📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো

📄 হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো


হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো, আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্মমর্যাদাবোধের দীপ্তি!

আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে মানুষ নিরাশ হয়ে পড়েছিল। তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছিল 'নিখুঁত মানব প্রকৃতি' সম্পর্কে এক রকম পাপবোধ। এই ধারণা মানুষের মনে বেশ ভালভাবেই ঠাঁই করে নিয়েছিল, মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী ও অপরাধী।

মূলত মানুষের নিখুঁত মানব-প্রকৃতি ও সুকুমার বৃত্তির এই দৈন্যদশা সৃষ্টি হওয়ার জন্যে কাজ করছিল যুগপৎ এশিয়ার কয়েকটি প্রাচীন ধর্ম এবং ইউরোপ, আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিকৃত খ্রীস্ট ধর্ম। হিন্দুস্তানের প্রাচীন ধর্মগুলো মানুষের সামনে পেশ করেছিল 'তানাসুখ'-এর দর্শন ১ আর খ্রীস্ট ধর্ম প্রচার করে বেড়াচ্ছিল এই স্লোগান, "মানুষ আসলে জন্মগতভাবেই পাপী আর ঈসা মাসীহ হলেন তাদের পাপের কাফ্ফারা ও প্রায়শ্চিত্যস্বরূপ।”

এই জঘন্যতম আকীদা দু'টোর প্রসার ঘটিয়ে তৎকালীন দুনিয়ার সে আকীদার অনুসারী লাখো কোটি মানুষকে আপন সত্তা ও প্রকৃতি সম্পর্কে ভীষণভাবে সন্দিহান করে তোলা হয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যত, পরিণাম-ফল ও আল্লাহর রহমত লাভের আশা-ভরসাকে তাদের মন থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল।

তখনই মুহাম্মদ (সা.) দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন: মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি একটি নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ফলকের ন্যায়, আগে যাতে ছিল না কোন ধরনের লেখা ও চিহ্ন। পরবর্তীতে মানুষ তাতে আঁকে চোখ জুড়ানো সব নকশা ও চিত্র অর্থাৎ মানুষ নিজেই উদ্বোধন করে তার জীবন। আগামী দিনের কর্ম বিচারেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে, আপন কর্মগুণেই তার বিচার হবে। সে হবে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী। অন্যের কর্মের ব্যাপারে সে মোটেই দায়ী নয়। পবিত্র কুরআনের একাধিক জায়গায় এই কথা পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে, মানুষ কেবল নিজের কর্ম সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হবে।

"কেউ কারো বোঝা বহন করবে না এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। তার কর্ম শীঘ্রই দেখা হবে, অতঃপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।" [সূরা নজম, আয়াত-৩৮]

স্বীয় স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে এই ঘোষণা আবার ফিরিয়ে আনল তার হারানো বিশ্বাস ও অনুভূতি। ফলে সে এগিয়ে গেল সমুখপানে—দৃঢ়প্রত্যয়ী সংকল্প নিয়ে, বীরত্বব্যঞ্জক উদ্যমী মনোভাব নিয়ে, এগিয়ে গেল নির্ভীক ও নিঃশংক হয়ে, মানবতার এক নতুন পৃথিবী আবাদ করার লক্ষ্য নিয়ে। সুযোগের সদ্ব্যবহারে এখন সে মোটেই দ্বিধাগ্রস্ত নয়, সন্ধিগ্ধ নয়। মুহাম্মদ (সা.) অপরাধ ও গোনাহকে ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলনকে মানুষের জীবনের একটি আকস্মিক অবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন যাতে সে লিপ্ত হয়ে পড়ে কখনো অজ্ঞতাবশত, কখনো অসতর্কতাবশত, আবার কখনো বা শয়তানের ধোঁকার শিকার হয়ে। নইলে সততা, সততার যোগ্যতা, অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া মানব স্বভাবের প্রকৃত দাবি ও ইনসানিয়াতের অলংকার। কোন ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চাওয়া, পুনর্বার তা না করার দৃঢ় সংকল্পে বুক বাঁধা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ, তার মৌলিকত্বের বড় নিদর্শন ও বহিঃপ্রকাশ, সর্বোপরি তা হযরত আদম (আ.)-এর উত্তরাধিকার।

