📄 স্থানের উপযোগিতা
সুধি! আমরা ও আপনারা এখন যে স্থানে সমবেত হয়েছি, এখানে সবচেয়ে কল্যাণকর আলোচনা, মানবতার বিকাশে নবুয়তের প্রয়োজনীয়তা ও সভ্যতায় এর অপিরিসীম অবদান সম্পর্কে আলোচনা রাখার জন্য উৎকৃষ্টতম স্থান। এখানে আলোচনা করা হবে বিশেষ বিশেষ আম্বিয়া-ই-কিরাম সম্পর্কে, যাঁদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা নবুয়তের সম্মানে অলংকৃত করেছেন। আলোচনা করা হবে আল্লাহর কাছে তাঁদের স্বীকৃতি, তাঁদের মর্যাদা ও সম্মান, সৃষ্টির ওপর তাঁদের অতুলনীয় অবদান ও জীবনের শিরা-উপশিরায় তাঁদের গভীর প্রভাব সম্পর্কে। অবশেষে ইমামুল মুরসালীন খাতামুন্নবিয়ীন (সা.) সম্পর্কে কল্যাণকর আলোচনা হবে, আল্লাহতা'আলা যাঁকে সর্বশেষ রিসালত, সর্বকালীন ও বিশ্বজনীন নবুয়তের সম্মানে অনন্য করেছেন, যাঁকে দান করা হয়েছে স্থায়ী কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব, সনাতন ও সার্বজনীন শরীয়ত এবং সুরক্ষিত ও চিরঅম্লান কিতাব। আর মানবকুলের সৌভাগ্য ও মুক্তি (শ্রেণীগত ও ভাষাগত তারতম্য সত্ত্বেও) তাঁর ওপর ঈমান আনয়ন ও তাঁর পদাংক অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে, যাঁর হিজরত ও সর্বশেষ বাসস্থানের জন্য এমন এক পূত ও পবিত্র নগরীকে চয়ন করা হয়েছে, যেখানে ওহী ও রিসালাতের মাধ্যমে আসমানের সাথে যমীনের শেষবারের মত মিলন ঘটে।
সুতরাং এ সম্মানিত জায়গায় কিছু বক্তব্য রাখার যাঁর সুযোগ হবে এবং যিনি এ সম্মান লাভ করবেন, তাঁকে এ মহান ও নাজুক দায়িত্বের প্রতি পুরোপুরি সচেতন হতে হবে, তিনি কেমন স্থান থেকে বক্তব্য রাখতে চলেছেন। এই 'মাকামে মাহমুদ' বা প্রশংসনীয় জায়গার সাথে সংশ্লিষ্ট দিকগুলো এড়িয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য অন্য কোন আলোচ্য বিষয় স্থির করা কি তার জন্য সঙ্গত হবে? এটা ঈমান, বিবেক ও ইহসানেরও দাবি। আরব কবি সম্ভবত এর প্রেক্ষাপটেই বলেছেন:
ওয়ালাম্মা নাযালনা মানযিলান মাল্লালাহুন নাদা - ইতবাকুন ওয়ালা বুস্তানা মিনান নূরি জালিয়া -
আজাদদ লানা তীবাল মাকানি ওয়া হুসনাহু - মানি ফাত্তি মিনহু ফাকুনতাল আমানিয়া -
এবং আমরা যখন এক শিশির সজীব ও নয়ন জুড়ানো স্থান ও ফুলের কুঁড়িতে সুশোভিত বাগানে অবতরণ করি, তখন স্থানের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা জাগিয়ে দেয় আমাদের মনে একগুচ্ছ আশা। আমাদের সেসব আশার প্রাণ ছিল পক্ষান্তরে তুমি-ই।
📄 বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক দায়িত্ব
মুসলিম বিশ্বের যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা স্বয়ং রাসূলে করীম (সা.)- এর পবিত্র নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, তার প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে, নবুওয়তের নিয়ামত যথাযথ অনুধাবনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। আল্লাহ্ পাক এই নিয়ামতের চেয়ে বড় কোন নিয়ামত আর একটিও নাযিল করেন নি। আর সে নিয়ামতের সকৃতজ্ঞ মূল্যায়ন তার সক্রিয় সমর্থক ও আহ্বায়কদের মধ্যে হবে এবং জীবন সংগ্রামের ক্ষেত্রে যেখানে অজ্ঞতা, আল্লাহদ্রোহিতা ও বিপ্লবের পতাকা চতুর্দিকে পতপত করছে, সেখানে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুহাম্মদী পতাকা ও তার আদর্শ শিবিরের সুশীতল ছায়ায় সমবেত হবে এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে ইসলামকে সমৃদ্ধিশালী করার জন্য নিজেকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করবে, হোক তা গবেষণা ও বিশ্বাস্য বিষয়ক অথবা কর্ম, শৃঙ্খলা, চরিত্র ও সামাজিক বিষয় কিংবা কৃষ্টি-কালচার ও রাজনৈতিক বিষয়ক।
