📄 হযরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী
হযরত মুহাম্মদ (সা.) হবেন সর্বশেষ নবী ও রাসূল। এটা মহান আল্লাহর অকাট্য সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের কথাও আল্লাহতাআলা জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বময় মানবগোষ্ঠীকে। জানিয়ে দিয়েছেন, মানব জাতির উভয় জাহানের কল্যাণে ও সফলতার উৎস-বিন্দু ইসলামের শিক্ষা ও বিশ্বাসের ভিত্তি ওহীর দরোজা বন্ধ হয়ে গেছে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। আর কোন নবীর আগমন হবে না এই মাটির বসুন্ধরায়। জিবরাঈল (আ.)-ও আর আসবেন না কোন মানবের দ্বারে। ওহীর সন্দেশ নিয়ে। তাই হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ই সর্বশেষ নবী। কিয়ামতাবধি সকল মানুষের নবী। আর তাঁর অনুগত উম্মত-ই সর্বশেষ উম্মত।
এই ঘোষণা আল্লাহর। স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন তিনি পবিত্র কোরআনে। ঘোষণার শব্দ ও ভঙ্গি সহজ ও পরিষ্কার। সেখানে সন্দেহ কিংবা ভিন্ন ব্যাখ্যার কোন সুযোগ নেই। একমাত্র বক্র স্বভাব ও সুযোগ-সন্ধানী জন ছাড়া আর কেউ তাতে সন্দেহ করেনি। সন্দেহ করার সাহস দেখায় নি। কিন্তু অন্তর-রোগীদের পথ-ই ভিন্ন। তারা সুস্থ মানুষের সাথে থাকতে পারে না বেশি ক্ষণ। সর্বশেষ নবীর গুণাবলী পবিত্র কোরআনে নবুওয়ত ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। অত্যন্ত বলিষ্ঠ প্রত্যয় ভাষ্যে বলা হয়েছে, তিনিই 'সর্বশেষ' নবী। অধিকন্তু তাঁর পর আর কোন নবী আসার প্রয়োজনকেও অস্বীকার করা হয়েছে সরল ছন্দে। 'নবীজীর পর আর কোন নবী আসার প্রয়োজন নেই'-এ কথাটি এমন শিল্পময় ভঙ্গিতে বলা হয়েছে, যা যে কোন সুস্থ বিবেকবান পাঠককে সহজেই আন্দোলিত করবে, প্রভাবিত করবে, করবে দৃঢ় বিশ্বাসে সমর্পিত। অধিকন্তু পাঠকের সামনে মূর্তিমান হয়ে উঠবে প্রিয় নবীজীর অনুসরণীয় অতুলনীয় জীবন্ত ব্যক্তিত্ব, যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের উপমাহীন রাহবর-পথপ্রদর্শক।
ইরশাদ হচ্ছে: "মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারো পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রসূল। নবীদের মোহর (সর্বশেষ নবী) ও আল্লাহতাআলা সর্ববিষয়ে জ্ঞাত।” [আহযাব: ৪০] পবিত্র কোরআন ইসলাম ও রাসূল (সা.)-এর এক জীবন্ত মুজিযা। আলোচ্য আয়াতের শেষ অংশটি 'আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত' সেই মুজিযারই দীপ্ত প্রমাণ। কারণ এখানে যখন ঘোষণা দেয়া হয়েছে, রাসূল (সা.) সর্বশেষ নবী, তখন কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে: একজন নবী কি করে কিয়ামতাবধি সকলের জন্যে আদর্শ হবেন? কি করে তিনি বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন যুগের মানবগোষ্ঠীকে পথ দেখাবেন? তাঁর আনীত শিক্ষা ও শরীয়ত কি করে সমগ্র মানব জাতির প্রয়োজন পূরণ করবে, জীবন জিজ্ঞাসার জবাব দেবে? পরিবর্তনশীল এই মানব বিশ্বে শত বিবর্তনে একই আলো কিভাবে পথ দেখাবে এ মানবগোষ্ঠীকে যুগ-যুগান্তর? এ সকল প্রশ্নের জবাব-ই দেয়া হয়েছে আয়াতের এই ক্ষুদ্র অংশে। আল্লাহ্ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন: তোমার মনে যত রকমের যত প্রশ্নই জাগুক, আল্লাহ্ সবই জানেন, পূর্ব থেকেই তিনি অবগত তোমার এই সুপ্ত প্রশ্ন সম্পর্কে।