মুহাম্মদ (সা.) গোনাহগার ও পাপীদের সামনে, পাপাচার ও অনাচার ও অনাচারে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের সামনে খুলে দিয়েছেন তওবার এক প্রশস্ত দরজা। ব্যাপকভাবে ডেকেছেন তাদেরকে তওবার দিকে। তুলে ধরেছেন তাদের সামনে তওবার ফযীলত ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা, যে বিস্তৃতি উপলব্ধি করে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি দ্বীনের এই বিশেষ ও মহান রুকনটিকে উম্মতের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাই তাঁর অন্যান্য সুন্দর নামের মধ্যে একটি নাম হলা নবী অত-তওবাহ (তওবার নবী)। কেননা বিগত জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গুনাহ-খাতার জন্য একমাত্র বাধ্যতামূলক পন্থা হিসেবেই শুধু মানুষকে তিনি তওবার দিকে ডাকেন নি, বরং তওবার মান ও মাহাত্ম্যকে তুলে ধরেছেন উম্মতের সামনে। ফলে তওবা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে 'বিলায়াতে'র দরজা লাভ করার জন্য এক শ্রেষ্ঠ ইবাদতে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ এই বিলায়াতই আবেদ-যাহিদ-এর কাছেও আল্লাহর নেক বান্দাদের নিকট চিরকালের ঈর্ষা করার জিনিস।

আল-কুরআনেও আল্লাহ্ তা'আলা বর্ণনা করেছেন তওবার ফযীলত ও তাঁর রহমতের বিস্তৃতির কথা। তওবা করলে গোনাহগারের গোনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে এমন চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে এবং অবাধ্য ও গোনাহগার বান্দাদেরকে, কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের সাথে যুদ্ধে হেরে যাওয়া হৃদয়গুলোকে আল্লাহর রহমতের দামান আঁকড়ে ধরার এবং দয়া ও করুণার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য এমনভাবে ডেকেছেন এবং তাঁর তরংগায়িত ও সর্বব্যাপী রহমতকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় আল্লাহ্ পাক শুধু সহনশীল, দয়ালু ও দানশীলই নন, বরং তিনি ভীষণ ভালোবাসেন তওবাকারীদেরকে।

এবার পড়ুন কুরআনের আয়াতগুলো, অনুধাবন করুন তাঁর দয়া, করুণা ও মহব্বতের সেই নিঃসীমতা, যা আয়াতের শব্দে ঝরে ঝরে পড়েছে, আলো ছড়াচ্ছে।

"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়ালু"। [সূরা যুমার, আয়াত-৫৩]

অপর এক আয়াতে গুনাহগার পাপী মানুষের উল্লেখ প্রসংগে নয়, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী, উত্তম চরিত্র-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জান্নাতী মানুষের আলোচনা প্রসঙ্গে গুনাহ থেকে তওবাকারী মানুষের উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে:

"তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ্ সৎ কর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন এবং যারা কোন অশ্লীল কার্য করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ্ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না। ওরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং জান্নাত যার পাদদেশ নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং সৎ কর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম!"

এই আয়াতের চেয়েও আরো চিত্তাকর্ষক পদ্ধতি চোখে পড়ে নিম্নোক্ত আয়াতে। আল্লাহ্ এই আয়াতে তাঁর পুণ্যবান বান্দাগণের এক নূরানী তালিকা তৈরি করেছেন আর তা উদ্বোধন করেছেন আবেদ-যাহিদের বদলে তওবাকারীদের দিয়ে:

“তওবাকারী, ইবাদতকারী, শোকরগুযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সেজদা আদায়কারী, সৎ কাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্তকারী ও আল্লাহর দেয়া সীমাসমূহের হিফাজতকারী (এরাই মু'মিন) এবং (হে পয়গাম্বর।) আপনি মু'মিনদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।" [সূরা তওবা, আয়াত ১১২]

