📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 জ্ঞানী, তত্ত্ববিদ ও আম্বিয়া-ই-কিরামের স্বরূপ নিরূপণে একটা উদাহরণ

📄 জ্ঞানী, তত্ত্ববিদ ও আম্বিয়া-ই-কিরামের স্বরূপ নিরূপণে একটা উদাহরণ


আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর তুলনায় অন্যান্য বিজ্ঞানী, তত্ত্ববিদ, গুণী ও সুধীদের স্বরূপ উন্মোচিত হবে নিম্নোক্ত উদাহরণ থেকে:

যেমন একটা সুবৃহৎ উন্নত পরিপাটি নগরী। বিভিন্ন ধরনের শিক্ষিত ও জ্ঞানীবর্গের গমনাগমন এই নগরীতে। এল একটি দল সেই নগরীতে। তাদের মনের আকর্ষণ ইতিহাস বিষয়টির সাথে। এই নগরী সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা: এই প্রাচীন নগরীটির সংস্কারক কে? প্রতিষ্ঠাতা কে? কখন থেকে নগরীটির উন্নতি সাধিত হতে থাকে? উন্নতির পথে এর বাধাগুলো কি কি ছিল? কোন্ সরকার কখন অতীত হয়েছে এখানে?

অপর একটি দলের আগমন ঘটে সেই শহরে। তাদের অন্বেষণ হচ্ছে প্রত্নতত্ত্বের অনুসন্ধান। প্রাচীন স্মৃতিচিহ্নের কি আছে কোথায় কোথায়, তারা সেই খোঁজে নিবেদিত। শহরের ঐতিহ্যবাহী এলাকাকে খনন করে উদ্‌ঘাটিত বস্তু ও লেখাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে তারা চায় এগুলোর সময়কাল নির্ধারণ করতে। তা থেকে তারা অতীতের সভ্যতা ও প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হতে প্রয়াসী হবে।

সেই শহরে কতিপয় এমন মানুষের আবির্ভাব, যাদের গবেষণা ও অধ্যবসায় ভূগোলকেন্দ্রিক। তারা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখে শুধু ভূগোল চর্চায়। তারা চিন্তা করবে-এই শহরটির চতুঃসীমা কি? এর পরিধি ও আয়তন কতটুকু? শহরটির ভৌগোলিক বা চৌহদ্দিগত অবস্থান কেমন? এর চতুষ্পার্শ্বের অবস্থানরত পর্বতমালা ও ছায়াদাতা শৃঙ্গরাজির অবস্থানটা-ই বা কি? শহরের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট পয়ঃপ্রণালীগুলো কি কি? আবার সেগুলোর উৎস কোথায়?

আবার এমন একটা দল আগমন করল সেই নগরীতে, কাব্য ও সাহিত্যই যাদের সার্বক্ষণিক গবেষণার বিষয়বস্তু। নয়নাভিরাম সুশৃঙ্খল নগরীর মনোহর চাকচিক্য, তার হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যাবলী, সকাল-সাঁঝে মন মাতানো মৃদু বাতাস ও রকমারি ফুলে প্রস্ফুটিত পুষ্পোদ্যানের শ্যামল মায়ার আকর্ষণে তারা সব সময় বিমোহিত। তাদের লালিত মানস-মুকুল তখন বিকশিত হয়ে ওঠে। তাদের প্রতিভা ও হৃদয়াপ্লুত প্রয়াস তখন রচনা করে দেয় ভাবের জোয়ারে প্রাণবন্ত, অথচ সাহিত্য সুষমামণ্ডিত চরণমালার এক সুবিশাল কাব্য গ্রন্থ।

