📄 কুদরতী প্রশ্ন
এ পার্থিব জীবনে জ্ঞান অর্জন, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তার চাহিদা মোচন একমাত্র ইন্দ্রিয়রাজি ও বুদ্ধিগত যোগ্যতার ওপরই নির্ভরশীল অর্থাৎ এ ইন্দ্রিয়শক্তির নির্দেশানুযায়ীই মানব জীবন অতিবাহিত হয়ে থাকে। এ জাগতিক জীবনে ইন্দ্রিয়রাজির নিরিখে একটা প্রশ্নঃ নবুয়তের সিলসিলা ও আম্বিয়া-ই-কিরামের মহত্ত্ব কতটুকু? অপরাপর সুধী ও বুদ্ধিজীবী থেকে কি বৈশিষ্ট্য দ্বারা নবীগণ শ্রেষ্ঠত্ব পেয়ে থাকেন? কেনই বা তাঁদের এ অধিকার, তাঁরা কিছু তত্ত্ব নিয়ে পর্যালোচনা করবেন, আর এমন এমন সংবাদ দেবেন, যা সূক্ষ্ম অনুভূতির নাগালেও আসে না, না সেখানে মেধাসম্পন্ন বিবেকের আরোহণ সম্ভব? অথচ সবাই একই সমাজে লালিত। একই ভূখণ্ডে জীবনাতিপাত করে চলেছে। এর কারণ কি, এরা অবলোকন করে ফেলবেন এমন অদৃশ্য কিছু যা তাঁদেরই সমসাময়িক অন্যান্য বিজ্ঞানী ও মহামনীষী পর্যন্ত পারবেন না? অথচ সে অদৃশ্য জিনিসসমূহ প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রদীপ্ত হয় আর তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু বাস্তবে পরিণত হয়।
বস্তুত এটি একটি প্রাকৃতিক ও কুদ্রতী প্রশ্ন যা আবহমানকাল ধরে নতুন নবীর আবির্ভাবের সাথে সাথে জনমনে পয়দা হয়ে আসছে। মন-মস্তিস্ককে প্রভাবিত করেছে। বিশ্বনবী (সা.) নবুয়তের সম্মানে বিভূষিত হয়ে তাব্লগি ও শুদ্ধিকরণের দায়িত্বে যখন নিয়োজিত হন, তখন তাঁকেও সে প্রশ্নের একান্তই মুখোমুখি হওয়ার কথা। নবী (সা.) সে পরিবেশে যে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যে দূরদর্শিতার সাথে উক্ত সমস্যাটির সমাধান দিয়েছিলেন, তা তাঁর অনন্য মু'জিযাসমূহের অন্যতম বৈ কিছু নয়।
আরব সমাজ, বিশেষ করে মক্কা-মরুতে বসবাসকারিগণ দীর্ঘকাল যাবত সূক্ষ্ম মাসআলা, ইলমী পরিভাষা, দর্শন ইত্যাদি থেকে হাত গুটিয়ে জীবন কাটিয়ে আসছিল, তবে আবার মন-মানসিকতার তীক্ষ্ণতা, সুষ্ঠু বিবেচনা, সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ন্যায়ের সামনে শির অবনত করার জন্য তারা ছিল তখন বিশ্বসেরা। এ পার্থিব জীবনে নবীগণের মর্যাদা কতটুকু? অপরাপর যারা বাহ্যিক ইন্দ্রিয়রাজি বিনে জ্ঞান হাসিলের অন্য মাধ্যম হতে বিমুখ, এদের মাঝে একমাত্র নবীগণেরই অদেখা তত্ত্বাবলী প্রকাশ করার অধিকার থাকে কিভাবে? নবী (সা.) উপরিউক্ত জিজ্ঞাসাটার এমন ফায়সালা প্রদান করেছেন, যেখানে আরববাসীদের সে বিশেষ গুণটির পুরোপুরি মিল লক্ষ্য করা যায়। তারা সে প্রজ্ঞাজনিত প্রকাশভংগী প্রতিপক্ষ ভাষাবিদ ও দর্শনশাস্ত্রবিশারদদের সহস্র যুক্তির চেয়ে ছিল অধিকতর সক্রিয় ও হৃদয়গ্রাহী। এর জন্য তাঁর গৃহীত কর্মসূচী, কর্মপদ্ধতি ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি শ্রোতৃমণ্ডলীদের সুষ্ঠু মানসিকতা, জ্ঞান-বুদ্ধির পরিধি এবং স্থান ও পাত্রের পুরো সামঞ্জস্য বজায় রেখে সন্নিবেশিত হয়েছিল। আম্বিয়া-ই-কিরামদের সবার অবস্থা মূলত এমনই ছিল। তাঁরা স্বীয় নবুয়তের সত্যতা প্রমাণে বানোয়াট লৌকিকতা, অলংকার জ্ঞান ও ইশারা-ইঙ্গিতের ধার ধারতেন না, বরঞ্চ তাঁরা ছোট ও সাধারণ বিষয় দ্বারা বহু মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বের করে দেখিয়ে দিতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে একে তো ছিল না সাংবাদিকতা, ছিল না বেতারযন্ত্রের ব্যবস্থাপনা, এমন কি ছিল না স্বরকে একটু উচ্চ করা বা ছড়ানোর মেশিনটিও। এমন একটি যুগে মক্কা মরুর সমস্ত বাসিন্দাকে এক জায়গায় এক সুনির্দিষ্ট সময় একত্র করার কি ব্যবস্থা হতে পারে? কিভাবে তাদের মন-মস্তিষ্কে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যদ্দ্বারা তারা স্বীয় অভিরুচির মোহ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে সবাই এক হয়ে নবী (সা.)-এর দিকে (ত্রাণের জন্য) ছুটে আসবে?
রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আরব সমাজেই প্রতিপালিত একজন সদস্য। পূর্ব থেকেই তাদের আচরণাদি, প্রথা ও রীতিনীতির সাথে তাঁর বেশ সম্পৃক্ততা ছিল, এমন কি তিনি ওসব রীতিনীতির মোহ তাদের মানসিকতা ও সমাজের শিরা-উপশিরাই কতটুকু শিকড় গেড়ে বসেছিল, সে সম্পর্কেও ওয়াকিফ ছিলেন। সে সুকঠিন ও সূক্ষ্ম কাজে মহানবী (সা.) তাঁর অভিজ্ঞতাকে পুরো সদ্ব্যবহার করেছিলেন। আরবদের চিরাচরিত প্রচলন ছিল তাদের কেউ কোন বিপদ আঁচ করলে, যেমন শত্রুর আকস্মিক আক্রমণের আশংকা অথবা শত্রুপক্ষের সুযোগ তল্লাশী ইত্যাদি, সাথে সাথে ছোট পাহাড়ের চূড়া কিংবা গুহায় আরোহণ করত এবং উচ্চৈঃস্বরে এই বলে চিৎকার করে উঠত, "ইয়া সাবাহ" (ধ্বংস ধ্বংস), "ইয়া সাবাহ" (শত্রু শত্রু)। এই বিকট ধ্বনি শোনামাত্রই সমাজের লোকজন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ত, হাতিয়ার গুছিয়ে নিত এবং বিপদ বা শত্রু প্রতিহত করার নিমিত্ত এগিয়ে আসত। সে ভয়ংকর বস্তুটি কি ছিল, যা এক সঙ্গে তাদের সবাইকে বিষাদাচ্ছন্ন করে তুলত এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তায় কুঠারাঘাত হানত? তা একটাই ছিল—শত্রু, যার লশকর এক বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে নিচ্ছিল। উট ও অন্যান্য জীবজন্তুকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সার্বিক ক্ষতি সাধনের অপচেষ্টা করছিল তাদের। আরব উপজাতি ও মরুবাসিগণ এই একটিমাত্র বিপদের সাথেই জীবনে পরিচিত হয়ে আসছিল আবহমানকাল ধরে। সুতরাং তারা যখনি ওসব শব্দ শুনত, সেই একটি অর্থই তারা ধরে নিত।
ওসব পার্থিব অসুবিধা ও ভয়াবহতার গুরুত্ব যে অনস্বীকার্য তা স্বীকৃত বটে; কিন্তু নবীগণের দূরদৃষ্টির সামনে তা তুচ্ছ। কারণ তাঁরা বিশ্বস্রষ্টা ও নিয়ন্তার অস্তিত্ব, গুণাবলী ও তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি সংক্রান্ত বিষয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। সজাগ থাকেন তাঁরা বর্বরতাচ্ছন্ন বিষাক্ত জীবন সম্বন্ধেও, যার মধ্য দিয়ে তদানীন্তন মক্কাবাসিগণ কালাতিপাত করছিল। তাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানতেন আরবের বর্বরতাক্লিষ্ট সমাজে অনুপ্রবিষ্ট অনাচার ও দুশ্চরিত্রতা সম্পর্কেও। "তারা প্রতিমা পূজা করত, মৃত জীব খেত, অশ্লীলতায় মত্ত থাকত দিব্বি এবং আত্মীয়দের সূত্রবন্ধন ছিন্ন করত অহরহ। জ্বালাতন করত প্রতিবেশীদেরকে। বিত্তশালীরা প্রায়ই দুর্বলদেরকে শোষণ করে বেড়াত।"
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উপলব্ধি করলেন, দুশমন তো মূলত বাইরে নয়, বরঞ্চ তা আসন জুড়ে আছে জনগণের মন-মস্তিষ্কে, আকাঈদ ও চরিত্রে। যত বহিঃশত্রু আছে তদপেক্ষা এ দুশমন অধিকতর ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক। অনিষ্টের এ স্রোতধারা প্রবহমান তাদেরই সত্তা এবং তাদেরই অভ্যন্তর থেকে যা বাহ্যিক ক্ষতি সাধনকারী কার্যকলাপ থেকে প্রকট, যেগুলোর উদাহরণ তারা বর্বরতার দীর্ঘ কালে স্থাপন করে আসছিল অথবা আরবীয় গোত্রীয় জীবনে অহরহ যেগুলোয় তাদের আক্রান্ত হতে হয়েছিল, তাদের প্রবৃত্তিজনিত আত্মদ্রোহিতা প্রতিটি শত্রু গোত্র অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শত্রু ছাউনি অপেক্ষা বহু ক্ষতিকর ছিল। তাদের এ অভিশপ্ত জীবন-প্রণালী মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধানলকে তীব্র করে তুলছিল। কারণ তিনি তাঁর বান্দাদের নাস্তিকতাকে আদৌ অনুমোদন করেন না। বসুন্ধরায় কিঞ্চিৎ কোলাহল সৃষ্টি হোক, তাও তিনি চান না।
টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের সময়ের জাহিলী যুগের এই চিত্রটি যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন হযরত জাফর ইবন আবু তালিব (রা.)। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর সমীপে তাঁর পরিবেশিত ভাষণের কিয়দংশ পেশ করা হলো।
📄 সাফা পাহাড়ের উপকন্ঠে
একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ঊষালগ্নে সাফা পাহাড়ে তশরীফ আনলেন। এটি মক্কারই সন্নিকটে অবস্থিত ছিল। এখানে আগমন করে তিনি উচ্চ স্বরে আওয়ায দিলেন, "ইয়া সাবাহাহ্", "ইয়া সাবাহাহ্।" মরুবাসীদের মনে একথা চিরন্তন সত্য হিসেবে গাঁথা ছিল, এই আওয়ায উচ্চারিত হয় যথাস্থলে ও বিপদসংকুল পরিবেশে। আর সাধারণত এতে মিথ্যা, প্রতারণা অথবা হাসি-তামাশার লেশটুকুও থাকে না। মক্কাবাসীদের এ সুবিদিত আওয়ায এমন এক ব্যক্তিত্বের কণ্ঠ থেকে আজ বের হচ্ছিল, যিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী। তাঁকে তারা সাদিক (সত্যবাদী) ও বিশ্বস্ত উপাধিতে বিভূষিত করেছিল পূর্বেই। সে আওয়াযের রহস্য তারা খুবই জানত। কারণ অভিজ্ঞতা ও ঘটনা প্রবাহের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস তাদেরই সামনে উপস্থিত ছিল। তারা সে আওয়াযের দিকে অগ্রসর হতে একটুও কুণ্ঠাবোধ না করে সমবেত হয়ে গেল। কেউ নিজেই এল আবার কেউ প্রতিনিধি প্রেরণ করল। ১
সবাই একত্র হলে রাসূল (সা.) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, “হে বনী 'আব্দুল মুত্তালিব। হে বনী ফিত্র! হে বনী কা'ব! তোমাদের অভিপ্রায় কি? আমি তোমাদের সামনে যদি এই ঘোষণা দিই, এই পাহাড়ের পাদদেশে একদল অশ্বারোহী সেনা লুক্কায়িত আছে এবং তোমাদের অজান্তে তারা তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রহর গুণছে, তোমরা আমার এ ঘোষণায় আস্থা রাখবে কি? রাসূলে আরবী (সা.) যাদেরকে সম্বোধন করেছিলেন এবং যাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তারা 'অশিক্ষিত' ও 'অনুন্নত' ছিল। তারা ফালসাফা ও তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেনি এবং তারা কোন বিষয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করায় অভ্যস্ত ছিল না, বরঞ্চ (আমি পূর্বেই বলেছি) তারা ছিল বস্তুনিষ্ঠ ও কর্মঠ। আল্লাহ্ পাক বিবেক ও মুক্তবুদ্ধি (Common sense)-এর এক বিরাট অঙ্গ তাদেরকে দান করেছিলেন। তারা তাই অবস্থান ও পরিবেশটি পর্যবেক্ষণ করল। ভাষণদাতা যেই স্থানটিতে দণ্ডায়মান ছিলেন, সেটার প্রকৃতিগত অবস্থা অবলোকন করল।
তারা ভাবল এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, একনিষ্ঠা ও শুভকামিতা পরীক্ষিত হয়েছে একাধিকবার, এখন তিনি একটা ছোট পর্বতশৃঙ্গে উপবিষ্ট, তিনি সামনে তো দেখতে পাচ্ছেনই, তাঁর শ্রোতৃমণ্ডলী রয়েছে, সাথে সাথে এ পর্বতের পাদদেশে সে প্রান্তটিও দেখতে পাচ্ছেন, এখানের শ্রোতাদের দৃষ্টি যেখানে পৌঁছতে অক্ষম। তারা তখন কোন প্রকার দ্বিধা-সংশয়ের পক্ষপাত না করে উপলব্ধি করতে পেরেছে, যার মর্যাদা এমন হবে, তার অধিকার আছে পাহাড়ের পাদদেশে লুক্কায়িত শত্রু কিংবা বিপদ সম্পর্কে সতর্ক-সংকেত পেশ করার। আর যাদের সামনে পাহাড়টি প্রতিবন্ধক, তাদের এ অধিকার থাকতে পারে না বা তাঁকে মিথ্যে বলে আখ্যায়িত করার ও তাঁর দেয়া খবরটি এ বলে প্রত্যাখ্যান করে দেয়ার যে, তারা সংকেতদাতার সাথে তা প্রত্যক্ষ করায় শরীক রয়নি। প্রকারান্তরে বিরাজমান অন্তরায় সৃষ্টিকারী পাহাড়টিই তাদের অবস্থা ও ভাষণদাতার অবস্থার মাঝখানে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর পাহাড়ের চূড়ায় দণ্ডায়মান ভাষণদাতাকে অন্যদিকে দৃষ্টি দান ও সাক্ষ্য প্রদানের একক সুযোগ দিয়ে দিয়েছে।
আরববাসিগণ নিরপেক্ষমনা ছিল। তারা ছিল সুনিপুণ ও সত্যপ্রিয়। প্রতিউত্তরে তারা বলল, “হ্যাঁ! আমরা এ জাতীয় ঘোষণা করতে পারি না। আমাদের তা মেনে নিতেই হবে।"
টিকাঃ
১. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮।
📄 নবুয়তের দর্শনগত রূপ
নবী (সা.) নবুয়তের এ বিরল আল্লাহপ্রদত্ত হিকমত, আরবী ভাষা ও সাহিত্যে অনন্য প্রতিভা দ্বারা নবীগণ নবুয়তের অনুপম মাহাত্ম্য ও অতুলনীয় মর্যাদার রূপরেখা অংকন করে আরববাসীদের সামনে উপস্থাপন করলেন। নবীগণের শ্রেষ্ঠত্ব তিনি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এই তথ্যটির দিকে তিনি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন-নবীগণ অবলোকন করেন এমন এক জগৎ, যা তাঁদের সমসাময়িক আর কেউ পারেন না। তাঁরা এমন ঘটনাবলী সম্পর্কে সংবাদ দিতে সক্ষম, অন্যান্য নায়ক ও সংস্কারকগণ যার স্বাক্ষর পেশ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আর তা এজন্য, তাঁরা নবুয়তের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে আছেন। মানুষ হিসেবে অনুভূতির পবিত্রতা ও স্বভাবগত শালীনতার কারণে দৃষ্ট বিশ্বকে তাঁরা সুস্থ বুদ্ধি ও সুষ্ঠু চিন্তার মানুষের মতই দেখে থাকেন। অধিকন্তু আল্লাহপ্রদত্ত নবুয়ত (আল্লাহর খুশি অনুযায়ী) যেহেতু অদৃশ্য জগতের সাথে সম্পর্ক রাখে তাই তাঁরা এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নবুয়তের জগতের অদৃশ্য রহস্যাবলীও অবলোকন করার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
কুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিসলুকুম ইউহা ইলাইয়া - "বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, (তবে) আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।" [সূরা কাহফঃ ১১০]
একজন মানুষ যত বড় মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞ কিংবা বিশেষজ্ঞই হন না কেন, তার জন্য এটা সম্ভব হবে না, নবীগণ মিথ্যারোপ করবে অথবা তাঁদের প্রত্যক্ষ দৃষ্ট বিষয়াদিকে প্রত্যাখ্যান করবে। কেননা তারা নবীগণের পর্যবেক্ষণে অংশীদার ছিল না। যেসব জিনিস আম্বিয়া-ই-কিরাম দেখতে পান, এরা তা দেখে না। যেমনি পাহাড়ের নিম্নদেশে দণ্ডায়মান কারো জন্য কোন অবস্থাতেই সমীচীন হবে না পর্বতশৃঙ্গে আরোহীর উক্তিতে আপত্তি উত্থাপন করার এবং পর্বতের পেছনের খবরাদি ও পর্বতের পাদদেশে সংঘটিত ঘটনাবলীকে উপেক্ষা করার।
তাইতো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়রাজির গোলকধাঁধায় আক্রান্ত কেউ যদি এঁদের বিরুদ্ধে মেতে ওঠে এবং প্রমাণ পেশ করার পেছনে লেগে যায়, তখনি তাঁরা অবাক চিত্তে সার্বিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে ওঠেনঃ
আ তুহাজ্জুননি ফিল্লাহি ওয়া ক্বাদ হাদানি - "তোমরা কি আল্লাহ্ সম্বন্ধে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎ পথে পরিচালিত করেছেন।” [সূরা আন'আম : ৮১]
নবুয়তের প্রথম যুগের সব নিরক্ষর আরববাসী সেসব দার্শনিক ও পণ্ডিতবর্গ অপেক্ষা অধিকতর বিচক্ষণ সাব্যস্ত হয়েছে, যারা আম্বিয়া ও রাসূলগণের খবরগুলো ও তথ্যরাজি একমাত্র এজন্যই উপেক্ষা করে দেয়ার চেষ্টা করছে, তারা কেন তা দেখবে না? সেসব জিনিস তাদের অজান্তে থাকবে কেন?
বাল কাযযাবু বিমা লাম ইউহিতু বিইলমিহি ওয়ালাম্মা ইয়া'তিহিম তা'উইলুহু - "আসল কথা হলো, যে বিষয়ের জ্ঞান তারা আয়ত্ত করেনি তা অস্বীকার করে এবং এখনও এর রহস্য তাদের নিকট অনুদ্ঘাটিত।” [সূরা ইউনুস : ৩৯]
এ প্রকৃতিগত, যুক্তিগত ও অনিবার্য স্বরগুলো অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) একান্ত নিশ্চয়তা ও দৃঢ়তার সাথে সামনে অগ্রসর হলেন। সর্বশেষ স্তরে উপবিষ্ট হয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন:
ফাইন্নি ইন হুয়া ইল্লা নাযীরুল লাকুম বাইনা ইয়াদাই আযাবিন শাদীদ - "আমি তো আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ককারী মাত্র।”
মহানবী (সা.) তাদেরকে সে বাস্তব ও স্থায়ী বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করলেন, যা বিরাজমান ছিল তাদের দৈনিক কর্ম পদ্ধতিতে, যার অনুসরণে কাটছিল তাদের জীবনধারা। তিনি তাদেরকে সতর্ক করলেন সেসব ভ্রান্ত ও অনর্থক ধ্যান-ধারণা সম্পর্কেও, যেগুলো তাদের মন-মানসিকতায় বদ্ধমূল হয়ে বসেছিল। সেসব প্রতিমা সম্পর্কেও তাদেরকে সজাগ করলেন, যেগুলোর তারা অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়েছিল। যেসব বিধ্বংসী চরিত্র ও রীতিনীতি তারা আঁকড়ে ধরেছিল, সেগুলো সম্পর্কেও তিনি দিলেন এক নতুন অনুভূতি। এক কথায় তারা তখন এক চরম মূর্খতার ভেতর দিয়ে কাল যাপন করে আসছিল। শিক্ষা ও ঈমানবিমুখ ছিল তাদের মানসিকতা ও স্বভাব। ইনসাফ যে কি বা আল্লাহ্-ভীতি কাকে বলে, তা তো বুঝতই না তারা, যদ্দরুন সমাজ জীবনে বয়ে এসেছিল তখন ব্যাপক হাহাকার, সংকীর্ণতা, ব্যাকুলতা, মানসিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ ভয়াবহতা।
“মানুষের কৃতকর্মের দরুন সমুদ্রে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে যার ফলে তাদেরকে তাদের কোন কোন কর্মফল তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।" [সূরা রুম: ৪১]
"গুরু শাস্তির পূর্বে তাদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব যাতে তারা ফিরে আসে।" [সূরা আস-সাজদাহ: ২১]
"অথচ এ জীবনের পর রয়েছে আর একটি শাস্তির জীবন। সে শাস্তির তুলনায় ইহলৌকিক শাস্তি ও কষ্টদায়ক জিনিস একেবারেই তুচ্ছ ও সামান্য।”
"এবং পরকালের শাস্তি তো কঠোর!" [সূরা আর-রাদ: ৩৪]
"পরকালের শাস্তি তো অবশ্যই কঠিনতর ও অধিকতর স্থায়ী।" [সূরা তাহা: ১২৭]
"পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক।" [সূরা হা-মীম-আস-সাজদা : ১৬]
সুধী ও বিজ্ঞ সমাজ ঐসব ক্রিয়া ও গুণ সম্বন্ধে জানতে প্রয়াস পেয়েছেন। বিভিন্ন বস্তুর স্বভাব ও গুপ্ত সম্পর্কে অবহিত হয়ে তারা পরিজ্ঞাত বিষয়াদির এক মূল্যবান কোষাগার রচনা করে দিয়েছেন। ফলে উত্তরসুরিদের এতে বহু উপকার হয়েছে। এ মহান কাজ যাঁরা সম্পাদন করেছেন, তাঁদের পরিশ্রম, তাঁদের ত্যাগ ও সাধনা, সফলতা ও সম্মানের যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা হয়। পরিশোধ করা হয় তাদের জয়ধ্বনির পাওনাটুকু, অথচ আল্লাহ্ পাকের অস্তিত্ব, গুণাবলী, আদেশ-নিষেধ, তাঁর সন্তুষ্টি, আকীদা ও বিধি-নিষেধের বৈশিষ্ট্য ও শুদ্ধাশুদ্ধি, ভাল ও মন্দ চরিত্রের ফলাফলের দীক্ষা, আখিরাতের প্রতিদান, শান্তি ও অশান্তি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের যথাযথ পরিচিতি প্রদানের জন্য নবীগণকে আল্লাহ্ পাক স্বীয় ইচ্ছা অনুযায়ী মনোনীত করেছেন। এই নশ্বর জীবনের পরের অবস্থানসমূহ ও তখন যা ঘটবে, যেমন হাশর, নশর, পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান, সুফল ও প্রতিশোধের জ্ঞান অর্জন করার জন্য আম্বিয়া-ই-কিরামই হচ্ছেন একক মাধ্যম।
"তিনিই অদৃশ্যের জ্ঞানাধার, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত!” [সূরা জ্বিন : ২৬-২৭]
আম্বিয়া-ই-কিরাম (দরুদ ও সালাম তাঁদের ওপর) নবুয়তের পাহাড়ে আরোহণ করেন। তাঁরা দেখেন এই জগতকে। সাথে সাথে দেখে থাকেন অদেখা এক জগতকেও। আর মানবতা, মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির পথে অদূর ভবিষ্যতে কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে গেরিলা হামলা সম্পর্কে সতর্ক সংকেত তাঁরাই দিয়ে থাকেন। ঢাকা পড়া ধ্বংসাত্মক পরমাণু ও ক্ষতিকর জিনিসগুলোকেও ধরিয়ে দেন তাঁরাই। ভীতি প্রদর্শন করেন তাঁরা আপন সমাজকে নেহায়েত হৃদ্যতা, প্রেম, দয়া ও একনিষ্ঠতার সাথে। এদিকে যখন কেউ তাদের এই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার খর্ব করতে অপচেষ্টা করে এবং এহেন সুস্পষ্ট বিষয়টাতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে এবং তাদের মাহাত্ম্য ও বিশ্বস্ততাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে, তখন তাঁরা সৌহার্দ্য ও একনিষ্ঠতা নিয়ে পরিতাপ ও বেদনাদায়ক কণ্ঠে বলে ওঠেন:
“বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি: তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে দু-দু'জন অথবা এক-একজন করে দাঁড়াও, অতঃপর তোমরা চিন্তা করে দেখ-তোমাদের সঙ্গী আদৌ উন্মাদ নন। তিনি তো আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ককারী মাত্র।” [সূরা সাবা : ৪৬]
📄 হিদায়াতের একমাত্র মাধ্যম
এরই প্রেক্ষাপটে কুরআন একাধিকবার তাগিদ দিচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর মৌল গুণাবলীর যথাযথ চিহ্নিতকরণে মনোনীত হয়েছেন একমাত্র নবীগণ। আল্লাহর সঠিক মা'রিফাত, যা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার নাগাল থেকে পূত-পবিত্র, ভুল ধারণা কিংবা সঙ্গতিহীন ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত, আর তা অর্জনের একক মাধ্যম তাঁরা-ই। তাঁদের অনুসৃত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ বিনে অন্য কোন সূত্র দ্বারা সে মা'রিফাত লাভ করা সম্পূর্ণ দুরূহ। শুধু যুক্তি-জ্ঞান এর কিঞ্চিৎ দিশা দিতেও অপারক এবং ধী-শক্তি ও মেধা এক্ষেত্রে অচল। তা চারিত্রিক ভারসাম্যের ব্যবস্থাও হতে পারে না। বুদ্ধিমত্তার তীব্রতা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অকেজো। জ্ঞান ও বুদ্ধির অনুসন্ধান যেমনি সে পর্যন্ত পৌঁছতে ব্যর্থ, অভিজ্ঞতার কোষাগারও তেমনি সেক্ষেত্রে একেবারেই শূন্য। আল্লাহপাক জান্নাতবাসী কতিপয় সত্যবাদী অভিজ্ঞ মনীষীর ভাগ্য দ্বারা এ তথ্যটির বিশ্লেষণ দিচ্ছেন-যেখানে মিথ্যা বর্ণনা ও অতিরঞ্জিত কিছুর কোন প্রকার স্থান নেই।
"প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন। আমাদেরকে আল্লাহ্ পথ না দেখালে আমরা কখনো পথ পেতাম না।” [সূরা আ'রাফ: ৪৩] কুরআন সুস্পষ্টভাবে এ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে, নবীগণই সঠিক মা'রিফাত অর্জনের একমাত্র মাধ্যম এবং তাঁরাই আল্লাহর পরিচিতি লাভের দিশারী ছিলেন। সেই গন্তব্যস্থলে নিয়ে পৌঁছিয়ে দিতে অনেকটা সক্ষম তাঁরাই।
"আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো সত্য বাণী এনেছিল।" [সূরা আ'রাফ: ৪৩]
এসব কথা দ্বারা প্রতীয়মান হলো, আম্বিয়া-ই-কিরামের আবির্ভাবের ফলেই এটি সহজ হতে পেরেছে। এজন্য আল্লাহর মা'রিফাত অর্জন করা, তাঁর সন্তুষ্টি ও বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়া আর সে মুতাবিক নিজেদেরকে সুশোভিত করা সম্ভব হয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে জান্নাতের প্রবেশপত্র নেয়া সম্ভব হয়েছে।
বুদ্ধি ও অনুভূতির ঊর্ধ্বের তথ্যাবলীর অনুসন্ধানে মানুষের বিবেক ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো যে কতটুকু নিষ্ক্রিয়, ক্ষীণ, সীমিত ও আস্থা স্থাপনের অনুপযোগী এ সম্পর্কে কতিপয় বাহ্যিক শীর্ষস্থানীয় ও আধ্যাত্মিক তথ্যবিশারদের উক্তি ও পর্যালোচনা পরিবেশন করা সমীচীন মনে করি।
হযরত শায়খ আহমদ সরহিন্দী-মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) [মৃ. ১০৩৪ হিজরী] স্বীয় তত্ত্ববহুল মাকতুবাতে (রচনাবলী) এ প্রসঙ্গটি একাধিকবার টেনেছেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেক নবীগণ (আ.)-এর সহযোগিতা ও পথপ্রদর্শন ছাড়াও বিশ্বস্রষ্টার অস্তিত্ব নির্ণয় করতে পারে, তাঁর অস্তিত্ব যে একান্ত জরুরী ও আবশ্যক-এ অনুভূতিও যোগাতে পারে বটে, কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে তাঁর মৌলিক গুণাবলীর সঠিক পরিচিতি, তাঁর পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা, নিখুঁত একত্ববাদ ইত্যাকার বিষয়ে অবগত হওয়া কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। মুজাদ্দিদ সাহেব তাঁর রচনালিপিতে বলেন:
সারকথা: এই বুদ্ধিশক্তি সে অমূল্য দৌলতের দ্বারোদ্ঘাটনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং মহান আম্বিয়া-ই-কিরামের হিদায়াত ছাড়া সে রত্নাগারের দিশা পেতে বুদ্ধিশক্তি একেবারেই অক্ষম।” ১ পাশ্চাত্য দর্শন ও ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসও একথারই জ্বলন্ত স্বাক্ষর বহন করে, শুধু বিবেক ও যুক্তি-প্রমাণ কিংবা পাশ্চাত্য দর্শনের ওপর নির্ভরশীলগণ আল্লাহর মা'রিফাত ও তার মৌলিক গুণাবলী সাব্যস্তকরণ ও উত্তম কর্মগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে কতই না হোঁচট খেয়েছে! আর লিপ্ত হয়েছে তারা অবর্ণনীয় গোমরাহী ও মূর্খতায়। ২ মুজাদ্দিদ সাহেব স্বীয় রচনাবলীতে প্রমাণ করেছেন, যেমনিভাবে বুদ্ধির স্তর ইন্দ্রিয়রাজির ঊর্ধ্বে, তেমনিভাবে নবুয়তের স্তরও বিবেকের ঊর্ধ্বে, অথচ কোন জিনিস যুক্তির পরিপন্থী হওয়া এবং যুক্তি ঊর্ধ্বে হওয়া এক কথা নয় কিছুতেই। আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকিফ হওয়া নবুয়তের মধ্যে সীমিত এবং আম্বিয়াদের অবহিত ও তা'লমি দানের ওপর তা পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাঁরা মা'রিফাতে ইলাহীর ক্ষেত্রে গ্রীক দার্শনিকদের মূর্খতার নিদর্শনগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছেন যদ্দরুন মানব বিবেক-শক্তি অনুশোচনা না করে পারে না। অনুরূপ তিনি পাশ্চাত্য দার্শনিক ও তথাকথিত সংস্কারকগণের বিস্ময়কর অজ্ঞতার শিক্ষণীয় চিত্র তুলে ধরেছেন। ৩
অনুরূপ তিনি খাজা বাকী বিল্লাহর দু'জন গৌরবোজ্জ্বল সন্তান খাজা আবদুল্লাহ ও খাজা 'উবায়দুল্লার নামে প্রেরিত অন্য আরেকটি মাকতূব তথা রচনালিপি ২৬৬/১-এর মধ্যে অত্যন্ত বিশ্লেষণের সাথে প্রমাণ করেছেন, নবীগণের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব, গুণাবলী ও বিধি-নিষেধের যথোচিত পরিচিতি প্রদানের একক ও অনিবার্য উপায়। তিনি এও সাব্যস্ত করেছেন, বুদ্ধি ও কাশফ্ উভয়টির নির্মলতা ও নিষ্কলুষতা অসম্ভব। এ দু'টি জিনিস জড়দেহের প্রভাব, মনস্তাত্ত্বিকতা, চারিত্রিক কলুষতা ও সৃষ্টিজনিত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে সার্বিক মুক্ত ও স্বাধীন হতে পারে না। বিবেক-বুদ্ধি ও কাশফের মধ্যস্থতা এবং এগুলো থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো, বিধি-বিধান ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সেসব দুর্বলতার রঙ্গে রঙ্গীন হয়ে এবং সেগুলোর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে প্রকাশ পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব সিদ্ধান্তই পরিচালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে, যা তাদের নিকট বিদিত হয়ে আসছে যা বাহ্যিক অথচ তা একেবারেই বাস্তবতার পরিপন্থী ও স্বীকৃত মাত্র। তাদের নিজস্ব সমর্থনের দরুন অনেকক্ষেত্রেই শুদ্ধ ও অশুদ্ধের মাঝখানে তারতম্য করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.)-এর রচনাবলী এ জাতীয় তত্ত্ব ও দর্শনে পরিপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে সেসব রচনা অধ্যয়ন করা একান্তই কর্তব্য এবং ঈমানের জ্যোতি বৃদ্ধিকারক।
আল্লাহ্ পাক কুরআনের এক শানদার 'সূরা আস্-সাফফাত' (মুশরিকদের পথভ্রষ্টতাসমূহ, ভ্রান্ত ধারণা ও আল্লাহর সঙ্গে অশোভনীয় ব্যাপারে সম্পৃক্ততা খণ্ডন করা হয়েছে সূরাটিতে)-কে এরই বর্ণনায় সমাপ্ত করেছেন:
"তারা যা আরোপ করে তা হতে মহান ও পবিত্র আপনার প্রতিপালক, শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি এবং প্রশংসা সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।" [সূরা সাফফাত : ১৮০-১৮২]
উপরিউক্ত তিনটি আয়াত যেন সুসংবদ্ধ শিকলের কড়া, যা পরস্পর একত্রে গাঁথা। কেননা আল্লাহ্ পাক স্বীয় অস্তিত্বকে মুশরিকদের অবাঞ্ছিত ও অমার্জিত উক্তি থেকে পবিত্র ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হন নি শুধু, বরঞ্চ এর সাথে সাথে আম্বিয়া-ই-কিরাম সম্পর্কেও আলোচনা টেনেছেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ্ পাকের পূর্ণ পবিত্রতা ও মহত্ত্বকে সঠিকভাবে অভিব্যক্ত করেছেন। বিবৃত করেছেন তাঁরা তাঁর অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলীকে একটা একটা করে। আল্লাহ্ পাক এজন্য সপ্রশংস সালাম পাঠালেন তাঁদের উদ্দেশে। স্রষ্টার সঠিক পরিচিতি সৃষ্টি সমীপে উপস্থাপন ও তাঁর মৌলিক গুণাবলী সমুজ্জ্বল করার অনিবার্য বাহনই হচ্ছে নবীগণের কণ্ঠ। তাঁদের আবির্ভাব বয়ে এনেছে সৃষ্টিকুলের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ, বিশেষ করে তা হচ্ছে মানব জাতির অসীম ইহসান। এটি আল্লাহর রবুবিয়াত, রহমত ও হিকমতেরও এক জ্বলন্ত নিদর্শন।
এজন্যই নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা তিনি ইতি টানলেন:
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্য শোভনীয়, যিনি সমস্ত জাহানের প্রতিপালক।” [সূরা সাফফাত : ১৮২]
হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (র.) সে তত্ত্ব পরিব্যাপ্ত করতে গিয়ে তাঁর এক রচনায় লিখেছেন, "আম্বিয়া-ই-কিরাম হচ্ছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। তাঁদেরকে সোপর্দ করা হয়েছে এক মহাদৌলত। আওলিয়াদের বিচরণ যেখানে ক্ষান্ত, আম্বিয়া-ই-কিরামের বিচরণ সেখান থেকে মাত্র শুরু। এর ব্যতিক্রম নয় মোটেই। নবুয়তের অনুসরণে ফরযসমূহ দ্বারা নৈকট্য হাসিল হয়। সাগরের তুলনায় একটা ফোঁটার অস্তিত্ব যেমন, বিলায়াতের গুণাবলী নবুয়তের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় তেমনও নয়। ১ আম্বিয়া-ই-কিরাম ও নবুয়তের মর্যাদা সম্বন্ধে মুজাদ্দিদ সাহেবের ও তাঁর এক পূর্বসূরী প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মাখদুমুল মালিক শায়খ শরফুদ্দীন য়াহয়া মুনীরী (র.) তাঁদের রচনাবলীতে অতীব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। মুজাদ্দিদ সাহেব লেখেন, "ওয়ালীগণ তাঁদের লক্ষ্যস্থল সংকীর্ণ হওয়ার দরুন সৃষ্টির দিকে পুরোপুরি লক্ষ্য রাখতে পারেন না (বিধায় নবীগণের মত তাঁদের দ্বারা সর্বব্যাপী খিদমত ও হিদায়াতের কাজ নেয়া যেতে পারে না)। নবুয়তের বিষয়টি এর ব্যতিক্রম। নবীগণ তাঁদের অন্তরের প্রসারতা ও দৃষ্টির উদারতার ফলে স্রষ্টার দিকে যখন লক্ষ্য রাখতে যান, সৃষ্টির দিকেও লক্ষ্য রাখতে কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হন না। তদ্রূপ তাঁদের আবার সৃষ্টির দিকে লক্ষ্য করতে গিয়ে স্রষ্টার ধ্যানে কোন কণ্টক দেখা দেয় না।” ২
মাখদুম সাহেব বলেন, "আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর একটা নিশ্বাস মাত্র আউলিয়াগণের সমস্ত জীবনের চেয়েও উৎকৃষ্ট। আম্বিয়া-ই-কিরাম (আ.)-এর শুধু মাটির দেহটিও পবিত্রতা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে আউলিয়া-ই-কিরামের অন্তর ভেদজ্ঞান ও আরাধনার সমতুল্য। অন্যরা সাধনা করে যেখানে গিয়ে পৌঁছতে পারেন না, আম্বিয়া-ই-কিরামের মাটির দেহটি অনায়াসেই সেখানে পৌঁছে যায়।" ৩
টিকাঃ
১. মাকতুবাত: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮; প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩।
২. মাকতুবাত: প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১২।
৩. মাকতুব: বিংশতম খণ্ড।