গোনাহ করার পর তওবাকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হলে তার যে সম্মান ও মর্যাদা লাভ হয় তা ফুটে উঠেছে তাবুক যুদ্ধে কোন সংগত কারণ ছাড়াই পিছিয়ে পড়া তিন সাহাবীর তওবা কবুল করার কুরআনী ঘোষণায়। আয়াতে উক্ত তিন সাহাবীর আলোচনার আগে খোদ আল্লাহর নবী ও সেই সব আনসার-মুহাজিরের আলোচনাও করা হয় যারা তাবুক অভিযানে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। তারপর যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া তিনজনের কথা উল্লেখ করা হয়। কারণ হলো, এই তিনজন যাতে একাকিত্ব অনুভব না করেন এবং কোন প্রকার হীনমন্যতা ও নীচ অনুভূতি তাদেরকে কষ্ট না দেয় আর দুনিয়াবাসীর কাছেও যাতে কেয়ামত পর্যন্ত এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায়, এই তিনজনও সেই মুবারক জামাতেরই সদস্য। সুতরাং লজ্জার কিছু নেই।

আছে কি ধর্ম, চরিত্র, প্রশিক্ষণ ও সংস্কার-সংশোধনের কোন ইতিহাসে তওবা করার এমন চিত্তাকর্ষক, সুন্দর, মধুর ও হৃদয়গ্রাহী কোন নমুনা? এবার লক্ষ্য করুন কুরআনী আয়াত:

“আল্লাহ্ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে অনুগমন করেছিল যখন তাদের একদলের চিত্তবৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি; নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়েছিল আর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা তওবা করে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তওবা: আয়াত ১১৭-১১৮)

আল্লাহ্ আরো ঘোষণা করেছেন, তাঁর রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে:
“আমার রহমত প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৫৬)। এক হাদীছে কুদসীতে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী।"

আল্লাহ্ নৈরাশ্যকে কুফুরী, মূর্খতা ও ভ্রষ্টতার শামিল হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, হযরত ইয়া'কূব (আ.)-এর ভাষায়:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।"

অন্যত্র হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ
"পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্ট ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?" [সূরা হিজর: আয়াত-৫৬]

এভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) তওবার ফজিলত বর্ণনা করে এর প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করে ঘোষণা করলেন আল্লাহর রহমতের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার কথা এবং আল্লাহর ক্রোধ ও জালালিয়াতের ঘোষণা ও তার বিস্তৃতিতে ভীতসন্ত্রস্ত, নিরাশ ও হতোদ্যম হৃদয়গুলোকে শোনালেন এক নতুন জীবনের পয়গাম। হতাশাঘেরা জীবনে সঞ্চার করলেন এক নতুন স্পন্দন, নতুন তৎপরতা। লাঞ্ছনা ও অভিশপ্ত দুনিয়ার আঁধার থেকে বের করে তাদেরকে নিয়ে গেলেন সম্মান-মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা স্থাপনের এক আলোকোজ্জ্বল নতুন পৃথিবীতে।

টিকাঃ
১। তানাসুখ (জন্মান্তরবাদ): হিন্দুদের মাঝে ও প্রাচীন ধর্মের অন্য অনুসারীদের মাঝে প্রচলিত একটি 'আকীদা' যার মূল কথা হলো, মানুষের মৃত্যুর পর তার রূহু বা আত্মা অন্য প্রাণীর রূপ পরিগ্রহ করে। আর এই রূপান্তর ঘটে থাকে মৃত ব্যক্তির পাপ-পুণ্যের শাস্তি কিংবা পুরস্কার হিসেবে। তবে যে প্রাণীতে মানুষের রূহ স্থানান্তরিত হবে তা মৃতের চেয়ে মর্যাদায় বড়ও হতে পারে, আবার ছোটও হতে পারে।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 সমন্বয় সাধনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত

📄 সমন্বয় সাধনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত


প্রাচীন ধর্মগুলো, বিশেষত খ্রীস্ট ধর্ম মানব জীবনকে দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল: দীন ও দুনিয়া। আর ভূমণ্ডলকে ভাগ করেছিল দু'টি স্তরে। এক স্তরে কিছু সংখ্যক মানুষ মশগুল থাকবে কেবল দ্বীন নিয়ে, অপর দিকে কিছু লোক ব্যস্ত থাকবে শুধু দুনিয়া নিয়ে।