এদিকে সেই নগরীটি এমন একটি জামাতের গমনকেন্দ্রও হলো, যাদের অভিরুচি ভাষা ও ভাষা দর্শন। নগরীতে অবস্থানরত বাসিন্দাদের ভাষা-ই তাদের আলোচ্য বিষয়। তারা পর্যবেক্ষণ চালায় ভাষার উৎস, ক্রমবিকাশ, ক্রমোন্নতির স্তরসমূহ এবং অপরাপর সব ভাষার সাথে এ নগরীর ভাষার সম্বন্ধ সম্পর্কে। এভাবে তারা ভাষাটির মূল ইতিহাস উন্মোচিত করতে চায়। সাথে সাথে কালের প্রবাহে অবলুপ্ত ক্রমবিবর্তনের ধারাসমূহও সংগ্রহ করে নেয় তারা। একত্র করে শব্দকোষ। গুছিয়ে নেয় সুবিন্যাসের সাথে ভাষার সাথে সম্পৃক্ত ব্যাকরণও। লিখন পদ্ধতি ও বর্ণমালার বিশেষ রীতিনীতিগুলো আবিষ্কার করে সে সম্পর্কে উদ্‌ঘাটিত সব তত্ত্ব বাস্তবে উপস্থাপন করে তারা।

জ্ঞানী ও গুণী সম্প্রদায়ের এসব দলের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। তারা শ্রদ্ধারও দাবিদার। এদেরকে কটাক্ষ কিংবা তাচ্ছিল্য করা যায় না। বস্তুত প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব প্রেরণা, চেতনা ও সাধনার বিষয় থাকে। তদনুযায়ী তার প্রক্রিয়াসমূহ কাজ করে চলে।

কিন্তু এসব জামাত স্বীয় মর্যাদা, মূল্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করার পর ততক্ষণ শংকামুক্ত হবে না, যতক্ষণ এ নগরী সম্পর্কে কিছু অত্যাবশ্যকীয় ও অনিবার্য বিষয় সম্পর্কে অবগত না হবে। যেমন এ নগরীটির শাসনকর্তা কে? নগরীটির প্রশাসনিক কাঠামো কি? সেসব সাধারণ আইনগুলোই বা কি, যা সকলকেই (নেশা ও পেশায় বিভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও) বাধ্যতামূলকভাবে মেনে নিতে হয়? এ নগর কিংবা দেশের নাগরিকত্ব অর্জনের বিহিত কি? এখানকার বাসিন্দাদের করের হার কত? বসতি স্থাপনের নির্ধারিত নীতিমালা-ই বা কি? এখানকার আইনে কি কি জিনিস বৈধ আর কি কি জিনিস অবৈধ? কিসেই বা লিপ্ত হলে আইনত দণ্ডনীয় হতে হয়? এতদ্ভিন্ন তাকে জেনে নিতে হবে এমন এমন কিছু বিষয়ও, যা এই সুসভ্য ও উন্নত শহরে সসম্মান ও নিরাপদে জীবন যাপনের লক্ষ্যে একান্ত অপরিহার্য হয়।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 শহরে নবীগণের দায়িত্ব কি হবে

📄 শহরে নবীগণের দায়িত্ব কি হবে


উন্নত শহরে অনুরূপ আর একটি এমন দলের আগমন হয়, যারা অতুলনীয় যোগ্যতার অধিকারী সঠিক, অথচ লাভজনক প্রয়াসের ধারক। তারা ধীশক্তির অধিকারী, তীক্ষ্ণ ও পূত অভিরুচিসম্পন্ন। মানবিক গুণে তারা সঠিকভাবে গুণী। কিন্তু তাদের কর্ম প্রক্রিয়া ও তৎপরতা একেবারেই ভিন্ন। তাদের দাওয়াত, কর্মধারা অন্যদের কর্মপদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তারা সে সুসংহত শহরে প্রবেশ করে এর প্রাণকেন্দ্র ও জীবন-শৃংখলার মূল চাবিকাঠি যেখানে, সেখানে পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছে যায়, বরং শহরের আসল মালিক (আল্লাহ্) সে দলটির হাত ধরে উৎসমূলের দিকে নিয়ে যান। মনীষীদের এই দলটি সরাসরি সেই কেন্দ্র থেকে প্রকৃত আইন ও ফরমানসমূহ অর্জন করেন। অতঃপর ওসব আইন ও ফরমান সমস্ত মানুষের কাছে প্রচার করেন। পরিশেষে তারাই সে শহরের গঠনমূলক শক্তি কিংবা গঠনমূলক প্রতিষ্ঠান ও শহরবাসীর পারস্পরিক সম্পর্কের মূল শৃংখলে পরিণত হন।

