📄 ঐক্য ও সাম্য
নবীজীর দ্বিতীয় অনুগ্রহ এই, শতধাবিচ্ছিন্ন ও বহুধাবিভক্ত মানব সম্প্রদায়কে ঐক্য ও সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর আগমনের পূর্বেকার চিত্র একটু কল্পনা করুন। এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের কোন সম্পর্ক ছিল না। সবার মাঝে সম্পর্কহীনতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া হয়ে আছে। জাতীয়তাবাদ বন্দী হয়ে আছে সংকীর্ণতার নিগড়ে। পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যবধান ও পার্থক্য ছিল মানুষ ও প্রাণী, স্বাধীন ও গোলাম এবং আব্দ ও মা'বুদের সম্পর্কের ব্যবধান ও পার্থক্যের মত। তখন একতা ও সাম্যের কোন ধারণাই তাদের ছিল না। তারপর নবীজী সবাইকে শুনিয়ে দিলেন সুদীর্ঘ কালের নীরবতাকে ভেঙ্গে দিয়ে এবং স্তরে স্তরে জমে থাকা অন্ধকারকে ভেদ করে সেই বিপ্লবী ঘোষণা, যা হতবাক করে দিল মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে আর পরিস্থিতি মোড় নিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে।
আইয়্যুহান নাসু ইন্না রাব্বাকুম ওয়াহেদুন ওয়া ইন্না আবাকুম ওয়াহেদুন কুল্লুকুম লিআদামা ওয়া আদামা মিন তুরাবিন - ইন্না আকরামাকুম ইনদাল্লাহি আতকাকুম - ওয়ালাইসা লিআরাবিয়্যিন আলা আজামিয়্যিন ফাদলুন ইল্লা বিততাকওয়া -
"হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতৃপুরুষও এক। তোমরা সবাই আদম সন্তান আর আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি সেই যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিক ভয় করে। কোন অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোন আরবের কেবল তাকওয়া ছাড়া।" [কানযু'ল উম্মাল] এই ঘোষণার রয়েছে দু'টি দিক যার ওপর নির্ভর করে শান্তি ও নিরাপত্তা সর্বকালে সর্বস্থানে। একটি হলো, আল্লাহ্ এক অদ্বিতীয়। আর দ্বিতীয় হলো, মানুষের উৎসস্থল এক-অদ্বিতীয়। সুতরাং মানুষের ভাই দুই দিক থেকে। প্রথমত, তাদের প্রতিপালক এক আর এটিই মূল। দ্বিতীয়ত তাদের পিতৃপুরুষ এক।
“হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ সব কিছুর খবর রাখেন।”
বিদায় হজ্জের বিশাল জনসমুদ্রে নবীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল এই চিরন্তন বাণী।
সত্যি কথা বলতে কি, নবীজী যখন এই মহান ঐতিহাসিক ঘোষণা শোনানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তখন এই স্পষ্ট ও বিপ্লবী ঘোষণা শোনার জন্যে পৃথিবীর একেবারেই 'মুড' ছিল না। কেননা ভূমিকম্প থেকে এই ঘোষণা মোটেই কম বিধ্বংসী ও কম মারাত্মক ছিল না। কারণ কিছু কিছু জিনিস এমন যার প্রতিক্রিয়া আমরা ধীরে ধীরে সয়ে নিতে পারি অথবা আড়ালে থাকার কারণে কোন প্রতিক্রিয়াই অনুভূত হয় না। যেমন বিদ্যুৎ প্রবাহের কথাই ধরুন। আমরা যদি সরাসরি তা স্পর্শ করি তাহলে নিমিষেই আমাদেরকে ঢলে পড়তে হবে মৃত্যুর হিমশীতল কোলে আর যদি আবরণের ওপর দিয়ে স্পর্শ করি তাহলে কোন বিপদাশংকাই নেই। আজ মানুষ পেরিয়ে এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তা ও গবেষণার এক সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা। কিসের বদৌলতে? ইসলামী দাওয়াতের বদৌলতে, সর্বজনীন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার বদৌলতে, ইসলামের অগণিত দাঈ, সংস্কারসেবী ও প্রশিক্ষণদাতাদের হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কোরবানীর বদৌলতে। এসব কিছুর বদৌলতেই আজ এই বিপ্লবী ও ব্যতিক্রমী ঘোষণা নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া কারো পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাই আজ জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে আরম্ভ করে বিশ্বব্যাপী সর্বত্রই ধ্বনিত হচ্ছে মানবাধিকার ও সাম্যের কথা। এই বাস্তবতার কথা আজ কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একটু নজর দিলে দেখা যায়, পৃথিবীতে প্রাক-ইসলামী যুগে এমন সময়ও অতিবাহিত হয়েছে যখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ছিল আসমান-যমীন। কোন কোন বংশ নিজের সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছিল চন্দ্র-সূর্যের সাথে, কেউ বা আবার স্বয়ং আল্লাহর সাথে।