এই দু'টি স্তর শুধু পরস্পর বিচ্ছিন্নই ছিল না, উভয়ের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিরাট বাধা ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এক দলের সাথে আরেক দলের কোন যোগাযোগ ও মিল ছিল না, বরং পারস্পরিক যুদ্ধ-কলহ ও হানাহানির এক সিলসিলা বিদ্যমান ছিল, বিরাজমান ছিল একে অপরের রক্তে হাত লাল করার এক উন্মত্ত জিঘাংসা। এদের প্রত্যেকেই দ্বীন-দুনিয়ার একত্রীকরণ ও সহাবস্থান অসম্ভব মনে করত। তাই যখনই কোন মানুষ এই দু'টি পক্ষের কোন একটিকে গ্রহণ করতে চাইত অপরিহার্যভাবেই তখন তাকে অপর পক্ষ থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়তে হতো, বরং অপর পক্ষের বিরুদ্ধে তাকে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করতে হতো। এ যেন একই সঙ্গে দুই নৌকায় পা রাখা! দুনিয়াদারদের মনোভাব ছিল এই, আসমান যমীনের স্রষ্টার দিক থেকে মুখ না ফেরালে ও পরকাল সম্পর্কে বেখবর না হলে অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন ও সমৃদ্ধি সাধন কোনভাবেই সম্ভব নয়। মন থেকে আল্লাহর ভয় না তাড়ালে এবং নৈতিক, চারিত্রিক ও দ্বীনী শিক্ষা বর্জন না করলে কোন প্রশাসনিক ক্ষমতাই টিকে থাকতে পারে না।

আর অপর দল মনে করে, "বৈরাগ্যবাদকে আঁকড়ে না ধরলে এবং দুনিয়ার সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন না করলে দ্বীনদার হওয়ার প্রশ্নই আসে না।” বলা বাহুল্য, যা কিছু সহজ মানুষ তাই পছন্দ করে এবং প্রকৃতিগতভাবে তা মেনে নিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। দ্বীনের অর্থ যদি এই হয়, দুনিয়ার বাহ্যিক সাজ-সরঞ্জাম ও উপায়-উপকরণ থেকে মোটেই ফায়দা হাসিল করা যাবে না, তবে তা মানব প্রকৃতির সাথে মোটেই সংগতিপূর্ণ হতে পারে না, বরং তা হবে নির্দোষ ও নির্মল মানব প্রকৃতিকে গলা টিপে হত্যা করার শামিল। আর দ্বীনের এই তথাকথিত ব্যাখ্যার পরিণতিতেই তৎকালীন যুগের সভ্য, ধীমান, যোগ্য ও শিক্ষিত সমাজের একটি বিরাট অংশ দ্বীনের পরিবর্তে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়াদারী নিয়ে ভীষণভাবে মেতে ওঠে। ফলে তিরোহিত হয়ে যায় তাদের হৃদয়-মন থেকে আধ্যাত্মিকতায় সফলতা অর্জনের ও উন্নত নৈতিকতা বিনির্মাণের সমস্ত আশা-ভরসা। যারা ব্যাপক হারে দ্বীন বর্জন করেছিল তারা এই ভেবে বসেছিল, বাস্তবিকই দ্বীনের সাথে দুনিয়ার সম্পর্ক বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক। আর গির্জাকেন্দ্রিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড যে দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে এমনটি ভাবতে মানুষকে বাধ্য করেছিল তা বলাই বাহুল্য। ফলে প্রশাসন ক্রমশই ক্রুদ্ধ ও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে লাগল দ্বীনের প্রতিনিধিত্বকারী এই গির্জার প্রতি। তখন মানুষ হয়ে পড়েছিল বাঁধনমুক্ত উন্মত্ত হাতির ন্যায় আর সমাজ ব্যবস্থা হয়েছিল দিকচিহ্নহীন মরুর বুকের লাগামহীন উটের ন্যায়।

দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ও তার অনুসারীদের দ্বন্দ্ব-কলহ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলেই দরজা খুলে যায় ধর্মহীনতা ও আল্লাহদ্রোহিতার যার প্রথম ও প্রধান শিকার ছিল পাশ্চাত্য দুনিয়া এবং সেই সব সম্প্রদায় যারা চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যকে মুরুব্বী হিসেবে গ্রহণ করেছিল কিংবা পাশ্চাত্যের আনুগত্য শর্তহীনভাবে মেনে নিয়েছিল।