এতে দ্বিধার লেশমাত্র অবকাশ নেই, শহরের সমস্ত মানুষ, জ্ঞানী ও সুধী সম্প্রদায় নিজের জীবনের প্রতিটি স্তরে নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে জ্ঞান চর্চা ও গবেষণায় নিমগ্ন থাকার জন্য এমন একটা নিষ্কলুষ দলের অবশ্যিই মুখাপেক্ষী। কেননা সেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান সেই ইল্মে নববীর স্নিগ্ধ পরশেই লালিত হয়ে ক্রমবিকাশ ও ক্রমোন্নতির সিঁড়িগুলো অতিক্রম করছে। এই দলটি দ্বারা-ই সাধারণ জনগণ পাচ্ছে সে শিক্ষা। আর এ দলটি সেই জ্ঞান ও শিক্ষার প্রচারের দায়িত্বে সর্বমুহূর্তেই নিবেদিত থাকেন। এ 'ইল্ম' যদি না-ই থাকল, আর যদি না-ই রইল ঐ দলটি, তখন সমস্ত দল মূর্খতা ও অজ্ঞতার শিকার হবে কোন সন্দেহ নেই। হ্যাঁ, তাদের থেকে প্রচলিত আইনবহির্ভূত কাজ সংঘটিত হতে পারে। তাদেরকে আটক করে বন্দীশালায়ও প্রেরণ করা হয়। তবে কথিত ক্ষমতাধরদের যত সব জ্ঞান-বিজ্ঞান, যাবতীয় মেহনত, অনুসন্ধান ও অভিযান বিন্দুমাত্রও কাজে আসবে না। পক্ষান্তরে ওসব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নিয়ম-শৃংখলার (বিদ্যমান সমন্বিত ক্ষমতা) ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর মারিফাত লাভ। কারণ এ সুবিশাল ও সুপরিসর নগরীর শৃংখলা রক্ষা তাঁরই কুদরতে আন্‌ন্জাম পাচ্ছে। পরিচিতি লাভ করতে হবে সে প্রাণকেন্দ্রেরও, যার চতুর্দিকে এই শহর প্রদক্ষিণ করছে। এটি-ই সে মা'রিফাত, যার জন্য আম্বিয়া-ই-কিরামকে নিয়োজিত করা হয়েছে।

"এভাবে ইবরাহীমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বিস্ময়কর ব্যবস্থাগুলো দেখাই আর যাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” [সূরা আন'আম : ৭৫]

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সর্বাপেক্ষা পবিত্র দায়িত্ব

📄 সর্বাপেক্ষা পবিত্র দায়িত্ব


এই আল্লাহর মা'রিফাতের গুরুত্ব অত্যধিক। আমার বক্তব্যে উল্লিখিত উদাহরণটি শহরের নিছক একজন প্রশাসক কিংবা নিয়ন্ত্রকের ব্যাপার নয়, বরং তিনি শহরের সৃষ্টিকর্তাও। তিনিই তার অস্তিত্ব দান করলেন। এতে জীবন সঞ্চারও করলেন। জীবন যাপনের সর্ববিধ উপাদান সহজ সুলভে যুগিয়ে দিলেন। তিনি রুযীদাতা। তিনি বিনয়ী, দয়ালু, ক্ষমতাবান। সন্তানের প্রতি মাতার স্নেহ যতটুকু, সৃষ্টির সাথে তাঁর সম্পর্ক এর চেয়েও ঘনিষ্ঠতর। পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতগুলো দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে আল্লাহর সম্পর্ক তাঁর সৃষ্টিকুলের সাথে যে কতটুকু সুপরিসর, গভীর ও প্রগাঢ়। এর সাথে সাথে আল্লাহ্ পাকের কয়েকটি সুন্দর নামের পরিচিতি পাওয়া যাবে, যার মহিমায় ধারার প্রতিটি অণু-পরমাণু প্রদীপ্ত।

