📄 প্রাচীন ধর্মগুলোর তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা সভ্যতার পতন বৃত্তান্ত
J. G. Denison-এর ভাষায় নিম্নরূপ:
“পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে সভ্য দুনিয়া পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ চার হাজার বছর ধরে যে সভ্যতার চুল ও ডানা গজিয়েছিল তা এখন বিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছে এবং মানবকুল পুনরায় আদিম বর্বর যুগে প্রত্যাবর্তন করতে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দল ও সকল গোত্র পরস্পর সংঘর্ষে মেতে উঠবে এবং বিদায় নেবে শান্তি ও নিরাপত্তা,... প্রাচীন গোত্রীয় শাসন ব্যবস্থার প্রভাব নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল... খৃস্টবাদ প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য দ্বারা একতা ও শৃংখলার পরিবর্তে বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছিল। এ যুগ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। যে সভ্যতা এক প্রকাণ্ড বৃক্ষের ন্যায় সমগ্র দুনিয়াকে আপন ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছিল এবং যার প্রতিটি ডালে ঝুলেছিল শিল্প ও সাহিত্যের সোনালী দল তা ছিল ধ্বসে যাওয়ার কাছাকাছি এবং তার গ্রহণকাল চলছিল।”
মানব জাতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতির এ অন্তিম মুহূর্তে আল্লাহ্ আরব উপদ্বীপে এক মহামানব সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর ওপর অর্পণ করলেন মানব প্রজন্মকে উদ্ধারপূর্বক মানবতার শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এক নাজুক ও দুরূহ মিশন। এটা ছিল ঐতিহাসিকদের ব্যাপক অভিজ্ঞতা ও কল্পনাবিলাসী কবিদের উচ্চ ধারণারও অতীত। এর সপক্ষে ইতিহাসের অকাট্য সাক্ষী ও অব্যাহত ধারার বর্ণনা না থাকলে এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও কঠিন ছিল। খ্রীস্টীয় ষষ্ঠ শতকে আবির্ভূত সে মহামানব হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। এ মহামানবের প্রথম অবদান হলো, তিনি দীর্ঘকাল যাবত মানব সন্তানের মাথার ওপর জ্বলন্ত ও তার ওপর আঘাত হানতে উদ্যত নাঙা তরবারি অপসারণ করলেন এবং তাকে দান করলেন এক অপূর্ব উপহার যার কল্যাণে লাভ করল সে এক নব জীবন, অর্জন করল নতুন প্রত্যয় ও নতুন শক্তি, পেল নতুন সম্মান এবং শুরু হলো তার নবযাত্রা। রাসূলুল্লাহর বরকতে সভ্যতা-সংস্কৃতি-জ্ঞান ও শিল্প, আধ্যাত্মিকতা ও নিষ্ঠা এবং মানবতা বিনির্মাণের এক নব দিগন্ত উন্মোচিত হলো। মানব সমাজ তার নিকট থেকে পেল এক অমূল্য সম্পদ যার ওপর নির্ভর করে মানবতার সমৃদ্ধি, কল্যাণ, সংস্কৃতির গঠন ও উন্নয়ন। রাসূল (সা.)-প্রদত্ত সে অমূল্য পুঁজি ও মূলধন হলো:
কল্যাণের প্রতি অনুরাগ ও অকল্যাণ বর্জনের প্রেরণা, শির্ক শক্তি তথা শির্ক কেন্দ্রের মূলোৎপাটন এবং সৎ কর্মের প্রসার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ত্যাগ স্বীকারের বরকতপূর্ণ সংকল্প। বলা বাহুল্য, মানুষের সকল উন্নতি, অগ্রগতি, অবিস্মরণীয় অবদানগুলোর মূলে রয়েছে একমাত্র এই পবিত্র প্রেরণা ও বরকতপূর্ণ সংকল্প। কারণ সকল উপায়-উপকরণ, সাজ-সরঞ্জাম আর অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একমাত্র মানুষেরই দৃঢ়তা ও সংকল্পেরই অধীন।
