📄 প্রাচীন বিশ্বে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণকর অভিজ্ঞতালব্ধ বিজ্ঞানে তাদের নেতৃত্ব
আমি আমার অধ্যয়নের আলোকে এ দাবি করতে পারি, মুসলিম জাতি বিশাল বিস্তীর্ণ আজিমুশ্শান সাম্রাজ্যের শুধু ভিত্তিই স্থাপন করেনি, বরং এক সময় তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা বিশ্বের সকল জাতির ওপর শ্রেষ্ঠ ছিল। প্রত্যেক যুগে মুসলমানদের ভেতর এমন সব মহামানব জন্ম নিয়েছেন যারা জ্ঞান অর্জনের তীব্র আগ্রহ, নিস্বার্থ জ্ঞান সেবা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অমূল্য গ্রন্থ রচনায় যারা ছিলেন অনন্য। প্রথম যুগের আয়েম্মা, মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও মুজতাহিদীনদের কথা বাদ দিলেও (যাদের উদাহরণ দুনিয়ার কোন জাতির ইতিহাসে নেই) দেখা যায়, মুসলিম জাতি দ্বীনী ও বৈষয়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এমন সব অনন্য চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক সৃষ্টি করেছে অন্যান্য জাতির বড় বড় জ্ঞানীর সাথে যাদের তুলনা করা যায়। মুসলমানরা তাদের জ্ঞানার্জনের পরিধি শুধু তাফসীর, হাদীস, ফিক্ নীতিশাস্ত্র ও বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তারা ভূগোল, পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রকৌশলী, ডাক্তারী, রসায়ন, দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম ও সভ্যতার মত বিজ্ঞানের সকল শাখায় সেবা করেছেন। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানীরা, আলেমরা শিল্প ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দুনিয়াবাসীকে পথ প্রদর্শন করেছেন। এসব ময়দানে তারা এমন চিহ্ন রেখে গিয়েছেন যা কখনও মুছে যাবে না।
📄 মুসলিম আবিষ্কারক ও বিশেষজ্ঞগণ
১. আল-খাওয়ারিযিমী (৮৫০. ইং ২৩৬ হি.) বিশ্ব ভূগোলের ওপর সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন।
২. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল ইদ্রীস (১১৫৩ ইং ৫৬০ হি.) আল মামালিক ওয়াল মাসালিক নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে অসংখ্য চিত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট করে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক রুটের বর্ণনা দিয়েছেন।
৩. ইবনুল হায়ছাম (১০৩৯ ইং ৪৩১ হি.) দু'শ'র মত গ্রন্থ রচনা করেন, যার ভেতর ছেচল্লিশটি জ্যামিতি সংক্রান্ত, আটান্নটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক গ্রন্থ। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সূদান সীমান্তে মিশরের বিশ্ব বিখ্যাত আসওয়ান বাঁধ তৈরির পরামর্শ ও পরিকল্পনা দিয়েছিলেন। “দৃষ্টি” বিজ্ঞানে উপহার দেন গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
৪. মুহাম্মদ বিন মূসা খাওয়ারিযীমী (৮৫০ ইং ২৩৬ হিজরী) জ্যামিতি বিজ্ঞানে এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার পর শূন্য (০) আবিষ্কার (বৃদ্ধি) করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সংখ্যার অবস্থান নির্ধারণ করেন এবং এই খাওয়ারিযীমীই আলজেবরা আবিষ্কার করেন।
৫. আলবাতানী (৯২৯ ইং-৩১৭ হি.) পাশ্চাত্য যাকে (Albategni) এল ব্যটেগনী অথবা আল বাতেনুস (Albatenus) নামে স্মরণ করে, যিনি মহান আরব সৌর বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি সূর্য গ্রহণের বক্রতার সঠিক পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৬. আবু বকর মুহাম্মদ আল রাযী (৯৩২ ইং ৩১১ হি.) পাশ্চাত্য যাকে রেজিছ (Razes) নাম দিয়েছে, মধ্যযুগের সবচে বড় ডাক্তার হবার সাথে মহান দার্শনিক ও রসায়নবিদও ছিলেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ও অমর গ্রন্থ আল হাবী রচনা করেন।