"তিনিই আল্লাহ্, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই; তিনি অদৃশ্য দৃশ্যের পরিজ্ঞাত; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু। তিনিই আল্লাহ্, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহিমান্বিত; তারা যাকে শরীক স্থির করে, আল্লাহ্ তা হতে পবিত্র, মহান। তিনিই আল্লাহ্ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা, সকল উত্তম নাম তাঁরই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সূরা হাশর: ২২-২৪]

সুতরাং মানুষ তার প্রদত্ত বুদ্ধির সার্বিক প্রয়াসের সদ্ব্যবহার করে আল্লাহর মা'রিফাত ও পরিচিতি লাভ করে তা রাখতে হবে অন্তরের অন্তস্তলে। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে প্রমাণ দেখাতে হবে তার প্রতি ঐকান্তিকতার। তাঁর তাবেদারী, সন্তুষ্টি, নৈকট্য ও কৃপা দৃষ্টি অর্জনে অক্লান্ত সংযম সাধনা করাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম কাজ ও পরম দায়িত্ব। মানবতা ও ভদ্রতার দাবিও এটি। সুবুদ্ধি ও নিষ্ঠা-প্রকৃতিরও এটাই চাহিদা।

মানুষের স্তর বিভিন্ন। তাদের সক্রিয়তা, তৎপরতা ও দাওয়াতের পাশে রয়েছে আম্বিয়া-ই-কিরামের তৎপরতা। উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এই পবিত্র দলটির প্রয়োজন পরাপরদের জন্য কতটুকু? শরীরের জন্য আত্মার, কর্মের ক্ষেত্রে বুদ্ধির এবং মানব জাতির জন্য দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন চোখ দু'টির প্রয়োজন যতটুকু।

তাদের উপস্থিতি ছাড়া জগত (যদিও এতে সমস্ত জ্ঞান, সাহিত্য-ভাণ্ডার, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিল্প ও পেশা থাকুক না কেন) অন্ধকার আর অন্ধকার। যেন ঘোর তিমিরাচ্ছন্ন এক সাগর!

“পুঞ্জীভূত অন্ধকার, স্তরের ওপর স্তর, এমন কি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ্ যাকে জ্যোতি দান করেন না, তার জন্য কোন জ্যোতিই নেই।” [সূরা নূর : ৪০]

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 মানবতার কল্যাণ, বরকত ও সভ্যতার অগ্রগতির আসল উপাদান

📄 মানবতার কল্যাণ, বরকত ও সভ্যতার অগ্রগতির আসল উপাদান


আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) শুধু আল্লাহর বিশুদ্ধ মা'রিফাত ও নিশ্চিত ইলমের প্রাণকেন্দ্র ও উৎস নয়, বরং এর সাথে সাথে তাঁরা মানব সমাজকে দান করেন আরো এক অমূল্য সম্পদ। মানবতার কল্যাণ ও বরকত আনয়ন এবং সভ্যতা ও উন্নতির প্রতিষ্ঠা সাধন এই সম্পদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সে মহামূল্যবান উপাদান হচ্ছে ভালোর প্রতি অনুরাগ ও মন্দের প্রতি বিরাগমনা হওয়ার পবিত্র প্রেরণা সৃষ্টি করা, শিরকের শক্তি ও ঘাঁটিগুলো ধূলিসাৎ করা, মঙ্গলের পথ উন্মুক্ত করা এবং উন্নতি লাভের নিমিত্ত নিজকে উৎসর্গ করার দৃঢ় মনোবৃত্তি। মানুষের সর্বপ্রকার উন্নতি, অগ্রগতিও অটুট কৃতিত্বের মৌলিক ও আসল কারণই হচ্ছে এই পবিত্র চেতনা ও সুদৃঢ়তা।

