📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ইসলাম বিরোধীদের শেকড় সন্ধানে

📄 ইসলাম বিরোধীদের শেকড় সন্ধানে


হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এসব মিথ্যাবাদী অস্বীকারকারীদের বাস্তবিক জীবনাবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবো। খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, গোটা দুনিয়ার ইসলামবিদ্বেষী মানুষগুলো দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। এক, হিংসুক। দুই, মূর্খ। হয়তো এদের কারো মধ্যে হিংসা ও মূর্খতা উভয়ই পাওয়া যাবে আর না হয় দুয়ের একটা অবশ্যই পাওয়া যাবে。

**প্রথম শ্রেণি: হিংসুক**

যারা হিংসুক তাদের দ্বারা ইসলামের বিরোধিতা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, বুদ্ধি-বিবেচনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান কোনো কিছুই হিংসুকের হিংসাকে প্রশমিত করতে পারে না। হিংসুকরা দুনিয়ালোভী, স্বার্থবাদী হয়ে থাকে। এরা স্বভাবতই প্রতিপক্ষের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের কারণে মনের মধ্যে একধরণের ব্যাথা ও কষ্ট অনুভব করতে থাকে। এরা মানবতার এক বিকৃত শ্রেণি। কোনো দলিল-প্রমাণই এদের বিরোধিতার মাত্রাকে হ্রাস করতে পারে না। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوا فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ ) [النمل: ١٤]
"আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল অথচ তাদের অন্তর তা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখ, ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ১৪]

এ হিংসুক শ্রেণিতে রয়েছে বড় বড় অপরাধী, ফিৎনা ও গুমরাহীর মূল হোতা এবং অভিশপ্ত ইবলিসের চেলা-চামুন্ডারা। এরা সব যুগেই ছিল। কোনো নবী, ওলী বা সিদ্দিীক; কারো জীবনকালই এ শ্রেণি থেকে মুক্ত ছিল না। সব ক্ষেত্রেই এরা সত্য, সুন্দর ও শৃঙ্খলার শত্রু। সব সময়ই এরা অসত্য, অসুন্দর ও উশৃঙ্খলার বাহক। এদের আধ্যাত্মিক ও মূল চালিকাশক্তি ইবলিস হলেও এরা মানুষের মধ্য হতে এমন কিছু দূর্ভাগাকে নিজেদের নেতা বানিয়ে নেয় যাদের ভালো-মন্দের অনুভূতি শক্তির মৃত্যু ঘটেছে, যাদের স্বভাবে ধরেছে পঁচন, অন্তর হয়ে গেছে কালিমাযুক্ত এবং অন্তর্দৃষ্টি হয়ে গেছে অন্ধ। ফলে তারা নিজেদের ও অধিনস্থদের জন্য একমাত্র গোমরাহী এবং ভ্রষ্টতার পথ বেচে নেয়। সত্য ও কল্যাণের প্রতি আহ্বানকারী সকল কিছু থেকেই পূর্ণ বিমুখতা প্রদর্শন করে এবং সত্য ও কল্যাণের ধারক-বাহক ব্যক্তি বা আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করে।

এ শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত ছিল ফির'আউন, হামান ও কারুন। আবু জাহল, উবাই ইবন খালফ ও আবু লাহাব এ দলেরই অংশ। এ ক্যাটাগরীতেই ছিল কিসরা ও কাইসার। হুয়াই ইবন আখতাব এবং কা'আব ইবন আশরাফও এদের বাইরে নয়।

এদের মধ্যে কেউ রাজা-বাদশাহর পোষাকে আত্মপ্রকাশ করে আবার কেউ ধরে সাধু-সন্ন্যাসিদের বেশ। কেউ তরবারী তুলে নেয় এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায় আবার কেউ কলম হাতে নিয়ে ব্যাঙ্গ ও কটুক্তিতে লেগে যায়। এদের মধ্যে রয়েছে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, মুশরিক ও অগ্নিপূজক। রয়েছে নাস্তিক। রয়েছে মুসলিম নামধারী মুনাফিকরাও। যেমন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল-এর ঘটনা কারো কাছেই অজানা নয়।

এরা বড় ভয়ংকর প্রজাতি। মুসলিমদের সব সময় এদের মুখোস উন্মোচন, এদের ষড়যন্ত্র ও নীল নকশার স্বরূপ উদঘাটনের এবং বিশ্ববাসীকে এদের অনিষ্ট ও অপকর্ম থেকে সতর্ককরণের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। এত ভয়ংকর হওয়া সত্যেও খুশির বিষয় হলো এরা সংখ্যায় অতি স্বল্প। সারা দুনিয়ার ইসলামবিরোধী জনগোষ্টির তুলনায় এরা সমুদ্রের মাঝে কয়েক ফোটা পানির ন্যায়। যেমন, সমগ্র মিসরবাসীর তুলনায় ফির'আউন, হামান ও কারুন কী? গোটা মক্কাবাসীর সামনে আবু জাহল, উবাই ইবন খালফ ও আবু লাহাব কয় জন? ফারস্য, ইরাক ও এতদুভয়ের আশ-পাশের গণমানুষের তুলনায় কিসরার অবস্থান কোথায়? শাম, এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের খ্রিস্টানদের মধ্যে হিরাক্লিয়াসই বা কয় জন?

হিংসা ও খলতার ফাঁদে বন্দী এ শ্রেণির লোকেরা স্বেচ্ছায়, সাগ্রহে, জেনে-বুঝে ইসলামের মাহাত্ম্য ও নবী চরিত্রের পবিত্রতার ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকেফহাল হয়েই কেবল হিংসার বশবর্তী হয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করে এবং সত্যনিষ্ঠ মহামানবের চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। তবে ইসলামের নিন্দাবাদে লিপ্ত, বিরুদ্ধাচারী ও লোকদেরকে ইসলাম থেকে বাধা প্রদানকারী মোট জনগোষ্ঠির তুলনায় এ হিংসুক শ্রেণি হাতে গণা কয়েকজন মাত্র。

**দ্বিতীয় শ্রেণী: মূর্খ**

প্রিয় পাঠক! তাহলে ইসলাম বিদ্ধেষীদের অবশিষ্ট বৃহদাংশ কোন শ্রেণির? হ্যাঁ তারা এ প্রথম শ্রেণির হিংসুকদের অন্ধ অনুসারী মূর্খ শ্রেণির লোক। যারা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপ-প্রচার ও তথ্য সন্ত্রাসের শিকার। যারা ইসলাম সম্পর্কে সঠিক উৎস থেকে ধারণা লাভ করতে পারে নি। যাদের নিকট ইসলামের বিকৃত রূপ তুলে ধরা হয়েছে। যাদেরকে এ ধারণ দেওয়া হয়েছে যে, ইসলাম হলো নিছক কিছু অসংলগ্ন নব আবিস্কৃত বিষয়াবলি, কষ্টদায়ক অন্ধ অনুকরণ এবং কতিপয় বিকৃত চিন্তা-চেতনার নাম মাত্র। ফলে তারা ইবলিসদের পেছনে বকরীর পালের মতো ছুটে চলেছে এবং নিজেদের বাহনজন্তুকে তাদের পতনের পথে ছুটিয়ে দিয়েছে আর তারা ধারণা করছে যে, তারা ভালো কাজই করছে। এদের মধ্যে কেউ হয়ত একেবারেই মূর্খ; জ্ঞানের আলো যাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারে, আবার কেউ স্বল্প জ্ঞানী; বিস্তারিত ব্যাংখ্যা-বিশ্লেষণ যাদের সন্দেহ-সংশয় দূর করতে পারে কিংবা কেউ মোটামুটি জ্ঞানের অধিকারী; দলীল প্রমাণের বর্ধিত জ্ঞান যাদেরকে সত্যের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারে।

মোটকথা এ দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের শুধু জ্ঞান প্রদীপের অভাব। এরা জ্ঞান-দরিদ্র জনসাধারণ। এরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আগ্রহী হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না এবং মন থেকে ইসলামের বিরোধিতাও করে না। এরা জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় সাগ্রহে এবং সংকল্পের সাথে ইসলামের বিরোধিতা ও নবী চরিত্রে কলঙ্ক লেপনে লিপ্ত হয় না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টালে আমরা কী দেখতে পাই? ফারস্যের জনসাধারণ কি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল? নাকি ইসলাম বিরোধী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শুধুমাত্র কিসরা তার সুবিধাভোগী উজির-উমারা এবং তার বশিভূত কিছু সৈনিকদের দ্বারা? ফারস্যের জনসাধারণ বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এ বিশ্বাস লালন করে এসেছে যে, আগুন তাদের প্রভু, বংশ পরম্পরায় কিসরা তাদের নেতা এবং মযদক ও তার অনুসারীদের ধর্মই তাদের সঠিক ধর্ম। এভাবেই দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। হঠাৎ তাদের মাঝে ইসলামের স্বচ্ছ-সুন্দর বাণী উপস্থাপিত হলো। তাদের চোখের পর্দা সরিয়ে ফেলা হলো। তাদের নেতা ও সর্দাররা তাদের কানে সত্য ও সুন্দরের প্রতিবন্ধক এবং ভ্রষ্টতার যে সরঞ্জামাদী স্থাপন করে রেখেছিল তা বিদূরিত করা হলো। ফলে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে তারা তাদের বিপদগামিতার স্বরূপ উদঘাটন করে ফেলল, ইসলামের মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল এবং অতি নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত স্বভাব ও বিজ্ঞান সম্মত কথা-বার্তা, চাল-চলন অবলোকন করল। অতঃপর কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি ছাড়াই পূর্ণ আগ্রহ ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামকে গ্রহণ করে নিল। আল্লাহর শপথ! কাউকে ইসলামে দীক্ষিত করতে আমাদের কোনো বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না এবং কারো চেতনা-বিশ্বাসে চাপ সৃষ্টির চেষ্টাও করি না। উপরন্তু আমরা জোর-জবরদস্তী ও চাপ সৃষ্টি না করতে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ﴾ [البقرة: ٢٥٦]
"দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬]