টিকাঃ
২. J. H. DENISON, EMOTION AS THE BASIS OF CIVILIZATION (LONDON-1928), P. 265.
১. ROBERT BRIFFAULT, THE MAKING OF HUMANITY. (LONDON - 1919) P. 164.
📄 তাতারী প্রলয় রোধ ও ইউরোপকে জ্ঞানের আলো দান
এ দু'টি বৈপ্লবিক অবদানের নৈতিক ও মানবিক দাবী হচ্ছে তার প্রকৃত উৎসমূলের মাহাত্ম্য ও অনুগ্রহ স্বীকার করা। আর যে কোন উপলক্ষ ও শিরোনামে এ ব্যাপারে মত প্রকাশ করা হলে কিংবা তার বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা নেয়া হলে তখন অবশ্যই আমাদেরকে যাবতীয় নৈতিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, যা হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি, সভ্যতা ও দর্শনসমূহের মধ্যে মর্যাদার আসন নিয়ে টিকে আছে। এ মূল্যবোধ অনুশীলনের বেলায় নির্ভরযোগ্যতা, দৃঢ়তা, মিতাচার, ভারসাম্য, ন্যায় ও সত্যবাদিতা অটুট রাখা কর্তব্য।
মনে রাখা দরকার, সকল ধর্মীয় গ্রন্থ, নৈতিক শাস্ত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন ইতিহাসবিদ ও সমালোচকবৃন্দের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা থেকে আমরা উপরিউক্ত নীতির শিক্ষা লাভ করেছি। শুধু ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীই নয়, বরং বিদ্যা, জ্ঞান বিনিময় ও পরস্পর উপকার প্রাপ্তির ব্যাপারটিও এ নীতির ওপর টিকে আছে, যেদিন এ নীতির বিলুপ্তি ঘটবে সেদিন যাবতীয় বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক তৎপরতা, পরীক্ষা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সমৃদ্ধ প্রয়াস তার পবিত্র ও গঠনমূলক রূপ হারিয়ে অশ্লীল সাহিত্য রচনা, কৌতুক উপস্থাপন ও অপবাদ চর্চায় পরিণত হবে এবং এর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত নেতিবাচক, বিশৃংখলাজনক ও ঘৃণার উদ্রেককারী। বলা নিষ্প্রয়োজন, জ্ঞান ও সাহিত্য ভুবন এসব থেকে সহস্রবার পানাহ্ চায় এবং এর দ্বারা বিভিন্ন জাতি ও দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কও ব্যাহত হওয়ার আশংকা বিদ্যমান।
জনসাধারণের মাঝে প্রচলিত এক অপরিপক্ক ধারণা হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কোন বিধিনিষেধ আরোপ করার অর্থ হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও দলননীতি (Coercion) প্রয়োগ সর্বোপরি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের কার্যকারিতা খর্ব করে দেয়ার প্রয়াস। কিন্তু বাস্তবতা এমন নয় যে, বাক-স্বাধীনতা নৈতিকতার সকল সীমারেখা গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হয়; যে স্বাধীনতা সভ্যতার মহান সংগঠক ও ধর্মীয় দিকপালদের ব্যাপারে এমন জঘন্য ও হীন (Obscence) ভাষায় মন্তব্য করার প্ররোচনা দেয় যা শুধু কৌতুক, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও অপ-উপন্যাস রচনার বেলায় বৈধ হতে পারে, যে স্বাধীনতা দ্বারা ইতিহাসের অমোঘ বাস্তবতা ও স্বীকৃত সত্যের টুটি চেপে ধরা হয় এবং পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় দিকপাল ও নবীদের কোটি কোটি অনুসারীদের হৃদয়ে আঘাত হানা হয় আর দেশ ও সমাজের বিভিন্ন অংশ ও উপাদানের বন্ধন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়, তা এক গুরুতর অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বলা নিষ্প্রয়োজন, সহাবস্থানের (Co-existence) নীতিতে বিশ্বাসী কোন সভ্য ও শান্তিপ্রিয় দেশে এ জাতীয় অপরাধবৃত্তির অনুমোদন দেয়া যায় না। স্বয়ং পাশ্চাত্যের একাধিক চিন্তাবিদ ও উচ্চ পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী মহলও অবাধ ও লাগামহীন বাকস্বাধীনতার বিরোধী। তাদের মতে লাগামহীন বাকস্বাধীনতার কারণে যে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির উদ্ভব হবে তা বাকস্বাধীনতা হরণের চেয়ে বহু গুণ মারাত্মক ও ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে তাদের উক্তি ও মতামত উপস্থাপনের জন্যে এক প্রবন্ধ নয়, বরং এক স্বতন্ত্র পুস্তিকার প্রয়োজন।
টিকাঃ
১. তামাদ্দুনে আরব, মূল: Gustave Lebon, ফ্রান্স, উর্দু তরজমা: শামসুল উলামা মৌলভী সাঈদ আলী বংগলী, পৃষ্ঠা ৪০০, প্রকাশনায়-উর্দু একাডেমী লক্ষ্ণৌ, ১৯৮৫।
