📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অমুসলিমদের স্বীকৃতি
এ শাশ্বত মহান দাওয়াতে ইসলামিয়ার প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হচ্ছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য পূর্ববর্তী নবীগণের ঘটনাবলী বর্ণনা করা হচ্ছিল। আর কুরআন মাজীদ কোনো মন্তব্য ছাড়া শুধুমাত্র পূর্ববর্তী নবীগণের ঘটনাবলী বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সর্বদা অন্যান্য নবীগণের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন করেছে এবং সে ক্ষেত্রে কোনো একজন নবীর ব্যাপারেও ভিন্নতা করে নি।
আর পূর্ববর্তী নবীগণের ব্যাপারে গৃহীত এ পন্থা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কী জীবন থেকে শুরু করে মাদানী জীবনেও অব্যাহত ছিল। এমনকি ইয়াহূদী কিংবা খ্রিস্টানদের সাথে সংঘটিত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পরও কুরআন মাজীদ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের নবী ঈসা ও মূসা আলাইহিমাস সালাম- এর মাহাত্ম্য বর্ণনায় বিরত থাকে নি। যেমন, মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
(وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ، وَاسْتَوَى ءَاتَيْنَهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ) [القصص: ١٤] “আর মূসা যখন যৌবনে পদার্পণ করল এবং পরিণত বয়স্ক হলো, তখন আমি তাকে বিচারবুদ্ধি ও জ্ঞান দান করলাম। আর এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কার দিয়ে থাকি।” [সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত: ১৪]
অন্যত্র এসেছে:
(قَالَ يَمُوسَى إِنِّي أَصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَلَاتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا ءَاتَيْتُكَ وَكُن مِّنَ الشَّكِرِينَ ) [الاعراف: ١٤٤]
“তিনি বললেন, হে মূসা, আমি আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা তোমাকে মানুষের ওপর পছন্দ করে নিয়েছি। সুতরাং যা কিছু আমি তোমাকে প্রদান করলাম তা গ্রহণ কর এবং শোকর আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৪৪]
পবিত্র কুরআনে অনুরূপ উদাহরণ অনেক রয়েছে।
ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারেও পবিত্র কুরআনে অনুরূপ আলোচনা এসেছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে:
﴿قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ وَآتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدتُّ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا ﴾ [مريم: ٣٠، ٣٣]
“তিনি বলেন, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে এবং জননীর অনুগত থাকতে। আর আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমার জন্ম হয়েছে, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।” [সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩০-৩৩]
অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ ﴾ [الانعام: ٨٥]
"আর (স্মরণ করুন) যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকে। প্রত্যেকেই নেককারদের অর্ন্তভুক্ত।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৮৫]
শুধু তাই নয় পূর্ববর্তী নবীগণের এ শ্রেষ্ঠত্ব এবং সম্মানসূচক আলোচনা মদীনায় ইয়াহুদী-খ্রিস্টান কর্তৃক সৃষ্ট বৈরী পরিস্থিতিতেও চলমান ছিল। যখন মদীনায় ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের সাথে মুসলিমদের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বিরোধ চলছিল এবং ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের পক্ষ থেকে অনবরত মিথ্যারোপ করা হচ্ছিল তখনও পূর্ববর্তী নবীগণের গুণাগুণ বিরতিহীনভাবে চলছিল।
মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম-এ দু'জনকে আল্লাহ তা'আলা প্রবল দৃঢ়চেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا ﴾ [الاحزاب: ٧]
“আর স্মরণ কর (সে সময়ের কথা), যখন আমরা অঙ্গীকার নিয়েছিলাম নবীদের থেকে এবং তোমার থেকে, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র ঈসা থেকে। আর আমরা তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ০৭]
আমরা যদি হিসাব কষি তাহলে দেখতে পাব যে, উক্ত আয়াতটি সূরা আল-আহযাব-এর অন্তর্ভুক্ত, যা বনু কুরাইযা কর্তৃক মুসলিমদের সাথে কৃত বিশ্বাসঘাতকতা ও মুসলিমদেরকে মদীনা থেকে পুরোপুরি উচ্ছেদের অপচেষ্টার পর অবতীর্ণ হয়েছে। তথাপি আমরা উপলব্ধি করেছি যে, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের নবী মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের সম্মাননা ও গুণাগুণ তখনও চলছিল। আমাদের আরও অনুভূত হয়েছে যে, মুসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের স্ব স্ব অনুসারী ও সম্প্রদায়ের বিশ্বাসঘাতকতার পরও কুরআনে তাঁদের (মুসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম-এর) প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে।
ব্যাপকহারে এবং কুরআনে বর্ণিত সেসব প্রশংসাবলী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় ইনসাফপূর্ণ চরিত্রগুণে নিজ উম্মত ও ইয়াহুদী- খ্রিস্টানদের নিকট পৌঁছেও দিয়েছিলেন।
কুরআনে কারীমে এ মহান নবীদ্বয়ের সম্মাননা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ কোনো দৈবক্রম বা গতানুগতিক ঘটনা ছিল না; বরং যথোপযুক্ত বিবেচনায়ই বারবার বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে 'মুহাম্মাদ' শব্দটি শুধুমাত্র চারবার এবং 'আহমদ' শব্দটি শুধুমাত্র পাঁচবার উল্লেখ হওয়া সত্বেও আমরা দেখেতে পাই যে, 'ঈসা' শব্দটি পচিশ বার, 'মসীহ' শব্দটি এগার বারসহ মোট ছত্রিশ বার ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নাম উল্লেখ হয়েছে। আর মূসা আলাইহিস সালাম তো সেসব নবীদের তালিকাভুক্ত হয়েছেন পবিত্র কুরআনে যাদের নামোল্লেখ করণের ষোলকলা পূর্ণ করা হয়েছে। যেহেতু মূসা আলাইহিস সালাম-এর নাম একশত চল্লিশ বার উল্লেখ হয়েছে।
বস্তুত পূর্ববর্তী নবীগণের নাম পবিত্র কুরআনে যতবার উল্লেখ হয়েছে তার সংখ্যার দিকে তাকালে এটাই অনুভূত হয় যে, এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানষপটে পূর্ববর্তী নবীগণের জন্য এক বিনম্র শ্রদ্ধা ও সাদর অভ্যর্থনার বীজ বপন করে। অথচ বাস্তবতা হলো আমি যখন পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত নবীগণের নাম গণনার কাজে হাত দিয়েছি, তখন বিস্মিত হয়েছি। কারণ তখন বেশ কিছু চমৎকার সংখ্যাতত্ত্ব বা সূক্ষ্ণ নিদর্শন আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে পবিত্র কুরআনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাম উল্লেখ হয়ে মূসা আলাইহিস সালামের, অতঃপর পর্যায়ক্রমে ইবরাহীম, নূহ ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সকলের ওপর সর্বোত্তম শান্তি ও দুরূদ বর্ষিত হোক এবং তারা সকলেই দৃঢ়চেতা রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর এতেও কোনো সন্দেহ নেই যে, ঐ সমস্ত রাসূলগণের মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্ব যথোপযুক্ত এবং নির্ধারিত ছিল। কিন্তু যেমনটা আমি পূর্বেই আভাস দিয়েছিলাম যে, পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মাত্র পাঁচবার উল্লেখ হয়েছে-এ সংখ্যাতত্ত্বের বিশ্লেষণে আমি দেখতে পাচ্ছি যে, পবিত্র কুরআনে সতের জন নবীর নাম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক বার উল্লেখ করা হয়েছে, যার দ্বারা এ কথা নির্দ্বিধায় ও সুস্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, নিশ্চয় ইসলাম সকল নবী ও রাসূলগণকে যথোপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দেয়।
আর এ সংখ্যাতত্ত্ব এ কথাও দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে যে, নিশ্চয় এ কুরআন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সংকলন করেন নি।
অনেক বিকৃত মস্তিষ্কধারী পাশ্চাত্যবাদীদের দাবী অনুযায়ী কুরআন যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংকলন হতো তাহলে অন্যদের নয়; বরং নিজের পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করাই তাঁর মূল চেষ্টা হতো। বস্তুত এটি সম্পূর্ণ তাদের ভ্রান্ত চিন্তা বৈ কিছুই নয়।
এমতাবস্থায় আমরা সমন্বিত কন্ঠে প্রশ্ন রাখতে চাই যে, ইসলামের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনে পূর্ববর্তী নবীগণের এত সম্মান ও নানা প্রেক্ষিতে তাঁদের স্মরণ করার পরও একথা কী করে বলা সম্ভব যে, ইসলাম অন্যদের ব্যাপারে জ্ঞাত নয় ও স্বীকৃতি দেয় না?
এ ভূপৃষ্ঠে এমন কারা আছে যারা আমাদের ব্যাপারে জানে এবং স্বীকার করে, যেমনভাবে আমরা অন্যদের সম্পর্কে জানি ও স্বীকার করি:
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবকূলের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব এবং সমস্ত সৃষ্ট জগতের সর্দার-এ কথায় আমাদের দৃঢ়শ্বিাস থাকার পরও আল-কুরআন আমাদেরকে কোনো পার্থক্যকরণ ছাড়া সকল নবীগণের ওপর ঈমান আনার নির্দেশ প্রদান করে। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা ঈমানের স্বরূপ বর্ণনায় সে বিষয়গুলোই বলেন যেগুলোতে সহমত প্রদর্শন উম্মতে মুসলিমাহ-এর জন্য আবশ্যক। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُولُوا ءَامَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ ﴾ [البقرة: ١٣٦]
"তোমরা বল, 'আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের ওপর ও যা নাযিল করা হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাদের সন্তানদের ওপর আর যা প্রদান করা হয়েছে মুসা ও ঈসাকে এবং যা প্রদান করা হয়েছে তাদের রবের পক্ষ হতে নবীগণকে। আমরা তাদের কারো মধ্যে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩৬]
রাসূলগণ ও তাদের রিসালাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে পাওয়া সকল ধর্মের একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া এবং সকল রাসূলের রিসালাতের কেন্দ্রবিন্দু এক আল্লাহ হওয়ার ওপর ঈমান আনাসহ এ সকল কিছুকেই ইসলাম ব্যাপৃত করে নেয়। উপরোক্ত আয়াতে ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিরই বর্ণনা রয়েছে। 24
আল্লামা ইবন কাসীর রহ. উপরোক্ত আয়াতের ব্যাপকার্থবোধক অংশ বিশেষ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ এর মন্তব্যে বলেন, এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে, "আমরা তাঁদের সকলের ওপরেই বিশ্বাস পোষণ করি।" কাজেই এ উম্মতের সকল মুসলিমগণ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত সকল রাসূলগণকে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত সকল কিতাবসমূহকেই বিশ্বাস করেন। এসবের কোনোটিকেই তারা অস্বীকার করেন না; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে যা-ই অবতীর্ণ হয়েছে তাই এ উম্মতের মুমিনরা বিশ্বাস করে এবং যে সকল নবীকে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন সকলকেই মুমিনরা স্বীকার করেন। 25 শুধু তাই নয় বরং নবীগণের মধ্যে যে তারতম্য সৃষ্টি করে তার ব্যাপারে আল-কুরআন অতীব কঠোরতা অবলম্বন করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ، وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ، وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُوْلَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا ﴾ [النساء: ١٥٠، ١٥١]
"নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফুরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে, 'আমরা কতককে বিশ্বাস করি আর কতকের সাথে কুফুরী করি' এবং তারা এর মাঝামাঝি একটি পথ গ্রহণ করতে চায়, তারাই প্রকৃত কাফির এবং আমরা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করেছি অপমানকর 'আযাব।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫০-১৫১]
পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণের ব্যাপারে কথা বলার সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহেন মৌলিক বিষয়টি চিন্তায় রেখেই কথা বলতেন।
আমাদেরকেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা নবীগণের মধ্যে একজনকে অন্যের ওপর প্রাধান্য না দেই। আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا تُخَيَّرُوا بَيْنَ الْأَنْبِيَاءِ»
"তোমরা নবীগণের একজনকে অন্যের ওপর প্রধান্য দিও না (তারতম্য করো না)।"26
বিশেষত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে অপরাপর নবীগণের ওপর অগ্রাধিকার দিতে নিষেধ করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَا تُخَبِرُونِي مِنْ بَيْنِ الْأَنْبِيَاءِ»
"তোমরা আমাকে অপরাপর নবীগণের ওপর প্রধান্য দিও না।"27
এছাড়াও নবীদের মধ্যে একজনকে অন্যের ওপর প্রধান্য দেওয়ার বিষয় নিয়ে যখন এক মুসলিম ও ইয়াহুদীর মধ্যে বিবাদের সৃষ্টি হলো তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদীর পক্ষপাত গ্রহণ করে রাগান্বিত হলেন। (ইয়াহূদীর দাবী অনুযায়ী মূসা আলাইহিস সালামকে অগ্রাধিকার দিলেন)
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«بَيْنَمَا يَهُودِيٌّ يَعْرِضُ سِلْعَتَهُ أُعْطِيَ بِهَا شَيْئًا كَرِهَهُ فَقَالَ لَا وَالَّذِي اصْطَفَى مُوسَى عَلَى الْبَشَرِ فَسَمِعَهُ رَجُلٌ مِنْ الْأَنْصَارِ فَقَامَ فَلَعَمَ وَجْهَهُ وَقَالَ تَقُولُ وَالَّذِي اصْطَفَى مُوسَى عَلَى الْبَشَرِ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا ؟ فَذَهَبَ إِلَيْهِ فَقَالَ أَبَا الْقَاسِمِ إِنَّ لِي ذِمَّةً وَعَهْدًا فَمَا بَالُ فُلَانٍ لَطَمَ وَجْهِي فَقَالَ لِمَ لَطَمْتَ وَجْهَهُ فَذَكَرَهُ فَغَضِبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى رُبِيَ فِي وَجْهِهِ ثُمَّ قَالَ لَا تُفَضِّلُوا بَيْنَ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ فَإِنَّهُ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَيَصْعَقُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ يُنْفَخُ فِيهِ أُخْرَى فَأَكُونُ أَوَّلَ مَنْ بُعِثَ فَإِذَا مُوسَى آخِذُ بِالْعَرْشِ فَلَا أَدْرِى أَحُوسِبَ بِصَعْقَتِهِ يَوْمَ الطُّورِ أَمْ بُعِثَ قَبْلِي وَلَا أَقُولُ إِنَّ أَحَدًا أَفْضَلُ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى»
