সহীহ বুখারী )کتاب بدء الوحى ، باب حديث لأبي سفيان عند هر قل হাদীস নং ৮, সহীহ মুসলিম ) کتاب الجهاد والسير( হাদীস নং ১৭৭৩।
92. তারীখুত-তাবারী )تاریخ الامم والملوك( )৩/৯০,৯১); ইবন কাসীর: আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যাহ (৩/৫০৮-৫১০)।
93. আবু জা'ফর ত্বাহাবী: মুশকিলুল আসার (১১/১৩৬)।
94. মুসতাদরাকে হাকিম (২/৬৩৩); বায়হাকী: দালাইলুন-নবুওয়্যাহ (৩/৩০৮)।
95. ফারুক হামাদাহ: العلاقات الإسلامية النصرانية في العهد النبوي (৯৫)।
96. হাবীব ইবন আমর সালামানী বর্ণনা করেন, আমরা সাতজন সালামান গোত্রের প্রতিনিধি হয়ে আগমন করলাম এবং আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মসজিদের বাইরে একটি জানাযার সামনে সাক্ষাৎ করলাম। আমরা সালাম দিলাম তিনি উত্তর দিয়ে জানতে চাইলেন, তোমরা কারা? বললাম, 'আমরা সালামান গোত্র থেকে সকলের প্রতিনিধি হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে এসেছি'। তিনি স্বীয় গোলাম সাওবানকে ডেকে বললেন: "দূত ও প্রতিনিধিরা যেখানে থাকেন এদেরকে সেখানে নিয়ে যাও”। এরপর যোহরের সালাতের পর মিম্বর ও তাঁর ঘরের মাঝখানে আমরা তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমরা তাকে সালাত ও ইসলামের অন্যান্য বিধি-বিধান এবং ঝাড়-ফুঁক সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম এবং ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলাম। তিনি আমাদের প্রত্যেককে পাঁচ আওকিয়া করে হাদিয়া দিলেন। অতঃপর আমরা আমাদের গোত্রে ফিরে এলাম। এটা ছিল দশম হিজরীর শাওয়াল মাসে। অধিকতর জানতে: ইবন সা'দ: আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (১/৩৩২)।
97. ইবন সা'দ: আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (১/৩৩২)।
98. রমলাহ বিনতে হারেস নাজ্জারীয়্যাহ আনসারী মহিলা ছিলেন। তার ঘরে দূত ও প্রতিনিধিরা অবস্থান করত। অধিকতর জানতে: ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (৬/১১৯)।
99. ইবন সা'দ: আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা (১/৩০০-৩৪৮)
100. প্রাগুক্তা
101. সহীহ বুখারী )کتاب الجهاد والسير( হাদীস নং ২৮৮৮।
102. আল-ওয়াকেদী: আল-মাগাযী (১/৬৮১)