১. ROBERT BRIFFAULT. THE MAKING OF HUMANITY. (LONDON-1919) P. 190.
২. IBID. P. 202.
১. ISAIH BERLIN IN MODERN POLITICAL THOUGHT. (ed) WILLIAM EBENSTEIN. NEW DELHI. 1974, PP. 87-88.
২. H.M. SEERVAI CONSTITUTIONAL LAW OF INDIA. VOL. 1. P-492.
📄 মুসলমানদের উদ্দেশ সীরাতের পয়গাম
সকলেই জানেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন আবির্ভূত হন তখন দুনিয়াটা এমন কোন বিরান ও অনাবাদী জায়গায় পরিণত হয় নি কিংবা কোন কবরস্থানেও তা পরিণত হয়ে যায়নি। জীবনের চাকা এখন যেভাবে চলছে, অল্প-বিস্তর পার্থক্য থাকলেও তখনও তো সেভাবেই চলছিল। দুনিয়ার তামাম কায়কারবার আজকের মতই চলছিল। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন ছিল, তেমনি কৃষিকর্মও ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ছিল, ছিল প্রশাসন চালাবার লোক আর তার নিয়মনীতি। তখনকার লোকগুলো তাদের প্রচলিত জীবনধারায় পরম তুষ্ট ও তৃপ্ত ছিল। তাদের সেই জীবনধারায় কোনরূপ কাটছাঁট, সংস্কার-সংশোধন কিংবা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কোন প্রয়োজন তারা অনুভব করত না।
কিন্তু আল্লাহতা'আলার নিকট তাঁর যমীনের এই চিত্র ও পৃথিবীর এই অবস্থা আদৌ পছন্দনীয় ছিল না। এই যুগ সম্পর্কে হাদীস পাকে বলা হচ্ছেঃ "আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াবাসীদের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপণ করলেন। তিনি দুনিয়ার তামাম অধিবাসীকে, চাই কি সে আরব বা অনারব হোক, অপছন্দ করলেন এবং তাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কিতাবধারীদের কিছু লোক এর ব্যতিক্রম ছিল।”
এমনি এক অবস্থায় আল্লাহতা'আলা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দুনিয়ার বুকে প্রেরণ করলেন এবং তাঁর সঙ্গে একটি গোটা জাতিগোষ্ঠীর আবির্ভাবের ব্যবস্থা করলেন। আর এ তো সত্য, তাদেরকে এমন কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জন্য আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছিলেন যা অন্য কোন জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা সাধিত হচ্ছিল না। যে কাজ তারা সকলে পূর্ণ নিবিষ্ট চিত্তে ও আগ্রহ সহকারে আঞ্জাম দিচ্ছিল তার জন্য কোন নতুন উম্মাহ জন্ম দেবার দরকার ছিল না এবং মানব জীবনের এই প্রশান্ত সমুদ্রে এই নতুন তরঙ্গ তোলারও প্রয়োজন ছিল না যা মুসলমানদের জন্ম লাভের ভেতর দিয়ে আবির্ভাব ঘটল এবং যারা পৃথিবীতে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করল।
আল্লাহতা'আলা যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন তখন ফেরেশতারা আবেদন করলেন, তাসবীহ-তাহলীল ও পাক-পবিত্রতা বর্ণনার জন্য তো আমরাই যথেষ্ট ছিলেন, এর জন্য আবার এই মাটির পুতুল বানাবার কী দরকার পড়ল, বুঝতে পারলাম না। আল্লাহতা'আলা বললেন: আমি জানি যা তোমরা জান না। এ যেন ইঙ্গিত দিলেন এবং সামনে গিয়ে তা স্পষ্টও করে দিলেন, আদম (আ.) কেবল এই কাজের জন্যই পয়দা হন নি, যে কাজ ফেরেশতারা আঞ্জাম দিচ্ছিলেন। তার থেকে আল্লাহ্ অন্য কাজ নিতে চান।
আজ যদি কুরাইশ সর্দারদের কিছু বলার শক্তি থাকত তাহলে তারা মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে একথা বলতে পারত, আজ তোমরা এসব জিনিসের পেছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছ, যেসব বস্তুকে তোমরা তোমাদের জীবনের পরম লভ্য ও কাঙ্ক্ষিত ভাবছ, সেই সব জিনিসই তো আমরা গোনাহগাররা তোমাদের পয়গাম্বরের সামনে পেশ করেছিলাম আর সেগুলো তোমরা এক ফোঁটা খুন না ঝরিয়েও হাসিল করতে পারতে। তাহলে তোমাদের যাবতীয় দৌড়-ঝাপ ও চেষ্টা-সাধনার প্রাপ্তি এবং সেই সমস্ত কুরবানী ও ত্যাগের মূল্য কি সেই জীবন-পদ্ধতি ও জীবনধারা যা আজ তোমরা মেনে চলেছ এবং জীবন-যিন্দেগী ও নৈতিক চরিত্রের কি সেই সমতল রেখা যার ওপর আজ তোমরা পরম তুষ্ট? আজ যদি কুরাইশ নেতৃবর্গের ভেতর থেকে কেউ, যারা ছিল ইসলামের প্রতিপক্ষ-এই প্রশ্ন করবার সুযোগ পায় তাহলে আজ আমাদের শ্রেষ্ঠ থেকে শ্রেষ্ঠতর ও যোগ্য থেকে যোগ্যতর উকীলও এর সন্তোষজনক ও থামিয়ে দেবার মত জওয়াব দিতে পারবেন না এবং এ ব্যাপারে উম্মাহর লজ্জিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।