"একবার এক ইয়াহুদী তার কিছু দ্রব্য সামগ্রী বিক্রির জন্য পেশ করছিল, তার বিনিময়ে তাঁকে এমন কিছু দেওয়া হলো যা সে পছন্দ করল না। তখন সে বললো, না! সেই সত্তার কসম, যিনি মূসা আলাইহিস সালামকে মানব জাতির ওপর মর্যাদা দান করেছেন। এ কথাটি একজন আনসারী (মুসলিম) শুনলেন, তুমি বলছো, সেই সত্তার কসম! যিনি মূসাকে মানব জাতির ওপর মর্যাদা দান করেছেন অথচ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে বিদ্যমান। তখন সে ইয়াহূদী লোকটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেল এবং বলল, হে আবুল কাসিম। নিশ্চয় আমার জন্য নিরাপত্তা এবং আহাদ রয়েছে অর্থাৎ আমি একজন যিম্মি। অতএব, অমুক ব্যাক্তির কী হলো, কী কারণে সে আমার মুখে চড় মারলো? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তুমি তার মুখে চড় মারলে? আনসারী ব্যাক্তি ঘটনাটি বর্ণনা করলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন। এমনকি তার চেহারায় সেটা প্রকাশ পেল। তারপর তিনি বললেন, আল্লাহর নবীগণের মধ্যে কাউকে কারো ওপর (অন্যকে হেয় করে) মর্যাদা দান করো না। কেননা কিয়ামতের দিন যখন শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন আল্লাহ যাকে চাইবেন সে ব্যতীত আসমান ও জমিনের বাকী সবাই বেহুশ হয়ে যাবে। তারপর দ্বিতীয়বার তাতে ফুঁক দেওয়া হবে। তখন সর্বপ্রথম আমাকেই উঠানো হবে। তখনই আমি দেখতে পাব মূসা আলাইহিস সালাম 'আরশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তূর পর্বতের ঘটনার দিন তিনি যে বেহুশ হয়েছিলেন এটা কি তারই বিনিময়, না আমারই আগে তাঁকে উঠানো হয়েছে? আর আমি এ কথাও বলি না যে, কোনো ব্যাক্তি ইউনুস ইবন মাত্তার চেয়ে অধিক মর্যাদাবান। "28
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের বাস্তবিক ঘটনাবলি উল্লেখ করা থেকে কখনই বিরত থাকতেন না। বিশেষ করে ঐ সকল ক্ষেত্রে যেখানে ইয়াহূদী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় নববী ভাই মূসা ইবন ইমরানের নামোল্লেখসহ তাঁর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাদীসে বর্ণিত বিরোধের ঘটনাকে সমূলে সমাহিত করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে এবং পূর্ববর্তী সকল নবীগণকে একই ধারাবাহিকতায় বৃত্তায়ণ ও একই ভবনের অনেকগুলো ইটতুল্য মূল্যায়ন করতেন। পরস্পরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রতিযোগিতা কিংবা বিরোধের তো কোনো সুযোগই ছিল না। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ»
"আমার দৃষ্টান্ত এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায়, যে একটি আট্টালিকা তৈরি করল এবং তা উত্তম ও সুন্দর করল। তবে তার কোণগুলোর কোনো এক কোণায় একটি ইটের জায়গা ছাড়া। লোকেরা তার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল আর তা দেখে বিস্মিত হতে লাগল এবং পরস্পর বলতে লাগল, ঐ ইটখানি স্থাপন করা হলো না কেন? (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি-ই সে ইট আর আমি নবীগণের মোহর ও শেষ নবী।"29
ইতিহাসে দীর্ঘ পরিক্রমার পথ চলায় পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণের ব্যাপারে এটাই ছিল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আম্বিয়ায়ে কেরামের সম্পর্ক; সেতো একটি বৃহদায়তন বিশাল ভবনের ইটসমূহের মতো। আর ইটের উপমা দ্বারা মুখোমুখি সংঘর্ষ বা অবস্থান উদ্দেশ্য নয়; বরং একটি ভবন যেমন অনেকগুলো ইটের দ্বারা পূর্ণতা পায় এবং একটি ইট অন্যটির সহযোগিতায় উপরে উঠে, ঠিক তেমনি আম্বিয়ায়ে কেরামও এক মহান দায়িত্ব পালনে যুগে যুগে একে অপরকে সহযোগিতা করে গেছেন, একজন আরেকজনকে পূর্ণতা অর্জনে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছেন। আর সেই মহান দায়িত্বটি হলো মহান রবের একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা।
অতএব, এ তাওহীদ প্রতিষ্ঠার পথে যারা আমাদের পূর্ববর্তী হয়েছেন তাদেরকে আমরা সম্পূর্ণরূপে চিনি ও জানি এবং আমরা যখন এ কথা বলি যে, 'আমরা পূর্ববর্তী নবীগণকে তাদের অনুসারীদের থেকে বেশী ভালোবাসি এবং তাদের সম্প্রদায় থেকে বেশী মর্যাদা দিই' তখনো আমরা অতিরঞ্জিত করি না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাদীসের মধ্যেই এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যেমন, একজন ইয়াহুদীকে আশুরার দিনে সাওম পালন করতে দেখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিজ্ঞাসা, জবাব ও তার প্রতি উত্তর। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ مَا هَذَا قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمُ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَابِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهُ مُوسَى قَالَ فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ»
"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করে দেখতে পান যে, ইয়াহূদীরা আশুরার দিনে সাওম পালন করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সাওম পালন কর কেন?) তারা উত্তর দিল, এ অতি উত্তম দিন। এ দিনে আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে মুক্তি দান করেন, ফলে এ দিনে মূসা আলাইহিস সালাম সাওম পালন করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি এ দিনে সাওম পালন করেন এবং সাওম পালনের নির্দেশ দেন।"30
এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে নিজেকে বনী ইসরাঈলদের থেকেও বেশি হকদার মনে করছেন। কেননা বনী ইসরাঈলের ফির'আউন থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি তাকে এত আনন্দিত করেছে যে, এ নি'আমতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে তিনি নিজে ঐ দিন সাওম পালন করেছেন এবং তার উম্মতকেও সাওম পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এতগুলো বিষয় ও ঘটনাবলী কি মূসা আলাইহিস সালাম এবং বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের অবগতি এবং তাদেরকে আমাদের স্বীকৃতি দান বলে গণ্য হবে না?
ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কেও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَالْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلَّاتٍ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ»
"ইহ ও পরজগতে আমি ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী। লোকেরা বলল, কীভাবে হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, নবীগণ একই পিতার সন্তানের মতো³¹। তাদের মা বিভিন্ন। তাঁদের দীন একটিই।"32
এ সাবলীল উদার বক্তব্যটি কি ঈসা আলাইহিস সালাম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের অবগতি এবং তাদেরকে আমাদের স্বীকৃতি দান বলে গণ্য হবে না?
আমরা আরো দেখতে পাই যে, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পর ইসলামের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মহান দুই ব্যক্তিত্ব আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বকে পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলদের সাথে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এ সাদৃশ্য বা সামঞ্জস্য সাধন নবী ও রাসূলদের প্রতি ভক্তি ভালোবাসা ও সম্মানের চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ এবং প্রশংসার দাবীদার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَإِنَّ مَثَلَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ كَمَثَلِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ
"হে আবু বকর, নিশ্চয় তোমার উপমা হচ্ছে ইবরাহীম আলাহিস সালামের মতো।" যে ইবরাহীম বলেন,
﴿فَمَن تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ﴾ [ابراهيم: ٣٦]
"সুতরাং যে আমার অনুসরণ করেছে, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,
وَمَثَلُكَ يَا أَبَابَكْرٍ كَمَثَلِ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ
"হে আবু বকর! তোমার উপমা হচ্ছে ঈসা আলাইহিস সালামের মতো।” যে ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন,
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴾ [المائدة: ١١٨]
"যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১১৮]
উক্ত দু'টি আয়াতে ইবরাহীম ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের যে রকম বিনম্র চিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহুকেও সেই বিশেষ গুণে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-এর উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وان مثلك يا عمر كمثل نوح عليه السلام
"হে উমার, নিশ্চয় তোমার উপমা হচ্ছে নূহ আলাইহিস সালামের মতো।” যেই নূহ বলেন,
رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا ﴾ [نوح: ٢٦]
"হে আমার রব! জমিনের উপর কোনো কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না।” [সূরা নূহ, আয়াত: ২৬]
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, (উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু সম্পর্কে) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وان مثلك يا عمر كمثل موسى عليه السلام
"হে উমার তোমার উপমা হচ্ছে মূসা আলাইহিস সালামের মতো।"33 যেই মূসা আলাইহিস সালাম বলেছেন,
﴿وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ ﴾ [يونس: ৮৮]
"তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রনাদায়ক 'আযাব দেখে।" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৮৮]
এমনটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিতে পূর্ববর্তী আম্বিয়াদের মহান মর্যাদা।
এমনকি কোনো নবী থেকে প্রকাশিত কোনো কাজের ভিন্নরূপ যদি কোথাও তিনি আশা করতেন তাহলে প্রথমে সেই নবীর জন্য আল্লাহ তা'আলার দরবারে দো'আ-প্রার্থনার দ্বারা স্বীয় বাসনা প্রকাশ করতেন। যেমন, মূসা ও খিদিরের সফরে যখন তিনি মূসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে আফসোস করলেন যে, যদি তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন... সে ক্ষেত্রে তিনি বললেন,
﴿يَرْحَمُ اللَّهُ مُوسَى لَوَدِدْنَا لَوْ صَبَرَ حَتَّى يُقَصَّ عَلَيْنَا مِنْ أَمْرِهِمَا﴾
"আল্লাহ তা'আলা মুসার ওপর রহম করুন। আমাদের কতই না মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হতো যদি তিনি সবর করতেন, তাহলে আমাদের কাছে তাদের আরো ঘটনাবলী বর্ণনা করা হতো।"34
অনুরূপভাবে লুত আলাইহিস সালামের ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত ঘটনা:
﴿ قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ ءَاوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ ﴾ [هود: ٨٠]
"সে বলল, 'তোমাদের প্রতিরোধে যদি আমার কোনো শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম।” [সূরা হুদ, আয়াত: ৮০]
এখানে যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, লুত আলাইহিস সালাম যে কথাটি বলেছেন তার থেকে উত্তম কথা রয়েছে তখন তিনি আফসোস করে বললেন,
«يَرْحَمُ اللهُ لُوطًا لَقَدْ كَانَ يَأْوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ»
"লুত আলাইহিস সালামকে আল্লাহ রহম করুন, তিনি শক্ত-কঠিন স্তম্ভের³⁵ আশ্রয় চাইতেন। "³⁶
এছাড়াও বিভিন্ন সুনানে নববীয়্যাহ গ্রন্থসমূহ পাঠ করলে আমরা দেখতে পাই যে, পূর্ববর্তী নবীগণ তাদের অনুসারীদের মধ্যে যারা ধার্মিকতায় যথেষ্ট অগ্রগামী হয়েছে ও দীনের পথে অটল থেকেছে, তাদের ব্যাপারে যতটুকু গুণাগুণ বা প্রশংসা করেছেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐসব ব্যক্তিদের প্রশংসায় তাদের নবীদেরকে অতিক্রম করে গেছেন। যেমন, পবিত্র করআনের সূরা বুরুজে বর্ণিত 'আসহাবে উখদুদ'-এর ঘটনা বর্ণনার সময় খ্রিস্টান ধর্মসাধকের প্রশংসা, আল্লাহর নি'আমতের শুকরিয়া আদায়কারী বনী ইসরাঈলের "অন্ধ আবেদ"-এর প্রশংসা, বনী ইসরাঈলে আবেদ জুরাইয এবং শিশু বাচ্চার দোলনায় কথা বলার ঘটনা, যা সাহাবীগণের জন্যে তিনি উল্লেখ করতেন সেই জুরাইয” নামীয় আবেদ এর প্রশংসা। অনুরূপ ঘটনার বিবরণ বিভিন্ন সুনানে নববীয়্যাহ গ্রন্থমালায় এত বেশি বর্ণিত হয়েছে যে, এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এগুলোর পরিসংখ্যান আনয়ন খুবই কঠিন।
এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ববর্তী দীনসমূহের আবেদগণকে হিদায়াতের পথে আদর্শ এবং আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সাহাবায়ে কেরামের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রিয় পাঠক! আগত হাদীসের বিষয়বস্তুর দিকে একটু দৃষ্টিপাত করুন, দেখুন অন্য দীনের অনুসরণের কিরূপ উপমা উপস্থাপিত হয়েছে। খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
شَكَوْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُتَوَسِّدُ بُرْدَةً لَهُ فِي ظِلِ الْكَعْبَةِ قُلْنَا لَهُ أَلَا تَسْتَنْصِرُ لَنَا أَلَا تَدْعُو اللَّهَ لَنَا قَالَ كَانَ الرَّجُلُ فِيمَنْ قَبْلَكُمْ يُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ فَيُجْعَلُ فِيهِ فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُشَقُ بِاثْنَتَيْنِ وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَيُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ لَحْمِهِ مِنْ عَظْمٍ أَوْ عَصَبٍ وَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ أَوْ الذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ».
"আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করলাম। তখন তিনি কা'বা ঘরের ছায়ায় তাঁর চাদরকে বালিশ বানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা বললাম, (আমাদের জন্য কি) সাহায্য কামনা করবেন না? আমাদের জন্য কি দো'আ করবেন না? তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বেকার লোকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য জমিনে গর্ত করত। তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত হেনে দুই টুকরা করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হত। এতদসত্ত্বেও তাকে তার দীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না। আল্লাহর কসম! এ দীন অবশ্যই পূর্ণতা লাভ করবে। এমন হবে যে, সান'আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণকারী ভ্রমণ করবে অথচ সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না এবং নিজের মেষপালের জন্য শুধু বাঘের ভয় থাকবে; কিন্তু তোমরা তো তাড়াহুড়া করছ। "40
অগ্রজ আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাদের অনুসারীবৃন্দের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চিন্তা-চেতনা এমনই সম্মানসূচক ছিল এবং এ চেতনা তিনি স্বীয় জীবনাচারের প্রতিটি ধাপে অটুট রেখেছেন।
শুধু তাই নয় বরং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রথমবার যখন অহী নাযিল হলো এবং তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, এটা কী? তখন তিনি খ্রিস্টান পাদ্রী ওয়ারাকা ইবন নাওফল-এর কাছে গেলেন এবং তার কাছে এ ঘটনাবলী বললেন। সব শুনে ওয়ারাকা ঘোষণা করল যে, সে যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ দিনগুলোতে (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর স্বগোত্রীয়দের থেকে আগত বিতাড়ন ও বিপদাপদ) জীবিত থাকে (কারণ ওয়ারাকা খুব বৃদ্ধ ছিল) তাহলে সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকাশ্য সাহায্য করবে; কিন্তু তা সম্ভব হয় নি। কারণ দ্বিতীয়বার অহী শুরু হওয়ার আগেই ওয়ারাকা দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন, তথাপি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভুলেন নি; বরং তার ঈমানের প্রশংসা করেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন যে, ওয়ারাকা জান্নাতবাসীদের একজন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لَا تَسُبُّوا وَرَقَة فَأَنِّي رَأَيْتُ له جَنَّة أَوْ جَنَّتَيْنِ»
"তোমরা ওয়ারাকাকে গালি দিও না। কেননা আমি তার জন্য এক জান্নাত কিংবা দু জান্নাত দেখেছি।"43
ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ ধরণের অনুভূতি অসংখ্য রয়েছে। এ অনুভূতিগুলো বিরোধীদের সাথে আপস বা সংবেদনশীলতা নয়; বরং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ ইতিবাচক মানসিকতায় ছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাও জানতেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব থাকবেই। এটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। এজন্য তিনি বিভিন্ন হাদীসে সে দিকে ইঙ্গিতও করেছেন। আর যাদের বিদ্যমানতা অনস্বীকার্য তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সাথে সহাবস্থানকে মেনে নেওয়াই স্বাভাবিক এবং তাদের সাথে চলা-ফেরা, লেন-দেন ও আচার-আচরণের নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অমুসলিমদেরকে স্বীকার করে নেওয়া কিংবা তাদের কারো প্রশংসা করা শুধুমাত্র খামখেয়ালি চিন্তাধারা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বক্তব্য নয়, যা ইসলাম ও মুসলিমদের বাস্তবিক জীবনেতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলে আপনি দেখতে পাবেন; বরং ইসলামী জীবন-বিধানে এ সকল চিন্তাধারা ও বক্তব্যের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটেছে। ফলে তা বহু ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে। একই সমাজে ভিন্ন মতাবলম্বী অনেকগুলো সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে স্বীকার করা ও তাদের সাথে সদাচরণের এ ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিটি অনেক ফলপ্রসূ ও কার্যকরী। যা পারস্পরিক সহাবস্থানকে সহজ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ করে তোলে।
আর এজন্যই মদীনায় আগমন করেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানকার ইয়াহূদীদের সাথে সহাবস্থানকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিলেন এবং তাদের সাথে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় এসকল চুক্তিকে অটুট রাখতে চাইতেন। যত বিশ্বাসঘাতকতা বা চুক্তিভঙ্গের অঘটন ঘটেছিল সব ইয়াহুদীদের পক্ষ থেকেই হয়েছে। যতক্ষণ প্রতিপক্ষ থেকে কোনো অন্যায় বা সীমালঙ্ঘন প্রকাশ পায় নি ততক্ষণ তিনি মজবুতভাবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখেছেন। বরং মদীনাতে স্থায়ী শান্তি বিরাজমান রাখার স্বার্থে অনেক সময় তিনি প্রতিপক্ষের অনেক অন্যায় বাড়াবাড়িকেও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি এ আচরণ-বিধির প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। এমনকি তাঁর কিছু কিছু কাজে অনেকেই হয়রান হয়ে যেত। যেমন, তিনি নিজের লৌহবর্ম বন্দক রেখে বাকীতে কিছু খাবার ক্রয় করেছেন এক ইয়াহুদীর নিকট থেকে!!45 আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, মদীনাতে সাহাবীদের মধ্যে অনেকেই ধনী ছিলেন। যাদের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে প্রিয় কেউ ছিল না। হতে পারতো যে, তাদের কাউকে জানালে তারা হাদিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রয়োজন পূর্ণ করে দিত কিংবা কমপক্ষে এটাতো হতে পারতো যে, তিনি কোনো ধনী সাহাবীর নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করতেন এবং সে সাহাবীর নিকটই লৌহবর্ম বন্ধক রাখতেন। কিন্তু পরিস্থিতি থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তিনি মুসলিমদের জন্য এ ধরণের কাজের বৈধতা দেওয়ার জন্য এমন করেছেন এবং এতে তিনি এ দিকেও ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রতিবেশী অমুসলিমগণ যদি মুসলিমদের কোনো প্রকার সম্মানহানি না করে তাহলে তাদের সাথে এ ধরণের সম্পর্ক স্থাপন করা স্বাভাবিক। সেটি লৌহবর্ম বন্ধক রাখা পর্যায় পর্যন্ত গড়ালেও। লৌহবর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ-সরঞ্জাম। এরপরও প্রতিবেশী ইয়াহুদীর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা ও আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ করার জন্যই তিনি তার নিকট সেটি বন্ধক রেখেছেন।
ইয়াহুদীদের মতো খৃস্টানদের সাথেও তিনি একই ধরণের আচরণ করতেন, তাদের সাথেও একাধিকবার অনেকগুলো চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন এবং তাদেরকে সামাজিক স্বীকৃতিও দিয়েছেন। অথচ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তাদের এমন কিছু সুক্ষ্ম আক্বীদা-বিশ্বাস রয়েছে যা স্পষ্টত শির্ক। তথাপিও তাদের শির্কের প্রতি ধাবমানতা দেখেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ধর্ম পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করলেন না। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন: ﴿أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ ﴾ [يونس: 99]
"তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়?" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯৯]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দায়িত্ব ছিল শুধুমাত্র উত্তম পন্থায় দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া এবং যথাযথ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ খুলে খুলে বর্ণনা করে দেওয়া। অতঃপর প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ তা'আলা সত্যকে গ্রহণ করা কিংবা না করার পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ ﴾ [الكهف: ٢٩]
"অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।" [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ২৯]
এখান থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা মেনে নিয়েছেন যে, ইয়াহুদীদের অনেকে ইয়াহুদিয়্যাতের ওপর এবং খৃস্টানদের অনেকে নাসরানিয়্যাতের ওপর থেকে যাবেই এবং তিনি এটাও গ্রহণ করে নিয়েছেন যে, বিরোধী সকল সম্প্রদায়ের সাথেই শান্তিপূর্ণ সদাচরণ চালিয়ে যেতে হবে। এ ব্যাপারে সাধারণ মূলনীতি তো হচ্ছে, ﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ﴾ [البقرة: ٢٥৬]
"দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৬]
কেননা, যে স্বেচ্ছায় সাগ্রহে ইসলাম গ্রহণ করে না তার এ ইসলাম না তার নিজের কোনো উপকারে আসে এবং না এর দ্বারা সমাজের কোনো ফায়দা হয়। সুতরাং মনে কুফুর লুকিয়ে রেখে এবং ভেতরে ভেতরে ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করে চাপে পড়ে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কোনো মানে হয় না; বরং এমন ব্যক্তি অমুসলিমদের মাঝে থেকে শান্তি ও সস্তির জীবন বেছে নিক এবং কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা'আলার ফয়সালা মেনে নিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ رَبَّكَ يَقْضِي بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ﴾ [الجاثية: ١٧]
"তারা যে সব বিষয়ে মতোবিরোধ করত তোমার রব কিয়ামতের দিনে সে সব বিষয়ে মীমাংসা করে দেবেন।" [সূরা আল-জাছিয়াহ, আয়াত: ১৭]
শুধু ইয়াহুদী-খ্রিস্টান তথা আহলে কিতাবীদের সাথেই নয়; বরং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কাফির-মুশরিকদের সাথেও সহাবস্থান ও সদাচরণকে গ্রহণ ও বরণ করে এসেছেন। দেখুন, মক্কী জীবনে এ ধরণের বহু আয়াত নাযিল হয়েছে,
لَكُمْ دِينَكُمْ وَلِيَ دِينِ ﴾ [الكافرون: ٦]
"তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।" [সূরা আল-কাফিরূন, আয়াত: ৬]
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ ﴾ [الأعراف: ١٩٩]
“তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক।” [সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৯৯]
﴿وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ ﴾ [الأنعام: ١٠٦]
“এবং মুশরিকদের তরফ থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১০৬]
এটি ছিল মক্কী জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ-বিধি। মক্কায় কাফির-মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করেছে, তাঁর ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে, তাঁর সাহাবীদেরকে দেশান্তরিত করেছে এবং তাঁর জন্য যাবতীয় পথই সংকীর্ণ করে ফেলেছে তবুও মোকাবেলায় ফিরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না।
ইসলাম বিরোধী সকল সম্প্রদায়কে স্বীকৃতিদান, ইসলামের সাথে আকীদাগত দিক থেকে চরম অসামঞ্জস্য হওয়া সত্ত্বেও সকল দল-মতকে মেনে নেওয়া এবং এ জাতীয় অসাধারণ ধৈর্য, সহ্য ও বিনম্র আচরণের পরও ইসলাম বিদ্বেষীরা কি তাঁকে সামাজিক স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত দিয়েছে?!
