📄 নবুওয়তে মুহাম্মদীর মু'জেযা ও বৈপ্লবিক অবদান
যদি পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তি থেকে থাকেন যাঁর ব্যাপারে অত্যন্ত জোরাল ভাষায় বলা যায়, তিনি ইতিহাসের প্রচলিত ধারা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রাচীন রীতিনীতির পরিবর্তে চিন্তা-গবেষণা, পূর্বসূরীদের অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধি-বিবেচনার মাধ্যমে কার্য সম্পাদনে মানব জাতিকে অভ্যস্ত করেছেন, তিনি হলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। তাঁর শিক্ষা মানব বিবেককে করেছে উজ্জ্বল এবং প্রতিভাকে করেছে দীপ্তিময়। উল্লিখিত বক্তব্যের বলিষ্ঠ প্রমাণ এই, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সর্বপ্রথম যে বাণী অবতীর্ণ হয় তাতে মহান স্রষ্টা মানব জাতিকে 'জ্ঞানে'র মহান দান ও অনুগ্রহের কথা এবং কলমকে এ জ্ঞান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন, জ্ঞানের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রার সাথে যার সম্পর্ক চিরন্তন। এ মহাবাণী অবতীর্ণ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় বিশ্বব্যাপী জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আন্দোলন। অব্যাহত থাকে জ্ঞান চর্চার এ পবিত্র ধারা এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তি, এক জাতি থেকে অন্য জাতি, এক যুগ থেকে অন্য যুগ ও এক বংশ থেকে অন্য বংশ পর্যন্ত। জ্ঞানের প্রচার, প্রসার ও মানব জাতির প্রয়োজন অনুসারে তার বিস্তারের এ মহান অবদানের গৌরব একমাত্র সেই মহান স্রষ্টারই প্রাপ্য। জ্ঞানের এ বিরামহীন সফর ও অব্যাহত পথ পরিক্রমার কারণেই বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য পাঠশালা ও বিদ্যাপীঠ এবং আজও জীবন্ত রয়েছে সকল জ্ঞান-গবেষণাগার। প্রাণবন্ত রয়েছে খ্যাতনামা গ্রন্থাগার ভুবন।
📄 একটি অপ্রত্যাশিত সূচনা
হেরা গুহায় সর্বপ্রথম যেই ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে এবং সুদীর্ঘ ছয় শ' বছরের বিরতির পর যমীনের সাথে আসমানের, বরং সঠিক ভাষায় বলতে হয়, নবুওয়তী ওহীর মাধ্যমে যমীনের সাথে আসমানের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাতে ইবাদত-বন্দেগীর নির্দেশনা, আল্লাহর পরিচয় ও মারেফাত সম্পর্কে কোন ইতিবাচক বিধি-বিধান অথবা মূর্তি পূজা পরিহার করা ও জাহেলী যুগের আচার-অভ্যাসের সমালোচনার মতো কোন নেতিবাচক কথা ছিল না, (যদিও এসব বিষয় স্ব স্ব স্থানে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মত এ সকল বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও তাবলীগ করা হয়েছে), বরং সর্বপ্রথম বাণী যার মাধ্যমে ওহীর শুভ সূচনা হয় তা ছিল: "পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। পড়া তোমার রব মহামহিমাময় যিনি কলমের মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন যা মানুষ জানত না"। এভাবেই প্রকাশ পায় ঐতিহাসিক ঘটনার যা উন্মুক্ত করে দেয় ইতিহাসবিদ ও চিন্তাশীলদের সম্মুখে গবেষণার প্রশস্ত দিগন্ত। ওহীর এ সুর ও সূচনা এই হাকীকতের প্রতিই বলিষ্ঠ ও স্পষ্ট ইংগিত বহন করছিল। যে নিরক্ষর নবী (সা.) দ্বারা ধর্মের ইতিহাসে নবযুগের সূচনা হতে যাচ্ছে যা ব্যাপক ও গভীরভাবে পাঠ-পঠনের সুবিশাল উন্নতির যুগ, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য হবে সোনালী যুগ। যদ্বারা জ্ঞানও ও দ্বীনের যৌথ উদ্যোগে মানবতার গঠন ও বিন্যাসের কাজ সম্পাদিত হবে।
📄 আত্মা, মহাকাশ, বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের অতীতকাল, চিন্তা-ভাবনার