ফারস্য জাতির সামনে ভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াত বা সৎপথ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা সত্যকে পেয়ে গেছে এবং স্পষ্টভাবে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য বুঝে ফেলেছে। ফলে ফারস্যের বৃহৎ জনগোষ্ঠি তাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তির পথ অবলম্বন করেছে। যে স্বভাবজাত প্রবৃত্তির বীজ আল্লাহ তা'আলা তার প্রতিটি বান্দার অন্তরে গচ্ছিত রেখেছেন।
﴿فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ﴾ [الروم: ٣٠]
"আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতির ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

অধিকাংশ ফারস্যবাসীই ইসলাম গ্রহণ করেছে। মিথ্যা, অস্বীকার ও বিরোধিতার ওপর অবিচল থাকে নি। তবে নেতৃস্থানীয় কাফিরদের কথা ভিন্ন; যারা জেনে-বুঝে হিংসা ও অংকারবশত স্বধর্ম ত্যাগ করে নি।

হুবহু একই ঘটনা ঘটেছিল শাম, মিসর, উত্তর আফ্রিকার জনগণ এবং স্পেন, এশিয়া মাইনর ও পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ব্যাপারেও। এমনকি পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং হিন্দুস্থান প্রভৃতির জনসাধারণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

অস্ত্র ও তরবারীর জোরে নয়; বরং দলীল প্রমাণ ও আপন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ইসলাম চিরবিজয়ী দীন। ইসলামের সঠিক দাওয়াত ও নবীচরিত্রের বাস্তবিক বিবরণ তুলে ধরতে পারলেই মানুষের হিদায়াতের জন্যে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গহণের জন্য শুধুমাত্র ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট। এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [النحل: ٣٥]
"আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া নয় কি?” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৫]

﴿وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [النور: ٥٤]
"আর রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪]

﴿فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [المائدة: ٩٢]
"তার পর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু সুস্পষ্ট প্রচার।" [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৯২]

পবিত্র কুরআনে এ ধরণের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার সবগুলো উল্লেখ করা দুরূহ ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিমরা যদি তাদের ধর্মের পয়গাম ও যথাযথ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সকলের কাছে পৌঁছে দিতে এবং নবীচরিত্রের সৌন্দর্যগুলো অন্যের নিকট তুলে ধরতে অক্ষম হয় তাহলে এর ফলাফল কী দাঁড়াবে? এ ব্যাপারে মুসলিমদের অক্ষমতা বিকৃত মতাদর্শের ধ্বজাধারীদের এবং ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর ধারক-বাহকদের জন্য এ পথ উন্মুক্ত করে দেয় যে, তারা নিজেদের মতো করে জনসাধারণের সামনে ইসলামের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং এর ফাঁকে নিজেদের রচিত মতাদর্শের দাওয়াত গলাধকরণ করায়। আর মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধভাবে কারো নেতৃত্ব মেনে চলা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাই ইসলামের ধারক-বাহকগণ যখন ইসলামের দাওয়াত, ইসলামী দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বদানে উদাসিনতা এবং অক্ষমতা প্রদর্শন করে তখন এর ফলাফল কী দাঁড়ায়? আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে সে দিকেই ইঙ্গিত করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنْ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالًا فَسُبِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মানুষের অন্তর থেকে ইলম কেড়ে নেবেন না। তবে তিনি 'আলেম শ্রেণিকে কবয করে ইলম তুলে নেবেন। যখন কোনো আলেম থাকবে না তখন লোকেরা মূর্খ লোকদের নেতা বানিয়ে নেবে। তাদের কাছে ফাতওয়া চাওয়া হবে এবং তারা না জেনে ফাতওয়া দিবে। এতে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং লোকদেরও পথভ্রষ্ট করবে।"

পৃথিবীতে মুসলিমদের ভূমিকা ও দায়িত্বের ব্যাখ্যা সম্বলিত প্রখ্যাত সাহাবী রব'ঈ ইবন 'আমের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু' এর একটি চমৎকার প্রজ্ঞাময় উক্তি রয়েছে। তিনি বলেন,
الله ابتعثنا لنخرج من شاء من عبادة العباد إلى عبادة الله، ومن ضيق الدنيا إلى سعتها، ومن جور الأديان إلى عدل الإسلام
"আল্লাহ আমাদেরকে (মুসলিমদেরকে) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর গোলামীর দিকে, সংকীর্ণতা থেকে প্রসস্ততার দিকে এবং অন্যান্য মতাদর্শগুলোর অবিচার থেকে মুক্ত করে ইসলামের সাম্য ও সম্প্রীতির দিকে বের করে আনার লক্ষ্যে।"

এ দায়িত্ব ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মহান। মুসলিমদের সর্বদা এ দায়িত্বের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্ত জরুরী। কারণ যারা আমাদের বিরোধিতা করছে তাদের অধিকাংশ আমাদের পরিচয় পায় নি। আমাদেরকে যারা ঘৃণার চোখে দেখছে, তাদের অনেকেই আমাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বে-খবর। আমাদের উচিৎ আমাদের দীন ও নবীচরিত্রের পূর্ণতা ও মাহাত্ম্যের ক্ষেত্রগুলোকে খুলে খুলে বিশ্লেষণ করা। প্রয়োজন আমাদের কথা আমাদেরই মুখে বলা। আমাদের আখলাক-চরিত্রের বিষয়গুলো আমাদেরই কলমে লেখা। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেতিহাস আমাদেরই ভাষায় রচিত হওয়া। আমি ইংরেজি ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে লেখা বই খোঁজার জন্য ইউরোপ আমেরিকার বড় বড় লাইব্রেরীগুলোতে প্রবেশ করেছি, সেখানে আমি ইসলাম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লেখা হাজারো বই দেখতে পেলাম; কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হয় যে, সেগুলোর অধিকাংশই রচিত হয়েছে অমুসলিমদের হাতে। ফল যা হবার তাই হয়েছে, খুব কম লেখকই ইসলামের সঠিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন এবং সততার পরিচয় দিয়েছেন। অবশিষ্ট অনেকেই নিজেদের রুচি মতো বিকৃতি সাধন, মিথ্যারোপ, অপব্যাখ্যা ও অবিচার করতে ছাড়েন নি。

টিকাঃ
৫. মযদক, প্রখ্যাত ফারস্য দার্শনিক, আনুশারওয়া এর পিতা কবায কিসরা এর যুগে যার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কবায কিসরা তার মাযহাবের অনুসরণ শুরু করে, ছেলে আনুশারওয়া তা জানতে পেরে তাকে হত্যা করে ফেলে।
৬. সহীহ বুখারী (كتاب العلم: باب كيف يقبض العلم) হাদীস নং ১০০। সহীহ মুসলিম ( كتاب العلم: باب رفع العلم و قبضه ) হাদীস নং ২৬৭০।
৭. ফারস্য অভিযানে অংশগ্রহণকারী বিখ্যাত এক সাহাবী। সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস যাকে রুস্তমের নিকট দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন। খুরাসান বিজয়ের পর আহনাফ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে তাখারিস্তানের গভর্ণর বানিয়ে পাঠিয়েছেন। ৪ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৭ম খণ্ড ৪৩ পৃষ্ঠা।

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক! এসব মিথ্যাবাদী অস্বীকারকারীদের বাস্তবিক জীবনাবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবো। খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, গোটা দুনিয়ার ইসলামবিদ্বেষী মানুষগুলো দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। এক, হিংসুক। দুই, মূর্খ। হয়তো এদের কারো মধ্যে হিংসা ও মূর্খতা উভয়ই পাওয়া যাবে আর না হয় দুয়ের একটা অবশ্যই পাওয়া যাবে。

**প্রথম শ্রেণি: হিংসুক**

যারা হিংসুক তাদের দ্বারা ইসলামের বিরোধিতা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ, বুদ্ধি-বিবেচনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান কোনো কিছুই হিংসুকের হিংসাকে প্রশমিত করতে পারে না। হিংসুকরা দুনিয়ালোভী, স্বার্থবাদী হয়ে থাকে। এরা স্বভাবতই প্রতিপক্ষের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের কারণে মনের মধ্যে একধরণের ব্যাথা ও কষ্ট অনুভব করতে থাকে। এরা মানবতার এক বিকৃত শ্রেণি। কোনো দলিল-প্রমাণই এদের বিরোধিতার মাত্রাকে হ্রাস করতে পারে না। এদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ ظُلْمًا وَعُلُوا فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُفْسِدِينَ ) [النمل: ١٤]
"আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল অথচ তাদের অন্তর তা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করেছিল। অতএব দেখ, ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ১৪]

এ হিংসুক শ্রেণিতে রয়েছে বড় বড় অপরাধী, ফিৎনা ও গুমরাহীর মূল হোতা এবং অভিশপ্ত ইবলিসের চেলা-চামুন্ডারা। এরা সব যুগেই ছিল। কোনো নবী, ওলী বা সিদ্দিীক; কারো জীবনকালই এ শ্রেণি থেকে মুক্ত ছিল না। সব ক্ষেত্রেই এরা সত্য, সুন্দর ও শৃঙ্খলার শত্রু। সব সময়ই এরা অসত্য, অসুন্দর ও উশৃঙ্খলার বাহক। এদের আধ্যাত্মিক ও মূল চালিকাশক্তি ইবলিস হলেও এরা মানুষের মধ্য হতে এমন কিছু দূর্ভাগাকে নিজেদের নেতা বানিয়ে নেয় যাদের ভালো-মন্দের অনুভূতি শক্তির মৃত্যু ঘটেছে, যাদের স্বভাবে ধরেছে পঁচন, অন্তর হয়ে গেছে কালিমাযুক্ত এবং অন্তর্দৃষ্টি হয়ে গেছে অন্ধ। ফলে তারা নিজেদের ও অধিনস্থদের জন্য একমাত্র গোমরাহী এবং ভ্রষ্টতার পথ বেচে নেয়। সত্য ও কল্যাণের প্রতি আহ্বানকারী সকল কিছু থেকেই পূর্ণ বিমুখতা প্রদর্শন করে এবং সত্য ও কল্যাণের ধারক-বাহক ব্যক্তি বা আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করে।