টিকাঃ
24. সায়্যিদ কুতুব: যিলালিল কুরআন ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৩।
25. ইবন কাসীর, তাফসীরুল কুরআনুল কারীম: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৩।
26. সহীহ বুখারী: (كتاب الخصومات باب ما يذكر في الأشخاص والملازمة والخصومة بين المسلم) (والیهودی( হাদীস নং ২২৮১; সহীহ মুসলিম )كتاب الفضائل باب من فضائل موسى علیه السلام( হাদীস নং ২৩৭৪।
27. সহীহ বুখারী )كتاب الديات باب اذا لطم يهوديا عند الغضب( হাদীস নং ৬৫১৯।
28. সহীহ বুখারী (كتاب الأنبياء: باب قوله تعالى ويونس لمن المرسلين) হাদীস নং ৩২৩৩; তিরমিযী, হাদীস নং ৩২৪৫; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪২৭৪।
29. সহীহ বুখারী, (كتاب المناقب باب خاتم النبيين) হাদীস নং ৩৩৪২; সহীহ মুসলিম (كتاب الفضائل باب ذكر كونه صلعم تم النبيين) হাদীস নং ২২৮৬।
30. সহীহ বুখারী, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত كتاب الصوم: باب صیام عاشوراء হাদীস নং ১৯০০; সহীহ মুসলিম )كتاب الصيام باب صوم يوم عاشوراء( হাদীস নং ১১৩০।
31. ভিন্ন ভিন্ন মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া একই পিতার সন্তান।
32. সহীহ বুখারী, (কিতাবুল আম্বিয়া: বাব ওয়াযকুর ফিল কুতুব মারইয়াম.... মানা শারক্বিয়া,) হাদীস নং ৩২৫৯; সহীহ মুসলিম (কিতাবুল ফাযায়েল: বাব ফাযল ঈসা আলাইহিস সালাম) হাদীস নং ২৩৬৫।
33. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৩২৩২; বায়হাকী, হাদীস নং ১৬৬২৩।
34. হাদীস নং ১২২; সহীহ মুসলিম )كتاب الفضائل باب من فضائل خضر( হাদীস নং ২৩৮০।
35. এখানে স্তম্ভ বলে বংশীয় দিক থেকে শক্তিশালী হওয়া বুঝিয়েছেন। [সম্পাদক]
36. সহীহ বুখারী, আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে ( كتاب الانبياء: باب قوله تعالى ونبئهم عن ضيف إبراهيم ) হাদীস নং ৩১৯৩, সহীহ মুসলিম ( كتاب الفضائل: باب من فضائل إبراهيم الخليل ) হাদীস নং ১৫১।
37. সুহাইব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে ইমাম মুসলিম রহ. আসহাবে উখদুদের হাদীটি বর্ণনা করেছেন। (কিতাবুজ যুহুদ ওয়ার রাকাইক : বাব কিস্সা আসহাবিল উখদুদ ওয়াস্সা-হির ওয়ার রা-হিব ওয়াল গুলাম) হাদীস নং ৩০০৫; আহমদ হাদীস নং ২৩৯৭৬।
38. অন্ধ, কুষ্ঠরোগী ও বধীর-এর ঘটনা, যা ইমাম সহীহ বুখারী আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন (কিতাবুল আম্বিয়া : বাব মা যুকিরা আন বানি ইসরাঈল) হাদিস নং ২৩৭৭, ইমাম মুসলিম (কিতাবুজ যুহুদ ওয়ার রাকাইক) হাদীস নং ২৯৬৪।
39. বনী ইসরাঈলের জুরাইজ নামীয় আবেদ ও শিশু বাচ্চার দোলনায় কথা বলার ঘটনা, যা ইমাম সহীহ বুখারী আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণনা করেন (কিতাব আবওয়াবুল আমল ফিস সালাত : বাব ইযা দাওয়াতিল উম্মু ওয়ালাদাহা ফিস সালাহ) হাদীস নং ১১৪৪; ইমাম মুসলিম (কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ ওয়াল আদাব : বাব তাকদিম বিরিল ওয়ালিদাইন আলাত তাতাওউয়ি বিস সালাহ) হাদীস নং ২৫৫০।
40. সহীহ বুখারী ( كتاب الإكراه: باب من اختار لبضرب والقتل والهوان على الكفر ) ৬৫৪৪, আহমদ, হাদীস নং ২১১০৬।
41. ওয়ারাকা ইবন নাওফল ইবন আব্দুল আসাদ ইবন আব্দুল-উযযা ইবন কুসাই। জাহেলী যুগেও তিনি নাসরানী ধর্ম পালন করতেন। অতঃপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর হেরা গুহায় অহী নাযিল হলো তখন তখন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে নিজ চাচাত ভাই ওয়ারাকার কাছে গেলেন। ওয়ারাকা সব শুনে বললেন, এ তো ঐ (নামুস) অহী যা মূসা আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল হয়েছিল। অধিকতর জানতে পড়ুন: আল্লামা ইবনুল আসীরের উসদুল গাবাহ ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠ ৪৬৩-৪৬৫ এবং আল্লামা ইবন হাজার আসকালানীর আল-ইসাবাহ ৬ষ্ট খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৭।
42. সহীহ বুখারী ( کتاب بدء الوحى: باب كيف كان بدء الوحى إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم ) মুসলিম ( كتاب الإيمان باب بدء الوحى إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم ) হাদীস নং ১৬০।
43. মুসতাদরাকে হাকিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, হাদীস নং ৪২১১ এবং হাকিম বলেন যে, এ হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিমের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ কিন্তু তারা এটি তাখরীজ করেন নি। ইমাম যাহাবীও (রহ.) তালখীস গ্রন্থে এ কথা বলেছেন। নাসীরুদ্দীন আলবানীও এটিকে সহীহ বলেছেন। অধিকতর জানতে দেখুন: সহীহ আল-জামিউ হাদীস নং ৭৩২০।
44. যেমন দেখুন: সহীহ বুখারী হাদীস নং ২৭৬৮, ২১০৯; সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৯৪৪, ১৫৫।
45. সহীহ বুখারী, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, (كتاب الرهن، باب من رهن درعه) হাদীস নং ২৩৭৪; সহীহ মুসলিম (كتاب المساقاة، باب الرهن وجوازه في الحضر والسفر) হাদীস নং ১৬০৩।
📄 অমুসলিমরা কি মুসলিমদের স্বীকৃতি দেয়?
উপরের অধ্যায়ে আলোচ্য সকল শ্রেণির অমুসলিমদের প্রতি রাসূলের স্বীকৃতি দান ও সদাচরণের এতগুলো দৃষ্টান্তের পর এবং সকল আকীদাগত মতপার্থক্য অতিক্রম করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাদেরকে বরণ ও গ্রহণ করে নেওয়ার ব্যাপক প্রমানাদি উপস্থাপনের পর এখন আমরা প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই যে, অমুসলিমরা কি রাসূল কিংবা মুসলিমদেরকে স্বীকার করে?!
**মুসলিমদেরকে স্বীকৃতি প্রদানে ইয়াহুদীদের অবস্থান:**
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের অবস্থান কিরূপ ছিল এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর আবির্ভাবের সুচনা লগ্ন থেকেই মিথ্যাচার, বিরুদ্ধাচরণ ও অস্বীকারই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ইয়াহুদীদের মূল চেতনা। অথচ সকল প্রকার প্রামাণ্যচিত্র ও তথ্যাবলি এ কথারই দাবী রাখে যে, ইয়াহূদীরা রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রচারিত দীন সম্পর্কে তাঁর মক্কী জীবনেই সম্যক অবগত ছিল।
ইয়াহুদীদের এ মানসিকতার পরিচ্ছন্ন ধারনা লাভের জন্য তাদের স্বজাতীয় গবেষক "ইসরাঈল ওয়ালফানসুন" এর সংকলনটি খুবই অগ্রগণ্য বিবেচনা করা হয়: (যদিও আমরা তার অনেক মতের সাথে সহমত পোষণ করি না তথাপি তার এ সংকলনটির শুদ্ধতায় কারো ভিন্নমতো নেই)
“ইসরাঈল ওয়ালফানসুন” তার গবেষণায় উল্লেখ করেন “আমি এ ধারণা পোষণ করি যে, নিশ্চয় ইয়াহুদীরা ইসলামের উত্থান সম্পর্কে কখনই উদাসীন এবং অজ্ঞ ছিল না। কেননা এটি তাদের ঐক্য, বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বিশেষতঃ রাসূলের মক্কী জীবনের শেষ দিনগুলোতে দাওয়াতে ইসলামীয়ার মহান ডাক মদীনা অভিমুখে ধেয়ে আসা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বিদ্যমান এতো তীব্র বিদ্ধেষ- যে অত্র গোত্রের অপর দুই শাখা বুনু নাযীর ও বনু কুরাইজার দলপতিগণকে মুসলিমদের কর্মকাণ্ডের ওপর পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করা হলো- থাকা সত্যেও খাযরাজ গোত্রের নেতৃবৃন্দগণের রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা, মদীনায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গোপনীয়তা অবলম্বন না করা, (যেমন, মাস'আব ইবন উমাইর সকলের গোত্রের মধ্যমণীত অবস্থান করেও প্রকাশ্যে লোকদরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি আহ্বান করতেন) এবং হজের মৌসুমে ইয়াহূদী বনীকগণের মুসলিমদের সাথে মিলিত হয়ে বাণিজ্য সম্পাদন করার পরও এ দাবী খুবই অযৌক্তিক যে, ইয়াহুদীরা মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল না।”
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কী জীবনে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াতেও ইয়াহুদী গবেষক 'ওয়ালফানসুনের' এ বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। কারণ, আয়াতে সুস্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, বনী ইসরাঈলের 'আলেমগণ রাসূলের সত্যতা সম্পর্কে খুব ভালোরূপে অবগত ছিল। যেমন, আল্লাহ তা'আলা আল-কুরআনে বলেন,
﴿أَوَ لَمْ يَكُن لَّهُمْ ءَايَةً أَن يَعْلَمَهُ عُلَمَؤُا بَنِي إِسْرَاءِيلَ ﴾ [الشعراء: ١٩٧]
"এটা কি তাদের জন্য একটা নিদর্শন নয় যে, বনী ইসরাঈলের পণ্ডিতগণ তা জানে?" [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ১৯৭]
কাজেই মক্কার মুশরিকদের জন্য এটি একটি নিদর্শন ছিল। কেননা তারা ইয়াহূদী 'আলেমদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদর্শনাবলী বর্ণনা করে তার ব্যাপারে জানতে চাইলে ইয়াহুদী 'আলেমগণ তাদের কিতাবে হুবহু বর্ণনাটিই খুঁজে পেল। অতএব, এ কথায় আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ইয়াহুদীরা খুব ভালো করেই চিনতে পেরেছিল যে, এ সেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার ব্যাপারে নিজেদের কিতাবে পড়ে তার আগমনের জন্য অপেক্ষ্যমান ছিল।
বিখ্যাত তাবে'ঈ ইবন ইসহাক এ ব্যাপারে যে বর্ণনাটি পেশ করেছেন তাতে বিষয়ের সত্যতা আরো তরান্বিত হয়। তিনি বর্ণনা করেন যে, কুরাইশরা নযর ইবন হারেছ এবং উকবাহ ইবন আবী মু'ঈতকে মদীনার ইয়াহুদী পণ্ডিতদের কাছে প্রেরণ করল, যেন তারা নিজেদের (কুরাইশ) মধ্যে প্রেরিত এ ব্যক্তি (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জন্য কিছু প্রশ্ন জেনে যায়। তখন ইয়াহুদী পণ্ডিতগণ ঐ দু'জনকে তাওরাত কিতাবে বর্ণিত এমন কয়েকটি বিষয় শিখিয়ে দিলেন, যেগুলো কোনো নবী ছাড়া অন্য কেউ জানবে না। অতঃপর ঐ দুই কুরাইশী ব্যক্তি ইয়াহুদী পণ্ডিত থেকে শিখে আসা প্রশ্নসমূহ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উত্থাপন করল। তখন তিনি তাওরাত কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন।
এ ঘটনাটিই ছিল সূরা কাহাফ অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট। আর এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবী হওয়ার সত্যতাও সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَنَةِ وَالْإِنجِيلِ [الاعراف: ١٥٧]
“যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৭]
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবন কাসীর রহ, অনেকগুলো বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন, যেগুলোর দ্বারা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কী জীবনেই তাঁর সত্যতা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিল।
এ সকল প্রামাণিক বিষয়াদি এ কথারই গুরুত্বারোপ করে যে, ইয়াহুদীরা তাদের কিতাব তাওরাতের বিবরণ মতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে বিদ্যমান গুণাবলী সম্পর্কে মোটেও অনবহিত ছিল না; বরং তারা তো সেই যমানায় রাসুলের আবির্ভাবের অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছিল। অতঃপর কালের আবর্তে দিনাতিপাত হলো এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন। মদীনায় হিজরতের সূচনালগ্ন থেকেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাসাধ্য ইয়াহুদীদের নৈকট্য অর্জন বা নৈকট্যে আনয়নে সচেষ্ট ছিলেন। কারণ তারাও আসমানী কিতাবধারী। এ কারণে ইয়াহুদীদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়েও তিনি প্রত্যাশী ছিলেন।
আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ইয়াহূদীদের নৈকট্য কামনা শুধু জাগতিক প্রয়োজনের কিছু চুক্তি সম্পাদনের জন্য নয়; বরং এ নৈকট্য কামনা ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ শর'ঈ বিধানের বাস্তায়ন চেষ্টা। বিশেষতঃ ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ দু'টি বিধান 'সালাত' ও 'সাওম' পালনে মুসলিমদের সাথে তাদের সাদৃশ্যতা ছিল।
আমরা জানি যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাদানী জীবনের প্রাথমিক দিনগুলো পর্যন্ত মুসলিমদের কিবলা ছিল ফিলিস্তিনে অবস্থিত 'বাতুল মুক্বাদ্দাস' যা হিজরতের পর একটানা ১৬/১৭ মাস পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল অথচ পূর্ববর্তী সকল আম্বিয়াসহ ইয়াহুদীদেরও কিবলা ছিল এ 'বাতুল মুক্বাদ্দাস'। আর 'সিয়াম' পালনে ইয়াহুদীদের সাথে সাদৃশ্য হওয়া বলতে আশুরা দিনের সাওম উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কারণ, এ দিনে ইয়াহুদী ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায় সাওম পালন করে।
ইয়াহুদীরা এ বিষয়ে সম্যক অবগত ছিল যে, চলমান সময়ই হচ্ছে আখেরী যামানার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনের পূর্ব ঘোষিত সময় এবং তারা এ কথাও খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিল যে, এ মুহাম্মাদই হচ্ছেন সেই শেষ রাসূল যার সম্পর্কে তারা তাওরাতে জানতে পেরেছিল। কেননা শেষ রাসূল সম্পর্কে তাদের কিতাবে বর্ণিত সকল নিদর্শন ও সু-সংবাদ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে সমন্বিত হয়েছিল। শুধু তাই নয় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে খুব বিনম্র ও হৃদয়গ্রাহী আচরণ করতেন। এতো কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ইয়াহুদীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যানের কী কারণ থাকতে পারে?!
