📄 ইসলামী যুগে দর্শনের ত্রুটি
পরিতাপের বিষয়, আমাদের যে ইসলামী ফালসাফা (কালামশাস্ত্র) গ্রীকের নাস্তিকতাবাদ সমর্থিত ফালসাফার প্রতিযোগিতায় বাস্তবে এসেছিল, তাও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। তাতেও আলোচনা করা হয়েছে এই বিষয়টিতেও এমন এমন বহু কথা, যার মূলনীতি ও ফরমুলা মানুষের জ্ঞানবহির্ভূত ছিল। সঠিকভাবে এদের খবরও ছিল না এ নীতিমালার। এতে অনুপ্রবেশ করেছে বল্লাহীনভাবে গ্রীক দর্শনের বিষক্রিয়া, যা সাধারণত স্বীয় গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে উদাসীন বিধায় সচরাচর সীমালংঘন করে থাকে। এই ইলমে কালামেরও অনুরূপ মহান আল্লাহ্ পাকের অস্তিত্বের আনুষঙ্গিক বিষয়াদি, নামসমূহ ও গুণাবলীর তথ্যানুসন্ধানে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনাই পরিদৃষ্ট হচ্ছে। তারা সেসব বিষয়ে এমন বিস্তারিত আলোচনা করেছে, এমনভাবে খুঁটে খুঁটে বিশ্লেষণ করেছে, যেন তারা কোন বিজ্ঞান গবেষণাগার (Laboratory)-এ দণ্ডায়মান আছে আর সমস্ত অংশগুলোকে প্রত্যক্ষ করছে!
মহান আল্লাহ্ পাক এর ঊর্ধ্বে। তা'আলাল্লাহু আন যালিকা -
📄 আম্বিয়া-ই-কিরামের স্বাতন্ত্র্য
আম্বিয়া-ই-কিরাম (তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)-এর প্রাণ সঞ্চারক ইলমের নেই কোন অংশীদার, নেই কোন সমকক্ষ, মানবকুলের সৌভাগ্য আনয়নের ক্ষেত্রে যার কোন বিকল্প নেই এবং যা এড়িয়ে গিয়ে নাজাতেরও কোন ব্যবস্থা নেই। এটি সেই মহতী ইল্ম, যার আলোকে মানুষ নিজের ও সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টার সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারে। জানতে পারা যায় এর মাধ্যমে আল্লাহ্ পাকের সুউচ্চ গুণাবলী এবং তাঁর ও বান্দার মাঝখানে বিরাজমান সম্পর্কের সম্যক পরিচয়। এই ইল্মের আলোকে মানুষ তার আদি অন্ত নিরূপণ করতে সক্ষম হয়। মানুষ যে আসলে কি, প্রতিপালকের মোকাবিলায় তার অবস্থানটি কেমন, তা চিহ্নিত করা যায় এই নববী ইল্ম দ্বারাই। কি কাজে আল্লাহ্ পাক সন্তুষ্ট হন, কিসে অসন্তুষ্ট হন, কি করলে আখিরাতে মানুষ সৌভাগ্যবান হবে, আর কি করলে দুর্ভাগা ও ব্যর্থ হবে এসবের খতিয়ান রয়েছে এই নববী ইল্মেই।
অর্থাৎ এই ইল্ম দিক-নির্দেশনা দেয়, মানুষের কাজকর্ম, 'আকীদা, চরিত্র ও আচার-আচরণ কেমন হলে অনন্তকালের চরম শাস্তি টেনে আনবে, আর কেমন হলে টেনে আনবে অফুরন্ত পরম শান্তি। তাই এ ইল্মকে 'ইলমুন্নাজাত' বা নাজাতের ইল্ম আখ্যা দেয়া যথাযথ।
আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) যদিও স্বীয় যুগের শ্রেষ্ঠতম যোগ্যতাসম্পন্ন, সূক্ষ্ম অনুভূতি ও কোমলতার অধিকারী, সৃষ্টিগত মেধাবী ও ধীশক্তিধর হয়ে থাকেন, তবুও তাঁরা কালের প্রচলিত ও প্রবর্তিত জ্ঞান-বিজ্ঞানে অংশ নেন না। এজন্য তাঁরা এসব বিষয়ে নিজেদেরকে ব্যুৎপন্ন হওয়ার আদৌ দাবিও করেন না, বরঞ্চ ওসব জিনিস থেকে পৃথক থেকে একমাত্র নবুয়তের দায়িত্ব আদায় এবং সে খিদমত পুরোপুরি আঞ্জাম দেয়ায় তাঁরা নিমগ্ন থাকেন। তাঁদেরকে যে উদ্দেশে আবির্ভূত করা হয়েছে, যে আদর্শের উজ্জীবনে তাঁরা আদিষ্ট, মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য যেসব জিনিসে নিহিত রয়েছে, আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) একমাত্র সেগুলোর ইল্ম উম্মতের কাছে পৌঁছানোর জন্য সদা ব্যস্ত থাকেন।