এ শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত ছিল ফির'আউন, হামান ও কারুন। আবু জাহল, উবাই ইবন খালফ ও আবু লাহাব এ দলেরই অংশ। এ ক্যাটাগরীতেই ছিল কিসরা ও কাইসার। হুয়াই ইবন আখতাব এবং কা'আব ইবন আশরাফও এদের বাইরে নয়।

এদের মধ্যে কেউ রাজা-বাদশাহর পোষাকে আত্মপ্রকাশ করে আবার কেউ ধরে সাধু-সন্ন্যাসিদের বেশ। কেউ তরবারী তুলে নেয় এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায় আবার কেউ কলম হাতে নিয়ে ব্যাঙ্গ ও কটুক্তিতে লেগে যায়। এদের মধ্যে রয়েছে ইয়াহুদী, খ্রিস্টান, মুশরিক ও অগ্নিপূজক। রয়েছে নাস্তিক। রয়েছে মুসলিম নামধারী মুনাফিকরাও। যেমন আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল-এর ঘটনা কারো কাছেই অজানা নয়।

এরা বড় ভয়ংকর প্রজাতি। মুসলিমদের সব সময় এদের মুখোস উন্মোচন, এদের ষড়যন্ত্র ও নীল নকশার স্বরূপ উদঘাটনের এবং বিশ্ববাসীকে এদের অনিষ্ট ও অপকর্ম থেকে সতর্ককরণের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। এত ভয়ংকর হওয়া সত্যেও খুশির বিষয় হলো এরা সংখ্যায় অতি স্বল্প। সারা দুনিয়ার ইসলামবিরোধী জনগোষ্টির তুলনায় এরা সমুদ্রের মাঝে কয়েক ফোটা পানির ন্যায়। যেমন, সমগ্র মিসরবাসীর তুলনায় ফির'আউন, হামান ও কারুন কী? গোটা মক্কাবাসীর সামনে আবু জাহল, উবাই ইবন খালফ ও আবু লাহাব কয় জন? ফারস্য, ইরাক ও এতদুভয়ের আশ-পাশের গণমানুষের তুলনায় কিসরার অবস্থান কোথায়? শাম, এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের খ্রিস্টানদের মধ্যে হিরাক্লিয়াসই বা কয় জন?

হিংসা ও খলতার ফাঁদে বন্দী এ শ্রেণির লোকেরা স্বেচ্ছায়, সাগ্রহে, জেনে-বুঝে ইসলামের মাহাত্ম্য ও নবী চরিত্রের পবিত্রতার ব্যাপারে পূর্ণ ওয়াকেফহাল হয়েই কেবল হিংসার বশবর্তী হয়ে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধিতা করে এবং সত্যনিষ্ঠ মহামানবের চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। তবে ইসলামের নিন্দাবাদে লিপ্ত, বিরুদ্ধাচারী ও লোকদেরকে ইসলাম থেকে বাধা প্রদানকারী মোট জনগোষ্ঠির তুলনায় এ হিংসুক শ্রেণি হাতে গণা কয়েকজন মাত্র。

**দ্বিতীয় শ্রেণী: মূর্খ**

প্রিয় পাঠক! তাহলে ইসলাম বিদ্ধেষীদের অবশিষ্ট বৃহদাংশ কোন শ্রেণির? হ্যাঁ তারা এ প্রথম শ্রেণির হিংসুকদের অন্ধ অনুসারী মূর্খ শ্রেণির লোক। যারা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপ-প্রচার ও তথ্য সন্ত্রাসের শিকার। যারা ইসলাম সম্পর্কে সঠিক উৎস থেকে ধারণা লাভ করতে পারে নি। যাদের নিকট ইসলামের বিকৃত রূপ তুলে ধরা হয়েছে। যাদেরকে এ ধারণ দেওয়া হয়েছে যে, ইসলাম হলো নিছক কিছু অসংলগ্ন নব আবিস্কৃত বিষয়াবলি, কষ্টদায়ক অন্ধ অনুকরণ এবং কতিপয় বিকৃত চিন্তা-চেতনার নাম মাত্র। ফলে তারা ইবলিসদের পেছনে বকরীর পালের মতো ছুটে চলেছে এবং নিজেদের বাহনজন্তুকে তাদের পতনের পথে ছুটিয়ে দিয়েছে আর তারা ধারণা করছে যে, তারা ভালো কাজই করছে। এদের মধ্যে কেউ হয়ত একেবারেই মূর্খ; জ্ঞানের আলো যাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে পারে, আবার কেউ স্বল্প জ্ঞানী; বিস্তারিত ব্যাংখ্যা-বিশ্লেষণ যাদের সন্দেহ-সংশয় দূর করতে পারে কিংবা কেউ মোটামুটি জ্ঞানের অধিকারী; দলীল প্রমাণের বর্ধিত জ্ঞান যাদেরকে সত্যের পথে সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারে।

মোটকথা এ দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের শুধু জ্ঞান প্রদীপের অভাব। এরা জ্ঞান-দরিদ্র জনসাধারণ। এরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আগ্রহী হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না এবং মন থেকে ইসলামের বিরোধিতাও করে না। এরা জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় সাগ্রহে এবং সংকল্পের সাথে ইসলামের বিরোধিতা ও নবী চরিত্রে কলঙ্ক লেপনে লিপ্ত হয় না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টালে আমরা কী দেখতে পাই? ফারস্যের জনসাধারণ কি ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল? নাকি ইসলাম বিরোধী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শুধুমাত্র কিসরা তার সুবিধাভোগী উজির-উমারা এবং তার বশিভূত কিছু সৈনিকদের দ্বারা? ফারস্যের জনসাধারণ বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এ বিশ্বাস লালন করে এসেছে যে, আগুন তাদের প্রভু, বংশ পরম্পরায় কিসরা তাদের নেতা এবং মযদক ও তার অনুসারীদের ধর্মই তাদের সঠিক ধর্ম। এভাবেই দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। হঠাৎ তাদের মাঝে ইসলামের স্বচ্ছ-সুন্দর বাণী উপস্থাপিত হলো। তাদের চোখের পর্দা সরিয়ে ফেলা হলো। তাদের নেতা ও সর্দাররা তাদের কানে সত্য ও সুন্দরের প্রতিবন্ধক এবং ভ্রষ্টতার যে সরঞ্জামাদী স্থাপন করে রেখেছিল তা বিদূরিত করা হলো। ফলে অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে তারা তাদের বিপদগামিতার স্বরূপ উদঘাটন করে ফেলল, ইসলামের মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল এবং অতি নিকট থেকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উন্নত স্বভাব ও বিজ্ঞান সম্মত কথা-বার্তা, চাল-চলন অবলোকন করল। অতঃপর কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি ছাড়াই পূর্ণ আগ্রহ ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামকে গ্রহণ করে নিল। আল্লাহর শপথ! কাউকে ইসলামে দীক্ষিত করতে আমাদের কোনো বল প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না এবং কারো চেতনা-বিশ্বাসে চাপ সৃষ্টির চেষ্টাও করি না। উপরন্তু আমরা জোর-জবরদস্তী ও চাপ সৃষ্টি না করতে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ﴾ [البقرة: ٢٥٦]
"দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬]

ফারস্য জাতির সামনে ভ্রষ্টতা থেকে হিদায়াত বা সৎপথ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা সত্যকে পেয়ে গেছে এবং স্পষ্টভাবে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য বুঝে ফেলেছে। ফলে ফারস্যের বৃহৎ জনগোষ্ঠি তাদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তির পথ অবলম্বন করেছে। যে স্বভাবজাত প্রবৃত্তির বীজ আল্লাহ তা'আলা তার প্রতিটি বান্দার অন্তরে গচ্ছিত রেখেছেন।
﴿فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ﴾ [الروم: ٣٠]
"আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতির ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

অধিকাংশ ফারস্যবাসীই ইসলাম গ্রহণ করেছে। মিথ্যা, অস্বীকার ও বিরোধিতার ওপর অবিচল থাকে নি। তবে নেতৃস্থানীয় কাফিরদের কথা ভিন্ন; যারা জেনে-বুঝে হিংসা ও অংকারবশত স্বধর্ম ত্যাগ করে নি।

হুবহু একই ঘটনা ঘটেছিল শাম, মিসর, উত্তর আফ্রিকার জনগণ এবং স্পেন, এশিয়া মাইনর ও পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ব্যাপারেও। এমনকি পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং হিন্দুস্থান প্রভৃতির জনসাধারণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

অস্ত্র ও তরবারীর জোরে নয়; বরং দলীল প্রমাণ ও আপন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ইসলাম চিরবিজয়ী দীন। ইসলামের সঠিক দাওয়াত ও নবীচরিত্রের বাস্তবিক বিবরণ তুলে ধরতে পারলেই মানুষের হিদায়াতের জন্যে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গহণের জন্য শুধুমাত্র ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়াই যথেষ্ট। এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿فَهَلْ عَلَى الرُّسُلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [النحل: ٣٥]
"আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া নয় কি?” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৫]

﴿وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [النور: ٥٤]
"আর রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪]

﴿فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴾ [المائدة: ٩٢]
"তার পর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু সুস্পষ্ট প্রচার।" [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৯২]

পবিত্র কুরআনে এ ধরণের অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার সবগুলো উল্লেখ করা দুরূহ ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিমরা যদি তাদের ধর্মের পয়গাম ও যথাযথ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সকলের কাছে পৌঁছে দিতে এবং নবীচরিত্রের সৌন্দর্যগুলো অন্যের নিকট তুলে ধরতে অক্ষম হয় তাহলে এর ফলাফল কী দাঁড়াবে? এ ব্যাপারে মুসলিমদের অক্ষমতা বিকৃত মতাদর্শের ধ্বজাধারীদের এবং ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর ধারক-বাহকদের জন্য এ পথ উন্মুক্ত করে দেয় যে, তারা নিজেদের মতো করে জনসাধারণের সামনে ইসলামের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করায় এবং এর ফাঁকে নিজেদের রচিত মতাদর্শের দাওয়াত গলাধকরণ করায়। আর মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধভাবে কারো নেতৃত্ব মেনে চলা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাই ইসলামের ধারক-বাহকগণ যখন ইসলামের দাওয়াত, ইসলামী দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বদানে উদাসিনতা এবং অক্ষমতা প্রদর্শন করে তখন এর ফলাফল কী দাঁড়ায়? আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে সে দিকেই ইঙ্গিত করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنْ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالًا فَسُبِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মানুষের অন্তর থেকে ইলম কেড়ে নেবেন না। তবে তিনি 'আলেম শ্রেণিকে কবয করে ইলম তুলে নেবেন। যখন কোনো আলেম থাকবে না তখন লোকেরা মূর্খ লোকদের নেতা বানিয়ে নেবে। তাদের কাছে ফাতওয়া চাওয়া হবে এবং তারা না জেনে ফাতওয়া দিবে। এতে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং লোকদেরও পথভ্রষ্ট করবে।"

