📄 জ্ঞানের বিক্ষিপ্ত এককের ভেতর ঐক্য ও সম্পর্ক
জ্ঞান বিস্তার ও জ্ঞানের ভেতর প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টির বিপ্লবের চেয়ে ও জ্ঞানকে সঠিক লক্ষের দিকে পথ প্রদর্শন, জ্ঞানকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা এবং একে উপকারী ও বিশ্বাসের উপায় বানানোর কাজটি আরও দূরূহ, এ ব্যাপারে মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাব ও ইসলামী দাওয়াতের অবদান, গুরুত্ব, মর্যাদা ও মূল্য অনেক বেশি।
জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা বিক্ষিপ্ত, বরং তা অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতপূর্ণ ছিল। পদার্থ বিজ্ঞান ও দর্শন তো রীতিমত ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। এমন কি গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নিষ্পাপ জ্ঞানের পণ্ডিতরাও অনেক সময় এ থেকে ধর্মবিরোধী নেতিবাচক ফলাফল বের করার প্রয়াস পেত। যেমন গ্রীক বিজ্ঞানীরা (যারা এক শতাব্দী যাবত দর্শন ও গণিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সুপ্রতিষ্ঠিত রেখেছিল) এরা হয় মুশরিক, নয়তো ধর্মদ্রোহী। গ্রীক বিজ্ঞান ও চিন্তাধারা ছিল ধর্মের জন্য ভয়ংকর এবং ধর্মদ্রোহীর জন্য প্রমাণ ও আদর্শ। এ ভয়াবহ অবস্থায় ইসলামের বিরাট বড় অনুগ্রহ ছিল এই যে, জ্ঞানের বাহ্যিক সংঘর্ষপূর্ণ সকল শাখা-প্রশাখাকে এক সূত্রে গেথে দেয়। এটি ইসলামের জন্য এ কারণে সহজ ছিল যে, তার জ্ঞানের সফর সঠিক সূচনা বিন্দু (Starting point) থেকে শুরু হয়। ইসলাম জ্ঞানের সুদীর্ঘ সফর আল্লাহর ওপর ঈমান, তাঁর থেকে সাহায্য প্রার্থনা ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে এবং (اقرأباسم) নির্দেশ তামীলের লক্ষ্যেই তা শুরু করেছিল। সঠিক সূচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কল্যাণ ও শুভ পরিণামের জামিন হয়। ইসলাম, কুরআন, ঈমানের অনুগ্রহ ও অবদানের সুবাদে জ্ঞান সমূহের মাঝে এমন ঐক্য আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় যা সমগ্র একককে এক সূত্রে বেঁধে দেয়। আর তা হলো মহাপবিত্র আল্লাহর পরিচয়।
📄 পাশ্চাত্য জাগরণ, সভ্যতায় ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব যুগের সূচনায় ইসলামের অবদান
রবার্ট ব্রিফল্ট [Robert Brifault] তার গ্রন্থে [The making humanity] লিখেছেনঃ ইউরোপের উন্নতি অগ্রগতির এমন কোন দিক নেই যেখানে ইসলামী সভ্যতার অনুগ্রহ ও অবদানের সুগভীর ছাপ সুস্পষ্ট নয়।
সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তিনি আরো বলেনঃ শুধু পদার্থ বিজ্ঞানেই, যাতে আরব অবদান সর্বজনস্বীকৃত, ইউরোপে নব জীবন সৃষ্টির মুখ্য ভূমিকা পালন করেনি, বরং ইসলামী সভ্যতা ইউরোপীয় জীবনে বিশাল ও বিভিন্নমুখী প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামের প্রথম কিরণ যখন ইউরোপের মাটিতে পড়তে আরম্ভ করে তখন থেকেই এর সূচনা হয়।
প্রায়ই এ দাবি করা হয় যে, ইউরোপের পুনর্জাগরণ গ্রীক চিন্তাধারার পুনরুজ্জীবনের ফলাফল। গ্রীক থেকেই বর্তমান বিশ্ব-শক্তি ও জ্ঞানের আলো পেয়েছে, এ ধারণা খণ্ডন করে বিখ্যাত ঐতিহাসিক এইচ. জি. উইলস্ (Wells) বলেন- যে জ্ঞানের সূচনা করার পর গ্রীকরা তাকে বিদায় দেয় এবং পরিত্যাগ করে, আরব মেধা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে নব আবেগ-উদ্দীপনার সাথে সুশৃংখল ও সুবিন্যস্তভাবে নিজেদের গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করে। তাই বলা যায়, গ্রীক জাতি যদি সত্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক উপায়ের জনক হয়ে থাকে তবে আরবরা তার লালনকারী। সুস্পষ্ট বর্ণনা ভঙ্গি, সহজ সরল ব্যাখ্যা, নিয়মতান্ত্রিক ও মেপে তুলে শব্দ প্রয়োগ ও অত্যন্ত গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তাকে সুসজ্জিত করেছে বরং শুধু আরবদের থেকেই আধুনিক দুনিয়া জ্ঞান ও শান্তির এ অমূল্য উপহার অর্জন করেছে।
টিকাঃ
১. The Outline of History- ১৯২০ ইং ২৭৩ পৃষ্ঠা, ২৭৩।
📄 প্রাচীন বিশ্বে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণকর অভিজ্ঞতালব্ধ বিজ্ঞানে তাদের নেতৃত্ব