বাস্তবিক অবস্থা ছিল ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে মাত্র কিছু সংখ্যক লোক রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীকার করেছিল। বাকী বৃহৎ অংশ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ ও তাঁকে অস্বীকার করার ব্যাপারে একেবারে লজ্জাস্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের এহেন হাস্যকর পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে ইয়াহুদীদের পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণের সময় তাদের উদ্ভট আচরণ। যেমন,
ইয়াহুদী পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবন সালাম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সুদৃঢ় ধারনা লাভের জন্য তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল,
إِنِّي سَائِلُكَ عَنْ ثَلاثٍ لَا يَعْلَمُهُنَّ إِلَّا نَبِيٌّ قَالَ : مَا أَوَّلُ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ؟ وَمَا أَوَّلُ طَعَامٍ يَأْكُلُهُ أَهْلُ الجَنَّةِ؟ وَمِنْ أَيِّ شَيْءٍ يَنْزِعُ الوَلَدُ إِلَى أَبِيهِ؟ وَمِنْ أَيِّ شَيْءٍ يَنْزِعُ إِلَى أَخْوَالِهِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَبَّرَنِي بِهِنَّ آنِفًا جِبْرِيلُ قَالَ: فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ ذَاكَ عَدُوٌّ اليَهُودِ مِنَ المَلَائِكَةِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " أَمَّا أَوَّلُ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ فَنَارُ تَحْشُرُ النَّاسَ مِنَ المَشْرِقِ إِلَى المَغْرِبِ، وَأَمَّا أَوَّلُ طَعَامٍ يَأْكُلُهُ أَهْلُ الْجَنَّةِ فَزِيَادَةُ كَبِدِ حُوتٍ، وَأَمَّا الشَّبَهُ فِي الوَلَدِ: فَإِنَّ الرَّجُلَ إِذَا غَشِيَ المَرْأَةَ فَسَبَقَهَا مَاؤُهُ كَانَ الشَّبَهُ لَهُ، وَإِذَا سَبَقَ مَاؤُهَا كَانَ الشَّبَهُ لَهَا " قَالَ : أَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ اللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ اليَهُودَ قَوْمٌ بُهُتُ، إِنْ عَلِمُوا بِإِسْلَامِي قَبْلَ أَنْ تَسْأَلَهُمْ بَهَتُونِي عِنْدَكَ، فَجَاءَتِ اليَهُودُ وَدَخَلَ عَبْدُ اللَّهِ البَيْتَ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَيُّ رَجُلٍ فِيكُمْ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَلَامٍ» قَالُوا أَعْلَمُنَا، وَابْنُ أَعْلَمِنَا، وَأَخْيَرُنَا، وَابْنُ أَخْيَرِنَا، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفَرَأَيْتُمْ إِنْ أَسْلَمَ عَبْدُ اللَّهِ قَالُوا: أَعَادَهُ اللَّهُ مِنْ ذَلِكَ، فَخَرَجَ عَبْدُ اللَّهِ إِلَيْهِمْ فَقَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، فَقَالُوا: شَرُّنَا، وَابْنُ شَرِّنَا، وَوَقَعُوا فِيهِ».
"আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই যার উত্তর নবী ছাড়া আর কেউ অবগত নয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন কী? আর সর্বপ্রথম খাবার কী, যা জান্নাতবাসী খাবে? আর কী কারণে সন্তান তার পিতার সাদৃশ্য লাভ করে? আর কিসের কারণে (কোনো কোনো সময়) তার মামাদের সাদৃশ্য হয়? তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এইমাত্র জিবরীল আলাইহিস সালাম আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। (বর্ণনাকারী বলেন) তখন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, সে তো ফিরিশতাগণের মধ্যে ইয়াহুদীদের শত্রু। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো আগুন, যা মানুষকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে তাড়িয়ে নিয়ে একত্রিত করবে। আর প্রথম খাবার যা জান্নাতবাসীরা খাবেন তা হলো মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান সদৃশ হওয়ার রহস্য হলো পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে তখন যদি পুরুষের বীর্যের পূর্বে স্খলিত হয় তখন সন্তান তার সাদৃশ্যতা লাভ করে। তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি-নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এরপর তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইয়াহুদীরা অপবাদ ও কুৎসা রটনাকারী সম্প্রদায়। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করার পূর্বে তারা যদি আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয় জেনে ফেলে, তাহলে তারা আপনার কাছে আমার কুৎসা রটনা করবে। তারপর ইয়াহুদীরা এলো এবং আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু ঘরে প্রবেশ করলেন (লুকিয়ে গেলেন)। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যাক্তির পুত্র। তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যাক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যাক্তির পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি আব্দুল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করে, এতে তোমাদের অভিমত কী হবে? তারা বলল, এর থেকে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করুন। এমন সময় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাদের সামনে বের হয়ে আসলেন এবং বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তখন তারা বলতে লাগল, সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাক্তির সন্তান এবং তারা তাঁর গীবত ও কুৎসা রটনায় লিপ্ত হয়ে গেল।"53
মূলত ইয়াহুদীদের এ ধরনের উদ্ভট আচরণের আসল কারণ ছিল কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সরাসরি মহা সত্য থেকে প্রত্যাবর্তন করা। শুধুমাত্র মহা সত্যকে অস্বীকার করার জন্যই তাদের এ অস্বীকার।
প্রিয় পাঠক ইয়াহূদীদের এরূপ ঘটনার বিবরণ আমরা আরো দেখতে পাই যখন তাদের একটি দল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতা ও জ্ঞানের গভীরতা যাচাই কার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করল এবং জবাব শোনার পর এগুলো যুক্তিহীন, তুচ্ছ ও অবান্তর প্রমাণ বলে বাহানা করল যেন রাসূলের সত্যতাকে স্বীকার করে নিতে না হয়। যেমন,
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أَقْبَلَتْ يَهُودُ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالُوا : يَا أَبَا الْقَاسِمِ إِنَّا نَسْأَلُكَ عَنْ خَمْسَةِ أَشْيَاءَ، فَإِنْ أَنْبَأْتَنَا بِهِنَّ، عَرَفْنَا أَنَّكَ نَبِيٌّ وَاتَّبَعْنَاكَ ، فَأَخَذَ عَلَيْهِمْ مَا أَخَذَ إِسْرَائِيلُ عَلَى بَنِيهِ، إِذْ قَالُوا: اللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ، قَالَ: «هَاتُوا» قَالُوا: أَخْبِرْنَا عَنْ عَلَامَةِ النَّبِيِّ، قَالَ: «تَنَامُ عَيْنَاهُ وَلَا يَنَامُ قَلْبُهُ قَالُوا: أَخْبِرْنَا كَيْفَ تُؤَنَّثُ الْمَرْأَةُ، وَكَيْفَ تُذْكِرُ؟ قَالَ: «يَلْتَقِي الْمَاءَانِ، فَإِذَا عَلَا مَاءُ الرَّجُلِ مَاءَ الْمَرْأَةِ أَذْكَرَتْ، وَإِذَا عَلَا مَاءُ الْمَرْأَةِ مَاءَ الرَّجُلِ آنَثَتْ قَالُوا: أَخْبِرْنَا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ؟ قَالَ: "كَانَ يَشْتَكِي عِرْقَ النَّسَاءِ فَلَمْ يَجِدُ شَيْئًا يُلائِمُهُ إِلَّا أَلْبَانَ كَذَا وَكَذَا - قَالَ أَبِي: "قَالَ بَعْضُهُمْ: يَعْنِي الْإِبِلَ فَحَرَّمَ لُحُومَهَا»، قَالُوا : صَدَقْتَ، قَالُوا: أَخْبِرْنَا مَا هَذَا الرَّعْدُ؟ قَالَ: «مَلَكُ مِنْ مَلَائِكَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ مُوَكَّلٌ بِالسَّحَابِ بِيَدِهِ - أَوْ فِي يَدِهِ - مِخْرَاقٌ مِنْ نَارٍ، يَزْجُرُ بِهِ السَّحَابَ، يَسُوقُهُ حَيْثُ أَمَرَ اللهُ قَالُوا : فَمَا هَذَا الصَّوْتُ الَّذِي نَسْمَعُ؟ قَالَ: «صَوْتُهُ» قَالُوا: صَدَقْتَ، إِنَّمَا بَقِيَتْ وَاحِدَةٌ وَهِيَ الَّتِي نُبَايِعُكَ إِنْ أَخْبَرْتَنَا بِهَا، فَإِنَّهُ لَيْسَ مِنْ نَبِيَّ إِلا لَهُ مَلَكُ يَأْتِيهِ بِالْخَبَرِ، فَأَخْبِرْنَا مَنْ صَاحِبِكَ؟ قَالَ: «جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ ، قَالُوا: جِبْرِيلُ ذَاكَ الَّذِي يَنْزِلُ بِالْحَرْبِ وَالْقِتَالِ وَالْعَذَابِ عَدُونَا، لَوْ قُلْتَ: مِيكَاثِيلَ الَّذِي يَنْزِلُ بِالرَّحْمَةِ وَالنَّبَاتِ وَالْقَطْرِ، لَكَانَ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: مَن كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ) [البقرة: .[٩٧
"একবার কতক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বলল, হে আবুল কাসিম, আমরা আপনাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করব। যদি আপনি সেসব বিষয়ে আমাদেরকে অবহিত করতে পারেন তাহলে আমরা বুঝে নিব যে, আপনি সত্য নবী এবং আমরা আপনার অনুসারী হয়ে যাব।
তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থেকে এমন অঙ্গীকার নিলেন যেমনটি নিয়ে ছিলেন ইসরাঈল (ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) তার সন্তানদের থেকে। যখন বনী ইসরাঈল (ইয়াকুব পুত্রগণ) বলল: আমরা যা বলছি তার ওপর আল্লাহই সাক্ষী।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: প্রশ্ন করো।
তারা বলল: আমাদেরকে সত্য নবীর নিদর্শন সম্পর্কে বলুন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার দু'চোখ ঘুমায় কিন্তু অন্তর ঘুমায় না।
তারা বলল: একজন মহিলা কীভাবে কন্যা ও পুত্র সন্তান জন্ম দেয়?
তিনি বললেন: স্বামী-স্ত্রীর পানি যখন এক সাথে মিলিত হয় আর যখন পুরুষের পানি স্ত্রীর পানির পূর্বে স্খলিত হয় তখন পুত্র সন্তান জন্ম দেয়। আর যদি স্ত্রীর পানি পুরুষের পানির পূর্বে স্খলিত হয় তখন কন্য সন্তান জন্ম দেয়।
তারা বলল: আমাদেরকে বলুন যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিজের জন্য কী হারাম করেছিলেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তিনি (عرق النسا) এক প্রকার বাথ) রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং এ জন্য তিনি অমুক প্রাণীর দুধ ছাড়া আর কিছুকে তিনি দোষতেন না। (আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ বলেন, আমার বাবা বলেছেন, তাদের অনেকে বলেন, অমুক বলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটকে বুঝিয়েছেন।) তাই তিনি উটের গোশত নিজের জন্য হারাম করেছিলেন।
তারা বলল: আপনি সত্য বলেছেন।
অতঃপর তারা বলল: আমাদেরকে বলুন যে, الرعد (বজ্রপাত) কী? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর একজন ফিরিশতা যিনি মেঘমালা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত, তার হাতে আগুনের একটি ছড়ি থাকে, যা দিয়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশে মেঘমালোকে বিভিন্ন স্থানে তাড়িয়ে নিয়ে যান।
তারা বলল: যে শব্দটি শোনা যায়-তা কিসের শব্দ? তিনি বললেন সেই ছড়ির শব্দ।
তারা বলল: আপনি সত্য বলেছেন। আর একটি মাত্র প্রশ্ন বাকী আছে, এর উত্তর দিতে পারলেই আমরা আপনার হাতের বাই'আত হব আর তা হচ্ছে প্রত্যেক নবীর কাছেই বার্তাবাহক একজন ফিরিশতা আসেন, আপনার কাছে কোন ফিরিশতা আসেন?