পৃথিবীর সভ্য ও উন্নত জাতিগুলো যারা স্বীয় যুগে সভ্যতা, সংস্কৃতি, মনস্তাত্ত্বিকতা ও জ্ঞান-গরিমার আবিষ্কারাদির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, তাঁদেরও আম্বিয়া-ই-কিরামের পরিবেশিত অনুপম শিক্ষা ও তাঁদের আদর্শমণ্ডিত ইলমের এমন মুখাপেক্ষী হতে হয়েছিল, যেমন সাগরে ডুবন্ত মৃতপ্রায় ব্যক্তির নৌকার অথবা একজন নিরাশ রোগীর 'অকসীর' (দীর্ঘ জীবনদাতা তথাকথিত দাওয়া)-এর হতে হয়। ওসব উন্নত জাতির সদস্যবৃন্দ এ সুষমামণ্ডিত ইলমের তুলনায় (অন্য সব জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা কৃষ্টি কালচারে যতটুকুই অগ্রগামী থাকুক না কেন) যেন দুগ্ধপায়ী শিশু, অবুঝ ও বোকা, রিক্ত, সহায়হারা! তদুপরি তাদের আপন জ্ঞানগত সফলতা ও সংস্কৃতিগত অগ্রগতির দরুন যখনি এই মহতী ইল্মকে উপেক্ষা করেছে, বিদ্রূপ করতে শুরু করেছে, তারা নিজের জন্য সমাজ ও জাতির জন্য ডেকে এনেছে চরম বিপর্যয় ও ধ্বংস। বহু উন্নত ও সভ্য জাতি শিক্ষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদে ধন্য হয়েছিল, মেধা ও ধীশক্তিতে যারা ছিল তদানীন্তন বিশ্বে উদাহরণযোগ্য— দাম্ভিকতা, ঔদ্ধত্য, আত্মগরিমা স্বীয় শিল্প-বিজ্ঞানে গর্বের শিকার হয়ে পড়েছিল। ফলে স্বীয় যমানার নবীর আনীত তা'লীমকে উপেক্ষা ও অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতে থাকে এবং তাতে অনীহা প্রদর্শন করে। এই তা'লীমকে ভাবতে থাকে নিষ্প্রয়োজন ও মূল্যহীন। ফলে তারা অহংকারের নজরানায় পরিণত হয়। পরিণতিতে উচ্চতর ধীশক্তির নামে অজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও তত্ত্বজ্ঞানের নামে সংকীর্ণতা নিয়ে ধ্বংসের অতল তলে তারা নিমজ্জিত হয়েছে, ভোগ করেছে আপন কর্মের অসহনীয় প্রায়শ্চিত্ত।
আম্বিয়া-ই-কিরামের জ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানের মাঝে আপেক্ষিক নিরীক্ষণ:
আম্বিয়া-ই-কিরাম (তাঁদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক)-এর জ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানী ও দার্শনিকের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মাঝখানে তফাত কতটুকু? তা সহজভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠবে শুধু একটা ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিলেই। আপনারাও ঘটনাটি শুনেছেন হয়ত; কিন্তু এ আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপটে নাও চিন্তা করতে পারেন। ঘটনাটি যে খুব একটা সূক্ষ্ম তাও নয়। মাফ করবেন, এ ঘটনার অবতারণা কিন্তু আপনাদের ছাত্র সমাজকে নিয়েই।
"একজন সত্যবাদীর বর্ণনা-একদা কতিপয় ছাত্র চিত্ত বিনোদনে নৌকা ভ্রমণে বেরিয়েছিল। তাদের মন ছিল তখন আবেগাপ্লুত, সময়টাও নেহায়েত মনোরম। আবহাওয়া মৃদু ও আনন্দদায়ক। এ অবস্থায় কি তরুণ সমাজ নীরব থাকতে পারে? সেই মুহূর্তে মূর্খ বোকা একজন নৌকার মাল্লা এদের মনোরঞ্জনের উত্তম আধার বৈকি! কেননা প্রতারণা হৈ-হুল্লোড় ও চিত্ত বিনোদনের অভাব মোচনের ক্ষেত্রে এমন একজন লোকই বেশি উপযোগী হয়। শুরু হলো এদের মৌজের পাল্লা। তাই তো তাদের মধ্যে সুচতুর ও বাকপটু একটি বালক মাল্লাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল :
চাচা মিয়া! তুমি কি কি বিদ্যা শিখেছ?