যে কোন ইসলামী জ্ঞান-গবেষণাগারের শিক্ষাপ্রাপ্ত ও অনুরাগীদের সার্বক্ষণিক আচার-অনুষ্ঠান ও তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু থাকতে হবে নবুয়ত, নবুয়তের কর্মধারাকে অন্য সব চিন্তা ও দর্শন, মত ও পথ, ধ্যান-ধারণার যাবতীয় ঢং, জীবনের সমস্ত রং এবং মানবতা ও সভ্যতার হরেক অভিপ্রায়ের ওপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেয়া।
আজকালকার ইসলামী গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেসব ইল্মী কর্মসূচীর দিকে মনোনিবেশ করে চলেছে এবং যেসব বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শনের দাবিদার হচ্ছে ঐ মৌলিক দায়িত্বটা এসব থেকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রগণ্য। কেননা যদি কোন বিরামহীন ও সত্যিকার ফায়সালা দানকারী সংঘাত নামে কিছু থাকে, তবে সেটা হচ্ছে নবুয়ত ও জাহিলিয়াতের বা অজ্ঞতার সংঘাত। এ জাহিলিয়াতের নেতৃত্ব দিচ্ছে পাশ্চাত্য জগত। আর সে ইসলাম (সত্য ধর্ম) যার পতাকাবাহী হবে একমাত্র মুসলমান অবশিষ্ট রয়েছে। এ সংঘাত ছাড়া বাকী সব সংঘাত হচ্ছে কৃত্রিম ও গৃহযুদ্ধ। যে যুদ্ধে একই গোত্রের লোক সাধারণ বস্তু নিয়েও ঝাঁপিয়ে পড়ে কিংবা স্বল্প বুদ্ধির দরুন শিশুদের ন্যায় ঝগড়ায় মেতে ওঠে। কিন্তু চিন্তা ও গবেষণার দ্বন্দ্ব আবহমানকাল ধরে জাহিলিয়াত ও নবুয়তের মধ্যেই বিরাজ করছে।
📄 এ যুগে আলোচ্য বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা
আর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি বড় বড় বিজ্ঞানাগার, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, ইল্ল্মী সমিতিগুলো, জাতিসংঘ ও এর বিশ্ব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো তথা সর্বত্রই এই আলোচ্য বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কারণ সৌভাগ্য, শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের যাবতীয় উপকরণ থাকা সত্ত্বেও মানবতার আজ চরম দুর্গতি দেখা দিয়েছে এবং আধুনিক সভ্যতার দুর্ভাগ্য এই, এ সভ্যতার যারা ধারক ও বাহক তারা নবুয়ত ও নবীদের (আ.) শিক্ষার চরম বিদ্রোহী সেজেছে। তারা জীবন ও সভ্যতার নীলনকশা নবুয়তের আদর্শের বহির্ভূত পথে পরিচালিত করতে চাচ্ছে। আর পোষণ করছে আল্লাহর অবদানের প্রতি অহংকার ও অনীহা, যা প্রদত্ত হয়েছিল উম্মী নবীকে, ভাব-ভঙ্গিতে তারা অতীত বর্বর সমাজগুলোর সে অহংকারাত্মক উক্তিটারই পুনরাবৃত্তি করছে, কুরআনে পাকের ভাষায় বিবৃত হয়েছে: আবশারুন ইয়াহদুনানা “আমাদেরই মত মানুষ কি আমাদেরকে হিদায়াত দিতে চলেছে?” এমন একজন উম্মী আমাদেরকে কি জ্ঞান শেখাবে? এরূপ একজন নিঃস্ব ফকীর আমাদেরকে কি সুখী স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে? আমাদেরকে কি সুসভ্য করে গড়ে ওঠাবে মরুভূমির এ যাযাবরটি?