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: জিবরীল আলাইহিস সালাম।
তারা বলল: জিবরীল!!?? সে তো ঐ ফিরিশতা, যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও শান্তি নিয়ে আগমন করে। সে আমাদের শত্রু!! যদি আপনি বলতেন মিকাঈল যিনি রহমত, উদ্ভিদ ও বৃষ্টি অবতরণ করেন তাহলে ভালো হতো। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন:
مَن كَانَ عَدُوًّا لِجِبْرِيلَ [البقرة: ٩٧]
"যে জিবরীলের শত্রু” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৯৭]54
ইয়াহুদ সম্প্রদায়ের এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন পরিস্থিতির অবতারণার আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন সাফওয়ান ইবন আসসাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু। তিনি বলেন,
قال يهودي لصاحبه اذهب بنا إلى هذا النبي فقال صاحبه لا تقل نبي إنه لو سمعك كان له أربعة أعين !!
فأتيا رسول الله صلى الله عليه وسلم فسألاه عن تسع آيات بينات فقال لهم لا تشركوا بالله شيئا ولا تسرقوا ولا تزنوا ولا تقتلوا النفس التي حرم الله إلا بالحق ولا تمشوا ببريء إلى ذي سلطان ليقتله ولا تسحروا ولا تأكلوا الربا ولا تقذفوا محصنة ولا تولوا الفرار يوم الزحف وعليكم خاصة اليهود أن لا تعتدوا في السبت.
قال: فقبلا يده ورجله، فقالا نشهد أنك نبي!!
قال: فما يمنعكم أن تتبعوني ؟
قالا : إن داود دعا ربه أن لا يزال في ذريته نبي، وإنا نخاف إن تبعناك أن تقتلنا اليهود».
“এক ইয়াহুদী তার এক সঙ্গীকে বলল, আমাকে এ নবীর কাছে নিয়ে চল। সঙ্গীটি বলল: নবী বলবে না। তিনি যদি তা শুনতে পান তবে তো তার চক্ষু (খুশীতে) আটখানা হয়ে পড়বে। তারা উভয়েই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলো এবং তাঁকে নয়টি সুস্পষ্ট নিদর্শন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তিনি তাদের বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কিছুর শরীক করবে না। চুরি করবে না, যিনা করবে না, যে প্রাণ হত্যা করা অল্লাহ্ হারাম করেছেন কোনো হক ব্যতিরেকে সে প্রাণকে হত্যা করবে না, হত্যার উদ্দেশ্যে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ক্ষতাসীনের কাছে নিয়ে যাবে না, যাদু টোনা করবে না, সুদ খাবে না, নিষ্পাপ মহিলাকে অপবাদ দিবে না, যুদ্ধের ময়দান থেকে পিঠ ফিরায়ে পলায়ন করবে না। আর হে ইয়াহূদীগণ! বিশেষ করে তোমাদের জন্য কথা হলো, তোমরা শনিবারের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করবে না।
সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, তখন তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'হাত ও দু'পায়ে চুম্বন করে বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্যই নবী। তিনি বললেন, তাহলে আমার অনুসরণ করতে তোমাদেরকে কিসে বাধা দিচ্ছে?
তারা বলল, নবী দাউদ আলাইহিস সালাম স্বীয় রবের কাছে প্রার্থনা করেছেন যে, যেন তার বংশধরদের মাঝে নবী আসতে থাকে। মূলত আমরা ভয় পাচ্ছি যদি আমরা আপনার অনুসরণ করি তাহলে ইয়াহূদী নেতৃবর্গ আমাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। "56
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত হাদীসের আলোকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ঐ দুই ইয়াহুদী নিজেদের জীবননাশের ভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম গ্রহণকে অস্বীকার করল। বস্তুত তখন সাধারণ ইয়াহুদীদের অবস্থাটা ছিল নিম্নরূপ:
কিছুসংখ্যক তীব্র বিদ্বেষের কারণে আর কথক নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য, বাকীরা স্বগোত্রীয় কর্তাদের দ্বারা নিজেদের প্রাণনাশের ভয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইসলামের প্রতি মিথ্যারোপ করতো। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সূচনা থেকে রাসূলের ব্যাপারে এমনটাই হলো ইয়াহুদীদের চিরাচরিত অবস্থান।
এ ক্ষেত্রে হুয়াই ইবন আখতাব কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণের ঘটনাটিকেও আমরা ভুলে যেতে পারি না। যার বিবরণ পেশ করতে গিয়ে সূফিয়া বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু 'আনহা বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: "আমার পিতা ও চাচার সন্তানদের মাঝে তাদের নিকট আমার চেয়ে অধিক প্রিয়পাত্র আর কেউই ছিল না। আমার বাবা-চাচাদের সাথে যখনই আমার সাক্ষাত হত এবং এতে আমি হর্ষোৎফুল্ল হতাম তখনই তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাদ দিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতো। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু আমর ইবন আউফ-এর মহল্লা কুবাতে আসলেন তখন তারা দু'জনও (আমার বাবা-চাচা, আবু ইয়াইসর ইবন হুয়াই) অন্ধকারে চুপিসারে সালুল্লাহ সালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে অগ্রসর হলো। আল্লাহর কসম! আমার বাপ-চাচারা কখনো সূর্য ডুবার আগে কখনো আমাদের কাছে আসতো না। সে দিনও তারা উদাসীন ও অলসভাবে ধীরপদে আমাদের কাছে আসল। আমি তাদের উপস্থিতি দেখে উৎফুল্ল হলাম যেমনটা আমি সব সময়ই হতাম। অতঃপর আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, তাদের দু'জনের কেহই আমাকে এখনো দেখে নি।
এমন্থাবস্থায় আমি শুনতে পেলাম যে, আমার চাচা আবু ইয়াসির আমার পিতাকে বলছে, এ মুহাম্মাদই কি সেই ব্যক্তি?! (যার সম্পের্ক তাওরাতে বিবরণ রয়েছে)
পিতা জবাবে বললেন, আল্লাহর শপথ! এ মুহাম্মদই সেই ব্যক্তি!!
চাচা বললেন, আপনি কি তার গুণাবলী এবং নিদর্শনসমূহ দ্বারা তাকে চিনেছেন?
পিতা বললেন, আল্লাহর শপথ! হ্যাঁ!!
চাচা বললেন, তাঁর ব্যাপারে আপনার নিজস্ব সিদ্ধান্ত কী?
পিতা বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন তার শত্রুতা ও বিরোধিতাই আমার সিদ্ধান্ত। "57
এধরনের একরোখা ও বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতির বদলা নেওয়ার মানসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন?! নিজেকে স্বীকৃতি প্রদান বা স্বীয় দীনের ওপর ঈমান আনয়নের জন্য কি কারো ওপর জোড়জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করেছেন?
বরং বাস্তবচিত্র তো হলো ইসলাম এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিষয়সমূহ স্বচ্ছ ও নির্মলভাবে সকলের সামনে প্রকাশিত হওয়ার পরও, ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতা ও বিশ্বস্থতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত -এ কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ও অপরাপর সকলে জানা সত্বেও তিনি তাদের কোনো একজনকেও নিজের ওপর ঈমান আনতে ও তাঁকে সত্যায়ণ করতে বাধ্য করেন নি। অথচ তাঁর বল-প্রয়োগ করার মতো যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় ছিল এবং মুসলিমদের তরবারীসমূহ তাঁর একটি ইশারার অপেক্ষায় ছিল।
বস্তুত রাসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো সেই মহান নীতির ওপর অটল ছিলেন, যে নীতির কোনো পরিবর্তন নেই। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, ﴿ لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ﴾ [البقرة: ٢٥٦] "দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৬]
ইয়াহুদী সম্প্রদায় শুধু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীকার না করা বা মেনে না নেওয়াতেই কি সীমাবদ্ধ থেকেছে?! না, রবং বাস্তবিক প্রেক্ষাপট ছিল সম্পর্ণ তার ব্যতিক্রম। কেননা তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা ও শত্রুতামূলক অবস্থান গ্রহণ করে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ কুরআনের ওপর নানা রকম উদ্ভট সন্দেহমূলক মন্তব্য চড়াতে থাকে এবং সাধারণ মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরানোর জন্যে বিভিন্ন রকম চক্রান্ত ও কটকৌশল শুরু করে।
শুধু তাই নয়, এর চেয়েও কৌতুহলোদ্দীপক কথা হচ্ছে এ যে, ইয়াহূদীদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মদীনার অলিতে-গলিতে বিচরণ করে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে সাধারণ মানুষের মাঝে এ মর্মে সাবধান বাণী প্রচার করতে লাগল যে, এ ব্যক্তি সেই রাসূল নয়, যার বিবরণ তাদের তাওরাত গ্রন্থে রয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে এরাই লোকদেরকে এ রাসূলের আগমনের সু-সংবাদ প্রদান করতো। এমনকি বিখ্যাত সাহাবী মা'আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তো একবার ইয়াহূদীদের সম্বোধন করে বললেন, 'হে ইয়াহূদী যুবকগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর' কেননা আমরা শির্ক-এ নিমজ্জিত থাকা অবস্থায় তোমরা যখন ইয়াহূদী পণ্ডিতগণকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পের্ক জিজ্ঞাসা করতে তখন তারা আমাদেরকে এ মর্মে অবহিত করতো যে, তিনি অতিসত্বর প্রেরিত হবেন এবং আমাদের সামনে প্রেরিতব্য রাসূলের সেই নিদর্শন ও গুণাবলী উপস্থাপন করতো, যেগুলো এ (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মাঝে বিদ্যমান রয়েছে!! তখন ইয়াহূদী পণ্ডিত সালাম ইবন মাশকাম তার জবাবে বললো, এ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের কাছে কোনো কিছু নিয়ে প্রেরিত হয় নি, আমরা তাকে চিনি, মূলত সে ঐ রাসূলই নয়, যার ব্যাপারে আমরা তোমাদেরক অবহিত করতাম।
অতঃপর এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ১৪ ﴿وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَابٌ مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَّا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُم مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ، فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكَافِرِينَ ﴾ [البقرة: ٨٩]
"আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহরপক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এলো আর তারা (এর মাধ্যমে) পূর্বে কাফিরদের ওপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এলো যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব, কাফিরদের ওপর আল্লাহর লা'নত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮৯]
অনুরূপভাবে তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণের পথ হিসেবে আরো নানান প্রকার ঘৃন্যতম পরিকল্পনা গ্রহণ করল যেগুলোর নেতৃত্বে থাকতো আব্দুল্লাহ ইবন ছাঈফ, আদী ইবন যায়েদ ও হারিস ইবন আওফ-এর মতো শীর্ষ পর্যায়ের ইয়াহূদী ব্যক্তিবর্গ। তারা বলত, চল আমরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর সকালে ঈমান আনি অতঃপর সন্ধায় তা অস্বীকার করি, যাতে তাদের দীনের ওপর আমরা একটি আবরণী এঁকে দিতে পারি। তাহলে আশা করি (তাঁর ওপর যারা ঈমান এনেছে) তারাও বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের মতো কাজ করবে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দীন থেকে ফিরে আসবে। তাদের এহেন অপকৌশলের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন, 59
﴿ وَقَالَت طَّائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ ءَامِنُوا بِالَّذِي أُنزِلَ عَلَى الَّذِينَ ءَامَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا ءَاخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ وَلَا تُؤْمِنُوا إِلَّا لِمَن تَبِعَ دِينَكُمْ قُلْ إِنَّ الْهُدَىٰ هُدَى اللَّهِ أَن يُؤْتَى أَحَدٌ مِّثْلَ مَا أُوتِيتُمْ أَوْ يُحَاجُّوكُمْ عِندَ رَبِّكُمْ قُلْ إِنَّ الْفَضْلَ بِيَدِ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ﴾ [آل عمران: ۷۲، ۷۳]
"আর কিতাবীদের একদল বলে, মুমিনদের ওপর যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার প্রতি দিনের প্রথমভাগে ঈমান আন আর শেষ ভাগে তা অস্বীকার কর, যাতে তারা ফিরে আসে।
আর তোমরা কেবল তাদেরকে বিশ্বাস কর, যারা তোমাদের দীনের অনুসরণ করে। বল, 'নিশ্চয় আল্লাহর হিদায়াতই হিদায়াত। এটা এ জন্য যে, কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া হবে যেরূপ তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। অথবা তারা তোমাদের রবের নিকট তোমাদের সাথে বিতর্ক করব'। বল, নিশ্চয় অনুগ্রহ আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে চান, তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭২-৭৩]
ইয়াহুদীদের অপতৎপরতার আরেকটি উদারহরণ হচ্ছে মদীনায় আনসারদের মাঝে পরস্পরে কলহ-বিবাদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে তারা বিভিন্ন চক্রান্তের অপচেষ্টা চালাত। কট্টর মুসলিম বিরোধী ইয়াহূদী শাশ ইবন কায়েস তো সদা আওস এবং খাযরাজ গোত্রের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছড়াতেই ব্যস্ত থাকত। এ ঘটনাটি আল্লামা ইবন হিশাম তার সীরাত গ্রন্থে ইবন ইসহাকের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। 61
অতঃপর ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করতে করতে পূর্বোক্ত সকল অপকৌশলের সীমা অতিক্রম করে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার ওপর জঘন্য ও লজ্জাঙ্কর মন্তব্যারোপ করা শুরু করল। তারা বলতে লাগল, 'আল্লাহ হত-দরিদ্র অথচ আমরা ধনবান'। তাদের এহেন ঘৃন্য মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বললেন,
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍ وَنَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ ﴾ [آل عمران: ۱۸۱]
"নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, 'নিশ্চয় আল্লাহ দরিদ্র এবং আমরা ধনী'। অচিরেই আমি লিখে রাখব তারা যা বলেছে এবং নবীদেরকে তাদের অন্যায়ভাবে হত্যার বিষয়টিও এবং আমি বলব, 'তোমরা উত্তপ্ত 'আযাব আস্বাদন কর।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮১]
এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আবু ইসহাকের সূত্রে ইবন হিশামের সীরাত গ্রন্থেআলোচিত হয়েছে। অনুরূপ অন্য গ্রন্থেও এর বিবরণ রয়েছে।