আর পূর্বেই বলা হয়েছে, এর জন্য সর্বতোভাবেই দায়ী ছিল সীমালংঘনকারী ও কট্টরপন্থী ফাদার ও পাদ্রীরা যারা মানুষকে দ্বীন সম্পর্কে ভুল তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করে দ্বীনের এক অবাস্তব, অসংগত, হিংস্র ও ভয়ানক চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দ্বীন সম্পর্ক ভীষণভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।

এই নাযুক পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটল হযরত রাসূলে কারীম (সা.)-এর। ঘোষিত হলো, মানুষের সঠিক কর্মকাণ্ডের সাথে দ্বীনের কোন বিরোধ নেই, থাকতে পারে না। মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের বুনিয়াদই হলো মানুষের মূল লক্ষ্য। ইসলাম এই বিষয়টিকেই একটি ছোট ও গভীর অর্থবহ শব্দে প্রকাশ করেছে। শব্দটি হলো النية "নিয়ত”-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

“নিয়তের ওপরই সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে। মানুষ যা নিয়ত করবে তারই ফল সে লাভ করবে।”

মানুষের যাবতীয় কাজের উদ্দেশ্যই যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তাঁর হুকুম পালন, তাহলে এসব কাজ তাকে পৌঁছে দেবে আল্লাহ্র নিকটতম সান্নিধ্যে, ইয়াকীন ও বিশ্বাসের সর্বোচ্চ চূড়ায়। ফলে তার সমস্ত কর্মই পরিগণিত হবে তখন 'খালিস দ্বীন' হিসেবে। পার্থিব আবিলতার সামান্যতম স্পর্শও তাতে থাকবে না, হোক না সে কাজ জিহাদ ও লড়াই? হোক না সে কাজ দেশ শাসন ও রাজ্য পরিচালনা, হোক না সে দুনিয়ার বৈধ বস্তুসমূহ থেকে খিদমত গ্রহণ কিংবা মনের চাহিদা পূরণ কিংবা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে চাকরি অনুসন্ধানের চেষ্টা-তদবির কিংবা দাম্পত্য জীবনের সুখ-সম্ভোগের। নিয়ত ঠিক থাকলে এ সবই বিবেচিত হবে ইবাদত হিসেবে। পক্ষান্তরে নিয়ত ঠিক না থাকলে বড় বড় ইবাদত, যথাঃ নামায, রোযা, হিজরত, জিহাদ, তাসবীহ-তাহলীল-সবই পরিগণিত হবে দুনিয়াবী কাজ হিসেবে। তার জন্য কোন সওয়াব তো মিলবেই না, বরং এই ইবাদতই তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পঞ্চম অনুগ্রহ এই, তিনি দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছেন এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও শত্রুভাবাপন্ন দল দু'টিকে অবিরাম হিংসা, হানাহানি ও জিঘাংসা থেকে মুক্ত করে গলায় গলায় মিলিয়ে দিয়েছেন, আবদ্ধ করেছেন ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক সুগভীর দৃঢ় বন্ধনে, উপহার দিয়েছেন শান্তি ও ঐক্যের এক নতুন পৃথিবী।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) একাধারে বাশীর (সুসংবাদ প্রদানকারী) ও নাযীর (ভীতি প্রদর্শনকারী)। তিনি আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন এই মহান দু'আঃ
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর আর আমাদেরকে বাঁচাও জাহান্নামের আযাব থেকে।”

তিনি আরো ঘোষণা করেছেন:
"নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু কেবল জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশেই নিবেদিত।"

মানব জীবন কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিপরীতমুখী এককের সমষ্টি নয়, বরং তা হলো এমন এক সত্তার নাম, জীবনের ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ্র প্রতি ঈমান ও অবিচল আস্থা বাস্তব জীবনের হাজারো কর্মব্যস্ততা মোটেই যা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং নিষ্ঠা থাকলে, নিয়ত সহীহ্ থাকলে, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য হলে আর এ সবই নবী-রাসূলগণের আনীত মাপকাঠিতে উতরে গেলে প্রমাণিত হবে, আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি নবীজীর কাছ থেকে একতা ও সাম্যের শিক্ষা। নবীজী মিটিয়ে দিযেছেন দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সকল বাধা-ব্যবধান। তিনি মানুষের গোটা জীবনকে ইবাদতে পরিণত করেছেন আর সমগ্র পৃথিবীকে পরিণত করেছেন ইবাদতগাহে। পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত ক্ষয়িষ্ণু মানবতার হাত ধরে তিনি তাদের নিয়ে গেছেন নিষ্ঠা ও সততার এক বিস্তৃত অঙ্গনে।

