📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 নির্বাচিত সৃষ্টি ও মানবতার নিষ্কলুষ আদর্শ

📄 নির্বাচিত সৃষ্টি ও মানবতার নিষ্কলুষ আদর্শ


কুরআন মজীদ আম্বিয়া-ই-কিরামকে কখনো কখনো স্মরণ করেছে ইস্তিফা (মনোনয়ন), ইজতিবা (চয়ন), মহব্বত ও সন্তুষ্টির শব্দ দ্বারা, আবার কখনো কখনো তাঁদেরকে উন্নত প্রশংসাবলী, যৌক্তিক, চারিত্রিক ও আমালী যোগ্যতার যথাযথ বাহক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয়, নবীগণই সৃষ্টির নির্যাস, মানবতার নিষ্কলঙ্ক আদর্শ ও আল্লাহ্ পাকের বার্তা বহন ও দীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক যোগ্য ও নৈপুণ্যের অধিকারী ব্যক্তিবর্গই হয়ে থাকেন।

আল্লাহু আলামু হাইসু ইয়াজআলু রিসালাতাহু। "রিসালাতের দায়িত্ব কোথায় রাখা যায়, এ সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।" [সূরা আল-আন'আম : ১২৪]

হযরত ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কে ইরশাদ হচ্ছেঃ "আমি তো এর পূর্বে ইবরাহীমকে সৎ পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তার সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক পরিজ্ঞাত।" [সূরা আম্বিয়া : ৫১]

আরো বলা হয়েছে : "এবং আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীমকে বন্ধু করে নিয়েছিলেন।" [সূরা আন-নিসা : ১২৫]

“এবং আমি পরবর্তীদের মাঝে ইবরাহীমের পুণ্য স্মৃতি টিকিয়ে রেখেছি, ইবরাহীমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক! পুণ্যবানদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। তিনি আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরই একজন ছিলেন।" [সূরা আস-সাফফাত : ১০৮-১১১]

এবং হযরত ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কেই বলা হয়েছে: "অবশ্যই ইবরাহীম নিতান্ত ধৈর্যশীল, কোমল-প্রাণ ও আল্লাহঅভিমুখী ছিলেন।" [সূরা হুদ : ৭৫]

এদিকে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মরণে বলা হয়েছে: "তিনি তাঁর প্রতিপালকের কাছে অতীব প্রিয় ছিলেন।” [সূরা মারইয়াম: ৫৫]

হযরত মূসা (আ.)-এর স্মরণে বলা হয়েছে: "আর আমি তোমাকে আমার কাজের জন্য তৈরি করেছি।" [সূরা ত্বহা : ৪১]

আরো বলা হয়েছে: "এবং মূসা! আমি আমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালবাসা সঞ্চারিত করেছি। (তোমার সাথে মানুষ সদাচরণের জন্য) যেন তুমি আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হও।" [সূরা তাহা : ৩৯]

তাঁর সম্পর্কে আরো ইরশাদ হচ্ছে: "আমি তোমাকে আমার বাণী ও বাক্যালাপ দ্বারা লোকের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা আ'রাফ: ১৪৪]

হযরত দাউদ (আ.)-এর স্মরণে বলা হয়েছে: "এবং আমার বান্দাহ শক্তিধর দাউদকে স্মরণ করুন। অবশ্যই তিনি (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারীদেরই একজন ছিলেন।" [সূরা সাদ : ১৭]

তাঁরই যোগ্য উত্তরসুরি সন্তান হযরত সুলায়মান (আ.)-এর স্মরণে বলা হয়েছে: “সুলায়মান নেহায়েত উত্তম বান্দা ছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি প্রত্যাবর্তনকারীদের একজন ছিলেন।" [সূরা সাদ : ৩০]

অনুরূপ হযরত আইয়ুব (আ.)-এর মর্যাদাসম্পন্ন এক জামাত নবী (আ.)-এর প্রতি ভালবাসা, সম্মান প্রদর্শন ও তাঁদের উচ্চাঙ্গের গুণাবলী বিশেষ ভঙ্গিতে আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: "এবং আমার কতিপয় ক্ষমতাবান ও বিচক্ষণ বান্দা, যেমন ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে স্মরণ করুন। আমি তাঁদেরকে পরপারের ইয়াদের এক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গুণ দিয়ে অলংকৃত করেছি। এবং তাঁরা আমার নিকট মনোনীত ও নিষ্ঠাবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।” [সূরা সাদ : ৪৫-৪৭]

এ অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও যে আপনারা কুরআন পাকের তাত্ত্বিক গবেষণা করে থাকেন এবং আমার আলোচনা আপনাদের কাছে অভিনব কিংবা নতুন কিছু যে উপস্থাপন করবে এমন কিছু নয়, তথাপি এ মনোরম ও আনন্দদায়ক আলোচনা মঞ্চে আমার বক্তব্যটা দীর্ঘায়িত করার কারণ হচ্ছে এই, আল্লাহ্ পাকের কাছে নবী (আ.)-দের সম্মান, মর্যাদা ও তাঁদের সম্পর্কে কুরআনের ভাষায় উচ্চারিত উচ্চাঙ্গের প্রশংসাবলী ও গুণাবলী আপনাদের হৃদয় সমীপে তুলে ধরা। কুরআন তাঁদেরকে আদর্শ চরিত্র, উত্তম ও উন্নত গুণাবলীর দিশারী বলে ঘোষণা করেছে।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 কুদরতী প্রশ্ন

📄 কুদরতী প্রশ্ন


এ পার্থিব জীবনে জ্ঞান অর্জন, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তার চাহিদা মোচন একমাত্র ইন্দ্রিয়রাজি ও বুদ্ধিগত যোগ্যতার ওপরই নির্ভরশীল অর্থাৎ এ ইন্দ্রিয়শক্তির নির্দেশানুযায়ীই মানব জীবন অতিবাহিত হয়ে থাকে। এ জাগতিক জীবনে ইন্দ্রিয়রাজির নিরিখে একটা প্রশ্নঃ নবুয়তের সিলসিলা ও আম্বিয়া-ই-কিরামের মহত্ত্ব কতটুকু? অপরাপর সুধী ও বুদ্ধিজীবী থেকে কি বৈশিষ্ট্য দ্বারা নবীগণ শ্রেষ্ঠত্ব পেয়ে থাকেন? কেনই বা তাঁদের এ অধিকার, তাঁরা কিছু তত্ত্ব নিয়ে পর্যালোচনা করবেন, আর এমন এমন সংবাদ দেবেন, যা সূক্ষ্ম অনুভূতির নাগালেও আসে না, না সেখানে মেধাসম্পন্ন বিবেকের আরোহণ সম্ভব? অথচ সবাই একই সমাজে লালিত। একই ভূখণ্ডে জীবনাতিপাত করে চলেছে। এর কারণ কি, এরা অবলোকন করে ফেলবেন এমন অদৃশ্য কিছু যা তাঁদেরই সমসাময়িক অন্যান্য বিজ্ঞানী ও মহামনীষী পর্যন্ত পারবেন না? অথচ সে অদৃশ্য জিনিসসমূহ প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রদীপ্ত হয় আর তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু বাস্তবে পরিণত হয়।

বস্তুত এটি একটি প্রাকৃতিক ও কুদ্রতী প্রশ্ন যা আবহমানকাল ধরে নতুন নবীর আবির্ভাবের সাথে সাথে জনমনে পয়দা হয়ে আসছে। মন-মস্তিস্ককে প্রভাবিত করেছে। বিশ্বনবী (সা.) নবুয়তের সম্মানে বিভূষিত হয়ে তাব্লগি ও শুদ্ধিকরণের দায়িত্বে যখন নিয়োজিত হন, তখন তাঁকেও সে প্রশ্নের একান্তই মুখোমুখি হওয়ার কথা। নবী (সা.) সে পরিবেশে যে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, যে দূরদর্শিতার সাথে উক্ত সমস্যাটির সমাধান দিয়েছিলেন, তা তাঁর অনন্য মু'জিযাসমূহের অন্যতম বৈ কিছু নয়।

আরব সমাজ, বিশেষ করে মক্কা-মরুতে বসবাসকারিগণ দীর্ঘকাল যাবত সূক্ষ্ম মাসআলা, ইলমী পরিভাষা, দর্শন ইত্যাদি থেকে হাত গুটিয়ে জীবন কাটিয়ে আসছিল, তবে আবার মন-মানসিকতার তীক্ষ্ণতা, সুষ্ঠু বিবেচনা, সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ন্যায়ের সামনে শির অবনত করার জন্য তারা ছিল তখন বিশ্বসেরা। এ পার্থিব জীবনে নবীগণের মর্যাদা কতটুকু? অপরাপর যারা বাহ্যিক ইন্দ্রিয়রাজি বিনে জ্ঞান হাসিলের অন্য মাধ্যম হতে বিমুখ, এদের মাঝে একমাত্র নবীগণেরই অদেখা তত্ত্বাবলী প্রকাশ করার অধিকার থাকে কিভাবে? নবী (সা.) উপরিউক্ত জিজ্ঞাসাটার এমন ফায়সালা প্রদান করেছেন, যেখানে আরববাসীদের সে বিশেষ গুণটির পুরোপুরি মিল লক্ষ্য করা যায়। তারা সে প্রজ্ঞাজনিত প্রকাশভংগী প্রতিপক্ষ ভাষাবিদ ও দর্শনশাস্ত্রবিশারদদের সহস্র যুক্তির চেয়ে ছিল অধিকতর সক্রিয় ও হৃদয়গ্রাহী। এর জন্য তাঁর গৃহীত কর্মসূচী, কর্মপদ্ধতি ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি শ্রোতৃমণ্ডলীদের সুষ্ঠু মানসিকতা, জ্ঞান-বুদ্ধির পরিধি এবং স্থান ও পাত্রের পুরো সামঞ্জস্য বজায় রেখে সন্নিবেশিত হয়েছিল। আম্বিয়া-ই-কিরামদের সবার অবস্থা মূলত এমনই ছিল। তাঁরা স্বীয় নবুয়তের সত্যতা প্রমাণে বানোয়াট লৌকিকতা, অলংকার জ্ঞান ও ইশারা-ইঙ্গিতের ধার ধারতেন না, বরঞ্চ তাঁরা ছোট ও সাধারণ বিষয় দ্বারা বহু মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বের করে দেখিয়ে দিতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে একে তো ছিল না সাংবাদিকতা, ছিল না বেতারযন্ত্রের ব্যবস্থাপনা, এমন কি ছিল না স্বরকে একটু উচ্চ করা বা ছড়ানোর মেশিনটিও। এমন একটি যুগে মক্কা মরুর সমস্ত বাসিন্দাকে এক জায়গায় এক সুনির্দিষ্ট সময় একত্র করার কি ব্যবস্থা হতে পারে? কিভাবে তাদের মন-মস্তিষ্কে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যদ্দ্বারা তারা স্বীয় অভিরুচির মোহ থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে সবাই এক হয়ে নবী (সা.)-এর দিকে (ত্রাণের জন্য) ছুটে আসবে?

রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আরব সমাজেই প্রতিপালিত একজন সদস্য। পূর্ব থেকেই তাদের আচরণাদি, প্রথা ও রীতিনীতির সাথে তাঁর বেশ সম্পৃক্ততা ছিল, এমন কি তিনি ওসব রীতিনীতির মোহ তাদের মানসিকতা ও সমাজের শিরা-উপশিরাই কতটুকু শিকড় গেড়ে বসেছিল, সে সম্পর্কেও ওয়াকিফ ছিলেন। সে সুকঠিন ও সূক্ষ্ম কাজে মহানবী (সা.) তাঁর অভিজ্ঞতাকে পুরো সদ্ব্যবহার করেছিলেন। আরবদের চিরাচরিত প্রচলন ছিল তাদের কেউ কোন বিপদ আঁচ করলে, যেমন শত্রুর আকস্মিক আক্রমণের আশংকা অথবা শত্রুপক্ষের সুযোগ তল্লাশী ইত্যাদি, সাথে সাথে ছোট পাহাড়ের চূড়া কিংবা গুহায় আরোহণ করত এবং উচ্চৈঃস্বরে এই বলে চিৎকার করে উঠত, "ইয়া সাবাহ" (ধ্বংস ধ্বংস), "ইয়া সাবাহ" (শত্রু শত্রু)। এই বিকট ধ্বনি শোনামাত্রই সমাজের লোকজন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ত, হাতিয়ার গুছিয়ে নিত এবং বিপদ বা শত্রু প্রতিহত করার নিমিত্ত এগিয়ে আসত। সে ভয়ংকর বস্তুটি কি ছিল, যা এক সঙ্গে তাদের সবাইকে বিষাদাচ্ছন্ন করে তুলত এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তায় কুঠারাঘাত হানত? তা একটাই ছিল—শত্রু, যার লশকর এক বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে নিচ্ছিল। উট ও অন্যান্য জীবজন্তুকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সার্বিক ক্ষতি সাধনের অপচেষ্টা করছিল তাদের। আরব উপজাতি ও মরুবাসিগণ এই একটিমাত্র বিপদের সাথেই জীবনে পরিচিত হয়ে আসছিল আবহমানকাল ধরে। সুতরাং তারা যখনি ওসব শব্দ শুনত, সেই একটি অর্থই তারা ধরে নিত।

ওসব পার্থিব অসুবিধা ও ভয়াবহতার গুরুত্ব যে অনস্বীকার্য তা স্বীকৃত বটে; কিন্তু নবীগণের দূরদৃষ্টির সামনে তা তুচ্ছ। কারণ তাঁরা বিশ্বস্রষ্টা ও নিয়ন্তার অস্তিত্ব, গুণাবলী ও তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতার ভয়াবহ পরিণতি সংক্রান্ত বিষয়ে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। সজাগ থাকেন তাঁরা বর্বরতাচ্ছন্ন বিষাক্ত জীবন সম্বন্ধেও, যার মধ্য দিয়ে তদানীন্তন মক্কাবাসিগণ কালাতিপাত করছিল। তাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানতেন আরবের বর্বরতাক্লিষ্ট সমাজে অনুপ্রবিষ্ট অনাচার ও দুশ্চরিত্রতা সম্পর্কেও। "তারা প্রতিমা পূজা করত, মৃত জীব খেত, অশ্লীলতায় মত্ত থাকত দিব্বি এবং আত্মীয়দের সূত্রবন্ধন ছিন্ন করত অহরহ। জ্বালাতন করত প্রতিবেশীদেরকে। বিত্তশালীরা প্রায়ই দুর্বলদেরকে শোষণ করে বেড়াত।"

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উপলব্ধি করলেন, দুশমন তো মূলত বাইরে নয়, বরঞ্চ তা আসন জুড়ে আছে জনগণের মন-মস্তিষ্কে, আকাঈদ ও চরিত্রে। যত বহিঃশত্রু আছে তদপেক্ষা এ দুশমন অধিকতর ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক। অনিষ্টের এ স্রোতধারা প্রবহমান তাদেরই সত্তা এবং তাদেরই অভ্যন্তর থেকে যা বাহ্যিক ক্ষতি সাধনকারী কার্যকলাপ থেকে প্রকট, যেগুলোর উদাহরণ তারা বর্বরতার দীর্ঘ কালে স্থাপন করে আসছিল অথবা আরবীয় গোত্রীয় জীবনে অহরহ যেগুলোয় তাদের আক্রান্ত হতে হয়েছিল, তাদের প্রবৃত্তিজনিত আত্মদ্রোহিতা প্রতিটি শত্রু গোত্র অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শত্রু ছাউনি অপেক্ষা বহু ক্ষতিকর ছিল। তাদের এ অভিশপ্ত জীবন-প্রণালী মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধানলকে তীব্র করে তুলছিল। কারণ তিনি তাঁর বান্দাদের নাস্তিকতাকে আদৌ অনুমোদন করেন না। বসুন্ধরায় কিঞ্চিৎ কোলাহল সৃষ্টি হোক, তাও তিনি চান না।

টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের সময়ের জাহিলী যুগের এই চিত্রটি যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন হযরত জাফর ইবন আবু তালিব (রা.)। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর সমীপে তাঁর পরিবেশিত ভাষণের কিয়দংশ পেশ করা হলো।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সাফা পাহাড়ের উপকন্ঠে

📄 সাফা পাহাড়ের উপকন্ঠে


একদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ঊষালগ্নে সাফা পাহাড়ে তশরীফ আনলেন। এটি মক্কারই সন্নিকটে অবস্থিত ছিল। এখানে আগমন করে তিনি উচ্চ স্বরে আওয়ায দিলেন, "ইয়া সাবাহাহ্", "ইয়া সাবাহাহ্।" মরুবাসীদের মনে একথা চিরন্তন সত্য হিসেবে গাঁথা ছিল, এই আওয়ায উচ্চারিত হয় যথাস্থলে ও বিপদসংকুল পরিবেশে। আর সাধারণত এতে মিথ্যা, প্রতারণা অথবা হাসি-তামাশার লেশটুকুও থাকে না। মক্কাবাসীদের এ সুবিদিত আওয়ায এমন এক ব্যক্তিত্বের কণ্ঠ থেকে আজ বের হচ্ছিল, যিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সত্যবাদী। তাঁকে তারা সাদিক (সত্যবাদী) ও বিশ্বস্ত উপাধিতে বিভূষিত করেছিল পূর্বেই। সে আওয়াযের রহস্য তারা খুবই জানত। কারণ অভিজ্ঞতা ও ঘটনা প্রবাহের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস তাদেরই সামনে উপস্থিত ছিল। তারা সে আওয়াযের দিকে অগ্রসর হতে একটুও কুণ্ঠাবোধ না করে সমবেত হয়ে গেল। কেউ নিজেই এল আবার কেউ প্রতিনিধি প্রেরণ করল। ১

সবাই একত্র হলে রাসূল (সা.) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, “হে বনী 'আব্দুল মুত্তালিব। হে বনী ফিত্র! হে বনী কা'ব! তোমাদের অভিপ্রায় কি? আমি তোমাদের সামনে যদি এই ঘোষণা দিই, এই পাহাড়ের পাদদেশে একদল অশ্বারোহী সেনা লুক্কায়িত আছে এবং তোমাদের অজান্তে তারা তোমাদের ওপর আক্রমণের প্রহর গুণছে, তোমরা আমার এ ঘোষণায় আস্থা রাখবে কি? রাসূলে আরবী (সা.) যাদেরকে সম্বোধন করেছিলেন এবং যাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তারা 'অশিক্ষিত' ও 'অনুন্নত' ছিল। তারা ফালসাফা ও তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন করেনি এবং তারা কোন বিষয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করায় অভ্যস্ত ছিল না, বরঞ্চ (আমি পূর্বেই বলেছি) তারা ছিল বস্তুনিষ্ঠ ও কর্মঠ। আল্লাহ্ পাক বিবেক ও মুক্তবুদ্ধি (Common sense)-এর এক বিরাট অঙ্গ তাদেরকে দান করেছিলেন। তারা তাই অবস্থান ও পরিবেশটি পর্যবেক্ষণ করল। ভাষণদাতা যেই স্থানটিতে দণ্ডায়মান ছিলেন, সেটার প্রকৃতিগত অবস্থা অবলোকন করল।

তারা ভাবল এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, একনিষ্ঠা ও শুভকামিতা পরীক্ষিত হয়েছে একাধিকবার, এখন তিনি একটা ছোট পর্বতশৃঙ্গে উপবিষ্ট, তিনি সামনে তো দেখতে পাচ্ছেনই, তাঁর শ্রোতৃমণ্ডলী রয়েছে, সাথে সাথে এ পর্বতের পাদদেশে সে প্রান্তটিও দেখতে পাচ্ছেন, এখানের শ্রোতাদের দৃষ্টি যেখানে পৌঁছতে অক্ষম। তারা তখন কোন প্রকার দ্বিধা-সংশয়ের পক্ষপাত না করে উপলব্ধি করতে পেরেছে, যার মর্যাদা এমন হবে, তার অধিকার আছে পাহাড়ের পাদদেশে লুক্কায়িত শত্রু কিংবা বিপদ সম্পর্কে সতর্ক-সংকেত পেশ করার। আর যাদের সামনে পাহাড়টি প্রতিবন্ধক, তাদের এ অধিকার থাকতে পারে না বা তাঁকে মিথ্যে বলে আখ্যায়িত করার ও তাঁর দেয়া খবরটি এ বলে প্রত্যাখ্যান করে দেয়ার যে, তারা সংকেতদাতার সাথে তা প্রত্যক্ষ করায় শরীক রয়নি। প্রকারান্তরে বিরাজমান অন্তরায় সৃষ্টিকারী পাহাড়টিই তাদের অবস্থা ও ভাষণদাতার অবস্থার মাঝখানে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে। আর পাহাড়ের চূড়ায় দণ্ডায়মান ভাষণদাতাকে অন্যদিকে দৃষ্টি দান ও সাক্ষ্য প্রদানের একক সুযোগ দিয়ে দিয়েছে।

আরববাসিগণ নিরপেক্ষমনা ছিল। তারা ছিল সুনিপুণ ও সত্যপ্রিয়। প্রতিউত্তরে তারা বলল, “হ্যাঁ! আমরা এ জাতীয় ঘোষণা করতে পারি না। আমাদের তা মেনে নিতেই হবে।"

টিকাঃ
১. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 নবুয়তের দর্শনগত রূপ

📄 নবুয়তের দর্শনগত রূপ


নবী (সা.) নবুয়তের এ বিরল আল্লাহপ্রদত্ত হিকমত, আরবী ভাষা ও সাহিত্যে অনন্য প্রতিভা দ্বারা নবীগণ নবুয়তের অনুপম মাহাত্ম্য ও অতুলনীয় মর্যাদার রূপরেখা অংকন করে আরববাসীদের সামনে উপস্থাপন করলেন। নবীগণের শ্রেষ্ঠত্ব তিনি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এই তথ্যটির দিকে তিনি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রয়াস পেয়েছিলেন-নবীগণ অবলোকন করেন এমন এক জগৎ, যা তাঁদের সমসাময়িক আর কেউ পারেন না। তাঁরা এমন ঘটনাবলী সম্পর্কে সংবাদ দিতে সক্ষম, অন্যান্য নায়ক ও সংস্কারকগণ যার স্বাক্ষর পেশ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। আর তা এজন্য, তাঁরা নবুয়তের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে আছেন। মানুষ হিসেবে অনুভূতির পবিত্রতা ও স্বভাবগত শালীনতার কারণে দৃষ্ট বিশ্বকে তাঁরা সুস্থ বুদ্ধি ও সুষ্ঠু চিন্তার মানুষের মতই দেখে থাকেন। অধিকন্তু আল্লাহপ্রদত্ত নবুয়ত (আল্লাহর খুশি অনুযায়ী) যেহেতু অদৃশ্য জগতের সাথে সম্পর্ক রাখে তাই তাঁরা এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নবুয়তের জগতের অদৃশ্য রহস্যাবলীও অবলোকন করার সুযোগ পেয়ে থাকেন।

কুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিসলুকুম ইউহা ইলাইয়া - "বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, (তবে) আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।" [সূরা কাহফঃ ১১০]

একজন মানুষ যত বড় মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞ কিংবা বিশেষজ্ঞই হন না কেন, তার জন্য এটা সম্ভব হবে না, নবীগণ মিথ্যারোপ করবে অথবা তাঁদের প্রত্যক্ষ দৃষ্ট বিষয়াদিকে প্রত্যাখ্যান করবে। কেননা তারা নবীগণের পর্যবেক্ষণে অংশীদার ছিল না। যেসব জিনিস আম্বিয়া-ই-কিরাম দেখতে পান, এরা তা দেখে না। যেমনি পাহাড়ের নিম্নদেশে দণ্ডায়মান কারো জন্য কোন অবস্থাতেই সমীচীন হবে না পর্বতশৃঙ্গে আরোহীর উক্তিতে আপত্তি উত্থাপন করার এবং পর্বতের পেছনের খবরাদি ও পর্বতের পাদদেশে সংঘটিত ঘটনাবলীকে উপেক্ষা করার।

তাইতো বাহ্যিক ইন্দ্রিয়রাজির গোলকধাঁধায় আক্রান্ত কেউ যদি এঁদের বিরুদ্ধে মেতে ওঠে এবং প্রমাণ পেশ করার পেছনে লেগে যায়, তখনি তাঁরা অবাক চিত্তে সার্বিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে ওঠেনঃ

আ তুহাজ্জুননি ফিল্লাহি ওয়া ক্বাদ হাদানি - "তোমরা কি আল্লাহ্ সম্বন্ধে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎ পথে পরিচালিত করেছেন।” [সূরা আন'আম : ৮১]

নবুয়তের প্রথম যুগের সব নিরক্ষর আরববাসী সেসব দার্শনিক ও পণ্ডিতবর্গ অপেক্ষা অধিকতর বিচক্ষণ সাব্যস্ত হয়েছে, যারা আম্বিয়া ও রাসূলগণের খবরগুলো ও তথ্যরাজি একমাত্র এজন্যই উপেক্ষা করে দেয়ার চেষ্টা করছে, তারা কেন তা দেখবে না? সেসব জিনিস তাদের অজান্তে থাকবে কেন?

বাল কাযযাবু বিমা লাম ইউহিতু বিইলমিহি ওয়ালাম্মা ইয়া'তিহিম তা'উইলুহু - "আসল কথা হলো, যে বিষয়ের জ্ঞান তারা আয়ত্ত করেনি তা অস্বীকার করে এবং এখনও এর রহস্য তাদের নিকট অনুদ্‌ঘাটিত।” [সূরা ইউনুস : ৩৯]

এ প্রকৃতিগত, যুক্তিগত ও অনিবার্য স্বরগুলো অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) একান্ত নিশ্চয়তা ও দৃঢ়তার সাথে সামনে অগ্রসর হলেন। সর্বশেষ স্তরে উপবিষ্ট হয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন:

ফাইন্নি ইন হুয়া ইল্লা নাযীরুল লাকুম বাইনা ইয়াদাই আযাবিন শাদীদ - "আমি তো আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ককারী মাত্র।”

মহানবী (সা.) তাদেরকে সে বাস্তব ও স্থায়ী বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করলেন, যা বিরাজমান ছিল তাদের দৈনিক কর্ম পদ্ধতিতে, যার অনুসরণে কাটছিল তাদের জীবনধারা। তিনি তাদেরকে সতর্ক করলেন সেসব ভ্রান্ত ও অনর্থক ধ্যান-ধারণা সম্পর্কেও, যেগুলো তাদের মন-মানসিকতায় বদ্ধমূল হয়ে বসেছিল। সেসব প্রতিমা সম্পর্কেও তাদেরকে সজাগ করলেন, যেগুলোর তারা অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়েছিল। যেসব বিধ্বংসী চরিত্র ও রীতিনীতি তারা আঁকড়ে ধরেছিল, সেগুলো সম্পর্কেও তিনি দিলেন এক নতুন অনুভূতি। এক কথায় তারা তখন এক চরম মূর্খতার ভেতর দিয়ে কাল যাপন করে আসছিল। শিক্ষা ও ঈমানবিমুখ ছিল তাদের মানসিকতা ও স্বভাব। ইনসাফ যে কি বা আল্লাহ্-ভীতি কাকে বলে, তা তো বুঝতই না তারা, যদ্দরুন সমাজ জীবনে বয়ে এসেছিল তখন ব্যাপক হাহাকার, সংকীর্ণতা, ব্যাকুলতা, মানসিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ ভয়াবহতা।

“মানুষের কৃতকর্মের দরুন সমুদ্রে ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে যার ফলে তাদেরকে তাদের কোন কোন কর্মফল তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।" [সূরা রুম: ৪১]

"গুরু শাস্তির পূর্বে তাদেরকে আমি অবশ্যই লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব যাতে তারা ফিরে আসে।" [সূরা আস-সাজদাহ: ২১]

"অথচ এ জীবনের পর রয়েছে আর একটি শাস্তির জীবন। সে শাস্তির তুলনায় ইহলৌকিক শাস্তি ও কষ্টদায়ক জিনিস একেবারেই তুচ্ছ ও সামান্য।”

"এবং পরকালের শাস্তি তো কঠোর!" [সূরা আর-রাদ: ৩৪]

"পরকালের শাস্তি তো অবশ্যই কঠিনতর ও অধিকতর স্থায়ী।" [সূরা তাহা: ১২৭]

"পরকালের শাস্তি তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক।" [সূরা হা-মীম-আস-সাজদা : ১৬]

সুধী ও বিজ্ঞ সমাজ ঐসব ক্রিয়া ও গুণ সম্বন্ধে জানতে প্রয়াস পেয়েছেন। বিভিন্ন বস্তুর স্বভাব ও গুপ্ত সম্পর্কে অবহিত হয়ে তারা পরিজ্ঞাত বিষয়াদির এক মূল্যবান কোষাগার রচনা করে দিয়েছেন। ফলে উত্তরসুরিদের এতে বহু উপকার হয়েছে। এ মহান কাজ যাঁরা সম্পাদন করেছেন, তাঁদের পরিশ্রম, তাঁদের ত্যাগ ও সাধনা, সফলতা ও সম্মানের যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা হয়। পরিশোধ করা হয় তাদের জয়ধ্বনির পাওনাটুকু, অথচ আল্লাহ্ পাকের অস্তিত্ব, গুণাবলী, আদেশ-নিষেধ, তাঁর সন্তুষ্টি, আকীদা ও বিধি-নিষেধের বৈশিষ্ট্য ও শুদ্ধাশুদ্ধি, ভাল ও মন্দ চরিত্রের ফলাফলের দীক্ষা, আখিরাতের প্রতিদান, শান্তি ও অশান্তি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের যথাযথ পরিচিতি প্রদানের জন্য নবীগণকে আল্লাহ্ পাক স্বীয় ইচ্ছা অনুযায়ী মনোনীত করেছেন। এই নশ্বর জীবনের পরের অবস্থানসমূহ ও তখন যা ঘটবে, যেমন হাশর, নশর, পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান, সুফল ও প্রতিশোধের জ্ঞান অর্জন করার জন্য আম্বিয়া-ই-কিরামই হচ্ছেন একক মাধ্যম।

"তিনিই অদৃশ্যের জ্ঞানাধার, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেন না তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত!” [সূরা জ্বিন : ২৬-২৭]

আম্বিয়া-ই-কিরাম (দরুদ ও সালাম তাঁদের ওপর) নবুয়তের পাহাড়ে আরোহণ করেন। তাঁরা দেখেন এই জগতকে। সাথে সাথে দেখে থাকেন অদেখা এক জগতকেও। আর মানবতা, মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির পথে অদূর ভবিষ্যতে কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে গেরিলা হামলা সম্পর্কে সতর্ক সংকেত তাঁরাই দিয়ে থাকেন। ঢাকা পড়া ধ্বংসাত্মক পরমাণু ও ক্ষতিকর জিনিসগুলোকেও ধরিয়ে দেন তাঁরাই। ভীতি প্রদর্শন করেন তাঁরা আপন সমাজকে নেহায়েত হৃদ্যতা, প্রেম, দয়া ও একনিষ্ঠতার সাথে। এদিকে যখন কেউ তাদের এই স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার খর্ব করতে অপচেষ্টা করে এবং এহেন সুস্পষ্ট বিষয়টাতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে এবং তাদের মাহাত্ম্য ও বিশ্বস্ততাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে, তখন তাঁরা সৌহার্দ্য ও একনিষ্ঠতা নিয়ে পরিতাপ ও বেদনাদায়ক কণ্ঠে বলে ওঠেন:

“বলুন, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি: তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে দু-দু'জন অথবা এক-একজন করে দাঁড়াও, অতঃপর তোমরা চিন্তা করে দেখ-তোমাদের সঙ্গী আদৌ উন্মাদ নন। তিনি তো আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের সতর্ককারী মাত্র।” [সূরা সাবা : ৪৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00