মাল্লা মিয়া: আমি তো কোন লেখাপড়াই করিনি।
বালকটি মৃদু কণ্ঠে বলল : আরে চাচা, তুমি সাইন্স পড়নি?
মাল্লা: আমি তো এর নামও শুনিনি।
দ্বিতীয় বালক : চাচা! জ্যামিতি ও এ্যালজাবরা অবশ্যই পড়েছ, না?
মাল্লা : হুযুর! এই নামটাই আমার কাছে নতুন!
তখন তৃতীয় বালক টিপ্পনী কেটে বলল : যা-ই হোক, তুমি ভূগোল ও ইতিহাসটুকু তো নিশ্চয়ই পড়েছ, চাচা মিয়া?
মাল্লা : জনাব! এটা কি কোন শহরের নাম, না মানুষের নাম?
মাল্লার এই উত্তরটা শুনে বালকগণ তাদের হাসি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। উচ্চ স্বরে তারা হাসতে থাকে। অতঃপর তারা জিজ্ঞেস করল : চাচা মিয়া! তোমার বয়স কত হয়েছে?
মাল্লা : এ-ই কত, চল্লিশ!
তরুণগণ বলল : অমনিতেই তো তুমি অর্ধেকটা জীবন নাশ করে দিলে, অথচ লেখাপড়া শিখলে না।
মাল্লা বেচারা অবশেষে নীরবই রয়ে গেল।
কুদরতের লীলা দেখুন, নৌকাটা তেমন দূরে যেতে না যেতেই সমুদ্রে উঠল এমন তুফান (সাইক্লোন), ঢেউ ক্রমশ প্রকাণ্ড হতে প্রকাণ্ডতর হতে শুরু করল। তদ্দরুন একবার নৌকাটি উঠছিল বহু উঁচুতে আবার নামছিল বহু নীচুতে। তখন মনে হচ্ছিল, নৌকাটি এ-ই বুঝি তলিয়ে গেল! তারা ছেলেবয়েসী হলেও সমুদ্র ভ্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল ছিল। তাই বিলুপ্ত হতে লাগল তাদের অহমিকা। চেহারায় দেখা দিয়েছে আতংক ভাব। এবারে এল বোকা মাঝির পালা। সে নিতান্ত গাম্ভীর্যের সাথে জিজ্ঞেস করল, "ভায়া! তোমরা কি কি জ্ঞান হাসিল করেছ?” নওজোয়ানরা জানত না, এ সাদাসিধে মাঝি যে কি উদ্দেশে জিজ্ঞেস করছে। বুঝতে না পেরে তারা মাদ্রাসা অথবা কলেজের শিক্ষাপ্রাপ্ত বিষয়াদির এক দীর্ঘ ফিরিস্তি পেশ করতে শুরু করল। যখন আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেসব আকর্ষণীয় বিষয়াদির ফিরিস্তি বর্ণনা শেষ হলো তখন মাঝি মৃদু হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল: আচ্ছা, ভালো কথা, এসব বিষয়ে তোমরা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হাসিল করেছ। তবে পানিতে সাঁতার কাটার শিক্ষাটা নিয়েছ কি? আল্লাহ্ না করুন, নৌকাটি কাত হয়ে গেলে তীরে পৌঁছাতে পারবে তো?