প্রিয় পাঠক! ইয়াহুদীদের জিজ্ঞাসা সুলভ মানসিকতার এখানেই শেষ নয়; বরং আরো একধাপ এগিয়ে (যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা-র ভিত্তিতে) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকৃতি ও তাঁর ওপর মিথ্যারোপ করাকে আরো তরান্বিত করতে নবী সুলাইমান আলাইহি ওয়াসাল্লামের-এর নবুয়তকেও জোরপূর্বক মিথ্যারোপ করে বসল। (কারণ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে নবী বলে মানেন) অথচ সুলইমান আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাদশাহী ও নবুওয়াতী একত্রে প্রাপ্ত হওয়ার কারণে ইয়াহূদীদের মতেও শ্রেষ্ঠতম নবী হিসেবে গণ্য হতেন। তারা দাবী করে বসল যে, সুলাইমান তো নবী নন; বরং একজন যাদুকর ছিল। যেমন কথক ইয়াহূদী পণ্ডিত বলে, "তোমরা কি মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ ধারনার ব্যাপারে আশ্চর্যবোধ কর না যে, সে মনে করে সুলাইমান একজন নবী ছিল। আল্লাহর শপথ সুলাইমান তো যাদুকর বৈ কিছুই ছিল না। ”65
তাদের এ জঘন্য মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ ) [البقرة: ١٠٢]
"আর সুলাইমান কুফুরী করে নি; বরং শয়তানরা কুফুরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১০২]
রাসূলের বিরোধিতায় এমন ধরনের নৃশংসতায়ও ইয়াহূদীদের মনের ঝাল মিঠে নি; বরং আরো ঘৃণ্যতম অপকর্মে তারা জড়িত হয়েছে। তারা মুশরিক এবং মূর্তিপূজকদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী মুসলিমগণের ওপর মর্যাদায় অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ ءَامَنُوا سَبِيلًا ﴾ [النساء: ٥١]
"তুমি কি তাদেরকে দেখ নি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছে? তারা জিবত ৬৬ ও তাগুতের প্রতি ঈমান আনে এবং কাফিরদেরকে বলে, এরা মুমিনদের তুলনায় অধিক সঠিক পথপ্রাপ্ত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫১]
ইয়াহুদীদের এতসব অপতৎপরতা ও চক্রান্ত বিস্তারের পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসকি হেসে তাদের সাথে সামাজিক আচার সম্পাদক করতেন। তাদের অস্থিত্বকেও তিনি অস্বীকার করতেন না। তারা আহলে কিতাব হওয়া এবং তাদের স্বীকৃতিতেও তিনি নেতিবাচক মানসিকতা পোষন করতেন না।
প্রিয় সুধী মহল! এমনটাই হলো অন্যদের ক্ষেত্রে মহান শাশ্বত ধর্ম ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামের ক্ষেত্রে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি। যাতে আপনার নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের মধ্যকার ফাঁকা সদৃশ পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে!!
**মুসলিমদেরকে স্বীকৃতি প্রদানে খ্রিস্টানদের অবস্থান:**
প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বীকৃতি প্রদান প্রশ্নে খ্রিস্টানদের মানসিকতায়ও ইয়াহুদীদের থেকে ভালো কোনো অবস্থান ছিল না। তবে হ্যাঁ! খৃস্টানদের বিরোদ্ধাচারণে ইয়াহূদীদের মতো এতো জঘন্য কোনো চক্রান্ত ছিল না। ইয়াহুদীদের থেকে যেমন ঘৃণ্যতম ঈর্ষা, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে খ্রিস্টানদের বেলায় তা এতো জটিল ছিল না। তথাপি সর্বোপরি হতাশাব্যাঞ্জক কথা একটাই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে খ্রিস্টানদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন তারা সেভাবে রাসূলকে মেনে নিতে বা স্বীকৃতি দিতে পারে নি।
ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা দেখেত পেয়েছি যে, খ্রিস্টান রাজা রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে সে জ্ঞাত হলো এবং সে এমন সব বিষয়াদী অবহিত হলো যার দরুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশই থাকে না। শুধু তাই নয় বরং হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পের্ক এক আশচর্যজনক মন্তব্য করল। আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাথে দীর্ঘ কথোপকথনের পর হিরাক্লিয়াস তাকে বলল, 'তুমি ঐ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্বন্ধে যা বলছ তা যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে অতি সত্বর সে আমার দু'পা রাখার স্থানটুকুরও মালিক হবে অথচ আমি জানতাম যে, শেষ নবী কুরাইশের বাইরে থেকে হবেন এবং আমি এ ধারনাও করতাম না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন। যদি আমি এ কথা জানেত পারি যে, তাঁর কাছে গেলে মুক্তি পাব, তাহলে তাঁর সাক্ষাতপ্রাপ্ত হবার জন্য সকল কষ্ট সহ্য করে নিতাম এবং তার দর্শন পেলে আমি তার পা ধুয়ে দিতাম'। (উত্তম সেবা করতাম)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের ব্যাপারে এমন সু-উচ্চ ধারনা এবং মহান মর্যাদা দানের পরও হিরাক্লিয়াসের অবস্থান কী ছিল?! সে কি পেরেছিল ইসলামকে মেনে নিতে?!
বাস্তবতা হচ্ছে, এ রোম সম্রাটই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্ধশায় তাঁর বিরুদ্ধে ও পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। মুতা ও তাবুকে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য রোমান সৈন্য প্রেরণ করেছে। আরব উপ-দ্বীপের খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলোকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর একটানা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে।
আরেক খ্রিস্টান-মিসরের কিবতী সম্প্রদায়ের নেতা মুক্বাওক্কিসের অবস্থানও হিরাক্লিয়াস থেকে খুব ভিন্নতর কিছু ছিল না। কেননা সে এমন এক ব্যক্তি যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে এমন সব কথা বলত, যাতে রাসূলকে সত্য নবী বলে মেনে নিয়েছে বলে অনুমিত হতো। শুধু তাই নয় বরং সে হাতিব ইবন আবী বালতা'আহ এর মাধ্যেম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য উপঢৌকন প্রেরণ করেছে। এত কিছুর পরও যখন ইসলামী সৈন্য মিসরের সীমানায় প্রবেশ করল তখন সে রোমানদের সাথে হাত মিলিয়ে মুসলিমদেরকে প্রতিরোধ ও তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য অবস্থান গ্রহণ করলো। অথচ এ মুক্বাওকিসই মিসরের দখলদারিত্ব থেকে রোমানদেরকে উৎখাত করেছে। যা পরবর্তী ছয়শত বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল!!
নাজরানের খ্রিস্টানদের অবস্থা তো সর্বজনবিধিত বরং; তারা নিজেরাই নিজেদের অবস্থানের সাক্ষী। কেননা তারা খুব ভালো করেই জানত যে, তিনিই প্রেরিত শেষ নবী। খ্রিস্টান দলপতিগণ যখন তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অভিসম্পাতের আহ্বান করত, তখন তারা এ ভয়ে তা করা থেকে বিরত থাকত যে, এমনটি করলে আল্লাহর 'আযাব বর্ষিত হবে। তথাপী তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত ও তাঁর দীনকে মেনে নেয় নি!!
**মুশিরকদের অবস্থান:**
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক স্বীকৃতি প্রদানে মুশরিকদের ভূমিকার ব্যাখ্যা বা বর্ণনায় মূলত নতুন করে বলার কিছু নেই। কেননা দীর্ঘসময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারপাশে নিরাপদ সহাবস্থানের পরও তারা তাঁকে স্বীকার করে নিতে পুরোপুরী অস্বীকার করেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের প্রতি মুশরিকদের বিরূপ আচরণের প্রভাব নিয়ে শত-সহস্র গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এমনকি যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করলেন তখনো তিনি মদীনার মুশরিকদের সাথে অতীব বিনম্র আচরণ করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কারো ওপর কোনো ধরনের বল-প্রয়োগ করেন নি; বরং তিনি বিনম্র ব্যবহার করে তাদরকে কাছে টানতে চাইতেন। অথচ মুশরিকরা সর্বদা তাঁর বিরোধিতা করে গিয়েছে।
এ বিষয়ের প্রামাণিকতার জন্যে আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ ঘটনার চেয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাই না যে ঘটনায় তিনি এমন একটি মজলিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যাতে মুসলিম, মুশরিক, মূর্তিপূজক ও ইয়াহুদীরা সম্মিলিত হয়েছে.........................ইমাম বুখারী উসামা ইবন যায়েদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেন,
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَكِبَ حِمَارًا عَلَيْهِ إِكَافُ تَحْتَهُ قَطِيفَةٌ فَدَكِيَّةٌ وَأَرْدَفَ وَرَاءَهُ أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ وَهُوَ يَعُودُ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ فِي بَنِي الْحَارِثِ بْنِ الْخَزْرَجِ وَذَلِكَ قَبْلَ وَقْعَةِ بَدْرٍ حَتَّى مَرَّ فِي مَجْلِسٍ فِيهِ أَخْلَاطُ مِنْ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُشْرِكِينَ عَبَدَةِ الْأَوْثَانِ وَالْيَهُودِ وَفِيهِمْ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُبَيَ ابْنُ سَلُولَ وَفِي الْمَجْلِسِ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ فَلَمَّا غَشِيَتْ الْمَجْلِسَ عَجَاجَةُ الدَّابَّةِ خَمَّرَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُتِيَ أَنْفَهُ بِرِدَابِهِ ثُمَّ قَالَ لَا تُغَبِّرُوا عَلَيْنَا فَسَلَّمَ عَلَيْهِمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ وَقَفَ فَنَزَلَ فَدَعَاهُمْ إِلَى اللَّهِ وَقَرَأَ عَلَيْهِمُ الْقُرْآنَ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أُبَيَ ابْنُ سَلُولَ أَيُّهَا الْمَرْءُ لَا أَحْسَنَ مِنْ هَذَا إِنْ كَانَ مَا تَقُولُ حَقًّا فَلَا تُؤْذِنَا فِي مَجَالِسِنَا وَارْجِعْ إِلَى رَحْلِكَ فَمَنْ جَاءَكَ مِنَّا فَاقْصُصْ عَلَيْهِ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رَوَاحَةَ اغْشَنَا فِي مَجَالِسِنَا فَإِنَّا نُحِبُّ ذَلِكَ فَاسْتَبَّ الْمُسْلِمُونَ وَالْمُشْرِكُونَ وَالْيَهُودُ حَتَّى هَمُّوا أَنْ يَتَوَاثَبُوا فَلَمْ يَزَلْ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُخَفِّضُهُمْ ثُمَّ رَكِبَ دَابَّتَهُ حَتَّى دَخَلَ عَلَى سَعْدِ بْنِ عُبَادَةَ فَقَالَ أَيْ سَعْدُ أَلَمْ تَسْمَعْ إِلَى مَا قَالَ أَبُو حُبَابٍ يُرِيدُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أُبَي قَالَ كَذَا وَكَذَا قَالَ اعْفُ عَنْهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَاصْفَحْ فَوَاللَّهِ لَقَدْ أَعْطَاكَ اللهُ الَّذِي أَعْطَاكَ وَلَقَدْ اصْطَلَحَ أَهْلُ هَذِهِ الْبُحْرَةِ عَلَى أَنْ يُتَوِّجُوهُ فَيُعَصِّبُونَهُ بِالْعِصَابَةِ فَلَمَّا رَدَّ اللهُ ذَلِكَ بِالْحَقِّ الَّذِي أَعْطَاكَ شَرِقَ بِذَلِكَ فَذَلِكَ فَعَلَ بِهِ مَا رَأَيْتَ فَعَفَا عَنْهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
"একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি গাধার উপর সাওয়ার হলেন, যার জিনের নিচে ফাদাকের তৈরি একখানি চাদর ছিল। তিনি উসামা ইবন যায়দকে নিজের পেছনে বসিয়ে ছিলেন। তখন তিনি হারিস ইবন খাযরাজ গোত্রের সা'দ ইবন উবাদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখাশোনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। এটি ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বের ঘটনা।
তিনি এমন এক মজলিসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেখানে মুসলিম, মুশরিক, ইয়াহূদী ও প্রতিমাপূজক সবাই ছিল। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলও ছিল। আর এ মজলিসে আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু 'আনহুও উপস্থিত ছিলেন। যখন সাওয়ারীর পদাঘাতে উড়ন্ত ধূলাবালী মজলিসকে ঢেকে ফেলছিল তখন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই তার চাদর দিয়ে তার নাক ঢাকল।
তারপর বলল, তোমরা আমাদের উপর ধুলাবালু উড়িওনা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সালাম দিলেন। তারপর এখানে থামলেন ও সাওয়ারী থেকে নেমে তাদের আল্লাহর প্রতি আহ্বান করলেন এবং তাদের কাছে কুরআন পাঠ করলেন। তিনি আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল বলল, হে আগত ব্যাক্তি! আপনার এ কথার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই? তবে আপনি যা বলছেন, যদিও তা সত্য, তবুও আপনি আমাদের মজলিসে এসব বলে আমাদের বিরক্ত করবেন না। আপনি আপনার নিজ ঠিকানায় ফিরে যান। এরপর আমাদের মধ্য থেকে কেউ আপনার নিকট গেলে তাকে এসব কথা বলবেন।
তখন ইবন রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাদের মজলিসে আসবেন, আমরা এসব কথা পছন্দ করি। তখন মুসলিম, মুশরিক ও ইয়াহুদীদের মধ্যে পরস্পর গালাগালি শুরু হলো। এমনকি তারা একে অন্যের ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থামাতে লাগলেন। অবশেষে তিনি তার সাওয়ারীতে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন এবং সা'দ ইবন উবাদার কাছে পৌঁছলেন। তারপর তিনি বললেন হে সা'দ! আবু তুরাব অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবন উবাই কি বলেছে, তা কি তুমি শুন নি? সা'দ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বললেন, সে এমন কথাবার্তা বলেছে। তিনি আরো বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি তাকে মাফ করে দিন। আর তার কথা ছেড়ে দিন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে সব নি'আমত দান করার ছিল তা সবই দান করেছেন। পক্ষান্তরে এ শহরের অধিবাসীরা তো পরামর্শ করে সিধান্ত নিয়েছিল যে, তারা তাকে রাজ মুকুট পরাবে। আর তার মাথায় রাজকীয় পাগড়ী বেধে দিবে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আপনাকে যে দীনে হক দান করেছেন, তা দিয়ে তিনি তাদের সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে সে (ক্ষোভানলে) জ্বলছে এজন্যই সে আপনার সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা আপনি নিজেই প্রত্যাক্ষ করেছেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মাফ করে দিলেন।"71
পরিশেষে আমরা বলতে চাই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ধরনের ইতিবাচক অবস্থান ও তার বিরোধীদের এতোসব নেতিবাচক অবস্থানের পরও কি কেহ এ কথা দাবী করেত পারে যে, মুসলিমরা অন্যদের সামাজিক স্বীকৃতি দেয় না?!