পৃথিবীতে মুসলিমদের ভূমিকা ও দায়িত্বের ব্যাখ্যা সম্বলিত প্রখ্যাত সাহাবী রব'ঈ ইবন 'আমের রাদিয়াল্লাহু 'আনহু' এর একটি চমৎকার প্রজ্ঞাময় উক্তি রয়েছে। তিনি বলেন,
الله ابتعثنا لنخرج من شاء من عبادة العباد إلى عبادة الله، ومن ضيق الدنيا إلى سعتها، ومن جور الأديان إلى عدل الإسلام
"আল্লাহ আমাদেরকে (মুসলিমদেরকে) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্তি দিয়ে আল্লাহর গোলামীর দিকে, সংকীর্ণতা থেকে প্রসস্ততার দিকে এবং অন্যান্য মতাদর্শগুলোর অবিচার থেকে মুক্ত করে ইসলামের সাম্য ও সম্প্রীতির দিকে বের করে আনার লক্ষ্যে।"

এ দায়িত্ব ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মহান। মুসলিমদের সর্বদা এ দায়িত্বের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্ত জরুরী। কারণ যারা আমাদের বিরোধিতা করছে তাদের অধিকাংশ আমাদের পরিচয় পায় নি। আমাদেরকে যারা ঘৃণার চোখে দেখছে, তাদের অনেকেই আমাদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বে-খবর। আমাদের উচিৎ আমাদের দীন ও নবীচরিত্রের পূর্ণতা ও মাহাত্ম্যের ক্ষেত্রগুলোকে খুলে খুলে বিশ্লেষণ করা। প্রয়োজন আমাদের কথা আমাদেরই মুখে বলা। আমাদের আখলাক-চরিত্রের বিষয়গুলো আমাদেরই কলমে লেখা। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেতিহাস আমাদেরই ভাষায় রচিত হওয়া। আমি ইংরেজি ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে লেখা বই খোঁজার জন্য ইউরোপ আমেরিকার বড় বড় লাইব্রেরীগুলোতে প্রবেশ করেছি, সেখানে আমি ইসলাম ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লেখা হাজারো বই দেখতে পেলাম; কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হয় যে, সেগুলোর অধিকাংশই রচিত হয়েছে অমুসলিমদের হাতে। ফল যা হবার তাই হয়েছে, খুব কম লেখকই ইসলামের সঠিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন এবং সততার পরিচয় দিয়েছেন। অবশিষ্ট অনেকেই নিজেদের রুচি মতো বিকৃতি সাধন, মিথ্যারোপ, অপব্যাখ্যা ও অবিচার করতে ছাড়েন নি。

টিকাঃ
৫. মযদক, প্রখ্যাত ফারস্য দার্শনিক, আনুশারওয়া এর পিতা কবায কিসরা এর যুগে যার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কবায কিসরা তার মাযহাবের অনুসরণ শুরু করে, ছেলে আনুশারওয়া তা জানতে পেরে তাকে হত্যা করে ফেলে।
৬. সহীহ বুখারী (كتاب العلم: باب كيف يقبض العلم) হাদীস নং ১০০। সহীহ মুসলিম ( كتاب العلم: باب رفع العلم و قبضه ) হাদীস নং ২৬৭০।
৭. ফারস্য অভিযানে অংশগ্রহণকারী বিখ্যাত এক সাহাবী। সা'দ ইবন আবি ওয়াক্কাস যাকে রুস্তমের নিকট দূত হিসেবে পাঠিয়েছেন। খুরাসান বিজয়ের পর আহনাফ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাকে তাখারিস্তানের গভর্ণর বানিয়ে পাঠিয়েছেন। ৪ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৭ম খণ্ড ৪৩ পৃষ্ঠা।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 মুসলিমগণ কোথায়?

📄 মুসলিমগণ কোথায়?


আল্লাহর সৃষ্ট সমগ্র মানবকুলের সামনে ইসলাম ও নবীচরিত্রের সৌন্দর্য, মাহাত্ম্য ও পরিপূর্ণতা তুলে ধরে দাওয়াতের লক্ষ্যে লেখা-লেখি করা কি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র অন্তর্ভুক্ত নয়? ইসলাম বিদ্ধেষীদের মনে তাদের মূর্খতাহেতু সৃষ্ট সকল সন্দেহ-সংশয় রোধকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ করা কি আমাদের কর্তব্যের আওতায় পড়ে না? যারা অজ্ঞতার নিম্নসীমায় বাসকারী, অন্ধকারাচ্ছন্ন অন্তরের অধিকারী এবং ইসলামের বড়ত্ব, মাহাত্ম্য ও নবীচরিত্রের সৌন্দর্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর -এ সকল মানবগোষ্ঠির দ্বারে দ্বারে ধর্ম-জ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে ছুটে যাওয়ার কি প্রয়োজন নেই? আল্লাহর দীনকে তাঁর স্বকীয় অবস্থানে নিয়ে যেতে ইসলামের সব সৌন্দর্য পৃথিবীর সকল মানবগোষ্ঠির সামনে তাদের নিজস্ব ভাষায় উপস্থাপিত হওয়ার কি কোনো প্রয়োজন নেই? আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ ﴾ [ ابراهيم: ٤]
"আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তার কাওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে তিনি তাদের কাছে বর্ণনা দেন।" [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ০৪]

ব্যাপক হারে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে পূর্ণ উদাসীন হয়ে শুধুমাত্র খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা নিয়ে মগ্ন থাকতে দেখে কি আমাদের অন্তরে কোনো কষ্ট অনুভূত হয় না? ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম বিদ্বেষীদের নিকট থেকে ইসলামের বিকৃত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যাখ্যা পাওয়ার কারণে লক্ষ-কোটি মানুষ যে আজ ইসলাম বিমুখ, সে জন্য কি আমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে না?

দায়িত্ব অনেক মহৎ, অবহেলার পরিণতিও অত্যন্ত ভয়াবহ। গোটা পৃথিবী আমাদের দীনের পূর্ণাঙ্গতার পানে তাকিয়ে রয়েছে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো নেতৃত্বের অভাব অনূভব করছে। পৃথিবীবাসীর সামনে এর সঠিক রূপরেখা তুলে ধরার কাজ এতো সহজ নয়। শত্রুরা ওঁত পেতে আছে। শয়তানও বসে নেই। চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয়ে গেছে। তবে আমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর ঘোষণা, তিনিই আমাদের অন্তরকে মজবুত করবেন এবং আমাদের কদমকে দৃঢ় করে দেবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ، وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [يوسف: ٢١]
"আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে প্রবল; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২১]

আল্লাহর সৃষ্ট সমগ্র মানবকুলের সামনে ইসলাম ও নবীচরিত্রের সৌন্দর্য, মাহাত্ম্য ও পরিপূর্ণতা তুলে ধরে দাওয়াতের লক্ষ্যে লেখা-লেখি করা কি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র অন্তর্ভুক্ত নয়? ইসলাম বিদ্ধেষীদের মনে তাদের মূর্খতাহেতু সৃষ্ট সকল সন্দেহ-সংশয় রোধকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ করা কি আমাদের কর্তব্যের আওতায় পড়ে না? যারা অজ্ঞতার নিম্নসীমায় বাসকারী, অন্ধকারাচ্ছন্ন অন্তরের অধিকারী এবং ইসলামের বড়ত্ব, মাহাত্ম্য ও নবীচরিত্রের সৌন্দর্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর -এ সকল মানবগোষ্ঠির দ্বারে দ্বারে ধর্ম-জ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে ছুটে যাওয়ার কি প্রয়োজন নেই? আল্লাহর দীনকে তাঁর স্বকীয় অবস্থানে নিয়ে যেতে ইসলামের সব সৌন্দর্য পৃথিবীর সকল মানবগোষ্ঠির সামনে তাদের নিজস্ব ভাষায় উপস্থাপিত হওয়ার কি কোনো প্রয়োজন নেই? আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ ﴾ [ ابراهيم: ٤]
"আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তার কাওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে তিনি তাদের কাছে বর্ণনা দেন।" [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ০৪]

ব্যাপক হারে মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে পূর্ণ উদাসীন হয়ে শুধুমাত্র খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা নিয়ে মগ্ন থাকতে দেখে কি আমাদের অন্তরে কোনো কষ্ট অনুভূত হয় না? ইয়াহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম বিদ্বেষীদের নিকট থেকে ইসলামের বিকৃত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত ব্যাখ্যা পাওয়ার কারণে লক্ষ-কোটি মানুষ যে আজ ইসলাম বিমুখ, সে জন্য কি আমাদেরকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে না?

দায়িত্ব অনেক মহৎ, অবহেলার পরিণতিও অত্যন্ত ভয়াবহ। গোটা পৃথিবী আমাদের দীনের পূর্ণাঙ্গতার পানে তাকিয়ে রয়েছে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো নেতৃত্বের অভাব অনূভব করছে। পৃথিবীবাসীর সামনে এর সঠিক রূপরেখা তুলে ধরার কাজ এতো সহজ নয়। শত্রুরা ওঁত পেতে আছে। শয়তানও বসে নেই। চূড়ান্ত লড়াই শুরু হয়ে গেছে। তবে আমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর ঘোষণা, তিনিই আমাদের অন্তরকে মজবুত করবেন এবং আমাদের কদমকে দৃঢ় করে দেবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ، وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ ﴾ [يوسف: ٢١]
"আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে প্রবল; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ২১]

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ

📄 ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ


সর্বপ্রথম আমাদের এটা জানা উচিৎ যে, একজন মানুষ হিসেবে তার প্রতি সাধারণ বিবেচনায় ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী কী? তাহলে আমরা জানতে পারব অমুসলিমদের বিষয়গুলোকে ইসলাম কীভাবে গ্রহণ করে এবং তাদের সাথে ইসলামের আচরণবিধি কী?