বালকদের কারো সাঁতার জানা ছিল না। বালকগণ ভগ্ন চিত্তে জানাল, "চাচাজী! এই একটি মাত্র বিষয়ই আমাদের অজানা রয়ে গিয়েছে, যা আমরা এখনো জানতে পারিনি।"
বালকদের এই উত্তর শুনে মাঝি হেসে উঠল খুবই বিকট স্বরে এবং বলল, "মিয়া! আমিতো অর্ধেকটা জীবন অমনিতেই বৃথাই নাকি কাটিয়ে দিলাম! কিন্তু তোমাদের তো জীবন সারাটাই বৃথা। কারণ এই তুফানে তোমাদের এতদিনের অর্জিত বিদ্যা কোন কাজই দিচ্ছে না। আজ সাঁতারের তা'লীমটুকু-ই জীবন রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ, অথচ তোমরা জানলে না সে তালীম!"
উন্নতির উচ্চ স্তর অতিক্রম করে কৃষ্টি ও সভ্যতার চূড়ান্ত সোপানে উপবিষ্ট আজ যেসব জাতি, তাদের আসল চেহারা হচ্ছে এটাই। তারা জ্ঞান-সাহিত্যের বিরাটকায় বিশ্বকোষ (Encyclopaedia)-ই কণ্ঠস্থ রাখুক না কেন অথবা হোক না তারা মানবিক যাবতীয় শিক্ষা, বিজ্ঞান আবিষ্কার ও সুবিশাল পৃথিবীতে গুপ্ত খনিজ দ্রব্যের অনুসন্ধানে নিখিল বিশ্বের পুরোধা, কিন্তু তারা আল্লাহর মা'রিফাত বা পরিচিতি লাভের সহায়ক ইল্ম থেকে সর্বতোভাবে বিমুখ, অথচ স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব এই ইল্ম দিয়ে। উদ্দেশ্যের সৈকতে এই ইসলামকে মাধ্যম করে উপনীত হওয়া যায়। আর তুফান থেকেও নিষ্কৃতি লাভ হয়। স্বীয় আমলকে দুরস্ত রাখে এই ইল্ম। এই ইল্ম অনভিপ্রেত আসক্তিকেও সুনিয়ন্ত্রিত রাখে। চরিত্রকে মার্জিত ও প্রবৃত্তিকে সুসংহত করে। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং মঙ্গলের দিকে অনুপ্রাণিত করে। এই ইল্ম মনে আল্লাহর ভয়ের জোয়ার তোলে। এই ইল্ম বিনে কলুষহীন সমাজ গড়া যেমনি সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় তাহযীব-তামাদ্দুনের রক্ষণাবেক্ষণ। একমাত্র এ ইল্মেই রয়েছে পরিণাম ও পরিণতি এবং আখিরাতের প্রস্তৃতির জন্য প্রবল উদ্দীপনা। আমিত্ব ও আত্মপূজার অহমিকাকে বিদূরিত করে এই ইল্ম। দুনিয়ার এই তুচ্ছ বস্তুর লোভ-লালসার বেড়াজাল থেকে আযাদ হয়ে কল্যাণের দিকে এভাবে আকৃষ্ট হতে থাকে, লৌহখণ্ড যেভাবে হয়ে থাকে চুম্বকের দিকে।
এই ইল্মে নববী সাবধানতা ও ভারসাম্যের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। অনর্থক ও নিষ্ফল চেষ্টায় অবাঞ্ছিত পথ পরিহার করাই এই ইল্মের বিশেষ আহ্বান।
সেসব জাতির বিভীষিকাময় কাহিনী মহান আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন পবিত্র কালামে বর্ণনা দিয়েছেন, যারা ছিল আত্মগৌরব ও অহংকারের কালো পাথারে নিমজ্জিত। যারা সমসাময়িক আম্বিয়া-ই-কিরামকে ভাবত হীন ও তুচ্ছ। কারণ আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) যুগোপযোগী প্রচলিত শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য খ্যাতি রাখতেন না।
