📄 হিদায়াতের একমাত্র মাধ্যম
এরই প্রেক্ষাপটে কুরআন একাধিকবার তাগিদ দিচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর মৌল গুণাবলীর যথাযথ চিহ্নিতকরণে মনোনীত হয়েছেন একমাত্র নবীগণ। আল্লাহর সঠিক মা'রিফাত, যা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার নাগাল থেকে পূত-পবিত্র, ভুল ধারণা কিংবা সঙ্গতিহীন ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত, আর তা অর্জনের একক মাধ্যম তাঁরা-ই। তাঁদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ বিনে অন্য কোন সূত্র দ্বারা সে মা'রিফাত লাভ করা সম্পূর্ণ দুরূহ। শুধু যুক্তি-জ্ঞান এর কিঞ্চিৎ দিশা দিতেও অপারক এবং ধী-শক্তি ও মেধা এক্ষেত্রে অচল। তা চারিত্রিক ভারসাম্যের ব্যবস্থাও হতে পারে না। বুদ্ধিমত্তার তীব্রতা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অকেজো। জ্ঞান ও বুদ্ধির অনুসন্ধান যেমনি সে পর্যন্ত পৌঁছতে ব্যর্থ, অভিজ্ঞতার কোষাগারও তেমনি সেক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য। আল্লাহপাক জান্নাতবাসী কতিপয় সত্যবাদী অভিজ্ঞ মনীষীর ভাগ্য দ্বারা এ তথ্যটির বিশ্লেষণ দিচ্ছেন-যেখানে মিথ্যা বর্ণনা ও অতিরঞ্জিত কিছুর কোন প্রকার স্থান নেই।
"প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন। আমাদেরকে আল্লাহ্ পথ না দেখালে আমরা কখনো পথ পেতাম না।” [সূরা আ'রাফ: ৪৩] কুরআন সুস্পষ্টভাবে এ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে, নবীগণই সঠিক মা'রিফাত অর্জনের একমাত্র মাধ্যম এবং তাঁরাই আল্লাহর পরিচিতি লাভের দিশারী ছিলেন। সেই গন্তব্যস্থলে নিয়ে পৌঁছিয়ে দিতে অনেকটা সক্ষম তাঁরাই।
"আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্য বাণী এনেছিল।" [সূরা আ'রাফ: ৪৩]
এসব কথা দ্বারা প্রতীয়মান হলো, আম্বিয়া-ই-কিরামের আবির্ভাবের ফলেই এটি সহজ হতে পেরেছে। এজন্য আল্লাহর মা'রিফাত অর্জন করা, তাঁর সন্তুষ্টি ও বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আর সে মুতাবিক নিজেদেরকে সুশোভিত করা সম্ভব হয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে জান্নাতের প্রবেশপত্র নেয়া সম্ভব হয়েছে।
বুদ্ধি ও অনুভূতির ঊর্ধ্বের তথ্যাবলীর অনুসন্ধানে মানুষের বিবেক ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো যে কতটুকু নিষ্ক্রিয়, ক্ষীণ, সীমিত ও আস্থা স্থাপনের অনুপযোগী এ সম্পর্কে কতিপয় বাহ্যিক শীর্ষস্থানীয় ও আধ্যাত্মিক তথ্যবিশারদের উক্তি ও পর্যালোচনা পরিবেশন করা সমীচীন মনে করি।
হযরত শায়খ আহমদ সরহিন্দী-মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) [মৃ. ১০৩৪ হিজরী] স্বীয় তত্ত্ববহুল মাকতুবাতে (রচনাবলী) এ প্রসঙ্গটি একাধিকবার টেনেছেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নবীগণ (আ.)-এর সহযোগিতা ও পথপ্রদর্শন ছাড়াও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করতে পারে, তাঁর অস্তিত্ব যে একান্ত জরুরী ও আবশ্যক-এ অনুভূতিও যোগাতে পারে বটে, কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে তাঁর মৌলিক গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি, তাঁর পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, নিখুঁত একত্ববাদ ইত্যাকার বিষয়ে অবগত হওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। মুজাদ্দিদ সাহেব তাঁর রচনালিপিতে বলেন:
সারকথা: এই বুদ্ধিশক্তি সে অমূল্য দৌলতের দ্বারোদ্ঘাটনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং মহান আম্বিয়া-ই-কিরামের হিদায়াত ছাড়া সে রত্নাগারের দিশা পেতে বুদ্ধিশক্তি একেবারেই অক্ষম।” ১ পাশ্চাত্য দর্শন ও ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসও একথারই জ্বলন্ত স্বাক্ষর বহন করে, শুধু বিবেক ও যুক্তি-প্রমাণ কিংবা পাশ্চাত্য দর্শনের ওপর নির্ভরশীলগণ আল্লাহর মা'রিফাত ও তার মৌলিক গুণাবলী সাব্যস্তকরণ ও উত্তম কর্মগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে কতই না হোঁচট খেয়েছে! আর লিপ্ত হয়েছে তারা অবর্ণনীয় গোমরাহী ও মূর্খতায়। ২ মুজাদ্দিদ সাহেব স্বীয় রচনাবলীতে প্রমাণ করেছেন, যেমনিভাবে বুদ্ধির স্তর ইন্দ্রিয়রাজির ঊর্ধ্বে, তেমনিভাবে নবুয়তের স্তরও বিবেকের ঊর্ধ্বে, অথচ কোন জিনিস যুক্তির পরিপন্থী হওয়া এবং যুক্তি ঊর্ধ্বে হওয়া এক কথা নয় কিছুতেই। আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিফ হওয়া নবুয়তের মধ্যে সীমিত এবং আম্বিয়াদের অবহিত ও তা'লমি দানের ওপর তা পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাঁরা মা'রিফাতে ইলাহীর ক্ষেত্রে গ্রীক দার্শনিকদের মূর্খতার নিদর্শনগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছেন যদ্দরুন মানব বিবেক-শক্তি অনুশোচনা না করে পারে না। অনুরূপ তিনি পাশ্চাত্য দার্শনিক ও তথাকথিত সংস্কারকগণের বিস্ময়কর অজ্ঞতার শিক্ষণীয় চিত্র তুলে ধরেছেন। ৩
অনুরূপ তিনি খাজা বাকী বিল্লাহর দু'জন গৌরবোজ্জ্বল সন্তান খাজা আবদুল্লাহ ও খাজা 'উবায়দুল্লার নামে প্রেরিত অন্য আরেকটি মাকতূব তথা রচনালিপি ২৬৬/১-এর মধ্যে অত্যন্ত বিশ্লেষণের সাথে প্রমাণ করেছেন, নবীগণের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী ও বিধি-নিষেধের যথোচিত পরিচিতি প্রদানের একক ও অনিবার্য উপায়। তিনি এও সাব্যস্ত করেছেন, বুদ্ধি ও কাশফ্ উভয়টির নির্মলতা ও নিষ্কলুষতা অসম্ভব। এ দু'টি জিনিস জড়দেহের প্রভাব, মনস্তাত্ত্বিকতা, চারিত্রিক কলুষতা ও সৃষ্টিজনিত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে সার্বিক মুক্ত ও স্বাধীন হতে পারে না। বিবেক-বুদ্ধি ও কাশফের মধ্যস্থতা এবং এগুলো থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো, বিধি-বিধান ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সেসব দুর্বলতার রঙ্গে রঙ্গীন হয়ে এবং সেগুলোর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে প্রকাশ পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব সিদ্ধান্তই পরিচালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে, যা তাদের নিকট বিদিত হয়ে আসছে যা বাহ্যিক অথচ তা একেবারেই বাস্তবতার পরিপন্থী ও স্বীকৃত মাত্র। তাদের নিজস্ব সমর্থনের দরুন অনেকক্ষেত্রেই শুদ্ধ ও অশুদ্ধের মাঝখানে তারতম্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.)-এর রচনাবলী এ জাতীয় তত্ত্ব ও দর্শনে পরিপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে সেসব রচনা অধ্যয়ন করা একান্তই কর্তব্য এবং ঈমানের জ্যোতি বৃদ্ধিকারক।
আল্লাহ্ পাক কুরআনের এক শানদার 'সূরা আস্-সাফফাত' (মুশরিকদের পথভ্রষ্টতাসমূহ, ভ্রান্ত ধারণা ও আল্লাহর সঙ্গে অশোভনীয় ব্যাপারে সম্পৃক্ততা খণ্ডন করা হয়েছে সূরাটিতে)-কে এরই বর্ণনায় সমাপ্ত করেছেন:
"তারা যা আরোপ করে তা হতে মহান ও পবিত্র আপনার প্রতিপালক, শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি এবং প্রশংসা সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।" [সূরা সাফফাত : ১৮০-১৮২]
উপরিউক্ত তিনটি আয়াত যেন সুসংবদ্ধ শিকলের কড়া, যা পরস্পর একত্রে গাঁথা। কেননা আল্লাহ্ পাক স্বীয় অস্তিত্বকে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত ও অমার্জিত উক্তি থেকে পবিত্র ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হন নি শুধু, বরঞ্চ এর সাথে সাথে আম্বিয়া-ই-কিরাম সম্পর্কেও আলোচনা টেনেছেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ্ পাকের পূর্ণ পবিত্রতা ও মহত্ত্বকে সঠিকভাবে অভিব্যক্ত করেছেন। বিবৃত করেছেন তাঁরা তাঁর অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলীকে একটা একটা করে। আল্লাহ্ পাক এজন্য সপ্রশংস সালাম পাঠালেন তাঁদের উদ্দেশে। স্রষ্টার সঠিক পরিচিতি সৃষ্টি সমীপে উপস্থাপন ও তাঁর মৌলিক গুণাবলী সমুজ্জ্বল করার অনিবার্য বাহনই হচ্ছে নবীগণের কণ্ঠ। তাঁদের আবির্ভাব বয়ে এনেছে সৃষ্টিকুলের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ, বিশেষ করে তা হচ্ছে মানব জাতির অসীম ইহসান। এটি আল্লাহর রবুবিয়াত, রহমত ও হিকমতেরও এক জ্বলন্ত নিদর্শন।