নিশ্চই একজন মানুষ সাধারণ মানবিক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত এবং সাধারণভাবে এ সম্মানের বিষয়টি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম ও বর্ণে নির্বিশেষে এতে কোনো তারতম্য নেই। আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে ঘোষণা করেন:
﴿ وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي ءَادَمَ وَحَمَلْتَهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا ﴾ [الاسراء: ٧٠]
"আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিযিক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে মর্যাদা দিয়েছি।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৭০]

আদম সন্তানের এ সম্মানের বিষয়টি ব্যাপক তথা সকল মানুষই এতে অর্ন্তভুক্ত। আল্লাহ নিজেই আপন অনুগ্রহের ছায়া মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্যই বিস্তৃত করেন। কাজেই সকল মানুষকেই তিনি জলে-স্থলে বাহন ও রিযিক দান করেন, সকল মানুষকেই আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সব কিছুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।

ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গিটি সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। ইসলামী শরী'আতে সকল ক্ষেত্রেই মানবকুলের প্রতি এ সম্মান রয়েছে। শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কথা এবং কাজেই এ দৃষ্টিভঙ্গিটির প্রতিফলন ঘটেছে। এটা আমাদের জন্য এক মহান ও অনন্য পন্থা ও পদ্ধতির সন্ধান দেয়, যে পন্থা ও পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় বিরুদ্ধাচারণকারী ও অস্বীকারকারীদের সাথে আচরণ করেছেন।

সকলের সাথেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ ছিল সম্মানসূচক। কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে অপদস্থ করা বা কারো প্রতি যুলুম করা কিংবা স্বীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং তার মর্যাদাহানী করা বৈধ নয়। এ বিষয়টি কুরআনে কারীমের অনেক আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনচরিত থেকে স্পষ্টত ফুটে উঠে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ﴾ [الانعام: ١٥١]

"আর বৈধ কারণ ছাড়া সে প্রাণকে হত্যা করো না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৫১]

পবিত্র কুরআনের এ আদেশটি ব্যাপক অর্থবোধক। কাজেই মুসলিম এবং অমুসলিম সকল মানব প্রাণই এখানে উদ্দেশ্য। অতএব ইসলামের আদল তথা ইনসাফ ও ন্যায়ের বাস্তবায়নও সাধারণভাবে সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ধর্ম ও বর্ণ বিবেচনায় এখানে তারতম্য করা যাবে না。

ইমাম কুরতবী রহ. বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ কর্তৃক হারাম হওয়া প্রাণকে হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। চাই সেটি মু'মিনের প্রাণ হোক বা চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের। তবে যদি কারো দ্বারা এমন কোনো কাজ সংগঠিত হয়, যার দরুন তাকে হত্যা করা ওয়াজিব সেটা ভিন্ন ব্যাপার। 13 অতঃপর তিনি একাধিক হাদীস উল্লেখ করেছেন। যেমন,
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «مَنْ قَتَلَ مُعَاهَداً فِي غَيْرِ كُنْهِهِ، حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ».
"যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধকে অন্যায়ভাবে কোনো কারণ ছাড়া হত্যা করেছে, আল্লাহ তার উপর জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন।"14

ইসলামী শরী'আতে সকল শ্রেণির মানুষের প্রতি সর্বপ্রকার যুলুম নিষিদ্ধ। আর এ নিষিদ্ধকরণ অগণিত আয়াতে কারীমাহ ও হাদীসে নববী দ্বারা প্রমাণিত এবং এ বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামত দিবসে বান্দার হিসাব-নিকাশের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: ﴿وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيمَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا﴾ [الانبياء: ٤٧]
"আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মীযানসমূহ স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৪৭]

এখানেও ন্যাবিচারের এ বিধানটি সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে। কোনো শর্তযুক্ত হয় নি। কাজেই সেদিন কোনো মানবাত্মার প্রতিই যুলুম করা হবে না। চাই সেই মানবাত্মা আল্লাহতে বিশ্বাসী হোক বা কাফির হোক, মুসলিম বা নাসরানী, ইয়াহূদী কিংবা আরো যত একঘেয়ে বা ভিন্ন চিন্তাধারী হোক না কেন কারো প্রতিই যুলুম করা হবে না। নিশ্চই যুলুম খুবই জঘন্য কাজ, আল্লাহ তা'আলা নিজ ও নিজ বান্দাদের জন্য যুলুম চিরতরে হারাম করে দিয়েছেন। আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদীসে কুদসী বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا عِبَادِي، إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّماً فَلَا تَظَالَمُوا».
"হে আমার বান্দারা আমার নিজের জন্য যুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা চিরতরে হারাম করেছি, কাজেই তোমরা পরস্পর একে অন্যের উপর যুলুম করো না"15

এটাই হচ্ছে মানুষের ব্যাপারে ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। এটা আত্ম-উপলব্ধি, সম্মান এবং মর্যাদাকর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যাপারে কতই না হৃদয়গ্রাহী ও মহত্তর পন্থা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যখন তার পাশ দিয়ে একজন ইয়াহূদীর শবদেহ অতিক্রম করছিল। ইমাম মুসলিম রহ, ইবন আবী লাইলার সূত্রে বর্ণনা করেন,

أَنْ قَيْسَ بْنَ سَعْدٍ وَ سَهْلَ بْنَ حُنَيْفٍ كَانَا بِالْقَادِسِيَةِ. فَمَرَّتْ بِهِمَا جَنَازَةٌ. فَقَامَا. فَقِيلَ لَهُمَا: إِنَّهَا مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ. فَقَالا : إِنَّ رَسُولَ الله صلى الله عليه وسلم مَرَتْ بِهِ جَنَازَةٌ فَقَامَ. فَقِيلَ: إِنَّهُ يَهُودِي. فَقَالَ أَلَيْسَتْ نَفْساً».
"কায়স ইবন সা'দ ও সাহল ইবন হুনায়িফ দু'জনই কাদেসিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তাদের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিল। এতে তারা দু'জনই দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাদেরকে বলা হলো যে, এ জানাযাটি একজন কাদেসিয়াবাসীর। তাঁরা দু'জনই বললেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ দিয়ে একটি জানাযা যাচ্ছিল, তিনি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাঁকে বলা হয়েছিল জানাযাটি ইয়াহুদীর। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, সে কি মানুষ নয়?”

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত এ পন্থা বা অবস্থানটি কি শ্রেষ্ঠতম নয়?

এটাই হচ্ছে শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি।

নিশ্চয়ই রাসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোক্ত অবস্থান বা আচরণের দ্বারা সকল শ্রেণির মানষের জন্য মুসলিমদের হৃদযন্ত্রে আত্ম-উপলব্ধি এবং সম্মানের বীজ বপন করেছেন এবং এরূপ সম্মানসূচক আচরণ তিনি সাধারণভাবেই করেছেন, তার (ঐ ইয়াহুদীর) আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্যে নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে করেছেন এবং অন্যদের এরূপ করার আদেশ দিয়েছেন-একথা জানার পরও যে, ঐ লোকটি একজন ইয়াহুদী ছিল।

তাহলে আমরা দেখতে পেলাম যে, ঐ সমস্ত ইয়াহুদী যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে ছিল -তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্য রাসূল হওয়ার আয়াতসমূহ (নিদর্শানাবলী) দেখেছে এবং অখণ্ডনীয় দলীলাবলী ও উজ্জলতর সুষ্পষ্ট প্রমাণাদি শুনেছে। তার পরও তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম-এর ওপর ঈমান আনে নি; বরং তারা নানানভাবে আক্রমণ করে তাঁকে হেনস্থা করেছে। ইয়াহুদীদের এতসব আপসহীনতা ও একগুয়েমির পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরই একজন অখ্যাত ব্যক্তির শবহেদের সম্মানে দাড়াঁলেন অথচ সে কোনো প্রসিদ্ধ লোক ছিল না, যদি হতো তাহলে তার ব্যপারে হাদীসের বাণীতে নাম ব্যতিরেকে শুধু "একজন ইয়াহূদী" বলা হতো না। সে কখনই মুসলিমদের পরিচিত ছিল না। এসব কিছুই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বোত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট বৈ কিছুই নয়। ঐ ইয়াহূদীর অপ্রসিদ্ধ হওয়ার এটাও একটা প্রমাণ যে, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু 'আনহুম তাকে চিহ্নিত করেছে তার ইয়াহুদিত্বের বৈশিষ্ট্য দিয়ে, তার নাম দিয়ে নয়। অতঃপর তাঁর দাঁড়ানোকে "সে কি একজন মানুষ নয়" কথা দ্বারা প্রত্যয়ন করেছেন, বৈধতা দিয়েছেন ও দৃঢ় করেছেন; কিন্তু তিনি ঐ ইয়াহূদীর কোনো বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের কথা উল্লেখ করেন নি।

এটাই হচ্ছে দীন ইসলামে একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন। (এবং এটাই হচ্ছে ইসলামী শরী'আতে মানব মূল্যায়নের মূল দৃষ্টিভঙ্গি।)

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক এ সম্মান সূচক দাঁড়ানো সামান্যতম সময়ের জন্য ছিল না; বরং শবদেহটি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিল।

জাবের ইবন আব্দুল্লাহ সূত্রে ইমাম মুসলিম রহ, বর্ণনা করেন, قَامَ النَّبِيُّ وَأَصْحَابُهُ لِجَنَازَةِ يَهُودِي حَتَّى تَوَارَت». "রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ এক ইয়াহুদীর শবদেহের সম্মানে শবদেহটি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলেন।"16