আল-কুরআন আমাদের কাছে বর্ণনা করেছে ইয়াহুদী-নাসারাদের ভ্রান্ত আকীদার কথা এভাবে:
"আর ইয়াহুদী ও নাসারাগণ বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়ভাজন।"
মিসরীয় ফেরাউনরা নিজেদেরকে সূর্য দেবতার অবতার বলত আর হিন্দুস্তানের কতিপয় সম্প্রদায় নিজেদেরকে বলত সূর্য বংশ ও চন্দ্র বংশ। ইরানী বাদশাহগণ (যাদের উপাধি ছিল কিসরা) দাবি করত, তাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত রয়েছে খোদায়ী শোণিত ধারা। ইরানীদের কাছে তাদের গুণাবলী এভাবে পরিবেশিত হয়েছিল, "উপাস্যদের মধ্যে রয়েছে এমন মানুষ যার কোন বিলুপ্তি নেই এবং মানুষের মধ্যে রয়েছে এমন উপাস্য যার কোন দ্বিতীয় নেই। সমুচ্চ হোক তার কথা, উন্নত হোক তার সম্মান ও মর্যাদা! তিনি সূর্যের সাথে উদিত হন সূর্যালোক হয়ে আর ছাপিয়ে তোলেন অন্ধকার রাতকে উজ্জ্বল আলোকমালায়।"
অনুরূপ রোম সম্রাটদের মধ্যেও হতো অনেক 'ইলাহ'। তাদের যিনিই মসনদে আসীন হতেন, তিনিই তথাকথিত 'ইলাহ'-এ পরিণত হয়ে যেতেন আর তার 'লকব' হত August আর চীনারা নিজেদের অধিপতিদেরকে মনে করত ইবনু'স-সামা-আসমানের পুত্র বলে। তাদের ধারণা ছিল, আসমান পুরুষ ও যমীন নারী আর এই দুইয়ের সম্মিলনেই অস্তিত্ব লাভ করেছে এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিলোক।
আরবরা নিজেদের ছাড়া অন্য সবাইকে ভাবত 'আজম'। কুরায়শরা মনে করত তারাই আরব গোত্রসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত। তারা সর্বক্ষেত্রেই নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলত। কোন আনুষ্ঠানিকতায়ই অন্য কোন গোত্রের সাথে তারা অংশ নিত না। হাজীদের সাথে প্রবেশ করত না আরাফাতে, বরং হারামে থেকে যেত এবং মুযদালিফায় অবস্থান করত আর বলত: আমাদের কথা ভিন্ন। আমরা আহলুল্লাহ।
📄 মানুষের সম্মান ও মর্যাদার ঘোষণা
মানব জাতির প্রতি রাসূলে আরাবির তৃতীয় অনুগ্রহ এই, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন মানবতার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের শিক্ষা। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ ও মানবতা অপমান ও লাঞ্ছনার এক দুর্বিষহ জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে গুণছিল নাজাত ও মুক্তির প্রহর। এই মানুষের চেয়ে অপমানিত, লাঞ্ছিত, ধিকৃত ও অবহেলিত কোন জীব আর পৃথিবীতে ছিল না। দেবতা মনে করে যে সব জীব-জানোয়ার ও গাছপালার পূজা করা হতো কিছু মনগড়া বিশ্বাস ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে, সেগুলো পর্যন্ত ছিল এই মানুষের চেয়ে অধিক মূল্যবান, সম্মানিত ও সুরক্ষিত। শুধু তাই নয়, এসব কল্পিত উপাস্যদের জন্য অনেক নিষ্পাপ মানুষকে বলি দেয়া হতো। তাদের তাজা খুন-গোশত পেশ করা হতো নৈবেদ্য হিসেবে দেবতাদের সামনে, তবু তাদের হৃদয় একটু কাঁপত না। তাদের পাষাণ হৃদয়ে উদ্রেক হতো না সামান্য মানবতাবোধ। কেনই-বা বলছি সেই চৌদ্দ শ' বছর আগের কথা। বিংশ শতাব্দীর এই সভ্য যুগেও তো হিন্দুস্তানসহ সভ্য হিসেবে কথিত দেশগুলোতে আমরা দেখে চলেছি এমন জঘন্য, বর্বর, লোমহর্ষক ও অমানবিক সব চিত্র।
তখন সেই জাহেলী যুগে এলেন আল্লাহর নবী। উদ্ধার করলেন মানবতাকে অপমান ও লাঞ্ছনার অতল গহ্বর থেকে, ফিরিয়ে দিলেন গৌরব ও হারিয়ে যাওয়া সম্মান-মর্যাদা, ফিরিয়ে দিলেন তার আত্মসম্মানবোধ ও গ্রহণযোগ্যতা। দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন : এই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় ও মহান আর কিছু নেই। মানুষ সবচেয়ে সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ। প্রেম-ভালবাসা পাওয়ার অধিক হকদার অন্য কিছু নয়, কেবল মানুষ।