মহাগ্রন্থ আল্-কুরআন জ্ঞানের বিভিন্ন উপায় ও মাধ্যমের আলোচনার সাথে এমন সব বস্তুর প্রতিও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, জ্ঞানার্জনের স্বার্থে যা অধ্যয়ন করা উচিত। এ ব্যাপারে আল্-কুরআন আত্মা, মহাকাশ ও অতীত জাতিসমূহের উত্থান-পতনের বিভিন্ন অবস্থাদির প্রতি চিন্তাশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে কুরআনের ভাষায় যাকে আইয়ামুল্লাহ, সুন্নাতুল্লাহ ইত্যাদি শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে এবং আধুনিক পরিভাষায় যাকে ইতিহাস বলা হয়, যাতে মানুষ এসব বস্তুর ভেতর চিন্তা-গবেষণা করে প্রয়োজনীয় ফলাফল আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় এবং মানব জাতি তার অত্যন্ত মূল্যবান ও সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তারকারী ফলাফল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হয়।
আল্লামা ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ভাষণে ইসলামের আগমনের ফলে মানব বুদ্ধি, বিবেক, জ্ঞানের মাধ্যম ও উৎসের যে উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার সুফল ও কল্যাণের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, অন্তর্দৃষ্টি জ্ঞান আহরণের একটি উৎস মাত্র। কিন্তু আল-কুরআন জ্ঞান অর্জনের আরো যে দুটি মাধ্যমের কথা বার বার জোরালো ভাষায় উল্লেখ করেছে, তা হলো সৃষ্টি জগত, মানব ইতিহাস। মুসলিম বিশ্ব এ উভয় উৎস থেকে জ্ঞানার্জন ও উপকৃত হবার ক্ষেত্রে নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কুরআনের ভাষায় চন্দ্র, সূর্য, বছরের হ্রাস-বৃদ্ধি, রাত্রিদিনের পরিবর্তন এবং ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা, জাতিসমূহের জীবনের ব্যর্থতা ও সফলতা, যুগের আগমন ও প্রত্যাগমন, মোটকথা এ সৃষ্টি জগতের যা কিছু আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করে থাকি এর সব কিছুই এক মহাসত্যের নিদর্শনাবলী। তাই এর সব কিছু নিয়ে গবেষণা ও এর মাঝে চিন্তা-ভাবনা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। যেন এমনটি না হয়, তারা অন্ধ বধিরের মত এসব নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে। কারণ আজ যে ব্যক্তি এসব থেকে চক্ষু বন্ধ করে থাকবে সম্মুখের অনন্ত জীবনেও তারা অন্ধই হয়ে থাকবে। এ কারণেই এ বাস্তব ও অকাট্য সত্যের প্রতি বার বার লক্ষ্য করার প্রতি আহ্হ্বানের সাথে সাথে (যার শিক্ষা আল-কুরআন দান করেছে) ধীরে ধীরে মুসলমানরা যখনই এ সত্যের সন্ধান ও তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হলো।
সৃষ্টি জগত চলমান গতিশীল, তা অনন্ত এবং উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফল এই দাঁড়াল, তারা দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের শুরুতে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে যে গ্রীক (ইউনানী) দর্শন অধ্যয়ন করেছিল, সাথে সাথে তারা তার বিরোধিতা শুরু করে। শুরুতে তারা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি যে, কুরআনের মূল দর্শন ও আহ্হ্বানের সাথে রয়েছে গ্রীক দর্শনের সংঘাত, তাই তারা শুরুতে গ্রীক দর্শনের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে গ্রীক দর্শন ও চিন্তা-ধারার আলোকেই পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন শুরু করে। কিন্তু যেহেতু কুরআন পাকের ভিত্তি নূর (নূর) বাস্তব ও অকাট্য সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, অপরদিকে