সেই পুণ্য কাফেলায় রয়েছেন ফকীর-মিসকীনের পোশাকে কত রাজা-বাদশাহ! আবার রাজা-বাদশাহ ও আমীরগণের লেবাসে রয়েছেন কত আবেদ যাহিদ ও আল্লাহর পেয়ারা বান্দা! এঁরা ধৈর্য ও সহনশীলতার সুউচ্চ পর্বতমালা! ইল্ল্ফ ও জ্ঞানের উচ্ছল ঝর্ণাধারা! এঁদের রজনী ভোর হয় ইবাদত-বন্দেগীর নিবিড়তায় আর দিবসে হয় এঁরা শাহসওয়ার! আল্লাহর পথের সৈনিক। কিন্তু কোথাও কোন বিরোধ নেই, কোন জটিলতা নেই, নেই কোন শূন্যতা।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 মঞ্জিলে মাকসুদ

📄 মঞ্জিলে মাকসুদ


মুহাম্মাদ (সা.)-এর ষষ্ঠ অনুগ্রহ কিংবা তাঁর ঘটানো ষষ্ঠ বিপ্লব হলো, তিনি মানুষকে উপযুক্ত ও সম্মানজনক এক মনযিলের পথ দেখিয়েছেন যেখানে ব্যয় হবে তার সর্বশক্তি। তিনি তাদেরকে সন্ধান দিয়েছেন এক বিশাল বিস্তৃত মহাশূন্যের, যেখানে সে উড়ে বেড়াবে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায়। নবীজীর আগমনের পূর্বে মানুষ নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। সে জানত না কোথায় যেতে হবে তাকে এবং কোথায় শেষ হবে তার এই যাওয়া। সর্বোত্তম ও বাস্তবভিত্তিক এমন কোন ক্ষেত্র আছে কি যেখানে অনায়াসে বিলিয়ে দেয়া যেতে পারে তার শক্তি-ক্ষমতা, চেষ্টা-সাধনা ও তার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা প্রতিভা? না, কিছুই সে জানত না। সে বন্দী ছিল মনগড়া, কল্পিত, মরীচিকাময় কিছু ক্ষুদ্র স্বার্থ ও হীন উদ্দেশ্যের নিগড়ে। সে ছিল সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ পৃথিবীর এক বাসিন্দা। এই জীবনকে কেন্দ্র করেই ব্যয়িত হতো তার সকল শক্তি ও মেধা। বিপুল অর্থবল, অসীম শক্তিবল, কিছু সংখ্যক মানুষের ওপর মোড়লিপনা ও আধিপত্য লাভ ও কোন ভূখণ্ডের মালিক হতে পারাই ছিল সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীর একজন বাসিন্দার সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া। জাহিলী সমাজে সেই গণ্য হতো একজন সর্বোচ্চ সফল ব্যক্তি হিসাবে। বল্লাহারা জীবনের বাঁধনমুক্ত আমোদ-প্রমোদ, নারী কণ্ঠের মধুঢালা সুর লহরী, উপাদেয় ও বিলাসী খাবার, বুলবুলির মিষ্টি আওয়াজ, ময়ূরের পেখমের দৃষ্টিকাড়া সৌন্দর্য ও চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের ভিড়ের ভেতর হারিয়ে যাওয়াই ছিল তার স্বপ্নসাধ。