মানুষই হেফাজতের অধিক দাবিদার। আল্লাহ্ নিজে বাড়িয়ে দিয়েছেন মানুষের মর্যাদা ও অবস্থান। ফলশ্রুতিতে এই মানুষই অর্জন করেছে তার খলীফা ও প্রতিনিধি হওয়ার গৌরব।
"তিনি সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু যমীনে রয়েছে।” মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমস্ত সৃষ্টির নেতৃত্ব দেয়ার ও সভাপতিত্ব করার অধিকার একমাত্র মানুষের।
"নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের জন্য বাহন দান করেছি। তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।" মানুষের সম্মান ও মাহাত্ম্যের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে আল্লাহর নবীর এই বাণী :
"সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহর পরিবার। সুতরাং সৃষ্টিকুলের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই প্রিয়তম যে তার পরিবার-পরিজনের সাথে উত্তম আচরণ করে।"
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত মহানবী (সা.)-এর যে হাদীসটি বিধৃত হচ্ছে মানবতার মাহাত্ম্যের ওপর এত বড় দলীল ও মানবতার সেবায় নিজেকে পেশ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এত বড় প্রমাণ আর নেই। লক্ষ্য করুন হাদীসের কথা ও মর্ম। তিনি বলেন:
কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ স্বীয় বান্দাদের উদ্দেশ্য করে বলবেন, "হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তোমরা আমার সেবা-যত্ন করনি।” বান্দা আরজ করবে, “হে আল্লাহ্! এ কেমন করে সম্ভব! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” তিনি বলবেন, "তুমি কি জান না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, কিন্তু তুমি তার সেবা-যত্ন করনি? তার পাশে দাঁড়ালে সেখানে তো তুমি আমাকেই পেতে।”
"হে আদম সন্তান! আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তোমরা আমাকে অন্ন দাওনি।” বান্দা তখন আরজ করবে, "প্রভু হে! কিভাবে সম্ভব, আপনি তো রাব্বু'ল আলামীন!” আল্লাহ্ বলবেন, "আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল। তুমি তাকে খেতে দাওনি। তোমার কি জানা ছিল না, তাকে খাওয়ালে আমাকে কাছে পেতে?” “হে আদম সন্তান! আমি পিপাসার্ত ছিলাম, তোমরা আমায় পানি দাওনি।” বান্দা আরজ করবে, "হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে আপনাকে পান করাব? আপনি যে তৃষ্ণা থেকে পবিত্র?” আল্লাহ্ বলবেন, "আমার অমুক বান্দা পিপাসার্ত ছিল, তুমি তার পিপাসা নিবারণ করনি। তোমার কি জানা ছিল না, তার পিপাসা মেটালে তা আমার কাছে পেতে?"
মানবতার মাহাত্ম্যের ও তার উন্নত অবস্থানের সাক্ষ্য বহনকারী এই ঘোষণার চেয়ে অধিক স্পষ্ট ও পরিষ্কার কোন ঘোষণা কি কল্পনা করা যেতে পারে? এমন উন্নত অবস্থান ও মহান মর্যাদা মানুষ কি লাভ করতে পেরেছে সে কালের কিংবা এ কালের কোন ধর্ম দর্শনের অনুসারী হয়ে? নজীর আছে কি? আল্লাহর রহমত লাভ করতে হলে সৃষ্টিলোকের ওপর রহম করতে হবে। আল্লাহর নবী ইরশাদ করেছেন:
"যারা রহম করে তাদের প্রতিই রহমানের রহমত বর্ষিত হয়। পৃথিবীতে যারা আছে তোমরা তাদের প্রতি রহম কর, তবে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের প্রতি রহমত নাযিল করবেন।" একটু ভেবে দেখুন তো, ইসলাম-পূর্ব যুগে মানবতার এই মুক্তি সংগ্রামে, মানুষের মাঝে একতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের এই জিহাদে বের হওয়ার পূর্বে কি ছিল পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি? একজন মানুষের কিছু মাতাল ইচ্ছার মূল্য ছিল হাজার হাজার প্রাণের চেয়েও বেশি। একেকজন রাজ্যপাল ও সাম্রাজ্যবাদী সম্রাট বের হতো আর দেশকে দেশ কব্জা করে সেখানে বইয়ে দিত অমানবিকতার ঝড়ো হাওয়া। তাদের ইচ্ছার কাছে কত আযাদ মায়ের আযাদ সন্তানদের নিমিষেই বরণ করে নিতে হতো গোলামী-পরাধীনতার শৃংখল।
📄 হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো
হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো, আত্মনির্ভরশীলতা ও আত্মমর্যাদাবোধের দীপ্তি!
আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে মানুষ নিরাশ হয়ে পড়েছিল। তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছিল 'নিখুঁত মানব প্রকৃতি' সম্পর্কে এক রকম পাপবোধ। এই ধারণা মানুষের মনে বেশ ভালভাবেই ঠাঁই করে নিয়েছিল, মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী ও অপরাধী।
মূলত মানুষের নিখুঁত মানব-প্রকৃতি ও সুকুমার বৃত্তির এই দৈন্যদশা সৃষ্টি হওয়ার জন্যে কাজ করছিল যুগপৎ এশিয়ার কয়েকটি প্রাচীন ধর্ম এবং ইউরোপ, আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিকৃত খ্রীস্ট ধর্ম। হিন্দুস্তানের প্রাচীন ধর্মগুলো মানুষের সামনে পেশ করেছিল 'তানাসুখ'-এর দর্শন ১ আর খ্রীস্ট ধর্ম প্রচার করে বেড়াচ্ছিল এই স্লোগান, "মানুষ আসলে জন্মগতভাবেই পাপী আর ঈসা মাসীহ হলেন তাদের পাপের কাফ্ফারা ও প্রায়শ্চিত্যস্বরূপ।”
এই জঘন্যতম আকীদা দু'টোর প্রসার ঘটিয়ে তৎকালীন দুনিয়ার সে আকীদার অনুসারী লাখো কোটি মানুষকে আপন সত্তা ও প্রকৃতি সম্পর্কে ভীষণভাবে সন্দিহান করে তোলা হয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যত, পরিণাম-ফল ও আল্লাহর রহমত লাভের আশা-ভরসাকে তাদের মন থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল।
তখনই মুহাম্মদ (সা.) দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন: মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি একটি নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ফলকের ন্যায়, আগে যাতে ছিল না কোন ধরনের লেখা ও চিহ্ন। পরবর্তীতে মানুষ তাতে আঁকে চোখ জুড়ানো সব নকশা ও চিত্র অর্থাৎ মানুষ নিজেই উদ্বোধন করে তার জীবন। আগামী দিনের কর্ম বিচারেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে, আপন কর্মগুণেই তার বিচার হবে। সে হবে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী। অন্যের কর্মের ব্যাপারে সে মোটেই দায়ী নয়। পবিত্র কুরআনের একাধিক জায়গায় এই কথা পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে, মানুষ কেবল নিজের কর্ম সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হবে।
"কেউ কারো বোঝা বহন করবে না এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। তার কর্ম শীঘ্রই দেখা হবে, অতঃপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান।" [সূরা নজম, আয়াত-৩৮]
স্বীয় স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে এই ঘোষণা আবার ফিরিয়ে আনল তার হারানো বিশ্বাস ও অনুভূতি। ফলে সে এগিয়ে গেল সমুখপানে—দৃঢ়প্রত্যয়ী সংকল্প নিয়ে, বীরত্বব্যঞ্জক উদ্যমী মনোভাব নিয়ে, এগিয়ে গেল নির্ভীক ও নিঃশংক হয়ে, মানবতার এক নতুন পৃথিবী আবাদ করার লক্ষ্য নিয়ে। সুযোগের সদ্ব্যবহারে এখন সে মোটেই দ্বিধাগ্রস্ত নয়, সন্ধিগ্ধ নয়। মুহাম্মদ (সা.) অপরাধ ও গোনাহকে ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলনকে মানুষের জীবনের একটি আকস্মিক অবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন যাতে সে লিপ্ত হয়ে পড়ে কখনো অজ্ঞতাবশত, কখনো অসতর্কতাবশত, আবার কখনো বা শয়তানের ধোঁকার শিকার হয়ে। নইলে সততা, সততার যোগ্যতা, অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া মানব স্বভাবের প্রকৃত দাবি ও ইনসানিয়াতের অলংকার। কোন ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চাওয়া, পুনর্বার তা না করার দৃঢ় সংকল্পে বুক বাঁধা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ, তার মৌলিকত্বের বড় নিদর্শন ও বহিঃপ্রকাশ, সর্বোপরি তা হযরত আদম (আ.)-এর উত্তরাধিকার।