কারণ সমস্ত উপায়-উপকরণ, সাজ-সরঞ্জাম আর অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একমাত্র মানুষেরই দৃঢ়তা ও সংকল্পেরই অধীন। সমস্ত কৃতিত্বের মূল ভিত্ হচ্ছে মানুষের ইচ্ছাবৃত্তি। উপরিউক্ত কল্যাণমণ্ডিত বিষয়টির আসল চয়নক্ষেত্র ও উৎস আম্বিয়া-ই-কিরামের তা'লীমে আবহমানকাল ধরে বিদ্যমান রয়েছে। তাঁরা নবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েই নিজেদের কওম ও উম্মত তথা সমস্ত সমাজে ভালো কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা সৃষ্টির দিকটি অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। ন্যায়ের সাহায্য করা ও অন্যায়ের সাথে বিরোধিতা করার আদর্শকে সমাজের মানুষের মন-মস্তিস্কে প্রবেশ করিয়ে দেয়ার জন্য তাঁরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। মানবেতিহাসের এ সুদীর্ঘকালব্যাপী যখনি এ মনোবৃত্তিটি দুর্বল হয়ে পড়েছে, মানুষের প্রকৃতিতে ও চালচলনে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, প্রকাশ পেয়েছে তাদের মধ্যে তখন হিংস্রতা ও পাশবিক কার্যকলাপ, যেমন আমরা কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন জাতির মর্মান্তিক অবস্থা অবলোকন করেছি, আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) তখনই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। নিষ্ঠুরতা ও পশুত্বকে তাঁরা করুণা, বদান্যতা, ভদ্রতা ও মানবতা দ্বারা পাল্টিয়ে দেন। তারা তাদের উচ্চ তা'লীমের প্রচলন ঘটান। তাঁদের উপর্যুপরি চেষ্টা ও সাধনা বলবৎ রাখেন। তাঁরা আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের দিকে মোটেই লক্ষ্য করেন নি। নিজের ইয্যত-সম্মানের খেয়াল করার সুযোগ তাঁদের কোথায়? এমন কি স্বীয় জীবন ও দেহের কথাটুকুও ভাবতে সুযোগ পান নি তাঁরা। সে অব্যাহত ও জীবনপণ প্রচেষ্টা ও মেহনতের বদৌলতে মানবতাবিবর্জিত হিংস্র জন্তুদের মাঝে জন্ম নিল এমন সব পবিত্রাত্মা, যাদের সুঘ্রাণে সারাটি দুনিয়া বিমোহিত হয়ে উঠল, যাদের জ্যোতি ও শোভা মানবতার ইতিহাসে বয়ে এনেছে এক অপূর্ব আকর্ষণ ও স্নিগ্ধতা এবং সম্মান ও মর্যাদায় যাঁরা ফেরেশতা হতে অগ্রগামী হয়ে গেলেন। আর এসব অনুপম আদর্শের অধিকারী অনুসরণীয় পথিকৃতদের বরকতে ধ্বংসপ্রাপ্ত নিমজ্জিত মানবতার ভাগ্যে ফিরে এল নতুন জীবন। এল ন্যায় ও নিষ্ঠার শাসনকাল। সবলদের থেকে দুর্বল নিজেদের দাবি আদায়ের সুযোগ পেল। ছাগলের রক্ষক হয়ে চলল চিরশত্রু চিতাবাঘ। মরুতে প্রবাহিত হলো দয়া-দাক্ষিণ্যের শীতল হাওয়া। ছড়িয়ে পড়ল মায়া-মমতায় হৃদয়গ্রাহী সুগন্ধ। সৌভাগ্যের বিতান জমজমাট হয়ে উঠল। জান্নাতীর সরঞ্জামে দুনিয়ার বাজারের দোকান সুসজ্জিত হতে থাকে, প্রবাহিত হয় ঈমান ও ইয়াকীনের মন-মাতানো বায়ু। মানবাত্মাগুলোও লোভ-লালসার বেড়াজাল থেকে আযাদ হয়ে কল্যাণের দিকে এভাবে আকৃষ্ট হতে থাকে, লৌহখণ্ড যেভাবে হয়ে থাকে চুম্বকের দিকে।