ভিন্ন সম্পদায়কে সামাজিক স্বীকৃতি ইসলামী মূলবোধের একটি মৌলিক বিষয়। ইসলাম কখনই কোনো অমুসলিমকে ধর্মান্তরিত করণে বল-প্রয়োগ করাকে বৈধতা দেয় না। সে জন্যেই বিশ্বময় আমাদের উদাত্ত আহ্বানের অন্যতম একিট হচ্ছে এ যে, এ শাশ্বত বিধানে কোনো অপবাদ দেওয়ার আগে ইসলামকে তার সঠিক ও বিশুদ্ধ উৎসমূল থেকে অধ্যয়ন করুন। তাহলেই আপনার মনের সকল কলিমা দূর হয়ে যাবে।
উপরের কথাগুলো হৃদয়ঙ্গম করার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল ভিন্ন সম্প্রদায় ও তাঁর বিরোধীদেরকে শুধু সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন?! না, বরং তিনি এ সকল স্তর অতিক্রম করে আরো অনেক অনে-ক অনে-ক দূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছেন।
সামনের অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিমদরেকে শুধু স্বীকৃতি দান নয়; বরং অমুসলিমদেরকে সম্মানপ্রদর্শন ও তাদেরকে যথোপযুক্ত মর্যাদার আসনে সমাসীনও করেছেন।
টিকাঃ
46. “ইসরাঈল ওয়ালফানসুন” মিশরের ডক্টর ত্বহা হোসাইনের তত্ত্বাবধানে 'আরব বিশ্বে ইয়াহুদী' বিষয়ের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনকারী একজন ইয়াহুদী আলোচক।
47. মাস'আব ইবনু উমাইর: তিনি বদর ও ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মদীনায় দূত হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন।
48. ওয়ালফানসুন প্রণীত গ্রন্থ “জাহেলী যুগ ও ইসলামের আবির্ভাবকালীন আরব বিশ্বে ইয়াহুদীদের ইতিহাস” পৃষ্ঠা নং ১০৬-১০৮।
49. আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন ইয়াসার, তিনি আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাক্ষাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং বিখ্যাত তাবেয়ী, মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ আত্মা ইবন আবি রাব্বাহ ও ইবন শিহাব যুহরী রহ. থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। ১৫১ হিজরীতে মারা যান। অধিকতর জানতে দেখুন- ইমাম যাহাবী রচিত গ্রন্থ আল-কাশেফ: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬।
50. ইবন হিশাম রচিত গ্রন্থ আস-সীরাতুন্নববীয়্যাহ: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১০-২১১ ও আল্লামা ইবনু কাসীরের 'তাফসীরুল কুরআনিল কারীম' ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৮।
51. ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনু উমার ইবনু কাসীর আল-করাইশী আদ-দামেশকী আল-শাফেঈ। তিনি ছিলেন একাধারে একজন ইমাম, হাফিজুল হাদীস ও বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। ৭০০ হিজরীতে দামেশকের আল মুজদিল এলাকায় জন্ম গ্রহন করেন। 'তাফসীরুল কুরআনিল কারীম', 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' তার রচিত অমর গ্রন্থ। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন তুগরী বুরদী রচিত আন-নুজুমুজ যাহেরাহ।
52. আব্দুল্লাহ ইবন সালাম ইবন হারেস আল আনসারী। নবী ইউসুফ ইবন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-এর সন্তানদের একজন। তিনি আনসারগণের খুব ভালো মিত্র ছিলেন। জাহেলী যুগে তার নাম ছিল হুসাইন। অতঃপর তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম রাখলেন আব্দুল্লাহ। ৪৩ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। অধিকতর জানতে দেখুন: আল্লামা ইবন হাজার আসকালানীর আল এসাবাহ (৪৭২৫), আবু আসীরের আসাদুল গাবাহ (৩/১৭৬), আল ইসতি'আব: (২/৩৮২)
53. সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, হাদীস নং ৩১৫১ এবং কিতাবুল ফাযায়েল, হাদীস নং ৩৭২৩।
54. মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৪৮৩; আল্লামা হাইশামী "মাজমা'আয যাওয়ায়েদ" গ্রন্থেও এ হাদীসটি বর্ণনা করছেন, হাদীস নং ১৩৯০২।
55. সাফওয়ান ইবন আসসাল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ১২টি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন।
56. তিরমিযী, হাদীস নং ২৭৩৩; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৭০৫।
57. আল্লামা ইবন কাসীর প্রণিত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (৩/২৩৭)
58. আল্লামা ইবন হিশামের আস-সীরাতুন্নববিয়্যাহ (২/৯১), তাফসীরে ইবন কাসীর (১/১৮৫), আল্লামা সুয়ূতী রহ.-এর আদ-দুররুল মানছুর (১/২১৭)।
59. আল্লামা ইবন হিশামের আস-সীরাতুন্নববিয়্যাহ (২/৯১), তাফসীরে ইবন কাসীর (১/৪৯৬), আল্লামা কুরতুবী রহ.-এর 'আল-জামেঈ লি আহকামিল কুরআন (৪/১১০)।
60. শাশ ইবন কায়েস। সে ছিল হিংসুটে ও চরম মুসলিম বিদ্বেষী এক ইয়াহুদী। সে মদীনার আনসার থেকে আওস ও খাযরাজ গোত্রে কলহ-বিবাদ সৃষ্টিতে সদা ব্যস্ত থাকত। এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন,
قُلْ يَتَأَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ ءَامَنَ تَبْغُونَهَا عِوَجًا ﴾ [ال عمران: ٩٩]
"বল, 'হে আহলে কিতাব, তোমরা কেন আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিচ্ছ তাদেরকে, যারা ঈমান এনেছে? তোমরা তাতে বক্রতা অনুসন্ধান কর." [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৯]
61. আল্লামা ইবন হিশামের 'আস-সীরাতুন্নববিয়্যাহ' (২/৯৫)।
62. আল্লামা ইবন হিশামের 'আস-সীরাতুন্নববিয়্যাহ' (২/৯৮)।
63. যেমন, আল্লামা ইবন কাসীর রহ.-এর 'তাফসীরুল কুরআনিল আযীম' (১/৫৭৫)।
64. অনুবাদক।
65. আল্লামা ইবন হিশামের 'আস-সীরাতুননববিয়্যাহ' (৩/৮০)।
66. জিবত )الجبت( অর্থ মূর্তি, প্রতিমা, যাদুকর, ভেলকিবাজ, যাদু, ভেলকি ইত্যাদি।
67. আবু সুফিয়ান সখর ইবন হারব ইবন উমাইয়াহ আল-কুরাইশী আল-উমওয়ী। তিন মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করনে। হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মালে গনিমত থেকে অংশ দিয়েছেন। তিনি তায়েফের যুদ্ধেও অংশগ্রহন করেছেন তখন তীরের আঘাতে তার এক চোখে হারান, তারপর ইয়ামুকের যুদ্ধেও অংশ করলে অপর চোখটিও হারান। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন আব্দুল বার-এর আল ইসতিয়াব (২/২৭০), ইবনুল আসীরের 'আসাদুল গাবাহ' (২/৪০৭), ইবন হাজারের 'আল-ইসাবাহ' (৪০৪৫)
68. হাতিব ইবন আবী বালতা'আহ আল-লাখমী, বদর ও হুদায়বিয়ায় অংশ নিয়েছেন। মাত্র ৩০বছর বয়সে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ কুরআনের আয়াত দ্বারা তার ঈমানের সাক্ষ্য দিয়েছেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوّى وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ ﴾ [الممتحنة: ١]
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করো না" হারান। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন্ আব্দুল বার এর আল ইসতিয়াব (১/৩৮৪), ইবনুল আসীরের 'আসাদুল গাবাহ' (১/৪৯১)।
69. উসামা ইবন যায়েদ ইবন হারেস, মাত্র আট বছর বয়সে মুসলিম সৈন্যদের সাথী হয়েছে। উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাতে খুব আদর করতেন এমনকি কোনো বস্তু প্রদানে নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ থেকেও উসামাকে প্রাধান্য দিতেন। খলীফা উসমান রাদিয়াল্লাহু 'আনহু-এর হত্যার পর যখন ফেতনা ছড়িয়ে পরল তখন তিনি তা দমন করেন। ৫৮/৫৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। অধিকতর জানতে দেখুন: ইবন আব্দুল বার-এর 'আল-ইসতিয়াব' (১/১ ৭০), ইবনুল আসীরের 'আসাদুল গাবাহ' (১/৯৫), ইবন হাজারের 'আল-ইসাবাহ' (৮৯)।
70. মদীনার অধিবাসিরা। ইবন হাজার আসকালানী রহ.-এর 'ফাতহুল বারী' (৮/২৩২)
71. সহীহ বুখারী, (অনুমতি চাওয়া অধ্যায়, মুসলিম ও মুশরিকের যৌথ মজলিসে সালামের পরিচ্ছেদ), হাদীস নং ৫৮৯৯; সহীহ মুসলিম (ইতিহাস ও জিহাদ অধ্যায়, মুনাফিকদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধারণ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দো'আ পরিচ্ছেদ) হাদীস নং ১৭৯৮।