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কিংবা প্রতিকূল অবস্থার প্রেক্ষিতে যদি আমরা এসব জিনিস ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুলে ধরতে সক্ষম না হই, তাহলে কি কখনো সম্ভব হবে না, কমপক্ষে মদীনার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটিকে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত করা? আর কেনই বা হবে না? এতো সেই মদীনা মুনাওয়ারা, যা সব সময়ে আধ্যাত্মিকতার ও নেহায়েত সুদক্ষদের বীজ বপনের উর্বর ক্ষেত্র এবং মুবারক সংরক্ষিত ভূমি যা তাদের জন্য যুগে যুগে সুফলা সাব্যস্ত হয়ে এসেছে। যে নগরী আল্লাহ্পাকের নিম্নোক্ত বাণীরই সত্যিকার বাস্তবায়ন:
“এবং (লক্ষ্য কর) যমীন খুবই উর্বরা, এ এর প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে উত্তম ফলনই দিচ্ছে।” [সূরা আ'রাফ: ৫৮]
এখানে যা আলোচিত হয়েছে সারা বিশ্বে তার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে।
📄 কুরআনে কারীমের আলোকে নবুয়ত ও আম্বিয়া-ই-কিরাম
মুতাকাল্লিম বা কালামশাস্ত্রবিদগণের আত্মা থেকে নিষ্কৃতি প্রার্থনার মাধ্যমে আমি এ মন্তব্যটুকু করতে বাধ্য হচ্ছি, মূলত 'ইলমে কালাম ও 'আকাঈদের কিতাবাদি নবুয়ত ও আম্বিয়া-ই-কিরামের ব্যাপারে নিতান্তই সংকীর্ণ ও সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে। এ সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি নবুয়তকে একদিকে এমন গতিহীন ও প্রাচীরাবদ্ধ ভাবধারা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা আকাঈদের নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে জীবনের অন্যান্য দিকের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। অবশ্য কালামশাস্ত্রের তদানীন্তন বাধ্যবাধকতা ও সীমিত পাঠ্য পদ্ধতি অবলম্বনের একটা সুনির্ধারিত পাঠ্য পরিক্রমার আবশ্যকতাও যে ছিল সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এ কারণেই আমরা নবুয়ত ও আম্বিয়া বিষয়দ্বয়কে কুরআনের আলোকে ও কুরআনের দৃষ্টিতে দেখা বাঞ্ছনীয় মনে করি। এ প্রজ্ঞাময় কিতাবেরই নির্দেশিত লক্ষ্যে নবুয়তের সম্ভাব্যতা, নিগূঢ় তথ্য, এর সুপরিসর দিগন্ত ও গভীরতা সম্পর্কে ভেবে দেখা একান্ত প্রয়োজন মনে করি। আজ চিন্তা করার দরকার হয়ে পড়েছে জীবনের ওপর নবুয়তের মাধ্যমে নাযিলকৃত মৌলিক বিষয়গুলো এবং হৃদয় ও দৃষ্টি, চরিত্র ও অভিরুচির ওপর এটার প্রভাব ও প্রতিফলন নিয়ে। আজ গবেষণা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে সমাজ ও সভ্যতার একটা নীল নকশা নিয়ে, এমন কি এই কুরআনের গঠনমূলক অবস্থানগুলোকে নিয়ে বর্বরতার পাশাপাশি একটি অনুপম ও অনন্য সভ্যতার ভিত্তি রাখার উদ্দেশ্যে।