সর্বশেষ নবীর আবির্ভাব হয়েছে আরব সমাজে। কোরআনও অবতীর্ণ হয়েছে তাদেরই ভাষায়। এজন্যে "শেষ নবী"র সংবাদটিও পরিবেশিত হয়েছে তাদেরই ভাষারীতির কলা-কৌশল মাফিক। কারণ তাঁরাই কোরআনের প্রথম সম্বোধিত মানব কাফেলা। ইসলামের প্রথম কাতারের সৈনিক তাঁরাই। তাঁরাই পরবর্তীকালের মানব কাফেলার কাছে ইসলামের ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন, তুলে ধরবেন আল-কোরআনের শিক্ষা ও আদর্শ। আর একথাও সত্য, আরবী ভাষা একটি বর্ণাঢ্য, ব্যাপক ও বিস্তৃত ভাষা। মনের ভাব বিকাশের সমুদয় উপাদান শিল্পরসে আপ্লুত হয়ে বেঁচে আছে এই ভাষায়। সাথে সাথে 'শেষ' কথাটি বোঝাবার জন্যে 'খাতাম' (মোহর) শব্দটির চাইতে সুন্দর ও উপযুক্ত শব্দও আরবী সাহিত্যে নেই। আরবদের বোল-চাল, ভাব বিনিময়ের বিভিন্ন কলা-কৌশলে 'শেষ' বোঝাবার ক্ষেত্রে এই শব্দটিই সর্বোচ্চ যথার্থ ও সংগত শব্দ বলে বিবেচনা করা হয়। আর তারা তাদের ভাষায় অবতীর্ণ কোরআনে তাদের মুখের কথাটি কেড়ে নিয়েই বলা হয়েছে, "তিনি (সা.) নবীগণের খাতাম, তিনি সর্বশেষ নবী।”
অধিকন্তু পবিত্র কোরআনে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এমন সব গুণ আলোচিত হয়েছে ওহীয়ে ইলাহীর ভাষায় যার প্রতিটি গুণ স্পষ্ট বলে দেয় তিনিই সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেণীর মানবগোষ্ঠীর জন্যে সর্বশেষ রাসূল-সকলের জন্যে তিনি এক উপমাময় আদর্শ-সর্বোত্তম নমুনা। এ মর্মে ইরশাদ হচ্ছে:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ, কিয়ামত প্রতিষ্ঠায় আশাবাদী, যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে বেশি বেশি, তার জন্যে আল্লাহর নবীর আনুগত্যটাই ভাল।" [আহযাব: ২১]
আরও ইরশাদ হয়েছে: "হে রাসূল! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন। তোমাদের পাপগুলো মোচন করে দেবেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।" [সূরা আল ইমরান: ৩১]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: “হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। আপনি আল্লাহর প্রতি আহ্বানকারী এক উজ্জ্বল প্রদীপ।" [সূরা আহযাব: ৪৫]
এটা তো সকলেই জানে, আল্লাহতাআলা অতীত ও ভবিষ্যত সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। তাঁর জ্ঞানের পরিধি অসীম-অনন্ত। দৃশ্য-অদৃশ্য সব কিছুই তিনি জানেন। তাঁর জানাও অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা এ কথাও জানি, একজন বুদ্ধিমান ও পথিকৃৎ কবি-সাহিত্যিকও এমন কোন রাজ্যাধিপতির প্রশংসায় কালি ব্যয় করতে প্রস্তুত নন, যে রাজা খুব শীঘ্রই পদচ্যুত হবেন, যে রাজা অচিরেই তাজ-তখত হারিয়ে নিক্ষিপ্ত হবেন সাধারণ জনতার কাতারে। অথবা একজন অভিজ্ঞ হেকিম কিংবা কোন বিজ্ঞজনের কথাই ধরুন যিনি জানেন, সদ্যোপ্রসূত এই সন্তানটি বেশি সময় বাঁচবে না। বিজ্ঞজনরা কি এই শিশুর প্রশংসায় বাক্য ব্যয় করবেন? করবেন না। কোন জ্ঞানী বুদ্ধিমানই একান্ত ক্ষণস্থায়ী কিছুর প্রশংসা করেন না।
কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষা, সে তো সকল শ্রেণীর মানুষের জন্যে এক বিস্ময়কর আদর্শ। সকল যুগের সকল পেশার সকল দেশের মানুষের জন্যে তিনি এক অনুপম আদর্শ-অনিন্দ্য নমুনা। তাই তাঁর জীবন-সৌন্দর্য, সুবাসিত চরিত্রমাধুরী, অলংকৃত-অম্লান শারীরিক গঠন, আচার-আচরণ, স্বভাব-সভ্যতা সবই আ-কিয়ামত সকল মানুষের এক চিরন্তন সম্পদ, অব্যর্থ দিক নির্দেশক।