অপরদিকে কিছু মানুষ ধরনা দিয়ে ঘুরে বেড়াত তৎকালীন রাজা-বাদশাহদের কাছে। তাদের বুদ্ধি ও মেধা উৎসর্গীকৃত হতো তাদের নৈকট্য লাভের পেছনে এবং তাদের অমূলক প্রশস্তি গেয়ে। অত্যাচারী শাসকবর্গের নাচের পুতুল হয়ে তারা কেবল নাচত। কিছু মূল্যহীন নিরর্থক সাহিত্যকে বুকে চেপে রেখে তারা লাভ করত সান্ত্বনা। তখন এলেন মুহাম্মাদ (সা.)। নির্ধারণ করে দিলেন মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। মানুষের মাঝে এই বিশ্বাস দৃঢ়মূল করলেন, তার চেষ্টা-সাধনা, তার বুদ্ধি, মেধা ও প্রতিভা, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাস এবং তার মুক্ত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ও কেন্দ্রবিন্দু হলো আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ, তাঁর গুণাবলী, তাঁর কুদরত, হিকমত ও তাঁর বিশাল-বিস্তৃত অন্তহীন সাম্রাজ্যের মাহাত্ম্য ও চিরন্তনতার সম্যক পরিচিতি লাভ, তাঁর প্রতি অবিচল ঈমান ও দৃঢ় আস্থা রাখা, তাঁর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টিতে আসে বিজয় ও সাফল্য এই দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করা। সদাসর্বদা সন্তুষ্ট থাকা তাঁর প্রতি, বিশ্বাস রাখা তাঁর সীমাহীন কুদরতের প্রতি, তাঁর সেই একত্বের প্রতি যা মিলন ঘটাতে পারে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অগণিত অংশের ভেতর, কখনো বিপরীতমুখী অংশের মাঝে এবং নিজের রূহ বা আত্মাকে সর্বদা তাঁর যিকিরে সজীব ও শক্তিশালী রাখা। তারপর এই সবের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নৈকট্য ও ইয়াকীনের মহিমান্বিত জগতে প্রবেশ করা, সর্বশেষে উপনীত হওয়া সেই স্থানে যেখানে নূরের ফেরেশতারাও পৌঁছতে পারে না। এটাই মানুষের আসল সৌভাগ্য, তার পূর্ণত্বের শেষ ধাপ, তার হৃদয় ও আত্মার মিরাজ।

📘 নতুন পৃথিবীর জন্ম দিবস > 📄 জন্ম হলো নতুন পৃথিবী—নতুন মানুষ

📄 জন্ম হলো নতুন পৃথিবী—নতুন মানুষ


মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের বরকতে ও তাঁর মহান শিক্ষার বদৌলতে বদলে গেল পৃথিবী, বদলে গেল পৃথিবীর রসম-রেওয়াজ ও প্রশাসনিক কাঠামো। মানবতার উত্তরণ ঘটল গ্রীষ্মের খরতাপ, লু হাওয়া, প্রচণ্ড দাহ ও দুর্ভিক্ষঘেরা এক ভয়ংকর ঋতু থেকে এমন এক ঋতুতে যেখানে গলাগলি করছে ফুল আর বসন্ত, যেখানে উদ্যান ঘেঁষে বয়ে চলেছে ছলচল প্রবাহের উচ্ছল ঝর্ণাধারা। তাঁর আগমনে পাল্টে গেছে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, তাদের হৃদয়গুলো আপন প্রতিপালকের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল। মানুষ ব্যাপকভাবে ধাবিত হলো আল্লাহ্ অভিমুখে। মানুষ সন্ধান পেল অপরিচিত এক নতুন স্বাদের, অজানা এক নতুন রুচির, অজ্ঞাত এক নতুন ভালোবাসার。