আমার ধারণা মতে ইয়াহুদীর জানাযা অতিক্রম করা এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের শবদেহ দৃষ্টিগোচর হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকার মহৎ ও উদার মনোভাবটি সকল সাহাবায়ে কেরাম ও তৎপরবর্তী মুসলিমদের হৃদয়ে এ সুদৃঢ় চেতনা জাগ্রত করেছে যে, ইসলাম একজন মানুষকে শুধু মানুষ হওয়া হিসেবে তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেয় এবং সম্মানের চোখে দেখে। পরবর্তীতে কায়েস ইবন সা'দ¹⁷ এবং সাহল ইবন হুনাইফ' রাদিয়াল্লাহু 'আনহু কর্তৃক একজন (মজুসী) অগ্নিপূজকের শবদেহের সম্মানে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ইসলাম কর্তৃক প্রদত্ত এ সম্মানের বিষয়টিই বাস্তবায়িত হয়েছে।

আর মাজুসী হলো যারা কোনো মৌলিক বা আসমানী কিতাবধারী নয় তারা দীন ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বিশ্বাসে বিশ্বাসী; বরং তারা ইসলাম বিরোধী যুদ্ধবাজ সম্প্রদায়। এতদসত্ত্বেও সাহাবীগণ ইসলামের মানব মূল্যায়নের ধারাকে অব্যাহত রেখেছেন। কেননা তাঁরা ইয়াহূদীর শবদেহকে সম্মান দেখিয়েছেন এবং তার সম্মানে দাড়িয়েছেন। এটাই হচ্ছে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে আমাদের মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি। আর এটাই হচ্ছে সেই মহৎ মূলনীতি যা মুসলিমগণ অমুসলিমদের সাথে আচরণের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে পোষণ করে।

অতঃপর বিশ্বাসের জগতে যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোদ্ধাচরণ করে ও ভিন্ন নীতি অবলম্বন করে তাদের ব্যাপারে ইসলামের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এ যে, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক, সম্ভাব্য বরং অনির্বায বিষয়। কেননা কখনোই এমন কোনো যামানা পাওয়া যায় নি যখন কোনো একটি ইস্যুতে সকল 'আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করতেন। অতএব উলুহিয়্যাত (প্রভুত্ব) ও তাওহীদ (একত্ববাদ) এর মতো ইস্যুতে সমগ্র মানব জাতির ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হবে এটা কি করে সম্ভব? আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ النَّاسَ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ ﴾ [هود: ۱۱۸]
"যদি তোমার রব চাইতেন তবে সকল মানুষকে এক উম্মতে পরিণত করতেন। কিন্তু তারা পরস্পর মতোবিরোধকারী রয়ে গেছে।” [সূরা হূদ, আয়াত: ১১৮]

কাজেই মুসলিমগণ এ কথা খুব সহজেই মেনে নেন যে, আকীদাহগত দিক থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী থাকতেই পারে এবং তারা একথাও জানে যে, এদের দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত করাও একদম অসম্ভব। এজন্যেই মুসলিমগণ বিরুদ্ধবাদীদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সহাবস্থান মেনে নেয় এবং এ জন্যেই ইসলামী শরী'আত অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সর্বোত্তম, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুষ্পষ্ট আচরণ পরিকাঠামো প্রদর্শন করে।

অতএব, এ পটভূমিগুলোতে লক্ষ্য করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম সম্প্রদায় এ কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, কিয়ামতের দিবসে হিসাবের ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই হাতে। কোনো ব্যক্তি যদি ঈমান বা কুফুরকে গ্রহণ করতে চায় সেটা তার ওপরই বর্তাবে এবং প্রতিদান দিবসে স্বীয় রবের নিকট তারই হিসাব দিতে হবে। মুসলিমদের চিন্তার জগতে যদি আপনি পরিভ্রমন করেন তাহলে এমন একজন মুসলিম দা'ঈ তথা দীনের পথে আহ্বানকারী ব্যক্তিও পাবেন না, যিনি ভিন্ন মতাবলম্বীদের ইসলামের ছায়াতলে আসা বা তাদের দীন পরিবর্তন করার ব্যাপারে বল প্রয়োগের মানসিকতা পোষণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآمَنَ مَن فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ [يونس: ٩٩]
"আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে জমিনের সকলেই ঈমান আনত। তবে কি তুমি বাধ্য করবে, যাতে তারা মু'মিন হয়?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯৯]

মুসলিমদের মধ্যে লক্ষ্য করার মতো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, তাঁরা খুব সহজেই অমুসলিমদের কাছে নিজেদের সুষ্পষ্টতম দীনের দাওয়াত নিয়ে পৌঁছে যেতে পারে। আর এমতাবস্থায় যদি অমুসলিমদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দীনি দাওয়াতকে বাধাগ্রস্তও করে তবুও কোনো দা'ঈ কর্তৃক তারা জিজ্ঞাসিত হবে না বা কেউ তাদের কাছে কৈফিয়ত তলব করবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِن جَدَلُوكَ فَقُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ اللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ ﴾ [الحج: ٦٨، ٦٩]
"আর তারা যদি তোমার সাথে বাকবিতণ্ডা করে, তাহলে বল, 'তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ, আল্লাহ সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন ফয়সালা করে দেবেন।” [সূরা আল-হজ: ৬৮-৬৯]

এ লজিক তথা যৌক্তিকতা এবং ইসলামী শরী'আতে সকল মানবপ্রাণকে যথোপযুক্ত মূল্যায়ন বাস্তবতার কারণে এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক সকল আদম সন্তানকে সৃষ্টির সেরা ঘোষনার কারণে ইসলামী শরী'আতে মানব শ্রেষ্ঠত্য এবং মহত্ব বজায়ে অনেক শর'ঈ বিধান বর্ণিত হয়েছে। বিশেষত আদল (ন্যায়পরায়নতা), রহমত (অনুগ্রহ), উলফত (অনুরাগ), তা'আরুফ (পরিচিতি বা সামাজিক শিষ্টাচার) ইত্যাদি। এছাড়াও অনন্য ও উত্তম চরিত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এ সকল বিধি-বিধানগুলো সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা মুসলিম-অমুসলিম সকলকেই পরিবেষ্টন করে। কাজেই জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সাথেই চারিত্রিক মাহাত্ম্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা।

আর ইয়াহুদী সম্প্রদায় কর্তৃক তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতকে বিকৃত করে উত্তম আচরণকে শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধকরণ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে সকল প্রকার ধ্বংসাত্মক কর্মযজ্ঞকে বৈধতা দানের মতো গর্হিত কাজ উম্মতে মুসলিমাতে কখনও সম্ভবপর হবে না।

আমাদের ইসলামী শরী'আতে রহমত তথা দয়া ও অনুগ্রহের দৃষ্টান্তে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ ﴾ [الانبياء: ١٠٧]
"আর আমরা তো তোমাকে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।" [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]

এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের রহমতস্বরূপ প্রেরিত হওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং ধর্মীয় মতপার্থক্য ও ক্ষেত্র বিশেষ উগ্রতা থাকা সত্যেও সকল মানবগোষ্টিই এ রহমতের অন্তর্ভুক্ত।

আর তা'আরুফ (পরস্পর পরিচিতি বা সামাজিক শিষ্টাচার) এর দৃষ্টান্তে আল্লাহ তা'আলা বলেন
﴿يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ﴾ [الحجرات: ١٣]
"হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে এক নারীও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার।" [সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩]

অত্র আয়াতের আঙ্গিকে এ কথাই প্রতিয়মান হয় যে, তা'আরূফ তথা পরস্পরে সামাজিক শিষ্টাচার সুন্দর করার বিষয়টিও নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে। সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; বরং চেষ্টা করতে হবে যাতে সকল জাতি ও গোষ্টিকে যেন পারস্পরিক পরিচিতি ও সু-সম্পর্ক স্থাপনের আওতায় আনা যায়। আল্লাহ তা'আলা নিজেই তো স্বীয় অনুগ্রহে জমিনে অবস্থানরত সকল মানুষের রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়েছেন ও জমিনের সকল কিছুকে নিজেদের প্রয়োজনে মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন এবং এতে তিনি মুমিন ও কাফির হওয়ায় কোনো তারতম্য রাখেন নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ وَالْفُلْكَ تَجْرِى فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ، وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَن تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ ﴾ [الحج: ٦٥]
"তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, জমিনে যা কিছু আছে এবং নৌযানগুলো, যা তাঁরই নির্দেশে সমুদ্রে বিচরণ করে সবই আল্লাহ তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। আর তিনিই আসমানকে আটকে রেখেছেন, যাতে তাঁর অনুমতি ছাড়া তা জমিনের উপর পড়ে না যায়। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি বড়ই করুণাময়, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হজ, আয়াত: ৬৫]

উক্ত আয়াতে নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল এবং জলরাশিকে অনুগত করে দেওয়ার বিষয়টি সকল মানুষের জন্যই অবধারিত। আর এ আয়াতের চূড়ান্ত মন্তব্যে এ কথাই স্পষ্ট হয় যে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্যই সাধারণভাবে সহানুভূতি ও অনুগ্রহ প্রযোজ্য। তাওরাতকে বিকৃতকারী ইয়াহুদীদের মতো স্ব-সম্প্রদায়ের সাথে উত্তম আচরণ আর ভিন্ন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক কাজের বৈধতা ইসলাম দেয় না।

আর ক্ষমার দৃষ্টান্তে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ [ال عمران: ١٣٣، ١٣٤]
"আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩-১৩৪]

ক্ষমা মু'মিনের বৈশিষ্ট্য আর উক্ত আয়াতে যে ক্ষমার কথা বলা হয়েছে সেটা শুধু মু'মিনদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং এখানে ক্ষমা শব্দটি ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে যা মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্য প্রযোজ্য।

আরো গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ন্যায়পরায়নতার বিধান বর্ণনা করেছেন, তখন তিনি এটাকে শুধু মু'মিনদের জন্য বা মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যই নির্ধারণ বা সীমাবদ্ধ করেন নি; বরং তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং আদেশ দিয়েছেন এ কথার যে, নগণ্যতম ব্যক্তির জন্যও ন্যায়নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ﴾ [المائدة: ৮]
"কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ০৮]