মানব সভ্যতা, সংস্কৃতি, উন্নতি ও অগ্রগতির পথে সে মহান সম্প্রদায়টির যতটুকু অবদান রয়েছে, অন্য কারো দ্বারা তা আদৌ হয়নি। করুণা ও কৃপার সুমধুর হাওয়া, মানুষের সম্মান, ভদ্রতা, সাম্য, সামঞ্জস্য ইত্যাদি তো তাঁদেরই থেকে পেয়েছে সারা মানবকুল, যা তাঁদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।

আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর সে দয়া ও বদান্যতায় মানব জীবনের স্থায়িত্ব সম্ভব হয়েছে। আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর আবির্ভাবই যদি না হতো, ইন্সানিয়াতের নৌকা তার ইল্ম, দর্শন, প্রজ্ঞা ও কৃষ্টি-কালচার নিয়ে তুফানের শিকার হয়ে সাগরের অতল তলে তলিয়ে যেত। মানুষের স্থলে এ বসুন্ধরায় তখন বন্য পশু ও হিংস্র প্রাণীদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত-পা সঞ্চালন করতে দেখা যেত। তারা নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালককে তখন চিনত না, সম্পর্ক রাখত না ধর্ম ও চরিত্রের সাথে। বিনয়, ভালবাসা কি, তা তো বুঝতই না। সারকথা, তখন নামধারী এই মানব জাতি পানাহার কিংবা কিছু শাক-পাতা ছাড়া আর কিছুই চিনত না।

আজকের বিশ্বে যা কিছু সুউচ্চ মানবিক নেতৃত্ব, তীক্ষ্ণ অনুভূতি, উত্তম মানের চরিত্র প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যত সোচ্চার ধ্বনি শ্রুত হচ্ছে, এসবের ঐতিহাসিক সূত্র অর্থাৎ জড়িত রয়েছে আসমানী ওহীর পদতলে অর্থাৎ নবীকুলের তা'লিম, তাঁদের দাওয়াত, তাঁদের তাবলীগের কাছে। এসব একমাত্র নবীগণের বিরামহীন সাধনা ও তাঁদের সহচরবৃন্দের একনিষ্ঠতারই ফসল বৈ নয় এবং দুনিয়া (আদি থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত) তাঁদেরই দস্তরখানের নিক্ষিপ্ত উচ্ছিষ্ট কুড়াতে বাধ্য। তাঁদেরই ছড়ানো জ্যোতিতে আজ দুনিয়াবাসী সামনের দিকে এগুতে প্রয়াস পাচ্ছে। মাথাটুকু গুঁজে থাকে এদেরই প্রতিষ্ঠিত মজবুত অট্টালিকার ছায়াতলে। এভাবেই তা জীবন কাটাচ্ছে, আরো কাটাবে। সেসব ধন্য ও বরেণ্য মহামনীষীর ওপর বর্ষিত হোক লাখো সালাম!

বাহার আপ জো দুনিয়া মে আই হুয়ি হ্যায় - ইয়ে সব পউদে উনহি কি উগাই হুয়ি হ্যায়।

এখন যে ঋতুরাজ বসন্ত এল বসুন্ধরায়, উদীয়মান চারা গাছগুলো, এসেছে এরই কৃপায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00