এজন্যই নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা তিনি ইতি টানলেন:
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য শোভনীয়, যিনি সমস্ত জাহানের প্রতিপালক।” [সূরা সাফফাত : ১৮২]
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) সে তত্ত্ব পরিব্যাপ্ত করতে গিয়ে তাঁর এক রচনায় লিখেছেন, "আম্বিয়া-ই-কিরাম হচ্ছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। তাঁদেরকে সোপর্দ করা হয়েছে এক মহাদৌলত। আওলিয়াদের বিচরণ যেখানে ক্ষান্ত, আম্বিয়া-ই-কিরামের বিচরণ সেখান থেকে মাত্র শুরু। এর ব্যতিক্রম নয় মোটেই। নবুয়তের অনুসরণে ফরযসমূহ দ্বারা নৈকট্য হাসিল হয়। সাগরের তুলনায় একটা ফোঁটার অস্তিত্ব যেমন, বিলায়াতের গুণাবলী নবুয়তের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় তেমনও নয়। ১ আম্বিয়া-ই-কিরাম ও নবুয়তের মর্যাদা সম্বন্ধে মুজাদ্দিদ সাহেবের ও তাঁর এক পূর্বসূরী প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মাখদুমুল মালিক শায়খ শরফুদ্দীন য়াহয়া মুনীরী (র.) তাঁদের রচনাবলীতে অতীব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। মুজাদ্দিদ সাহেব লেখেন, "ওয়ালীগণ তাঁদের লক্ষ্যস্থল সংকীর্ণ হওয়ার দরুন সৃষ্টির দিকে পুরোপুরি লক্ষ্য রাখতে পারেন না (বিধায় নবীগণের মত তাঁদের দ্বারা সর্বব্যাপী খিদমত ও হিদায়াতের কাজ নেয়া যেতে পারে না)। নবুয়তের বিষয়টি এর ব্যতিক্রম। নবীগণ তাঁদের অন্তরের প্রসারতা ও দৃষ্টির উদারতার ফলে স্রষ্টার দিকে যখন লক্ষ্য রাখতে যান, সৃষ্টির দিকেও লক্ষ্য রাখতে কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হন না। তদ্রূপ তাঁদের আবার সৃষ্টির দিকে লক্ষ্য করতে গিয়ে স্রষ্টার ধ্যানে কোন কণ্টক দেখা দেয় না।” ২
মাখদুম সাহেব বলেন, "আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর একটা নিশ্বাস মাত্র আউলিয়াগণের সমস্ত জীবনের চেয়েও উৎকৃষ্ট। আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর শুধু মাটির দেহটিও পবিত্রতা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে আউলিয়া-ই-কিরামের অন্তর ভেদজ্ঞান ও আরাধনার সমতুল্য। অন্যরা সাধনা করে যেখানে গিয়ে পৌঁছতে পারেন না, আম্বিয়া-ই-কিরামের মাটির দেহটি অনায়াসেই সেখানে পৌঁছে যায়।" ৩
টিকাঃ
১. মাকতুবাত: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮; প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩।
২. মাকতুবাত: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১২।
৩. মাকতুব: বিংশতম খণ্ড।
📄 গ্রীক দর্শনে ব্যর্থতার কারণ
এরই ফলশ্রুতিতে যে কেউ আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর অনুসৃত আদর্শ-বহির্ভূত অন্য কোন পন্থায় যখনি কেউ আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী ও মহিমান্বিত নামসমূহের পরিচিতি হাসিল করতে চায় এবং এ ধরার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের অবস্থা, আল্লাহর ক্ষমতা, তাঁর অনুশাসন ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত বিষয় সমাধানের অপচেষ্টা চালায় তার প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ঠিক তেমনি ব্যর্থ হবে, সে যদি তার স্বীয় বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, গবেষণা, প্রতিভা ও মেধা কিংবা কোন বিশেষ বিষয়ে পারদর্শিতা দ্বারা এ ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের অহমিকায় অবতীর্ণ হয়। পক্ষান্তরে তাতে তার অর্জন হবে ধৃষ্টতা আর পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ্ পাকের নিম্নোক্ত বাণীরই জ্বলন্ত নমুনা তারাই:
“দেখ, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে, তোমরাই তো সে বিষয়ে তর্ক করেছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে কেন তর্ক করছ? আল্লাহ্ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নও।" [সূরা আলে-ইমরান : ৬৬]
গ্রীকদের প্রাচীন স্রষ্টা-দর্শন ও এর উদ্ভাবক ও বিশেষজ্ঞদের অকৃতকার্যতা ও ব্যর্থতার মূল কারণ এটাই। তাদের নজিরবিহীন মেধা ও প্রতিভা, ইল্ম ও সাহিত্যিক অগ্রযাত্রা, তাদের কৃতিত্বপূর্ণ কাব্য চর্চা, সমর-নৈপুণ্যের অমর কাহিনী, অংকশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সৌর বিজ্ঞানের অব্যর্থ দক্ষতা নিক্ষেপ করেছে তাদেরকে মস্ত বড় গোলকধাঁধায়। তাদের ধারণা, এভাবেই আত্মিক তত্ত্ব ও স্রষ্টা-দর্শনের বিষয়েও তাদের অগ্রণী ভূমিকা থাকবে। তাই তো তারা তাদের নিজস্ব সীমা ডিঙ্গিয়ে স্রষ্টা-দর্শনের বিভিন্ন দিক এবং আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলীর রহস্যোদ্ঘাটনের দিকেও মনোনিবেশ করেছে।
কিন্তু এহেন সাধনার যে ফসল তারা দুনিয়াবাসীদের সামনে উপস্থাপন করেছে তা অত্যাশ্চর্যের এক দাস্তান, শিক্ষার নামে মূর্খতার ছড়াছড়ি ও পারস্পরিক বিপরীত ধর্ম ও বিভিন্নমুখী উক্তি ও মতামত এবং কল্পনা ও দাবির জগাখিচুড়ি মাত্র।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (র.) এ বিষয়ে একটি তথ্যবহুল পর্যালোচনা রেখেছেন:
"এতে রয়েছে ভাঁজে ভাঁজে অন্ধকার আর অন্ধকার। যদি কেউ এ জাতীয় কথাকে স্বপ্ন হিসেবেও বর্ণনা করতে যায়, তখন তাকে মস্তিষ্ক বিকৃত বলে আখ্যায়িত করা হবে।” ১
অন্যত্র তিনি লেখেন:
"আমার বুঝে আসে না, এ জাতীয় বিষয়াদি দ্বারা একটা পাগলও কি স্বস্তি লাভ করতে পারে? যারা কেবল বস্তুতত্ত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খ করে বিশ্লেষণ করে বেড়ায় তারা আবার কিসের বুদ্ধিজীবী ও যুক্তিবিদ?” ২
এমনিভাবে শায়খুল ইসলাম ইব্ন তায়মিয়াহ (র.) দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের উক্তি বারংবার নিরীক্ষণের পর বলেন:
"বিবেকবানদের একটু ভেবে দেখা দরকার সে সব ব্যক্তির উক্তিগুলো, যারা নিজেদের পেশকৃত উক্তি দ্বারা খুবই গর্ববোধ করছে এবং আম্বিয়া-ই-কিরামের নির্দেশিত আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছে বলে তৃপ্তি লাভ করছে।” এদের দর্শনের উচ্চ পর্যায়েও পরিলক্ষিত হচ্ছে মাতালের উক্তির মত শত উক্তি। স্থিরীকৃত ও বিদিত সত্যকে স্বীয় কারচুপি ও প্রবঞ্চনা দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করে তারা। এদিকে স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য বাতিলকে তারা আবার গ্রহণ করে নেয়। ৩
ইমাম ইব্ তায়মিয়াহ (র.) অন্য একখানে লেখেন:
"ইলাহীয়াত দর্শনের প্রথম গুরু এরিস্টটলের উক্তি ও যুক্তিগুলোকে নিয়ে যখন চিন্তা করা হয়, পর্যবেক্ষণ করে যদি কোন একজন অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ, তখন সে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হবে, গ্রীক দার্শনিকদের ন্যায় আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীনের মা'রিফাতবিমুখ অন্য কেউ ছিল না। আশ্চর্যান্বিত না হয়ে সে পারবে না। কাউকে যখন দেখা যায় নবীগণের ইলম ও তা'লিমের সাথে গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়! এ যেন একজন কামার ফেরেস্তার সাথে কিংবা একজন গেঁয়ো জমিদার সম্রাটের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছে। ৪
মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমদ ফারুকী (র.) এক রচনায় লিখেছেন:
"যুক্তি-জ্ঞানই যদি এ বিষয়ে যথেষ্ট হতো, তাহলে যুক্তিকেই পথ-প্রদর্শকরূপ গ্রহণকারী গ্রীক দার্শনিকগণ পথভ্রষ্টতার তমসাচ্ছন্ন পাথারে এভাবে আর হাবুডুবু খেতে থাকত না। অন্যদের অপেক্ষা আল্লাহ্ পাককে বেশি চিনে তারাই, অথচ আল্লাহ্ পাকের অস্তিত্ব ও গুণাবলী সংক্রান্ত বিষয়টিতে সর্বাপেক্ষা অধিক বোকা ও অজ্ঞ এরাই। তারা কি মহান আল্লাহ্ পাককে নিষ্ক্রিয় ও বেকার জ্ঞান করে বসেছে?"
অতঃপর মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) তাদের অনভিপ্রেত বিস্ময়কর উক্তিগুলো উল্লেখ করে লিখেছেন:
"আমি বিস্মিত হচ্ছি, এক সম্প্রদায় সেসব আত্মকদের (গ্রীক দার্শনিকগণ)-কে দার্শনিক আখ্যা দিচ্ছে। দর্শনশাস্ত্রের উদ্ভাবক নাকি তারা, অথচ এর (দর্শনের) সিংহভাগই অবান্তর ও ভিত্তিহীন সাব্যস্ত হয়েছে, বিশেষ করে ইলাহিয়াতের (যা তাদের এই বিষয়ের আসল লক্ষ্য) পর্বটি। প্রায় সবটুকুই এর কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী। অতএব, যাদের পুঁজি একমাত্র অজ্ঞতা তাদেরকে দার্শনিক আখ্যা দেয় কিভাবে? হ্যাঁ, দেয়া যেতে পারে, যদি অবজ্ঞাভরে কিংবা ব্যঙ্গ করে হয়, যেমন একজন অন্ধকে পদ্মলোচন নাম দেয়া হয়।” ১ আল্লাহ্ পাকের নিম্নোক্ত বাণীর জ্বলন্ত নমুনা তারাই:
"এদের সৃষ্টি কি এরা প্রত্যক্ষ করেছিল? তাদের উক্তি লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তারা জিজ্ঞাসিত হবে।" [সূরা আল-যুখরুফ: ১৯]
"আকাশমণ্ডলীর ও পৃথিবীর সৃষ্টিকালে আমি তাদেরকে ডাকিনি। এবং তাদের সৃজনকালেও নয়, আমি বিভ্রান্তকারীদের সাহায্য গ্রহণ করার নই।” [সূরা আল-কাফ্ফ: ৫১]
টিকাঃ
১. তাহাফুতুল ফালাসিফা, পৃষ্ঠা ৩০।
২. তাহাফুতুল ফালাসিফা, পৃষ্ঠা ৩২।
৩. মাওয়াফিকাহ সারাইহুল মা'কূল।
৪. 'আররদ্দ 'আলাল মানতিকীয়্যীন', পৃষ্ঠা ৩৯৫।
৫. মাকতুব: ২৩/৩।
📄 ইসলামী যুগে দর্শনের ত্রুটি
পরিতাপের বিষয়, আমাদের যে ইসলামী ফালসাফা (কালামশাস্ত্র) গ্রীকের নাস্তিকতাবাদ সমর্থিত ফালসাফার প্রতিযোগিতায় বাস্তবে এসেছিল, তাও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। তাতেও আলোচনা করা হয়েছে এই বিষয়টিতেও এমন এমন বহু কথা, যার মূলনীতি ও ফরমুলা মানুষের জ্ঞানবহির্ভূত ছিল। সঠিকভাবে এদের খবরও ছিল না এ নীতিমালার। এতে অনুপ্রবেশ করেছে বল্লাহীনভাবে গ্রীক দর্শনের বিষক্রিয়া, যা সাধারণত স্বীয় গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে উদাসীন বিধায় সচরাচর সীমালংঘন করে থাকে। এই ইলমে কালামেরও অনুরূপ মহান আল্লাহ্ পাকের অস্তিত্বের আনুষঙ্গিক বিষয়াদি, নামসমূহ ও গুণাবলীর তথ্যানুসন্ধানে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনাই পরিদৃষ্ট হচ্ছে। তারা সেসব বিষয়ে এমন বিস্তারিত আলোচনা করেছে, এমনভাবে খুঁটে খুঁটে বিশ্লেষণ করেছে, যেন তারা কোন বিজ্ঞান গবেষণাগার (Laboratory)-এ দণ্ডায়মান আছে আর সমস্ত অংশগুলোকে প্রত্যক্ষ করছে!
মহান আল্লাহ্ পাক এর ঊর্ধ্বে। তা'আলাল্লাহু আন যালিকা -
📄 আম্বিয়া-ই-কিরামের স্বাতন্ত্র্য
আম্বিয়া-ই-কিরাম (তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)-এর প্রাণ সঞ্চারক ইলমের নেই কোন অংশীদার, নেই কোন সমকক্ষ, মানবকুলের সৌভাগ্য আনয়নের ক্ষেত্রে যার কোন বিকল্প নেই এবং যা এড়িয়ে গিয়ে নাজাতেরও কোন ব্যবস্থা নেই। এটি সেই মহতী ইল্ম, যার আলোকে মানুষ নিজের ও সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টার সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারে। জানতে পারা যায় এর মাধ্যমে আল্লাহ্ পাকের সুউচ্চ গুণাবলী এবং তাঁর ও বান্দার মাঝখানে বিরাজমান সম্পর্কের সম্যক পরিচয়। এই ইল্মের আলোকে মানুষ তার আদি অন্ত নিরূপণ করতে সক্ষম হয়। মানুষ যে আসলে কি, প্রতিপালকের মোকাবিলায় তার অবস্থানটি কেমন, তা চিহ্নিত করা যায় এই নববী ইল্ম দ্বারাই। কি কাজে আল্লাহ্ পাক সন্তুষ্ট হন, কিসে অসন্তুষ্ট হন, কি করলে আখিরাতে মানুষ সৌভাগ্যবান হবে, আর কি করলে দুর্ভাগা ও ব্যর্থ হবে এসবের খতিয়ান রয়েছে এই নববী ইল্মেই।
অর্থাৎ এই ইল্ম দিক-নির্দেশনা দেয়, মানুষের কাজকর্ম, 'আকীদা, চরিত্র ও আচার-আচরণ কেমন হলে অনন্তকালের চরম শাস্তি টেনে আনবে, আর কেমন হলে টেনে আনবে অফুরন্ত পরম শান্তি। তাই এ ইল্মকে 'ইলমুন্নাজাত' বা নাজাতের ইল্ম আখ্যা দেয়া যথাযথ।
আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) যদিও স্বীয় যুগের শ্রেষ্ঠতম যোগ্যতাসম্পন্ন, সূক্ষ্ম অনুভূতি ও কোমলতার অধিকারী, সৃষ্টিগত মেধাবী ও ধীশক্তিধর হয়ে থাকেন, তবুও তাঁরা কালের প্রচলিত ও প্রবর্তিত জ্ঞান-বিজ্ঞানে অংশ নেন না। এজন্য তাঁরা এসব বিষয়ে নিজেদেরকে ব্যুৎপন্ন হওয়ার আদৌ দাবিও করেন না, বরঞ্চ ওসব জিনিস থেকে পৃথক থেকে একমাত্র নবুয়তের দায়িত্ব আদায় এবং সে খিদমত পুরোপুরি আঞ্জাম দেয়ায় তাঁরা নিমগ্ন থাকেন। তাঁদেরকে যে উদ্দেশে আবির্ভূত করা হয়েছে, যে আদর্শের উজ্জীবনে তাঁরা আদিষ্ট, মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য যেসব জিনিসে নিহিত রয়েছে, আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) একমাত্র সেগুলোর ইল্ম উম্মতের কাছে পৌঁছানোর জন্য সদা ব্যস্ত থাকেন।
পৃথিবীর সভ্য ও উন্নত জাতিগুলো যারা স্বীয় যুগে সভ্যতা, সংস্কৃতি, মনস্তাত্ত্বিকতা ও জ্ঞান-গরিমার আবিষ্কারাদির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল, তাঁদেরও আম্বিয়া-ই-কিরামের পরিবেশিত অনুপম শিক্ষা ও তাঁদের আদর্শমণ্ডিত ইলমের এমন মুখাপেক্ষী হতে হয়েছিল, যেমন সাগরে ডুবন্ত মৃতপ্রায় ব্যক্তির নৌকার অথবা একজন নিরাশ রোগীর 'অকসীর' (দীর্ঘ জীবনদাতা তথাকথিত দাওয়া)-এর হতে হয়। ওসব উন্নত জাতির সদস্যবৃন্দ এ সুষমামণ্ডিত ইলমের তুলনায় (অন্য সব জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা কৃষ্টি কালচারে যতটুকুই অগ্রগামী থাকুক না কেন) যেন দুগ্ধপায়ী শিশু, অবুঝ ও বোকা, রিক্ত, সহায়হারা! তদুপরি তাদের আপন জ্ঞানগত সফলতা ও সংস্কৃতিগত অগ্রগতির দরুন যখনি এই মহতী ইল্মকে উপেক্ষা করেছে, বিদ্রূপ করতে শুরু করেছে, তারা নিজের জন্য সমাজ ও জাতির জন্য ডেকে এনেছে চরম বিপর্যয় ও ধ্বংস। বহু উন্নত ও সভ্য জাতি শিক্ষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদে ধন্য হয়েছিল, মেধা ও ধীশক্তিতে যারা ছিল তদানীন্তন বিশ্বে উদাহরণযোগ্য— দাম্ভিকতা, ঔদ্ধত্য, আত্মগরিমা স্বীয় শিল্প-বিজ্ঞানে গর্বের শিকার হয়ে পড়েছিল। ফলে স্বীয় যমানার নবীর আনীত তা'লীমকে উপেক্ষা ও অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতে থাকে এবং তাতে অনীহা প্রদর্শন করে। এই তা'লীমকে ভাবতে থাকে নিষ্প্রয়োজন ও মূল্যহীন। ফলে তারা অহংকারের নজরানায় পরিণত হয়। পরিণতিতে উচ্চতর ধীশক্তির নামে অজ্ঞতা, দূরদর্শিতা ও তত্ত্বজ্ঞানের নামে সংকীর্ণতা নিয়ে ধ্বংসের অতল তলে তারা নিমজ্জিত হয়েছে, ভোগ করেছে আপন কর্মের অসহনীয় প্রায়শ্চিত্ত।
আম্বিয়া-ই-কিরামের জ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানের মাঝে আপেক্ষিক নিরীক্ষণ:
আম্বিয়া-ই-কিরাম (তাঁদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক)-এর জ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানী ও দার্শনিকের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মাঝখানে তফাত কতটুকু? তা সহজভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠবে শুধু একটা ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিলেই। আপনারাও ঘটনাটি শুনেছেন হয়ত; কিন্তু এ আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপটে নাও চিন্তা করতে পারেন। ঘটনাটি যে খুব একটা সূক্ষ্ম তাও নয়। মাফ করবেন, এ ঘটনার অবতারণা কিন্তু আপনাদের ছাত্র সমাজকে নিয়েই।
"একজন সত্যবাদীর বর্ণনা-একদা কতিপয় ছাত্র চিত্ত বিনোদনে নৌকা ভ্রমণে বেরিয়েছিল। তাদের মন ছিল তখন আবেগাপ্লুত, সময়টাও নেহায়েত মনোরম। আবহাওয়া মৃদু ও আনন্দদায়ক। এ অবস্থায় কি তরুণ সমাজ নীরব থাকতে পারে? সেই মুহূর্তে মূর্খ বোকা একজন নৌকার মাল্লা এদের মনোরঞ্জনের উত্তম আধার বৈকি! কেননা প্রতারণা হৈ-হুল্লোড় ও চিত্ত বিনোদনের অভাব মোচনের ক্ষেত্রে এমন একজন লোকই বেশি উপযোগী হয়। শুরু হলো এদের মৌজের পাল্লা। তাই তো তাদের মধ্যে সুচতুর ও বাকপটু একটি বালক মাল্লাকে লক্ষ্য করে বলে উঠল :
চাচা মিয়া! তুমি কি কি বিদ্যা শিখেছ?
মাল্লা মিয়া: আমি তো কোন লেখাপড়াই করিনি।
বালকটি মৃদু কণ্ঠে বলল : আরে চাচা, তুমি সাইন্স পড়নি?
মাল্লা: আমি তো এর নামও শুনিনি।
দ্বিতীয় বালক : চাচা! জ্যামিতি ও এ্যালজাবরা অবশ্যই পড়েছ, না?
মাল্লা : হুযুর! এই নামটাই আমার কাছে নতুন!
তখন তৃতীয় বালক টিপ্পনী কেটে বলল : যা-ই হোক, তুমি ভূগোল ও ইতিহাসটুকু তো নিশ্চয়ই পড়েছ, চাচা মিয়া?
মাল্লা : জনাব! এটা কি কোন শহরের নাম, না মানুষের নাম?
মাল্লার এই উত্তরটা শুনে বালকগণ তাদের হাসি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। উচ্চ স্বরে তারা হাসতে থাকে। অতঃপর তারা জিজ্ঞেস করল : চাচা মিয়া! তোমার বয়স কত হয়েছে?
মাল্লা : এ-ই কত, চল্লিশ!
তরুণগণ বলল : অমনিতেই তো তুমি অর্ধেকটা জীবন নাশ করে দিলে, অথচ লেখাপড়া শিখলে না।
মাল্লা বেচারা অবশেষে নীরবই রয়ে গেল।
কুদরতের লীলা দেখুন, নৌকাটা তেমন দূরে যেতে না যেতেই সমুদ্রে উঠল এমন তুফান (সাইক্লোন), ঢেউ ক্রমশ প্রকাণ্ড হতে প্রকাণ্ডতর হতে শুরু করল। তদ্দরুন একবার নৌকাটি উঠছিল বহু উঁচুতে আবার নামছিল বহু নীচুতে। তখন মনে হচ্ছিল, নৌকাটি এ-ই বুঝি তলিয়ে গেল! তারা ছেলেবয়েসী হলেও সমুদ্র ভ্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল ছিল। তাই বিলুপ্ত হতে লাগল তাদের অহমিকা। চেহারায় দেখা দিয়েছে আতংক ভাব। এবারে এল বোকা মাঝির পালা। সে নিতান্ত গাম্ভীর্যের সাথে জিজ্ঞেস করল, "ভায়া! তোমরা কি কি জ্ঞান হাসিল করেছ?” নওজোয়ানরা জানত না, এ সাদাসিধে মাঝি যে কি উদ্দেশে জিজ্ঞেস করছে। বুঝতে না পেরে তারা মাদ্রাসা অথবা কলেজের শিক্ষাপ্রাপ্ত বিষয়াদির এক দীর্ঘ ফিরিস্তি পেশ করতে শুরু করল। যখন আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেসব আকর্ষণীয় বিষয়াদির ফিরিস্তি বর্ণনা শেষ হলো তখন মাঝি মৃদু হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল: আচ্ছা, ভালো কথা, এসব বিষয়ে তোমরা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হাসিল করেছ। তবে পানিতে সাঁতার কাটার শিক্ষাটা নিয়েছ কি? আল্লাহ্ না করুন, নৌকাটি কাত হয়ে গেলে তীরে পৌঁছাতে পারবে তো?
বালকদের কারো সাঁতার জানা ছিল না। বালকগণ ভগ্ন চিত্তে জানাল, "চাচাজী! এই একটি মাত্র বিষয়ই আমাদের অজানা রয়ে গিয়েছে, যা আমরা এখনো জানতে পারিনি।"
বালকদের এই উত্তর শুনে মাঝি হেসে উঠল খুবই বিকট স্বরে এবং বলল, "মিয়া! আমিতো অর্ধেকটা জীবন অমনিতেই বৃথাই নাকি কাটিয়ে দিলাম! কিন্তু তোমাদের তো জীবন সারাটাই বৃথা। কারণ এই তুফানে তোমাদের এতদিনের অর্জিত বিদ্যা কোন কাজই দিচ্ছে না। আজ সাঁতারের তা'লীমটুকু-ই জীবন রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ, অথচ তোমরা জানলে না সে তালীম!"
উন্নতির উচ্চ স্তর অতিক্রম করে কৃষ্টি ও সভ্যতার চূড়ান্ত সোপানে উপবিষ্ট আজ যেসব জাতি, তাদের আসল চেহারা হচ্ছে এটাই। তারা জ্ঞান-সাহিত্যের বিরাটকায় বিশ্বকোষ (Encyclopaedia)-ই কণ্ঠস্থ রাখুক না কেন অথবা হোক না তারা মানবিক যাবতীয় শিক্ষা, বিজ্ঞান আবিষ্কার ও সুবিশাল পৃথিবীতে গুপ্ত খনিজ দ্রব্যের অনুসন্ধানে নিখিল বিশ্বের পুরোধা, কিন্তু তারা আল্লাহর মা'রিফাত বা পরিচিতি লাভের সহায়ক ইল্ম থেকে সর্বতোভাবে বিমুখ, অথচ স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব এই ইল্ম দিয়ে। উদ্দেশ্যের সৈকতে এই ইসলামকে মাধ্যম করে উপনীত হওয়া যায়। আর তুফান থেকেও নিষ্কৃতি লাভ হয়। স্বীয় আমলকে দুরস্ত রাখে এই ইল্ম। এই ইল্ম অনভিপ্রেত আসক্তিকেও সুনিয়ন্ত্রিত রাখে। চরিত্রকে মার্জিত ও প্রবৃত্তিকে সুসংহত করে। মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং মঙ্গলের দিকে অনুপ্রাণিত করে। এই ইল্ম মনে আল্লাহর ভয়ের জোয়ার তোলে। এই ইল্ম বিনে কলুষহীন সমাজ গড়া যেমনি সম্ভব নয়, তেমনি সম্ভব নয় তাহযীব-তামাদ্দুনের রক্ষণাবেক্ষণ। একমাত্র এ ইল্মেই রয়েছে পরিণাম ও পরিণতি এবং আখিরাতের প্রস্তৃতির জন্য প্রবল উদ্দীপনা। আমিত্ব ও আত্মপূজার অহমিকাকে বিদূরিত করে এই ইল্ম। দুনিয়ার এই তুচ্ছ বস্তুর লোভ-লালসার বেড়াজাল থেকে আযাদ হয়ে কল্যাণের দিকে এভাবে আকৃষ্ট হতে থাকে, লৌহখণ্ড যেভাবে হয়ে থাকে চুম্বকের দিকে।
এই ইল্মে নববী সাবধানতা ও ভারসাম্যের দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। অনর্থক ও নিষ্ফল চেষ্টায় অবাঞ্ছিত পথ পরিহার করাই এই ইল্মের বিশেষ আহ্বান।
সেসব জাতির বিভীষিকাময় কাহিনী মহান আল্লাহ্ রাব্বুল 'আলামীন পবিত্র কালামে বর্ণনা দিয়েছেন, যারা ছিল আত্মগৌরব ও অহংকারের কালো পাথারে নিমজ্জিত। যারা সমসাময়িক আম্বিয়া-ই-কিরামকে ভাবত হীন ও তুচ্ছ। কারণ আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.) যুগোপযোগী প্রচলিত শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য খ্যাতি রাখতেন না।
"তাদের রাসূল যখন তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসত, যখন তারা নিজেদের জ্ঞানে দম্ভ করত, তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তাদেরকে তাই বেষ্টন করল।" [সূরা মু'মিন: ৮৩]