মুহাম্মদ (সা.) গোনাহগার ও পাপীদের সামনে, পাপাচার ও অনাচার ও অনাচারে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের সামনে খুলে দিয়েছেন তওবার এক প্রশস্ত দরজা। ব্যাপকভাবে ডেকেছেন তাদেরকে তওবার দিকে। তুলে ধরেছেন তাদের সামনে তওবার ফযীলত ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা, যে বিস্তৃতি উপলব্ধি করে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তিনি দ্বীনের এই বিশেষ ও মহান রুকনটিকে উম্মতের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাই তাঁর অন্যান্য সুন্দর নামের মধ্যে একটি নাম হলা নবী অত-তওবাহ (তওবার নবী)। কেননা বিগত জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গুনাহ-খাতার জন্য একমাত্র বাধ্যতামূলক পন্থা হিসেবেই শুধু মানুষকে তিনি তওবার দিকে ডাকেন নি, বরং তওবার মান ও মাহাত্ম্যকে তুলে ধরেছেন উম্মতের সামনে। ফলে তওবা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে 'বিলায়াতে'র দরজা লাভ করার জন্য এক শ্রেষ্ঠ ইবাদতে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ এই বিলায়াতই আবেদ-যাহিদ-এর কাছেও আল্লাহর নেক বান্দাদের নিকট চিরকালের ঈর্ষা করার জিনিস।
আল-কুরআনেও আল্লাহ্ তা'আলা বর্ণনা করেছেন তওবার ফযীলত ও তাঁর রহমতের বিস্তৃতির কথা। তওবা করলে গোনাহগারের গোনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে এমন চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে বর্ণনা করা হয়েছে এবং অবাধ্য ও গোনাহগার বান্দাদেরকে, কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের সাথে যুদ্ধে হেরে যাওয়া হৃদয়গুলোকে আল্লাহর রহমতের দামান আঁকড়ে ধরার এবং দয়া ও করুণার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য এমনভাবে ডেকেছেন এবং তাঁর তরংগায়িত ও সর্বব্যাপী রহমতকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় আল্লাহ্ পাক শুধু সহনশীল, দয়ালু ও দানশীলই নন, বরং তিনি ভীষণ ভালোবাসেন তওবাকারীদেরকে।
এবার পড়ুন কুরআনের আয়াতগুলো, অনুধাবন করুন তাঁর দয়া, করুণা ও মহব্বতের সেই নিঃসীমতা, যা আয়াতের শব্দে ঝরে ঝরে পড়েছে, আলো ছড়াচ্ছে।
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়ালু"। [সূরা যুমার, আয়াত-৫৩]
অপর এক আয়াতে গুনাহগার পাপী মানুষের উল্লেখ প্রসংগে নয়, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী, উত্তম চরিত্র-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জান্নাতী মানুষের আলোচনা প্রসঙ্গে গুনাহ থেকে তওবাকারী মানুষের উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ্ সৎ কর্মপরায়ণদেরকে ভালবাসেন এবং যারা কোন অশ্লীল কার্য করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ্ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না। ওরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং জান্নাত যার পাদদেশ নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং সৎ কর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম!"