হাদীসের এই মহান ভাণ্ডার সিঞ্চন করে মুসলমান মনীষিগণ যুগে যুগে সংকলন করেছেন অনেক অমর গ্রন্থ, যা তাদের পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি হিসেবে নিবেদিত হয়েছে। জীবনের বাঁকে বাঁকে দিয়েছে সত্য পথের দিশা। এ বিষয়ে রচিত ও সংকলিত গ্রন্থের পরিসংখ্যান পেশ করাও আমাদের জন্য অসম্ভব। মুসলিম বিশ্বের সকল সভ্য ভাষায়-ই সীরাত চর্চা হয়েছে; নবীজীর হাদীসভিত্তিক গ্রন্থ রচিত ও সংকলিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইবনে তাইমিয়ার বিশিষ্ট শিষ্য, এই উম্মতের এক ক্ষণজন্মা পথিকৃৎ আল্লামা ইবনে কায়্যিমের 'যাদুল মাআদ' বিশেষ গুরুত্বের সাথে স্মরণযোগ্য।
এটা আল্লাহতাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও হিকমতপূর্ণ সিদ্ধান্ত; নইলে আমাদের রাসূলের (সা.) জীবনী আমাদের কাছে স্পষ্ট, অনুসরণযোগ্য ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে দিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত, অথচ পাশাপাশি অন্যান্য নবীর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের জীবন আকাশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে মূর্খতা, অসতর্কতা আর অস্পষ্টতা, বরং বলা যায়, বটের ঝুড়ি যেভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত বলিষ্ঠ অট্টালিকার অস্তিত্ব ঢেকে ফেলে, তেমনি এসব মূর্খতা আর অসতর্কতা তাঁদের জীবন-সৌন্দর্যকে গ্রাস করে ফেলেছে এবং এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁদের আবির্ভাব হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে—নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্যে। তাঁরা সেই নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আল্লাহর দীন প্রচার করেছেন। সত্য ও সুন্দরের প্রতি মানুষকে আহ্বান করেছেন। যথাসময়ে চলে গেছেন মহান মাওলার সান্নিদ্ধে। তাই তাঁদের জীবন ও শিক্ষা পরবর্তীকালে আর সংরক্ষিত থাকেনি। সংরক্ষিত থাকেনি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল না বলেই।
এই বিষয়টি প্রমাণের জন্যে হযরত ঈসা (আ.)-এর জীবনীই যথেষ্ট। তাঁর আবির্ভাব আমাদের প্রিয় নবীর পূর্বে। মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে। আর তাঁর অনুসারীরা পৃথিবীর এমন একটি জাতি যারা শিক্ষা, গবেষণা, রচনা ও সংকলনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম জাতি হিসেবে পরিচিত, বরং এ ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। পাশাপাশি তাদের নবী হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি তাদের প্রেম ও ভালবাসা তো রীতিমত সীমা ছিঁড়ে ফেলেছে স্বয়ং হযরত ঈসা নবীর (আ.) আমলেই। ভক্তির আতিশয্যে তারা তাঁকে মানুষের আসন থেকে তুলে এনে সৃষ্টিকর্তার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নবীকে বানিয়েছে খোদা। অথচ এই ভক্ত-অনুরক্তরাই যখন হযরত ঈসা (আ.)-এর জীবনী পরিবেশন করতে চায়, তখন তারা খুব সংক্ষিপ্ত তথ্যই নিবেদন করতে পারে। তারা বরং কিছু চিত্র তুলে ধরতে পারে-পারে কিছু বিচ্ছিন্ন কাহিনী পরিবেশন করতে। এসব চিত্র-কাহিনী দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সুন্দর পবিত্র জীবনের ছবি আঁকা যায় না। আদর্শ কোন মডেল হিসেবে তুলে ধরা যায় না। কিছুদিন পূর্বেও খৃস্টানরা মনে করত ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ.)-এর শেষ তিন বছরের ঘটনাগুলো সংরক্ষিত আছে। কিন্তু এখন গবেষকরা বলছেন, "ইঞ্জিলে হযরত ঈসার পঞ্চাশ দিনের বেশি তথ্য নেই।” অর্থাৎ তিন বছর নয়, মাত্র পঞ্চাশ দিনের জীবনধারা সংরক্ষিত আছে-তাও কেবল তাদের দাবী মতে।
অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) ও অন্যান্য ধর্মের রাহনুমা ও পথ-প্রদর্শকের বেলায়ও একথা পরিষ্কার করেই বলা যায়, তাদের জীবনবিভাও হারিয়ে গেছে অতীতের কালো মেঘে। যেসব কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে একজন পথনির্দেশকের জীবন দাঁড়াতে পারে, সেই সব উপাদান এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এতে কোন সন্দেহ নেই, আজ যদি নতুন কোন নবীর আবির্ভাব হয়, চাই সে নবী নতুন শরীয়তপ্রাপ্ত হোক বা না হোক, তার এই আবির্ভাব-ই রাসূল (সা.) সম্পর্কে অবতীর্ণসমূহ ইলাহী প্রশংসা, আলোকময় বৈশিষ্ট্যমালার স্পষ্ট বিরোধী, পরিষ্কার সংঘাতময়। নতুন নবীর আবির্ভাব মানেই হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে উম্মতের চিরন্তন শাশ্বত সুদৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়া। কোন নতুন নবীর আবির্ভাবই প্রিয় নবীজীর অনুপম চরিত্র মাধুরী, তাঁর হাতে গড়া সোনালী কাফেলা হাযরাতে সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত, তাঁর জন্মভূমি ও হিজরতভূমির সাথে মুসলিম উম্মাহ'র চিরন্তন বন্ধনকে করবে দুর্বল, করবে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ নবীজীর পর যদি নতুন কোন নবীর আবির্ভাব হয়, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রিয় নবীজীর সম্মানিত উম্মত আর এই নতুন নবীর উম্মতের মাঝে সৃষ্টি হবে এক বিভেদ প্রাচীর, গড়ে উঠবে এক বিস্তর ব্যবধান। কল্পিত সেই উম্মত আমাদের নবীর সূত্রে গ্রন্থিত হবার মহান গৌরব থেকে বঞ্চিত হবে, বরং নবীজীর সাথে তাদের কোন দূরবর্তী সম্পর্কও থাকবে না।
এটা পবিত্র কোরআন ও হাদীস শরীফের স্পষ্ট দাবী, প্রিয় নবীজীর পবিত্র সত্তা মুমিনদের কাছে পৃথিবীর সকল কিছু, এমন কি তাদের স্বীয় জীবনের চাইতেও অধিক প্রিয়, অধিক মূল্যবান। পৃথিবীকে সকল মুমিন বান্দা প্রিয় নবীজীকে তাদের জান-মাল সব কিছুর ওপর প্রাধান্য দেয়; উৎসর্গ করে দেয় তাঁর তরে জীবন-মরণ সব কিছু।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে: "মুমিনদের কাছে নবীগণের অধিকার তাদের স্বীয় জীবনের চাইতে বেশি আর নবীগণের সহধর্মিণীরা হলেন মুমিনদের জননী।" [আল-আহযাব: ৬]
বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন নতুন নবীর আবির্ভাব, অতঃপর তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ভালবাসার এই আলোকময় ঐক্যকে ভেঙ্গেচুরে খান খান করে দেবে; প্রিয়তমের পাশে এনে দাঁড় করাবে আরেক অংশীদার-ভালবাসার প্রার্থী। পৃথিবীর কোন প্রেমিকই এই অংশীদারিত্বকে স্বীকার করতে পারে না, মেনে নিতে পারে না। এটাই প্রাগৈতিহাসিক বাস্তবতা, এক অলৌকিক সত্য কথা।