আগের সেই নিস্তেজ ঘুমন্ত হৃদয়গুলো জেগে উঠল ঈমানের উষ্ণতায়, মায়া-মমতার পরশে। সবার মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে নতুন উদ্যম, নতুন তৎপরতা। মানুষ দলে দলে বেরিয়ে এসেছে সিরাতু’ল-মুস্তাকীম তালাশের জন্য, সম্মান ও মর্যাদার চূড়ায় আরোহণের জন্য। দেশ ও জাতি-নির্বিশেষে সকলেই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ব্যাকুল, উন্মুখ। আরব, আজম, মিসর, তুর্কী, ইরান, খোরাসান, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, হিন্দুস্তান, আলজেরিয়া, পূর্ব হিন্দুস্তান সবাই এই ঊর্ধ্বে জগতের ইশক-মুহব্বত ও প্রেম-ভালোবাসায় বেকারার দেওয়ানা। মনে হচ্ছে, মানবতা যেন চেতনা ফিরে পেয়েছে, দীর্ঘ ও গভীর নিদ্রাশেষে চোখ মেলে তাকিয়েছে। কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকাকালীন যে সুদীর্ঘ সময় কেটে গেল তার ক্ষতি পূরণের ধারাবাহিকতায়ই তখন মানবতার একেকটি গোষ্ঠী থেকে জন্ম নিলেন আল্লাহর পথের অসংখ্য দাঈ, রব্বানী, মুখলিস, নিষ্ঠাবান মুজাহিদ, সংস্কারক, প্রশিক্ষক, আরিফে রব্বানী, আবেদ-যাহিদ, সৃষ্টির শোক-ব্যথার সমভাগী, মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গীকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ এবং আরো এমন সব মনীষী ও ব্যক্তিত্ব, নূরের ফেরেশতাকুলের কাছেও যাঁরা ঈর্ষার বিষয়। তাঁরা সবাই মিলে কি করলেন? বিরান ও অনাবাদী হৃদয়গুলোকে আবাদ কলেন আল্লাহ্ প্রেমের মশাল জ্বেলে। বইয়ে দিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফাতের হাজারো সালসাবিল। নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনী ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদদীপ্ত এক প্রচণ্ড দ্রোহ। নির্যাতিত, অবমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আর উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানব গোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে, যা আবাদ হয়ে আছে শুধু প্রেম-ভালোবাসা ও মায়া-মমতায়।

মানবতার সেবায় নিবেদিত এই মুবারক জামাত থেকে পৃথিবী কখনো বঞ্চিত হয়নি। এঁরা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন সর্বদা, সব জায়গায়। সংখ্যায় এঁরা অগণিত অথবা এঁদের সংখ্যা নিরূপণই অসম্ভব। এঁদের কোয়ানটিটির কথা বাদ দিয়ে আসুন এঁদের কোয়ালিটির আলোচনায়। উল্টে যান ইতিহাসের পাতা, দেখবেন তাঁদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা, তীক্ষ্ণ ধী ও নির্মল স্বভাব-চরিত্র। আরো দেখবেন কেমন করে এঁরা আর্ত মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন এবং নিজেকে তাদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁদের পবিত্র আত্মারা বিগলিত হতো সমবেদনায় সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে যে কোন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতেন তাঁরা হাসি মুখে। আর তাঁদের আমীর ও শাসকগণ ছিলেন পূর্ণ দায়িত্বসচেতন ও আমানতদার। একদিকে রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে থাকতেন মশগুল, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিও রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক-শাসিতের মাঝে কোথাও কোন অমিল বা বিরোধ ছিল না। সবাই তাঁদের অনুগত。

আরেকটু উল্টে যান ইতিহাসের পাতা। অবাক হবেন তাঁদের ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, দু'আ ও মুনাজাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্যবোধ, ছোট ও দুর্বলদের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমবোধ, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাঁদের মধুর বিনম্র আচরণ, দয়া ও করুণা এবং জানের দুশমনকে অকপটে ক্ষমা করে দেয়ার কাহিনী পড়ে। মনে হবে কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব না তাঁদের উর্বর কল্পনা ও তাঁদের বিরল প্রতিভার সিঁড়ি বেয়ে সেই চূড়ায় উপনীত হওয়া, যেখানে উপনীত হয়েছিলেন এঁরা বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও সনদ আমাদের সংরক্ষণে না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য ইতহাসের সাক্ষ্য না পেলে অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী ও উপকথা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। সত্যি, এই মহান ইনকিলাব, এই গৌরবদীপ্ত নতুন যুগের সূচনা মুহাম্মাদ (সা.)-এর অন্যতম মু'জিযা ও তাঁর এক মহাঅনুগ্রহ। সর্বোপরি তা ইলাহী রহমতের এক মহাদান যা সীমাবদ্ধ নয় স্থান-কাল-পাত্রের কোন সংকীর্ণ গণ্ডিতে। মহান আল্লাহ্ সত্যি বলেছেন:

"আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।" [সূরা ২১: আয়াত-১০৭]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00