এই আয়াতের চেয়েও আরো চিত্তাকর্ষক পদ্ধতি চোখে পড়ে নিম্নোক্ত আয়াতে। আল্লাহ্ এই আয়াতে তাঁর পুণ্যবান বান্দাগণের এক নূরানী তালিকা তৈরি করেছেন আর তা উদ্বোধন করেছেন আবেদ-যাহিদের বদলে তওবাকারীদের দিয়ে:
“তওবাকারী, ইবাদতকারী, শোকরগুযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সেজদা আদায়কারী, সৎ কাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্তকারী ও আল্লাহর দেয়া সীমাসমূহের হিফাজতকারী (এরাই মু'মিন) এবং (হে পয়গাম্বর।) আপনি মু'মিনদেরকে (জান্নাতের) সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।" [সূরা তওবা, আয়াত ১১২]
গোনাহ করার পর তওবাকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হলে তার যে সম্মান ও মর্যাদা লাভ হয় তা ফুটে উঠেছে তাবুক যুদ্ধে কোন সংগত কারণ ছাড়াই পিছিয়ে পড়া তিন সাহাবীর তওবা কবুল করার কুরআনী ঘোষণায়। আয়াতে উক্ত তিন সাহাবীর আলোচনার আগে খোদ আল্লাহর নবী ও সেই সব আনসার-মুহাজিরের আলোচনাও করা হয় যারা তাবুক অভিযানে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। তারপর যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া তিনজনের কথা উল্লেখ করা হয়। কারণ হলো, এই তিনজন যাতে একাকিত্ব অনুভব না করেন এবং কোন প্রকার হীনমন্যতা ও নীচ অনুভূতি তাদেরকে কষ্ট না দেয় আর দুনিয়াবাসীর কাছেও যাতে কেয়ামত পর্যন্ত এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায়, এই তিনজনও সেই মুবারক জামাতেরই সদস্য। সুতরাং লজ্জার কিছু নেই।
আছে কি ধর্ম, চরিত্র, প্রশিক্ষণ ও সংস্কার-সংশোধনের কোন ইতিহাসে তওবা করার এমন চিত্তাকর্ষক, সুন্দর, মধুর ও হৃদয়গ্রাহী কোন নমুনা? এবার লক্ষ্য করুন কুরআনী আয়াত:
“আল্লাহ্ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে অনুগমন করেছিল যখন তাদের একদলের চিত্তবৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি; নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়েছিল আর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা তওবা করে। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তওবা: আয়াত ১১৭-১১৮)
আল্লাহ্ আরো ঘোষণা করেছেন, তাঁর রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে:
“আমার রহমত প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৫৬)। এক হাদীছে কুদসীতে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী।"
আল্লাহ্ নৈরাশ্যকে কুফুরী, মূর্খতা ও ভ্রষ্টতার শামিল হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, হযরত ইয়া'কূব (আ.)-এর ভাষায়:
"নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।"
অন্যত্র হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ
"পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্ট ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?" [সূরা হিজর: আয়াত-৫৬]
এভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) তওবার ফজিলত বর্ণনা করে এর প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করে ঘোষণা করলেন আল্লাহর রহমতের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার কথা এবং আল্লাহর ক্রোধ ও জালালিয়াতের ঘোষণা ও তার বিস্তৃতিতে ভীতসন্ত্রস্ত, নিরাশ ও হতোদ্যম হৃদয়গুলোকে শোনালেন এক নতুন জীবনের পয়গাম। হতাশাঘেরা জীবনে সঞ্চার করলেন এক নতুন স্পন্দন, নতুন তৎপরতা। লাঞ্ছনা ও অভিশপ্ত দুনিয়ার আঁধার থেকে বের করে তাদেরকে নিয়ে গেলেন সম্মান-মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা স্থাপনের এক আলোকোজ্জ্বল নতুন পৃথিবীতে।
টিকাঃ
১। তানাসুখ (জন্মান্তরবাদ): হিন্দুদের মাঝে ও প্রাচীন ধর্মের অন্য অনুসারীদের মাঝে প্রচলিত একটি 'আকীদা' যার মূল কথা হলো, মানুষের মৃত্যুর পর তার রূহু বা আত্মা অন্য প্রাণীর রূপ পরিগ্রহ করে। আর এই রূপান্তর ঘটে থাকে মৃত ব্যক্তির পাপ-পুণ্যের শাস্তি কিংবা পুরস্কার হিসেবে। তবে যে প্রাণীতে মানুষের রূহ স্থানান্তরিত হবে তা মৃতের চেয়ে মর্যাদায় বড়ও হতে পারে, আবার ছোটও হতে পারে।
📄 সমন্বয় সাধনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত
প্রাচীন ধর্মগুলো, বিশেষত খ্রীস্ট ধর্ম মানব জীবনকে দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল: দীন ও দুনিয়া। আর ভূমণ্ডলকে ভাগ করেছিল দু'টি স্তরে। এক স্তরে কিছু সংখ্যক মানুষ মশগুল থাকবে কেবল দ্বীন নিয়ে, অপর দিকে কিছু লোক ব্যস্ত থাকবে শুধু দুনিয়া নিয়ে।
এই দু'টি স্তর শুধু পরস্পর বিচ্ছিন্নই ছিল না, উভয়ের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে ছিল এক বিরাট বাধা ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এক দলের সাথে আরেক দলের কোন যোগাযোগ ও মিল ছিল না, বরং পারস্পরিক যুদ্ধ-কলহ ও হানাহানির এক সিলসিলা বিদ্যমান ছিল, বিরাজমান ছিল একে অপরের রক্তে হাত লাল করার এক উন্মত্ত জিঘাংসা। এদের প্রত্যেকেই দ্বীন-দুনিয়ার একত্রীকরণ ও সহাবস্থান অসম্ভব মনে করত। তাই যখনই কোন মানুষ এই দু'টি পক্ষের কোন একটিকে গ্রহণ করতে চাইত অপরিহার্যভাবেই তখন তাকে অপর পক্ষ থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়তে হতো, বরং অপর পক্ষের বিরুদ্ধে তাকে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করতে হতো। এ যেন একই সঙ্গে দুই নৌকায় পা রাখা! দুনিয়াদারদের মনোভাব ছিল এই, আসমান যমীনের স্রষ্টার দিক থেকে মুখ না ফেরালে ও পরকাল সম্পর্কে বেখবর না হলে অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন ও সমৃদ্ধি সাধন কোনভাবেই সম্ভব নয়। মন থেকে আল্লাহর ভয় না তাড়ালে এবং নৈতিক, চারিত্রিক ও দ্বীনী শিক্ষা বর্জন না করলে কোন প্রশাসনিক ক্ষমতাই টিকে থাকতে পারে না।
আর অপর দল মনে করে, "বৈরাগ্যবাদকে আঁকড়ে না ধরলে এবং দুনিয়ার সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন না করলে দ্বীনদার হওয়ার প্রশ্নই আসে না।” বলা বাহুল্য, যা কিছু সহজ মানুষ তাই পছন্দ করে এবং প্রকৃতিগতভাবে তা মেনে নিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। দ্বীনের অর্থ যদি এই হয়, দুনিয়ার বাহ্যিক সাজ-সরঞ্জাম ও উপায়-উপকরণ থেকে মোটেই ফায়দা হাসিল করা যাবে না, তবে তা মানব প্রকৃতির সাথে মোটেই সংগতিপূর্ণ হতে পারে না, বরং তা হবে নির্দোষ ও নির্মল মানব প্রকৃতিকে গলা টিপে হত্যা করার শামিল। আর দ্বীনের এই তথাকথিত ব্যাখ্যার পরিণতিতেই তৎকালীন যুগের সভ্য, ধীমান, যোগ্য ও শিক্ষিত সমাজের একটি বিরাট অংশ দ্বীনের পরিবর্তে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়াদারী নিয়ে ভীষণভাবে মেতে ওঠে। ফলে তিরোহিত হয়ে যায় তাদের হৃদয়-মন থেকে আধ্যাত্মিকতায় সফলতা অর্জনের ও উন্নত নৈতিকতা বিনির্মাণের সমস্ত আশা-ভরসা। যারা ব্যাপক হারে দ্বীন বর্জন করেছিল তারা এই ভেবে বসেছিল, বাস্তবিকই দ্বীনের সাথে দুনিয়ার সম্পর্ক বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক। আর গির্জাকেন্দ্রিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড যে দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে এমনটি ভাবতে মানুষকে বাধ্য করেছিল তা বলাই বাহুল্য। ফলে প্রশাসন ক্রমশই ক্রুদ্ধ ও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে লাগল দ্বীনের প্রতিনিধিত্বকারী এই গির্জার প্রতি। তখন মানুষ হয়ে পড়েছিল বাঁধনমুক্ত উন্মত্ত হাতির ন্যায় আর সমাজ ব্যবস্থা হয়েছিল দিকচিহ্নহীন মরুর বুকের লাগামহীন উটের ন্যায়।
দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ও তার অনুসারীদের দ্বন্দ্ব-কলহ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলেই দরজা খুলে যায় ধর্মহীনতা ও আল্লাহদ্রোহিতার যার প্রথম ও প্রধান শিকার ছিল পাশ্চাত্য দুনিয়া এবং সেই সব সম্প্রদায় যারা চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যকে মুরুব্বী হিসেবে গ্রহণ করেছিল কিংবা পাশ্চাত্যের আনুগত্য শর্তহীনভাবে মেনে নিয়েছিল।
আর পূর্বেই বলা হয়েছে, এর জন্য সর্বতোভাবেই দায়ী ছিল সীমালংঘনকারী ও কট্টরপন্থী ফাদার ও পাদ্রীরা যারা মানুষকে দ্বীন সম্পর্কে ভুল তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করে দ্বীনের এক অবাস্তব, অসংগত, হিংস্র ও ভয়ানক চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দ্বীন সম্পর্ক ভীষণভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।
এই নাযুক পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটল হযরত রাসূলে কারীম (সা.)-এর। ঘোষিত হলো, মানুষের সঠিক কর্মকাণ্ডের সাথে দ্বীনের কোন বিরোধ নেই, থাকতে পারে না। মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের বুনিয়াদই হলো মানুষের মূল লক্ষ্য। ইসলাম এই বিষয়টিকেই একটি ছোট ও গভীর অর্থবহ শব্দে প্রকাশ করেছে। শব্দটি হলো النية "নিয়ত”-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
“নিয়তের ওপরই সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে। মানুষ যা নিয়ত করবে তারই ফল সে লাভ করবে।”
মানুষের যাবতীয় কাজের উদ্দেশ্যই যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও তাঁর হুকুম পালন, তাহলে এসব কাজ তাকে পৌঁছে দেবে আল্লাহ্র নিকটতম সান্নিধ্যে, ইয়াকীন ও বিশ্বাসের সর্বোচ্চ চূড়ায়। ফলে তার সমস্ত কর্মই পরিগণিত হবে তখন 'খালিস দ্বীন' হিসেবে। পার্থিব আবিলতার সামান্যতম স্পর্শও তাতে থাকবে না, হোক না সে কাজ জিহাদ ও লড়াই? হোক না সে কাজ দেশ শাসন ও রাজ্য পরিচালনা, হোক না সে দুনিয়ার বৈধ বস্তুসমূহ থেকে খিদমত গ্রহণ কিংবা মনের চাহিদা পূরণ কিংবা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে চাকরি অনুসন্ধানের চেষ্টা-তদবির কিংবা দাম্পত্য জীবনের সুখ-সম্ভোগের। নিয়ত ঠিক থাকলে এ সবই বিবেচিত হবে ইবাদত হিসেবে। পক্ষান্তরে নিয়ত ঠিক না থাকলে বড় বড় ইবাদত, যথাঃ নামায, রোযা, হিজরত, জিহাদ, তাসবীহ-তাহলীল-সবই পরিগণিত হবে দুনিয়াবী কাজ হিসেবে। তার জন্য কোন সওয়াব তো মিলবেই না, বরং এই ইবাদতই তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পঞ্চম অনুগ্রহ এই, তিনি দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছেন এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও শত্রুভাবাপন্ন দল দু'টিকে অবিরাম হিংসা, হানাহানি ও জিঘাংসা থেকে মুক্ত করে গলায় গলায় মিলিয়ে দিয়েছেন, আবদ্ধ করেছেন ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক সুগভীর দৃঢ় বন্ধনে, উপহার দিয়েছেন শান্তি ও ঐক্যের এক নতুন পৃথিবী।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) একাধারে বাশীর (সুসংবাদ প্রদানকারী) ও নাযীর (ভীতি প্রদর্শনকারী)। তিনি আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন এই মহান দু'আঃ
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর আর আমাদেরকে বাঁচাও জাহান্নামের আযাব থেকে।”
তিনি আরো ঘোষণা করেছেন:
"নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু কেবল জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশেই নিবেদিত।"
মানব জীবন কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিপরীতমুখী এককের সমষ্টি নয়, বরং তা হলো এমন এক সত্তার নাম, জীবনের ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ্র প্রতি ঈমান ও অবিচল আস্থা বাস্তব জীবনের হাজারো কর্মব্যস্ততা মোটেই যা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং নিষ্ঠা থাকলে, নিয়ত সহীহ্ থাকলে, আল্লাহর সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য হলে আর এ সবই নবী-রাসূলগণের আনীত মাপকাঠিতে উতরে গেলে প্রমাণিত হবে, আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি নবীজীর কাছ থেকে একতা ও সাম্যের শিক্ষা। নবীজী মিটিয়ে দিযেছেন দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সকল বাধা-ব্যবধান। তিনি মানুষের গোটা জীবনকে ইবাদতে পরিণত করেছেন আর সমগ্র পৃথিবীকে পরিণত করেছেন ইবাদতগাহে। পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত ক্ষয়িষ্ণু মানবতার হাত ধরে তিনি তাদের নিয়ে গেছেন নিষ্ঠা ও সততার এক বিস্তৃত অঙ্গনে।
সেই পুণ্য কাফেলায় রয়েছেন ফকীর-মিসকীনের পোশাকে কত রাজা-বাদশাহ! আবার রাজা-বাদশাহ ও আমীরগণের লেবাসে রয়েছেন কত আবেদ যাহিদ ও আল্লাহর পেয়ারা বান্দা! এঁরা ধৈর্য ও সহনশীলতার সুউচ্চ পর্বতমালা! ইল্ল্ফ ও জ্ঞানের উচ্ছল ঝর্ণাধারা! এঁদের রজনী ভোর হয় ইবাদত-বন্দেগীর নিবিড়তায় আর দিবসে হয় এঁরা শাহসওয়ার! আল্লাহর পথের সৈনিক। কিন্তু কোথাও কোন বিরোধ নেই, কোন জটিলতা নেই, নেই কোন শূন্যতা।