আমি আমার অধ্যয়নের আলোকে এ দাবি করতে পারি, মুসলিম জাতি বিশাল বিস্তীর্ণ আজিমুশ্শান সাম্রাজ্যের শুধু ভিত্তিই স্থাপন করেনি, বরং এক সময় তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা বিশ্বের সকল জাতির ওপর শ্রেষ্ঠ ছিল। প্রত্যেক যুগে মুসলমানদের ভেতর এমন সব মহামানব জন্ম নিয়েছেন যারা জ্ঞান অর্জনের তীব্র আগ্রহ, নিস্বার্থ জ্ঞান সেবা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অমূল্য গ্রন্থ রচনায় যারা ছিলেন অনন্য। প্রথম যুগের আয়েম্মা, মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও মুজতাহিদীনদের কথা বাদ দিলেও (যাদের উদাহরণ দুনিয়ার কোন জাতির ইতিহাসে নেই) দেখা যায়, মুসলিম জাতি দ্বীনী ও বৈষয়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এমন সব অনন্য চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক সৃষ্টি করেছে অন্যান্য জাতির বড় বড় জ্ঞানীর সাথে যাদের তুলনা করা যায়। মুসলমানরা তাদের জ্ঞানার্জনের পরিধি শুধু তাফসীর, হাদীস, ফিক্ নীতিশাস্ত্র ও বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তারা ভূগোল, পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রকৌশলী, ডাক্তারী, রসায়ন, দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম ও সভ্যতার মত বিজ্ঞানের সকল শাখায় সেবা করেছেন। অধিকাংশ মুসলিম বিজ্ঞানীরা, আলেমরা শিল্প ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দুনিয়াবাসীকে পথ প্রদর্শন করেছেন। এসব ময়দানে তারা এমন চিহ্ন রেখে গিয়েছেন যা কখনও মুছে যাবে না।
📄 মুসলিম আবিষ্কারক ও বিশেষজ্ঞগণ
১. আল-খাওয়ারিযিমী (৮৫০. ইং ২৩৬ হি.) বিশ্ব ভূগোলের ওপর সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন।
২. মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল ইদ্রীস (১১৫৩ ইং ৫৬০ হি.) আল মামালিক ওয়াল মাসালিক নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন যাতে অসংখ্য চিত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট করে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্যিক রুটের বর্ণনা দিয়েছেন।
৩. ইবনুল হায়ছাম (১০৩৯ ইং ৪৩১ হি.) দু'শ'র মত গ্রন্থ রচনা করেন, যার ভেতর ছেচল্লিশটি জ্যামিতি সংক্রান্ত, আটান্নটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ক গ্রন্থ। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সূদান সীমান্তে মিশরের বিশ্ব বিখ্যাত আসওয়ান বাঁধ তৈরির পরামর্শ ও পরিকল্পনা দিয়েছিলেন। “দৃষ্টি” বিজ্ঞানে উপহার দেন গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
৪. মুহাম্মদ বিন মূসা খাওয়ারিযীমী (৮৫০ ইং ২৩৬ হিজরী) জ্যামিতি বিজ্ঞানে এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার পর শূন্য (০) আবিষ্কার (বৃদ্ধি) করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সংখ্যার অবস্থান নির্ধারণ করেন এবং এই খাওয়ারিযীমীই আলজেবরা আবিষ্কার করেন।
৫. আলবাতানী (৯২৯ ইং-৩১৭ হি.) পাশ্চাত্য যাকে (Albategni) এল ব্যটেগনী অথবা আল বাতেনুস (Albatenus) নামে স্মরণ করে, যিনি মহান আরব সৌর বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি সূর্য গ্রহণের বক্রতার সঠিক পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৬. আবু বকর মুহাম্মদ আল রাযী (৯৩২ ইং ৩১১ হি.) পাশ্চাত্য যাকে রেজিছ (Razes) নাম দিয়েছে, মধ্যযুগের সবচে বড় ডাক্তার হবার সাথে মহান দার্শনিক ও রসায়নবিদও ছিলেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ও অমর গ্রন্থ আল হাবী রচনা করেন।
৭. ইবনুল বায়তার (১২৪৮ ইং ৬৪৬ হি.) তিনি স্বীয় যুগের মহান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ- جامع المفردات الادوية والأغزية • المغনি في الادوية - এতে বিভিন্ন রোগের আলামত ও উপসর্গসমূহের বর্ণনা দিয়েছেন।
৮. বিখ্যাত পণ্ডিত ইবনে সীনা পাশ্চাত্যে যিনি আবী সীনা নামে পরিচিত তিনি দর্শন বিষয়ক (الشضاء - البখاة) চিকিৎসা বিজ্ঞান القانون في (الطب) সাইকোলজীর ওপর (احوال النفس) রচনা করেন।
৯. ইবনে খালদুন (৮০৮ হি. ১৪০৬ ইং) জ্ঞানের রাজ্যে এক দীপ্তিময় নক্ষত্রের সামিল ছিলেন। যিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম সমাজ বিজ্ঞানী ও মানব সমাজকে, সঠিক দিক দান করার লক্ষ্যে নীতিমালা সন্ধান করার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
১০. জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগত আবু রায়হান আল বিরুনী (হি. ৪৪০-১০৪৮ ইং) বর্ণিল কর্ম প্রচেষ্টার প্রতিও চিরকৃতজ্ঞ, ফিজিকস্ (ما بعد الطبعيات) মেডিসিন বিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন।
টিকাঃ
১. Jewish Encyclopaedia; Vol. 8. p. 589.
২. বিস্তারিত দ্র. লেখকের منصب نبوت এর ৭ম খণ্ড বক্তৃতা ختم نبوت এর আসমানী সহীফা কোরআন জ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে নামক অধ্যায়।