পবিত্র কোরআনের আরেকটি স্বতন্ত্র উপস্থাপন ভঙ্গি আছে যে ভঙ্গি কথা বলে অতি গভীর থেকে। বর্ণনার এ রীতিও প্রিয় নবীজীর বিশ্বজনীন রিসালাত ও শাশ্বত শরীয়তের পরিচয় বিধানে ব্যবহৃত হয়েছে বার বার। স্পষ্ট, নিঃশংক ও দ্বিধাহীন এই উচ্চারণগুলো অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র আরবী ভাষায়। সে ভাষায় কোন মার-প্যাঁচ নেই, আছে স্বচ্ছতা, স্পষ্টতা আর ভাবের বলিষ্ঠতা। পবিত্র ওহীর ওই আলোকময় ভঙ্গিতে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষিত হয়েছে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা, মানবীয় প্রয়োজন-প্রত্যাশার পরিপূর্ণতার কথা। মানবগোষ্ঠী তার উন্নতির শিখর স্পর্শ করেছে, আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে গেছে তাঁর শীর্ষ মনজিলে-প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ সোপানে। ইরশাদ হচ্ছেঃ "আমি আজ তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম; তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম আর ইসলামকে মনোনীত করলাম তোমাদের দ্বীন হিসাবে।” [মায়িদা: ৩]
এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে দশম হিজরীতে। অবতীর্ণ হয়েছে আরাফার ময়দানে বিদায় হজ্জের মওসুমে। বিভিন্ন হাদীস সূত্রে প্রমাণিত হয়, এরপর আর হালাল-হারাম সম্পর্কিত কোন বিধান অবতীর্ণ হয়নি। এই আয়াত নাযিল হবার পর নবীজী (সা.) এই নশ্বর দুনিয়ায় অবস্থান করেছিলেন মাত্র একাশি দিন। বিশিষ্ট সাহাবীগণ যাঁরা নবীজীর সঙ্গ লাভে ছিলেন সদা অগ্রণী, তাঁর প্রতি প্রেম-ভালবাসা, তাঁর মিশন ও আদর্শের প্রতি ছিলেন সদা নিবেদিত-উৎসর্গীকৃত প্রাণ, হযরত আবু বকর আর হযরত উমর (রা.) যে কাফেলার প্রথম সারির স্বর্ণসত্তা, তাঁরা এই আয়াত নাযিল হবার সঙ্গে সঙ্গেই অনুমান করেছিলেন, নবীজী আর বেশি দিন থাকবেন না এই বিনাশী পৃথিবীতে। পরম প্রিয় বন্ধুর কাছে চলে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তার কারণ, উম্মতের প্রতি, বিশ্ব মানবতার প্রতি—যে পয়গাম পৌঁছাবার জন্যে ছিল তাঁর আভাদীপ্ত আবির্ভাব, সে পয়গাম যখন পূর্ণাঙ্গতার শীর্ষ বিন্দু ছুঁয়ে ফেলেছে, তখন আর তিনি থাকবেন কেন এই ধ্বংসালয়ে! তাঁর নিয়ামতের ধারা যখন সমাপ্তি রেখা স্পর্শ করেছে, তখন আর তিনি এই দুঃখের দুনিয়ায় পড়ে থাকবেন কোন্ প্রয়োজনে? তিনি থাকবেন না। তিনি চলে যাবেন। চলে যাবেন পরম প্রিয় বন্ধুর সকাশে। এ কথা ভাবতেই কেঁদে ফেলেছিলেন কোন কোন সাহাবী। আবার কোন কোন সাহাবী বলেছিলেন: দ্বীন যখন পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, নিয়ামত যখন পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেছে, তখন কিয়ামতের আর বেশি বাকী নেই! প্রলয় তাহলে ঘনিয়ে এসেছে! কোন কোন বিচক্ষণ ইহুদী আলেম বলেছে: এই আয়াতটি মুসলমানদের জন্যে একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যের স্মারক। অবশ্যই এটা ইসলামের জন্যেও একটি অনন্য-লা শারীক বৈশিষ্ট্য, যা অন্য কোন ধর্মের ভাগে জোটে নি। সে আরো বলেছিল: যে দ্বীনের প্রতি এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, সে দ্বীন চিরন্তন হয়ে থাকবে। মুসলমানদের উচিত এর প্রতি আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
📄 বিশুদ্ধ হাদীসের দৃষ্টিতে খতমে নবুওয়ত
এতে সন্দেহ নেই, একজন আরবী ভাষী, আরবী ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে সম্যক, ওয়াফেকহাল ব্যক্তি পবিত্র কোরআনের সাবলীল বলিষ্ঠ বর্ণনা থেকে সহজেই বুঝতে পারে, নবীজীর পর আর কোন নবীর আগমন ঘটবে না, বরং এ বিষয়ে তাকে কোন সন্দেহ-সংশয় স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট। কোথাও কোন জটিলতা নেই, রহস্যময়তা নেই। তারপরও বিষয়টির গভীর গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করে রাসূল (সা.) আরও কিছু সুস্পষ্ট প্রতিভাত ব্যাখ্যা পেশ করেছেন এ মর্মে। তিনি বিভিন্ন উপমা-উৎপ্রেক্ষার আলোকে তুলে ধরেছেন এই মহান সত্য। এ সম্পর্কিত হাদীসের সংখ্যা প্রচুর। আমরা এখানে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরছি মাত্র। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