৭. ইবনুল বায়তার (১২৪৮ ইং ৬৪৬ হি.) তিনি স্বীয় যুগের মহান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ- جامع المفردات الادوية والأغزية • المغনি في الادوية - এতে বিভিন্ন রোগের আলামত ও উপসর্গসমূহের বর্ণনা দিয়েছেন।
৮. বিখ্যাত পণ্ডিত ইবনে সীনা পাশ্চাত্যে যিনি আবী সীনা নামে পরিচিত তিনি দর্শন বিষয়ক (الشضاء - البখاة) চিকিৎসা বিজ্ঞান القانون في (الطب) সাইকোলজীর ওপর (احوال النفس) রচনা করেন।
৯. ইবনে খালদুন (৮০৮ হি. ১৪০৬ ইং) জ্ঞানের রাজ্যে এক দীপ্তিময় নক্ষত্রের সামিল ছিলেন। যিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম সমাজ বিজ্ঞানী ও মানব সমাজকে, সঠিক দিক দান করার লক্ষ্যে নীতিমালা সন্ধান করার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১০. জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগত আবু রায়হান আল বিরুনী (হি. ৪৪০-১০৪৮ ইং) বর্ণিল কর্ম প্রচেষ্টার প্রতিও চিরকৃতজ্ঞ, ফিজিকস্ (ما بعد الطبعيات) মেডিসিন বিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন।
টিকাঃ
১. Jewish Encyclopaedia; Vol. 8. p. 589.
২. বিস্তারিত দ্র. লেখকের منصب نبوت এর ৭ম খণ্ড বক্তৃতা ختم نبوت এর আসমানী সহীফা কোরআন জ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে নামক অধ্যায়।
📄 জ্ঞানের ইতিহাসে সবচে’ বড় ভ্রান্তি ও ইতিহাসের সবচে’ বড় দুর্ঘটনা
এ প্রবন্ধের সমাপ্তি পর্বে এসে আমি একটি বুনিয়াদী সত্যের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হলো আমাদের কখনও একথা ভুলে গেলে চলবে না, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলীফা। মানুষ নিজে না জ্ঞানের মূল কেন্দ্র, আর না জ্ঞানের উৎস। সেতো পৃথিবীতে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানকারী দূত বা প্রতিনিধি।
পবিত্র কুরআন (যা শিক্ষার ভিত্তি) আদম (আ.)-এর জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দানের আলোচনাটি পৃথিবীতে তিনি যে, আল্লাহর প্রতিনিধি এ কথার পরে করা হয়েছে আর তাও প্রসংগক্রমে যা থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি (আ.) জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বাধীন নন, বরং একজন খলীফা তথা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জ্ঞানের ব্যবহার করতে আদিষ্ট। কিন্তু স্বাধীন নন, জ্ঞানের ইতিহাসে বরং পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরাট দুর্ঘটনা বই আর কিছুই নয় যে মানুষ ভুলে গিয়েছে, সে এ পৃথিবীতে স্বাধীন নয়, বরং সে এই সৃষ্টিজগতে স্রষ্টার স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি, তাঁর স্কন্ধে এ পৃথিবীর আমানত অর্পণ করা হয়েছে। তাঁকে পৃথিবীর মালিক ও মনিব বানিয়ে পাঠানো হয়নি যাতে সে যমীনের ওপর ও নিচে অবস্থিত ধনভাণ্ডারসমূহকে সে ব্যক্তিগত, স্বীয় জাতি, বংশ ও শ্রেণীর স্বার্থে অথবা রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করার জন্য ব্যবহার করবে! তাই জ্ঞান ও মানবতার ইতিহাস উভয়ের জন্য সেদিনটি ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, যেদিন মানুষ নিজের জন্য ধ্বংসের এ রাস্তা বেছে নেয়, সে পৃথিবীতে স্বাধীন। মানুষকে সব ধরনের স্বেচ্ছাচার থেকে শুধু এ ধারণাই তাকে সঠিক পথে কায়েম রাখতে পারে, সে এ ধরার স্বাধীন মালিক নয়। রাজাধিরাজ আল্লাহর প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত, কারণ, এই সত্যের উপলব্ধিই তাকে স্বেচ্ছাচার থেকে বিরত রাখতে পারে, তার স্বেচ্ছাচারের সামনে দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধকের প্রাচীর খাড়া করতে পারে।
