📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 জন্ম হলো নতুন পৃথিবী—নতুন মানুষ

📄 জন্ম হলো নতুন পৃথিবী—নতুন মানুষ


মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের বরকতে ও তাঁর মহান শিক্ষার বদৌলতে বদলে গেল পৃথিবী, বদলে গেল পৃথিবীর রসম-রেওয়াজ ও প্রশাসনিক কাঠামো। মানবতার উত্তরণ ঘটল গ্রীষ্মের খরতাপ, লু হাওয়া, প্রচণ্ড দাহ ও দুর্ভিক্ষঘেরা এক ভয়ংকর ঋতু থেকে এমন এক ঋতুতে যেখানে গলাগলি করছে ফুল আর বসন্ত, যেখানে উদ্যান ঘেঁষে বয়ে চলেছে ছলচল প্রবাহের উচ্ছল ঝর্ণাধারা। তাঁর আগমনে পাল্টে গেছে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, তাদের হৃদয়গুলো আপন প্রতিপালকের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল। মানুষ ব্যাপকভাবে ধাবিত হলো আল্লাহ্ অভিমুখে। মানুষ সন্ধান পেল অপরিচিত এক নতুন স্বাদের, অজানা এক নতুন রুচির, অজ্ঞাত এক নতুন ভালোবাসার。

আগের সেই নিস্তেজ ঘুমন্ত হৃদয়গুলো জেগে উঠল ঈমানের উষ্ণতায়, মায়া-মমতার পরশে। সবার মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে নতুন উদ্যম, নতুন তৎপরতা। মানুষ দলে দলে বেরিয়ে এসেছে সিরাতু’ল-মুস্তাকীম তালাশের জন্য, সম্মান ও মর্যাদার চূড়ায় আরোহণের জন্য। দেশ ও জাতি-নির্বিশেষে সকলেই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ব্যাকুল, উন্মুখ। আরব, আজম, মিসর, তুর্কী, ইরান, খোরাসান, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, হিন্দুস্তান, আলজেরিয়া, পূর্ব হিন্দুস্তান সবাই এই ঊর্ধ্বে জগতের ইশক-মুহব্বত ও প্রেম-ভালোবাসায় বেকারার দেওয়ানা। মনে হচ্ছে, মানবতা যেন চেতনা ফিরে পেয়েছে, দীর্ঘ ও গভীর নিদ্রাশেষে চোখ মেলে তাকিয়েছে। কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকাকালীন যে সুদীর্ঘ সময় কেটে গেল তার ক্ষতি পূরণের ধারাবাহিকতায়ই তখন মানবতার একেকটি গোষ্ঠী থেকে জন্ম নিলেন আল্লাহর পথের অসংখ্য দাঈ, রব্বানী, মুখলিস, নিষ্ঠাবান মুজাহিদ, সংস্কারক, প্রশিক্ষক, আরিফে রব্বানী, আবেদ-যাহিদ, সৃষ্টির শোক-ব্যথার সমভাগী, মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গীকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ এবং আরো এমন সব মনীষী ও ব্যক্তিত্ব, নূরের ফেরেশতাকুলের কাছেও যাঁরা ঈর্ষার বিষয়। তাঁরা সবাই মিলে কি করলেন? বিরান ও অনাবাদী হৃদয়গুলোকে আবাদ কলেন আল্লাহ্ প্রেমের মশাল জ্বেলে। বইয়ে দিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফাতের হাজারো সালসাবিল। নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনী ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদদীপ্ত এক প্রচণ্ড দ্রোহ। নির্যাতিত, অবমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আর উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানব গোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে, যা আবাদ হয়ে আছে শুধু প্রেম-ভালোবাসা ও মায়া-মমতায়।

মানবতার সেবায় নিবেদিত এই মুবারক জামাত থেকে পৃথিবী কখনো বঞ্চিত হয়নি। এঁরা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন সর্বদা, সব জায়গায়। সংখ্যায় এঁরা অগণিত অথবা এঁদের সংখ্যা নিরূপণই অসম্ভব। এঁদের কোয়ানটিটির কথা বাদ দিয়ে আসুন এঁদের কোয়ালিটির আলোচনায়। উল্টে যান ইতিহাসের পাতা, দেখবেন তাঁদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা, তীক্ষ্ণ ধী ও নির্মল স্বভাব-চরিত্র। আরো দেখবেন কেমন করে এঁরা আর্ত মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন এবং নিজেকে তাদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁদের পবিত্র আত্মারা বিগলিত হতো সমবেদনায় সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে যে কোন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতেন তাঁরা হাসি মুখে। আর তাঁদের আমীর ও শাসকগণ ছিলেন পূর্ণ দায়িত্বসচেতন ও আমানতদার। একদিকে রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে থাকতেন মশগুল, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিও রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক-শাসিতের মাঝে কোথাও কোন অমিল বা বিরোধ ছিল না। সবাই তাঁদের অনুগত。

আরেকটু উল্টে যান ইতিহাসের পাতা। অবাক হবেন তাঁদের ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, দু'আ ও মুনাজাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্যবোধ, ছোট ও দুর্বলদের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমবোধ, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাঁদের মধুর বিনম্র আচরণ, দয়া ও করুণা এবং জানের দুশমনকে অকপটে ক্ষমা করে দেয়ার কাহিনী পড়ে। মনে হবে কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব না তাঁদের উর্বর কল্পনা ও তাঁদের বিরল প্রতিভার সিঁড়ি বেয়ে সেই চূড়ায় উপনীত হওয়া, যেখানে উপনীত হয়েছিলেন এঁরা বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও সনদ আমাদের সংরক্ষণে না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য ইতহাসের সাক্ষ্য না পেলে অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী ও উপকথা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। সত্যি, এই মহান ইনকিলাব, এই গৌরবদীপ্ত নতুন যুগের সূচনা মুহাম্মাদ (সা.)-এর অন্যতম মু'জিযা ও তাঁর এক মহাঅনুগ্রহ। সর্বোপরি তা ইলাহী রহমতের এক মহাদান যা সীমাবদ্ধ নয় স্থান-কাল-পাত্রের কোন সংকীর্ণ গণ্ডিতে। মহান আল্লাহ্ সত্যি বলেছেন:

"আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।" [সূরা ২১: আয়াত-১০৭]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00