গ্রীক দর্শনের ভিত্তি অনুমান ও যুক্তির ওপর, অকাট্য ও বাস্তব সত্যের ওপর নয়, তাই এক পর্যায়ে এর ব্যর্থতা ছিল অপরিহার্য। বাস্তবেও তাই হলো। আর এ ছিল ঐসব কর্ম প্রচেষ্টার ব্যর্থতা যার পরে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতি তার প্রকৃত শক্তি ও আহ্বান নিয়ে প্রকাশ্যে ময়দানে এসে উপস্থিত হয়, এমন কি আধুনিক সভ্যতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকেও লক্ষ্য করলে দিবালোকের মত ফুটে উঠবে, এসব সভ্যতার বিকাশ ইসলামের কাছে ঋণী। আল্লামা ইকবাল আরও বলেন, পবিত্র কুরআন ইতিহাসকে আইয়াম আল্লাহ (আইয়াম আল্লাহ) আল্লাহর দ্বীনসমূহ বলে উল্লেখ এবং একে জ্ঞানের অন্যতম উৎস আখ্যা দিয়েছে। বুনিয়াদি সত্য এই, অতীত জাতি ও সম্প্রদায়সমূহের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক উভয়ভাবেই হিসাব গ্রহণ ও পাকড়াও করা হয় যার ফলে এ দুনিয়াতেই তাদের অপরাধের শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। এটি এমন একটি বিষয় যা প্রমাণের জন্য কুরআন পাক বার বার ইতিহাসের ওপর নির্ভর করেছে। এছাড়াও আল-কুরআন গভীরভাবে মানবগোষ্ঠীর বর্তমান ও অতীত অবস্থা ও ঘটনাবলী নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি স্বীয় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
টিকাঃ
১. The Outline of History- ১৯২০ ইং ২৭৩ পৃষ্ঠা, ২৭৩।
📄 জ্ঞানের বিক্ষিপ্ত এককের ভেতর ঐক্য ও সম্পর্ক
জ্ঞান বিস্তার ও জ্ঞানের ভেতর প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টির বিপ্লবের চেয়ে ও জ্ঞানকে সঠিক লক্ষের দিকে পথ প্রদর্শন, জ্ঞানকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করা এবং একে উপকারী ও বিশ্বাসের উপায় বানানোর কাজটি আরও দূরূহ, এ ব্যাপারে মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাব ও ইসলামী দাওয়াতের অবদান, গুরুত্ব, মর্যাদা ও মূল্য অনেক বেশি।
জ্ঞানের শাখা-প্রশাখা বিক্ষিপ্ত, বরং তা অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতপূর্ণ ছিল। পদার্থ বিজ্ঞান ও দর্শন তো রীতিমত ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। এমন কি গণিত ও চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো নিষ্পাপ জ্ঞানের পণ্ডিতরাও অনেক সময় এ থেকে ধর্মবিরোধী নেতিবাচক ফলাফল বের করার প্রয়াস পেত। যেমন গ্রীক বিজ্ঞানীরা (যারা এক শতাব্দী যাবত দর্শন ও গণিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সুপ্রতিষ্ঠিত রেখেছিল) এরা হয় মুশরিক, নয়তো ধর্মদ্রোহী। গ্রীক বিজ্ঞান ও চিন্তাধারা ছিল ধর্মের জন্য ভয়ংকর এবং ধর্মদ্রোহীর জন্য প্রমাণ ও আদর্শ। এ ভয়াবহ অবস্থায় ইসলামের বিরাট বড় অনুগ্রহ ছিল এই যে, জ্ঞানের বাহ্যিক সংঘর্ষপূর্ণ সকল শাখা-প্রশাখাকে এক সূত্রে গেথে দেয়। এটি ইসলামের জন্য এ কারণে সহজ ছিল যে, তার জ্ঞানের সফর সঠিক সূচনা বিন্দু (Starting point) থেকে শুরু হয়। ইসলাম জ্ঞানের সুদীর্ঘ সফর আল্লাহর ওপর ঈমান, তাঁর থেকে সাহায্য প্রার্থনা ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে এবং (اقرأباسم) নির্দেশ তামীলের লক্ষ্যেই তা শুরু করেছিল। সঠিক সূচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কল্যাণ ও শুভ পরিণামের জামিন হয়। ইসলাম, কুরআন, ঈমানের অনুগ্রহ ও অবদানের সুবাদে জ্ঞান সমূহের মাঝে এমন ঐক্য আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় যা সমগ্র একককে এক সূত্রে বেঁধে দেয়। আর তা হলো মহাপবিত্র আল্লাহর পরিচয়।