অনুগ্রহ, অনুরাগ, ইনসাফ এবং সহনশীলতার এটাই হচ্ছে সেই প্রান্তিক দৃষ্টিভঙ্গি যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান চরিত্র মাধুর্য আমাদেরকে শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ইসলামী শরী'আতের উল্লিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ করেছেন।

ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক কথা হচ্ছে এ যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মহিমান্বিত চরিত্র মাধুর্য এমন এক সময়ে করে দেখিয়েছেন, যে সময়ের সভ্যতম রাজন্যবর্গ এবং সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের থেকেও এটা দুষ্প্রাপ্য ছিল।

আর এ বিষয়ে আরো সুষ্পষ্ট ধারণা পেতে চাইলে পাঠকবৃন্দের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তারা সেই বিকৃত তাওরাত গ্রন্থ যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেও ছিল এখনও রয়েছে-তার কিছু বিধি-বিধান ও রীতি-নীতির প্রতি একটু দৃষ্টিপাত করবেন। তাহলে পাঠক সুষ্পষ্টতই শরী'আতে ইসলামিয়াহ এবং মানব উদ্ভাবিত ভিত্তিহীন মতবাদ, যা মূল তাওরাত গ্রন্থে অনুপ্রবেশ করা হয়েছে-তার মধ্যে বিস্তর ফারাক উপলব্ধি করতে পারবেন।

যথা (সফর ইয়াশু‘) জিহুশো নামক গ্রন্থের কিছু অংশ তুলে ধরছি তাতেই ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের অন্যদের সাথে আচরণ পদ্ধতি কিরূপ ছিল তার একটি রূপরেখা প্রকাশ পাবে:
"জিহুশোয় এবং ইসরাঈলি সৈন্যরা নাখীশ থেকে উজলুনের দিকে রওয়ানা করে উজলুন নগরীটি অবরোধ করল। তার অধিবাসীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে এ দিনই তাদের ওপর জিহুশোয় বাহিনী কর্তৃত্ব গ্রহণ করল এবং নগরবাসীকে ধ্বংসাত্মকভাবে দমন করল। প্রত্যেকে তরবারী দিয়ে দফারফার ফায়সালা গ্রহণ করল। যেমনটা করেছিল পূর্বে লাখীশ নগরীতে। অতঃপর জিহুশোয় তার বাহিনী নিয়ে উজলুন থেকে হিবরুনের দিকে ফিরল এবং সেখানে তার অধিবাসীদের ওপর আক্রমন করে তাদের ওপর কর্তৃত্ব গ্রহণ করল। হিবরুন ও তার আশেপাশের জনপদ ধ্বংস করার পাশাপাশি হিবরুনের শাসকসহ সকল জনগোষ্টিকে হত্যা করল। এমনকি উজলুনের মতো এখানেও অশ্বগুলোও তাদের হাত থেকে পরিত্রাণ পায় নি। অতঃপর জিহুশোয় দাবীর নগরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করে তাদের ওপর আক্রমন করে কর্তৃত্ব গ্রহণ করে নিল এবং আশপাশের জনবসতিসহ পুরো এলাকা ধ্বংস করল ও তাদের শাসকসহ সকলকে হত্যা করল। এখানেও অশ্বসমূহও পরিত্রাণ পায় নি। মোটকথা: দাবীর নগরী ও তার শাসকের ওপর সে আচরণই করা হলো যেমনটি করেছিল লুবনা নগরী ও তার শাসকের সাথে। 20

ইয়াহুদী-খ্রিস্টান কর্তৃক এ ধরণের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের উপমা যুগে যুগে অসংখ্য রয়েছে। এ সংক্ষিপ্ত গ্রন্থে সেগুলোর পরিসংখ্যান টানা সম্ভব নয়। তবু সামান্যতম উপমা পেশ করলাম যাতে ইসলামী শরী'আতের আযমত (মাহাত্ম্য), অনুগ্রহ, ন্যায়-নিষ্ঠা ও সহনশীলতার বিষয়টি পাঠকবৃন্দের সামনে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। কেননা আমরা জানি এ শরী'আত এমন এক সময় আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রদত্ত হয়েছে যখন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে এ ধরণের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং লজ্জাস্কর পদক্ষেপের ঘনঘটা পরিলক্ষিত হচ্ছিল।

অপরাপর ধর্মাবলী থেকে ইসলামের উদার নীতির তুলনামূলক পার্থক্য ও স্বাতন্ত্রিকতার অর্থ এ নয় যে, ইসলাম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরকে নিজের প্রতি আহ্বান করতে আগ্রহী নয়; বরং মূল বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম শত্রু যারা তাদের শত চক্রান্ত ও অপকর্মের পরও তিনি এটাই প্রার্থনা করতেন যে, তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে নিত! যার বিশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে আবু জাহল এবং উমার ইবনুল খাত্তাব-এর জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দো'আ। তারা ইসলাম ও মুসলিমদের ঘোর শত্রু। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য দো'আ করলেন,
«اللهم أعز الإسلام بأحب هذين الرجلين إليك بأبي جهل أو بعمر بن الخطاب قال وكان أحبهما إليه عمر بن الخطاب».
“হে আল্লাহ, উমার এবং আবু জাহল এ দু'জনের মধ্যে আপনার নিকট অধিকতর পছন্দনীয় ব্যক্তি দ্বারা আপনি ইসলামকে শক্তিশালী করুন। অতঃপর বর্ণনাকারী বলেন, যদিও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উমারই অধিকতর পছন্দনীয় ছিল। "21

বাস্তবতা হচ্ছে এ যে, অমুসলিমদের দীর্ঘকাল ধরে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিমুখ হয়ে থাকা এবং দীন ইসলাম নিয়ে তাদের নানা বিভ্রান্তির পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয়ে কখনো প্রতিশোধের স্পৃহা জাগ্রত হয় নি এবং কখনও তিনি তাদের সাথে কোনো প্রকার অপব্যবহার বা কূটচালের বাসনাও পোষণ করেন নি। মূলতঃ তিনি সম্পূর্ণ এর বিপরীতমুখী চিন্তায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এদের মনোজগত অসুস্থ -এদের চিকিৎসা প্রয়োজন। এরা দিকভ্রান্ত - এদের সুষ্পষ্ট প্রমানাদিসহ সঠিক পথ দেখানো প্রয়োজন। কাজেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এহেন দাওয়াতী অভিযান এদের জন্য মুক্তি, সম্মান এবং সঠিক পথ প্রাপ্তির আলোকবর্তিকা রূপে উদিত হয়েছে।

এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব, এটাই ছিল তাঁর পথ ও পদ্ধতি এবং মানুষের সাথে আচরণের পটভূমি ও হৃদয়গ্রাহী তথ্য।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল অমুসলিমের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যাপারে ছিলেন প্রবল আগ্রহী। সেজন্যেই তিনি সকল ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজকদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। দাওয়াতের ব্যাপারে তিনি সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বনে সদা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। যদি কখনো কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায় ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করত -তখন তিনি প্রবল বিমূর্ষ হয়ে যেতেন। তাই তিনি যেন এহেন কারণে এতটা বিমূর্ষ ও মর্মপীড়িত না হন সে জন্য কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ ﴾ [الشعراء: ٣]
"তারা মুমিন হবে না বলে হয়ত তুমি আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে।” [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ০৩]

অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ ﴾ [فاطر: ۸]
"অতএব, তাদের জন্য আফসোস করে নিজে ধ্বংস হয়ো না।” [সূরা আল-ফাতির, আয়াত: ০৮]

কোনো অমুসলিমের ইসলাম গ্রহণে এহেন তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকার পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম কবুল করার জন্য কারো ওপর বল প্রয়োগকে সমর্থন করেন নি; বরং
﴿لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ﴾ [البقرة: ٢٥٦]
"দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৫৬]

এ আয়াতকে তিনি স্বীয় জীবনে কর্মপন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনে এ এক বিস্ময়কর ও অদ্ভুত ভারসাম্যতার বাস্তবায়ন ঘটেছে। তিনি যখন কাউকে স্বীয় রব থেকে নিয়ে আসা সত্যের দিকে আহ্বান করতেন তখন তিনি সর্বস্ব দিয়েই দাওয়াত দিতেন; কিন্তু কখনই কাউকে তিনি বল প্রয়োগ করে নিজের দিকে ধাবিত করতেন না।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগত বাণীটি কতইনা চিত্তাকর্ষক এবং এ বাণী দ্বারাই সাধারণত একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিভঙ্গিও ফুটে ওঠে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে,
إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ جَعَلَ الْفَرَاشُ وَهَذِهِ الدَّوَابُّ الَّتِي تَقَعُ فِي النَّارِ يَقَعْنَ فِيهَا فَجَعَلَ يَنْزِعُهُنَّ وَيَغْلِبْنَهُ فَيَقْتَحِمْنَ فِيهَا فَأَنَا آخُذُ بِحُجَزِكُمْ عَنْ النَّارِ وَهُمْ يَقْتَحِمُونَ فِيهَا».
"আমার ও লোকদের দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালালো আর যখন তার চতুর্দিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গ ও ঐ সমস্ত প্রাণী যেগুলো আগুনে পড়ে, তারা তাতে পড়তে লাগলো। তখন সে সেগুলোকে আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য টানতে লাগলো; কিন্তু তারা আগুনে পুড়ে মরল। তদ্রূপ আমি তোমাদের কোমরে ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করি অথচ তারা তাতেই প্রবেশ করবে।"22

এটাই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যত্নশীল এবং দয়াময় দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে কঠোরতা ও স্বেচ্ছাচারীতার লেশমাত্রও ছিল না।

পরিশেষে আমি পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই মহান সত্তার যিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ মহান চরিত্রমাধুর্য দ্বারা পরিপূর্ণ ও মহিমান্বিত করেছেন।

টিকাঃ
13. কুরতুবী (الجامع لأحكام القرآن) ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩২ (মুহাম্মদ ইবন আহমদ আল আনসারী আল খাযরাজী আল মালেকী আল কুরতুবী, বিখ্যাত মুফাসসীর, (الجامع لأحكام القرآن) নামক গ্রন্থের প্রণেতা। মৃত্যু: ৬৭১ হিজরী। অধিকতর জানতে দেখুন- (الزركلي الأعلام) ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২২।
14. আবু দাউদ, হাদীস নং ২৭৬০। নাসায়ী, হাদীস নং ৪৭৪৭। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২০৩৯৩। দারেমী, হাদীস নং ২৫০৪।
15. সহীহ মুসলিম )كتاب البر والصلة والآداب باب تحريم الظلم(; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২১৪৮৫; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৯০ )في الأدب المفرد(; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৬১৯; বায়হাকী, হাদীস নং ৭০৮৮( )في شعب الإيمان(; সুনান কুবরা হাদীস নং ১১২৮৩।
16. সহীহ মুসলিম (كتاب الجنائز باب القيام للجنازة) হাদীس নং ৯৬০; নাসায়ী হাদীস নং ১৯২৮; আহমদ হাদীস নং ১৯২৮, সুনানে বায়হাকী, হাদীস নং ৬৬৭০।
17. কায়েস ইবন সা'দ ইবন উবাদাহ, আরবের বিচক্ষণতম ব্যক্তিদের একজন। সমর কৌশলে পারদর্শী, অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বংশের লোক, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকেই পতাকাবাহী করেছিলেন। তিনি ৫৯ মতান্তরে ৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। অধিকতর জানতে দেখুন ،ابن الأثير: أسد الغابة - ٢٦٢/٤ ، وابن حجر: الإصابة الترجمة رقم (٧١٧٦) ، وابن عبد البر: الاستيعاب - ٣٥٠١٣.
18. সাহাল ইবন হুনাইফ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বক্ষণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকতেন এবং ওহুদের যুদ্ধেও সুদৃঢ় ছিলেন। আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু মদীনা ছেড়ে বসরায় যাওয়ার সময় তাঁকে মদীনায় প্রতিনিধি হিসেবে রেখে গেলেন। তিনি উষ্ট্রীর যুদ্ধে আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহুর সাথে অংশ গ্রহণ করেন।
সর্বশেষ আলী রাদিয়াল্লাহু 'আনহু তাঁকে ফারস্যের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। তিনি ৮৮ হিজরীতে কুফায় মৃত্যুবরণ করেন। অধিকতর জানতে দেখুন: ابن الأثير: أسد الغابة - ٢ / ٣٣٥ ، و ابن حجر : الإصابة، الترجمة رقم (۵۳۲۳) ، وابن عبد البر: الاستيعاب ۲۲۳২
19. উল্লেখ্য যে, (সফর ইয়াশু‘) (জিহুশোর বই) এটি মূলত ইবরানী ভাষায় রচিত বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের এক ধর্মাযোদ্ধার দিকে সম্পর্কিত গ্রন্থ। যার নাম ছিল ইউশা বিন নুন মূসা আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর তিনি তার ৮৪ বছর বয়সে বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছিলেন এবং ১১০ বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এ পুরো সময়টুকুই সে বিকৃত বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় সম্প্রসারণ যুদ্ধে ও সেই লক্ষ্যে অতিবাহিত করেছেন। এটি ইসরাঈলীদের নিকট একটি পবিত্রতম গ্রন্থ। উইকিপিডিয়া আরবি ভার্সন। (গুগল অনুসন্ধান)
20. কোনো সংস্করণে سفر یوشع লিখা হয়েছে: ১০ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৯।
21. তিরমিযী (كتاب المناقب : باب في مناقب عمرين الخطاب) হাদীস নং ৩৮৬৩; আহমদ, হাদীস নং ৫৬৯৬; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৪৪৮৫; মিশকাত, হাদীস নং ৬০৩৬।
22. সহীহ বুখারী: ( كتاب الرقاق : باب الانتهاء عن المعاصي ) হাদীস নং ৬১১৮; সহীহ মুসলিম: ( كتاب الفضائل : باب شفقته صلى الله عليه وسلم على امته ) হাদীস নং ২২৮১।

📘 অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আচরণ > 📄 ড. রাগিব আস-সারজানী-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

📄 ড. রাগিব আস-সারজানী-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি


ড. রাগিব আস-সারজানী ১৯৬৪ সালে মিশরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৮ সালে মিশরের কায়রো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেটার মার্ক পেয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর ১৯৯১ সালে পবিত্র কুরআনুল কারীমের হিফয সমাপ্ত করেন এবং ১৯৯২ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেটার মার্ক পেয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। অতঃপর ১৯৯৮ সালে মিশর ও আমেরিকার যৌথ ব্যবস্থাপনায় "কিডনী ও মূত্রনালীর প্রদাহ” বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
তিনি একাধারে-
১. কায়রো মেডিকেল বিশ্বদ্যিালয়ের প্রফেসর।
২. কায়রোস্থ ইতিহাস ও সভ্যতা রিচার্স সেন্টারের পরিচালনা বোর্ডের প্রধান।
৩. ইসলামী ইতিহাস সম্বলিত সর্ববৃহৎ ওয়েব সাইট www.islamstory.com-এর স্বপ্নদ্রষ্টা, রূপকার ও উপদেষ্ঠা।
৪. ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক বিষেশত ইসলামের ইতিহাসে গভীর পাণ্ডিত্ব অর্জনকারী।
৫. ইসলামী ইতিহাস অধ্যয়ণে তার অভিনব ও কৌতুহলুদ্দিপক গবেষণা এবং এ নিয়ে বিষদ পর্যালোনায় তার মননশীলতা ছিল এ রকম যে, "( مَعًا نَبْنِي خَيْرَ أُمَّة ) চলুন আমরা আমাদেরকে সর্বোত্তম উম্মত হিসেবে তৈরী করি"।
আর এ লক্ষে তিনি উম্মতের জন্য কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তন্মধ্যে:
(ক) জাগরণমূলক কর্মতৎপরতা গ্রহণ এবং উম্মাহের পূণর্গঠনে এর দ্বারা উপকৃত হওয়া।
(খ) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মুসলিম হৃদয়ে আশা সঞ্চারণ ও তাদেরকে উপকারী বিদ্যার্জনে উদ্বুদ্ধকরণ।
(গ) ইসলামের ইতিহাসকে মিথ্যা অপবাদ থেকে পরিশোধন করতঃ ইসলামের প্রকৃত সভ্যতার চিত্র উন্মোচিত করণ।
(ঘ) বক্তৃতা, গ্রন্থ রচনা, প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং নানা বিশ্লেষণ ও গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইলম ও দাওয়াহ ইলাল্লাহ-এর ময়দানে বিস্ময়কর অবদান রেখে চলেছেন। তিনি তার দাওয়াতের মিশন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
ইতিহাস ও ইসলাম নিয়ে গবেষনায় এ পর্যন্ত তার ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে:
(১) من هو محمد صلى الله عليه وسلم
(২) ماذا قدم المسلمون للعالم.. إسهامات المسلمين في حضارة الإنسانية
(৩) الرحمة في حياة الرسول صلى الله عليه وسلم
(৪) المشترك الإنساني.. نظرية جديدة للتقارب بين الشعوب
(৫) أليست نفسًا.. جمال التعامل النبوي مع غير المسلمين
(৬) قصة الأندلس
(৭) قصة الإمام محمد بن عبد الوهاب
(৮) قصة التتار من البداية إلى عين جالوت
(৯) قصة الحروب الصلبية من البداية إلى عهد عماد الدين زنكي
(১০) العلم وبناء الأمم - دراسة تأصيلية في بناء الدولة وتنميتها
(১১) روائع الأوقاف في الحضارة الإسلامية
(১২) أخلاق الحروب في السنة النبوية
(১৩) قصة العلوم الطبية في الحضارة الإسلامية
(১৪) فلسطين.. واجبات الأمة
(১৫) وشهد شاهد من أهلها
(১৬) رحماء بينهم - قصة التكافل والإغاثة في الحضارة
(১৭) بين التاريخ والواقع - أربعة اجزاء
(১৮) رمضان و نصر الأمة
(১৯) أمة لن تموت
(২০) رسالة إلى شباب الأمة
(২১) كيف تحافظ على صلوة الفجر
(২২) كيف تحفظ القرآن الكريم
(২৩) القراءة منهج حياة
(২৪) المقاطعة.. فريضة شرعية وضرورة قومية
(২৫) أخي الطبيبقاطع
(২৬) أنت و فلسطين
(২৭) فلسطين لن تضيع.. كيف؟
(২৮) لسنا في زمان أبرهة
(২৯) إلا تنصروه صلى الله عليه وسلم
(৩০) التعذيب في سجون الحرية
(৩১) رمضان وبناء الأمة
(৩২) الحج ليس للحاج فقط
(৩৩) من يشتري الجنة
এ ছাড়াও তিনি মানবিক কল্যাণে নানা ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন টিভি ও রেডিওতে সংলাপ ও আলোচনা পেশ করেন। তন্মেধ্য রয়েছ-
ইক্করা, আর-রিসালাহ, আল-হিওয়ার, আন-নাস, আল-কুদস, আল-মুসতাকবীল, আল-আরাবিয়্যাহ, আল-জাযিরাহ, আল-জাযিরা মুবাশির, আস-সাওদান, ইযা'আতু উম্মুল কাওয়ীন ও ইযা'আতু আল-কুরআনিল কারীম ফিলিস্তিন, উরদুন, লেবানন, সুদান ও আরব আমিরাতের প্রভৃতি রেডিও ও টিভি সম্প্রসারণ কেন্দ্রসমূহ।
ড. রাগিব সারজানীর সৃজনশীল কর্ম তৎপরতা এখানেই শেষ নয়; বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের জীবনাচার, উন্দোলুসের ইতিহাস, তাতারীদের ঘটনাপ্রবাহসহ নানা বিষয়ে রয়েছে তার শত শত অডিও-ভিডিও, লেকচার ও টকশো।
আল্লাহ এ মহৎ ব্যক্তির কর্মতৎপরতাকে কবুল করুন। আমীন।
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00