📄 প্রফেসর খলীক আহমদ নিজামীর মুখবন্ধ
[২২ আগস্ট ১৯৮৯-এর সন্ধ্যা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির 'সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ' কর্তৃক আয়োজিত এ সভায় প্রফেসর খালীক আহমদও উপস্থিত ছিলেন। অক্সফোর্ডের সে সুন্দর সন্ধ্যা কি কোনদিন ভোলা যাবে, যখন যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী তাঁর এ প্রবন্ধ ইংল্যান্ড, আফ্রিকা, আরব ও পাক-ভারতীয় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের এক অনন্য সমাবেশে একজন মনীষী আলেমের ভাব-গাম্ভীর্য সত্ত্বেও পরম উচ্ছ্বাসে পেশ করেছিলেন? মানবতার উদ্দেশে এ এক সমব্যথী অন্তরের আহ্বান। সাম্প্রতিককালে মহানবী (সা.)-এর ওপর সেখানকার বেশ কিছু প্রকাশনা শ্রদ্ধেয় মাওলানা নদভীর অন্তরে এক আবেগঘন অনুভব সৃষ্টি করে রেখেছিল। আর তাই তিনি চাইছিলেন, এবার যখন তিনি ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখবেন তখন তাদের বলবেন, মহানবী (সা.)-এর মহান ব্যক্তিত্ব তাদের কী দিয়েছে। ইউরোপীয়দের ওপর মহানবী (সা.)-এর অবদান কত বিরাট! এ প্রবন্ধে একটি 'আহত উপলব্ধি' কর্তৃক ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে এ আহ্বান জানানো হয়েছে যে, সে যেন অকৃতজ্ঞ অন্তরগুলোকে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)-এর অনুগ্রহসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয় আর বলে দেয় যে, অকৃতজ্ঞতা এমন এক নৈতিক অপরাধ যা মানব সমাজের প্রতিটি সাফল্য ও কল্যাণের দুয়ার চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।]
ইতিহাস সাক্ষী, রাসূল (সা.)-এর আগমন মানব জাতিকে চিন্তা ও কর্মের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তাদের জীবনে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানুষকে মানবতার প্রেম শিক্ষা দিয়েছেন এবং ভূপৃষ্ঠে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। মহানবী (সা.) স্বয়ং বলেন: "চারিত্রিক উৎকর্ষের পূর্ণতা বিধানের লক্ষ্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।" মহানবী (সা.) তাঁর পয়গাম মানবতার প্রতি পৌঁছে দেয়ার শেষ লগ্নে বিদায় হজ্বের সময় নাযিল হয়ঃ "আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণ করে দিলাম।"
বর্তমান যুগে এক শ্রেণীর মানুষ বিশ্বমানবতার ওপর মহানবী (সা.)-এর অসামান্য অনুগ্রহ আর অবদানের দিক থেকে চোখ বন্ধ করে আছে। তাদের এ দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনাই তাদের নিজেদের নৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্যে দায়ী। আর তাদের পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসেরও দলিল। এ প্রবন্ধে আল্লামা নদভী ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বলেছেন মহানবী (সা.) মানব জাতিকে কী দিয়েছেন। তিনি তৎকালীন বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বড় সভ্যতার-রোমান, সাসানীয় ও ভারতীয়-মৌলিক চিন্তাধারাগুলো বদলে দিয়েছেন। মানব জাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন মানবতার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। ভবিষ্যতের পথকে এ শিক্ষা এতই উজ্জ্বল করেছে, যার প্রভা বহু শতাব্দী পর আজও মানব হৃদয়কে স্পর্শ করছে। মানব সভ্যতা বহুবার পাশ ফিরলেও তাঁর পয়গামের উপকারিতা অপরিবর্তিতই রয়েছে, বরং দিন দিন এর প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে।