📄 জ্ঞানের ইতিহাসে সবচে’ বড় ভ্রান্তি ও ইতিহাসের সবচে’ বড় দুর্ঘটনা
এ প্রবন্ধের সমাপ্তি পর্বে এসে আমি একটি বুনিয়াদী সত্যের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হলো আমাদের কখনও একথা ভুলে গেলে চলবে না, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলীফা। মানুষ নিজে না জ্ঞানের মূল কেন্দ্র, আর না জ্ঞানের উৎস। সেতো পৃথিবীতে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানকারী দূত বা প্রতিনিধি।
পবিত্র কুরআন (যা শিক্ষার ভিত্তি) আদম (আ.)-এর জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দানের আলোচনাটি পৃথিবীতে তিনি যে, আল্লাহর প্রতিনিধি এ কথার পরে করা হয়েছে আর তাও প্রসংগক্রমে যা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি (আ.) জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বাধীন নন, বরং একজন খলীফা তথা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জ্ঞানের ব্যবহার করতে আদিষ্ট। কিন্তু স্বাধীন নন, জ্ঞানের ইতিহাসে বরং পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরাট দুর্ঘটনা বই আর কিছুই নয় যে মানুষ ভুলে গিয়েছে, সে এ পৃথিবীতে স্বাধীন নয়, বরং সে এই সৃষ্টিজগতে স্রষ্টার স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি, তাঁর স্কন্ধে এ পৃথিবীর আমানত অর্পণ করা হয়েছে। তাঁকে পৃথিবীর মালিক ও মনিব বানিয়ে পাঠানো হয়নি যাতে সে যমীনের ওপর ও নিচে অবস্থিত ধনভাণ্ডারসমূহকে সে ব্যক্তিগত, স্বীয় জাতি, বংশ ও শ্রেণীর স্বার্থে অথবা রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার জন্য ব্যবহার করবে! তাই জ্ঞান ও মানবতার ইতিহাস উভয়ের জন্য সেদিনটি ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, যেদিন মানুষ নিজের জন্য ধ্বংসের এ রাস্তা বেছে নেয়, সে পৃথিবীতে স্বাধীন। মানুষকে সব ধরনের স্বেচ্ছাচার থেকে শুধু এ ধারণাই তাকে সঠিক পথে কায়েম রাখতে পারে, সে এ ধরার স্বাধীন মালিক নয়। রাজাধিরাজ আল্লাহর প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত, কারণ, এই সত্যের উপলব্ধিই তাকে স্বেচ্ছাচার থেকে বিরত রাখতে পারে, তার স্বেচ্ছাচারের সামনে দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধকের প্রাচীর খাড়া করতে পারে।
📄 প্রফেসর খলীক আহমদ নিজামীর মুখবন্ধ
[২২ আগস্ট ১৯৮৯-এর সন্ধ্যা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির 'সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ' কর্তৃক আয়োজিত এ সভায় প্রফেসর খালীক আহমদও উপস্থিত ছিলেন। অক্সফোর্ডের সে সুন্দর সন্ধ্যা কি কোনদিন ভোলা যাবে, যখন যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী তাঁর এ প্রবন্ধ ইংল্যান্ড, আফ্রিকা, আরব ও পাক-ভারতীয় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের এক অনন্য সমাবেশে একজন মনীষী আলেমের ভাব-গাম্ভীর্য সত্ত্বেও পরম উচ্ছ্বাসে পেশ করেছিলেন? মানবতার উদ্দেশে এ এক সমব্যথী অন্তরের আহ্বান। সাম্প্রতিককালে মহানবী (সা.)-এর ওপর সেখানকার বেশ কিছু প্রকাশনা শ্রদ্ধেয় মাওলানা নদভীর অন্তরে এক আবেগঘন অনুভব সৃষ্টি করে রেখেছিল। আর তাই তিনি চাইছিলেন, এবার যখন তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখবেন তখন তাদের বলবেন, মহানবী (সা.)-এর মহান ব্যক্তিত্ব তাদের কী দিয়েছে। ইউরোপীয়দের ওপর মহানবী (সা.)-এর অবদান কত বিরাট! এ প্রবন্ধে একটি 'আহত উপলব্ধি' কর্তৃক ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে এ আহ্বান জানানো হয়েছে যে, সে যেন অকৃতজ্ঞ অন্তরগুলোকে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয় আর বলে দেয় যে, অকৃতজ্ঞতা এমন এক নৈতিক অপরাধ যা মানব সমাজের প্রতিটি সাফল্য ও কল্যাণের দুয়ার চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।]
ইতিহাস সাক্ষী, রাসূল (সা.)-এর আগমন মানব জাতিকে চিন্তা ও কর্মের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তাদের জীবনে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানুষকে মানবতার প্রেম শিক্ষা দিয়েছেন এবং ভূপৃষ্ঠে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। মহানবী (সা.) স্বয়ং বলেন: "চারিত্রিক উৎকর্ষের পূর্ণতা বিধানের লক্ষ্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।" মহানবী (সা.) তাঁর পয়গাম মানবতার প্রতি পৌঁছে দেয়ার শেষ লগ্নে বিদায় হজ্বের সময় নাযিল হয়ঃ "আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণ করে দিলাম।"
বর্তমান যুগে এক শ্রেণীর মানুষ বিশ্বমানবতার ওপর মহানবী (সা.)-এর অসামান্য অনুগ্রহ আর অবদানের দিক থেকে চোখ বন্ধ করে আছে। তাদের এ দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনাই তাদের নিজেদের নৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্যে দায়ী। আর তাদের পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসেরও দলিল। এ প্রবন্ধে আল্লামা নদভী ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বলেছেন মহানবী (সা.) মানব জাতিকে কী দিয়েছেন। তিনি তৎকালীন বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বড় সভ্যতার-রোমান, সাসানীয় ও ভারতীয়-মৌলিক চিন্তাধারাগুলো বদলে দিয়েছেন। মানব জাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন মানবতার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ভবিষ্যতের পথকে এ শিক্ষা এতই উজ্জ্বল করেছে, যার প্রভা বহু শতাব্দী পর আজও মানব হৃদয়কে স্পর্শ করছে। মানব সভ্যতা বহুবার পাশ ফিরলেও তাঁর পয়গামের উপকারিতা অপরিবর্তিতই রয়েছে, বরং দিন দিন এর প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।