১. "বনী ইসরাঈলের নবী তাদের শাসকও হতেন। তাদের এক নবীর ওফাতের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন দ্বিতীয় নবী। কিন্তু আমার পর আর কোন নবীর আবির্ভাব হবে না, বরং আমার খলীফা হবে।" [বুখারী শরীফ]
২. রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "আমার ও পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হলো সেই ব্যক্তির মত- যে ব্যক্তি একটি সুন্দর অট্টালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের জায়গা খালি ছিল। দর্শনার্থীরা এসে ঘুরে-ফিরে অট্টালিকা দেখে আর তাজ্জব হয়ে বলে, এখানে এই ইটটি খালি কেন? সেই ইটটিই আমি। আমি সর্বশেষ নবী।" [বুখারী শরীফ]
৩. নবীজী (সা.) বলেছেন: আমাকে ছয়টি কারণে অন্য সকল নবীর ওপর প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে: ১. আমাকে সারগর্ভ বক্তব্যের অধিকারী করা হয়েছে। ২. প্রভাব ও ভীতি দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। ৪. আমার জন্যে সমগ্র মৃত্তিকাকে মসজিদে ও পবিত্রকারী বানানো হয়েছে। আমাকে সমগ্র সৃষ্টির নবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। ৬. নবুওয়তের পরিসমাপ্তিও সাধিত হয়েছে আমার-ই মাধ্যমে। [মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ]
৪. রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, "নবুওয়ত ও রিসালাত সমাপ্ত হয়ে গেছে। আমার পর আর কোন নবী-রাসূলের আগমন হবে না।"
৫। সাহাবী হযরত জুবায়র ইবনে মুতইম (রা.) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেনঃ আমি মুহাম্মদ, আমিই আহমদ। আমিই মূলোৎপাটনকারী। আমার মাধ্যমে আল্লাহ্তায়ালা কুফুরকে মূলোৎপাটিত করবেন। আমি 'হাশির'। আমার মাধ্যমে হাশরের মাঠে সমগ্র জাতিকে পুনরুত্থিত করবেন আল্লাহতাআলা। আমি সকলের শেষে আগত। আমার পর আর কোন নবী আসবে না। [বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ]
আমরা এখানে নমুনাস্বরূপ কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করলাম। অন্যথায় এ সম্পর্কে হাদীসের সংখ্যা প্রচুর। সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ্ কাশ্মীরী (র.) তদীয় গ্রন্থ আকীদাতুল ইসলামে বলেছেন, খতমে নবুওয়তকে প্রমাণ করে এমন হাদীসের সংখ্যা দু'শ'টি। মুফতীয় শফী (র.) এ বিষয়ে প্রণীত তদীয় অমর রচনা "খতমে নবুওয়ত"- এর দুই শ' দশটি হাদীস সংকলন করেছেন।
উম্মতে মুহাম্মদীর বিশাল বিস্তীর্ণ কাল, বিশ্বময় ব্যাপ্তি, মূর্খতার আধিক্য আর বিশ্বাসের বিরোধ ও পতনের তুলনায় এ সংখ্যাও খুব বেশি নয়। মূলত মুসলমানদের সুদৃঢ় বিশ্বাস, অবিচল আকীদা, রক্ত-মাংসে নিহিত অনির্বাণ চেতনা, অধিকন্তু কোরআন-হাদীসের স্পষ্ট ভাষ্যেরই ফলশ্রুতি এটা। সন্দেহ নেই, অনন্তকাল প্রতিষ্ঠিত থাকবে বিশ্বমুসলিম তাদের এই গৌরবময় অভিধায়। এটাই তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অহংকার-সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি- তাদের নবী সর্বশ্রেষ্ঠ-সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল আর তারা হলো সর্বশেষ উম্মত।