"তাদের রাসূল যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসত, যখন তারা নিজেদের জ্ঞানে দম্ভ করত, তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তাদেরকে তাই বেষ্টন করল।" [সূরা মু'মিন: ৮৩]
📄 রাসূল (সা.)-এর আবির্ভাবের পর কারো অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের অবকাশ নেই
খাতামুন্ নাবিয়ীন (সা.)-এর আবির্ভাবের পরও গতানুগতিক ধারায়ই ওসব জাতি অনীহা প্রদর্শন করতে থাকে, যারা তদানীন্তন জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প ও কৃষ্টি-কালচারের উচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছিল। তাদের ঔদ্ধত্য, দাম্ভিকতা ও শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগতি, সফলকামী সুদক্ষ সুধীবর্গের ওপর অগাধ আস্থা ইত্যাদি তাদেরকে সরিয়ে রেখেছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কর্তৃক পরিবেশিত পরম উন্নত ও অত্যাবশ্যকীয় অনুপম ইল্মের স্নিগ্ধ পরশ থেকে। তাদেরকে অনুমতি দেয়নি রাসূল (সা.)-এর তরীকার পদাংকানুসরণ করে একটু সামনে এগুতে আর পরিত্রাণ লাভ করতে।
আমাদের এ যুগের অধুনা উন্নত জাতিগুলোর অবস্থা মোটেও তাদের ব্যতিক্রম নয়। তারা ইচ্ছা করলে কিয়ামত পর্যন্ত এ সনাতন দীনের ছায়াতলে এসে ধন্য হতে পারে। এই আলোকবর্তিকা হতে আলোকরশ্মি নিয়ে তারা নিজেদেরকে প্রদীপ্ত করতে সচেষ্ট হতে পারে। অনতিবিলম্বে সে সব জাতির এ গর্ব-অহংকার ও নিস্পৃহতায় ভয়াবহ পরিণতি দেখা দেবে। অসহনীয় হয়ে উঠছে নিখিল বসুন্ধরা তাদের অস্তগামী তথাকথিত সভ্যতার মৃতদেহের দুর্গন্ধে। সেই দিন অত্যাসন্ন, যখন তাদের সভ্যতার প্রাচীর চৌচির হয়ে ভূ-লুণ্ঠিত হবে।
📄 ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে মহাবিপর্যয়ের আশংকা
ইসলামী রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে 'আরব' রাষ্ট্রসমূহের অবস্থান আরেক বিস্ময়কর দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এ মহামূল্যবান প্রাণ সঞ্চারক 'ইল্ম' থেকে এদিন-ওদিক ছিটকে পড়েছে। এই 'ইল্মে নববী' দ্বারা উপকৃত না হয়ে তারা বহিঃপথে ছোটাছুটি করছে। গ্রহণ করছে এর স্থলে পাশ্চাত্য সভ্যতা, জড়বস্তুর ক্ষমতা ও বর্বরতার জীবনসম্বলিত দর্শন। এই অবাঞ্ছিত বিরোগের প্রতিক্রিয়ায় জর্জরিত হয়ে চলেছে তারা চরম দুর্গতির দিকে, যার আদৌ প্রতিকার নেই। এই 'ইল্মে নববী'র প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের দরুন আজ দেখা দিয়েছে তাদের মাঝে শত মতান্তর ও মতভেদ। বর্তমান দ্বন্দ্ব ও অনাগত দিনের বিপ্লব-কলহ তাদেরকে অবর্ণনীয় ধ্বংসের কবলে আক্রান্ত করতে চলেছে। পারস্পরিক বৈরী ভাব ও বিদ্বেষের মত জঘন্য সংক্রামক ব্যাধি আসন লাভ করে চলছে তাদের জাতীয় জীবনের শিরা-উপশিরায় যদ্দরুন পারস্পরিক সৌহার্দ্যে লেগেছে কুঠারাঘাত। তারা তাই পরস্পরের হাতে লাঞ্ছনা ও পদদলনের শিকার।